Thursday, August 20, 2026
বিরল রোগ: চোখের সামনে সন্তান অচল হয়ে পড়লেও কিছু করার থাকে না মা–বাবার by শিশির মোড়ল
পারে না শুধু দাঁড়াতে, হাঁটতে। সোজা হয়ে বসতে পারে না। বসলে মাথা ঢলে পড়ে। এই বয়সী শিশুর পেশিতে যে শক্তি থাকা দরকার, তা ওর নেই। শিশুটি বংশগত রোগে আক্রান্ত। চিকিৎসাবিজ্ঞানে রোগটির নাম স্পাইনাল মাসকুলার অ্যাট্রোফি (এসএমএ)।
শাহিন আক্তার ও শাহাদাৎ হোসেন দম্পতির একমাত্র সন্তান এই শিশু। নাম অলিভিয়া সঞ্চারী নবনী, বয়স চার বছর দুই মাস। রাজধানীর মগবাজারে তাঁদের বাসা। সন্তানের এসএমএ আছে জানার মুহূর্ত থেকে এই দম্পতির কাছে দুনিয়ার সবকিছু যেন ধূসর হয়ে গেছে। তাঁদের মেয়ে বিরল রোগে ভুগছে। এমন রোগ কম দেখা যায়। এসএমএ একটি বিরল রোগ।
২৩ আগস্ট ওই দম্পতির বাসায় তাঁদের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। বাসা ছাড়ার ঠিক আগমুহূর্তে কথা হয় শিশুটির সঙ্গে। শিশুর মা শাহিন আক্তার বলেন, ২০২১ সালের ২০ জুন নবনীর জন্ম। ঠিক সময়ে জন্ম হয়েছিল, জন্মের সময় ওজন ৩ কিলোগ্রামের বেশি ছিল। হাত–পা নড়াচড়াতেও সমস্যা ছিল না। জন্মের ২৫–২৬ দিন পর প্রথম চোখে পড়ল, মেয়ের পা দুটোর নড়াচড়া কমে গেছে। স্বামী–স্ত্রী মেয়েকে নিয়ে শিশু স্নায়ুরোগবিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মিজানুর রহমানের শরণাপন্ন হন। ওই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক একটি পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেন, যে পরীক্ষার ব্যবস্থা দেশে ছিল না।
শিশুর বাবা শাহাদাৎ হোসেন বলেন, ‘তখন করোনা শেষ হয়নি, বিদেশ যাতায়াত কঠিন ছিল। আমরা অক্টোবরে (২০২১) ভারতের চেন্নাই গিয়ে অ্যাপোলো হাসপাতালে মেয়েকে দেখাই। চেন্নাই থেকে রক্তের নমুনা পাঠানো হয় বেঙ্গালুরুতে। নভেম্বরে আমাদের জানানো হয় মেয়ের এসএমএ।’
চিকিৎসাবিজ্ঞান বলে এসএমএ মানুষের জিনের ত্রুটিজনিত রোগ। মা ও বাবা উভয়ই এসএমএর বাহক হলে তাঁদের সন্তানদের ২৫ শতাংশ ঝুঁকি থাকে এসএমএ রোগী হওয়ার। এসএমএ থাকলে পেশি নিয়ন্ত্রণের শক্তি ক্রমাগত কমতে থাকে, খাবার চিবানো ও গিলতে অসুবিধা হয়, মেরুদণ্ড বাকা ও কুঁজো হয়, শ্বাসকষ্ট থাকে। এসএমএর রোগীর দাঁড়াতে, হাঁটতে, সিঁড়ি ভাঙতে কষ্ট হয়। সাধারণত ১০ হাজার শিশু জন্মে একটি শিশুর এসএমএ দেখা যায়।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালের পরিচালক অধ্যাপক কাজী গিয়াস উদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘এসএমএ–কে আমরা বিরল রোগ বলছি। তবে দেশে আরও অনেক ধরনের বিরল রোগ আছে।’
বিরল রোগ সংক্রামক বা অসংক্রমাক হতে পারে। তবে বিরল রোগ কেন্দ্রে কেন্দ্রে রেখে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কোনো ধরনের কাজ নেই। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবু জাফর প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিরল রোগ নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পৃথকভাবে কোনো শাখা নেই। সামগ্রিকভাবে বিরল রোগ নিয়ে কোনো কাজ নেই। বিশেষ কোনো বিরল রোগ নিয়ে আলোচনা উঠলে তখন সেটার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।’
বিরল রোগ কী
জনগোষ্ঠীর মধ্যে যে রোগের প্রাদুর্ভাব কম দেখা যায়, তা বিরল রোগ। এ বছর ফেব্রুয়ারির বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি দলিল বলছে, বিরল রোগ হচ্ছে একটি বিশেষ স্বাস্থ্য পরিস্থিতি, যা প্রতি দুই হাজার মানুষের মধ্যে একজনে বা তার কমে দেখা দেয়। বিশ্বব্যাপী প্রায় সাত হাজার বিরল রোগ আছে, ভুগছে প্রায় ৩০ কোটি মানুষ। ৭০ শতাংশ বিরল রোগ শিশু বয়সে শুরু হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বিরল রোগ সাধারণত জটিল, একাধিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এতে প্রভাবিত হয়। আক্রান্ত ব্যক্তি সহ–অসুস্থতায় (কো–মরবিডিটি) ভোগে। রোগটি দ্রুত অবনতির দিকে যায়, প্রতিবন্ধিতা সৃষ্টি করে ও অকালমৃত্যুর কারণ হয়।
বিরল রোগ নিয়ে বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না। এদের নিয়ে কাজও কম। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে এগিয়ে থাকতে দেখা যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের আইনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি দুই লাখ মানুষের মধ্যে একজনের যে রোগটি হয়, তা বিরল রোগ। দেশটিতে প্রায় ছয় হাজার বিরল রোগ আছে। এসব রোগে আড়াই কোটি মানুষ ভুগছে।
দেশে কত বিরল রোগ
এই প্রতিবেদক গত মার্চ থেকে আগস্টের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত তিনটি হাসপাতাল, বেশ কয়েকজন চিকিৎসক ও ৩০ জনের বেশি অভিভাববক ও রোগীর সঙ্গে কথা বলে দেশে বিরল রোগের পরিস্থিতি জানার চেষ্টা করেছেন। এই সময়ে এসএমএ, ডিএমডি, হিমোফিলিয়া, মোয়ামোয়া, সিফা সিনড্রোম, রেটস সিনড্রোম, প্রজেরিয়া, ট্রি ম্যান সিনড্রোম, এক্সপির মতো বিরল রোগের কথা জানা গেছে। প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি।
এসএমএ জিনের ত্রুটিজনিত রোগ। এতে পেশির নিয়ন্ত্রণ শক্তি ক্রমাগত কমতে থাকে, খাবার চিবোতে ও গিলতে সমস্যা হয়, মেরুদণ্ড বাঁকা ও কুঁজো হয়, শ্বাসকষ্ট থাকে। রোগীর দাঁড়াতে, হাঁটতে ও সিঁড়ি ভাঙতে কষ্ট হয়। সাধারণত ১০ হাজার শিশু জন্ম নিলে তাদের মধ্যে একজনের এই রোগ হওয়ার ঝুঁকি থাকে। দেশে এই রোগী আছে ২০০ থেকে ৩০০।
জিনের ত্রুটিজনিত আরেকটি রোগ ডুচেনি মাসকুলার ডিস্ট্রোফি (ডিএমডি)। এটি ছেলেদের বেশি হয়। ১০ থেকে ১২ বছর বয়সে পায়ের পেশি শক্ত হয়ে যায়। অনুমান করা হয়, দেশে ডিএমডি রোগী আছে দুই শর কাছাকাছি। ১০ হাজার জীবিত জন্মে একজনের এটি দেখা যায়।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালের চিকিৎসকেরা ‘রেটস সিনড্রোম’ নামের একটি বিরল রোগ নিয়ে গবেষণা করছেন। এটিও জিনের ত্রুটিজনিত স্নায়ুর রোগ। জন্মের দেড়-দুই বছর পর্যন্ত শিশু ভালোই থাকে। তারপর থেকে শিশুর খিঁচুনি হতে দেখা যায়। শিশুর মাথা বড় হয় না। শিশু ভুলে যেতে থাকে। কত মানুষ এতে আক্রান্ত, তা জানা যায় না।
দেশের গণমাধ্যমগুলো ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে ‘বৃক্ষমানব’ আবুল বাজনদারকে নিয়ে অনেক প্রতিবেদন প্রকাশ করতে থাকে। আবুল বাজনদারের হাত ও পায়ের আকৃতি ছিল গাছের শিকড়ের মতো। জিনের নির্দিষ্ট ত্রুটি থাকা মানুষ হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে রোগটি দেখা দেয়।
আবুল বাজনদার ১৯ সেপ্টেম্বর এই প্রতিবেদককে বলেন, তিনি আবার অস্ত্রোপচারের জন্য জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি হয়েছেন। এ পর্যন্ত তাঁর দুই হাত ও দুই পায়ে ৩০টি বড় অস্ত্রোপচার হয়েছে।
প্রায় একইভাবে গণমাধ্যমের দৃষ্টি পড়েছিল একজন ‘প্রজেরিয়া’ রোগীর ওপর। এতে শিশুর চেহারা প্রবীণের মতো হয়। জিনের রূপান্তরে এটা হয়। মানুষ অল্প সময়ে বুড়িয়ে যায়। হৃদ্রোগ ও রক্তনালির রোগের ঝুঁকি থাকে। এক কোটি মানুষের মধ্যে এমন ব্যক্তি একজন দেখা যায়।
রক্তের একটি বিরল রোগ হিমোফিলিয়া। কেটে গেলে রক্তপাত বন্ধ হয় না। এই রোগ সাধারণত পুরুষের হয়, নারী এই রোগের বাহক। ১০ হাজার মানুষের মধ্যে এই রোগে একজনকে আক্রান্ত হতে দেখা যায়।
২০১৬ সালের নভেম্বরে রাজধানীর উত্তরার একটি প্রায় অন্ধকার ঘরে ৮ ও ১২ বছর বয়সী দুই ভাইবোনের সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। এরা সূর্যের আলো সহ্য করতে পারে না। দুই ভাইবোন জিনের ত্রুটিজনিত জেরোডার্মা পিগমেনটোসামের (এক্সপি) রোগী। এক্সপির রোগী আলোতে থাকলে কয়েক মিনিটের মধ্যে চামড়া শুকিয়ে যায়। তাদের স্নায়ুতন্ত্রের সমস্যা দেখা দেয়, শ্রবণশক্তি কমে যায়। তাদের এখনো চিকিৎসা চলছে।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগের গবেষকেরা জানিয়েছেন, দেশে অন্তত ২০০ জন ‘মোয়ামোয়া’ রোগী আছে। এটি মস্তিষ্কের রক্তনালির রোগ। এতে মস্তিষ্কের ধমনিতে রক্ত সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়। রোগীর সাময়িকভাবে তীব্র মাথাব্যথা, শরীরের একাংশে অবশ ভাব, খিঁচুনি, কথায় অস্পষ্টতা, চোখে ঝাপসা দেখা, স্মরণশক্তি কমে যাওয়া—এই রোগের লক্ষণ।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. টিটো মিয়া জানান, তিনি ময়মনসিংহের একটি পরিবারে ‘সিফা সিনড্রোম’ (কনজেনিটাল ইনসেনসিভিটি টু পেইন উইথ অ্যানহিড্রোসিস)–এর দুজন রোগী পেয়েছেন। ঘর্মগ্রন্থি (সোয়েট গ্লান্ড) না থাকার কারণে এদের ঘাম হয় না। এদের গরম লাগে বেশি, হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি বেশি। এরা ব্যথা অনুভব করে না।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালের সহকারী অধ্যাপক (শিশু নিউরোলজি বিভাগ) জুবাইদা পারভীন বলেন, ‘দেশে স্নায়ুর বিরল রোগ আছে অন্তত ১৫টি। অন্য কতটি বিরল রোগের অস্তিত্ব আছে, তা জানা নেই। প্রকৃত সত্য হচ্ছে, খোঁজা হয়নি।’
অবিরাম কষ্টের কাহিনি
রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা মোহাম্মদ পারভেজের প্রথম সন্তান মুনতাসিরের জন্ম হয় ২০১৪ সালে। জন্মের পাঁচ বছর পর মুনতাসিরের অস্বাভাবিকতা চোখে পড়ে। সে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না, পা বেঁকে যায়, পায়ের পেশিতে ব্যথার কথা বলতে থাকে। ২০২২ সালে শনাক্ত হয় মুনতাসির ডিএমডির রোগী।
ডিএমডির রোগীর বয়স বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হাত–পায়ের পেশি শক্ত হয়ে যায়, আঙুল বেঁকে যায়। আক্রান্ত শিশুর বয়স ১০–১২ হতেই নিজ থেকে আর চলাচল করতে পারে না। বাবা–মায়ের সামর্থ্য থাকলে হুইলচেয়ার ব্যবহার করতে পারে। মুনতাসিরের ক্ষেত্রে ঠিক এমনই হয়েছে।
১৫ এপ্রিল ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালে মুনতাসিরের বাবা মোহাম্মদ পারভেজের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ‘কিছুই করতে পারলাম না। আমার চোখের সামনে ছেলেটি ধীরে ধীরে অচল হয়ে গেল। বয়স মাত্র ১১ বছর। কিছুই করতে পারলাম না।’ চিকিৎসকেরা সতর্ক করে বলেছেন, এমন শিশুরা বেশি দিন বাঁচে না।
মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের বিরল রোগে আক্রান্ত মানুষ, তাদের বাবা–মা–অভিভাবসহ অন্তত ৩০ জনের সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। তাঁদের সবাই মোহাম্মদ পারভেজের মতো অসহায়। সন্তানের গল্প বলতে গিয়ে মায়ের চোখ ভেসে যায় জলে। কারও কষ্ট চিকিৎসা করাতে না পারার। কেউ জানেন চিকিৎসা করিয়েও সন্তানকে বাঁচাতে পারবেন না। ‘আমি মারা গেলে আমার সন্তানের কী হবে’, এমন চিন্তায় দিন যায় কোনো কোনো মায়ের।
২০ মার্চ কথা হয় খুলনার লবণচরার নূরজাহান রজনী ও মেহেদি হাসান আমিরের সঙ্গে। নূরজাহান রজনী কৃষি ব্যাংকে চাকরি করেন, মেহেদি হাসান আমির এলাকায় ছোটখাটো ঠিকাদারির কাজ করেন। তাঁদের তৃতীয় সন্তান আমিরা এসএমএর রোগী। আমিরা প্রায়ই তার বাবা–মা ও দুই বোনের উদ্দেশে বলে, ‘রাগ কোরো না। আমি বসতে পারি না, আমি হাঁটতে পারি না, রাগ কোরো না।’ নূরজাহান রজনী প্রথম আলোকে বলেন, ‘এতটুকু মেয়ের মুখে এমন কথা শুনে বুক ফেটে কান্না আসে।’
এমন সন্তান নিয়ে মা–বাবার জীবন আমূল বদলে যায়। রাজধানীর মগবাজারের শাহিন আক্তার ও শাহাদাৎ হোসেন দম্পতির ক্ষেত্রে তেমনই ঘটেছে। দুজন একসময় একটি বামপন্থী সাংস্কৃতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। নিয়মিত ওই দলের অনুষ্ঠানে যোগ দিতেন, অংশ নিতেন। এখন সব বন্ধ। শাহাদাৎ হোসেন চাকরির প্রয়োজনে কর্মস্থলে যান। আপনার সময় কাটে কীভাবে? এমন প্রশ্নের উত্তরে মা শাহিন আক্তার বলেন, ‘আমার নিজের বলে আর কোনো সময় নেই। সারাটা সময় মেয়ের সঙ্গে। মেয়ে যখন ঘুমায়, তখনই কিছুটা ছুটি।’ ঘরের বাইরে যাওয়া নেই, আত্মীয় বাড়ি যাওয়া নেই। সামাজিক অনুষ্ঠানে যাওয়া বন্ধ। শাহিন আক্তারের দুনিয়া আটকে গেছে মেয়েতে।
এমন সন্তান দুটো থাকলে সমস্যা কি বেড়ে যায়? দুঃখ কি দ্বিগুণ হয়? ব্যবসায়ী ওমর ফারুকের দুটি ছেলেই বিরল রোগে আক্রান্ত। ২৩–২৪ আগস্ট ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালে আয়োজিত একটি ওয়ার্কশপের প্রথম দিনের একটি অধিবেশনে ওমর ফারুক বলেন, ‘আমাদের জীবন বদলে গেছে। আমাদের জীবন থেকে আনন্দ হারিয়ে গেছে।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন অভিভাবক বলেন, এমন বাবা–মাও আছেন, যাঁদের তিনটি সন্তানই বিরল রোগে ভুগছে। ঘরজুড়ে একটি খাট, তার ওপর তিন সন্তানকে নিয়ে স্বামী–স্ত্রী রাত কাটাতেন। ইতিমধ্যে একটি সন্তান মারা গেছে। এখন ওই খাটেই বাবা–মা রাত কাটান বাকি দুই সন্তানকে নিয়ে।
সহজে রোগ শনাক্ত হয় না
পুরান ঢাকার সুজন সাহা ও রমা সাহার একমাত্র মেয়ে স্বস্তিকা সাহা। মেয়ের বয়স যখন ৯ মাস, বাবা–মা খেয়াল করলেন, মেয়ের বসতে ও দাঁড়াতে কষ্ট হয়। সুজন সাহা বলেন, ‘প্রথম মেয়েকে মিটফোর্ড হাসপাতালে দেখাই। পরে পিজি হাসপাতালে দেখাই। তারপর পান্থপথের একটি বেসরকারি হাসপাতালে গিয়েছিলাম। মেয়ে দিন দিন দুর্বল হতে থাকে। আট মাস আগে ভারতের চেন্নাই গেলাম। পরীক্ষায় ধরা পড়ল মেয়ের এসএমএ। আগের তিনটি হাসপাতালের কোনো চিকিৎসকই রোগ ধরতে পারেননি।’ একাধিক শিশুর মা-বাবার কাছ থেকে একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা শোনা গেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়েছেন আফরিন আক্তার। তিনি এসএমএর রোগী। তিনি বলেন, প্রথমে একজন চিকিৎসক মায়োপ্যাথির চিকিৎসা দেন। পরে দেশে-বিদেশে পরীক্ষায় নিশ্চিত হন যে তার এসএমএ। আফরিন আক্তার বলেন, ‘তিন বছরের বেশি সময় আমি ভুল চিকিৎসার মধ্যে ছিলাম।’ তিনি এখন বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন।
প্রায় সব বিরল রোগের নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই বলে জানিয়েছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. টিটো মিয়া। তিনি বলেন, ‘আমরা কিছু সাপোর্টিভ ট্রিটমেন্ট দিই, যেন রোগী স্বস্তি বোধ করে, রোগটি যেন আর না বাড়ে।’
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের শিশু নিউরোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শাওলী সরকার বলেন, ‘রোগনির্ণয় সঠিক না হলে ভুল চিকিৎসা হয়। এক রোগের লক্ষণ কিছু ক্ষেত্রে অন্য রোগের সঙ্গে মিলে যায়, তখন ভুল চিকিৎসার ঝুঁকি তৈরি হয়। কোনো রোগের চিকিৎসাই হয়তো জানা নেই, তখন রোগটি যেন না বাড়ে, সে জন্য কিছু চিকিৎসা দেওয়া হয়। এ ছাড়া ভালো রেফারেল পদ্ধতি না থাকার কারণে রোগীরা ভুল প্রতিষ্ঠান বা ভুল ব্যক্তির কাছে চলে যান, এতে সঠিক চিকিৎসা রোগীরা পান না।’
৯৫ শতাংশের চিকিৎসা নেই
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বিরল রোগের চিকিৎসা–সম্পর্কিত ওষুধসহ অন্যান্য পণ্যের দাম অনেক বেশি। অনেক দেশে এসব পণ্য ও ওষুধের প্রবেশাধিকার সীমিত। এটি বড় চ্যালেঞ্জ।
যেমন স্পাইনাল মাসকুলার অ্যাট্রোফির (এসএমএ) কথা বলা যায়। চিকিৎসক ও ওষুধ কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, এ রোগের চিকিৎসার ওষুধ তিনটি। প্রথমত জিনথেরাপি। ইনজেকশনের মাধ্যমে জীবনে তা একবারই দিতে হয়। এর দাম প্রায় ২২ কোটি টাকা। আরেকটি ইনজেকশন আছে, প্রতি দুই মাস অন্তর রোগীর মেরুদণ্ডে দিতে হয়। একটি ইনজেকশনের দাম এক কোটি টাকা। আর আছে একটি সিরাপ। এর প্রতি বোতলের দাম ১০ লাখ টাকা। একজন রোগীর মাসে এক বোতল দরকার হয়।
জিনথেরাপি বাংলাদেশে দুটি শিশুকে দেওয়া হয়েছে। মেরুদণ্ডে দেওয়া ইনজেকশন কেউ পেয়েছে বলে জানা যায়নি। একটি বহুজাতিক কোম্পানি দেশের তিনটি শিশুকে বিনা মূল্যে সিরাপ দেওয়া শুরু করে। এখন শুধু মগবাজারের নবনী ওষুধটি বিনা মূল্যে পাচ্ছে।
বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করে ওষুধ উদ্ভাবন করে তা সীমিতসংখ্যক মানুষের কাছে বিক্রি করা ওষুধ কোম্পানির জন্য লাভজনক নয়। যে দু–একটি ওষুধ তৈরি হয়, তার দাম বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ওষুধ উদ্ভাবনে সমতাভিত্তিক বিনিয়োগ ও আর্থিক প্রণোদনার অভাবের কারণে সারা বিশ্বের ৯৫ শতাংশ বিরল রোগের এখনো কার্যকর চিকিৎসা নেই।
রাষ্ট্র কী করছে
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিরল রোগ নিয়ে তাদের কোনো ধরনের কাজ নেই।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবু জাফর বলেন, ‘বিরল রোগ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পৃথক শাখা নেই। সামগ্রিকভাবে বিরল রোগ নিয়ে কাজও নেই। বিশেষ কোনো বিরল রোগ নিয়ে আলোচনা উঠলে তখন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়।’
ব্যতিক্রমী ভূমিকা নিয়েছে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটাল, বিশেষ করে এই প্রতিষ্ঠানের শিশু নিউরো বিভাগ। এই বিভাগ বিরল রোগে আক্রান্ত শিশুদের জন্য প্রতি সপ্তাহে বিশেষ ক্লিনিক চালু করেছে। এ ছাড়া প্রতি মাসের মাঝামাঝি এক দিন বড় করে নিয়মিত সেমিনারের আয়োজন করে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে একটি বিরল রোগের (এসএমএ) চিকিৎসা ও শল্যচিকিৎসার সরঞ্জাম কেনার জন্য ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালের অনুকূলে ৩১ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানের পরিচালক অধ্যাপক কাজী গিয়াস উদ্দিন আহমেদ বলেন, ৫ কোটি টাকার ওষুধ কেনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। বাকি টাকা খরচ করার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।
আত্মশক্তির সন্ধান
বিরল রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সহায়তা বা পাশে দাঁড়ানোর জন্য কয়েকটি সংগঠন গড়ে উঠেছে। এসব সংগঠন তথ্য সংগ্রহ করে, দেশে–বিদেশে কোথায় রোগ পরীক্ষা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে, তা জানার ও জানানোর চেষ্টা করে।
এমনই একটি সংগঠন কিওর এসএমএ বাংলাদেশ। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ওমর ফারুক বলেন, ‘এসএমএ রোগী ও তাদের অভিভাবকদের নিয়ে এই সংগঠন তৈরি হয়েছে। রোগটির ব্যাপারে সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি রোগনির্ণয়ে জেনেটিক পরীক্ষা দেশে চালু করার জন্য আমরা দৌড়ঝাঁপ করছি। ওষুধ কোম্পানি ও চিকিৎসকদের সঙ্গে নিয়ে আমরা চেষ্টা করছি যেন কম দামে ওষুধ পাওয়া যায়।’
একইভাবে ডিএমডি রোগীদের জন্য গড়ে ওঠা সংগঠনের নাম ডিএমডি কেয়ার ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ। হিমোফিলিয়া রোগীদেরও আছে বাংলাদেশ হিমোফিলিয়া সোসাইটি। এই ধরনের সংগঠন বিদেশে আছে।
কী করা যায়
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রয়োজন অনুযায়ী একটি সার্বিক ও রোগীকেন্দ্রিক পন্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব ব্যক্তির সক্ষমতা উন্নয়নে সহায়তা দেওয়া, সামাজিকভাবে তাদের সম্পৃক্ত রাখার পাশাপাশি স্বাস্থ্য, শিক্ষা বা কর্মসংস্থানে প্রবেশের বাধা দূর করা জরুরি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে বিরল রোগের জন্য পৃথক শাখা খোলার দাবি করেছেন কেউ, কেউ সচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন। সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার কথাও কেউ কেউ বলেন।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালের সহকারী অধ্যাপক জুবাইদা পারভীন বলেন, ‘এই ক্ষেত্রে দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে হবে। রোগ শনাক্তে উপযুক্ত ল্যাবরেটরি স্থাপন করা জরুরি।’
[প্রথম আলো রোগী ও রোগীর অভিভাবকদের অনুমতি নিয়ে তাঁদের নাম এই প্রতিবেদনে প্রকাশ করেছে।]

Saturday, June 13, 2026
পরিচয় থাকার পরও ‘বেওয়ারিশ’ দুলালী, রেখে গেলেন অনেক প্রশ্ন by মানসুরা হোসাইন
