চট্টগ্রামের নামী বেকারি-রেস্তোরাঁয় কী খাচ্ছে মানুষ by ফাহিম আল সামাদ
গতকাল বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম নগরের জিইসি মোড় এলাকায় হারুন বেকারিতে গিয়ে এমন চিত্র দেখতে পান জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। প্রতিষ্ঠানটিকে এক লাখ টাকা জরিমানা করে সাময়িক বন্ধ করে দেওয়া হয়। জানতে চাইলে অধিদপ্তরের উপপরিচালক (চট্টগ্রাম বিভাগ) মোহাম্মদ ফয়েজ উল্যাহ প্রথম আলোকে বলেন, ‘ছোট একটা বেকারি; দেখলে মনে হয় তেলাপোকার ফ্যাক্টরি। আমরা রান্নাঘরে ঢুকেই রীতিমতো অবাক হয়েছি। দেয়ালজুড়ে তেলাপোকার বিচরণ। রান্নাঘরে সেগুলো ঘোরাঘুরি করছিল।’
শুধু হারুন বেকারি নয়, গত ১০ দিনে চট্টগ্রাম নগরের অন্তত ৫টি খাদ্য তৈরি বেকারি ও রেস্তোরাঁয় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ পেয়েছেন নিরাপদ খাদ্য ও ভোক্তা অধিকার কর্মকর্তারা। এর মধ্যে বারকোড সুইটস, মেরিডিয়ান রেস্তোরাঁর মতো নামী প্রতিষ্ঠানও রয়েছে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ মো. জসিম উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি খাবার মানুষের জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তেলাপোকা বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও জীবাণু বহন করে, যা খাবারের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে ডায়রিয়া, আমাশয়, ফুড পয়জনিংসহ নানা রোগের কারণ হতে পারে।
যেখানে যা দেখলেন কর্মকর্তারা
গত ২৬ ফেব্রুয়ারি নগরের চকবাজার এলাকায় নামী রেস্তোরাঁ কাচ্চি ডাইনে পরিদর্শনে যান জেলা নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ এবং জেলা প্রশাসন। প্রতিষ্ঠানটির রান্নাঘরে ঢুকতেই চোখে পড়ে তেলাপোকা ও ইঁদুরের বিচরণ। ১ মার্চ মুরাদপুর এলাকায় বারকোড সুইটস অ্যান্ড কনফেকশনারির রান্নাঘরে গিয়েও তাঁরা তেলাপোকা-ছারপোকার বিচরণ ও বিড়ালের উপস্থিতি দেখতে পান।
গত বুধবার কালুরঘাট এলাকার বিএসপি ফুড প্রোডাক্টস প্রাইভেট লিমিটেড ও গতকাল বৃহস্পতিবার গরীবুল্লাহ শাহ হাউজিং এলাকায় হোম রেসিপি ফুড বেকারি গিয়েও তেলাপোকা পাওয়া গেছে রান্নাঘরে। চারটি প্রতিষ্ঠানের রান্নাঘরই স্যাঁতসেঁতে ও অপরিচ্ছন্ন বলে জানিয়েছেন নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তারা। তাঁরা জানান, এসব প্রতিষ্ঠানকে আগে মোটা অঙ্কের জরিমানা ও সতর্ক করলেও আবার একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া যায় বলে কর্মকর্তার জানিয়েছেন। অনেক প্রতিষ্ঠান জরিমানা দেওয়ার পর সাময়িকভাবে কিছুটা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখলেও পরে আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়। ফলে একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি ঘটে।
রাসায়নিকের অবাধ ব্যবহার
নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা ও ভোক্তা অধিকার কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুধু অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ নয়, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ক্ষতিকারক রাসায়নিকের ব্যবহার করা হচ্ছে অবাধে। খাদ্যপণ্যে ব্যবহারযোগ্য নয়—এমন রাসায়নিক মেশানো হচ্ছে ইফতারের খাদ্যপণ্য তৈরিতে। জিলাপি তৈরিতে দেদার ব্যবহার করা হচ্ছে হাইড্রোজ বা সোডিয়াম হাইড্রো সালফাইড।
গতকাল বৃহস্পতিবার নগরের চকবাজার এলাকায় সাতকানিয়া ভাতঘর নামের প্রতিষ্ঠানে অভিযান পরিচালনা করে জেলা প্রশাসন। এ সময় সেখানে জিলাপি তৈরিতে হাইড্রোজের ব্যবহার করতে দেখা যায়। দীর্ঘ সময় বা অতিরিক্ত মাত্রায় এর সংস্পর্শে এলে কিডনির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। অনেক সময় মেধাশক্তি দুর্বলও করে দেয়।
কর্মকর্তারা বলছেন, হাইড্রোজ যে ড্রামে আনা হয়, এর ওপরেই লেখা আছে, এটি ব্যবহারের সময় খাওয়া বা পান করা যাবে না। কারণ, এটি বাতাসের ক্ষতিকর কণা ছড়ায়। এটি ব্যবহার করা হয় পোশাক খাতে। আর সেটি ব্যবহার হচ্ছে খাবার তৈরিতে। গোপালজল, কেওড়াজলও খাবারে ব্যবহার নিষিদ্ধ, তবু ব্যবহার করা হচ্ছে।
এসব প্রতিষ্ঠান স্থায়ীভাবে সিলগালা করে দেওয়ার মতো শাস্তি প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, জরিমানা করে এসব প্রতিষ্ঠানকে ছাড় দেওয়ার কারণে তারা একই ভুল আবার করে। যেহেতু সিলগালা করে দেওয়ার বিধান আছে, তাই এসব প্রতিষ্ঠানকে কঠিন শাস্তি দিলে বাকিরা সতর্ক থাকবে।
![]() |
| নগরের জিইসি মোড়ের হারুন বেকারিতে কয়েক শ তেলাপোকার বিচরণ। গতকাল তোলাছবি: সংগৃহীত |

No comments