Showing posts with label কাশ্মীর. Show all posts
Showing posts with label কাশ্মীর. Show all posts

Sunday, July 19, 2026

কাশ্মিরের শহীদদের দোহাই দিয়ে বলছি by হামিদ মীর

জম্মু-কাশ্মিরের রাজনৈতিক সংগ্রামে তিনটি দিবস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমটি ২৩ মার্চ, দ্বিতীয়টি ১৩ জুলাই এবং তৃতীয়টি ১৪ আগস্ট। এই তিন দিবসের গুরুত্ব অনুধাবনে আসুন আমরা ১৯২৪ সালের ২১ জুলাই শ্রীনগরের রেশম কারখানায় কর্মরত হাজার হাজার কাশ্মিরি শ্রমিকদের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের পটভূমি জেনে নিই। ওই কারখানাগুলোর মালিক ও কর্মকর্তা সবাই ছিলেন হিন্দু, যারা মোটা অঙ্কের বেতন পেতেন। অন্য দিকে মুসলিম শ্রমিকরা দৈনিক মাত্র সাড়ে চার আনা মজুরি পেতেন। এ অন্যায়ের বিরুদ্ধে কাশ্মিরি মুসলিম শ্রমিকরা তাদের সন্তান-সন্ততিদের নিয়ে মিছিল বের করেন। তারা মজুরি বাড়ানোর দাবি করেন। এ শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারী শ্রমিকদের গ্রেফতার করা হয়। এ বিক্ষোভ কাশ্মিরি মুসলমানদের মধ্যে সেই রাজনৈতিক জাগরণের পরিচয় দেয়, যা ১৯২৩ সালে জম্মুতে ইয়ংমেনস মুসলিম অ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শুরু হয়েছিল। এরপরে ১৯২৯ সালে পুঞ্ছ অঞ্চলে রাষ্ট্রীয় করের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়।

২৩ মার্চ, ১৯৩১ সালে লাহোরে ব্রিটিশ সরকার স্বাধীনতাকামী ভগত সিংকে ফাঁসি দিলে ওই দিন ইয়ংমেনস মুসলিম অ্যাসোসিয়েশন ছাড়াও মীর ওয়ায়েজ মুহাম্মদ ইউসুফ শাহ এই ফাঁসির তীব্র নিন্দা জানান। পরের দিন প্রতিবাদী বিক্ষোভও করেন। এই ফাঁসির কয়েক দিন পর ২৯ এপ্রিল, ১৯৩১ সাল ছিল ঈদুল আজহার দিন। জম্মুর মুসলমানরা শালিমার বাগে ঈদের নামাজ আদায় করছিলেন। মাওলানা মুহাম্মদ ইসহাক তার খুতবায় ফেরাউন ও নমরুদের অত্যাচার ও নিপীড়নের কথা উল্লেখ করলে সেখানে উপস্থিত ডোগরা পুলিশের অন্যতম ইন্সপেক্টর লালা খেম চাঁদ এই খুতবা বন্ধ করে দেন। ওই দিন ইয়ংমেনস মুসলিম অ্যাসোসিয়েশন জম্মুর জামে মসজিদে একটি সভা করে। লালা খেম চাঁদকে বরখাস্ত করার দাবি জানায়।

৪ জুন, ১৯৩১ সালে জম্মুর সেন্ট্রাল জেলে লম্বুরাম নামে এক হিন্দু ইন্সপেক্টর কুরআন অবমাননা করেন। ৬ জুন এ ঘটনার বিরুদ্ধে পুরো জম্মুতে হরতাল পালন করা হয়। প্রতিবাদের এ ধারা মোজাফফরাবাদ ও রাওলাকোট থেকে মিরপুর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। ৫ জুন, ১৯৩১ সালে শ্রীনগরের খানকায়ে মুয়াল্লায় কুরআন অবমাননার বিরুদ্ধে একটি বিশাল সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ওই সমাবেশে আবদুল কাদির নামে এক পাখতুন যুবক ডোগরা সরকারের বিরুদ্ধে এক অগ্নিঝরা বক্তব্য প্রদান করেন; যার পর তাকে গ্রেফতার করা হয়। আবদুল কাদিরের বিরুদ্ধে মামলার শুনানি সাধারণ আদালতে করার পরিবর্তে শ্রীনগরের সেন্ট্রাল জেলে করা হয়। হাজার হাজার কাশ্মিরি মুসলমান শ্রীনগর সেন্ট্রাল জেলের বাইরে জড়ো হয়ে আবদুল কাদিরের পক্ষে সেøাগান দিতে থাকেন। দিনটি ছিল ১৯৩১ সালের ১৩ জুলাই। নামাজের সময় হয়ে গেল। মুসলমানরা জেলের দেওয়ালে চড়ে আজান দেয়া শুরু করলে তাদের ওপর গুলি চালানো হয়। গুলিবর্ষণে ২২ কাশ্মিরি মুসলমান শহীদ হন। পরবর্তীতে দিনটিকে কাশ্মিরি শহীদ দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এই ঘটনার পর শ্রীনগরে মার্শাল ল জারি করা হয়। চৌধুরী গোলাম আব্বাস ও শেখ আবদুল্লাহসহ সব শীর্ষস্থানীয় কাশ্মিরি নেতাকে গ্রেফতার করা হয়। ৩ আগস্ট গ্রেফতারকৃত সব নেতাকে মুক্তি দেয়া হয়। কিন্তু আবদুল কাদিরকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়।

এসব ঘটনার প্রতিবাদে ১৯৩১ সালের ১৪ আগস্ট লাহোরের মোচি গেটের বাইরের বাগানে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে আল্লামা ইকবাল কাশ্মিরের স্বাধীনতা আন্দোলনের ঘোষণা দেন। এ দিনে অপর কিছু শহরেও কাশ্মির দিবস পালন করা হয়। ১৪ সেপ্টেম্বর ১৯৩১ সালে মীর ওয়ায়েজ মাওলানা মুহাম্মদ ইউসুফ শাহ ডোগরা সরকারের বিরুদ্ধে জিহাদের ফতোয়া দেন। এসব কিছু মাত্র ছয় মাসের মধ্যে ঘটেছিল। ২৩ মার্চ সমগ্র জম্মু-কাশ্মির রাজ্য ভগত সিংয়ের ফাঁসির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে। এরপর কুরআন অবমাননার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়। ১৩ জুলাই ২২ কাশ্মিরি মুসলমান শহীদ হন। সেই সাথে ১৪ সেপ্টেম্বর শ্রীনগর থেকে ডোগরা সরকারের বিরুদ্ধে জিহাদের ফতোয়া আসে। এই তারিখগুলো স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, তখন পর্যন্ত অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের পক্ষ থেকে একটি পৃথক স্বদেশের আনুষ্ঠানিক দাবি উত্থাপিত হয়নি। কিন্তু জম্মু-কাশ্মিরের স্বাধীনতা আন্দোলন ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গিয়েছিল। চৌধুরী গোলাম আব্বাস ও সরদার ফতেহ কারেলবিসহ বেশ কয়েকজন কাশ্মিরি নেতা লাহোর এসে আল্লামা ইকবালের সাথে পরামর্শ করেন। একই সাথে ১৯৩২ সালে অল জম্মু-কাশ্মির মুসলিম কনফারেন্স নামে একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করেন।

১৯৩৪ সালে জম্মু-কাশ্মির রাজ্যে প্রথমবারের মাতো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। মুসলিম কনফারেন্স সব ক’টি মুসলিম আসনে জয়লাভ করে। ১৯৩৯ সালে শেখ আবদুল্লাহ মুসলিম কনফারেন্স ভেঙে ন্যাশনাল কনফারেন্স গঠন করেন। ১৯৪৫ সালে শেখ আবদুল্লাহ পণ্ডিত জওয়াহের লাল নেহরুকে ন্যাশনাল কনফারেন্সের বার্ষিক অধিবেশনে বিশেষ অতিথি করেন। এভাবে ন্যাশনাল কনফারেন্স কংগ্রেসের সুরে সুর মেলানোর পথ অবলম্বন করে। অন্য দিকে ২৩ মার্চ, ১৯৪০ সালে লাহোরে অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের অধিবেশনে মুসলিম কনফারেন্সের একটি প্রতিনিধিদল অংশ নেয়। ওই দলে জম্মু, শ্রীনগর, মোজাফফরাবাদ, পুঞ্ছ ও মিরপুরের পূর্ণ প্রতিনিধিত্ব ছিল। এভাবে মুসলিম কনফারেন্স প্রকাশ্যে মুসলিম লীগের পাশে এসে দাঁড়ায়।

১৯৪৪ সালে কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ শ্রীনগর সফর করেন। তিনি শেখ আবদুল্লাহকে পুনরায় মুসলিম কনফারেন্সে ফিরে আসার আমন্ত্রণ জানান। শেখ আবদুল্লাহ তা প্রত্যাখ্যান করেন। ১৭ জুন, ১৯৪৪ সালে শ্রীনগরে মুসলিম কনফারেন্সের বার্ষিক অধিবেশনের বিশেষ অতিথি ছিলেন কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ। এসব ঘটনার পটভূমিতে ১৯ জুলাই, ১৯৪৭ মুসলিম কনফারেন্স শ্রীনগরে তাদের অধিবেশনে পাকিস্তানের সাথে অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব পাস করে।