২০২৩ সালের ডিসেম্বরে স্বামীর ঘর ছেড়ে এসেছিলেন মানসিক ভারসাম্যহীন দুলালী। তখন থেকেই পরিবারের কাছে তিনি নিখোঁজ। মানসিক ভারসাম্যহীনতায় হারিয়ে ফেলেছিলেন নিজের আসল নাম—শামীমা নাসরিন জাহান। আর ঘর হারিয়ে ঠাঁই হয়েছিল রাজধানীর মিরপুরের একটি ফুটপাতে। অবহেলা, ক্ষুধা ও অসুস্থতায় মৃত্যু হয় তাঁর। পরে তাঁর লাশ দাফন করা হয় ‘বেওয়ারিশ’ হিসেবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই দুলালী রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারের দায়বদ্ধতা নিয়ে অনেকগুলো প্রশ্ন রেখে গেছেন। মানসিক স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো বা নতুন করে ভাবার বিষয়টি এখন সামনে এসেছে।
আট হাসপাতাল ঘুরে ঠাঁই হলো রাস্তার পাশে
গত ২২ মে সকালে মিরপুর ২ নম্বর সেকশনের ৬০ ফিট সড়কের পাশে শামীমাকে দেখতে পান সমাজসেবামূলক সংগঠন হিরোজ ফর অলের ডেভেলপমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেটর মুছা করিম (রিপন)। হাড় জিরজিরে শামীমা কিছু খেতে পারছিলেন না।
চিকিৎসার জন্য দুজন নারী ভিক্ষুকের সহায়তায় শামীমাকে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে নিয়ে যান মুছা করিম। সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বেসরকারি মানসিক হাসপাতাল, ক্লিনিকসহ আটটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তাঁকে। কোথাও জাতীয় পরিচয়পত্র নেই বলে ভর্তি করা হয়নি, কোথাও অভিভাবক চাওয়া হয়েছে, কোথাও বলা হয়েছে রোগী সামলানো কঠিন। এ কারণে তাঁর স্থায়ী চিকিৎসার ব্যবস্থা হয়নি।
মুছা করিম প্রথম আলোকে বলেন, কেরানীগঞ্জ থেকে কাজীপাড়ার এক্সিম ব্যাংক হাসপাতালে ভর্তি করার পরও দুলালীকে রাখা যায়নি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, রোগী রুমে থাকতে চাইছেন না এবং পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। তাই মানসিক হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। পরে মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের নিরাময় ক্লিনিকে নেওয়া হলে এনআইডি ও আইনগত অভিভাবক না থাকায় ভর্তি করানো সম্ভব হয়নি। বিভিন্ন শেল্টার হোমেও চেষ্টা ব্যর্থ হয়। ৮ নম্বর হাসপাতাল হিসেবে ধানমন্ডি ২৭ নম্বরের সুপারম্যাক্স হেলথকেয়ার লিমিটেডে চিকিৎসা শুরু হলেও সেখানেও তাঁকে রাখা হয়নি।
শেষ পর্যন্ত অসহায় হয়ে ২৪ মে ধানমন্ডির একটি রাস্তার পাশে দুলালীকে রেখে আসতে বাধ্য হন মুছা করিম। একটি হোটেলে টাকা দিয়ে তাঁর জন্য তিন বেলা খাবারের ব্যবস্থা করে যান তিনি।
এক প্ল্যাকার্ডে বদলে গেল দৃশ্য
দুলালীদের মতো মানুষ কেন হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা পাবেন না, তা প্রধানমন্ত্রীর নজরে আনার উদ্যোগ নেন মুছা করিম। ২৭ মে গুলশানে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে তিনি একাই দাঁড়ান একটি প্ল্যাকার্ড হাতে। তাতে ইংরেজিতে লেখা ছিল— ‘নো হেলথ উইথআউট মেন্টাল হেলথ।’ আর বাংলায় লেখা ছিল— ‘দুলালীকে বাঁচাতে চাই, দুলালী কেন চিকিৎসা পাচ্ছে না, প্রধানমন্ত্রীর কাছে জবাব চাই।’
এ নিয়ে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর নড়েচড়ে বসে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। পরে প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা) এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দারের সহায়তায় ২৯ মে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয় দুলালীকে। জিয়া উদ্দিন হায়দার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে হাসপাতালে দুলালীকে দেখতেও গিয়েছিলেন।
কিন্তু তত দিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে দুলালীর। পরে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউতে) নেওয়া হয়। ৩১ মে সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় তাঁর।
মৃত্যুর পর মিলল পরিচয়, তবু দাফন ‘বেওয়ারিশ’ হিসেবে
জীবিত অবস্থায় কেউ জানতেন না তিনি কে। মৃত্যুর পর অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তাঁর আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করে। সেখান থেকেই বেরিয়ে আসে পরিচয়। তাঁর নাম দুলালী নয়, শামীমা নাসরিন জাহান। ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার সিদ্ধকাঠি গ্রামে বিয়ে হয়েছিল তাঁর। শামীমার বাবার বাড়ির ইউনিয়নের নাম মোল্লারহাট। বাবার বাড়ি থেকে শ্বশুরবাড়ির দূরত্ব একদম কাছে না হলেও খুব দূরেও না। যশোরের কেশবপুরেও তাঁর আরেকটি ঠিকানা পাওয়া যায়।
নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে শামীমার স্বামীরও কিছু তথ্য পাওয়া যায়। এরপর পুলিশ পরিবারের সদস্যদের খুঁজতে শুরু করে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট এলাকায় গিয়েও কাউকে খুঁজে পায়নি। এ কারণে ৩ জুন রায়েরবাজার কবরস্থানে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের সহায়তায় তাঁকে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়।
এর দুদিন পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খবর দেখে ৫ জুন ছুটে আসেন তাঁর ভাইসহ পরিবারের সদস্যরা। ৭ জুন মেয়ের কবর দেখতে ঢাকায় আসেন মা।
‘বোনটাকে শেষ দেখা দেখতে পারলাম না’
শামীমার বড় ভাই মিজানুর রহমান ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। তিন ভাই, দুই বোনের মধ্যে শামীমা ছিলেন দ্বিতীয়। তিনি নলছিটি ডিগ্রি কলেজ থেকে স্নাতক পাস করেছিলেন। বাবা আবদুল খালেক ২০১৭ সালে মারা গেছেন।
মিজানুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন থেকেই শামীমা মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। তবে কারও কোনো ক্ষতি করতেন না। একা থাকতে পছন্দ করতেন। এর আগেও বিভিন্ন সময় বাড়ি থেকে চলে গিয়েছিলেন। কখনো কোনো মাজারে পাওয়া যেত, আবার কখনো নিজেই চলে আসতেন। তাঁর স্বামী আলাদা বাসা ভাড়া করে তাঁকে রাখতেন।
তাঁর নাম দুলালী ছিল কি না জানতে চাইলে মিজানুর রহমান বলেন, না; এমন কোনো নাম ছিল না। হয়তো তাঁর বোন নিজে থেকেই এ নাম বলেছিলেন।
আক্ষেপ নিয়ে শামীমার বড় ভাই প্রথম আলোকে বলেন, ‘বোনটাকে শেষ দেখা দেখতে পেলাম না, দাফন করতে পারলাম না। বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন হলো। এ কষ্ট সারা জীবন থাকবে। আমরা মুছা ভাই ও সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। তাঁরা না থাকলে আমাদের বোনটা ফুটপাতেই মরে পরে থাকত।’
স্বামীর নীরবতা
শামীমার স্বামী শহিদুল ইসলাম হাওলাদার নিজেও একজন পুলিশ সদস্য। বর্তমানে তিনি বরগুনার আমতলি থানায় পুলিশ কনস্টেবল হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। শামীমা নিখোঁজ হওয়ার পর স্ত্রীকে খুঁজে পেতে তিনি থানায় জিডি করা বা অন্য কোনো দায়িত্ব পালন করেননি বলে অভিযোগ করছেন শামীমার বাবার বাড়ির সদস্যরা।
স্ত্রী নিখোঁজ হওয়ার পর থানায় জিডি না করার বিষয়টি স্বীকার করে শহিদুল ইসলাম হাওলাদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘ফেসবুকে শামীমার তথ্য জানতে জানতে তাঁকে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়ে গেছে।’
শামীমার কখনো চিকিৎসা করিয়েছিলেন কি না, জানতে চাইলে শহীদুল বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে শামীমা মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। ও আমাকে সহ্য করতে পারত না। তাই চিকিৎসা করানোর জন্য শাশুড়িকে বলেছিলাম। তবে সন্তান না হওয়ার সমস্যা নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা করেছি।’
স্ত্রীর মরদেহ আইনি প্রক্রিয়ায় ফেরত নেবেন কি না—এ প্রশ্নের জবাবে শহিদুল বলেন, ‘এত দিনে মরদেহ নষ্ট হয়ে গেছে। আবার কবর খোঁড়াখুঁড়ি করতে গেলে লাশ থেকে গন্ধ বের হবে, সবাই বিরক্ত হবে। অনেক ঝামেলাও করতে হবে।’
প্রশ্নের মুখে পুলিশি অনুসন্ধান
৩১ মে শেরেবাংলা নগর থানার ওসি যশোরের কেশবপুর ও ঝালকাঠির নলছিটি থানায় বেতার বার্তা পাঠিয়ে দুলালী ওরফে শামীমা নাসরিন জাহানের তথ্য জানাতে বলেন। তবে ১ জুন নলছিটি থানা জানায়, স্থায়ী ঠিকানায় গিয়ে শামীমা নাসরিন জাহান নামে কাউকে খুঁজে পাননি এএসআই আনিসুর রহমান।
কেশবপুর থানা থেকেও একই বার্তা আসে বলে জানিয়েছেন মুছা করিম।
তবে পরিবারের সদস্যরা জানান, ২০২৪ সালের ১৩ ডিসেম্বর নলছিটি থানায় শামীমাকে নিখোঁজ দেখিয়ে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন তাঁর মা মোসা. মনোয়ারা বেগম। ৪৫ বছর বয়সী নাসরীন জাহানের (শামীমা বাদ ছিল) স্বামী শহিদুল ইসলাম বাবুলসহ অন্যান্য তথ্য উল্লেখ করা ছিল।
এই দম্পতি আনুমানিক ২৪ বছর আগে বিয়ে করেছিলেন, বিবাহিত জীবনে সন্তান হয়নি। শামীমা মাঝেমধ্যেই স্বামীর বাড়ি থেকে মায়ের বাড়ি চলে আসতেন, কারও সঙ্গে মিশতেন না, মুঠোফোন ব্যবহার করতেন না—এসব তথ্যও আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
জিডির আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, শামীমা ২০২৩ সালের ১২ ডিসেম্বর কেনাকাটার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়ে আর ফিরে আসেননি। এলাকায় হারানো বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, দীর্ঘদিন বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজির পর থানায় জিডি করা হলো। শ্যামলা, লম্বায় ৫ ফুট ৩ ইঞ্চি, কালো বোরকা গায়ে শামীমা বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন তা–ও উল্লেখ ছিল।
নলছিটি থানার তৎকালীন ওসি মো. আ. সালাম এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য এএসআই সনজীব কুমার পাহলানকে দায়িত্বও দিয়েছিলেন।
কিন্তু শামীমার মৃত্যুর পর পুলিশ পরিচয় শনাক্ত করলেও সেই জিডির সূত্র ধরে পরিবারকে খুঁজে বের করা যায়নি।
শামীমার ভাই মিজানুর বলেন, তাঁর মা আর ভাই নলছিটি থানার একদম কাছেই একটি বাসায় ভাড়া থাকেন। পুলিশ ভালোভাবে চেষ্টা করলে তাঁদের খুঁজে পেতেন।
