Tuesday, August 25, 2026
খলিফা ওমর (রা.)-এর বাজার ব্যবস্থাপনা by নাসরুল্লাহ ইবনে ইলিয়াস
বাজারের ভেতরে জনতার ভিড় ঠেলে হেঁটে যাচ্ছেন এক দীর্ঘদেহের প্রবীণ ব্যক্তি; হাতে তার চামড়ার চাবুক। তিনি অন্য কেউ নন, মুসলিম জাহানের দ্বিতীয় খলিফা ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)। হাঁটতে হাঁটতে তিনি তীক্ষ্ণ চোখে লক্ষ করছেন পণ্যের মান, পরখ করছেন মাপের পাত্র এবং আড়চোখে খেয়াল করছেন কোনো ব্যবসায়ী গোপনে ভেজাল দিচ্ছে বা অতিরিক্ত মুনাফার লোভে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে কি না।
এই দৃশ্য-ইতিহাস কল্পনা করলে পাঠকের মতে একটা মৌলিক প্রশ্ন জাগবে, বাজার কি শুধু ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যকার সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত লেনদেনের স্থান, নাকি সেখানে ন্যায়নিষ্ঠা, স্বচ্ছতা এবং সততা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রেরও এক অনিবার্য দায়িত্ব?
প্রথম খলিফা আবু বকর (রা.)-এর সংক্ষিপ্ত শাসনকালে রিদ্দা যুদ্ধ-পরবর্তী যে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জিত হয়েছিল, ওমর (রা.)-এর ১০ বছরের খেলাফতকালে (১৩-২৩ হিজরি/৬৩৪-৬৪৪ খ্রিষ্টাব্দ) তা এক বিশাল আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যেও রূপ নেয়। আজকের আলোচনা সেই রূপান্তর নিয়ে।
বিশ্ব অর্থনীতির প্রধান কেন্দ্র
ওমর (রা.)-এর শাসনকালে খেলাফত রাষ্ট্রের ভৌগোলিক সীমানা অভূতপূর্ব গতিতে সম্প্রসারিত হয়। রোম ও পারস্য সাম্রাজ্যের সমৃদ্ধ এলাকা—সিরিয়া, ইরাক, ইরান ও মিসর মুসলিম রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হয়। এই ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে তৎকালীন আরবের প্রথাগত মরু-অর্থনীতি ও ক্ষুদ্র আঞ্চলিক বাজার ব্যবস্থায় এক বৈপ্লবিক রূপান্তর ঘটে।
সিরিয়ার কৃষিপণ্য, মিসরের খাদ্যশস্য এবং পারস্যের ধাতু ও পোশাকশিল্প এখন একক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ছাতার নিচে চলে আসে। এর ফলে খোলাফায়ে রাশেদিনের অধীনে একটি বৃহৎ ‘একীভূত অর্থনীতি’ (Unified Economy) গড়ে ওঠে, যেখানে বাণিজ্য শুল্কের জটিলতা কমে যায় এবং সীমান্তহীন বাণিজ্য যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়।
নববিজিত অঞ্চলগুলোতে সামরিক ও বেসামরিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নগর অর্থনীতির দ্রুত বিকাশ ঘটে। সামরিক কেন্দ্র ও সেনানিবাস হিসেবে গড়ে ওঠা বসরা এবং কুফা অল্প সময়ের মধ্যেই অর্থনীতি ও বাণিজ্যের মূল কেন্দ্রে পরিণত হয়। ওমর (রা.) এই নতুন নগরগুলোতে বাজার পরিকল্পনার ক্ষেত্রে বিশেষ নকশা বাস্তবায়ন করেন। যেমন : কুফার বাজার পরিকল্পনা করার সময় তিনি নির্দেশ দেন যেন বাজারগুলো জামে মসজিদের কাছে এবং প্রশস্ত সড়কের পাশে উন্মুক্ত স্থানে গড়ে ওঠে, যাতে পণ্য পরিবহন ও তদারকি সহজ হয়।
একই সঙ্গে তিনি মুদ্রাব্যবস্থায় প্রশাসনিক শৃঙ্খলা আনেন। প্রচলিত সাসনি ও বাইজেন্টাইন মুদ্রা সচল রেখে তিনি দিরহামের ওজন সুনির্দিষ্ট করেন, যেখানে ১০টি দিরহামের ওজন ৭টি স্বর্ণ-দিনারের (মিছকাল) সমান নির্ধারণ করা হয়। পারস্যের দিরহামে ‘আলহামদুলিল্লাহ’, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর মতো আরবি বাক্য খোদাই করে খেলাফত রাষ্ট্রের আর্থিক মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই মুদ্রানীতি বাণিজ্যিক লেনদেনে স্থিতিশীলতা আনে এবং মধ্যপ্রাচ্যের দূরবর্তী বাজারগুলোকে একীভূত লেনদেন সূত্রে গ্রথিত করে।
শরিয়ত জেনে আসতে হবে
একটি অতিদ্রুত সম্প্রসারণশীল অর্থনীতিতে শুধু নৈতিক উপদেশ দিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। ওমর (রা.) গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন, ব্যবসায়ী যদি বাণিজ্য-সংক্রান্ত শরিয়তের বিধিবিধান না জানে, তবে অজ্ঞতাবশতই সে বিভিন্ন অন্যায্য ও হারাম লেনদেনে জড়িয়ে পড়বে।
মুসলিম আইন শাস্ত্রে ‘ইবাদত’-এর মতোই ‘মুয়ামালাত’ (অর্থনৈতিক লেনদেন) ঈমানের বাস্তব প্রয়োগক্ষেত্র। বাজারে ব্যবসা করা শুধু মুনাফা অর্জনের মাধ্যম নয়, বরং সামাজিক দায়িত্বও বটে। ওমর (রা.)-এর অর্থনৈতিক প্রশাসনে ব্যবসায়ীদের জন্য মোটাদাগে চার বিষয়ের জ্ঞান বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল—
রিবা (সুদ) ও তার সূক্ষ্ম রূপ : ‘রিবা আলফজল’ (সমজাতীয় পণ্য বিনিময়ে কমবেশি করা) এবং ‘রিবা আননাসিআহ’ (মেয়াদের কারণে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা) বাণিজ্যের এই জটিল নিয়মগুলো না জানলে সাধারণ ব্যবসায়ী সহজেই সুদের খপ্পরে পড়তে পারে।
গিশ ও তাদলিস (প্রতারণা ও ত্রুটি লুকানো) : ভালো পণ্যের নিচে নিম্নমানের পণ্য লুকিয়ে রাখা বা পণ্যের অভ্যন্তরীণ কোনো ত্রুটি গোপন করে বিক্রি করা শরিয়তে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
তাতফিফ (ওজনে কারচুপি) : মাপে বা ওজনে ক্রেতাকে ঠকানো, যা কোরআনে সরাসরি অভিশাপযোগ্য অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত।
মিথ্যা তথ্য ও কৃত্রিম অসততা : পণ্যের কৃত্রিম গুণগান গাওয়া, মিথ্যা কসম খেয়ে পণ্য বিক্রি করা বা বাজারে কৃত্রিমভাবে পণ্যের চাহিদা বাড়াতে ক্রেতা সেজে দাম হাঁকানো (নজশ)।
ওমর (রা.)-এর সুনির্দিষ্ট শাসননীতি ছিল—আইন না জেনে বাজারে নামলে ব্যবসায়ী অজান্তেই সুদে লিপ্ত হবে এবং ক্রেতার অধিকার হরণ করবে। ফলে প্রতিটি পেশাদার ব্যবসায়ীর জন্য নির্দিষ্ট ব্যবসার আইনকানুন জানা ‘ফরজে আইন’ (বাধ্যতামূলক আইনি দায়িত্ব) হিসেবে গণ্য হতো।
আধুনিক অনেক আলোচনায় এই ঘটনাটিকে একটি ‘আমলাতান্ত্রিক বাণিজ্যিক লাইসেন্সিং ব্যবস্থা’ হিসেবে চিত্রিত করার প্রবণতা দেখা যায়। বলা হয়, ওমর (রা.) নাকি বাজারে ঢোকার মুখে পরীক্ষা কেন্দ্র বসিয়েছিলেন এবং ফিকহ পরীক্ষায় পাস না করলে কাউকে ব্যবসা করতে দিতেন না। তবে প্রাথমিক ঐতিহাসিক গ্রন্থ অনুসন্ধান করলে এমন কোনো লিখিত সনদ প্রদান বা প্রশাসনিক প্রবেশ পরীক্ষার প্রমাণ পাওয়া যায় না।
তিনি ব্যবসায়ীদের জন্য ব্যবসার বিধিবিধান (ফিকহ) জানা বাধ্যতামূলক করেছিলেন, তবে তা বাস্তবায়ন হতো বাজারে সরেজমিনে তদারকি, শিক্ষা ও সংশোধনের মাধ্যমে। খলিফা নিজে এবং নিযুক্ত কর্মকর্তারা ভুল লেনদেন সংশোধন করতেন; আর বারবার প্রতারণা, সুদি বা অবৈধ লেনদেন করলে তাজিরস্বরূপ শাস্তি দিতেন এবং প্রয়োজনে বাজার থেকে বহিষ্কার করতেন। অর্থাৎ, এটি আধুনিক অর্থে কোনো লাইসেন্সিং ব্যবস্থা নয়; বরং জ্ঞানভিত্তিক বাজার তদারকি ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের একটি কার্যকর ব্যবস্থা ছিল।
বাজার মনিটরিং
পরবর্তীকালের সুসংগঠিত ‘মুহতাসিব’ (মার্কেট ইন্সপেক্টর) বা ‘হিসবাহ’ নামক যে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশাসনিক রূপ গড়ে উঠেছিল, তার প্রত্যক্ষ সূচনা ঘটেছিল ওমর (রা.)-এর খেলাফতকালে। ওমর (রা.) নিজে ছিলেন রাষ্ট্রের প্রধান নীতি-তদারককারী। তিনি নিয়মিত মদিনার বাজার পরিদর্শন করতেন। তবে রাষ্ট্রের আকার বৃদ্ধি পাওয়ায় তিনি বিশেষ ব্যক্তিবর্গকে বাজার তদারকির জন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেন।
এই প্রক্রিয়ায় ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) নিজেই সমগ্র রাষ্ট্রের বাজার ব্যবস্থার সর্বোচ্চ তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন। তিনি নিয়মিত বাজার পরিদর্শন, ব্যবসায়িক নীতিনির্ধারণ এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতেন। পাশাপাশি মদিনার বাজার পরিচালনার জন্য তিনি আবদুল্লাহ ইবনে উতবা ও সায়িব ইবনে ইয়াজিদকে দায়িত্ব প্রদান করেন, যারা যৌথভাবে বাজারের শৃঙ্খলা ও লেনদেন তদারকি করতেন। শিফা বিনতে আবদুল্লাহও বাজার তদারকির দায়িত্ব পালন করতেন। তিনি ব্যবসায়িক নৈতিকতা নিশ্চিত করা, প্রতারণা প্রতিরোধ এবং বাজারে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ভূমিকা পালন করেন। অন্যদিকে, সামরা বিনতে নুহাইক মক্কার বাজারে নিয়মিত পরিদর্শন করে অনিয়ম প্রতিরোধ, ওজন-পরিমাপ পরীক্ষা এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের সতর্ক করার দায়িত্ব পালন করতেন।
মনিটরিংয়ের প্রধান পয়েন্টগুলো
তদারককারীদের মূল প্রশাসনিক নজরদারির বিষয় ছিল তিনটি—
ক. মাপ ও ওজন : বাজারের বাটখারা ও মাপের পাত্রগুলো নিয়মিত পরীক্ষা করা হতো, যাতে কোনো ব্যবসায়ী পরিমাপে কম দিতে না পারে।
খ. পণ্যের মান ও ভেজাল প্রতিরোধ : পচা, বাসি বা নিম্নমানের পণ্য ভালো পণ্যের সঙ্গে মিশিয়ে বিক্রি করা রোধ করা হতো।
গ. মজুতদারি প্রতিরোধ : বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানোর উদ্দেশ্যে খাদ্যদ্রব্য আটকে রাখা খলিফা ওমর কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেন। বিভিন্ন হাদিস গ্রন্থে বর্ণিত আছে, ওমর (রা.) স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছিলেন, ‘আমাদের বাজারে কোনো মজুতদারি চলবে না।’ যে ব্যক্তি দূর থেকে বাজারে খাদ্যশস্য আমদানি করত, তাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে উৎসাহিত করা হতো আর যে ব্যক্তি কৃত্রিম সংকটের জন্য মজুত করত, তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হতো।
সংকটকালে ওমরের নীতি
হিজরি ১৮ সালে আরবে যে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ (আমুর রামাদাহ) দেখা দেয়, তখন ওমর (রা.) বাজার নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তিনি ব্যবসায়ীদের ওপর জোরপূর্বক দাম চাপিয়ে না দিয়ে, মিসর ও ইরাক থেকে সরকারি তহবিলে শস্য আমদানি করে বাজারে সরবরাহ বৃদ্ধি করেন। ফলে পণ্যের আকাশচুম্বী দাম স্বতঃস্ফূর্তভাবেই কমে আসে। এটি ছিল সরকারি মূল্য নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে সরবরাহ বৃদ্ধির মাধ্যমে বাজার স্থিতিশীল করার আধুনিক অর্থনৈতিক কৌশল।
ব্যবসায় উৎসাহ প্রদান
ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতাকে ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের শক্তির অন্যতম ভিত্তি মনে করতেন। তাই তিনি মানুষকে শ্রম, পেশা এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে বৈধ উপার্জনে উৎসাহিত করতেন। ব্যবসায় সফল হওয়ার জন্য তিনি মানুষকে অধ্যবসায়, দক্ষতা ও বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত গ্রহণের শিক্ষা দিতেন। তিনি বলতেন, কোনো ব্যক্তি যদি একটি ব্যবসায় বারবার চেষ্টা করেও সফল না হয়, তবে তার উচিত অন্য কোনো ব্যবসা করা। একই সঙ্গে তিনি প্রত্যেককে অন্তত একটি পেশা বা কারিগরি দক্ষতা অর্জনের পরামর্শ দিতেন এবং সতর্ক করতেন, একদিন এর প্রয়োজন হবেই। তার মতে, ব্যবসা ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান না থাকলে মানুষ অন্যের মুখাপেক্ষী হয়ে পড়ে। তাই তিনি বলতেন, মানুষের কাছে হাত পাতার চেয়ে পরিশ্রমের মাধ্যমে সামান্য উপার্জনও অধিক মর্যাদাপূর্ণ। দরিদ্রদের উদ্দেশে তার আহ্বান ছিল, ‘মাথা উঁচু করে ব্যবসা করো; মানুষের বোঝা হয়ে থেকো না।’
ওমর (রা.) শুধু ব্যক্তিগত জীবিকার জন্য নয়, বরং মুসলিম সমাজের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্বাধীনতার জন্যও ব্যবসাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন। একদিন তিনি মদিনার বাজারে এসে লক্ষ করলেন, অধিকাংশ ব্যবসায়ী নাবাতি (বিদেশি) জনগোষ্ঠীর। এতে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। লোকরা যখন বলল যে, ইসলামি বিজয়ের ফলে প্রাপ্ত সম্পদ তাদের বাজারমুখী হওয়ার প্রয়োজন কমিয়ে দিয়েছে, তখন ওমর (রা.) দৃঢ়ভাবে সতর্ক করে বলেন, ‘আল্লাহর কসম! যদি তোমরা এমন করো, তবে একদিন তোমাদের পুরুষরা তাদের পুরুষদের এবং তোমাদের নারীরা তাদের নারীদের মুখাপেক্ষী হয়ে পড়বে।’
এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, কোনো জাতি যদি উৎপাদন, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে সরে দাঁড়ায়, তবে একসময় তাকে অন্যের ওপর নির্ভরশীল হতে হয়। ওমর (রা.)-এর দৃষ্টিতে ব্যবসা শুধু ব্যক্তিগত আয়ের মাধ্যম নয়; বরং মুসলিম সমাজের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, মর্যাদা ও রাষ্ট্রশক্তি সংরক্ষণের অন্যতম প্রধান ভিত্তি ছিল।
ইসলামি বাজার ও আধুনিক বাজার
ওমর (রা.)-এর বাজার ব্যবস্থাপনা ও আধুনিক বাজার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মধ্যে উদ্দেশ্যগত মিল থাকলেও তাদের ভিত্তিগত দর্শনে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। আধুনিক বাজার তদারকি প্রধানত রাষ্ট্রপ্রণীত আইন, প্রশাসনিক বিধান ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। এছাড়া এর অসংখ্য ফাঁকফোকর নিয়ে আলোচনা তো আছেই; পক্ষান্তরে ওমর (রা.)-এর নীতি প্রতিষ্ঠিত ছিল ওহির নির্দেশনা, নৈতিক জবাবদিহি, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের সমন্বয়ে। খেলাফতের লক্ষ্য শুধু বাজার নিয়ন্ত্রণ ছিল না, বরং এমন একটি ব্যবসায়িক পরিবেশ গড়ে তোলা, যেখানে ব্যবসায়ী আল্লাহভীরু হবে, ভোক্তা নিরাপদ থাকবে এবং বাজার হবে ন্যায় ও আমানতের প্রতীক। তাই খেলাফতের এই তদারকি শুধু আইন প্রয়োগ নয়, ছিল চরিত্র গঠনও।
অকথ্য বাস্তবতা হলো, আধুনিক বিশ্বের প্রতিটি বাজার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এখনো প্রতারণা, মজুতদারি, কৃত্রিম সংকট, ভেজাল ও একচেটিয়া বাণিজ্যের ওপর টিকে আছে। জনগণ এবং জনগণের স্বার্থে কাজ করা কিছু সমাজচিন্তকরা এর প্রতিকার খুঁজে চলেছেন এর-ওর কাছে। অথচ চৌদ্দ শতাব্দী আগে ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) যে নীতিমালা প্রয়োগ করেছিলেন, তা বাজারকে শুধু নিয়ন্ত্রিতই করেনি; বরং নৈতিকতা, জবাবদিহি ও জনকল্যাণের ভিত্তিতে একটি টেকসই অর্থনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলেছিল। এ কারণেই তাঁর বাজারনীতি শুধু একটি ঐতিহাসিক প্রশাসনিক মডেল নয়; বরং ইসলামের অর্থনৈতিক প্রজ্ঞা, ন্যায়ভিত্তিক শাসন এবং মানবকল্যাণমুখী রাষ্ট্রচিন্তার এক উজ্জ্বল ও কালজয়ী দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
![]() |
| মসজিদে নববির কাছে অবস্থিত ঐতিহাসিক ‘সুক সুয়াইকা’ বা ‘সুক আল-কামাশাহ’ |
নবীজীবনচর্চায় নতুন আলো by ড. ইসাম তালিমা
মুসলিম সভ্যতার প্রতিটি যুগেই মহানবী (সা.)-এর জীবন নিয়ে গবেষণা ও রচনাকর্ম হয়েছে। কখনো তার সমগ্র জীবনকে ধারাবাহিক ও বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে; কখনো বিভিন্ন বর্ণনার সত্যতা যাচাই, সনদ পরীক্ষা এবং ঐতিহাসিক তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে; আবার কখনো তার জীবনের কোনো বিশেষ ঘটনা, বৈশিষ্ট্য বা দিককে কেন্দ্র করে আলোচনা করা হয়েছে। তার প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাশীল ব্যক্তিরা যেমন তার জীবনচরিত রচনা করেছেন, তেমনি বিদ্বেষী এবং বিরোধীরাও তাকে নিয়ে লিখেছে। এমনকি নিরপেক্ষ ও ন্যায়নিষ্ঠ গবেষকরাও তার জীবন এবং কর্মকে তাদের গবেষণার বিষয় করেছেন। ফলে মহানবী (সা.)-এর সিরাত যুগে যুগে ভালোবাসা, বিরোধিতা ও নিরপেক্ষ অনুসন্ধান—তিন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির মানুষেরই আগ্রহের বিষয় হয়ে থেকেছে।
সিরাতচর্চার দুটি ধারা
মহানবী (সা.)-এর সিরাত নিয়ে প্রচলিত চর্চাকে মূলগতভাবে দুটি প্রধান ধারায় ভাগ করা যায়। প্রথম ধারা হলো ‘ঐতিহাসিক বর্ণনাভিত্তিক সিরাতচর্চা’। এ ধারায় মহানবী (সা.)-এর জন্ম, জন্মের পূর্ববর্তী সময় ও তৎকালীন পরিবেশ থেকে শুরু করে তার ইন্তেকাল এবং ইন্তেকাল-পরবর্তী ঘটনাবলি ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করা হয়।
এই ধারার মধ্যেও রয়েছে একাধিক গবেষণাপদ্ধতি। সনদ যাচাইয়ের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন না করেই কেউ আলোচিত সব তথ্য একত্র করেছেন। আবার কেউ তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি সনদ নিরীক্ষা ও পর্যালোচনা করেছেন; যেসব বর্ণনা বিশুদ্ধ, সেগুলো গ্রহণ করেছেন এবং যেগুলো প্রমাণিত নয় বা দুর্বল, সেগুলোর ব্যাপারেও পাঠককে সতর্ক করেছেন। এই ধারার আরেকটি প্রবণতা হলো, সিরাতের ঘটনাবলি আলোচনা করে সেখান থেকে শিক্ষা, উপদেশ ও জীবনের নানা দিকনির্দেশনা আহরণ করা। কারো আলোচনায় সাধারণ শিক্ষাগুলো গুরুত্ব পেয়েছে, আবার কেউ বিশেষ কোনো শিক্ষা বা তাৎপর্যের ওপর জোর দিয়েছেন।
সিরাতচর্চার দ্বিতীয় ধারাটিও প্রাচীনকাল থেকে চলে আসছে। এ ধারায় মহানবী (সা.)-এর জীবনের কোনো একটি বিশেষ দিককে বেছে নিয়ে সেটিকে গভীরভাবে অধ্যয়ন করা হয়। মুসলিম ঐতিহ্যে এর প্রাথমিক দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় মহানবী (সা.)-এর শামায়েল (বাহ্যিক ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য) এবং খাসায়েস (বিশেষ বৈশিষ্ট্য) নিয়ে রচিত গ্রন্থগুলোয়। কাজী ইয়াজ, মাকরিজি প্রমুখের রচনায় এ ধরনের চর্চার উদাহরণ রয়েছে।
আধুনিক যুগে মহানবী (সা.)-এর জীবনের বিশেষ কোনো দিক নিয়ে গবেষণার এই ধারা আরো বিকশিত হয়েছে। সিরাতের নির্দিষ্ট বিষয়কে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছে অনেক বইপত্র। আব্বাস মাহমুদ আক্কাদ, খালিদ মুহাম্মদ খালিদ, ইউসুফ আল-কারজাবি, মাহমুদ শিত খাত্তাব ও অন্যরা এই ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন।
পাশাপাশি পাশ্চাত্য লেখকদের মধ্যেও মহানবী (সা.)-এর জীবন নিয়ে গবেষণা করেছেন। এসব রচনার মধ্যে যেমন ন্যায়নিষ্ঠ ও ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় পাওয়া যায়, তেমনি পক্ষপাতদুষ্ট ও বিদ্বেষপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থিতিরও প্রমাণ পাওয়া যায়।
সিরাতচর্চার তৃতীয় ও নতুন আরেকটি ধারা
সিরাতচর্চায় তৃতীয় একটি ধারা রয়েছে, যে ধারায় তেমন বিস্তৃত চর্চা হয়নি। বরং অল্প কয়েকজন লেখক এ পদ্ধতিতে কাজ করেছেন। এই ধারার বিষয় শুধু মহানবী (সা.)-এর জীবনচরিত নয়; বরং যারা লেখক ও গ্রন্থকার হিসেবে নবীজির সিরাত নিয়ে কাজ করেছেন, তাদের নানা দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে সিরাতকে নতুন করে পাঠ করা।
এ পদ্ধতিকে আমরা বলতে পারি ‘তুলনামূলক সিরাতচর্চা’—অর্থাৎ সিরাতের কোনো একটি নির্দিষ্ট ঘটনা ভিন্ন ভিন্ন লেখক কীভাবে উপস্থাপন করেছেন, তা পাশাপাশি রেখে তুলনামূলক আলোচনা করা। কারণ প্রত্যেক লেখক তার নিজস্ব সংস্কৃতি, সাহিত্যিক পরিমণ্ডল, ভাষাশৈলী এবং মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতার আলোকে সিরাতের ঘটনা বিশ্লেষণ করেন। ফলে একই ঘটনা নিয়ে তাদের লেখায় বৈচিত্র্যময় চিন্তা, সৃজনশীলতা ও অন্তর্দৃষ্টির প্রকাশ ঘটে।
ফিকহের ক্ষেত্রে যেমন তুলনামূলক ফিকহ রয়েছে, যেখানে বিভিন্ন ফকিহের মতামত ও ফিকহি সিদ্ধান্তের তুলনা করা হয়; এসব মতের পেছনের প্রেরণা, কারণ ও যুক্তি বিশ্লেষণ করা হয়; কোনো একটি মতের পেছনে থাকা ফিকহি দর্শন এবং তার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা বিধানগুলোও পর্যালোচনা করা হয়। তাফসির শাস্ত্রেও এই পদ্ধতির প্রয়োগ দেখা যায়।
তাই সিরাতের ক্ষেত্রেও যদি এ ধরনের তুলনামূলক পদ্ধতিতে গবেষণা করা হয়, তাহলে মহানবী (সা.)-এর সিরাতচর্চায় নতুন ও স্বতন্ত্র একটি ধারা সৃষ্টি হবে। এর মাধ্যমে সিরাতের অনেক দিক ও তাৎপর্য সামনে আসবে, বিচ্ছিন্নভাবে পাঠ করলে যা হয়তো আমাদের দৃষ্টিতে ধরা পড়বে না। ফলে মহানবী (সা.)-এর জীবন ও আদর্শকে বোঝার ক্ষেত্রে এ পদ্ধতি সিরাতচর্চাকে আরো সমৃদ্ধ এবং গভীর করে তুলতে পারে।
বিয়ুমির দৃষ্টান্ত
ড. মুহাম্মদ রজব আল-বায়ুমি ছাড়া এ ধরনের প্রচেষ্টা আর কারো মধ্যে আমার চোখে পড়েনি। তবে তিনি তুলনামূলক সিরাতচর্চার কোনো স্বতন্ত্র পদ্ধতি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে এই পদ্ধতিতে লেখেননি; বরং সিরাত রচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন মাত্র। তার প্রবন্ধটির শিরোনাম ছিল من روائع السيرة النبوية: الرسول يبكي ولده إبراهيم (সিরাতের অনুপম সৌন্দর্য : সন্তান ইব্রাহিমের জন্য রাসুলের কান্না)। প্রবন্ধটি ‘ফি মিজানিল ইসলাম’ গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে। এতে তিনি মারিয়া কিবতিয়ার গর্ভে জন্ম নেওয়া নবীজি (সা.)-এর ছেলে ইব্রাহিমের অল্প বয়সে ইন্তেকালের ঘটনা আলোচনা করেছেন।
বায়ুমি সমকালীন সাহিত্যিক ও চিন্তক আব্বাস আল-আক্কাদ, তাহা হুসাইন, আহমদ হাসান আল-জাইয়াত ও মুহাম্মদ হুসাইন হাইকলের সিরাতগ্রন্থে এ ঘটনাটির উপস্থাপন নিয়ে তুলনামূলক আলোচনা করেছেন।
সিরাতের গ্রন্থগুলোতে ঘটনাটি বড়জোর আধা থেকে এক পৃষ্ঠার হলেও, এই চার সাহিত্যিকের কলমে তা অসাধারণ মূল্যবান হয়ে উঠেছে। প্রত্যেকের দৃষ্টিভঙ্গিও ছিল ভিন্ন। আক্কাদ প্রথমে যুক্তি ও বুদ্ধির মাধ্যমে বিষয়টি দেখেছেন, এরপর আবেগের দিকে গেছেন; তাহা হুসাইন ঠিক বিপরীতভাবে আবেগ দিয়ে শুরু করে যুক্তিতে পৌঁছেছেন। যাইয়াত নিজের সন্তান হারানোর অভিজ্ঞতা থেকে এ ঘটনায় সান্ত্বনা ও শিক্ষা খুঁজে পেয়েছেন। আর হাইকল ঘটনাটিকে প্রবহমান সাহিত্যিক ভাষায় বর্ণনা ও বিশ্লেষণ করেছেন।
এই ধারণার পক্ষে আরো কিছু দৃষ্টান্ত
বায়ুমি যে আঙ্গিকে আলোচনা করেছেন, সেটি ছাড়াও এ ধারার গবেষণা পদ্ধতির পক্ষে অসংখ্য দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। দেখা যায়, প্রত্যেক ফকিহ বা সাহিত্যিক মহানবী (সা.)-এর জীবনের কোনো ঘটনা ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখেছেন। এসব দৃষ্টিভঙ্গিকে পাশাপাশি রেখে তুলনা করলে নবুয়তের আরো পূর্ণাঙ্গ ও স্পষ্ট চিত্র আমাদের সামনে বিকশিত হবে।
এর একটি দৃষ্টান্ত ইউসুফ আল-কারজাবি ও খালিদ মুহাম্মদ খালিদের রচনায় পাওয়া যায়। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি প্রথম আঘাতে একটি কাকলাস (টিকটিকি জাতীয় একধরনের সরীসৃপ) হত্যা করবে, তার জন্য একশ নেকি লেখা হবে। দ্বিতীয় আঘাতে এর চেয়ে কম এবং তৃতীয় আঘাতেও এর চেয়ে কম (নেকি পাবে)।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর : ৫৭৪০)
প্রথম আঘাতের জন্য ১০০ নেকি এবং পরবর্তী আঘাতের জন্য ক্রমহ্রাসমান নেকি কেন, এর ব্যাখ্যায় ইউসুফ কারজাবি একজন আইনজ্ঞের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বলেছেন, এটা মূলত সঠিকভাবে লক্ষ্যভেদ করার দক্ষতার পুরস্কার। শত্রুর মোকাবিলায় কাজে লাগাতে মুসলমানের এ ধরনের দক্ষতা থাকা প্রয়োজন।
অন্যদিকে খালিদ মুহাম্মদ খালিদের ব্যাখ্যা ভিন্ন। তার মতে, এখানে নেকির পুরস্কারের মধ্য দিয়ে মূলত দয়ার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। যদি কাকলাসকে হত্যা করতেই হয়, তবে যেন দ্রুত হত্যা করা হয়; কারণ বারবার আঘাত করলে প্রাণীটি অযথা কষ্ট পাবে।
আমরা যে পদ্ধতিকে ‘তুলনামূলক সিরাতচর্চা’ নামে অভিহিত করছি, তা সিরাতের বিস্তৃত ভান্ডারে ছড়িয়ে থাকা অমূল্য রত্নগুলোকে পাঠকের সামনে তুলে আনার একটি কার্যকর পথ হতে পারে। বিশেষত সিরাতের এমন সব পার্শ্বঘটনা ও অপেক্ষাকৃত কম আলোচিত বিষয় রয়েছে, যেগুলোর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ও শিক্ষা অনেক সময় বৃহৎ বর্ণনার আড়ালে পড়ে যায়।
সিরাতের লেখক ও কবিরা সাধারণত মহানবী (সা.)-এর জীবনের বড় ঘটনাগুলোর প্রতিই বেশি মনোযোগ দেন। নবীজির জন্ম, নবুয়তপ্রাপ্তি, হিজরত ও গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধের মতো ঘটনাগুলো তাদের রচনায় প্রাধান্য পায়। অথচ তার জীবনের অনেক ছোট ও আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ ঘটনার মধ্যেও নিহিত রয়েছে গভীর তাৎপর্য, মূল্যবান শিক্ষা এবং গুরুত্বপূর্ণ ঈমানি ও জাগতিক দিকনির্দেশনা। সেই বিস্মৃত বা আড়ালে থাকা রত্নগুলো খুঁজে বের করে বিভিন্ন লেখকের দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে একত্র করা গেলে মহানবী (সা.)-এর জীবন ও আদর্শকে আরো গভীর, পূর্ণাঙ্গ ও বহুমাত্রিকভাবে উপলব্ধি করা সম্ভব হবে।