প্রফেসর এম নাজির আহমদ তেশনার ‘তারিখে কাশ্মির (কাশ্মিরের ইতিহাস ৩২৪ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে ২০২১)’ গ্রন্থের তথ্যানুযায়ী, সরদার ইবরাহিম খানের বাসভবনে অনুষ্ঠিত এ অধিবেশনের সভাপতিত্ব করেন চৌধুরী হামিদুল্লাহ খান। অন্য দিকে জম্মু থেকে চৌধুরী গোলাম আব্বাস, ডাক্তার গোলাম আহমদ জাররাহ, মিরপুরের কর্নেল আলি আহমদ শাহ ও চৌধুরী মুহাম্মদ রফিক, পুঞ্ছের হাজি মুহাম্মদ, মোজাফফরাবাদের মুহাম্মদ আলি কানওয়াল, শ্রীনগরের খাজা আহমদুল্লাহ রেজা, রাজৌরির মির্জা ফকির মুহাম্মদ, চৌধুরী নুর হোসাইন, প্রফেসর ইসহাক কুরাইশি, সোপুরের খাজা গোলাম মহিউদ্দিনসহ রাজ্যের প্রতিটি অঞ্চলের মুসলমান প্রতিনিধিরা পাকিস্তানের সাথে অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব অনুমোদনকারীদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

পাকিস্তান ১৪ আগস্ট, ১৯৪৭ সালে আত্মপ্রকাশ করে। কিন্তু কাশ্মিরি মুসলমানরা ১৪ আগস্টের অনেক আগেই পাকিস্তানি হয়ে গিয়েছিলেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় যে, ১৯ জুলাইয়ের প্রস্তাব অনুমোদনকারী নেতারা নিজেরাই স্বাধীন কাশ্মিরের সমর্থক হয়ে যান। তবে তারা পাকিস্তানের বিরোধী ছিলেন না। ঐতিহাসিক বাস্তবতা এটাই যে, কাশ্মিরিদের স্বাধীনতা ১৯৩১ সালের ১৪ আগস্ট শুরু হয়েছিল। আজো জম্মু-কাশ্মির রাজ্যের সব অঞ্চলে ১৩ জুলাই কাশ্মিরি শহীদ দিবস পালন করা হয়। এরা সেই সব শহীদ, যারা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ১৬ বছর আগে শ্রীনগরে শহীদ হয়েছিলেন। আফসোস, আজ পাকিস্তান সরকারের কিছু মুসলিম লীগ মন্ত্রী দাবি করেন যে, তারা আজাদ কাশ্মিরের অধিবাসীদের পুরোপুরি কাশ্মিরি মনে করেন না। কারণ তাদের সংগ্রাম অধিকৃত কাশ্মিরের মানুষের চেয়ে কম। তাদের ভাষাও ভিন্ন।

১৯ জুলাই, ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের সাথে অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব অনুমোদনকারীদের দীর্ঘ তালিকায় শ্রীনগর থেকে জম্মু এবং মিরপুর থেকে মোজাফফরাবাদ পর্যন্ত রাজ্যের প্রতিটি অঞ্চলের প্রতিনিধিত্বের দিকে লক্ষ্য করুন, এতে প্রতিটি ভাষাভাষী মানুষ অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। ১৩ জুলাই কাশ্মিরি শহীদ দিবস শুধু শ্রীনগরেই নয়, রাওলাকোট ও বাগ থেকে শুরু করে নিলম উপত্যকা ও জম্মুতেও পালন করা হয়।

কাশ্মিরিদের ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞ পাকিস্তানের অযোগ্য শাসকগোষ্ঠী যেন ভুলে না যায় যে, ১৯৮৭ সালে অধিকৃত জম্মু-কাশ্মিরের রাজ্য নির্বাচনে কারচুপিই ভারত সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধের জন্ম দিয়েছিল। শ্রীনগর থেকে সৈয়দ ইউসুফ শাহ নামে একজন প্রার্থীর সাথে কারচুপি করা হলে, তিনি সশস্ত্র প্রতিরোধকারীদের জন্য সৈয়দ সালাহুদ্দিনরূপে আবির্ভূত হন। ভারত সরকার অধিকৃত জম্মু-কাশ্মিরে যে ভুল করেছিল, সেই একই ভুল যেন আজাদ কাশ্মিরে করা না হয়। শক্তির ব্যবহার কাশ্মিরে আরো বেশি বিদ্রোহের জন্ম দেবে। বিশ্বাস না হলে সৈয়দ সালাহুদ্দিনকে জিজ্ঞাসা করুন। নির্বাচনে কারচুপি আরো বেশি প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। লাখ লাখ কাশ্মিরি শহীদের দোহাই দিয়ে বলছি, আজাদ কাশ্মিরে জোরজুলুম ও কারচুপির পথ বেছে নেবেন না।

লেখক: হামিদ মীর, পাকিস্তানের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কলামিস্ট পাকিস্তানের উর্দু দৈনিক জং থেকে ভাষান্তর: ইমতিয়াজ বিন মাহতাব

কাশ্মীরে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ এবং বিদ্রোহী তৎপরতা চলছে
কাশ্মীরে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ এবং বিদ্রোহী তৎপরতা চলছে। ছবি: বিবিসি

Monday, July 13, 2026

পূর্ণাঙ্গ রাজ্যের দাবি কি ট্রাম্পের কাছে জানাব: মোদি সরকারকে ওমর আবদুল্লাহর প্রশ্ন

নির্বাচনের পর দুই বছর কেটে গেছে অথচ কেন্দ্রীয় সরকার এখনো প্রতিশ্রুতিমতো জম্মু–কাশ্মীরকে পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা দেয়নি। দাবি আদায়ে জম্মু–কাশ্মীরের শাসক দল ন্যাশনাল কনফারেন্স তাই এবার দিল্লি অভিযানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ২০ জুলাই সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশন যেদিন বসার কথা, ন্যাশনাল কনফারেন্স নেতা ও জম্মু–কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ সেদিন সদলে দিল্লিতে আন্দোলন শুরু করবেন। গতকাল রোববার জম্মুতে এক জনসভায় তিনি এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন।

জম্মু শহরে মহারাজা হরি সিং পার্কের ওই জনসভায় ওমর আবদুল্লাহ তাঁদের আন্দোলনকে দিল্লি নিয়ে আসার সিদ্ধান্তের কথা জানানোর পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি কটাক্ষ করে বলেন, ‘নির্বাচনের পর দুই বছর কেটে গেল। এখনো সরকার তার প্রতিশ্রুতি পালন করল না। অথচ সেই কবে থেকে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিজেপি নেতারা বলে চলেছেন, ঠিক সময়ে পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়া হবে। এই প্রতিশ্রুতি তাঁরা সংসদেও দিয়েছিলেন।’

এরপরই ওমর আবদুল্লাহর প্রশ্ন, ‘দাবি আদায়ে আমাদের কি তাহলে এবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে যেতে হবে? বিজেপি বলে দিক, দিল্লি না গিয়ে আমরা কি তবে এবার হোয়াইট হাউসের সামনে ধরনায় বসব?’

জম্মু–কাশ্মীর রাজ্য দ্বিখণ্ডিত হয়েছিল ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট। সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ খারিজও সেই দিনে। সেই থেকে জম্মু–কাশ্মীর ও লাদাখ দুটি পৃথক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল। যদিও বিজেপিশাসিত কেন্দ্রীয় সরকার বলেছিল, জম্মু–কাশ্মীরকে ঠিক সময়ে রাজ্যের মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়া হবে।

পাঁচ বছর পর ২০২৪ সালে জম্মু–কাশ্মীর বিধানসভার নির্বাচন হয়। নির্বাচনী প্রচারে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বারবার রাজ্যের হৃত মর্যাদা ফেরানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সেই প্রতিশ্রুতি এমনকি ভারতীয় সংসদেও দেওয়া হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টকেও সরকারের পক্ষে বলা হয়েছে, ঠিক সময়ে রাজ্যের মর্যাদা ফেরানো হবে। সেই থেকে সাত বছর অতিক্রান্ত। অথচ এখনো সেই প্রতিশ্রুতি পালন করেনি মোদি সরকার।

জনসভায় বিশাল এক ব্যানার লাগানো হয়েছিল। তাতে লেখা, ‘দিল্লি চলো। আমরা আমাদের রাজ্য ফেরত পেতে চাই’। আরও ব্যানারে লেখা ছিল, ‘আমাদের রাজ্য আমাদের গর্ব, আমাদের রাজ্য আমাদের হক’।

মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ বলেন, ‘আমাদের অপেক্ষা, আমাদের নীরবতাকে ওরা দুর্বলতা ভাবছে। ওরা আমাদের ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছে। আমরা দুর্বল নই। আমরা ধৈর্যের শেষ সীমায় পৌঁছে গেছি।’

জম্মু–কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘কেন্দ্রকে আমরা অনেক সময় দিয়েছি। দুই বছর ধরে নানাভাবে কথা বলেছি। বিভিন্ন উপায়ের খোঁজ করেছি। আর নয়। এবার অন্য কৌশল নিতে হবে। দিল্লি গিয়ে ধরনা দিতে হবে। ২০ জুলাই থেকে সেই নতুন অধ্যায় শুরু হবে।’

ওমর আবদুল্লাহ আরও বলেন, এই দাবি শুধু ন্যাশনাল কনফারেন্সের নয়; এই দাবি সবার। এমনকি বিজেপিরও। তারাও এই দাবি পূরণ হবে বলে ভোট চেয়েছিল। একজন বিজেপি নেতাকেও পাওয়া যাবে না, যিনি রাজ্যের বিরোধিতা করেছিলেন।

ওমর বলেন, ‘যতবার রাজ্যের কথা জানিয়েছি, প্রতিবার শুনেছি, ঠিক সময়ে তা দেওয়া হবে।’ তাঁর প্রশ্ন, সেই ঠিক সময়টা কবে আসবে? তাহলে কি তারা বিজেপির ক্ষমতায় আসার জন্য অপেক্ষায় রয়েছে? তা–ই যদি হয়, তাহলে সেটা তারা স্পষ্ট করে জানাক।’