নলছিটি থানার বর্তমান ওসি আরিফুল আলম মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, দুজন কর্মকর্তা সারাদিন এলাকায় গিয়ে পরিবারটিকে খুঁজেছেন, কিন্তু কেউ তাঁদের চিনতে পারেননি। থানার অনলাইন জিডির তথ্যও পাওয়া যায়নি। তবে তাঁদের পক্ষ থেকে চেষ্টার কোনো ঘাটতি ছিল না।
শামীমার মৃত্যুর পর থেকে বেওয়ারিশ হিসেবে লাশ দাফনসহ বিষয়টি দেখভাল করেছেন রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানার এসআই মো. সাইফুল ইসলাম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘জিডি থাকার পরও পরিবারকে খুঁজে না পাওয়া দুঃখজনক এবং এ দায় নলছিটি থানা এড়াতে পারে না।’
এসআই সাইফুল ইসলাম আরও বলেন, পরিবারের সদস্যরা এখনো চাইলে আইনি প্রক্রিয়ায় কবর থেকে লাশ তুলে আবার দাফন করতে পারেন। শামীমার মৃত্যুসনদে ‘দুলালী’ নামটি ব্যবহার করা হয়েছে। এই সনদ শামীমার মা এবং তাঁর স্বামী দুজনই চাচ্ছেন। কাকে দেওয়া হবে, তা সুরাহা হয়নি। তাই সনদটি এখনো হস্তান্তর করা হয়নি।
দুলালী বা শামীমা যে প্রশ্ন রেখে গেলেন
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ (২০১৮-১৯) বলছে, দেশে ১৮ বছরের বেশি বয়সী মানুষের ১৮ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক রোগে আক্রান্ত। এসব ব্যক্তির ৯২ শতাংশ চিকিৎসা নেন না। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্যনীতি, বাংলাদেশ ২০২২ বলছে, নারীরা পুরুষের তুলনায় মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় বেশি ভোগেন। মোট স্বাস্থ্য বাজেটের মাত্র শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য বরাদ্দ।
২০১৮ সালের মানসিক স্বাস্থ্য আইনে মানসিক রোগী ভর্তির জন্য এনআইডির বাধ্যবাধকতা নেই। বরং অভিভাবক, আত্মীয় বা ঠিকানাবিহীন মানসিক রোগীদের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধির মাধ্যমে নিকটস্থ সরকারি মানসিক হাসপাতালের প্রধানের কাছে পাঠানোর কথা বলা হয়েছে।
কিন্তু জাতীয় পরিচয়পত্র নেই বলে শুরুতে শামীমাকে হাসপাতালে ভর্তি নেওয়া হয়নি কেন—এ প্রশ্ন এখন সামনে চলে আসছে।
তবে পাবনা মানসিক হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সেখানে রোগী ভর্তিতে এনআইডি, নাগরিকত্ব সনদ, জন্মনিবন্ধন, ছবি, রক্তের সম্পর্কের আত্মীয়ের উপস্থিতি ও অভিভাবকের এনআইডিসহ বিভিন্ন নথি চাওয়া হয়। অভিভাবকহীন রোগীদের আদালতের নির্দেশে ভর্তি করা হয়।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক সাইফুন নাহার প্রথম আলোকে বলেন, মানসিক রোগী হারিয়ে গেলে, পালিয়ে গেলে, আত্মহত্যা বা সহিংসতার চেষ্টা করলে কিংবা অভিভাবক রোগীকে নিতে অস্বীকৃতি জানালে আইনগত প্রক্রিয়ায় এনআইডি ও ছবি প্রয়োজন হয়। এ কারণে ভর্তির সময় রোগীর ছবি ও এনআইডি নেওয়া হয়। তবে অভিভাবকহীন গুরুতর মানসিক রোগীরা জরুরি বিভাগ বা আউটডোরে এলে তাঁদের পর্যবেক্ষণে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয়। শিশুদের ক্ষেত্রে ভর্তির সময় মা–বাবা বা অভিভাবকের ছবি ও এনআইডি নেওয়া হয়।
তবে এ বিষয়ে বিকল্প আর কী কী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে, তা নিয়ে জ্যেষ্ঠ মনোচিকিৎসকদের নিয়ে সভা করার পরিকল্পনা আছে জানিয়েছেন সাইফুন নাহার।
প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার গত মঙ্গলবার প্রথম আলোকে বলেন, মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত ছিন্নমূল মানুষ হাসপাতালে গেলে চিকিৎসা পাবেন না—এটা হতে পারে না। এটা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার একটি ত্রুটি। দুলালীর মৃত্যু রাষ্ট্র, সমাজ এবং পরিবারব্যবস্থার অনেকগুলো দিক সামনে এনেছে।
জিয়াউদ্দিন হায়দার আরও বলেন, এই নারী কেন মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছিলেন, পরিবারের সদস্যরা তখন কোন দায়িত্ব পালন করলেন, তা দেখতে হবে। এ ছাড়া স্থানীয় সরকার, সংশ্লিষ্ট থানাগুলোর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন আছে। সব মিলে আইনের কোন কোন জায়গায় পরিবর্তন করতে হবে, তা দেখতে হবে।
![]() |
| মানসিক ভারসাম্যহীন দুলালী। তখনো জানা যায়নি তিনি শামীমা নাসরিন জাহান। ছবি: মুছা করিমের সৌজন্যে |
Wednesday, June 10, 2026
ক্যানসারের তথ্য রোগীকে কতটা জানানো উচিত by ডা. আরমান রেজা চৌধুরী
কোনো একটা রোগের সংবাদ দেওয়া মানে শুধু রিপোর্টের ফলাফল বলে দেওয়া নয়। এটি একটি মানবিক, সংবেদনশীল এবং দায়িত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট।
একজন রোগী যখন ক্যানসারের মতো একটি রোগের খবর শোনেন, তখন তাঁর মনে ভয়, হতাশা, অবিশ্বাস, রাগ, কান্না, এমনকি নীরবতা বা বিষণ্নতা চলে আসতে পারে। তাই এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া চিকিৎসার মতোই গুরুত্বপূর্ণ।
করণীয়
একজন ক্যানসার রোগীর জানা উচিত, তাঁর রোগ কোন পর্যায়ে আছে, চিকিৎসার লক্ষ্য কী, চিকিৎসায় কী লাভ হতে পারে, কী পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে এবং বিকল্প কী আছে। কারণ, এই তথ্যের ওপর নির্ভর করেই তিনি নিজের পরবর্তী জীবন, পরিবার, অর্থনীতি এবং মানসিক প্রস্তুতি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেবেন।
বিশ্বের অনেক দেশে এই কঠিন সংবাদ জানানোর জন্য চিকিৎসকদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। চিকিৎসকদের শেখানো হয় কীভাবে শান্ত পরিবেশে, সহজ ভাষায়, ধীরে ধীরে, রোগীর মানসিক অবস্থা বুঝে খারাপ খবরটি খুলে বলতে হয়।
রোগীকে একা করে দেওয়ার পরিবর্তে বলা যায়, ‘পরিস্থিতি কঠিন, কিন্তু আমরা আপনার পাশে আছি।’
অনেক দেশে ধাপে ধাপে পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। প্রথমে নিরিবিলি পরিবেশ তৈরি করা হয়। রোগী আগে কতটুকু জানেন, তা বোঝা হয়। তারপর রোগী কতটুকু জানতে চান, তা জিজ্ঞেস করা হয়। এরপর সহজ ভাষায় মূল তথ্য বলা হয়।
রোগীর আবেগ প্রকাশের সুযোগ দেওয়া হয়। একেবারে শেষে পরবর্তী করণীয় পরিষ্কারভাবে জানানো হয়। অর্থাৎ খারাপ খবর দেওয়ার পরও রোগী যেন দিশাহারা না হয়ে যান, সেটিই প্রধান লক্ষ্য।
শেষ কথা
বাংলাদেশে এই চর্চা আরও শক্তিশালী করা জরুরি। চিকিৎসক, নার্স, কাউন্সেলর এবং হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ থাকা দরকার। শুধু আধুনিক যন্ত্র, নতুন ওষুধ বা উন্নত হাসপাতাল থাকলেই ক্যানসার চিকিৎসা সম্পূর্ণ হয় না।
রোগীর সঙ্গে সৎ, মানবিক এবং পরিষ্কার যোগাযোগও আধুনিক চিকিৎসার অপরিহার্য অংশ। খারাপ খবর বলা মানে আশা শেষ করে দেওয়া নয়; বরং সত্যকে মানবিক ভাষায় বলা। রোগীকে বাস্তবতা বুঝতে দেওয়া, যাতে পরিবার প্রস্তুত হতে পারে।
অনেক সময় চাইলে রোগী চিকিৎসার কোনো পদ্ধতি নিতে অস্বীকৃতি জানাতে পারেন। বিকল্প বাছাই করতে পারেন। তাই রোগীকে কিছু জানাবেন না—এই আবেগ সর্বদা কার্যকরী নয়।
* ডা. আরমান রেজা চৌধুরী, ক্যানসার বিশেষজ্ঞ, এভারকেয়ার হাসপাতাল, ঢাকা
![]() |
| ক্যানসারের তথ্য রোগীকে জানাতে সঠিক পরিবেশ তৈরি করে নেওয়া জরুরি। ছবি: পেক্সেলস |
Saturday, May 16, 2026
বিশ্বে সবচেয়ে বেশি অঙ্গ প্রতিস্থাপন করে কোন দেশ, জানেন?
* ১৯৩৩ সালে প্রথম মৃত মানুষের কিডনি নিয়ে জীবিত মানুষের শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়। ইউক্রেনের শল্যচিকিৎসক ইউরি ভোরোনয়ের সেই অস্ত্রোপচারকে অবশ্য সফল বলা চলে না। দুদিন বাদেই মারা যান কিডনি গ্রহীতা।
* ১৯৫০ সালের ১৭ জুনও আবার চেষ্টা চালান যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয়ের লিটল কোম্পানি অব ম্যারি হসপিটালের চিকিৎসক রিচার্ড ললার, জেমস ওয়েস্ট ও রেমন্ড মার্ফি। সফলভাবে কিডনিও প্রতিস্থাপিত হয়। তবে রোগীর শরীর নতুন কিডনি গ্রহণ না করায় সার্জারির ১০ মাস পর তা অপসারণ করে ফেলতে হয় হয়।
* সফলভাবে প্রথম অঙ্গ প্রতিস্থাপন করা হয় ১৯৫৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর। যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনের ব্রিংহ্যাম অ্যান্ড উইমেনস হাসপাতালের শল্যবিদ জোসেফ ই মুরের নেতৃত্বে একদল চিকিৎসক ২৩ বছর বয়সী রিচার্ড হ্যারিকের দেহে কিডনি প্রতিস্থাপন করেন। তাঁর দেহে জমজ ভাই রোনাল্ডের কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল। ৮ বছর পর্যন্ত কার্যকর ছিল সেই কিডনি। চিকিৎসাবিদ্যায় যুগান্তকারী ভূমিকা রাখায় পরে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন জোসেফ মুরে।
* ১৯৬৬ সালে কিডনিসহ অগ্ন্যাশয় (প্যানক্রিয়াস) প্রতিস্থাপন করেন ইউনিভার্সিটি অব মিনেসোটার দুই চিকিৎসক উইলিয়াম কেলি ও রিচার্ড লিলেহেই।
* মস্তিষ্কে মৃত্যু (ব্রেন ডেথ) রোগীর কিডনি নিয়ে অন্যের শরীরে প্রতিস্থাপনের প্রথম ঘটনাটি ঘটে ১৯৬৩ সালের ৩ জুন। প্রতিস্থাপনের কাজটি করেন বেলজিয়ামের শল্যবিদ গাই আলেক্সান্দ্র।
* মানবদেহের সবচেয়ে বেশি প্রতিস্থাপিত অঙ্গ হচ্ছে কিডনি। তালিকার পরবর্তী অঙ্গগুলো হলো—যকৃৎ, হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস ও অগ্ন্যাশয়।
* অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ওইসিডি) এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বিশ্বে সবচেয়ে বেশি অঙ্গ প্রতিস্থাপন করে যুক্তরাষ্ট্র। দুই ও তিন নম্বরে রয়েছে স্পেন ও ফ্রান্স। তালিকার সবচেয়ে নিচের তিনটি দেশ হচ্ছে জাপান, গ্রিস ও লাটভিয়া।
* ১৩ আগস্ট ‘বিশ্ব অঙ্গদান দিবস’। অঙ্গদানের গুরুত্ব সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করতে ও অঙ্গদানে উৎসাহিত করতে দিনটি পালিত হয়।
* বাংলাদেশে প্রথম অঙ্গ প্রতিস্থাপন করা হয় ১৯৮২ সালে, পিজি (বর্তমানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়) হাসপাতালে।
* ১৯৯৯ সালের ১৩ এপ্রিল বাংলাদেশে প্রথম ‘অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন ১৯৯৯’ হয়। ২০১৮ সালে আইনটি সংশোধন করা হয়।
* বাংলাদেশের ইতিহাসে ব্রেন ডেথে মৃত্যুর আগে নিজের অঙ্গদান করা প্রথম ব্যক্তি সারাহ ইসলাম। দুটি কিডনি ও দুটি কর্নিয়া দান করে গেছেন তিনি।