আরবি থেকে বাংলা : আহমাদ ফাহমি

খলিফা ওমর (রা.)-এর অর্থব্যবস্থা ও সংস্কার by কাজী যুবাইদা তোহফা
মানবসভ্যতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যেকোনো বড় সাম্রাজ্যের উত্থানের পেছনে থাকে সামরিক পরাক্রম। আর তার দীর্ঘস্থায়িত্বের আসল রহস্য লুকিয়ে থাকে একটি সুসংহত অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর। সাত শতকে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর শাসনকাল ছিল বৈশ্বিক ইতিহাসে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ও অনন্য জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাকাল। কোরআন ও সুন্নাহর মৌলিক দর্শন ও নীতির ওপর ভিত্তি করে তিনি যে অর্থনৈতিক কাঠামো দাঁড় করিয়েছিলেন, তা সমকালীন রোমান বা পারস্য সাম্রাজ্য তো বটেই, আধুনিক অর্থনৈতিক চিন্তায়ও তার ন্যায়ভিত্তিক অর্থনৈতিক নীতিমালা গভীর গবেষণার বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়। এই অর্থব্যবস্থার মূল ভিত্তি ছিল সম্পদকে শুধু ধনীদের মধ্যে আবর্তিত হতে না দিয়ে সমাজের প্রান্তিক স্তরে পৌঁছে দেওয়া এবং রাষ্ট্রে কঠোর প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
খলিফা উমর (রা.)-এর প্রবর্তিত এই বৈপ্লবিক অর্থনৈতিক কাঠামোর মূল গভীরতা অনুধাবন করতে হলে তার পূর্ববর্তী শাসনকালের বাস্তব পরিস্থিতির দিকে দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। ইসলামের প্রাথমিক যুগে রাষ্ট্র পরিচালনার পেছনে কোনো স্থায়ী বা প্রাতিষ্ঠানিক আমলাতন্ত্র গড়ে ওঠেনি। তখন পর্যন্ত রাষ্ট্রে সুনির্দিষ্ট কোনো কর কাঠামো, জাতীয় বাজেট কিংবা স্থায়ী অর্থনৈতিক নীতিমালার কোনো অস্তিত্ব ছিল না। কারণ, খেলাফতের ভৌগোলিক পরিধি তখন প্রধানত আরবের মরুভূমির মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল এবং রাজস্বের আকারও ছিল তুলনামূলক ছোট। কিন্তু উমর (রা.) যখন খেলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ করলেন, তখন পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্যের বিজয়ের মাধ্যমে খেলাফত রাষ্ট্রের সীমানা বিশাল রূপ ধারণ করে। কোটি কোটি দিরহামের রাজস্ব এবং লাখ লাখ নতুন অনারব নাগরিকের অন্তর্ভুক্তির ফলে আগের সেই অনানুষ্ঠানিক ও সাময়িক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে। দূরদর্শী খলিফা উমর (রা.) অনুধাবন করতে পেরেছিলেন, একটি বিশাল আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রকে শুধু সামরিক পরাক্রমের জোরে টিকিয়ে রাখা যাবে না, যদি না তার পেছনে একটি সুশৃঙ্খল, স্থায়ী এবং সুসংহত প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনৈতিক কাঠামো থাকে। ঠিক এই প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক প্রয়োজনেই তিনি প্রথাগত আরবীয় সাময়িক রাজস্ব বণ্টন পদ্ধতি থেকে বের হয়ে এসে রাষ্ট্রের সামগ্রিক অর্থব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ আধুনিক ও নিয়মতান্ত্রিক রূপ দেওয়ার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
বাইতুল মালের প্রাতিষ্ঠানিক আধুনিকায়ন
ইসলামের শুরুর যুগে রাষ্ট্রীয় কোষাগার বা ‘বাইতুল মালে’র কোনো স্থায়ী অবয়ব ছিল না; রাজস্ব এলে তাৎক্ষণিকভাবে বণ্টন করে দেওয়া হতো। বাহরাইন থেকে আসা ৮ লাখ দিরহামের বিশাল রাজস্বও মহানবী (সা.) এক বৈঠকে সর্বসাধারণের মধ্যে বিতরণ করেছিলেন। কিন্তু খেলাফত রাষ্ট্রের পরিধি বৃহৎ পরিসরে বৃদ্ধি পাওয়ায় খলিফা উমর স্থায়ী ও সুসংহত কেন্দ্রীয় বাইতুল মাল ব্যবস্থা গড়ে তোলেন। মদিনায় কেন্দ্রীয় সুবৃহৎ কোষাগার ভবন নির্মাণের পাশাপাশি প্রতিটি বিজিত প্রদেশে এর শাখা বিস্তৃত করা হয় এবং সুরক্ষায় সার্বক্ষণিক পাহারাদার নিযুক্ত করা হয়। কর আদায়ের প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও নিয়মতান্ত্রিক করতে তিনি ‘সাহেবুল খারাজ’ বা কর সংগ্রাহক এবং কোষাগার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ‘সাহিবে বাইতুল মাল’ বা কোষাধ্যক্ষ নিয়োগের মতো সম্পূর্ণ নতুন প্রশাসনিক পদের সৃষ্টি করেন। বাহরাইন থেকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আসার পর উমর (রা.) সাহাবিদের নিয়ে পরামর্শ সভায় বসেন এবং ওয়ালিদ ইবনুল মুগিরার প্রস্তাব অনুযায়ী পারস্য ও রোমানদের আদলে হিসাব সংরক্ষণের স্থায়ী দপ্তর চালু করেন। এই নতুন কেন্দ্রীয় কোষাগারের প্রধান কোষাধ্যক্ষ বা ‘সাহেবে বাইতুল মাল’ হিসেবে তিনি প্রখ্যাত আমানতদার সাহাবি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আরকাম (রা.)-কে নিযুক্ত করেন।
দেওয়ান ব্যবস্থা ও নিয়মতান্ত্রিক আদমশুমারি
প্রশাসনিক দূরদর্শিতার আলোকেই খলিফা উমর (রা.) আরবে প্রথম সুশৃঙ্খল আমলাতান্ত্রিক বাজেট ব্যবস্থাপনা হিসেবে ‘দেওয়ান’ বা রাষ্ট্রীয় রেজিস্ট্রি বিভাগ গঠন করেন। এই ব্যবস্থার নিখুঁত বাস্তবায়নে তিনি খেলাফত রাষ্ট্রে প্রথম নিয়মতান্ত্রিক আদমশুমারির ব্যবস্থা করেন। নাগরিকদের সংখ্যা ও প্রকৃত আর্থিক অবস্থা তালিকাভুক্ত করার পর তিনি বীরত্ব ও ইসলামের ত্যাগের তারতম্য অনুযায়ী ভাতার বৈজ্ঞানিক স্তরবিন্যাস করেন। তিনি বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের প্রত্যেকের জন্য বার্ষিক ৫ হাজার দিরহাম, ওহুদ যুদ্ধের শহীদদের পরিবার ও হাবশায় হিজরতকারীদের জন্য ৪ হাজার দিরহাম এবং তরুণদের জন্য ২ হাজার দিরহাম করে নিয়মিত বৃত্তির ব্যবস্থা করেন। এই ব্যবস্থার লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের আর্থিক অধিকার নিশ্চিত করা। বিখ্যাত ইতিহাসবিদ ইবনে সাদের ‘আত-তবাকাতুল কুবরা’ গ্রন্থের ৩৬০৫ নম্বর বর্ণনা অনুযায়ী, খলিফা উমর ঘোষণা করেছিলেন, ‘(আমি প্রদান করি কিংবা না-ই বা করি) পৃথিবীর সব স্বাধীন মুসলিমের রাষ্ট্রীয় সম্পদে অধিকার রয়েছে। আর আমি যদি বেঁচে থাকি, তবে অবশ্যই ইয়েমেনের মেষপালকের কাছেও তার প্রাপ্য অধিকার পৌঁছে যাবে তার মুখ লাল হওয়ার আগেই (নিজের হকের জন্য কষ্ট করে দাবি করার আগেই)।’ এই দেওয়ানব্যবস্থা ও ভাতা নির্ধারণের শুরুর সময়ে খলিফা উমর (রা.) আরবের বংশ তালিকা ও বীরত্ব অনুযায়ী নির্ভুল তালিকা প্রস্তুত করার জন্য আকিল ইবনে আবু তালেব, মাখরামাহ ইবনে নাওফাল এবং জুবাইর ইবনে মুতইমকে দায়িত্ব দেন। তালিকা প্রস্তুতের পর ভাতা বণ্টনের ক্ষেত্রে তিনি নিজের পরিবার বা গোত্রকে নয়, বরং ইসলামের প্রথম যুগের ত্যাগকে অগ্রাধিকার দিয়ে সর্বপ্রথম মহানবী (সা.)-এর পরিবার এবং বদরি সাহাবিদের নাম রাষ্ট্রীয় খাতায় সবার ওপরে তালিকাভুক্ত করেন।
নিয়মিত সামরিক বাহিনী গঠন ও আর্থিক নিরাপত্তা
উমর (রা.)-এর আগে খেলাফতে নিয়মিত কোনো বেতনভুক্ত সামরিক বাহিনীর অস্তিত্ব ছিল না। তিনি খেলাফতের ইতিহাসে প্রথম নিয়মিত বেতনভুক্ত ও সুশৃঙ্খল সামরিক বাহিনী গঠন করেন। পদাতিক, অশ্বারোহী ও তীরন্দাজদের বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত করে তাদের নাম রাষ্ট্রীয় রেজিস্ট্রি বা দেওয়ানে তালিকাভুক্ত করা হয় এবং বাইতুল মাল থেকে নিয়মিত বেতন ও উন্নতমানের পোশাক-পরিচ্ছদের ব্যবস্থা করা হয়।
যুদ্ধের ময়দানে থাকা সেনাদের পরিবার-পরিজনের সার্বিক অর্থনৈতিক দায়িত্ব খলিফা নিজে তদারকি করতেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের নিয়মিত বেতন-ভাতা বৃদ্ধির বৈপ্লবিক ব্যবস্থা করেছিলেন। সৈন্যদের পারিবারিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে খলিফা উমরের এই নীতি শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এর পেছনে ছিল স্পর্শকাতর ঐতিহাসিক ঘটনা।
এক রাতে খলিফা উমর মদিনার অলিগলিতে সাধারণ প্রজাদের অবস্থা তদারকি করছিলেন। সে সময় একটি বাড়ি থেকে এক নারীর কণ্ঠে গভীর বিরহ ও আকুলতার কবিতা শুনতে পান, যার স্বামী দীর্ঘ সময় ধরে খিলাফতের সীমান্ত রক্ষায় যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়োজিত ছিলেন। এ ঘটনা খলিফার মনকে গভীরভাবে আলোড়িত করে। পরদিন সকালেই তিনি উম্মুল মুমিনিন হাফসা (রা.)-এর কাছে গিয়ে জানতে চান, একজন বিবাহিত নারী তার স্বামী ছাড়া সর্বোচ্চ কতদিন ধৈর্য ধরে থাকতে পারে? উত্তরে তিনি জানান, এই সময়সীমা সর্বোচ্চ চার মাস।
এ ঘটনার ওপর ভিত্তি করেই খলিফা উমর (রা.) তৎক্ষণাৎ একটি ঐতিহাসিক রাষ্ট্রীয় ফরমান জারি করেন—কোনো বিবাহিত সৈনিককে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে চার মাসের বেশি সময় পরিবার থেকে দূরে যুদ্ধক্ষেত্রে রাখা যাবে না। একই সঙ্গে তিনি আইন করেন, যুদ্ধকালীন এই চার মাস সৈন্যদের পরিবারের যাবতীয় ভরণপোষণ ও অর্থনৈতিক ব্যয়ভার রাষ্ট্রীয় কোষাগার বা বাইতুল মাল থেকে সুনিশ্চিত করা হবে।
খলিফা নিজে রাতের আঁধারে যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা সৈন্যদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খাদ্যসামগ্রী ও নগদ অর্থ পৌঁছে দিতেন এবং দূরবর্তী যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আসা সৈন্যদের চিঠিপত্র নিজে বহন করে তাদের পরিবারের কাছে পৌঁছে দিতেন।
এই নিয়মতান্ত্রিক ও মানবিক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ফলেই খেলাফত রাষ্ট্রে সৈন্যদের বীরত্ব এবং তাদের পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা অভূতপূর্ব এক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে।
নবজাতকের নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা
উমর (রা.)-এর অর্থব্যবস্থায় ‘শাসক’ পদের চেয়ে নিজেকে জনগণের ‘পাহারাদার’ ভাবা খলিফা মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে ছিলেন আপসহীন। মদিনার এক অসহায় মায়ের কষ্ট দেখে তিনি নীতি পরিবর্তন করে রাষ্ট্রের প্রতিটি নবজাতক শিশুর জন্যই মায়ের বুকের দুধপানের সময় থেকেই নিয়মিত রাষ্ট্রীয় ভাতার নিয়ম চালু করেন। এই মানবিক রাষ্ট্রদর্শনের পেছনে মদিনার উপকণ্ঠে ঘটে যাওয়া এক স্পর্শকাতর বাস্তব চিত্র বিদ্যমান। এক গভীর রাতে খলিফা উমর এবং আবদুর রহমান ইবনে আওফ যখন মদিনার বাইরে তাঁবু খাটিয়ে থাকা এক কাফেলার নিরাপত্তায় নিয়োজিত ছিলেন, তখন দূর থেকে একটি শিশুর কান্নার আওয়াজ খলিফার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তিনি ঘরের দরজায় গিয়ে মাকে সান্ত্বনা দিতে বললেও দীর্ঘক্ষণ পর আবার কান্নার তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় খলিফা নিজে গিয়ে এর কারণ অনুসন্ধান করেন। খলিফাকে চিনতে না পেরে সেই দুঃখী মা অত্যন্ত আক্ষেপের সঙ্গে জানান, খলিফা শুধু দুধ ছাড়ানো শিশুদের জন্য রাষ্ট্রীয় ভাতার ঘোষণা দিয়েছেন; তাই পেটের দায়ে তিনি জোরপূর্বক তার এই দুগ্ধপোষ্য শিশুকে মায়ের বুক থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টা করছেন, যাতে দ্রুত সরকারি সাহায্য পাওয়া যায়।
অসহায় মায়ের এই নিদারুণ স্বীকারোক্তি খলিফার বিবেককে প্রচণ্ড নাড়া দেয় এবং অনুশোচনায় জর্জরিত হয়ে তিনি ফজরের নামাজে এতটাই কান্না করছিলেন যে মুসল্লিদের পক্ষে তার কিরাত বোঝা কঠিন হয়ে পড়েছিল। মোনাজাত শেষে তিনি বিলাপ করে বলতে থাকেন যে উমরের ভুলের কারণে আজ কত নিষ্পাপ শিশু কষ্টের শিকার হয়েছে। এ ঘটনার পরদিনই খেলাফতে জরুরি ফরমান জারি করা হয়, এখন থেকে কোনো শিশুকে জোর করে দুধ ছাড়াতে হবে না, বরং প্রতিটি নবজাতক পৃথিবীতে ভূমিষ্ঠ হওয়ার মুহূর্ত থেকেই বাইতুল মালের নিবন্ধিত নাগরিক হিসেবে স্থায়ী ভাতার অধিকার লাভ করবে।
স্বজনপ্রীতি রোধ ও মিতব্যয়িতার আদর্শ
দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি রোধে সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত ব্যবসা করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল। কোনো গভর্নর বা সরকারি কর্মকর্তা নিযুক্ত হওয়ার আগে সম্পদের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব নেওয়া হতো এবং দায়িত্ব ছাড়ার সময় অতিরিক্ত বা অবৈধ কোনো সম্পদ পাওয়া গেলে বাজেয়াপ্ত করা হতো। আর এই জবাবদিহির সবচেয়ে বড় উদাহরণ ছিলেন খলিফা নিজে, যিনি বাইতুল মাল থেকে সাধারণ একজন নাগরিকের সমপরিমাণ সর্বনিম্ন ভাতা গ্রহণ করতেন। অগণিত তালি দেওয়া সাধারণ পোশাক পরে বিশ্ব কাঁপানো এই রাষ্ট্রনায়ক প্রমাণ করেছিলেন, শাসকের ভোগবিলাস নয়, বরং মিতব্যয়িতাই রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মূল চাবিকাঠি। এই কঠোর প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও মিতব্যয়িতার নীতিটি খলিফা শুধু মুখে বলেননি, বরং তা প্রয়োগের ক্ষেত্রে নিজের পরিবার কিংবা রাষ্ট্রের প্রভাবশালী সেনাপতিদের প্রতিও কোনো ছাড় দেননি। খেলাফতের অন্যতম সফল ও প্রভাবশালী গভর্নর আমর ইবনুল আস যখন মিসরের দায়িত্ব পালন করছিলেন, তখন তার ব্যক্তিগত সম্পদে আকস্মিক প্রবৃদ্ধি লক্ষ করে খলিফা উমর (রা.) তৎক্ষণাৎ হিসাব তলব করেন। গভর্নর তার এই অতিরিক্ত সম্পদকে বৈধ ব্যবসা ও ব্যক্তিগত উপার্জনের ফসল বলে দাবি করলেও, খলিফা তার নীতিতে অটল থাকেন এবং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদের প্রভাব খাটিয়ে অতিরিক্ত উপার্জনের আশঙ্কার কারণে গভর্নরের সেই বর্ধিত সম্পদের অর্ধেক অংশ রাষ্ট্রীয় ফরমান বলে বাইতুল মালে বাজেয়াপ্ত করেন। এমনকি নিজের প্রিয় পুত্র আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) রাষ্ট্রীয় চারণভূমি ব্যবহার করে চড়া দামে উট বিক্রি করে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জন করলে, খলিফা সরকারি চারণভূমির অনৈতিক সুবিধার কারণে পুত্রের সেই লভ্যাংশের পুরোটা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা করে দেন। নিজের পরিবারের প্রতি রাষ্ট্রপ্রধানের এমন নজিরবিহীন ও আপসহীন অর্থনৈতিক জবাবদিহি সমগ্র খিলাফতে দুর্নীতি এবং স্বজনপ্রীতির পথ চিরতরে রুদ্ধ করে দিয়েছিল।
![]() |
| মুসলিমদের বাইতুল মুকাদ্দাস বিজয়ের স্মৃতিবাহী ঐতিহাসিক ‘ওমর ইবনুল খাত্তাব ময়দান’ |
Friday, August 21, 2026
মাওলানা সাঈদীর মৃত্যু: সেদিন হাসপাতালে যা হয়েছিল by মাসুদ সাঈদী
আব্বাকে ঠিক কোন হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে, তা জানার জন্য আমি এরপর হন্যে হয়ে কারাগারের পরিচিত কর্মকর্তাদের একের পর এক ফোন করতে থাকলাম। কিন্তু কোথাও আব্বাকে আনার খবর পেলাম না। আমি, আমাদের পরিবারের লোকজন এবং শুভাকাঙ্ক্ষীরা মিলে সম্ভাব্য তিনটি হাসপাতালে দৌড়াদৌড়ি করতে থাকলাম। এগুলো হলো জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট, মিরপুর ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন ও পিজি হাসপাতাল। কিন্তু কোথাও আব্বাকে নিয়ে আসার খবর পেলাম না। অবশেষে রাত ১০টারও কিছু সময় পর আমরা জানতে পারলাম আব্বাকে শাহবাগের পিজি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ততক্ষণে খবর ছড়িয়ে পড়েছে আল্লামা সাঈদী অসুস্থ এবং তাকে পিজিতে নিয়ে আসা হচ্ছে। আব্বাকে নিয়ে আসার খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই মানুষের ভিড় জমতে থাকে হাসপাতালের সামনে। রাত ১১টার দিকে অ্যাম্বুলেন্সের আওয়াজ ভেসে এলো পিজির মূল গেটের দিক থেকে। সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশাল বহর।
অ্যাম্বুলেন্স সোজা পিজি হাসপাতালের ডি ব্লকের ইমার্জেন্সির সামনে গিয়ে থামল। সবাই দৌড়ে সেখানে হাজির হওয়ার চেষ্টা করলাম। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আটকে দিল আমাদের সবাইকে।
গাড়ির দরজা খুলল। দুজন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যের কাঁধে ভর করে আব্বা নামলেন। মেহেদি মাখানো লাল দাড়িতে আব্বার চেহারাটা খুব মায়াবি লাগছিল। দুজনের কাঁধে ভর করে নেমেই স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে কাউকে আগে সালাম দেওয়ার সুযোগ না দিয়ে তিনি হাত নেড়ে সবার উদ্দেশে বললেন, ‘আসসালামু আলাইকুম।’ মুহূর্তের মধ্যে একটা শোরগোল পড়ে গেল। গভীর রজনীতে হাসপাতাল কাঁপিয়ে জনতা সমস্বরে উত্তর দিল ‘ওয়ালাইকুম আসসালাম’। আব্বার মুখে তখন সেই ভুবনকাড়া হাসি।
১৩ বছর কারাগারে থাকা অবস্থায় বহুবার আব্বাকে হাসপাতালে আনা হয়েছে। কোনোবার এমন হয়নি যে, আব্বাকে হাসপাতালে আনা হয়েছে অথচ আমি উপস্থিত নেই। আব্বাকে হাসপাতালে আনলে বরাবর আমি যেটা করতাম তা হলোÑআব্বাকে বহনকারী গাড়ি হাসপাতালের গেটে পৌঁছালে আমি গাড়ির দরজার কাছে এগিয়ে যেতাম। আব্বার হাত ধরে তাকে গাড়ি থেকে নামাতাম। এরপর পাশাপাশি হেঁটে আব্বার শারীরিক অবস্থা জানতে জানতে ডাক্তারের চেম্বারের দিকে যেতাম। কিন্তু এই শেষবার ছিল সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। আব্বাকে হাসপাতালে নিয়ে আসার আগেই হাসপাতাল জুড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি দেখে আমি ভীষণ অবাক হয়েছিলাম। হাসপাতাল জুড়েই ছিল তাদের সরব উপস্থিতি। আর আব্বার গাড়ি যখন হাসপাতালে এসে পৌঁছাল, তখন পুরো গাড়িটাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঘিরে ফেলল। তবু ওই অবস্থার মধ্যেই আমি আব্বার দিকে এগিয়ে গেলাম। আমাকে এক প্রকার ধাক্কা দিয়েই আব্বার কাছ থেকে সরিয়ে দেওয়া হলো। ওদের আচরণে আব্বা ভীষণ কষ্ট পেলেন। ধমকের সুরে প্রতিবাদ করলেন। আমাকে কাছে আসতে দিতে বললেন। কিন্তু কোনো কথাই তারা শুনল না। আমি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে ভীষণ তাড়াহুড়া লক্ষ করলাম। ওদের রুক্ষ আচরণে আমি হতবাক হলাম। তবু ভাবলাম, যাক! হাসপাতালে যখন আব্বাকে এনেছে, আজকের রাতটা যাক। আগামীকাল ইনশাআল্লাহ আব্বার সঙ্গে দেখা করব, কথা বলব, আর আব্বার শারীরিক অবস্থার বিস্তারিত জেনে নেব।
কিন্তু কে জানত, আব্বার শারীরিক অবস্থার খোঁজ নেওয়া বা আব্বার সঙ্গে দেখা করার ‘আগামীকাল’—আমার জীবনে আর কোনো দিনই আসবে না।
অ্যাম্বুলেন্স থেকে নামিয়ে হুইলচেয়ারে বসিয়ে দ্রুত আব্বাকে নিয়ে যাওয়া হলো ইমার্জেন্সিতে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু লোক ছাড়া আর কাউকেই ঢুকতে দেওয়া হলো না। তারা ভেতরে ঢুকেই ডি-ব্লকের মূল গেট বন্ধ করে দিল। আমি পাগলের মতো পেছন পেছন ছুটছিলাম ইমার্জেন্সির দিকে, কিন্তু ঢুকতে পারলাম না। ইমার্জেন্সির চেকআপ প্রক্রিয়ায় সব মিলিয়ে সময় লেগেছে ৩০ থেকে ৪০ মিনিটের মতো। এর ফাঁকে আব্বার সঙ্গে কোনো ধরনের আলাপ কিংবা খোঁজখবর নেওয়ার কোনো সুযোগই তারা আমাকে দিল না!
ইমার্জেন্সি রুমে নেওয়ার কিছুক্ষণ পর সেখানে পিজি হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের প্রধান ডা. চৌধুরী মেশকাত আহমেদ এলেন। তার সঙ্গে এলেন পিজি হাসপাতালের ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. এসএম মোস্তফা জামান। তারা কেউই আমাদের পরিচিত নন। তারা ইমার্জেন্সি রুমের বন্ধ দরজার ভেতরে কী আলোচনা করলেন আর কী সিদ্ধান্ত নিলেন, তা আমি বা আমরা জানতেই পারলাম না। তাদের তো উচিত ছিল এই আলোচনা করার সময় রোগীর সন্তান হিসেবে আমাকে বা আমাদের পরিবারের কাউকে সঙ্গে নিয়ে আলোচনা করার, আমাদের বিস্তারিত জানিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার। কিন্তু তারা তা করেননি। শুধু তাই নয়, আব্বার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে আমাদের কোনো কিছু না জানিয়েই ইমার্জেন্সি রুম থেকে তারা বেরিয়ে যান। বাইরে দেশের প্রায় সব ইলেকট্রনিক, প্রিন্ট ও সোশ্যাল মিডিয়ার সাংবাদিকরা আব্বার শারীরিক অবস্থা জানার জন্য অপেক্ষায় ছিলেন। তারা রুম থেকে বের হতেই সাংবাদিকরা ওই দুজন চিকিৎসককে ঘিরে ধরলেন। ডা. চৌধুরী মেশকাত আহমেদ সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা না বলে চলে গেলেন আর ডা. এসএম মোস্তফা জামান সাংবাদিকদের ব্রিফ করা শুরু করলেন। তখন আমি জানতে পারলাম তারা চিকিৎসক এবং তাদের দুজনকে আব্বার চিকিৎসার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ডা. এসএম মোস্তফা জামান সাংবাদিকদের বললেন, “দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী আমার অধীনে কার্ডিয়াক ইমার্জেন্সিতে ভর্তি রয়েছেন। কিছুক্ষণ আগে আমি খবর পেয়ে এখানে এসেছি। বর্তমানে তার শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। প্রাথমিক ইসিজিতে ওনার হার্ট অ্যাটাক পাওয়া গেছে। এর আগেও ওনার হার্টে রিং পরানো হয়েছিল। ধারণা করা হচ্ছিল তার প্রাইমারি পিসিআই লাগবে। অর্থাৎ সঙ্গে সঙ্গে রোগীকে এনজিওগ্রাম করে রিং বসানোর প্রয়োজন হতে পারে। তবে ‘বুকের ব্যথা কমে যাওয়ায়’ আপাতত পিসিআই লাগবে না বলে মনে হচ্ছে(!)। তবে তার শারীরিক অবস্থার বিষয়ে এখনো সুস্পষ্ট মন্তব্য করা যাচ্ছে না। তাকে আমরা কনজারভেটিভ ম্যানেজমেন্টে রাখছি।”
সাংবাদিকদের সঙ্গে ব্রিফিং শেষ হলে ডা. এসএম মোস্তফা জামানের সামনে গিয়ে আমি দাঁড়ালাম। তাকে আমি আমার পরিচয় দিলাম। সোজাসাপ্টা জানতে চাইলাম, ‘আপনি বলছেন আমার আব্বার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। যদি তাই হয়, তাহলে আপনারা এখনো তার এনজিওগ্রাম করছেন না কেন? কেন সময় নষ্ট করছেন?’
ডা. এসএম মোস্তফা জামান জবাবে বললেন, ‘ঠিক এই মুহূর্তে আপনার আব্বার বুকে ব্যথা নেই, তাই এনজিওগ্রাম না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমরা।’
তখন না বুঝলেও এখন বেশ বুঝতে পারছি—তাদের রিপোর্ট(!) অনুযায়ী আব্বার হার্ট অ্যাটাক হলেও ডাক্তাররা আব্বার প্রাইমারি পিসিআই (Primary Percutaneous Coronary Intervention)Ñঅর্থাৎ সঙ্গে সঙ্গে এনজিওগ্রাম কেন করল না? কেন তার মতো বিশ্ববিখ্যাত একজন মানুষের জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করল না? কেন হাসপাতালে এত কঠোর নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল? কেন একটিবারের জন্যও আমাকে আব্বার সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি? কেন আব্বার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে আমাকে একটুও জানতে দেওয়া হয়নি?—তা এখন বেশ বুঝতে পারছি।
পিজির চিকিৎসকরা সিদ্ধান্ত নিলেন প্রাথমিক চেকআপের পর আব্বাকে সিসিইউতে স্থানান্তর করবেন। আমরা রুমের সামনে অপেক্ষমাণ। হঠাৎ রুমের দরজা খুলে গেল। আব্বা হুইলচেয়ারে ঠিক দরজার দিকে মুখ করেই বসা ছিলেন। সামনেই আমরা কয়েকজন দাঁড়ানো। দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে আব্বা আমাকে আর আমার ছোট ভাই নাসীমকে দেখে এক অমায়িক হাসি দিলেন। আমাদের দেখে আব্বা কতটা তৃপ্ত হলেন তা আমি তার মিষ্টি হাসি দেখেই অনুমান করতে পেরেছিলাম। আব্বা ভরসা পেলেন তার সন্তানরা তার কাছেই আছে, তার পাশেই আছে!
সিসিইউ রুমের দরজা মিলিয়ে গেল। আব্বা আমাদের চোখের অন্তরালে চলে গেলেন। আব্বা দুনিয়ার অন্তরালে যাওয়ার আগ মুহূর্তে এভাবেই আমাদের চোখেরও অন্তরালে চলে গেলেন। এই যে যাওয়া এটাই শেষ যাওয়া, এটাই শেষ দেখা। এরপর হাসপাতালের সামনে সিঁড়িতে, ফ্লোরে রাত-দিন এক পায়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম আমিÑ কখন আব্বাকে একনজর দেখার ডাক পাব। চিকিৎসাধীন বাবাকে মৃত্যুর আগে একটিবারের জন্যও তার সন্তানদের দেখার সুযোগ দেওয়া হয় নাÑপৃথিবীর ইতিহাসে এ রকম দ্বিতীয় কোনো ঘটনা আছে কি না আমার জানা নেই।
১৪ আগস্ট ২০২৩, সোমবার। আগের দিন সারারাত নির্ঘুম কাটানোর পর ভোর হতেই আমি সিসিইউতে আবার ঢোকার চেষ্টা করলাম। দোতলায় সিসিইউর সামনে গিয়ে দেখি পঞ্চাশের অধিক পুলিশ সেখানে অবস্থান নিয়েছে। শুধু তাই নয়, সিসিইউর প্রবেশ মুখে পুলিশ চেকপোস্ট বসিয়েছে। আমি অবাক হয়ে গেলাম! এত কঠিন নিরাপত্তাবেষ্টনী কেন?—এমন আগে তো কখনো হয়নি! এখন কী এমন হলো যে এত কঠোর অবস্থানে পুলিশ!!