জম্মু–কাশ্মীর বিধানসভার বিরোধী নেতা বিজেপির সুনীল শর্মা গতকাল এ প্রসঙ্গে বলেন, সরকার পরিচালনায় ব্যর্থতা ঢাকতেই মুখ্যমন্ত্রী নতুন এই পথে হাঁটতে চলেছেন।

ওমর আবদুল্লাহ সম্প্রতি অভিযোগ করেছেন, বিজেপি তাঁর সরকার ফেলে দেওয়ার চক্রান্ত করছে। বলেছেন, তাঁর দলের শীর্ষ নেতাদের ভাঙিয়ে নিতে একেকজনকে ২০ থেকে ৩০ কোটি টাকার টোপ দিয়েছে।

গত শনিবারও মুখ্যমন্ত্রী বলেন, তাঁর দলের এক বিধায়ককে ৩০ কোটি টাকা দেবে জানিয়ে বিজেপি বলেছে, দল ত্যাগ করলে মন্ত্রী করবে এবং বিজেপি ক্ষমতায় এলে রাজ্যের মর্যাদাও ফিরিয়ে দেওয়া হবে।

ওমর বলেন, এমন একজন ওই প্রস্তাব দিয়েছেন, যিনি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী। কিন্তু একজন বিধায়ককেও ওরা পাবে না। ২০ থেকে ৩০ কোটি কেন, ১০০ কোটি দিলেও কেউ দল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেবেন না।

গত নির্বাচনে জম্মু–কাশ্মীর বিধানসভায় ৯০ আসনের মধ্যে ন্যাশনাল কনফারেন্স ৪২ ও কংগ্রেস ৬ আসনে জয়ী হয়। এই জোটের সঙ্গে ছিল সিপিএমও। তারা ১টি আসন জেতে। ৪৯ আসন জিতে সরকার গড়েন ওমর আবদুল্লাহ। বিজেপি জেতে ২৯ আসন। মেহবুবা মুফতির পিডিপি মাত্র ৩টি আসনে জয়ী হয়েছিল।

ওমর আবদুল্লাহর আশঙ্কা, পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার পর বিজেপি এবার নজর দিয়েছে জম্মু–কাশ্মীরের ওপর। তাঁদের দল ভাঙিয়ে বিজেপি ক্ষমতায় আসতে চাইছে। রাজনৈতিক মহলের ধারণা, রাজ্যের দাবিতে ওমরের দিল্লি অভিযানের সিদ্ধান্ত বিজেপির সেই উদ্যোগ রোখা ও দলকে জোটবদ্ধ রাখা।

শ্রীনগরের হজরত বাল মসজিদে এক অনুষ্ঠানে মোনাজত করছেন জম্মু–কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ। ১১ জুলাই ২০২৬, শ্রীনগর
শ্রীনগরের হজরত বাল মসজিদে এক অনুষ্ঠানে মোনাজত করছেন জম্মু–কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ। ১১ জুলাই ২০২৬, শ্রীনগর। ছবি: এএনআই

Sunday, July 12, 2026

জনপ্রতি ৩০ কোটি রুপির প্রলোভন দিয়েছিল বিজেপি, আদর্শ বিক্রি করেননি ওমর আবদুল্লাহ

ভারত অধিকৃত জম্মু ও কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ অভিযোগ করেছেন, তার দল ন্যাশনাল কনফারেন্সের (এনসি) বিধায়কদের দলত্যাগে রাজি করাতে বিজেপি ২০-৩০ কোটি রুপি, মন্ত্রিত্ব এবং রাজ্যের মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল।

গতকাল শনিবার কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগরের কাছে হজরতবালে আয়োজিত ন্যাশনাল কনফারেন্সের এক সমাবেশে ওমর আবদুল্লাহ এ অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, তার দলকে ভাঙতে নতুন করে তৎপরতা শুরু হয়েছে। বিজেপির ঘনিষ্ঠ সুপ্রিম কোর্টের এক আইনজীবী এনসির এক বিধায়কের কাছে দলত্যাগের বিনিময়ে ২০-৩০ কোটি রুপি, মন্ত্রিত্ব এবং জম্মু ও কাশ্মীরের রাজ্যের পুনর্বহালের আশ্বাস দেন।

ওমর বলেন, ‘আল্লাহ সাক্ষী, আমার জম্মুর একজন বিধায়ক এসে আমাকে বিষয়টি জানিয়েছেন।’ তার ভাষায়, যখন অর্থের লোভ দেখিয়ে কাজ হলো না, মন্ত্রিত্বের প্রলোভনও ব্যর্থ হলো, তখন বিধায়কদের বলা হচ্ছেÑ‘আমাদের সঙ্গে আসুন, আমরা আপনাদের রাজ্যের মর্যাদা ফিরিয়ে দেব।’

ওমর আবদুল্লাহ জোর দিয়ে বলেন, ন্যাশনাল কনফারেন্সের কোনো বিধায়কই টাকার বিনিময়ে নিজের আদর্শ বিক্রি করবেন না। একই সঙ্গে তিনি কেন্দ্র সরকার ও বিজেপিকে সতর্ক করে বলেন, ‘আমাদের ধৈর্য ও ভদ্রতার পরীক্ষা নেবেন না।’

তিনি জানান, জম্মু ও কাশ্মীরের পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি তিনি একাধিকবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং অন্যান্য কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেছেন। কিন্তু প্রতিবারই তাকে বলা হয়েছে, ‘উপযুক্ত সময়ে’ এ মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়া হবে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘খোদার দোহাই, আমাদের বলুন সেই উপযুক্ত সময়টি কবে আসবে?’

ওমর আবদুল্লাহর এ মন্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন জম্মু ও কাশ্মীরের সাংবিধানিক মর্যাদা পুনর্বহালের দাবিতে কেন্দ্রের ওপর রাজনৈতিক চাপ আবার বাড়ছে। ২০১৯ সালের আগস্টে ভারতীয় সংসদ সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করার পর জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যকে ভেঙে জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখ নামে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভাগ করা হয়।

২০২৩ সালের ডিসেম্বরে সুপ্রিম কোর্ট ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের সিদ্ধান্ত বহাল রাখলেও কেন্দ্র সরকারের দেওয়া এই আশ্বাস নথিভুক্ত করে যে, ‘উপযুক্ত সময়ে’ জম্মু ও কাশ্মীরকে পুনরায় রাজ্যের মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়া হবে।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় ন্যাশনাল কনফারেন্স স্টেটহুড পুনর্বহালের দাবিতে তাদের আন্দোলন জোরদার করেছে। এ দাবির সমর্থনে দলটি আগামী ২০ জুলাই দিল্লির যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করবে। তাদের দাবি, জম্মু ও কাশ্মীরে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা এবং প্রকৃত ফেডারেল জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা পুনর্বহাল অপরিহার্য।

জনপ্রতি ৩০ কোটি রুপির প্রলোভন দিয়েছিল বিজেপি, আদর্শ বিক্রি করেননি ওমর আবদুল্লাহ
মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ

Monday, June 22, 2026

কাশ্মীরের জেলবন্দী সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার রশিদ পদত্যাগ করতে চান

ভারতনিয়ন্ত্রিত জম্মু–কাশ্মীরের জেলবন্দী সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার রশিদ পদত্যাগ করতে চাইছেন। বছরের পর বছর বন্দী থাকার জন্য সংসদ সদস্যের দায়িত্বপালনে অপারগ রশিদ দলের কাছে এই ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।

রশিদ বলেছেন, বন্দী থাকার কারণে তিনি সংসদ সদস্যের দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না। এলাকার জনতার আশা–আকাঙ্ক্ষা মেটাতে পারছেন না। তাঁদের অভাব–অভিযোগের কথা সংসদে বলতে পারছেন না। প্রতিকার করতে ব্যর্থ হচ্ছেন। কাজেই তিনি সংসদ সদস্য পদ ত্যাগ করতে চান।

রশিদের অনুরোধ দল বিবেচনা করে দেখবে জানিয়েছে। সে জন্য দলের শীর্ষ নেতাদের বৈঠক ডাকা হয়েছে। দুই দিন ধরে সেই বৈঠক চলবে। তার পর দল সিদ্ধান্ত নেবে।

রশিদের দল আওয়ামি ইত্তেহাদ পার্টি (এআইপি) এক বিবৃতিতে এ কথা জানিয়েছে। রশিদ এআইপির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা।

৫৮ বছর বয়সী ইঞ্জিনিয়ার রশিদের আসল নাম শেখ আবদুল রশিদ। কিন্তু কাশ্মীর উপত্যকায় তিনি ইঞ্জিনিয়ার রশিদ নামেই পরিচিত। বিএসসি পাস করার পর তিনি সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিপ্লোমা পান এবং জম্মু–কাশ্মীর প্রোজেক্টস কনস্ট্রাকশন কর্পোরেশনে এক দশক ধরে কাজ করেন। সেই কারণেই তিনি পরিচিত হন ইঞ্জিনিয়ার রশিদ নামে। কিশোর বয়সে তিনি যোগ দিয়েছিলেন আবদুল গণি লোনের দল পিপলস কনফারেন্সে। বিচ্ছিন্নতাবাদী হওয়ার অভিযোগে তাঁকে প্রথম গ্রেপ্তার করা হয়েছিল ২০০৫ সালে। সাড়ে তিন মাস জেল খাটার পর মুক্তি পান।

রশিদ ২০০৮ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত জম্মু–কাশ্মীর বিধানসভার সদস্য ছিলেন।