বিভিন্ন ওয়েবসাইট অবলম্বনে কবীর হোসাইন ও রাফিয়া আলম
![]() |
| শল্যচিকিৎসক জোসেফ ই মুরের নেতৃত্বে চলছে কিডনি প্রতিস্থাপনের অস্ত্রোপচার, ১৯৫৪ সাল। ছবি: সংগৃহীত |
Thursday, April 9, 2026
মস্তিষ্কখেকো অ্যামিবা: বর্তমান পরিস্থিতি ও সতর্কতা by ডা. কাকলী হালদার
সম্প্রতি বিভিন্ন দেশে, বিশেষ করে ভারতের কেরালায় এই অ্যামিবার সংক্রমণে বেশ কয়েকজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে বিভিন্ন গণমাধ্যমে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক।
ফলে উষ্ণ মিঠাপানিতে বেড়ে ওঠা প্রাণঘাতী জীবাণুটি নিয়ে স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
২০১৮ সালে বাংলাদেশে ‘ব্রেন ইটিং অ্যামিবা’র প্রথম স্বীকৃত রোগী হিসেবে ১৫ বছরের এক কিশোরকে শনাক্ত করা হয়েছিল।
কীভাবে ছড়ায়
এই অ্যামিবা উষ্ণ পানির মাধ্যমে ছড়ালেও সরাসরি পানি পান করার ফলে বা একজন থেকে আরেকজনের মধ্যে বা হাঁচি–কাশি দিয়ে ছড়ায় না। বরং নাক দিয়ে দূষিত পানি প্রবেশ করলে অ্যামিবাটি ঘ্রাণ স্নায়ুর মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছায় এবং দ্রুত সংক্রমণ ঘটায়।
লক্ষণ
প্রাথমিকভাবে তীব্র মাথাব্যথা, জ্বর, বমি ও ঘাড় শক্ত হয়ে যায়। চিকিৎসা শুরু না হলে বা অনেক ক্ষেত্রে হলেও দ্রুত অবস্থা খারাপ হয়ে খিঁচুনি, ভারসাম্যহীনতা, হ্যালুসিনেশন, ঘ্রাণ না পাওয়া, ঝাপসা দৃষ্টি, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, কোমায় চলে যাওয়া, এমনকি কয়েক দিনের মধ্যে রোগীর মৃত্যু হতে পারে। চিকিৎসা না পেলে মৃত্যুহার ৯৬-৯৮ শতাংশ।
চিকিৎসা
সংক্রমণ অত্যন্ত মারাত্মক হলেও কিছু ক্ষেত্রে অ্যান্টিফাঙ্গাল ও অ্যান্টিবায়োটিকের যৌথ প্রয়োগে রোগী সুস্থ হয়। সাধারণত অ্যামফোটেরিসিন বি, মিল্টেফোসাইন, ফ্লুকোনাজোল, রিফাম্পিন ইত্যাদি ওষুধের যৌথ ব্যবহার করা হয়। তবে দ্রুত শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা শুরু করাই একমাত্র ভরসা।
প্রতিরোধ
* অজানা বা অপরিষ্কার উষ্ণ পানিতে সাঁতার না কাটা।
* নাক দিয়ে পানি প্রবেশ এড়াতে নাক ক্লিপ ব্যবহার বা হাত দিয়ে নাক বন্ধ করা।
* নাক পরিষ্কারে ফুটানো বা ফিল্টার করা পানি ব্যবহার করা।
* সুইমিংপুলে নিয়মিত পরিমাণমতো ক্লোরিন দেওয়া।
বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকি
বাংলাদেশের আবহাওয়া উষ্ণ ও আর্দ্র এবং অনেক জায়গায় অপরিষ্কার জলাশয় বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হয়। তাই ঝুঁকি পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
যদিও এখনো এ সংক্রমণ খুব বিরল, তবে জলবায়ু পরিবর্তন ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে ভবিষ্যতে এর ঝুঁকি বাড়তে পারে। সতর্কতা অবলম্বন করলেই মারাত্মক এই সংক্রমণ থেকে নিরাপদ থাকা সম্ভব।
| মস্তিষ্কখেকো অ্যামিবা বা নিগ্লেরিয়া ফাউলেরি একটি বিরল কিন্তু মারাত্মক পরজীবী, যা মানুষের মস্তিষ্কে সংক্রমণ ঘটাতে পারে। ছবি: ফ্রিপিক |
Thursday, April 2, 2026
অস্ত্রোপচারে এআই: ভুল চিকিৎসা ও ভুল অঙ্গ শনাক্তের অভিযোগ
জনসন অ্যান্ড জনসনের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান অ্যাক্লারেন্ট জানিয়েছিল, তাদের তৈরি ‘ট্রুডি নেভিগেশন সিস্টেম’-এর সফটওয়্যারে এখন থেকে ‘মেশিন-লার্নিং অ্যালগরিদম’ ব্যবহার করা হবে; যা নাক, কান ও গলাবিশেষজ্ঞদের অস্ত্রোপচারের সময় সহায়তা করবে।
এই চিকিৎসা সরঞ্জাম এর আগে বাজারে প্রায় তিন বছর ধরে প্রচলিত ছিল। সেই সময় পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) যন্ত্রটির ত্রুটি নিয়ে সাতটি ও একজন রোগীর আহত হওয়ার বিষয়ে একটি ‘নিশ্চিত না হওয়া’ প্রতিবেদন পেয়েছিল। তবে যন্ত্রটিতে এআই যুক্ত করার পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ১০০টি যান্ত্রিক ত্রুটি ও নেতিবাচক ঘটনার প্রতিবেদন জমা পড়েছে এফডিএর কাছে।
প্রতিবেদনগুলো অনুযায়ী, ২০২১ সালের শেষ দিক থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বরের মধ্যে অন্তত ১০ ব্যক্তি আহত হয়েছেন। অভিযোগগুলোর বেশির ভাগই ছিল এমন—অস্ত্রোপচারকালে রোগীর মাথার ভেতর চিকিৎসকের ব্যবহৃত যন্ত্রটি ঠিক কোথায় অবস্থান করছে, সে সম্পর্কে ‘ট্রুডি নেভিগেশন সিস্টেম’ ভুল তথ্য দিয়েছে।
প্রতিবেদন থেকে আরও জানা গেছে, এআই প্রযুক্তির সহায়তায় অস্ত্রোপচারের সময় এক রোগীর নাক দিয়ে মস্তিষ্কের তরল (সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড) চুইয়ে পড়েছিল। অন্য এক ঘটনায়, একজন সার্জন ভুলবশত রোগীর মাথার খুলির নিচের অংশ ফুটো করে ফেলেছিলেন। আরও দুটি ঘটনায়, প্রধান ধমনি দুর্ঘটনাবশত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দুই রোগী স্ট্রোকের শিকার হন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এফডিএর কাছে আসা প্রতিবেদনগুলো অসম্পূর্ণ হতে পারে এবং এগুলো চিকিৎসা বিভ্রাটের কারণ নিরূপণের জন্য তৈরি করা নয়। ফলে ঘটনাগুলোতে এআইয়ের ভূমিকা প্রকৃতপক্ষে কতটুকু ছিল, তা স্পষ্ট নয়।
তবে স্ট্রোকের শিকার দুই ব্যক্তি টেক্সাসে মামলা করেছেন। তাঁরা দাবি করেছেন, ট্রুডি সিস্টেমের এআই তাঁদের শারীরিক ক্ষতির জন্য দায়ী। একটি মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, ‘সফটওয়্যারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুক্ত করার আগে পণ্যটি যতটা নিরাপদ ছিল, পরিবর্তনের পর এটি ততটা থাকেনি।’
বার্তা সংস্থা রয়টার্স স্বতন্ত্রভাবে মামলার এসব অভিযোগ যাচাই করতে পারেনি।
ট্রুডি ডিভাইস নিয়ে এফডিএর প্রতিবেদনের বিষয়ে জনসন অ্যান্ড জনসন কর্তৃপক্ষকে প্রশ্ন করা হলে তারা ইন্টেগ্রা লাইফ সায়েন্সেসের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলে। ২০২৪ সালে ইন্টেগ্রা লাইফ সায়েন্সেস অ্যাক্লারেন্ট ও ট্রুডি নেভিগেশন সিস্টেম কিনে নেয়।
ইনটেগ্রা লাইফ সায়েন্সেস বলেছে, প্রতিবেদনগুলো শুধু এটুকুই প্রমাণ করে যে যেখানে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে, সেখানে ট্রুডি সিস্টেমটি ব্যবহৃত হচ্ছিল। তারা আরও বলেছে, ‘ট্রুডি নেভিগেশন সিস্টেম বা এআই প্রযুক্তির সঙ্গে কোনো আঘাত বা ক্ষতির সরাসরি যোগসূত্র থাকার মতো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।’
এমন এক সময়ে এ ঘটনাগুলো সামনে আসছে; যখন এআই স্বাস্থ্যসেবার জগৎকে ‘বদলে’ দিতে শুরু করেছে। এর প্রবক্তারা ভবিষ্যদ্বাণী করছেন যে নতুন এই প্রযুক্তি বিরল রোগের নিরাময় ও নতুন ওষুধ খুঁজে পেতে সাহায্য করবে, সার্জনদের দক্ষতা বাড়াবে এবং রোগীদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে।
কিন্তু রয়টার্স যখন নিরাপত্তা ও আইনি নথিপত্র পর্যালোচনা এবং চিকিৎসক, নার্স, বিজ্ঞানী ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্মকর্তাদের সাক্ষাৎকার নিয়েছে; তখন চিকিৎসাক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের কিছু ঝুঁকিও উঠে এসেছে। ডিভাইস নির্মাতা, প্রযুক্তি জায়ান্ট ও সফটওয়্যার নির্মাতারা এখন এ প্রযুক্তি দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছে।
বর্তমানে এফডিএ অন্তত ১ হাজার ৩৫৭টি এআই–চালিত চিকিৎসা সরঞ্জামের অনুমোদন দিয়েছে; যা ২০২২ সালের তুলনায় দ্বিগুণ।
শুধু ট্রুডি সিস্টেমই নয়, আরও অনেক এআই-চালিত যন্ত্র নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এফডিএ ডজনখানেক এআই-চালিত যন্ত্রের ত্রুটির প্রতিবেদন পেয়েছে। এর মধ্যে এমন একটি হার্ট মনিটর আছে; যেটি হৃৎস্পন্দনের অস্বাভাবিকতা শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং একটি আল্ট্রাসাউন্ড যন্ত্রের কথা বলা হয়েছে; যা ভ্রূণের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ভুলভাবে শনাক্ত করেছে।
গত আগস্টে জামা হেলথ ফোরামে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে জনস হপকিন্স, জর্জটাউন ও ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা জানিয়েছেন, এফডিএ অনুমোদিত ৬০টি এআই-চালিত চিকিৎসা সরঞ্জাম–সংশ্লিষ্ট ১৮২টি পণ্য প্রত্যাহারের ঘটনা ঘটেছে। তাদের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ৪৩ শতাংশ ক্ষেত্রে ডিভাইসগুলো অনুমোদনের এক বছরের মধ্যেই বাজার থেকে তুলে নিতে হয়েছে। সাধারণ চিকিৎসা সরঞ্জামের তুলনায় এআই-চালিত যন্ত্রের বাজার থেকে প্রত্যাহারের হার প্রায় দ্বিগুণ।
এফডিএর পাঁচজন বর্তমান ও সাবেক বিজ্ঞানী রয়টার্সকে বলেন, এআইয়ের এ জয়জয়কার সংস্থাটির জন্য নতুন সংকট তৈরি করেছে। গুরুত্বপূর্ণ কর্মীদের হারানোর পর এআই–সমৃদ্ধ চিকিৎসা সরঞ্জামগুলো অনুমোদনের আবেদনের যে জোয়ার শুরু হয়েছে, তার সঙ্গে তাল মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে সংস্থাটি। এফডিএর অন্তর্ভুক্ত প্রতিষ্ঠান মার্কিন স্বাস্থ্য ও জনসেবা বিভাগের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, তাঁরা এ খাতে সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছেন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আরেক রূপ ‘জেনারেটিভ এআই চ্যাটবট’ এখন চিকিৎসা খাতে জায়গা করে নিচ্ছে। অনেক চিকিৎসক সময় বাঁচাতে রোগীর তথ্য সংরক্ষণের মতো কাজে এআই ব্যবহার করছেন। তবে চিকিৎসকেরা এ–ও বলছেন যে অনেক রোগী নিজের রোগনির্ণয় করতে বা বিশেষজ্ঞের পরামর্শের বিরোধিতা করতে চ্যাটবট ব্যবহার করছেন; যা নতুন ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
প্রায় তিন বছর আগে চ্যাটজিপিটি বাজারে আসার পর ব্যবসায়িক ও সামাজিকভাবে ব্যাপক সাড়া ফেলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। চ্যাটজিপিটি ও গুগলের জেমিনাই বা অ্যানথ্রোপিকের ক্লদ-এর মতো জনপ্রিয় চ্যাটবটগুলো কনটেন্ট (আধেয়) তৈরির জন্য ‘জেনারেটিভ এআই’ ব্যবহার করে। এগুলো মূলত লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল বা এলএলএমের ওপর ভিত্তি করে তৈরি; যা মানুষের ভাষা বুঝতে ও তৈরি করতে বিপুল পরিমাণ তথ্য এবং ডেটার মাধ্যমে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। এখন এসব এআই টুল সাধারণ স্বাস্থ্যসেবা অ্যাপের মতো চিকিৎসাক্ষেত্রেও যুক্ত করা হচ্ছে।