আব্বার খোঁজ নেওয়ার বা আব্বার সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা বারবার করেও ব্যর্থ হলাম। কী করব? আমার কী করা উচিত?—ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না। হঠাৎ মনে পড়ল ডা. চৌধুরী মেশকাত আহমেদের কথা। গত রাতেই শুনেছিলাম তিনি পিজি হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের প্রধান এবং আব্বা তার অধীনেই ভর্তি আছেন। দৌড়ে গেলাম মেশকাত সাহেবের রুমে। কিন্তু তাকে পেলাম না, তিনি তখনো অফিসে আসেননি। কী আর করা! হাসপাতালের ডি-ব্লকের নিচে একটি সিঁড়ি আছে। আমি সেই সিঁড়িতে গিয়ে বসে পড়লাম, ডা. মেশকাত যখনই রুমে ঢুকবেন আমি যেন তাকে মিস না করি। সম্ভবত বেলা ১১টার দিকে ডা. মেশকাত তার অফিসে এলেন। তিনি অফিসে ঢোকার কিছু পরেই আমি তার রুমের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। সেখানে গিয়ে হতবাক হয়ে গেলাম আমি! তার রুমের সামনেও অনেক পুলিশ। আমি ভেবে পেলাম না এই সাজসাজ রব কীসের জন্য। রুমে ঢুকতে গিয়েই পুলিশি বাধার মুখে পড়লাম। কোথায় যাব, কার কাছে যাব? কেন যাব?— এমন হাজারো প্রশ্ন তাদের! আমি আমার পরিচয় দিলাম, কার কাছে যাব তাও জানালাম। তারা শুনে বলল, অপেক্ষা করুন, সাক্ষাতের অনুমতি আনতে হবেÑএই বলে একজন পুলিশ সদস্য রুমের ভেতরে চলে গেলেন। আমি একা বাইরে দাঁড়িয়ে ভাবছিলামÑএকজন অসুস্থ মানুষের শারীরিক অবস্থার খোঁজ নেওয়ার জন্য ডাক্তারের অফিসে ঢুকতেও পুলিশের অনুমতি লাগবে? ডা. মেশকাত তো সরকারের মন্ত্রী না, এমপিও না, কোনো সচিব না কিংবা ভিআইপি প্রোটোকল পাওয়ার মতো কোনো ব্যক্তিও না! তাহলে? এই লোককে এত পাহারায় রাখার কারণ কী? কোথায় যেন একটা রহস্য লুকিয়ে আছে। কিন্তু ভেবে পাচ্ছিলাম না রহস্যটা কী! অনেক সময় পর একজন রুম থেকে বেরিয়ে এসে আমাকে ডেকে নিয়ে গেলেন। আমি রুমে ঢুকে দেখি সেখানেও পুলিশে ভরা। ডা. মেশকাতের সঙ্গে দুজন লোককে বসা দেখলাম। আমাকে বসতে বলার পর একজন তার পরিচয় দিলেন যে তিনি পিজি হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. রেজাউর রহমান আর অন্যজন গতরাতে সাংবাদিকদের ব্রিফ করা সেই ডা. এসএম মোস্তফা জামান। আমি আব্বার শারীরিক অবস্থার কথা সরাসরি ডা. মেশকাত আহমেদের কাছে জানতে চাইলাম। তিনি বললেন, স্যার আগের থেকে সুস্থ আছেন। এবার আমি বললাম, ‘আমি আব্বার সঙ্গে দেখা করতে চাই এবং তা এখনই। আমি তার মুখ থেকেই শুনতে চাই তিনি কেমন আছেন এবং কেনই বা তাকে এখানে আনা হয়েছে।’ এ পর্যায়ে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. রেজাউর রহমান বললেন, ‘আমরা আপনাকে দেখা করার ব্যবস্থা করছি। আপনি বাইরে অপেক্ষা করুন।’
সরল বিশ্বাসে আমি বাইরে অপেক্ষা করতে লাগলাম। ঘণ্টা পেরিয়ে গেল কিন্তু না ডা. মেশকাত আহমেদ আমাকে কোনো খবর দিলেন, না ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. রেজাউর রহমান আমাকে কোনো খবর দিলেন! আমি ঠিক বুঝতে পারছিলাম না এখন আমার কি করণীয়।
এরপর আমি আইনজীবীদের মাধ্যমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দুটি আবেদন করলাম। প্রথম আবেদনটি হলো— আম্মাসহ আমাদের পরিবারের অন্যসব সদস্যের আব্বার সঙ্গে হাসপাতালে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য সরকারকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আবেদন। আর দ্বিতীয় আবেদনটি হলোÑবয়স ও অসুস্থতা বিবেচনায় আব্বার সার্বক্ষণিক দেখভাল ও সার্বিক সহযোগিতার জন্য পরিবারের পক্ষ থেকে আমি অথবা যেকোনো একজন অ্যাটেনডেন্ট হিসেবে থাকার অনুমতি চেয়ে আবেদন।
বেলা গড়িয়ে ঘড়িতে দুপুর ১টার মতো বাজে। তখনো তাদের দুজনের কেউই আমাকে কোনো মেসেজ না দেওয়ায় আমি আবার ডা. মেশকাত আহমেদের রুমে গেলাম। গিয়ে দেখি তিনি রুমে নেই। অফিস একেবারেই ফাঁকা। সেখান থেকে নেমে আমি সোজা চলে এলাম হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. রেজাউর রহমানের অফিসে। এখানে এসে রেজাউর রহমানের পাশে বসা দেখলাম ডা. এসএম মোস্তফা জামানকে। এখানে গিয়ে রেজাউর রহমানকে পেলাম ঠিকই কিন্তু তিনি তখন সরকারের বিভিন্ন সংস্থা আর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলা নিয়ে ব্যস্ত। আমাকে সময় দেওয়ার মতো সময় তার কোথায়! তবু আল্লাহর সাহায্যে ধৈর্য নিয়ে দাঁতে দাঁত কামড়ে বসে আছি।
আব্বার কোনো খবর জানতে পারছি না, তাকে দেখতে পারছি নাÑএমনিতেই আমার মন খারাপ হয়ে আছে, তার মধ্যে দেখছি পরিচালক সাহেব তার রুমে থাকা লোকজনের সঙ্গে চা-নাশতা আর গল্পে সময় পার করছেন। ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছিল আমার।
ভর দুপুরবেলা। বাইরে তখন প্রচণ্ড রোদ। পরিচালকের রুম থেকে বেরিয়ে আমি একা উদ্ভ্রান্তের মতো হাঁটছি। খুব অসহায় মনে হচ্ছিল নিজেকে। আব্বার সব মামলা সব জায়গায় (জজকোর্ট, সিএমএম কোর্ট, ট্রাইব্যুনাল, হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগ) আমি একা বছরের পর বছর পরিচালনা করেছি। দৌড়িয়েছি, সিনিয়র-জুনিয়র ল’ইয়ারদের চেম্বারে গিয়েছি, করোনার সময়ও আমি নিয়মিত কাসিমপুর কারাগারে গিয়েছি, অসম্ভব পরিশ্রম করেছি কিন্তু আজকের মতো এতটা অসহায় আর দুর্বল কখনোই মনে হয়নি। অজানা আতঙ্ক পেয়ে বসেছিল আমাকে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করার পর আমি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীক ফোন দিলাম। তিনি খুবই আন্তরিকতার সঙ্গে আমাকে আশ্বস্ত করে বললেন, ‘তুমি কোনো চিন্তা করিও না। তোমার আবেদন এখন আমার হাতে। আমি সব ব্যবস্থা করছি । তার কথায় মনটা একটু হালকা হলো।’
আমি সিসিইউতে ওঠার সিঁড়িতে বসে রইলাম। উপরে ওঠার কোনো সুযোগ নেই, কারণ গোটা সিসিইউর এলাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একপ্রকার ঘিরে ফেলেছে। বিকাল ৫টার মতো বেজে গেল। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আমার আবেদন মঞ্জুরের কোনো খবর তখনো এলো না। এদিকে হঠাৎ করেই হাসপাতাল কম্পাউন্ডে প্রশাসনের বেশ কিছু গাড়ি ঢুকতে দেখলাম। অফিশিয়াল ড্রেসের ও সিভিল পোশাকের অনেক নতুন অফিসারকে দেখলাম। পাল্লা দিয়ে বেড়ে যাচ্ছিল ইলেকট্রনিক, প্রিন্ট ও সোশ্যাল মিডিয়ার সাংবাদিকের সংখ্যা। সঙ্গে বাড়ছিল আল্লামা সাঈদীকে ভালোবাসার মানুষের সংখ্যাও। ঘড়ির কাঁটা যখন ৬টা ছুঁয়ে ফেলল এবং আব্বার সঙ্গে সাক্ষাতের তখনো কোনো সুযোগ আমরা পরিবারের সদস্যরা পেলাম না—তখন বুঝলাম আমাদের পরিকল্পিতভাবেই আব্বার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে দেওয়া হচ্ছে না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমার সঙ্গে শুধু মিষ্টি কথার অভিনয় করেছেন আর আমি তার অভিনয়কে সহমর্মিতা ভেবেছিলাম!
মাগরিবের পরপরই আব্বার দ্বিতীয়বার হার্ট অ্যাটাকের খবর শুনি লোকমুখে। পাগলের মতো ছোটাছুটি করেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনো খবর বের করতে পারলাম না। দায়িত্বরত প্রশাসনের লোকজনের কাছে গিয়ে বিষয়টির সত্যতা জানতে চাইলে তারা জানালেন, তিনি একেবারেই স্বাভাবিক আছেন। তারা দেখে এসেই নাকি আমাকে জানাচ্ছেন। কিন্তু তাদের চোখে চোখ রেখে আমি আশ্বস্ত হতে পারলাম না, তাদের চেহারায় বা অভিব্যক্তিতে তাদের কথার সত্যতা খুঁজে পেলাম না। এরই মধ্যে হাসপাতালের পরিবেশ ভারী হতে শুরু করল। কিছুক্ষণ পরপরই সরকার এবং পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের গাড়ি হাসপাতাল চত্বরে আসতে শুরু করল। হাসপাতালের চারদিকে বিপুল পরিমাণে পুলিশ মোতায়েন করা হলো। হাসপাতালের ডাক্তার আর প্রশাসনের লোকদের ছুটোছুটি দেখতে পেলাম।
আব্বাকে হাসপাতালে ভর্তি করার পর থেকে নিয়ে আব্বার দুনিয়ার সফর শেষ করা পর্যন্ত হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কিংবা কর্তব্যরত চিকিৎসকরা আব্বার চিকিৎসার বিষয়ে আমার বা আমাদের সঙ্গে একটিবারের জন্যও কোনো আলোচনা করেননি, আব্বার পুরোনো রোগ কিংবা চিকিৎসা সম্পর্কেও আমাদের কাছে কিছু জানতে চাননি, তারা আব্বার কী চিকিৎসা করছেন, সে সম্পর্কেও আমাদের পরিষ্কার করে কিছু বলেননি, তারা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আব্বার শারীরিক অবস্থার আপডেটও আমাদের জানাননি। সন্ধ্যার পর থেকে আব্বার শারীরিক অবস্থার অবনতি হচ্ছিলÑসেই খবরটিও আমাদের জানাননি। দ্বিতীয়বার আব্বার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে বা কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়েছেÑসেটিও তারা অফিশিয়ালি আমাদের কিছু জানাননি। শেষ পর্যন্ত আব্বাকে তারা লাইফ সাপোর্টে নিয়েছেনÑএ বিষয়েও আমাকে/আমাদের অবহিত করেননি। এমনকি লাইফ সাপোর্টে নেওয়ার বিষয়ে আমাদের কাছ থেকে কোনো লিখিত বা মৌখিক অনুমতিও নেননি। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আব্বার চিকিৎসা প্রক্রিয়াটাই ছিল রহস্যজনক, সন্দেহজনক।
হাজারো ভাবনা, অস্থিরতা আর ছুটোছুটির মধ্যেই এশার আজান হয়ে গেল। সব অস্থিরতা একদিকে রেখে মনের প্রশান্তি আর আব্বার দ্রুত সুস্থতা ও নেক হায়াত কামনায় মালিকের দরবারে সেজদা দেওয়ার জন্য ছোট ভাই নাসীম সাঈদীকে নিয়ে পিজি হাসপাতালের মসজিদের দিকে ছুটলাম। কাকতালীয় কি না জানি না, ইমাম সাহেব শাহাদতের আয়াত ধরলেন। তিনি সুরা আলে ইমরানের ১৬৭ নম্বর আয়াত থেকে তিলাওয়াত শুরু করলেন। যখন তিনি এই আয়াত তিলাওয়াত করছিলেন—যার অর্থ হলো আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছেন, তাদের কখনোই মৃত মনে করো না; বরং তারা জীবিত এবং তাদের রবের কাছ থেকে তারা জীবিকাপ্রাপ্ত হয়ে থাকেন। মনের অজান্তেই চোখ বেয়ে অনর্গল পানি গড়াতে লাগল নামাজের ভেতরেই। মনে হচ্ছিল ভেতরটা ধুমড়ে-মুচড়ে একাকার হয়ে যাচ্ছে। নামাজের ভেতরেই চিৎকার দিতে ইচ্ছে করছিল। চোখের পানি আর ধরে রাখতে পারছিলাম না, টপটপ করে দাড়ি ভিজে পাঞ্জাবিতে পড়ছিল। শরীর কেঁপে কেঁপে উঠছিল। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে চোখের পানিতে নামাজ শেষ করলাম। মোনাজাতরত অবস্থায়ই একজন পুলিশ অফিসার এসে আমাকে সালাম জানালেন। বললেন, রমনা জোনের এডিসি হারুন অর রশীদ ও শাহবাগ থানার ওসি নূর মোহাম্মাদ আমার সঙ্গে কথা বলার জন্য মসজিদের বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন। আমি কান্নাভেজা চোখ সামলে তাদের কাছে যাওয়ার পর তারা তাদের সঙ্গে আমাকে সিসিইউতে যেতে বললেন। আমি ধরেই নিলাম—স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আমাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আব্বার সঙ্গে সাক্ষাতের অনুমতি বুঝি পাওয়া গেল! দীর্ঘক্ষণের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নিয়ে আব্বার রুমের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম আমরা। বহুল প্রতীক্ষিত ডাক আমাদের জন্য।
কিন্তু ডেকে নিয়ে তারা যে সংবাদটি জানালেন, সেটি বইবার মতো ক্ষমতা আমাদের ছিল না। পৃথিবী সমান ওজনদার এক ভয়াবহ দুঃসংবাদ তারা দিলেন আমাদের। আমার পরম শ্রদ্ধেয় আব্বার ইন্তেকালের দুঃসংবাদ দিলেন তারা আমাদের। আব্বা এ দুনিয়াতে আর নেই। মাথা ঘুরতে লাগল। চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। হাত-পা অকেজো হয়ে যেতে লাগল। এত ওজন, এই দুর্বিষহ সংবাদ বহন করার মতো শক্তি কি আমার আছে! চিৎকার করে বলে উঠলাম, কী বলছেন আপনারা এসব। ‘আব্বা আব্বা’ বলে চিৎকার দিলাম। প্রশাসনিক লোকদের শোরগোলে আমার সেই চিৎকার হারিয়ে গেল।
মুক্ত আব্বাকে দেখার স্বপ্ন আর পূরণ হলো না আমার।
ভারতের পোষ্য দল আওয়ামী লীগ ও তাদের গোলাম শেখ হাসিনা আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে কথিত যুদ্ধাপরাধের সাজানো বিচারের নামে বিচারিক হত্যা করতে চেয়েছিল, কিন্তু তা না পেরে চিকিৎসার নামে হত্যার (Medical Killing) পথ বেছে নিয়েছিল।
জালিম শেখ হাসিনা আর তার চিকিৎসক নামের খুনিরা যে একটি মাস্টারপ্ল্যানের মাধ্যমে আল্লামা সাঈদীকে চিকিৎসার নামে হত্যা করেছে, তা এখন বুঝতে পারি।
আমার দৃষ্টিতে ডা. চৌধুরী মেশকাত আহমেদ, ডা. এসএম মোস্তফা জামান ও মো. রেজাউর রহমান ক্লিনিক্যাল নেগ্লিডজেন্সের (Clinical Negligence) মতো ক্ষমাহীন অপরাধজনিত কারণে আমার বাবা আল্লামা সাঈদীকে হত্যার জন্য দায়ী।
কারো হার্ট অ্যাটাক হলে অ্যাটাকের ১২ ঘণ্টার মধ্যে এনজিওগ্রাম করে হার্টে রিং পরানো (Primary Percutaneous Coronary Intervention-PCI) হয় বা রোগীর বুকে ব্যথা থাকলে বা হার্টের গতি এলোমেলো (Arrhythmia) বা পেশেন্ট শকে গেলে সময়ের দিকে না তাকিয়ে দ্রুত এনজিওগ্রাম করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বুকে ব্যথা না থাকলেও ২৪ ঘণ্টার মধ্যে Early PCI-এর মাধ্যমে রোগীকে স্ট্যাবল করা হয়। কিন্তু আল্লামা সাঈদীর ব্যাপারে এর ব্যতিক্রম হলো কেন?