২০১৯ সালের আগস্ট মাসে ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের পর তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। ইউএপিএ আইনে তিনি বন্দী। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অর্থ সাহায্য করেছিলেন। সেই থেকে সাত বছর তিনি বন্দী।

বন্দী থাকা অবস্থাতেই রশিদ এআইপি প্রতিষ্ঠা করেন। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বারামুল্লা কেন্দ্র থেকে তিনি দলের প্রার্থী হন। লক্ষাধিক ভোটে হারিয়ে দেন ন্যাশনাল কনফারেন্স নেতা ওমর আবদুল্লাহকে।

ওই নির্বাচনে বিজেপি চেয়েছিল জম্মু–কাশ্মীরের ক্ষমতা দখল করতে। সে জন্য প্রথমে জম্মু–কাশ্মীরকে দ্বিখণ্ডিত করা হয়। রাজ্যের মর্যাদা কেড়ে নিয়ে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করা হয়। বিধানসভা ও লোকসভা কেন্দ্রগুলোর সীমানা পুনর্নির্ধারণ বা ডিলিমিটেশন করা হয়, যাতে মুসলমানপ্রধান কাশ্মীর উপত্যকার সঙ্গে হিন্দুপ্রধান জম্মুর আসনের তারতম্য কমে যায়। ওই ভোটে জিততে বিজেপি উপত্যকার ন্যাশনাল কনফারেন্স ও পিডিপির দলত্যাগী নেতাদের নিয়ে ‘জম্মু–কাশ্মীর আপনি পার্টি’ নামে নতুন এক রাজনৈতিক দল গড়তেও সাহায্য করে। ভোটে তাঁদের মদদও দেয়। ইঞ্জিনিয়ার রশিদের দলকেও কেন্দ্রীয় সরকার নানাভাবে মদদ দিয়েছিল। ভোটে প্রচারের জন্য কেন্দ্রীয় সরকার রশিদের জামিনের বিরোধিতা করেনি। যদিও বিজেপির লক্ষ্য পূরণ হয়নি। উপত্যকা দখলে রেখে কংগ্রেস ও বামপন্থীদের সহায়তায় ন্যাশনাল কনফারেন্স সরকার গড়ে। মুখ্যমন্ত্রী হন ওমর আবদুল্লাহ। ইঞ্জিনিয়ার রশিদকেও আবার ফেরত পাঠানো হয় দিল্লির তিহার জেলে।

রশিদের ইচ্ছাকে গুরুত্ব দিতে বারামুল্লা সংসদীয় ক্ষেত্রের অন্তর্গত ১৮টি বিধানসভা কেন্দ্রের দলীয় নেতাদের সঙ্গে এআইপি বৈঠক করেছে। এবার দলের শীর্ষস্থানীয় কমিটি দুই দিন ধরে প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করবে।

রশিদ ইস্তফা দিলে বারামুল্লা কেন্দ্রে উপনির্বাচন হবে। তাতে এআইপির জয়ের সম্ভাবনা কতটা, সেটাই হবে মুখ্য বিচার্য।

ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু–কাশ্মীরের জেলবন্দী সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার রশিদ
ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু–কাশ্মীরের জেলবন্দী সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার রশিদ। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া

Wednesday, March 4, 2026

কাশ্মীর নিয়ে ইরান কীভাবে ভারতকে বাঁচিয়েছিল by সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথভাবে ইরান আক্রমণ ও সে দেশের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা নিয়ে নয়াদিল্লির ‘অস্বস্তিকর’ নীরবতায় নরেন্দ্র মোদি সরকারের কড়া সমালোচনা করেছেন কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী। সর্বভারতীয় ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ পত্রিকায় আজ মঙ্গলবার প্রকাশিত এক নিবন্ধে সোনিয়া লিখেছেন, আন্তর্জাতিক আলোচনা চলাকালীন এক ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যা সমসাময়িক আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাসে এক গভীর ও গুরুতর ফাটল।

খামেনিকে হত্যা এবং ইরানের সার্বভৌমত্বের প্রতি নির্বিচার আক্রমণ নিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এখনো শোকপ্রকাশ করেননি। সামরিক হানার নিন্দাও করেননি। এই নীরবতার সমালোচনা করতে গিয়ে সোনিয়া ওই নিবন্ধে মনে করিয়ে দিয়েছেন, পাকিস্তান যখন ১৯৯৪ সালে ইসলামি সহযোগিতা সংস্থাকে (ওআইসি) জোটবদ্ধ করে কাশ্মীর প্রশ্নে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনে ভারতের বিরুদ্ধে প্রস্তাব আনার উদ্যোগ নিয়েছিল, এই ইরানই তখন ভারতের পাশে দাঁড়িয়ে তা বানচাল করে দিয়েছিল। কাশ্মীর সমস্যার আন্তর্জাতিকীকরণ ঠেকাতে ইরান সেদিন ত্রাতার ভূমিকা নিয়েছিল। তাদের সেই ভূমিকা ছিল অতীব তাৎপর্যপূর্ণ।

সেই ইরানের রাষ্ট্রপ্রধানের হত্যার নিন্দা তো দূরের কথা, ভারতের প্রধানমন্ত্রী এখনো শোক জ্ঞাপন পর্যন্ত করেননি। এই নীরবতা সোনিয়া গান্ধীকে বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ করেছে। তিনি মনে করিয়ে দিতে চেয়েছেন, গ্লোবাল সাউথের প্রতিনিধি হিসেবে নিজেকে তুলে ধরা ভারত যদি কোনো দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন বিনা প্রতিবাদে মেনে নেয়, বিধিনির্ভর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার পক্ষে কথা বলেও ঠিক মুহূর্তে যদি বৃহৎ শক্তির জবরদস্তির বিরুদ্ধে সরব না হয়, তা হলে অন্যদের কাছেও ভারত তার বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে। আস্থা হারাবে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর।

সোনিয়া খুবই সংক্ষেপে ১৯৯৪ সালের ভারতীয় কূটনীতির জয়ের প্রসঙ্গ টানলেও সে সময় যা ঘটেছিল, তা রীতিমতো থ্রিলার। ভারতীয় কূটনৈতিক সাফল্যের সে ছিল এক অভিনব দৃষ্টান্ত।

তার ঠিক আগের বছর দ্বিতীয়বারের জন্য পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছিলেন বেনজির ভুট্টো। ১৯৯৪ সালে তিনি উদ্যোগী হন ওআইসিকে জোটবদ্ধ করে কাশ্মীরে মানবাধিকার হরণ ও লঙ্ঘন নিয়ে এক প্রস্তাব গ্রহণ করে তা জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনে পেশ করার। প্রস্তাবটি পাস হলে বহু দশক পর কাশ্মীর সমস্যা আরও একবার আন্তর্জাতিক আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে উঠত। আলোচিত হতো জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী তখন নরসিমা রাও। দুই বছর আগে বাবরি মসজিদ ধ্বংস ঠেকাতে না পেরে তিনি তখন সমালোচনার কেন্দ্রে। বেহাল অর্থনীতি সামাল দিতে সোনা বন্ধক রাখা ভারত তখনো টালমাটাল। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর চিরবন্ধু রাশিয়াও তখন থিতু নয়। এ অবস্থায় নরসিমা রাও বাজি ধরেছিলেন ইরানের ওপর। তিনি বুঝেছিলেন, ইরান রাজি না হলে সর্বসম্মতির অভাবে ওআইসি প্রস্তাব গ্রহণ করতে পারবে না। সে ক্ষেত্রে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনেও প্রস্তাবটি পেশ হবে না। কাশ্মীরের আন্তর্জাতিকীকরণের পাকিস্তানি স্বপ্ন অধরা থেকে যাবে।

নয়াদিল্লির ইরান দূতাবাস পর্যন্ত নরসিমা রাওয়ের এই প্রচেষ্টা আন্দাজ করতে পারেনি। এর মাত্র কয়েক দিন আগেই ইরানের রাষ্ট্রদূত কাশ্মীরের হুরিয়ৎ নেতাদের আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, ওআইসিতে প্রস্তাব পাস করাতে ইরান যথাসাধ্য করবে। নরসিমা রাও কীভাবে অসাধ্য সাধন করেছিলেন, কাদের সাহায্য তিনি নিয়েছিলেন, রাষ্ট্রীয় স্বার্থে বরেণ্য নেতারা কীভাবে জোটবদ্ধ হয়েছিলেন এবং অসুস্থ শরীর নিয়ে সবার অলক্ষে কীভাবে কয়েক ঘন্টার জন্য তেহরান ঘুরে দিল্লি ফিরে এসেছিলেন তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীনেশ সিং, সেই রোমহর্ষ কাহিনি টুকরা টুকরাভাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে অভিষেক চৌধুরীর লেখা অটল বিহারি বাজপেয়ীর জীবনী ‘দ্য বিলিভার্স ডিলেমা’য়। ইরানবিশেষজ্ঞ সাবেক ভারতীয় রাষ্ট্রদূত এম কে ভদ্রকুমারও সেই থ্রিলার স্মৃতিচারণা করেছেন।