তবে এআই শুধু এলএলএমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় এবং চ্যাটবট আসার অনেক আগে থেকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়েছে। এ খাতের ইতিহাস ৭০ বছরের বেশি পুরোনো। ১৯৫০ সালে ব্রিটিশ গণিতবিদ অ্যালান টুরিং যখন তাঁর এক গবেষণাপত্রে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘যন্ত্র কি চিন্তা করতে পারে?’, সেটি ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।
এফডিএ ১৯৯৫ সালে প্রথম এআই-সমৃদ্ধ চিকিৎসা সরঞ্জামের অনুমোদন দেয়। সেই ব্যবস্থা জরায়ুমুখের ক্যানসার শনাক্ত করতে দুটি ‘প্যাটার্ন-ম্যাচিং’ সফটওয়্যার ব্যবহার করত। বর্তমানে চিকিৎসা সরঞ্জামে ব্যবহৃত এআই-কে প্রায়ই ‘মেশিন লার্নিং’ বলা হয়; যার একটি অংশ হলো ‘ডিপ লার্নিং’। এগুলো নির্দিষ্ট কাজ করার জন্য ডেটার মাধ্যমে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। যেমন রেডিওলজিতে চিকিৎসকদের নজর এড়িয়ে যেতে পারে, এমন টিউমার শনাক্ত করে ক্যানসার নির্ণয়ে এ প্রযুক্তি সাহায্য করে।
এমন ব্যবস্থা অস্ত্রোপচারের যন্ত্রপাতিতেও ব্যবহৃত হচ্ছে। ২০২২ সালের জুনে টেক্সাসের ফোর্ট ওয়ার্থের একটি হাসপাতালে এরিন রালফ নামের এক নারীর সাইনাসের অস্ত্রোপচারের সময় তাঁর মাথায় একটি ছোট বেলুন প্রবেশ করানো হয়। রালফের করা মামলা অনুযায়ী, মার্ক ডিন নামের এক চিকিৎসক ওই সময় তাঁর মাথার ভেতর যন্ত্রের অবস্থান নিশ্চিত করতে এআই-চালিত ‘ট্রুডি নেভিগেশন সিস্টেম’ ব্যবহার করছিলেন।
‘সাইনো প্লাস্টি’ নামের এ অস্ত্রোপচার দীর্ঘমেয়াদি সাইনোসাইটিস চিকিৎসার একটি আধুনিক পদ্ধতি। এতে সাইনাসের ছিদ্র বড় করার জন্য একটি বেলুন ফুলিয়ে দেওয়া হয়, যাতে তরল বেরিয়ে যেতে পারে ও প্রদাহ কমে।
তবে ডালাস কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে অ্যাক্লারেন্ট ও অন্যদের বিরুদ্ধে করা রালফের মামলায় অভিযোগ করা হয়, ট্রুডি সিস্টেম ডা. ডিনকে ‘ভুল পথে পরিচালিত’ করেছিল। এতে তাঁর একটি ক্যারোটিড ধমনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়; যা মস্তিষ্ক, মুখ ও ঘাড়ে রক্ত সরবরাহ করে। ফলে রক্ত জমাট বাঁধার সমস্যা তৈরি হয়।
আদালতের নথি অনুযায়ী, রালফের আইনজীবী বিচারককে জানিয়েছেন যে ডা. ডিনের নিজস্ব রেকর্ডেই দেখা গেছে, তিনি বুঝতেই পারেননি যে তিনি ক্যারোটিড ধমনির এত কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন।
তবে রয়টার্স স্বতন্ত্রভাবে সেই রেকর্ডগুলো যাচাই করতে পারেনি।
হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার পর স্পষ্ট হয় যে রালফ স্ট্রোক করেছেন। চার সন্তানের মা রালফকে আবার হাসপাতালে ফিরতে হয় এবং পাঁচ দিন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) কাটাতে হয়। তাঁর চিকিৎসার খরচ জোগাতে খোলা একটি ‘গো ফান্ড মি’ পাতায় জানানো হয়, যদি তাঁর মস্তিষ্ক ফুলে যায়, সে ক্ষেত্রে জায়গা করে দিতে খুলির একটি অংশ অপসারণ করা হয়েছিল।
এ ঘটনার এক বছরের বেশি সময় পর স্ট্রোকের শিকার ব্যক্তিদের নিয়ে একটি ব্লগে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রালফ বলেন, ‘আমি এখনো ফিজিওথেরাপি নিচ্ছি। ব্রেস (সহায়ক কাঠামো) ছাড়া হাঁটা এবং আমার বাঁ হাতটিকে আগের মতো সচল করা এখনো অনেক কঠিন।’
২০২৩ সালের মে মাসে ডা. ডিন যখন আরেকজন রোগী ডোনা ফার্নিহাফের ‘সাইনোপ্লাস্টি’ অস্ত্রোপচার করছিলেন, তখনো ‘ট্রুডি’ ব্যবহার করেন তিনি। ফোর্ট ওয়ার্থের আদালতে করা ফার্নিহাফের মামলা অনুযায়ী, অস্ত্রোপচারের সময় হঠাৎ তাঁর ক্যারোটিড ধমনি ‘ফেটে যায়’। রক্ত চারদিকে ‘ছিটে পড়তে থাকে।’ এমনকি অস্ত্রোপচার পর্যবেক্ষণ করতে আসা অ্যাক্লারেন্টের একজন প্রতিনিধির গায়েও সেই রক্ত লাগে। মামলায় বলা হয়, ডোনা ফার্নিহাফের একটি ক্যারোটিড ধমনি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং অস্ত্রোপচারের দিনই তিনি স্ট্রোকে আক্রান্ত হন।
মামলায় আরও অভিযোগ করা হয়েছে, অ্যাক্লারেন্ট কর্তৃপক্ষ জানত বা তাদের জানা উচিত ছিল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের ফলে এই নেভিগেশন সিস্টেমটি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ত্রুটিপূর্ণ ও অনির্ভরযোগ্য হয়ে ওঠার ঝুঁকি ছিল।
আদালতের নথি অনুযায়ী, অ্যাক্লারেন্ট উভয় মামলার অভিযোগই অস্বীকার করেছে। মামলাগুলো বর্তমানে চলমান রয়েছে। কোম্পানিটি দাবি করেছে, তারা ট্রুডি সিস্টেমের নকশা বা এটি তৈরি করেনি, শুধু বাজারজাত করেছে। অ্যাক্লারেন্টের বর্তমান মালিক ইন্টেগ্রা লাইফ সায়েন্সেস রয়টার্সকে বলেছে, এআই প্রযুক্তি ব্যবহারের সঙ্গে অস্ত্রোপচারকালে কোনো আঘাত বা ক্ষতির যোগসূত্র থাকার কোনো প্রমাণ নেই।
ফেডারেল ডেটাবেজ ‘ওপেন পেমেন্টস’-এর তথ্য অনুযায়ী, ডা. ডিন ২০১৪ সাল থেকে অ্যাক্লারেন্টের পরামর্শক হিসেবে কাজ শুরু করেন এবং ২০২৪ সাল পর্যন্ত কোম্পানিটির কাছ থেকে ফি বাবদ ৫ লাখ ৫০ হাজার ডলারের বেশি গ্রহণ করেন। এর মধ্যে অন্তত ১ লাখ ৩৫ হাজার ডলার ছিল ট্রুডি সিস্টেম–সংশ্লিষ্ট।
ডা. ডিনের একজন আইনজীবী জানিয়েছেন, রোগীর গোপনীয়তা রক্ষা এবং মামলা চলমান থাকায় চিকিৎসক এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে পারবেন না। ইন্টেগ্রা বলেছে, ডা. ডিন এখন আর ট্রুডির পরামর্শক নন এবং অ্যাক্লারেন্ট কিনে নেওয়ার পর তাঁকে যে অর্থ দেওয়া হয়েছে, তা শুধু তাঁর খাবারের খরচ বাবদ ছিল।
ফার্নিহাফের মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, ২০২১ সালে অ্যাক্লারেন্টের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জেফ হপকিন্স ট্রুডি ডিভাইসে এআই যুক্ত করার পেছনে ‘বিপণন কৌশলে’ জোর দিয়েছিলেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল, যন্ত্রটিতে ‘নতুন ও আধুনিক প্রযুক্তি’ রয়েছে, এমন দাবি করা।
লিংকডইনে অ্যাক্লারেন্টের একটি পোস্ট অনুযায়ী, ট্রুডির এআই সফটওয়্যারটি রোগীর শারীরবৃত্তীয় কাঠামোর নির্দিষ্ট অংশ শনাক্ত এবং চিকিৎসকের নির্ধারণ করা দুটি বিন্দুর মধ্যে ‘সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত ও সঠিক পথ’ খুঁজে বের করতে সহায়তা করে। এই প্রযুক্তির মূল লক্ষ্য হলো, অস্ত্রোপচারের পরিকল্পনা সহজ করা এবং সাইনাস অপারেশনের মতো প্রক্রিয়ায় তাৎক্ষণিক তথ্য সরবরাহ করা।
ফার্নিহাফের মামলায় বলা হয়, এআই যুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়ে অ্যাক্লারেন্ট কর্মকর্তারা যখন চিকিৎসক ডিনের কাছে গিয়েছিলেন, তখন তিনি হপকিন্স ও অ্যাক্লারেন্টকে সতর্ক করে বলেছিলেন যে ‘কিছু সমস্যা রয়েছে; যা সমাধান করা প্রয়োজন।’
মামলায় দাবি করা হয়েছে, এ সতর্কতা সত্ত্বেও অ্যাক্লারেন্ট তাদের নিরাপত্তার মান কমিয়ে নতুন প্রযুক্তিটি বাজারে আনার তোড়জোড় শুরু করে। এমনকি ট্রুডি সিস্টেমে যুক্ত করার আগে এই নতুন প্রযুক্তির কিছু ক্ষেত্রে নির্ভুলতার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল মাত্র ৮০ শতাংশ।
ডিন সত্যিই এমন কোনো সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন কি না, তা রয়টার্স নিশ্চিত করতে পারেনি। এ ছাড়া ফার্নিহাফের দাবির সপক্ষে জমা দেওয়া নথিপত্রগুলো আদালতের গোপনীয়তার আদেশে থাকায় সংবাদদাতারা সেগুলো যাচাই করতে পারেননি।
অ্যাক্লারেন্টের সাবেক প্রেসিডেন্ট জেফ হপকিন্স এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে কোনো সাড়া দেননি।
‘ভুল অঙ্গ শনাক্ত’
এফডিএ সতর্ক করেছে, চিকিৎসা সরঞ্জামের ত্রুটি বা প্রতিকূল ঘটনা নিয়ে প্রতিবেদনগুলোর সীমাবদ্ধতা রয়েছে। প্রায়ই এগুলোতে বিস্তারিত তথ্যের অভাব থাকে, ব্যবসায়িক গোপনীয়তা রক্ষার খাতিরে অনেক তথ্য মুছে ফেলা হয় এবং শুধু প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করেই কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না। এ ছাড়া একই ঘটনা নিয়ে সংস্থাটি একাধিক প্রতিবেদনও পেয়ে থাকে।
রয়টার্স দেখেছে যে ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবরের মধ্যে এফডিএ-তে জমা পড়া অন্তত ১ হাজার ৪০১টি প্রতিবেদন এমন সব চিকিৎসা সরঞ্জাম নিয়ে, যেগুলো সংস্থাটির অনুমোদন দেওয়া এআই-চালিত ১ হাজার ৩৫৭টি পণ্যের তালিকায় রয়েছে। যদিও সংস্থাটি বলছে, এ তালিকা সম্পূর্ণ নয়।
২০২৫ সালের জুন মাসের এক এফডিএ প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, প্রসবপূর্ব আল্ট্রাসাউন্ডের জন্য ব্যবহৃত একটি এআই সফটওয়্যার ভ্রূণের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ভুলভাবে শনাক্ত করছে। ‘সোনিও ডিটেক্ট’ নামের সফটওয়্যারটি ভ্রূণের ছবি বিশ্লেষণে মেশিন লার্নিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘সোনিও ডিটেক্ট সফটওয়্যারের এআই অ্যালগরিদম ত্রুটিপূর্ণ এবং এটি ভ্রূণের শারীরিক গঠন ভুলভাবে শনাক্ত ও সেগুলো ভুল অঙ্গের সঙ্গে যুক্ত করছে।’ তবে এতে কোনো রোগী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়নি।
‘সোনিও ডিটেক্ট’-এর মালিক স্যামসাং ইলেকট্রনিকসের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান স্যামসাং মেডিসন। প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, এই প্রতিবেদন কোনো নিরাপত্তা ঝুঁকির ইঙ্গিত দেয় না এবং এফডিএ এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধও করেনি।
এ ছাড়া অন্তত ১৬টি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, চিকিৎসা সরঞ্জাম খাতের জায়ান্ট প্রতিষ্ঠান মেডট্রনিকের তৈরি এআই-চালিত হার্ট মনিটরগুলো হৃৎস্পন্দনের অস্বাভাবিক ছন্দ বা সাময়িক বিরতি শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে। তবে এতে কেউ আহত হওয়ার তথ্য নেই। মেডট্রনিক এফডিএ-কে জানিয়েছে, কিছু ঘটনা ‘ব্যবহারকারীর বিভ্রান্তির’ কারণে ঘটেছে।