ডা. এসএম মোস্তফা জামান বলেছেন, তারা প্রথমেই আল্লামা সাঈদীকে PCI (Per Cutaneous Intervention) করার সিদ্ধান্ত নেন। পরে রোগীর বুকে ব্যথা না থাকার কারণে তারা আর PCI না করে কনজারভেটিভ ট্রিটমেন্ট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। PCI না করার এটি কোনো কারণ হতে পারে? কার্ডিওলজির আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের নীতিমালায় কোথাও লেখা নেই যে, বুকে ব্যথা না থাকলে বা কমে গেলে PCI করার প্রয়োজন নেই। PCI না করার অন্য কারণগুলো আল্লামা সাঈদীর ক্ষেত্রে তো প্রযোজ্য ছিল না। তাহলে আপনারা কেন PCI করলেন না? এটা স্পষ্ট Medical Negligence, যা সুস্পষ্ট অপরাধ।
ডা. এসএম মোস্তফা জামান বলছেন, আল্লামা সাঈদীকে ৭:১০ মিনিটে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। লাইফ সাপোর্টে নেওয়ার অনুমতি পরিবারের কাছ থেকে নেওয়া হলো না কেন?
হাসপাতালে সার্বক্ষণিক মিডিয়ায় কথা বলেছেন মেডিকেল টিমের সদস্য ডা. এসএম মোস্তফা জামান। তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যবিষয়ক কমিটির সদস্য, ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্রলীগ নেতা এবং ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে শাহবাগিদের কথিত গণজাগরণ মঞ্চে আল্লামা সাঈদীর ফাঁসির দাবিতে উগ্র স্লোগান দেওয়া ব্যক্তি। তার কাছে কি আল্লামা সাঈদী সুচিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ ছিল? যার ফাঁসির দাবিতে যে রাজপথে গলা ফাটিয়েছে, তিনি কি কখনো সুযোগ পেলে ওই লোকটিকে সুচিকিৎসা দিতে পারেন? তাহলে তাকে কেন আল্লামা সাঈদীর চিকিৎসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলো?
এমতাবস্থায় সরকারের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি, আল্লামা সাঈদীকে হত্যার রহস্য উদঘাটনে অনতিবিলম্বে একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হোক এবং সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে আল্লামা সাঈদীকে হত্যার জন্য দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক।
* লেখক : এমপি, আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর তৃতীয় সন্তান
![]() |
| মৃত্যুর একদিন আগে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে অ্যাম্বুলেন্স থেকে নামানোর সময় প্রাণবন্ত মাওলানা সাঈদী। |
Tuesday, August 18, 2026
শাসকের পরামর্শকরা একালে ও সেকালে by এলাহী নেওয়াজ খান
বৈরাম খাঁর সাহচর্যে থেকে আকবর বুঝেছিলেন, হারানো রাজ্যগুলো পুনরুদ্ধার করা এবং বিশাল মোগল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রয়োজন বৈরাম খাঁর মতো দক্ষ ও প্রতিভাবান একদল পরামর্শক। মূলত বৈরাম খাঁই সাম্রাজ্যের অভিভাবক হয়ে আকবরকে রাজ্য শাসনে অভিজ্ঞ করে তুলেছিলেন। তাই সম্রাট আকবর তার অভিজ্ঞতা থেকে জ্ঞান অর্জন করে তার চারপাশে এমন একদল পরামর্শক জড়ো করেছিলেন, যারা ছিলেন বিভিন্ন ক্ষেত্রে অত্যন্ত জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবান। এদের বলা হতো নবরত্ন। প্রকৃতপক্ষেই তারা রত্নই ছিলেন। ইতিহাসে তারা স্বীয় প্রতিভা ও দক্ষতা দিয়ে সমুজ্জ্বল হয়ে আছেন। তাদের মধ্যে কেউ ছিলেন প্রশাসনের দক্ষ, কেউ ছিলেন যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী, কেউ সংগীতজ্ঞ আবার কেউ ছিলেন সভাকবি ।
নবরত্ন হিসেবে পরিচিত সম্রাট আকবরের সেই ৯ জন পরামর্শক হলেন বীরবল : তিনি ছিলেন প্রধান উপদেষ্টা, সেনাপতি ও কৌতুকবিদ। আবুল ফজল : প্রধান সভাকবি এবং আইন-ই-আকবর ও আকবরনামার রচয়িতা। ফৈজি : প্রখ্যাত কবি ও রাজকুমারদের গৃহশিক্ষক। তানসেন : সুরসম্রাট ও বিশ্ববিখ্যাত সংগীতজ্ঞ । টোডরমল : আকবরের দক্ষ অর্থমন্ত্রী ও রাজস্ব সংস্কারক। রাজা মানসিংহ : মোগল সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাপতি। ফকির আজিম উদ্দিন : ধর্মীয় ও সুফিবিষয়ক উপদেষ্টা। আব্দুর রহিম খান-ই-খালান : সেনাপতি, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও হিন্দি দোহার রচয়িতা । মোল্লা দো-পিয়াজা : চতুর ও হাস্যরসাত্মক সভাসদ।
এই উপদেষ্টাদের বা পরামর্শকদের বৈশিষ্ট্য দেখে বোঝা যায় সম্রাট আকবর একজন মহান শাসক হিসেবে নিজেকে কীভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। সাধারণত মানব ইতিহাসজুড়ে নিপীড়নমূলক শাসনের কাহিনি বেশি থাকালেও সম্রাট আকবরের মতো এমন অনেক শাসকের নজির ইতিহাসে আছেন, যার দক্ষ ও প্রতিভাবান পরামর্শকদের সহায়তায় মহান শাসক হিসেবে ইতিহাসে অম্লান হয়ে আছেন। এটি সবাই জানে যে, সম্রাট আকবর নিরক্ষর ছিলেন। কিন্তু তার ছিল তীব্র জ্ঞানপিপাসা। সে কারণেই তিনি তার চারপাশে জড়ো করেছিলেন জ্ঞানীগুণী পরামর্শকরা। তারা তাকে বই পড়ে শোনাতেন এবং তাদের কাছ থেকে তিনি নানা বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করতেন। তাই এ ধরনের সুপরামর্শকদের কারণে একদিকে যেমন তিনি বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে করতে সক্ষম হয়েছিলেন; তেমনি টানা ৫০ বছর শাসন করেছিলেন নির্বিঘ্নে। আর এ কারণেই ইতিহাসবিদরা তাকে ‘আকবর দ্য গ্রেট’ হিসেবে অভিহিত করেছে।
সম্রাট আকবরকে নিয়ে এভাবে শুরু করার মূল লক্ষ্য হচ্ছে, একজন শাসকের জন্য পরামর্শকরা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটি বোঝানোর জন্য। কারণ একজন শাসক কেমন তা জানা যায়, তার চারপাশের পরামর্শকদের দেখে। এ ব্যাপারে চীনা একটি প্রবাদবাক্য আছে। তাতে বলা হয়েছে, পাখি নিজের পালক দেখে দল বাঁধে আর মানুষ চেনা যায় তার সঙ্গীদের দেখে। তাই চীনের বিখ্যাত দার্শনিক ও তাত্ত্বিক কনফুসিয়াস বলেছেন, যদি জানতে চাও কোন দেশের শাসনব্যবস্থা কেমন, তবে তার মন্ত্রীদের দিকে তাকাও।
মূলত একজন শাসক ঠিক তেমন লোকদের নিজের পাশে রাখেন, যাদের চিন্তাভাবনা তার নিজের সঙ্গে মেলে। এটাই আমরা সাধারণত চারপাশে দেখে থাকি। কারণ একই বৈশিষ্ট্যের মানুষ সবসময় এক জায়গায় সমবেত হয়। যাকে আমরা বলি সমমনা। যেমন ধরুন কেউ কোনো মজলিশে গেল। সেখানে প্রথম সে তার সমমনা কেউ আছে কি না খুঁজবে। তা না পেলে সে একাই এক জায়গায় বসে পড়বে। এটাই মানুষের বৈশিষ্ট্য। তাই একজন শাসক যদি সৎ ও ন্যায়পরায়ণ হন, তাহলে তিনি তার চারপাশে এ ধরনের লোকই খুঁজবেন। আর শাসকের জন্য তোষামোদকারীরা সবসময় বিপজ্জনক। তাই যেমন চীনা একজন দার্শনিক বলেছেন, হাজার তোষামোদকারীর হ্যাঁ-বাচক কথার চেয়ে একজন সৎ পরামর্শকের স্পষ্ট ও সত্য কথা অনেক বেশি মূল্যবান।
অন্যদিকে ইতালি ও রেনেসাঁ যুগের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী নিকোলো মেকিয়াভেলি তার বিখ্যাত প্রিন্স গ্রন্থে লিখেছেন, ‘একজন শাসকের বুদ্ধিমত্তা অনুমান করার প্রথম পদ্ধতি হলো তার চারপাশে কেমন মানুষ রয়েছে, তা লক্ষ করা।’
এই প্রেক্ষাপটে এটা বলা যায়, আগেকার দিনে রাজতন্ত্র এবং একালের গণতন্ত্র কিংবা যেকোনো সরকারপদ্ধতিতে একজন শাসক কেমন সেটি বোঝার একমাত্র উপায় হচ্ছে, শাসকের পরামর্শকরা কেমন সেটি দেখে। এছাড়া একজন সৎ ও দক্ষ পরামর্শদাতা শাসকের জন্য আল্লাহর তরফ থেকে বিশেষ অনুগ্রহ। ইতিহাসে এ ধরনের অনুগ্রহপ্রাপ্তদের অনেক নজির আছে। যেমন : ইসলামের ইতিহাসে সত্যবাদিতা, নির্ভীক মনোভাব, দূরদর্শিতা ও নিঃস্বার্থ উপদেষ্টাদের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার অনেক দৃষ্টান্ত আছে। ইসলামের প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর (রা.)-এর কথায়ই ধরা যাক। তার তার খেলাফত পরিচালনায় প্রধান পরামর্শদাতা ছিলেন হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)। উমর (রা.) সবসময় সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে জোরালো মতামত দিতেন, যা খলিফাকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করত। আবার একইভাবে হজরত উমর (রা.)-এর মূল পরামর্শক ছিলেন হজরত আলী (রা.)। তিনি আইন ও নীতিগত পরামর্শ দিতেন। জটিল রাষ্ট্রীয় ও বিচারিক সমস্যায় আলী (রা.)-এর পরামর্শ ছিল অত্যন্ত প্রজ্ঞাপূর্ণ ।
ইসলাম ইতিহাসের ওইসব মহান দৃষ্টান্ত ছাড়াও বিশ্ব ইতিহাসে এ ধরনের আরো অনেক দৃষ্টান্ত আছে। যেমন প্রাচীনকালের আলেকজান্ডারের কথা উল্লেখ করা যায়। তার শিক্ষক ও উপদেষ্টা ছিলেন বিখ্যাত দার্শনিক অ্যারিস্টটল। রাষ্ট্র পরিচালনা, কূটনীতি ও মানবিক মূল্যবোধের বিষয়ে অ্যারিস্টটলের শিক্ষাই আলেকজান্ডারকে একজন বিশ্বজয়ী শাসক হতে উদ্বুদ্ধ করেছিল।
অন্যদিকে বিংশ শতাব্দীতে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের কথা উল্লেখ করা যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় চার্চিলের প্রধান সামরিক পরামর্শক ছিলেন অ্যালেন ব্রুক। তিনি চার্চিলের ভুল সিদ্ধান্তগুলোর সরাসরি বিরোধিতা করতেন। এই নির্ভীক ও যৌক্তিক বিরোধিতাই শেষ পর্যন্ত ব্রিটেন যুদ্ধে জয়ী হতে সাহায্য করেছিল।
যাই হোক, পরিশেষে ইসলামের চতুর্থ খলিফা হজরত আলী (রা.)-এর ঘটনা উল্লেখ করে আমার এই লেখা শেষ করতে চাই। এ ঘটনাটি ‘নাহজুলবালাগা’ গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে। এটিও তো অনেকের জানা আছে, হজরত আলী (রা.)-এর খেলাফতকালে চরম অভ্যন্তরীণ কোন্দল, বিশৃঙ্খলা ও যুদ্ধবিগ্রহ দেখা দিয়েছিল। তখন একজন সাহাবি তার কাছে গিয়ে আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘হে আমিরুল মোমিনিন! হজরত আবু বকর (রা.) ও হজরত ওমর (রা.)-এর সময় তো শাসনব্যবস্থা শান্ত এবং শৃঙ্খল ছিল; কিন্তু আপনার সময় কেন এতটা বিশৃঙ্খলা দেখা দিচ্ছে?