নরসিমা রাও যখন ঠিক করলেন, ওআইসিকে ঠেকাতে একমাত্র ইরানই হতে পারে তুরুপের তাস, সেই সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীনেশ সিং অসুস্থ অবস্থায় দিল্লির অল ইন্ডিয়া মেডিক্যাল সায়েন্সেসে (এইমস) ভর্তি। ১৯৯৪ সালের মার্চ মাস। দিল্লিতে শীতের কামড়ের তীব্রতা কমলেও তেহরান তখনো বরফের চাদরের তলায়। সেই তীব্র ঠান্ডায় কাকপক্ষীকে জানতে না দিয়ে এইমস থেকে স্ট্রেচারে শুইয়ে বের করা হয় দীনেশ সিংকে। সেনা বাহিনীর বিশেষ বিমানে তিনি তেহরান পৌছান। হুইলচেয়ারে বসিয়ে তাঁকে নামিয়ে আনা হয় বিমান থেকে। সফরসঙ্গী একজন চিকিৎসক ও তিনজন সহযোগী। ‘মিশন সাকসেসফুল’ হওয়ার অনেক পরে জানা গিয়েছিল, কৌতূহলী ব্যক্তিদের নজর এড়াতে দিল্লির এইমস হাসপাতালে দীনেশ সিংয়ের বিছানায় সেদিন অন্য একজনকে শুইয়ে রাখা হয়েছিল।

দীনেশ সিংকে স্বাগত জানাতে তেহরান বিমানবন্দরে প্রটোকল ভেঙে হাজির হয়েছিলেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলী আকবর বেলায়েতি। হুইলচেয়ারবন্দী দীনেশ সিংকে দেখে বিস্মিত তিনি সফরের কারণ জানতে চাইলে স্মিত হেসে দীনেশ তাঁর হাতে প্রেসিডেন্ট আলী আকবর হাসেমি রাফসানজানিকে লেখা প্রধানমন্ত্রী নরসিংহ রাওয়ের ব্যক্তিগত অনুরোধপত্রটি তুলে দিয়েছিলেন।

এর পরের কয়েক ঘণ্টা ধরে প্রেসিডেন্ট রাফসানজানি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী বেলায়েতি ও ‘মজলিস’–এর (পার্লামেন্ট) স্পিকার নাতেক নৌরির কাছে কাশ্মীর পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেছিলেন দীনেশ সিং। সন্ধ্যায় দিল্লি ফেরার আগে প্রেসিডেন্ট রাফসানজানি তাঁর ইতিবাচক মনোভাবের কথা দীনেশ সিংকে জানিয়ে দিয়েছিলেন। দিল্লি এয়ারপোর্ট থেকে দীনেশ সোজা ফিরে গিয়েছিলেন এইমসে, প্রধানমন্ত্রী নরসিংহ রাওকে আশ্বস্ত করে। ভদ্রকুমারের কথায়, দীনেশকে রাফসানজানি বলেছিলেন, ভারতের যাতে কোনো ক্ষতি না হয়, ইরান তা নিশ্চিত করবে।

পরের ৭২ ঘণ্টা ছিল টেনশনে ভরা। অবশেষে জানা যায়, ওআইসির প্রস্তাব ঠেকিয়ে দিয়েছে ইরান। পাকিস্তানের প্রস্তাব পেশের সময় ইরান বাধা দেয়। ইরানি প্রতিনিধি জানান, তাঁরা ভারত ও পাকিস্তান দুই দেশেরই বন্ধু। তাঁরা চান বিবাদের মীমাংসা নিজেদের আলোচনার মধ্য দিয়েই হওয়া উচিত। ঔপনিবেশিক শক্তিদের মধ্যস্থতার সুযোগ দেওয়া ঠিক নয়।

সেই তেহরানযাত্রা ছিল দীনেশ সিংয়ের শেষ বিদেশ সফর। পরের বছরের নভেম্বরে ৭০ বছর বয়সে তিনি মারা যান। নরসিমা রাও অন্য খেলাও খেলেছিলেন। বাবরি মসজিদ ধ্বংস নিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতবিরোধীরা তখন সক্রিয়। রাষ্ট্রীয় স্বার্থে রাজনৈতিক বিবাদ ও বিভেদ ভুলে ভারত যে এককাট্টা, তা বোঝাতে জাতিসংঘের প্রতিনিধিদলের নেতা হিসেবে রাও বেছে নিয়েছিলেন বিরোধী দল বিজেপির শীর্ষ নেতা অটলবিহারি বাজপেয়ীকে। তাঁর সঙ্গে প্রতিনিধিদলে ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সালমন খুরশিদ, জম্মু–কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ফারুক আবদুল্লাহ এবং অর্থমন্ত্রী মনমোহন সিং। জাতিসংঘকে রাও এই বার্তাই দিতে চেয়েছিলেন, ভারতীয় গণতন্ত্র বিরুদ্ধস্বর রোধ করে না। প্রত্যেককে সম্মান দেওয়া হয়। এমনকি কাশ্মীরিদের আওয়াজকেও।

জাতিসংঘের আসরে ফারুক আবদুল্লাহর ভাষণ ছিল জ্বালাময়ী। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোর প্রতি ইঙ্গিত করে আবেগ মিশিয়ে তিনি বলেছিলেন, তাঁকে (বেনজির) কাশ্মীরে আসতে হবে আমার মৃতদেহ ডিঙিয়ে। শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে আমি কাশ্মীর রক্ষা করে যাব।

পাকিস্তানের মদদপ্রাপ্ত সশস্ত্র জঙ্গিদের উদ্দেশে হুংকার দিয়ে তিনি বলেছিলেন, তোমরাই আমাদের সুন্দর দেশকে মৃত্যু উপত্যকা করে তুলেছ। ‘দ্য বিলিভার্স ডিলেমা’য় অভিষেক লিখেছেন, অলৌকিকভাবে ভারতকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল ইরান। তাদের আপত্তিতে কাশ্মীর নিয়ে ওআইসি সর্বসম্মত হতে পারল না। হতচকিত ও বিহ্বল পাকিস্তান প্রস্তাবটি প্রত্যাহার করে নেয়। ভোটাভুটির প্রশ্নই আর থাকল না।

সেই ভারত ও আজকের ভারতে আসমান–জমিন ফারাক।

আজকের ইরান থেকে ভারতের মুখ ফিরিয়ে থাকা বিস্মিত করেছে সোনিয়া গান্ধীকে। ১৯৯৪ সালে ইরানের ভূমিকা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, নীরবতার অর্থ দায়িত্ব এড়ানো। অথচ ভারত চেয়েছিল বিশ্ব বিবেকের কণ্ঠস্বর হতে!

ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট আকবর হাশেমি রাফসানজানি
ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট আকবর হাশেমি রাফসানজানি। ছবি: রয়টার্স

Saturday, January 31, 2026

হিন্দুত্ববাদ কাশ্মীরকে যেভাবে গ্রাস করে ফেলছে by জাওয়াদ খালিদ

হিন্দুত্ববাদের ছায়া ধীরে ধীরে কাশ্মীরে নেমে আসছে। সম্প্রতি মসজিদ ও মাদ্রাসাগুলোর ওপর অধিক নজরদারি, আর মুসলিম শিক্ষার্থী-অধ্যুষিত একটি মেডিকেল কলেজ বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত এ বাস্তবতারই ইঙ্গিত দেয়।

কাশ্মীরে যা ঘটছে, তা আলাদা কোনো ঘটনা নয়। এটি ভারতের মুসলমানদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা একটি পরিকল্পিত প্রক্রিয়ার অংশ, যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক ইসলামবিদ্বেষের মাধ্যমে তাদের ধীরে ধীরে বঞ্চিত ও কোণঠাসা করা হচ্ছে। গত ১০ বছরে ভারতের রাজনীতি ও সমাজে হিন্দুত্ববাদের প্রভাব এতটাই গভীর হয়েছে যে দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামো এখন এর শিকার।

ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থাকে গেরুয়াকরণ করার চেষ্টা নতুন নয়। তবে ভারতীয় জনতা পার্টি রাষ্ট্রক্ষমতা ও গণমাধ্যমের বড় অংশের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার পর এই প্রক্রিয়া নজিরবিহীন গতি পেয়েছে। গেরুয়াকরণ বা হিন্দুকরণ কখনোই ইসলামবিদ্বেষ থেকে আলাদা নয়; এটি সরাসরি মুসলমানদের প্রান্তিককরণের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।

বারবার স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে দেশের সবচেয়ে বড় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর জন্য শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান আর রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার নয়। গরু রক্ষা নামের সহিংসতা, লাভ জিহাদ ও ল্যান্ড জিহাদের মতো ষড়যন্ত্র তত্ত্ব, মসজিদ ভাঙা, প্রকাশ্য গণপিটুনি কিংবা দরিদ্র মুসলিম মহল্লায় বুলডোজার চালানো—সব ক্ষেত্রেই হিন্দুত্ববাদের ঘৃণার রাজনীতির প্রধান লক্ষ্য মুসলমানরাই।

এখন এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় আঘাত গিয়ে পড়ছে কাশ্মীরি মুসলমানদের ওপর। ভারতের অন্য অঞ্চলের তুলনায় কাশ্মীরে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও ভয়, আতঙ্ক ও বর্জনের রাজনীতির মাধ্যমে তাদেরও সন্দেহভাজন ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীতে পরিণত করার চেষ্টা চলছে। সম্প্রতি জম্মু ও কাশ্মীর পুলিশ উপত্যকাজুড়ে মসজিদ ও মাদ্রাসাগুলোকে লক্ষ্য করে একটি অনধিকারমূলক অভিযান শুরু করেছে। বহু পৃষ্ঠার ফরম বিতরণ করে ইমাম, ধর্মশিক্ষক ও মসজিদ পরিচালনা কমিটির লোকদের ব্যক্তিগত ও আর্থিক তথ্য চাওয়া হচ্ছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, এটি সন্ত্রাসবিরোধী পদক্ষেপ। কিন্তু কাশ্মীরের অনেক মানুষের কাছে মনে হচ্ছে, এটি নিরাপত্তার চেয়ে সামষ্টিক সন্দেহ আর নজরদারির হাতিয়ার।