মেডট্রনিক তাদের হার্ট মনিটরের এআই অ্যালগরিদমকে ‘ডিপ লার্নিং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ হিসেবে বর্ণনা করে। তাদের দাবি, এটি ভুল সতর্কবার্তার হার কমিয়ে সঠিক তথ্য দেয়। তবে প্রতিষ্ঠানটি তাদের ওয়েবসাইটে এ–ও স্বীকার করেছে, তাদের এই প্রযুক্তি প্রকৃত অস্বাভাবিক হৃৎস্পন্দন শনাক্তের ক্ষেত্রে ভুল করতে পারে।
মেডট্রনিক রয়টার্সকে জানিয়েছে, ১৬টি ঘটনার মধ্যে মাত্র একটিতে তাদের যন্ত্র ত্রুটিপূর্ণ ছিল এবং এতে রোগীর কোনো ক্ষতি হয়নি।
ট্রাম্প আমলে এফডিএতে জনবল ছাঁটাই
রয়টার্সের সঙ্গে আলাপকালে এফডিএর পাঁচজন বর্তমান ও সাবেক বিজ্ঞানী জানিয়েছেন, নতুন চিকিৎসাযন্ত্রের জোয়ার সামলানোর মতো পর্যাপ্ত সক্ষমতা এখন নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির নেই। প্রায় চার বছর আগে এফডিএ এআই–বিশেষজ্ঞ বিজ্ঞানীর সংখ্যা বাড়িয়েছিল। দলটি এআইয়ের নিরাপত্তা যাচাইয়ে সংস্থাটির প্রধান সম্পদে পরিণত হয়েছিল। গত বছরের শুরুর দিকে এ দলে সদস্যসংখ্যা ছিল প্রায় ৪০।
একজন সাবেক কর্মী বলেন, ‘কিছু জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার এই প্রযুক্তি কীভাবে কাজ করে সে সম্পর্কে কোনো ধারণাই নেই। আমরা তাঁদের পাশে বসে বুঝিয়ে বলতাম, কেন এ প্রযুক্তিটি বাজারের জন্য নিরাপদ বা অনিরাপদ।’
তবে গত বছরের শুরুতে ট্রাম্প প্রশাসন ইলন মাস্কের ব্যয় সংকোচন অভিযানের অংশ হিসেবে এই এআই টিম ভেঙে দিতে শুরু করে। এফডিএর অভ্যন্তরীণ সূত্র অনুযায়ী, ৪০ জন বিজ্ঞানীর মধ্যে প্রায় ১৫ জন চাকরি হারিয়েছেন বা নিজে থেকে চলে গেছেন। ডিজিটাল হেলথ সেন্টার অব এক্সিলেন্স নামের আরেকটি বিভাগও তাদের এক-তৃতীয়াংশ কর্মী হারিয়েছে।
মার্কিন স্বাস্থ্য বিভাগের মুখপাত্র অ্যান্ড্রু নিক্সন অবশ্য দাবি করেছেন যে এফডিএ এআই-চালিত যন্ত্রের ক্ষেত্রেও আগের মতোই কঠোর মান বজায় রাখছে। তিনি বলেন, ‘রোগীর নিরাপত্তাই এফডিএর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।’
তবে এফডিএর সাবেক কর্মীদের মতে, ছাঁটাইয়ের পর কর্মীদের কাজের চাপ দ্বিগুণ হয়ে গেছে। ফলে অনেক ত্রুটি নজর এড়িয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বর্তমানে এফডিএর নিয়ম অনুযায়ী, বেশির ভাগ এআই-চালিত যন্ত্র বাজারে আনার আগে রোগীদের ওপর পরীক্ষা করার প্রয়োজন হয় না। নির্মাতারা শুধু পুরোনো কোনো এআই-বিহীন যন্ত্রের ‘আপডেট’ হিসেবে এগুলো বাজারে ছাড়ার অনুমতি পান।
সেন্ট লুইসের ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি স্কুল অব মেডিসিনের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আলেকজান্ডার এভারহার্ট বলেন, ‘চিকিৎসা সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে এফডিএর প্রথাগত পদ্ধতি এআই-চালিত প্রযুক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট নয়। আমরা নির্মাতাদের ওপর নির্ভর করছি যে তারা ভালো পণ্য দেবে; কিন্তু এফডিএর কাছে এর কোনো কার্যকর সুরক্ষা ব্যবস্থা আছে কি না, আমার জানা নেই।’ রয়টার্স
![]() |
| লিংকডইনে অ্যাক্লারেন্টের প্রকাশিত একটি ভিডিওতে তাদের ট্রুডি নেভিগেশন সিস্টেমের একটি এআই সুবিধা দেখানো হয়েছে। ‘ট্রুপাথ’ নামের এই ফিচার সার্জনদের দুটি নির্ধারিত বিন্দুর মধ্যে ‘সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত ও কার্যকর পথ’ দেখায়। ভিডিওর স্ক্রিনশট: রয়টার্স |
Thursday, March 26, 2026
তিন যুগ আগে রোগীদের সেবা দিতে যেভাবে যাত্রা শুরু করে ল্যাবএইড
১৯৮৯ সালে ডায়াগনস্টিক সেন্টার হিসেবে যাত্রা শুরু করে ল্যাবএইড। এক ছাদের নিচে হৃদ্রোগীদের বিশেষায়িত সেবা দিতে ২০০৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠা পায় ল্যাবএইড কার্ডিয়াক হাসপাতাল। এরপর ২০০৬ সালে ঢাকায় সব রোগের চিকিৎসার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয় বিশেষায়িত ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতাল। চট্টগ্রামেও রয়েছে ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতাল। দেশের বিভিন্ন জেলায় রয়েছে ল্যাবএইড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের শাখা। ল্যাবএইড ক্যানসার হাসপাতাল অ্যান্ড সুপার স্পেশালিটি সেন্টার এই প্রতিষ্ঠানের আধুনিকতম সংযোজন। বিশ্বমানের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার প্রয়াসেই ল্যাবএইডের এই দীর্ঘ পথচলা।
দিনে-রাতে জরুরি সেবা
আকস্মিক মৃত্যুর অন্যতম কারণ হার্ট অ্যাটাক। উপসর্গ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সঠিক চিকিৎসা শুরু করতে পারলে বেঁচে যায় অমূল্য প্রাণ। এ জন্য প্রয়োজন এমন প্রতিষ্ঠান, যেখানে দ্রুততম সময়ে এনজিওগ্রাম করা যায়। এনজিওগ্রাম দেখে দ্রুততম সময়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন একজন বিশেষজ্ঞ। নেওয়া হয় স্টেন্টিং বা রিং পরানোর মতো ব্যবস্থা। কিন্তু ২০০৪ সালের আগে দিনে-রাতে যেকোনো সময় হার্ট অ্যাটাকের উপসর্গ দেখা দিলে এত সব ব্যবস্থা গ্রহণের উপায় সে অর্থে দেশে ছিলই না। অথচ হুট করে হার্ট অ্যাটাকের মতো মারাত্মক সমস্যা হতে পারে যে কারও। কম বয়সীদেরও রয়েছে এমন বিপদের ঝুঁকি। বিপন্ন জীবন বাঁচাতে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে অবিরাম সেবা দিয়ে চলেছে ল্যাবএইড কার্ডিয়াক হাসপাতাল। শিশুর জন্মগত ত্রুটি সংশোধনসহ হৃৎপিণ্ডের সূক্ষ্ম ও জটিল শল্যচিকিৎসা যত্নসহকারে সম্পন্ন হচ্ছে।
‘উইনিং ক্যানসার’
ক্যানসার এমন এক রোগ, যাতে কেবল একজন রোগীই ভোগেন না, নানাবিধ ভোগান্তিতে পড়ে পুরো পরিবার। রোগীর শারীরিক কষ্টটা অপরিমেয়। মানসিক আর আর্থিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে পারে তাঁর পরিবারের সদস্যরাও। ব্যয়বহুল চিকিৎসা নিতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ে বহু পরিবার। কম খরচে চিকিৎসা পেতে সরকারি হাসপাতালগুলোতে যান ক্যানসারে আক্রান্ত বহু মানুষ। কিন্তু উপচে পড়া ভিড় ঠেলে চিকিৎসা পেতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। অথচ সময়মতো চিকিৎসা করালে নিরাময় হয় বহু ক্যানসার। ল্যাবএইড ক্যানসার হাসপাতাল অ্যান্ড সুপার স্পেশালিটি সেন্টারের মূলমন্ত্র ‘উইনিং ক্যানসার’। ক্যানসার মানেই জীবনের শেষ নয়। ক্যানসারের সঙ্গে লড়েও জয়ী হন বহু মানুষ। আর লড়াইয়ের পরও যাঁদের মেনে নিতে হয় মৃত্যুর পরিণতি, তাঁদের এই মৃত্যুও যেন হয় উপশমমূলক। এমনটা যেন না হয় যে হাল ছেড়ে দিয়ে ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর জন্য ভয়ার্ত চোখে প্রতীক্ষা করছেন একজন মানুষ। এমন ভাবনাকে উপজীব্য করেই এই বিশেষায়িত সেন্টারে সেবা দেন কর্মীরা।
আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা
বর্তমানে স্ট্রোক বাংলাদেশে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। স্ট্রোক–পরবর্তী সবচেয়ে আধুনিক চিকিৎসাপদ্ধতি যেমন থ্রম্বোলাইসিস ও থ্রম্বেকটমিও হচ্ছে ল্যাবএইডের অত্যাধুনিক স্ট্রোক সেন্টারে। আর মুমূর্ষু রোগীদের জন্য ল্যাবএইডের অত্যাধুনিক নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র (আইসিইউ) ও সিসিইউ তো আছেই।
হৃদ্রোগ ও ক্যানসার ছাড়াও এখানে পাবেন যেকোনো সমস্যার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের খোঁজ। দীর্ঘদিন ধরে হিপ জয়েন্ট (ঊরুসন্ধি) বা নি জয়েন্ট (হাঁটু) প্রতিস্থাপনের কাজটি সাফল্যের সঙ্গে হয়ে আসছে এই প্রতিষ্ঠানে। প্রসবকালীন জটিলতা মোকাবিলায় রয়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা। ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশনসহ (আইভিএফ) বন্ধ্যত্বের আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা এখানে আছে। সাফল্যের হার উন্নত বিশ্বের মতোই।
ধারাবাহিকতা ও সাফল্যের স্বীকৃতি
কলেজ অব আমেরিকান প্যাথলজিস্টের (সিএপি) স্বীকৃতি পেয়ে আসছে ল্যাবএইড ডায়াগনস্টিক সেন্টার। ল্যাবরেটরির মানের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার এটি একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন বোর্ডের (বিএবি) তালিকার সেরার মধ্যেই থাকে ল্যাবএইড। রয়েছে আন্তর্জাতিক আরও নানা স্বীকৃতি। ল্যাবএইড ক্যানসার হাসপাতাল অ্যান্ড সুপার স্পেশালিটি সেন্টারের রয়েছে জয়েন্ট কমিশন ইন্টারন্যাশনালের (জেসিআই) স্বীকৃতি। চট্টগ্রামের ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতাল আবার আমেরিকান অ্যাক্রেডিটেশন কমিউনিকেশন কাউন্সিল (এএসিআই) স্বীকৃতির শেষ ধাপে আছে। ন্যাশনাল অ্যাক্রেডিটেশন বোর্ড ফর হসপিটালস অ্যান্ড হেলথকেয়ার প্রোভাইডারসের (এনএবিএইচ) স্বীকৃতি পেয়েছে ল্যাবএইড কার্ডিয়াক হাসপাতাল এবং ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতাল।
অঙ্গ প্রতিস্থাপনের সুযোগ
জীবন বাঁচাতে অঙ্গ প্রতিস্থাপন এক গুরুত্বপূর্ণ শল্যচিকিৎসা। ২০১০ সালে লিভার প্রতিস্থাপন শুরু করে ল্যাবএইড হাসপাতাল। ছয়জন রোগীর লিভার প্রতিস্থাপন করা হয় সে সময়। নিয়মিত কিডনি প্রতিস্থাপনও হয়েছে। পরে বাংলাদেশে অঙ্গ প্রতিস্থাপনবিষয়ক নীতিমালার জটিলতায় পড়ে থমকে গেছে এই উদ্যোগ। বাংলাদেশ থেকে বহু রোগী অঙ্গ প্রতিস্থাপনের জন্য বাইরে যান। বাইরের কিছু প্রতিষ্ঠানের অঙ্গ প্রতিস্থাপন নীতিমালাও প্রশ্নবিদ্ধ। তবু বাধ্য হয়ে সেসব প্রতিষ্ঠানেই ছুটছেন মানুষ। সরকারিভাবে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা হলে রোগীরা এ ধরনের বিশেষায়িত সেবা পাওয়ার সুযোগ দেশেই পাবেন। ল্যাবএইড কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অঙ্গ প্রতিস্থাপনের মতো জটিল শল্যচিকিৎসার জন্য যে দক্ষ লোকবল ও বিশেষায়িত যন্ত্রপাতি প্রয়োজন, সবই তাদের আছে। কেবল সরকারি সিদ্ধান্তের অপেক্ষা।
স্বপ্ন যখন রোবোটিক শল্যচিকিৎসা
