Friday, October 3, 2025
জেন-জি বিদ্রোহ: এশিয়ায় ফিরছে আরব বসন্ত? by মীনা কান্ডাসামি
জেন-জি বিদ্রোহ: এশিয়ায় ফিরছে আরব বসন্ত? by মীনা কান্ডাসামি
এখানে বিপ্লবের চিত্রনাট্য যাঁরা লিখছেন, তাঁরা কোনো পেশাদার বিপ্লবী নন। তাঁরা সেই সব সাধারণ তরুণ-তরুণী, যাঁদের আর হারানোর কিছু নেই। তাঁদের আন্দোলনের ছবি আমাদের সামনে হাজির হচ্ছে। আমরা শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্টের প্রাসাদে শয়নকক্ষের খাটে শুয়ে থাকা প্রতিবাদকারীদের সেলফি তুলতে দেখেছি। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন গণভবনে ঢুকে পড়া উল্লসিত জনতার একই ছবি দেখেছি। আমরা নেপালের পার্লামেন্ট ভবন জ্বলতে থাকা আগুন দেখেছি।
এ সবই জেনারেশন জেড বা জেন-জির হতাশা, বঞ্চনা ও ক্ষোভের ভাষা। এখানে বিদ্রোহ এক প্রবল বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে।
গত বছর বাংলাদেশে, ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কায় আর অতিসম্প্রতি ইন্দোনেশিয়া ও নেপালে তরুণেরা ক্ষমতার ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছেন। কোথাও তাঁরা শাসকদের উৎখাত করেছেন, কোথাও–বা গদি নড়িয়ে দিয়েছেন। এতগুলো দেশে একসঙ্গে এমন দৃশ্য কি নিছক কাকতালীয়? মোটেও না। এর পেছনে রয়েছে একটি বড় বৈশ্বিক প্রবণতা—সংগঠিত বামপন্থী ও প্রগতিশীল আন্দোলনের পতন। যে আন্দোলনগুলো একসময় দুর্নীতি, বৈষম্য ও দমননীতির বিরুদ্ধে তরুণদের পাশে দাঁড়াত, আজ তারা ছিন্নভিন্ন, দুর্বল কিংবা অস্তিত্ব হারানোর পথে।
এশিয়ার একেক দেশে সামাজিক চুক্তি ভেঙে পড়েছে নানা কারণে। এর পেছনে কোথাও ভয়াবহ বেকারত্ব, কোথাও দুর্নীতিগ্রস্ত ও দমনমূলক অভিজাত শ্রেণি, কোথাও তীব্র অর্থনৈতিক সংকট, আবার কোথাও ধনী-গরিবের মধ্যে ক্রমবর্ধমান বৈষম্য কাজ করেছে। অথচ এসবের বিরুদ্ধে যে প্রগতিশীল শক্তি একসময় সোচ্চার ছিল, তারা এখন এতটাই অকার্যকর যে তরুণদের কাছে তারা আর কোনো বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প হয়ে উঠতে পারছে না। ফলে রাগান্বিত তরুণদের একমাত্র ভরসা হয়ে উঠেছে তাঁদের স্মার্টফোন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন তাঁদের মিছিল ও আন্দোলনের সমন্বয়ের হাতিয়ার। তবে এর ভেতরে কোনো দৃঢ় নেতৃত্ব নেই, নেই কোনো সুসংহত মতাদর্শ, নেই কোনো স্পষ্ট বিপ্লব-পরবর্তী স্বপ্নের রূপরেখা। তবু এই শূন্যতার মধ্যেই গড়ে উঠছে এক নতুন বাস্তবতা। এটি যেন এশিয়ায় আরব বসন্তের পুনর্জন্ম।
শ্রীলঙ্কায় যখন লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতি ও বৈদেশিক ঋণের খেলাপি অবস্থায় লাখো মানুষ খাদ্য, জ্বালানি ও ওষুধ কিনতে অক্ষম হয়ে পড়ে, তখনই আমরা রাজাপক্ষে পরিবারতন্ত্রের পতন ঘটতে দেখলাম। বাংলাদেশে যুব বেকারত্ব আর চাকরির কোটাব্যবস্থা (যা শাসক আওয়ামী লীগের সমর্থকদের পক্ষে বলে মনে করা হতো) সরকার পতনের মূল কারণ হয়ে ওঠে। ইন্দোনেশিয়ায় মুদ্রাস্ফীতি, ক্রমবর্ধমান বৈষম্য এবং শ্রম অধিকার ও পরিবেশ সুরক্ষাকে খর্ব করা আইন আগুনে ঘি ঢালে। তা শেষ পর্যন্ত ভয়াবহ সহিংসতায় বিস্ফোরিত হয়। নেপালেও একই ধরনের বিষাক্ত সমীকরণ তৈরি হয়। সেখানে পুলিশের গুলিতে প্রতিবাদকারীদের মৃত্যু দেশকে রাজনৈতিক শূন্যতার দিকে ঠেলে দেয় এবং প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগে বাধ্য করে।