জবাবে হজরত আলী (রা.) বলেছিলেন, তখন আমি ও উসমান এবং অন্যান্য বিজ্ঞ সাহাবা ছিলাম তাদের পরামর্শক আর এখন তোমরা হচ্ছো আমার পরামর্শক। তিনি এ কথা বলে মূলত বোঝাতে চেয়েছিলেন, ভালো শাসন শুধু শাসকদের ওপর নির্ভর করে না; তার চারপাশের মানুষ এবং প্রজাকুল কেমন তার ওপরও নির্ভর করে।
![]() |
| এআই দ্বারা নির্মিত প্রতীকী ছবি। |
Sunday, August 16, 2026
অভ্যুত্থানকারীরা মুজিবকে হত্যার চেয়ে বেশি কিছু ভাবেনি by মিজানুর রহমান খান
বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ডেভিস ইউজিন বোস্টার ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে মূল্যায়নধর্মী অন্তত সাতটি তারবার্তা পাঠান মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরে। ১৬ আগস্ট এ সম্পর্কে প্রাথমিক মন্তব্য শীর্ষক বার্তায় তিনি উল্লেখ করেন, ‘১৫ আগস্ট স্থানীয় সময় ভোর সোয়া পাঁচটায় অভ্যুত্থান শুরু হয়েছিল। ২৪ ঘণ্টা পরের ঘটনা এই আশাবাদ সৃষ্টি করেছে যে এ অভ্যুত্থানকে চ্যালেঞ্জ করা হবে না।’
ওই সময় ওয়াশিংটনেও তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার ঢাকার খবর জানতে উদ্গ্রীব ছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার ১১-১২ ঘণ্টা পর তিনি তাঁর স্টাফ বৈঠকে উল্লেখ করেন, ‘আমি আইএনআর (ব্যুরো অব ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড রিসার্চ) থেকে এ বিষয়ে ভালো তথ্য পাই।’
এ সময় ব্যুরোর পরিচালক উইলিয়াম জি হিল্যান্ড বলেন, ‘আমি যখন আপনার সঙ্গে কথা বলি, মুজিব তখনো মারা যাননি।’ সিআইএর সাবেক চৌকস কর্মকর্তা হিল্যান্ড ৭৯ বছর বয়সে গত বছরের ২৫ মার্চ মারা যান। ‘তিনি ছিলেন এক ভালো বিশ্লেষক। আমাদের গ্রুপে তিনি ছিলেন অবিচ্ছেদ্য অংশ।’ তাঁর মৃত্যুর পর এ মন্তব্য করেন কিসিঞ্জার (ওয়াশিংটন পোস্ট, ২৮ মার্চ ২০০৮)। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট ওয়াশিংটন সময় সকাল আটটার আগে মুজিবের মৃত্যুর বিষয়ে কিসিঞ্জার-হিল্যান্ড কথোপকথনের বিস্তারিত জানা যায়নি।
তবে ১৫ আগস্ট কিসিঞ্জার যখন তাঁর সহকর্মীদের সঙ্গে বৈঠকে শুনলেন, বাংলাদেশের অভ্যুত্থান ছিল সুপরিকল্পিত ও সংগঠিত, তাৎক্ষণিক বললেন, ‘তার মানে কী? মুজিবুর কি জীবিত, না মৃত?’ নিকটপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলফ্রেড আথারটন এ সময় বলেন, ‘মুজিবুর নিহত। তাঁর নিকটতম আত্মীয়স্বজন, যাঁদের অধিকাংশই পরিবারের সদস্য, তাঁরা বেঁচে নেই।’
এ-সংক্রান্ত দলিল থেকে জানা যাচ্ছে, হার্ভার্ড স্নাতকোত্তর ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা আথারটন এবং ১৯৬৯ পর্যন্ত সিআইএতে থাকা হিল্যান্ড বাংলাদেশের এই অভ্যুত্থানের খুঁটিনাটি জানতেন। ১৯৬২-৬৫ সালে কলকাতায় কর্মরত আথারটন ২০০২ সালের ৩০ অক্টোবর মারা গেছেন।
১৯৭৮-৭৯ সালে তিনি মিসরে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ছিলেন। সোভিয়েত বিশেষজ্ঞ হিল্যান্ড প্রেসিডেন্ট ফোর্ডের নিরাপত্তাবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে খ্যাতি কুড়ান। তিনি ফরেন অ্যাফেয়ার্স ম্যাগাজিনের সম্পাদকও ছিলেন।
ওই দিন হিল্যান্ডের মুখে ‘মুজিব তখনো মারা যাননি’ শুনে কিসিঞ্জার পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘সত্যিই তাই? তারা তাহলে মুজিবকে কিছু সময় পরে হত্যা করেছিল?’ এর জবাব দেন নিকটপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী আথারটন। তিনি বলেন, ‘আমরা যত দূর জানি—আমি বলতে পারি না যে আমরা বিস্তারিত সবকিছু জেনে গেছি। কিন্তু ইঙ্গিত ছিল তাঁকে হত্যা পরিকল্পনা বিষয়েই। এবং তারা তাঁর বাড়ি ঘিরে ফেলে। ভেতরে প্রবেশ করে এবং তাঁকে হত্যা করে।’
লক্ষণীয়, বোস্টারের পাঠানো তারবার্তাগুলোয় বিভিন্নভাবে ফুটে উঠেছে যে তিনি ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থান যাতে বাধাগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়ে সংবেদনশীল ও সতর্ক ছিলেন। তিনি ১৬ আগস্ট লিখেছেন, ‘জনসাধারণ যদিও মুজিবের পতনে আনন্দ প্রকাশ করেনি কিন্তু গ্রহণসূচক শান্ত অবস্থা বজায় রয়েছে এবং সম্ভবত তাতে স্বস্তির নিশ্বাসও রয়েছে।
শেখ মুজিব ও বাঙালিরা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। এর কারণ ছিল তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে তাঁর ব্যর্থতা। এবং দৃশ্যত তাঁর ক্ষমতায় থাকাটা হয়ে পড়েছিল মূলত ব্যক্তিগত ক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে। অবশ্য এর সঙ্গে যুক্ত হয় “ডাইন্যাস্টিক রিজনস” অর্থাৎ রাজবংশীয় শাসকদের পরম্পরাসংক্রান্ত কারণ। বাঙালিদের কাছ থেকে মুজিবের বিচ্ছিন্নতা ক্রমশ বাড়ার বড় কারণ ছিল তিনি যথাযথ পরামর্শ গ্রহণ থেকে দূরে সরছিলেন। এমনকি মুজিবের মধ্যে স্বৈরশাসকের চিরায়ত বৈকল্য ফুটে উঠতে শুরু করেছিল।’
বোস্টারের কথায়, ‘জুনের গোড়া থেকে শেখ মুজিব ক্ষমতা আঁকড়ে ধরতে ব্যাকুল হয়ে পড়েছিলেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয় তাঁর ভাগনে শেখ মনির ক্রমবর্ধমান প্রভাব। এসবই অভ্যুত্থানকারীদের সন্দেহমুক্ত করে যে পদক্ষেপ গ্রহণে বিলম্ব করা আর সমীচীন হবে না। তবে অভ্যুত্থানের জন্য ভারতীয় স্বাধীনতা দিবস বেছে নেওয়ার বিষয়টি হয়তো শুধুই কাকতালীয়। এই কাকতালীয় বিষয়টি কিন্তু আমাদের বিবেচনায় লক্ষণীয়।’
বোস্টার এরপর লেখেন, ‘এটা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয় যে পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে। খন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বাধীন বেসামরিক সরকার সামান্যই উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি করতে পেরেছে। যদিও শেখ মুজিবের সঙ্গে যাঁরা ঘনিষ্ঠ ছিলেন, তাঁদের অনেকেই হত্যার শিকার কিংবা বাদ পড়েছেন। কিন্তু তারপরও বর্তমান সরকারে সেসব পরিচিত মুখই রয়ে গেছেন, যাঁরা বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী দুর্বল প্রশাসনের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। স্পষ্টতই মন্ত্রিসভায় এখন যাঁরা রয়ে গেছেন, তা থেকে মনে হয়, মোশতাকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ ধারাবাহিকতা রক্ষা করে চলবে। কিন্তু সেখানে বৃহত্তর মডারেশন থাকবে। ১৫ আগস্ট দেওয়া তাঁর প্রথম বেতার ভাষণে এই দৃষ্টিভঙ্গি সমর্থন করে।
শেখ মুজিবের অভ্যন্তরীণ বিষয়ের নিন্দা করলেও মোশতাক জানিয়ে দিয়েছেন পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতা অনেকটাই অব্যাহত থাকবে। ইতিমধ্যে কিছু লক্ষণ দেখা যাচ্ছে যে নতুন সরকার পাকিস্তানসহ মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে চাইবে।
মোশতাকের সঙ্গে ভারতের সদ্ভাব না থাকার বিষয়টি প্রকাশ্য বিষয় হলেও এটাও পরিষ্কার যে নতুন সরকার ভারতের মনে বাড়তি কোনো সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টি করার দিকে যাবে না। মোশতাকের নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভার দিকে তাকালে সেই ইঙ্গিত মেলে। পুরোনো মুখগুলো রেখে দেওয়ার পেছনে নতুন সরকার কার্যত ভারতের কাছে সেই বার্তাই পৌঁছে দিতে চায়।
মোশতাকের ভাষণে যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনের মতো বৃহৎ শক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ও বন্ধুত্ব সম্পর্ক বজায় রাখার মধ্যে অধিকতর ভারসাম্যপূর্ণ বৈদেশিক সম্পর্ক বজায় রাখার ইঙ্গিত মেলে। এভাবে সরকার সোভিয়েত প্রভাব কিছুটা স্তিমিত করতে চাইছে।’
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের প্রভাব সম্পর্কে উল্লেখ করতে গিয়ে বোস্টার লিখেছেন, ‘নতুন সরকারের সঙ্গে আমাদের নিজেদের সম্পর্ক মুজিব সরকারের চেয়ে “এমনকি আরও অন্তরঙ্গ ভিত্তি”র ওপর প্রতিষ্ঠা পাবে। নতুন রাষ্ট্রপতি অতীতে অত্যন্ত লক্ষণীয় ও প্রকাশ্যে “প্রো–আমেরিকান” দৃষ্টিভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন।
বড় কথা হচ্ছে, মুজিব সরকারের মধ্যে শেখ মনি ও সামাদের (আবদুস সামাদ আজাদ) মতো যাঁরা বামপন্থী ও আমেরিকাবিরোধী হিসেবে পরিচিত ছিলেন, তাঁরা আর নেই। আরও জোরালো সম্ভাবনা হচ্ছে, বাংলাদেশ আমাদের কাছে এখন বেশি পরিমাণে সাহায্য চাইতে পারে। ইতিপূর্বে মোশতাক আমাদের বলেছিলেন, শুধু আমেরিকাই আমাদের সত্যিকারের সাহায্য করতে পারে। সুতরাং আমাদের প্রতি নতুন সরকারের উচ্চাশার বাঁধ নিয়ন্ত্রণই হতে পারে বড় সমস্যা।’
মোশতাক সরকার এবং সামরিক বাহিনীর মধ্যে সম্পর্ক মূল্যায়ন করতে গিয়ে ইউজিন বোস্টার লক্ষণীয়ভাবে উল্লেখ করেন, ‘এটা আমরা বিচার করতে পারি না।’ তাঁর কথায়, ‘আমরা কৌতূহলের সঙ্গে লক্ষ করি যে প্রত্যেক সরকারি বিবৃতিতে ক্ষমতা গ্রহণের অনুকূলে সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা গুরুত্বের সঙ্গে উল্লিখিত হচ্ছে। আমাদের বলা হয়েছে, সামরিক বাহিনী বর্তমানে সামরিক আইন আদেশ এমএলও প্রস্তুত করছে এবং এ ক্ষেত্রে যদি পাকিস্তানি ধাঁচ অনুসরণ করা হয়, তবে তা-ই হবে দেশের আইনের ভিত্তি।
এর ফলে সামরিক ও বেসামরিক লোকের মধ্যে উত্তেজনা বাড়াবে কি না, তা আমরা এখন বলতে পারি না। কিন্তু আমরা এটা ভাবতে পারি, মোশতাক বিবৃতিতে ইতিমধ্যে যা বলেছেন, তাতে গত জানুয়ারিতে মুজিব যা চাপিয়ে দিয়েছিলেন, তার চেয়ে একটি নতুন ও অধিকতর উদার সংবিধান পাওয়া যাবে।’
বোস্টার এ পর্যায়ে আরও উল্লেখ করেন, ‘মুজিবকে উৎখাতে সামরিক বাহিনীর সাফল্যের প্রেক্ষাপটে আমাদের এই ধারণা জন্মেছে যে অভ্যুত্থানকারীরা মুজিবকে হত্যার চেয়ে বেশি কিছু ভাবেনি। যাহোক, সামরিক বাহিনী—বিশেষ করে যেসব তরুণ কর্মকর্তা, যাঁরা অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা ও নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাঁরাই শেখ মুজিবকে উৎখাত করেছেন এবং আমরা সন্দেহ করি এবং যেহেতু তাঁরা রক্তের স্বাদ পেয়েছেন, তখন পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে তাঁরা কিছু ভূমিকা রাখতে চাইবেন।
অভ্যুত্থানের পরিকল্পনাকারীদের মধ্যে কোনো বাঙালি গাদ্দাফিকে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা না করাই ভালো। তার চেয়ে বরং এটা ভাবাই সংগত যে চাকরিমুখো মধ্যবিত্ত শ্রেণির পুরোনো সদস্য—যাঁরা শেখ মুজিব দ্বারা হুমকিগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন, তাঁরা হয়তো একটি অধিকতর উদারপন্থী শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবেন। পাকিস্তানি জমানায় পূর্ব বাংলায় যেমনটা দেখা গিয়েছিল, তার চেয়ে এটা হতে পারে ভিন্ন।’
বোস্টার লেখেন, ‘এখানে একটি বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা উচিত যে রক্তস্নাত হলেও শেখ মুজিবের উৎখাত যখন সফল হয়েছে, তখন আরও অনেক কিছুই করা বাকি রয়েছে। মোশতাকের ভাষণ প্রধানত সাধারণ বিবরণগত দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ এবং এতে আওয়ামী লীগের ইতিপূর্বেকার বাগাড়ম্বর প্রতিধ্বনিত হয়েছে কিন্তু নির্দিষ্ট পদক্ষেপ এ পর্যন্ত যা নেওয়া হয়েছে, তা অল্পই।
দেশ পরিচালনায় সীমিত পদক্ষেপ দেখে আমরা বিস্মিত হইনি। তবে যদি দ্রুত পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে নতুন সরকারের কর্তৃত্ব হ্রাস পেতে শুরু করবে। সে ক্ষেত্রে আমরা খুবই অস্থিরতাপূর্ণ একটি ক্ষমতার লড়াই প্রত্যক্ষ করতে পারি। বাঙালির রাজনৈতিক মঞ্চে শেখ মুজিবের মতো আজ আর কোনো কমান্ডিং পারসোনালিটি বা আদেশদানকারী ব্যক্তিত্ব নেই, যা কিনা মুজিবকে দীর্ঘকাল টিকিয়ে রেখেছিল। বেসামরিক সরকারের পদস্খলন ঘটেছে। আমরা এখন সামরিক বাহিনীর দিকে তাকাতে পারি। জাতিকে বাঁচাতে সেটাই আবশ্যিক।’
* মিজানুর রহমান খান, প্রয়াত সাংবাদিক
![]() |
| ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। ছবি: ফোকাস বাংলা |
Sunday, July 19, 2026
ইরান নয়, ট্রাম্পই এখন বিশ্বের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ by সায়মন টিসডাল
এই সপ্তাহেও প্রেসিডেন্ট দাবি করেছেন যে তিনি ‘বিশাল জয়’ পাচ্ছেন। ট্রাম্প এবং পেন্টাগনের যুদ্ধবাজ প্রধান পিট হেগসেথ কতবার এমন ভুয়া বিজয়ের দাবি করেছেন? কেউ তাঁকে বিশ্বাস করে না।
হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এখন হোয়াইট হাউসের একটি সীমিত ও অধরা লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ট্রাম্পের যুদ্ধংদেহি মনোভাবের কারণেই প্রণালিটি বন্ধ হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বৃহত্তর যুদ্ধের লক্ষ্যগুলো এখন আগের চেয়ে আরও বেশি অলীক মনে হচ্ছে।
মার্কিন বাহিনী যে অকার্যকর হয়ে পড়েছে, তার কারণ ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) শক্তি নয়, ট্রাম্পের কাপুরুষোচিত নেতৃত্ব। ইরান যদি সত্যিই তাদের দাবি অনুযায়ী এতটা বিপজ্জনক হতো, তবে যৌক্তিক পথ ছিল পূর্ণমাত্রায় আক্রমণ চালানো। জর্জ ডব্লিউ বুশ যখন ইরাককে বিপজ্জনক মনে করেছিলেন, তখন তিনি ১ লাখ ৭০ হাজার পদাতিক সৈন্য নিয়ে আক্রমণ করেছিলেন। সেটিও এক বিপর্যয় ছিল।
ট্রাম্প ইরানে তেমন কিছু করার সাহস দেখাবেন না। এই সামান্য স্বস্তির জন্য বিশ্ববাসীর অবশ্যই কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। কিন্তু ট্রাম্প নিজের ভুল স্বীকার করবেন না। তিনি একটি অসমাপ্ত যুদ্ধ অবলীলায় শুরু করেছিলেন। ট্রাম্প বরং বেসামরিক মানুষ ও মার্কিন সৈন্যদের একটি অন্তহীন ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধের মুখে ঠেলে দিতে পছন্দ করেন।
ট্রাম্প উপসাগরীয় আরব মিত্রদের বিপদে ফেলছেন, বিশ্ব অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত করছেন, অনুন্নত দেশগুলোতে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের ঝুঁকি বাড়াচ্ছেন এবং মস্কো থেকে বেইজিংয়ের স্বৈরশাসকদের আনন্দ দিচ্ছেন। আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করছেন এবং তাঁর নিজের রিপাবলিকান পার্টির নির্বাচনী সম্ভাবনা নষ্ট করছেন। এত কিছুর পরও তিনি নিজের ভুল মেনে নিয়ে ‘শান্তি আলোচনা’র মাধ্যমে কূটনৈতিক সমাধানের পথে হাঁটবেন না।
ইরান নয়, ট্রাম্পের আত্ম–অহংকারই এখন বিশ্বের এক নম্বর শত্রু। এই যুদ্ধ অনিয়ন্ত্রিতভাবে ছড়িয়ে পড়ার পেছনে মূল কারণ তিনিই। তিনি একাই একটি জীবন্ত গণবিধ্বংসী অস্ত্র।
এখানে একটি চেনা চিত্র দেখা যাচ্ছে। ট্রাম্প কংগ্রেস, মার্কিন মিত্র বা আমেরিকার জনগণের সঙ্গে কোনো পরামর্শ না করেই যুদ্ধে জড়িয়েছেন। তাঁর কোনো স্পষ্ট পরিকল্পনা বা দীর্ঘমেয়াদি কৌশল ছিল না। তিনি ইসরায়েলের বিতর্কিত প্রধানমন্ত্রীর দ্রুত বিজয়ের ভুয়া আশ্বাস সহজে বিশ্বাস করেছিলেন।
সামরিক ও আঞ্চলিক ঝুঁকি নিয়ে ট্রাম্পের যে অগাধ অজ্ঞতা ছিল, তা বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন দিয়েও দূর করা যায়নি। কারণ, তিনি সেই প্রতিবেদনগুলো পাত্তাই দেননি। আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, ট্রাম্প ভেবেছিলেন, প্রণালিটি বন্ধ করার আগেই ইরান আত্মসমর্পণ করবে।
উপসাগরীয় দেশগুলোতে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের পাল্টাহামলায় ট্রাম্প ‘হতবাক’ হয়েছিলেন। কিন্তু বাকি কেউ অবাক হয়নি। এখন তিনি অথই সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছেন।
গত বছরের গাজার উচ্চাভিলাষী ২০ দফার ‘শান্তি পরিকল্পনা’তেও একই ধরনের অহংকার ও দায়িত্বহীনতা দেখা গিয়েছিল। পুনর্গঠন, আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী গঠন বা নিরস্ত্রীকরণের মতো প্রধান বিষয়গুলোর কোনো অগ্রগতি হয়নি। ট্রাম্প নিজেই এখন এর ওপর থেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন।
হামাস অস্ত্র সমর্পণ করেনি, ইসরায়েলি বাহিনী গাজা থেকে প্রত্যাহার করতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে, মানবিক সহায়তা এখনো বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং অক্টোবরের ‘যুদ্ধবিরতি’র পর থেকে এ পর্যন্ত এক হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে ট্রাম্পের অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রেও একই সমালোচনা প্রযোজ্য। তিনি কখনোই যুদ্ধের মূল কারণ বা ভ্লাদিমির পুতিনের অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে মাথা ঘামাননি। তিনি শক্তিশালী পক্ষকে সমর্থন জুগিয়েছেন এবং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে আধা-আত্মসমর্পণে বাধ্য করার জন্য চাপ দিয়েছেন। সেই চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে কিয়েভের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন।
ট্রাম্পের সেই বোকামি, অধৈর্য ও দায়িত্বহীনতার পুনরাবৃত্তি ঘটছে ইরানে।
এই পরিস্থিতি থেকে নিজেকে মুক্ত করতে না পেরে ট্রাম্প এখন ছটফট করছেন। চলতি সপ্তাহের উত্তেজনার কেন্দ্রে রয়েছে জুনের একটি ‘পারস্পরিক সমঝোতা স্মারক’। এই চুক্তির মাধ্যমে মূল আলোচনার স্বার্থে ৬০ দিনের জন্য সংঘর্ষ স্থগিত রাখার কথা ছিল। ট্রাম্প এই চুক্তিকে নিজের ব্যক্তিগত বিজয় হিসেবে প্রচার করেছিলেন।
কিন্তু ট্রাম্পের অন্য সব চুক্তির মতো এটিও ছিল মারাত্মক ত্রুটিপূর্ণ। এখন এর পরিণতি স্পষ্ট হতে শুরু করায় তিনি পিছুটান দিচ্ছেন। তেহরান যে তাঁকে বিশ্বাস করে না, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। আসলে তাঁকে কে বিশ্বাস করে?