বিশ্বে জনপ্রিয় হচ্ছে রোবোটিক শল্যচিকিৎসা। আধুনিকতম এই প্রযুক্তির ব্যবহারে জটিল সব শল্যচিকিৎসায় সাফল্যের হারও বাড়ছে। দেশের বাইরে এই চিকিৎসার জন্য যে খরচ হবে, তার এক–পঞ্চমাংশ খরচে দেশেই করা সম্ভব এমন চিকিৎসা। দেশের মানুষের জন্য তেমন দারুণ কোনো সুযোগ সৃষ্টির আশা নিয়েই ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে চলেছে ল্যাবএইড।
![]() |
| ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতাল। ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন |
Monday, March 23, 2026
বৃটেনে চোখের চিকিৎসায় যুগান্তকারী উদ্ভাবন, প্রায় অন্ধ হওয়া চোখে অপারেশন ছাড়া ফিরিয়ে আনা হলো দৃষ্টিশক্তি
হাসপাতালের চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, যে কাজটি একসময় অসম্ভব বলে মনে করা হচ্ছিল, সেটিই তারা করে দেখিয়েছেন। বিরল কিন্তু মারাত্মক চোখের রোগ হাইপোটনি-তে আক্রান্ত রোগীদের দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনা এবং অন্তত রোগটির অগ্রগতি প্রতিরোধে তারা সফল হয়েছেন।
লন্ডনের মুরফিল্ডস আই হাসপাতাল এখন বিশ্বের প্রথম চিকিৎসাকেন্দ্র, যেখানে এই রোগের জন্য আলাদা চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। একটি পাইলট গবেষণায় দেখা গেছে, পরীক্ষামূলক এই চিকিৎসা দেয়া ৮ জন রোগীর মধ্যে ৭ জনের অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। এই চিকিৎসা পাওয়া প্রথম রোগী ৪৭ বছর বয়সী নিকি গাই। তিনি তার অভিজ্ঞতা বিবিসির সঙ্গে শেয়ার করেছেন। নিকি বলেন, ফলাফল ছিল “অবিশ্বাস্য” এটি তার জীবনই বদলে দিয়েছে। তিনি আবার তার সন্তানের বেড়ে ওঠা দেখতে পারছেন।
চিকিৎসার আগে তার অবস্থা ছিল এমন যে, তিনি শুধু আঙুল গুনতে পারতেন এবং সবকিছু ঝাপসা দেখাত। এখন তিনি আবার স্বাভাবিকভাবে দেখতে পাচ্ছেন। বর্তমানে তিনি পরীক্ষার চার্টে থাকা অক্ষরও পড়তে পারেন। নিকি জানান, তিনি আইনগতভাবে গাড়ি চালানোর যোগ্যতা অর্জনের মাত্র এক লাইনের দূরত্বে আছেন যা আগের তুলনায় বিশাল পরিবর্তন। এর আগে তিনি আংশিক দৃষ্টিহীন ছিলেন। কাছের কোনো কিছু দেখতে হলে আতস কাচ ব্যবহার করতে হতো এবং ঘরের ভেতর বা বাইরে চলাফেরার সময় স্মৃতির ওপর নির্ভর করতে হতো। নিকি বলেন, তিনি একসময় ভেবেছিলেন জীবনের বাকি সময়টা হয়তো এভাবেই কাটবে দৃষ্টি থাকবে না, কখনো গাড়ি চালাতে পারবেন না। সে বাস্তবতাও তিনি মেনে নিতে প্রস্তুত ছিলেন, কারণ তিনি এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছিলেন, যেখান থেকে আর কোনো আশা দেখছিলেন না।
হাইপোটনি রোগে চোখের ভেতরের চাপ বিপজ্জনকভাবে কমে যায়। এর ফলে চোখের গঠন ভেঙে পড়তে শুরু করে। সাধারণত চোখের ভেতরের জেলির মতো পদার্থ ঠিকমতো তৈরি না হলে, আঘাত লাগলে বা প্রদাহের পর এমনটি হতে পারে। কখনো কখনো এটি চোখের অস্ত্রোপচার বা নির্দিষ্ট কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াতেও দেখা দেয়। চিকিৎসা না হলে রোগী সম্পূর্ণ অন্ধ হয়ে যেতে পারে।
আগে চিকিৎসকেরা চোখের চাপ বাড়াতে সিলিকন অয়েল ব্যবহার করতেন। তবে দীর্ঘমেয়াদে এগুলো বিষাক্ত হতে পারে এবং দৃষ্টিশক্তি খুব একটা ফেরাতে পারে না। এমনকি চোখের পেছনের দৃষ্টি-সংক্রান্ত কোষগুলো কার্যকর থাকলেও সিলিকন অয়েলের কারণে দৃষ্টি ঝাপসাই থেকে যায়।
এই সমস্যার সমাধানে মুরফিল্ডসের চিকিৎসকেরা সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি পদ্ধতি গ্রহণ করেন। তারা ব্যবহার করেন স্বচ্ছ, জলভিত্তিক ও কম খরচের একটি উপাদান হাইড্রক্সিপ্রোপাইল মিথাইলসেলুলোজ (HPMC)। এটি আগে থেকেই কিছু চোখের অস্ত্রোপচারে ব্যবহার হয়ে আসছিল। তবে এবার এটিকে একবারের জন্য নয়, বরং নিয়মিত চিকিৎসা পদ্ধতির অংশ হিসেবে চোখে ইনজেকশনের মাধ্যমে প্রয়োগ করা হয়।
নিকি জানান, ২০১৭ সালে তার ছেলের জন্মের পরপরই তার ডান চোখে প্রচুর সিলিকন অয়েল দেওয়া হয়েছিল। হাইপোটনির কারণে চোখটি স্বাভাবিক আকার হারিয়ে কাগজের মতো ভেঙে পড়েছিল। সেই চিকিৎসা খুব একটা কাজে আসেনি। কয়েক বছর পর একই সমস্যা তার বাম চোখেও দেখা দেয়।
নিকি বলেন, যখন বাম চোখের দৃষ্টি হারাতে শুরু করল, তখন ভাবলাম কিছু একটা করতেই হবে। হাল ছাড়তে চাইনি।
নিকির চিকিৎসক ও সার্জন হারিট কুশিন বলেন, তারা দুজন মিলে নতুন কিছু করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি জানান, একমাত্র কার্যকর চোখে এমন একটি পরীক্ষামূলক চিকিৎসা প্রয়োগ করা তাদের জন্য বড় ঝুঁকি ছিল। কারণ, যদি ব্যর্থ হতো, রোগী সম্পূর্ণ দৃষ্টিহীন হয়ে পড়তেন।
তিনি আরও বলেন, এটি মূলত একটি পাইলট প্রকল্প ছিল। কিন্তু যেসব রোগী দুই চোখেই দৃষ্টিহীন হয়ে সারাজীবন অন্ধত্ব নিয়ে বাঁচতে বাধ্য হতেন, তাদের জন্য এই চিকিৎসা যে এত অসাধারণ ফল দেবে তা তারা নিজেরাও কল্পনা করেননি।
![]()
Monday, December 29, 2025
জরুরি চিকিৎসার জন্য গাজা থেকে বের হতে না পেরে ১০৯২ ফিলিস্তিনির মৃত্যু
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ডব্লিউএইচওর প্রধান তেদরোস আধানোম গেব্রেয়াসুস বলেন, দুই বছর আগে গাজায় ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর থেকে গুরুতর অবস্থায় থাকা ১০ হাজার ৬০০ জনের বেশি রোগীকে উপত্যকাটি থেকে বের করতে সক্ষম হয়েছে ডব্লিউএইচও এবং তাদের অংশীদারেরা। এই রোগীদের মধ্যে ৫ হাজার ৬০০ জনের বেশি শিশু।
চিকিৎসার জন্য আরও বহু রোগী গাজা ত্যাগের অপেক্ষায় রয়েছেন বলে সতর্ক করেন ডব্লিউএইচওর প্রধান। গাজার স্থানীয় কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যের বরাতে তিনি বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের ২৮ নভেম্বর পর্যন্ত চিকিৎসার জন্য উপত্যকাটি ত্যাগের অপেক্ষায় থাকা ১ হাজার ৯২ জনের মৃত্যু হয়েছে।
গাজায় অবস্থান করা রোগীদের জন্য আরও বেশি দেশের ‘দরজা খুলে দেওয়ার’ আহ্বান জানান গেব্রেয়াসুস। আর চিকিৎসার জন্য গাজা ত্যাগ না করতে পেরে মৃত্যু ফিলিস্তিনির সংখ্যা বাস্তবতার চেয়ে কম বলেও উল্লেখ করেন তিনি। এই সংখ্যা তিন থেকে চার গুণ বেশি হতে পারে বলে চলতি মাসের শুরুর দিকেই জানিয়েছিল আন্তর্জাতিক চিকিৎসা-মানবিক সংস্থা ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস।
দুই বছরের বেশি সময় ধরে গাজায় ইসরায়েলের টানা হামলার পর ১০ ডিসেম্বর থেকে উপত্যকাটিতে যুদ্ধবিরতি চলছে। এরপরও গাজায় প্রায়ই হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী। এতে এখন পর্যন্ত ৭০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১ লাখ ৭১ হাজার। তাঁদের মধ্যে ১ ডিসেম্বর পর্যন্ত জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন থাকা ১০ হাজার ৬০০ রোগীকে ৩০টির বেশি দেশ আশ্রয় দিয়েছে। এর মধ্যে মিসর, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ হাতে গোনা কয়েকটি দেশ বেশিসংখ্যক ফিলিস্তিনি রোগী নিয়েছে।
এদিকে আজ যুক্তরাষ্ট্রের মিয়ামিতে গাজার যুদ্ধবিরতির পরবর্তী ধাপ নিয়ে আলোচনার কথা রয়েছে। সেখানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটফের সঙ্গে আলোচনায় বসার কথা কাতার, মিসর ও তুরস্কের প্রতিনিধিদের। বৈঠকের আগে হামাস বলেছে, দ্বিতীয় ধাপের আলোচনা ইসরায়েলের যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের বিষয়টিকে কেন্দ্র করে হতে হবে।
| তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে ফিলিস্তিনি শিশু আরজওয়ান আল-দাহিনি। তার জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন থাকলেও বিদেশ যেতে পারছে না। আজ দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসে নাসের হাসপাতালে। ছবি: রয়টার্স |
Thursday, December 25, 2025
রোগীকে মারধর করলেন ভারতীয় চিকিৎসক
তিনি আরও বলেন, আমি শুধু অনুরোধ করেছিলাম যেন তিনি সম্মানের সঙ্গে কথা বলেন। কিন্তু তিনি আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন। আমি যখন জিজ্ঞেস করি, তিনি কি নিজের পরিবারের সঙ্গেও এভাবে কথা বলেন? তখন তিনি বলেন আমি ‘ব্যক্তিগত’ বিষয়ে কথা বলছি এবং মারধর শুরু করেন। ঘটনাটির ভিডিও দ্রুত অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে দেখা যায়, চিকিৎসক বারবার ঘুষি মারছেন, আর পানওয়ার আত্মরক্ষার চেষ্টা করছেন। ঘটনার পর হাসপাতালে বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়ো হয়ে অভিযুক্ত চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান। শিমলা আইজিএমসি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এ ঘটনায় তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
আইজিএমসি শিমলার মেডিকেল সুপারিনটেনডেন্ট ডা. রাহুল রাও জানান, কমিটি বিষয়টি তদন্ত করছে এবং শিগগিরই প্রতিবেদন জমা দেবে। একই সঙ্গে অভিযুক্ত চিকিৎসকের বিরুদ্ধে একটি পুলিশ মামলাও করা হয়েছে। উল্লেখ্য, এর আগে ২০১৭ সালে ভারতে আরেকটি ঘটনায় অপারেশন থিয়েটারের ভেতর দুই চিকিৎসকের পারস্পরিক গালাগালির ভিডিও ভাইরাল হয়। জরুরি সিজারিয়ান অপারেশনের সময় ওই বিতণ্ডার ফলে একটি শিশুর মৃত্যু হয়। ওই ঘটনায় প্রসূতি বিশেষজ্ঞ ডা. অশোক নাইনিব্রাল ও অ্যানেস্থেটিস্ট ডা. মুরারি লাল তাক অচেতন রোগীর ওপর অস্ত্রোপচার চলাকালে একে অপরের সঙ্গে তীব্র বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। যোধপুরের উমাইদ হাসপাতালে সংঘটিত ওই ঘটনায় প্রায় এক ডজন চিকিৎসাকর্মী অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য হন। উমাইদ হাসপাতালের তৎকালীন সুপারিনটেনডেন্ট ডা. রঞ্জনা দেশাই জানান, ওই নারীকে সংকটাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছিল এবং দ্রুত অপারেশন থিয়েটারে নেয়া হয়। পরে গুরুতর জন্মকালীন শ্বাসকষ্টের কারণে তার শিশুর মৃত্যু হয়।

BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
- ▼ 2026 (1767)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...