এই জনক্ষোভ যখন বিস্ফোরিত হয়, তখন তা সরাসরি গিয়ে আঘাত করে পার্লামেন্ট ভবন, প্রেসিডেন্টের প্রাসাদ কিংবা রাজনীতিবিদদের বাড়ির মতো ক্ষমতার প্রতীকগুলোর ওপর। ডিজিটাল সংহতির মাধ্যমেই এই আন্দোলনগুলো সংগঠিত হয়।
তরুণদের এই প্রতিবাদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে এক নতুন তাৎপর্য দিয়েছে। অনেকে মনে করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কেবল ডানপন্থী ইকো-চেম্বার ও বিভাজনের জায়গা। কিন্তু বাস্তবে এখানে জন্ম নিচ্ছে বিরোধী প্রতিষ্ঠান ও দুর্নীতিবিরোধী এক প্রবল তরঙ্গ। এটি জেন-জিকে একত্র করছে। তবে সমস্যাটা হলো এ অঞ্চলে উদারবাদী রাজনীতির ভয়াবহ ভগ্নদশার কারণে তরুণেরা কোনো ঐক্যবদ্ধ নেতৃত্ব পাচ্ছেন না।
ইন্দোনেশিয়ায় সুহার্তোর শাসন (১৯৬৭-১৯৯৮) বামপন্থাকে নির্মূল করে দিয়েছিল। সেই ব্যবস্থা আজও ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। নেপালের সাবেক মাওবাদীরা রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে গৃহযুদ্ধ করে ক্ষমতায় এসে জড়িয়ে পড়েছে সেই একই দুর্নীতিতে, যা কিনা তারা একসময় ধ্বংস করার শপথ নিয়েছিল। শ্রীলঙ্কায় জাতিগত সংকীর্ণতা বামপন্থাকে গ্রাস করেছে। আর বাংলাদেশে বামপন্থা প্রায় অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে।
এক দশকের বেশি আগে টুইটার ছিল আরব বসন্তের চালিকা শক্তি। আজকের এশিয়ায় সেই জায়গা নিয়েছে ইনস্টাগ্রাম ও টিকটক। প্রায়ই জেন-জিকে খাটো করে বলা হয়, তারা দুর্বল, ঝুঁকি নিতে ভয় পায় আর রিল-দুনিয়ার মধ্যে আটকে পড়েছে। অথচ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিদ্রোহগুলো তার সম্পূর্ণ উল্টো প্রমাণ হাজির করছে। আদতে এই প্রজন্ম বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়; বরং সোশ্যাল মিডিয়াকে তারা রূপান্তর করেছে তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্রে।
প্রতিটি ক্ষেত্রে লক্ষ করলে দেখা যাবে, প্রথম থেকেই আন্দোলন সহিংস হয়নি। রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নই আন্দোলনকে সহিংসতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। আন্দোলনকারীরা বুঝতে শিখেছেন, শুধু অর্থনৈতিক স্বস্তি বা রাজনৈতিক সংস্কার নয়, রাষ্ট্রীয় সহিংসতার জবাবদিহিও তাঁদের দাবির অংশ হতে হবে।
নেপালে আন্দোলনের শুরুটা ছিল উৎসবমুখর ও নির্দোষ। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীরা নিজেরাই ভেবেছিলেন, আন্দোলন শেষে তাঁরা জায়গাটা পরিষ্কার করে দেবেন। কিন্তু সেই পরিবেশ একমুহূর্তেই বদলে যায়, যখন পার্লামেন্ট ভবনে ঢুকতে চাওয়া প্রতিবাদকারীদের ওপর পুলিশ গুলি চালায়। শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশেও রাষ্ট্রীয় সহিংসতাই আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