ধর্মীয় নেতা, নাগরিক সমাজের সংগঠন ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা এই পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, এটি ধর্মীয় স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘন করে। উপাসনালয় ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে নজরদারির আওতায় আনা পুরো সম্প্রদায়ের কাছে একটি বার্তা দেয় যে তাদের বিশ্বাস ও উপাসনার স্থান রাষ্ট্রের চোখে সন্দেহের বিষয়।

জম্মুর শ্রী মাতা বৈষ্ণো দেবী ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল এক্সেলেন্স বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনা বঞ্চনার আরেকটি গভীরভাবে উদ্বেগজনক দিক তুলে ধরেছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রথম এমবিবিএস ব্যাচে ভর্তি হওয়া ৫০ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৪২ জনই ছিলেন মুসলিম। তাঁরা সবাই ভারতের জাতীয় ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে পুরোপুরি মেধার ভিত্তিতে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। কিন্তু এরপর ডানপন্থী উগ্র গোষ্ঠীগুলো বিক্ষোভ শুরু করে। তাদের দাবি ছিল, একটি হিন্দু তীর্থস্থানের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানের সুবিধা নেওয়ার কোনো অধিকার মুসলমানদের নেই। এর কিছুদিন পর জাতীয় মেডিকেল কমিশন অবকাঠামোগত ঘাটতির অজুহাতে কলেজটির স্বীকৃতি বাতিল করে দেয়।

এই ঘটনাগুলো একসঙ্গে দেখলে স্পষ্ট হয়, মুসলমানদের জীবন ও সাফল্যকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণযোগ্য সমস্যা হিসেবে দেখা হচ্ছে। কাশ্মীরে এই বাস্তবতা আরও তীব্র। কারণ, অঞ্চলটি আগেই তল্লাশি অভিযান, চেকপোস্ট ও সার্বক্ষণিক নজরদারির ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।

২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে জাতিসংঘের মানবাধিকার–বিশেষজ্ঞরা জম্মু ও কাশ্মীরে ভারতের সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের বিষয়ে গুরুতর সতর্কবার্তা দেন। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে পেহেলগামে হামলার পর প্রায় ২ হাজার ৮০০ জনকে আটক করা হয়। তাঁদের মধ্যে সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মীরাও ছিলেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে নির্বিচারে গ্রেপ্তার, নির্যাতন, বিচার ছাড়াই দীর্ঘ সময় আটক, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া, বাড়িঘর ভেঙে ফেলা এবং ভারতের বিভিন্ন স্থানে কাশ্মীরি শিক্ষার্থীদের হয়রানির তথ্য উঠে আসে।

কাশ্মীর ক্রমেই সারা ভারতের হিন্দুত্ববাদী প্রবণতার প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠছে। সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব সোসাইটি অ্যান্ড সেক্যুলারিজমের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বেড়েছে ৮৪ শতাংশ। এসব সহিংসতায় নিহত ব্যক্তিদের বড় অংশই ছিলেন মুসলমান। ওই বছর নথিভুক্ত ৫৯টি সাম্প্রদায়িক সহিংসতার মধ্যে ৪৯টিই ঘটেছে বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোতে। ২০০৯ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে ধর্মভিত্তিক ঘৃণাজনিত অপরাধের প্রায় ৯০ শতাংশই ঘটেছে ২০১৪ সালে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর।

ঘৃণামূলক বক্তব্যের ক্ষেত্রেও একই ধারা দেখা যাচ্ছে। ইন্ডিয়া হেট ল্যাবের তথ্য অনুযায়ী, শুধু ২০২৫ সালেই ১ হাজার ৩০০টির বেশি ঘৃণামূলক ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর বেশির ভাগই ঘটেছে বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোতে এবং মূল লক্ষ্য ছিল মুসলমান ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়। গরু রক্ষার নামে সন্ত্রাসী দল, বুলডোজার দিয়ে শাস্তি দেওয়া এবং নাগরিকত্ব ও ধর্মান্তর–সংক্রান্ত বৈষম্যমূলক আইন সমষ্টিগত শাস্তি ও দায়মুক্তির সংস্কৃতিকে স্বাভাবিক করে তুলেছে।

কাশ্মীরে যা ঘটছে, তা আসলে বর্জন ও ভয়ের রাজনীতির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা হিন্দুত্ববাদী প্রকল্পেরই স্বাভাবিক পরিণতি। যারা আগে থেকেই অবিরাম অবরোধ ও নজরদারির মধ্যে বসবাস করছে, সেই মুসলমানদের এখন আরও বেশি প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। ধর্মের ভিত্তিতে তাদের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাদ দেওয়া হচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারতের মুসলমানদের ভবিষ্যৎ আশাব্যঞ্জক মনে হয় না।

হিন্দুত্ববাদী প্রকল্প ধীরে হলেও নিষ্ঠুরভাবে এগিয়ে চলেছে। এটি একদিকে প্রতিষ্ঠান দখল করছে, অন্যদিকে মানুষের চিন্তা ও বোধবুদ্ধিকেও নিজের নিয়ন্ত্রণে নিচ্ছে। তবে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত ভারতের জনগণেরই। তারা কি ঘৃণা ছড়ানো শক্তি ও ধর্মীয় মৌলবাদীদের হাতে বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতন্ত্রকে ছেড়ে দেবে এবং সাভারকারের কল্পিত ঘৃণা ও ভয়ের রাষ্ট্রে রূপ নিতে দেবে, নাকি গান্ধী ও নেহরুর কল্পিত ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্রকে রক্ষা করবে।

এ মুহূর্তে সেই উত্তরের ভেতরে খুব একটা আশার কারণ দেখা যাচ্ছে না।

* জাওয়াদ খালিদ, পাকিস্তানভিত্তিক লেখক ও রাজনৈতিক অর্থনীতি বিশ্লেষক
- মিডিল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-01-22%2Fy3gmsw5r%2FkashmirbjpAFP.jpg?rect=14%2C0%2C1049%2C699&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
কাশ্মীরে বিজেপির বিস্তার। ফাইল ছবি: এএফপি

Wednesday, January 14, 2026

জম্মু–কাশ্মীরের মসজিদের খুঁটিনাটি পুলিশকে জানাতে হবে, নতুন আদেশ

জম্মু–কাশ্মীরের মসজিদগুলোর খুঁটিনাটি তথ্য সংগ্রহে পুলিশি তৎপরতা বিভিন্ন মহলে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। প্রশাসন প্রশ্নবিদ্ধ হতে শুরু করেছে। এমন তৎপরতা এই কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে আগে দেখা যায়নি।

সমালোচনা শুরু হয়েছে কারণ, পুলিশ এই কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মসজিদগুলোর পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য সংগ্রহে উদ্যোগী হয়েছে। তারা জানতে চায়, কোন মসজিদ কবে তৈরি হয়েছে, কাঠামোর বিবরণ, মসজিদ তৈরিতে কত খরচ হয়েছে, কারা টাকা দিয়েছে, মসজিদ চালাতে কত খরচ অথবা বার্ষিক আয়ই–বা কত। শুধু এটুকুই নয়, জানতে চাওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট মসজিদের সঙ্গে কারা যুক্ত, তাঁদের অর্থনৈতিক ক্ষমতা কেমন, পাসপোর্ট, ব্যাংক খাতা, এটিএম ও ক্রেডিট কার্ডের বিবরণও।

পুলিশের এই অতি তৎপরতা উপত্যকায় ক্ষোভের সঞ্চার করেছে। প্রশাসনও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। বিভিন্ন মহলে এই পদক্ষেপের সমালোচনা শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে সর্বভারতীয় ইংরেজি দৈনিক দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।

মিরওয়াইজ উমর ফারুখের সংগঠন মুত্তাহিদা মজলিস উলেমা (এমএমইউ) এই পুলিশি তৎপরতাকে ‘আক্রমণাত্মক তথ্য সংগ্রহ কর্মসূচি’ বলে বর্ণনা করেছে। জম্মু–কাশ্মীরের শাসক দল ন্যাশনাল কনফারেন্সের সংসদ সদস্য আগা রুহুল্লাহ মেহেদি বলেছেন, দক্ষিণপন্থী যে আদর্শ এখন দেশ চালাচ্ছে তা এখন ধর্মকেও নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে। এই পদক্ষেপের মধ্য দিয়েই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, দক্ষিণপন্থী আদর্শের সঙ্গে যারা সহমত নয় তাদেরকেও তারা নিয়ন্ত্রণ করতে চায়।

এই উদ্যোগ ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ জানিয়ে রুহুল্লাহর প্রশ্ন, নিরাপত্তারক্ষী বাহিনীর কাছে সব তথ্য যখন রয়েছে তখন এই বাড়তি তৎপরতার প্রয়োজন কোথায়? তিনি বলেন, এর মধ্য দিয়ে মনে হচ্ছে প্রশাসন ভিন ধর্মাবলম্বীদের ভয় দেখাতে চাইছে। এর পর হয়তো দেখা যাবে, আরএসএস ও বিজেপি মসজিদের ইমামদের হুকুম করবে, প্রতি শুক্রবার তাদের লিখে দেওয়া ধর্মোপদেশই পাঠ করতে হবে।