ইন্দোনেশিয়ায় আন্দোলন দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে তখনই, যখন তরুণ ডেলিভারি কর্মী আফফান কুরনিয়াওয়ান পুলিশের দমন অভিযানে এক সাঁজোয়া গাড়ির চাপায় মারা যান। ইতিহাসে এর অনুরূপ উদাহরণ আছে। ২০১০ সালে তিউনিসিয়ার তরুণ ফেরিওয়ালা মোহাম্মদ বুয়াজিজি তাঁর পণ্য পুলিশ কেড়ে নেওয়ায় আত্মাহুতি দিয়েছিলেন। সেই আগুনই পুরো আরব বিশ্বকে গ্রাস করেছিল।
ইন্টারনেট সেন্সরশিপও পরিস্থিতি আরও খারাপ করেছে। নেপালে যখন #নেপবেবি হ্যাশট্যাগ ভাইরাল হয়ে অভিজাতদের স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতিকে প্রকাশ্যে আনল, তখন সরকার অনলাইন সমালোচনাকে প্রাণঘাতী হুমকি হিসেবে দেখল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ করে তারা ভেবেছিল তরুণদের রাগ দমন করবে। কিন্তু বাস্তবে তরুণেরা আরও বেশি বিদ্রোহী হয়ে রাস্তায় নেমে পড়েন।
তবে আরব বসন্তের শেষ পরিণতি এক সতর্কবার্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেটি হলো আশার জোয়ার থেকে ধ্বংসস্তূপে গড়িয়ে পড়া। আজকের এশিয়ার বিদ্রোহেরও একই পরিণতি ঘটতে পারে। কারণ, ক্ষোভ জিইয়ে রাখার মতো পরিস্থিতি এখনো বিদ্যমান। যদি তরুণদের নেতৃত্ব দেওয়ার মতো বিশ্বাসযোগ্য বামপন্থী বা প্রগতিশীল বিকল্প তৈরি না হয়, তাহলে সামনে অপেক্ষা করছে আরও ভয়াবহ বিশৃঙ্খলা—ক্ষোভ, সামরিক অভ্যুত্থান, সাম্প্রদায়িক সংঘাত।
তবু এবার কিছু আলাদা। জেন-জি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে রাজনীতির পরিপূরক হিসেবে নয়, রাজনীতির কেন্দ্রীয় শক্তি হিসেবে দেখছে। তারা বুঝে গেছে, পুরোনো আন্দোলন ব্যর্থ হয়েছে। তাই তারা নতুন কিছু গড়ে তুলছে। তারা বিকেন্দ্রীভূত, কিন্তু ভয়ংকর কার্যকর। তারা নিজেদের কণ্ঠ খুঁজে পেয়েছে। আর যারা ক্ষমতায় আছে, যদি এই কণ্ঠকে উপেক্ষা করে, তবে সেই উপেক্ষা তাদের জন্যই এক ভয়ানক বিপদ হয়ে উঠবে।
● মীনা কান্ডাসামি, ভারতের চেন্নাইভিত্তিক লেখক
- নিউইয়র্ক টাইমস থেকে নেওয়া অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ
![]() |
| নেপালে বাস্তবে তরুণেরা আরও বেশি ক্ষুব্ধ হয়ে রাস্তায় নেমে আসেন। ছবি: এএফপি |
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
eCoxs Special
BNM Archive
- ► 2026 (1331)
-
▼
2025
(3280)
-
▼
October
(199)
-
▼
Oct 03
(8)
- রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান মিয়ানমারের ভেতরেই: ফিলিপ্পো...
- ট্রাম্পের পরিকল্পনায় কি হামাস রাজি হবে by জেসন বার্ক
- পৃথিবীর সব সরকারের ভেতরে সরকার থাকে -বিশেষ সাক্ষাৎ...
- ট্রাম্পের গাজা পরিকল্পনার ব্যাখ্যা ও দ্বিরাষ্ট্রভি...
- জেন-জি বিদ্রোহ: এশিয়ায় ফিরছে আরব বসন্ত? by মীনা কা...
- গাজা অভিমুখী নৌবহরে ইসরায়েলি সেনাদের আক্রমণ, ধরে ন...
- গাজায় ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর নতুন শান্তি পরিকল্পনা
- দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন রাজনীতির সম্ভাবনা by মো. সাহাবু...
-
▼
Oct 03
(8)
-
▼
October
(199)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...

No comments:
Post a Comment