সমালোচনা করেছে আওয়ামী ইত্তেহাদ পার্টিও (এআইপি)। এই দলের ব্যানারে গত লোকসভা ভোটে জিতেছিলেন ইঞ্জিনিয়ার রশিদ। জেলে বন্দী থেকেও নির্বাচনে জিতে তিনি সংসদ সদস্য হন। এআইপি বলেছে, পুলিশ যা যা জানতে চাইছে তাতে স্পষ্ট তারা ধর্মাচরণকেও নজরবন্দি করতে চায়। দলের প্রধান মুখপাত্র ইনাম উন নবি গণমাধ্যমকে বলেছেন, যা হচ্ছে তা প্রশাসন নয়, নিরাপত্তা রক্ষাও নয়। মানুষকে স্রেফ ভয় দেখানো হচ্ছে। প্রশাসন যদি প্রতিটি ধর্মস্থলকে বিপদ বলে চিহ্নিত করে তাহলে ক্ষোভ বেড়ে যাবে। মানুষের আস্থাও হারাবে।

বিভিন্ন সংগঠন অবিলম্বে এই তৎপরতা বন্ধের দাবি জানিয়েছে। প্রত্যেকেই মনে করে, এতে সর্বত্র ভুল বার্তা যাবে। প্রশাসনের প্রতি মানুষের বিশ্বাস নষ্ট হবে। ভয় বাসা বাঁধবে মনে। সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট হবে।

এমএমইউ মনে করে, নির্বাচিত সরকারের উচিত অবিলম্বে এই বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা। তারা উপরাজ্যপাল মনোজ সিনহাকে অনুরোধ করেছে, দেরি না করে এই পুলিশি উদ্যোগ বন্ধ করতে।

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে এই পদক্ষেপের বিষয়টি স্বীকার করেনি। যদিও পুলিশের এক সূত্র তাদের জানিয়েছে, এই কাজ কিছুদিন ধরেই চলছে। প্রতিটি মসজিদ কর্তৃপক্ষকে ফর্ম ভর্তি করে জমা দিতে বলা হয়েছে।

জম্মু–কাশ্মীর কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল। সেখানকার নির্বাচিত সরকার পূর্ণ ক্ষমতার অধিকারী নয়। বিশেষ করে পুলিশ ও নিরাপত্তার দায়িত্ব কেন্দ্রের হাতে। কেন্দ্রের হয়ে দায়িত্ব পালন করেন উপরাজ্যপাল। তাঁর সম্মতি ছাড়া নির্বাচিত সরকারের কোনো সিদ্ধান্ত বলবৎ হয় না।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2022-12%2Fca564205-757b-4376-aac6-e0b35d23fd99%2FUntitled_5.jpg?rect=0%2C0%2C1296%2C864&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif

Friday, January 2, 2026

কাশ্মীরে জৈইশ ও হিজবুল কমান্ডারদের খোঁজে ২০০০ সেনা জওয়ান

ভারতের কাশ্মীরে জৈশ ই মুহাম্মদ ও হিজবুল কমান্ডারদের খোঁজে বড় মাপের অভিযান শুরু  হয়েছে। প্রায়  ২০০০ সেনা জওয়ানকে এই অভিযানে নামানো হয়েছে বলে সংবাদ সংস্থার খবর। তুষারে ঢাকা উপত্যকা দিয়ে যাতে জঙ্গিরা অনুপ্রবেশ না করতে পারে, তার জন্য ধরে ধরে অপারেশন চালাচ্ছে সেনাবাহিনী। জানা গেছে, কাশ্মীরে জৈইশ ই মোহাম্মদির জঙ্গিদের ধরতে এই অভিযান শুরু হয়েছে। এরই সঙ্গে তাদের স্থানীয় কমান্ডারকেও ধরার চেষ্টায় রয়েছে সেনা জওয়ানরা।

এছাড়া হিজবুল মুজাহিদিনের কমান্ডারের খোঁজও করছে সেনাবাহিনী। ছাত্রু গ্রাম এবং আশেপাশের এলাকায় সেনার এই অভিযান বিগত এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলছে। সংবাদ সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী, কাশ্মীরে জৈইশের স্থানীয় কমান্ডার সাইফুল্লাহ ও তার  সহযোগী  আদিল-  এই দু’জনেই এখন কিশতওয়ারের ডোডা অঞ্চলের পাহাড়ে লুকিয়ে আছে। এই জঙ্গিদের একেক জনের মাথার দাম ৫ লাখ  রুপি করে।

এই আবহে কিশতওয়ারের ছাত্রু নামক গ্রাম থেকে এই তল্লাশি অভিযান শুরু হয়েছে। ডোবা অঞ্চলের সেওজধারে চিরুনি তল্লাশি চলছে। পাশাপাশি কিশতওয়ারের এলাকাতেও অভিযান শুরু হয়েছে শনিবার থেকে। অন্যদিকে আরেক অভিযানে কিশতওয়ারের পাদ্দের সাবডিভিশনে হিজবুল জঙ্গি কমান্ডার জাহিঙ্গির সারুরির খোঁজ শুরু করেছে সেনা। এছাড়াও তার দুই সহযোগী মুদ্দাসির এবং রিয়াজেরও খোঁজ চালানো হচ্ছে।

mzamin

Tuesday, December 30, 2025

কাশ্মীর ফাইলস থেকে আরআরআর: ভারতীয় সিনেমা ‘সাবালক’ হবে কবে by ভামসি জুলুরি

প্রকাশ ২৭ ডিসেম্বর ২০২২ঃ কোনো সিনেমা ভারতে (এবং প্রবাসী ভারতীয়দের মধ্যে) ব্যবসায়িক সাফল্য পাওয়ার মানে এই নয় যে ছবিগুলো বিদেশি দর্শকেরা, বিশেষ করে একটি নিরবচ্ছিন্ন বৈশ্বিক প্রতিকূল প্রচারণায় ইতিমধ্যেই ভারত সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা নেওয়া বিদেশিরা একইভাবে দেখবেন বা অনুভব করবেন।

সম্প্রতি ভারতীয় সিনেমা আমাদের সীমানা ছাড়িয়ে বিভিন্ন দেশে আলোড়ন তৈরি করেছে। সুখের বিষয়, তেলেগু ব্লকবাস্টার আরআরআর দুটি গোল্ডেন গ্লোবের জন্য মনোনয়ন জিতেছে। অন্যদিকে কম আনন্দের বিষয় হলো, দ্য কাশ্মীর ফাইলস ছবিটিকে ১৯৯০-এর দশকের কাশ্মীরি হিন্দু পণ্ডিতদের জাতিগত নির্মূল করা হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিরা গভীর আবেগ নিয়ে স্বাগত জানালেও সেটিকে একজন ইসরায়েলি নির্মাতা ‘অশ্লীল প্রোপাগান্ডা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

এই ছবি নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে, এমনকি বিতর্ক কূটনৈতিক স্তরে পৌঁছে গেছে। সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের প্রতি কাশ্মীর ফাইলস–এর স্ক্রিপ্ট রাইটারের উদাসীনতায় ইসরায়েলি নির্মাতা নাদাভ লাপিদসহ অনেকে হতাশা প্রকাশ করেছেন। অবশ্য আমার কিছু চলচ্চিত্র নির্মাতা বন্ধুসহ অনেকেই আবার স্ক্রিপ্ট রাইটারের অবস্থানকে মহৎ বলে মনে করছেন।

এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট দুই পরিচালকের মধ্যে বাগ্‌বিতণ্ডাও হয়েছে। লাপিদ ছবিতে চিত্রায়িত ঘটনাগুলো আদতেই ঘটেছিল কি না, তা বলতে তঁার অক্ষমতা প্রকাশ করেছিলেন এবং ওই হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিরা ছবিটি দেখে কী প্রতিক্রিয়া দেখাবেন, তা নিয়ে তিনি চিন্তিত ছিলেন।

লাপিদ বলেছেন, কোনো নির্দিষ্ট মতাদর্শের প্রচার হিসেবে বানানো ছবিও শৈল্পিক হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বিখ্যাত রুশ নির্মাতা সেরগেই নিকোলোভিচ আইজেনস্তাইন ও জার্মান নির্মাতা লেনি রেইফেনস্টাহলের কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, এই দুজনই প্রোপাগান্ডাভিত্তিক ছবি বানাতেন। কিন্তু এখন কেউই তাঁদের সেই ছবিগুলোকে আর প্রচারমূলক ছবি বলে না। কাশ্মীর ফাইলস সে রকমই কিছু নয় বলে তিনি জোর দিয়েছেন।

ছবিটির পরিচালক বিবেক অগ্নিহোত্রী বারবার উল্লেখ করেছেন, কেউ যখন বিপরীত দৃষ্টিকোণ থেকে মত দেয়, তখনই তারা ‘প্রোপাগান্ডা’ শব্দটি ব্যবহার করে থাকে। তিনি দাবি করেছেন, তাঁর কাশ্মীর ফাইলস সিনেমায় চিত্রায়িত ভয়ংকর ঘটনাগুলোর সত্যতা নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই এবং তিনি তঁার ছবির গল্পের জন্য ৭০০ ভুক্তভোগীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন।

তবে বিতর্কটি এখন কিছুটা কমে আসছে বলে মনে হচ্ছে। সম্ভবত উভয় শিবিরেরই ইসলামবিদ্বেষ কিংবা হিন্দুবিদ্বেষ সম্পর্কে উদ্বিগ্ন হওয়া এর কারণ হতে পারে। কাশ্মীর ফাইলস থেকে আলোচনা এখন আরআরআর-এর দিকে সরে গেছে।

এই প্রেক্ষাপটেই আমি বহু বছর ধরে ভারতীয় সিনেমার সঙ্গে যুক্ত থাকার সুবাদে অর্জিত অভিজ্ঞতা অ-ভারতীয় ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে শেয়ার করতে চাই।

ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সমালোচকদের যে মৌলিক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে, তা হলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই একটি ভারতীয় ছবির দৃশ্য একজন ভারতীয় দর্শকের মনের মধ্যে যে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে, তা বিদেশিদের ক্ষেত্রে কাজ করে না।

আমরা ভারতের সিনেমা হলে গিয়ে হাম আপকে হ্যায় কৌন কিংবা মিস্টার ইন্ডিয়া ছবি দেখে যেভাবে উদ্বেলিত হয়েছি, বিদেশের ছাত্র বা দর্শকদের কাছে তা খুব কমই চিত্তাকর্ষক ছিল।

১৯৯০-এর দশক থেকে পরবর্তী বেশ খানিকটা সময় জুড়ে ‘বলিউড’ নিয়ে বিশ্বজুড়ে একটি বিশেষ টান ছিল, যা শাহরুখ খান থেকে শুরু করে প্রবাসী ভারতীয় নির্মাতা মিরা নায়ার ও গুরিন্দর চাড্ডার মতো নির্মাতাদের বিশেষত্ব দিয়েছে। কিন্তু এর মানে এই নয় যে ভারতীয় চলচ্চিত্রগুলো ভারতীয়দের বয়ান বা ন্যারেটিভকে ভারতের বাইরে এগিয়ে নিতে পেরেছে।

এই বাস্তবতা মাথায় রেখে, আমরা দর্শকদের রুচি, বিষয়বস্তু এবং ফর্ম সম্পর্কে কিছু প্রাথমিক প্রশ্নের দিকে যেতে পারি।

আমাদের এই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে হবে যে কেন আরআরআর–এর (এবং তার আগে বাহুবলী) মতো একটি সিনেমা ভারতীয় এবং অ–ভারতীয় উভয় শ্রেণির দর্শকদের মন কাড়তে পেরেছিল।

একই সঙ্গে এটিও একটি বড় প্রশ্ন যে কেন দ্য কাশ্মীর ফাইলস-এর মতো একটি সিনেমায় ১৯৯০-এর জাতিগত নির্মূলকরণের হাত থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের করুণ অবস্থা দেখে ভারতীয় দর্শকদের অনেকে অশ্রুপাত করলেও তা সব অভিনয়শিল্পীর সহানুভূতি অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে?

ইস্যুটি কি শুধুই কট্টর পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতির, যেখানে বৈশ্বিক মানবাধিকারের মানদণ্ডে হিন্দুদের মানবাধিকার পাওয়ার যোগ্য বলে গণনা করা হয় না? নাকি আমাদের সীমানার বাইরের দর্শকদের মনে জায়গা করার মতো গল্প বলার ক্ষমতা আমাদের নেই। আমাদের সক্ষমতার সেই সীমাবদ্ধতাগুলোকে স্বীকৃতি দেওয়ার দরকার আছে।

কার্ল ভন ক্লজউইটজ লিখেছিলেন, যুদ্ধে প্রোপাগান্ডা চালানোর সময় তিন শ্রেণির দর্শক–শ্রোতার কথা মাথায় রাখতে হয়—সমর্থক, শত্রু এবং নিরপেক্ষ গোষ্ঠী। কিন্তু আমরা কয়েক বছর ধরে ভারতের প্রোপাগান্ডার যে গল্পগুলো দেখে আসছি, তা প্রায় একচেটিয়াভাবে প্রথমোক্ত গোষ্ঠীর প্রতি আলোকপাত করে বানানো।

ভারতীয় সিনেমাকে যদি বিশ্বমানের হতে হয়, ভারতের গল্পকে যদি সত্যিই বিশ্বের জন্য গ্রহণযোগ্য করতে হয়, তাহলে আমাদের কাউকে শত্রু বা বিরোধী হিসেবে ধরে না নিয়ে ভবিষ্যতে তিন শ্রেণির দর্শকের সঙ্গেই কথা বলতে শিখতে হবে।

যখন নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকা দর্শকেরা গল্পের আখ্যানের প্রতি সহানুভূতিশীল হবেন, তখনই ভারতীয় সিনেমার বয়ান বিশ্বমানের বলে প্রতিষ্ঠা পাবে। যত দিন তা না হচ্ছে, তত দিন তা ‘আমাদের প্রচার, তাদের প্রচার’ মার্কা সিনেমা হবে; সেই সিনেমা ‘আমাদের’ এবং ‘তাদের’—এই দুই গোষ্ঠীর মধ্যে সেতুবন্ধ গড়তে পারবে না।

* ভামসি জুলুরি, সান ফ্রান্সিসকো বিশ্ববিদ্যালয়ের মিডিয়া স্টাডিজের অধ্যাপক
- ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

কাশ্মীর ফাইলস ছবিটিকে সরকারি প্রোপাগান্ডা হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে
কাশ্মীর ফাইলস ছবিটিকে সরকারি প্রোপাগান্ডা হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। ছবি: সংগৃহীত

Monday, December 29, 2025

ভারতে বাড়তে থাকা অসহিষ্ণুতা নিয়ে মুফতি পরিবারের উদ্বেগ

টেলিগ্রাফের রিপোর্টঃ জম্মু-কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতির মেয়ে ইলতিজা মুফতি শুক্রবার মন্তব্য করেছেন যে, ভারত এখন যেন ‘লিঞ্চিস্তান’-এ পরিণত হয়েছে। তার দাবি, দেশে অসহিষ্ণুতা বাড়ছে এবং বাংলাদেশে লিঞ্চিংয়ের সমালোচনা যারা করছেন, ভারতে এমন ঘটনা ঘটলেও তারা নীরব থাকছেন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন টেলিগ্রাফ। উল্লেখ্য, ইংরেজি শব্দ লিঞ্চিং অর্থ পিটিয়ে হত্যা করা। ইলতিজা ‘এক্স’-এ একটি পোস্টে ভারতকে উদ্দেশ্য করে লিখেছেন, ‘না ইন্ডিয়া, না ভারত, না হিন্দুস্তান- তোমার নাম লিঞ্চিস্তান।’

তিনি ওই পোস্টে ওড়িশায় ১৯ বছর বয়সি বাঙালি মুসলিম অভিবাসী শ্রমিক জুয়েল শেখের লিঞ্চিং সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনও শেয়ার করেন। তাকে ‘বাংলাদেশি’ আখ্যা দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছিল বলে তার দাবি। ইলতিজার মা ও পিডিপি প্রধান, সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতিও দেশের বিচারব্যবস্থার বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা করেন। তার অভিযোগ, ভারতের বিচারব্যবস্থা গভীরভাবে রাজনীতিকরণে নিমজ্জিত। শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি সাম্প্রতিক জম্মু-কাশ্মীর ও লাদাখ হাইকোর্টের রায় নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেন। মেহবুবা বলেন, আমরা বহুদিন ধরেই বলে আসছি, দেশে অসহিষ্ণুতা বেড়েছে। লিঞ্চিং হচ্ছে। বাংলাদেশে যা হচ্ছে, তা আমাদের কষ্ট দেয়। কিন্তু যারা সেগুলোর সমালোচনা করছেন, নিজেদের সামনে এমন ঘটনা ঘটলেও মুখ খোলেন না। তিনি জানান, ৭২ ঘণ্টায় হিমাচল, উত্তরাখণ্ড ও হরিয়ানায় কাশ্মিরি শাল ব্যবসায়ীদের হয়রানির তিনটি ঘটনা ঘটেছে। সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত ভিডিওতে দেখা যায়, দক্ষিণপন্থী কর্মীরা তাদের জোর করে নির্দিষ্ট স্লোগান দিতে বাধ্য করছেন। স্লোগান দিতে অস্বীকার করলে মারধর করছেন।

হাইকোর্টে তার পিআইএল (জনস্বার্থ মামলা) খারিজ হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশের বিচারব্যবস্থার বড় অংশ রাজনৈতিক প্রভাবিত। সেই আবেদনে তিনি দেশের বিভিন্ন কারাগারে আটক কাশ্মিরি হাজতিদের জম্মু-কাশ্মীরে ফিরিয়ে নেয়ার দাবি করেছিলেন। কিন্তু আদালত তার আবেদনের সমালোচনা করে বলেন, এটি নাকি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। মেহবুবা বলেন, আমার চরিত্র নিয়ে মন্তব্য করা বিচারব্যবস্থার কাজ নয়। একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে প্রশ্ন তোলা আমার অধিকার।

প্রধান বিচারপতি অরুণ পাল্লি ও বিচারপতি রাজনেশ ওসওয়ালের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ মন্তব্য করেন যে, তার আবেদন অপ্রমাণিত ও রাজনৈতিকভাবে অনুপ্রাণিত এবং আইনগত মানদণ্ড পূরণ করতে ব্যর্থ। রায়ে আরও বলা হয়, মেহবুবা মুফতি নাকি এই মামলা দায়ের করেছেন ‘রাজনৈতিক সুবিধা নেয়া এবং নির্দিষ্ট একটি জনগোষ্ঠীর পক্ষের ন্যায়যোদ্ধা হিসেবে নিজেকে তুলে ধরার’ উদ্দেশ্যে।

রায় প্রসঙ্গে হতাশা ব্যক্ত করে তিনি বলেন, প্রতিটি সাধারণ মানুষ যখন পিআইএল করতে পারে, তখন একজন রাজনীতিবিদ কেন পারবে না? তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, রাজনীতিবিদরাই তো মাঠের মানুষের সঙ্গে যুক্ত। আমি জানি গরিব পরিবারগুলো কত কষ্টে থাকে। নিজেদের আত্মীয়দের দেখা করতেও পারে না, বাইরের রাজ্যের জেলে থাকা অবস্থায় তারা কীভাবে নিজেদের মামলা লড়বে?

mzamin