ট্রাম্পের ইরান বিপর্যয়ের কারণে হওয়া ক্ষতি এখন সীমাহীন বলে মনে হচ্ছে। বিশ্ব খুব কমই এমন দৃশ্য দেখেছে। একজন মদ্যপায়ী যেমন প্রতিবার নতুন করে মদ্যপান করার সময় ভাবে যে এবার ফলাফল ভিন্ন হবে, ট্রাম্পও তেমনি প্রতিদিন বোমা হামলা চালিয়ে যাচ্ছেন। অথচ আগের কোনো হামলাই কাঙ্ক্ষিত ফলাফল এনে দিতে পারেনি। তিনি যত বেশি বোমা ফেলছেন, ইরানের শাসকগোষ্ঠী তত বেশি অনড় হচ্ছে। সংঘাত তত বেশি তীব্র ও বিস্তৃত হচ্ছে।
এটি স্পষ্ট যে ট্রাম্পের কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই। তিনি হরমুজ প্রণালিতে নৌ-টোল আরোপের ঘোষণা দিয়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তা প্রত্যাহার করে নেন। বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলার তদারকি করছেন, যা যুদ্ধাপরাধের শামিল হতে পারে। ইয়েমেনের ইরানপন্থী হুতিদের মাধ্যমে লোহিত সাগর অবরোধের মতো মারাত্মক অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হচ্ছেন। এই গভীর জলাভূমি থেকে কীভাবে রক্ষা পাবেন, তা ট্রাম্পের জানা নেই।
ইউরোপীয় মিত্ররা সন্দেহের চোখে তাকাচ্ছে, ওয়াশিংটনের শত্রুরা আনন্দে হাসছে, বিশ্ববাজার আতঙ্কিত এবং তেলের দাম আবার বাড়ছে। প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বে আমেরিকার সুনাম ও প্রভাব কমছে। যখন কেউ আপনাকে সম্মান করে না, তখন পরাশক্তি হওয়া বেশ কঠিন।
ট্রাম্পকে কে থামাবে? কংগ্রেস তাকে যুদ্ধ বন্ধ করতে অথবা আনুষ্ঠানিক অনুমোদন নিতে বলেছে। তিনি তা উপেক্ষা করছেন। জরিপ বলছে, অধিকাংশ আমেরিকান এই ১০০ বিলিয়ন ডলারের মুদ্রাস্ফীতি সৃষ্টিকারী সংকটের বিরুদ্ধে। তবু ট্রাম্প শুনছেন না।
ন্যাটোর আঙ্কারা সম্মেলনে ট্রাম্পের তিরস্কারের শিকার হয়ে ব্যথিত মিত্ররা স্থায়ী ফাটলের ভয়ে তাঁকে থামাতে সাহস পাচ্ছে না। পোপ লিও তাঁর সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এখন হয়তো কেবল প্রার্থনাই বাকি আছে।
নিজের সামরিক বিভ্রান্তির ধ্বংসস্তূপের মধ্যে ক্রেমলিনে বসে পুতিন আনন্দের সঙ্গে দেখছেন যে কীভাবে আমেরিকানরা ইউক্রেন থেকে দূরে, মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি অন্তহীন যুদ্ধে তাদের মূল্যবান ক্ষেপণাস্ত্র ইন্টারসেপ্টর, অর্থ ও শক্তি অপচয় করছে।
পশ্চিমা জোটের মধ্যে ফাটল যত বাড়বে, পুতিন তত বেশি খুশি হবেন। আর চীনের মনোভাব নিয়ে যদি কারও সন্দেহ থাকে, তবে গত সপ্তাহে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে তাদের সাবমেরিন থেকে উৎক্ষেপণ করা দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার দিকে তাকানো উচিত। চীন ইতিমধ্যেই অর্থনৈতিক ও নরম শক্তির দিক থেকে বিশাল সুবিধা পাচ্ছে। আজ হোক বা কাল, সি চিন পিং সামরিকভাবে এর ফায়দা তুলবেন।
ট্রাম্পের এই জটিল ধাঁধার সমাধান শেষ পর্যন্ত আমেরিকার জনগণকেই করতে হবে। তাঁরা তাঁকে নির্বাচিত করেছেন। তাঁরা এই বিপজ্জনক দানবকে বিশ্বের ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন। তাঁর এই ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের জন্য শেষ পর্যন্ত তাঁদেরই সবচেয়ে বেশি মূল্য দিতে হতে পারে।
* সায়মন টিসডাল, গার্ডিয়ানের কলামিস্ট। গার্ডিয়ান থেকে অনূদিত।
![]() |
| ডোনাল্ড ট্রাম্প। রয়টার্স |
কাশ্মিরের শহীদদের দোহাই দিয়ে বলছি by হামিদ মীর
২৩ মার্চ, ১৯৩১ সালে লাহোরে ব্রিটিশ সরকার স্বাধীনতাকামী ভগত সিংকে ফাঁসি দিলে ওই দিন ইয়ংমেনস মুসলিম অ্যাসোসিয়েশন ছাড়াও মীর ওয়ায়েজ মুহাম্মদ ইউসুফ শাহ এই ফাঁসির তীব্র নিন্দা জানান। পরের দিন প্রতিবাদী বিক্ষোভও করেন। এই ফাঁসির কয়েক দিন পর ২৯ এপ্রিল, ১৯৩১ সাল ছিল ঈদুল আজহার দিন। জম্মুর মুসলমানরা শালিমার বাগে ঈদের নামাজ আদায় করছিলেন। মাওলানা মুহাম্মদ ইসহাক তার খুতবায় ফেরাউন ও নমরুদের অত্যাচার ও নিপীড়নের কথা উল্লেখ করলে সেখানে উপস্থিত ডোগরা পুলিশের অন্যতম ইন্সপেক্টর লালা খেম চাঁদ এই খুতবা বন্ধ করে দেন। ওই দিন ইয়ংমেনস মুসলিম অ্যাসোসিয়েশন জম্মুর জামে মসজিদে একটি সভা করে। লালা খেম চাঁদকে বরখাস্ত করার দাবি জানায়।
৪ জুন, ১৯৩১ সালে জম্মুর সেন্ট্রাল জেলে লম্বুরাম নামে এক হিন্দু ইন্সপেক্টর কুরআন অবমাননা করেন। ৬ জুন এ ঘটনার বিরুদ্ধে পুরো জম্মুতে হরতাল পালন করা হয়। প্রতিবাদের এ ধারা মোজাফফরাবাদ ও রাওলাকোট থেকে মিরপুর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। ৫ জুন, ১৯৩১ সালে শ্রীনগরের খানকায়ে মুয়াল্লায় কুরআন অবমাননার বিরুদ্ধে একটি বিশাল সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ওই সমাবেশে আবদুল কাদির নামে এক পাখতুন যুবক ডোগরা সরকারের বিরুদ্ধে এক অগ্নিঝরা বক্তব্য প্রদান করেন; যার পর তাকে গ্রেফতার করা হয়। আবদুল কাদিরের বিরুদ্ধে মামলার শুনানি সাধারণ আদালতে করার পরিবর্তে শ্রীনগরের সেন্ট্রাল জেলে করা হয়। হাজার হাজার কাশ্মিরি মুসলমান শ্রীনগর সেন্ট্রাল জেলের বাইরে জড়ো হয়ে আবদুল কাদিরের পক্ষে সেøাগান দিতে থাকেন। দিনটি ছিল ১৯৩১ সালের ১৩ জুলাই। নামাজের সময় হয়ে গেল। মুসলমানরা জেলের দেওয়ালে চড়ে আজান দেয়া শুরু করলে তাদের ওপর গুলি চালানো হয়। গুলিবর্ষণে ২২ কাশ্মিরি মুসলমান শহীদ হন। পরবর্তীতে দিনটিকে কাশ্মিরি শহীদ দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এই ঘটনার পর শ্রীনগরে মার্শাল ল জারি করা হয়। চৌধুরী গোলাম আব্বাস ও শেখ আবদুল্লাহসহ সব শীর্ষস্থানীয় কাশ্মিরি নেতাকে গ্রেফতার করা হয়। ৩ আগস্ট গ্রেফতারকৃত সব নেতাকে মুক্তি দেয়া হয়। কিন্তু আবদুল কাদিরকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়।
এসব ঘটনার প্রতিবাদে ১৯৩১ সালের ১৪ আগস্ট লাহোরের মোচি গেটের বাইরের বাগানে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে আল্লামা ইকবাল কাশ্মিরের স্বাধীনতা আন্দোলনের ঘোষণা দেন। এ দিনে অপর কিছু শহরেও কাশ্মির দিবস পালন করা হয়। ১৪ সেপ্টেম্বর ১৯৩১ সালে মীর ওয়ায়েজ মাওলানা মুহাম্মদ ইউসুফ শাহ ডোগরা সরকারের বিরুদ্ধে জিহাদের ফতোয়া দেন। এসব কিছু মাত্র ছয় মাসের মধ্যে ঘটেছিল। ২৩ মার্চ সমগ্র জম্মু-কাশ্মির রাজ্য ভগত সিংয়ের ফাঁসির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে। এরপর কুরআন অবমাননার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়। ১৩ জুলাই ২২ কাশ্মিরি মুসলমান শহীদ হন। সেই সাথে ১৪ সেপ্টেম্বর শ্রীনগর থেকে ডোগরা সরকারের বিরুদ্ধে জিহাদের ফতোয়া আসে। এই তারিখগুলো স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, তখন পর্যন্ত অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের পক্ষ থেকে একটি পৃথক স্বদেশের আনুষ্ঠানিক দাবি উত্থাপিত হয়নি। কিন্তু জম্মু-কাশ্মিরের স্বাধীনতা আন্দোলন ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গিয়েছিল। চৌধুরী গোলাম আব্বাস ও সরদার ফতেহ কারেলবিসহ বেশ কয়েকজন কাশ্মিরি নেতা লাহোর এসে আল্লামা ইকবালের সাথে পরামর্শ করেন। একই সাথে ১৯৩২ সালে অল জম্মু-কাশ্মির মুসলিম কনফারেন্স নামে একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করেন।
১৯৩৪ সালে জম্মু-কাশ্মির রাজ্যে প্রথমবারের মাতো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। মুসলিম কনফারেন্স সব ক’টি মুসলিম আসনে জয়লাভ করে। ১৯৩৯ সালে শেখ আবদুল্লাহ মুসলিম কনফারেন্স ভেঙে ন্যাশনাল কনফারেন্স গঠন করেন। ১৯৪৫ সালে শেখ আবদুল্লাহ পণ্ডিত জওয়াহের লাল নেহরুকে ন্যাশনাল কনফারেন্সের বার্ষিক অধিবেশনে বিশেষ অতিথি করেন। এভাবে ন্যাশনাল কনফারেন্স কংগ্রেসের সুরে সুর মেলানোর পথ অবলম্বন করে। অন্য দিকে ২৩ মার্চ, ১৯৪০ সালে লাহোরে অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের অধিবেশনে মুসলিম কনফারেন্সের একটি প্রতিনিধিদল অংশ নেয়। ওই দলে জম্মু, শ্রীনগর, মোজাফফরাবাদ, পুঞ্ছ ও মিরপুরের পূর্ণ প্রতিনিধিত্ব ছিল। এভাবে মুসলিম কনফারেন্স প্রকাশ্যে মুসলিম লীগের পাশে এসে দাঁড়ায়।
১৯৪৪ সালে কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ শ্রীনগর সফর করেন। তিনি শেখ আবদুল্লাহকে পুনরায় মুসলিম কনফারেন্সে ফিরে আসার আমন্ত্রণ জানান। শেখ আবদুল্লাহ তা প্রত্যাখ্যান করেন। ১৭ জুন, ১৯৪৪ সালে শ্রীনগরে মুসলিম কনফারেন্সের বার্ষিক অধিবেশনের বিশেষ অতিথি ছিলেন কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ। এসব ঘটনার পটভূমিতে ১৯ জুলাই, ১৯৪৭ মুসলিম কনফারেন্স শ্রীনগরে তাদের অধিবেশনে পাকিস্তানের সাথে অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব পাস করে।
প্রফেসর এম নাজির আহমদ তেশনার ‘তারিখে কাশ্মির (কাশ্মিরের ইতিহাস ৩২৪ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে ২০২১)’ গ্রন্থের তথ্যানুযায়ী, সরদার ইবরাহিম খানের বাসভবনে অনুষ্ঠিত এ অধিবেশনের সভাপতিত্ব করেন চৌধুরী হামিদুল্লাহ খান। অন্য দিকে জম্মু থেকে চৌধুরী গোলাম আব্বাস, ডাক্তার গোলাম আহমদ জাররাহ, মিরপুরের কর্নেল আলি আহমদ শাহ ও চৌধুরী মুহাম্মদ রফিক, পুঞ্ছের হাজি মুহাম্মদ, মোজাফফরাবাদের মুহাম্মদ আলি কানওয়াল, শ্রীনগরের খাজা আহমদুল্লাহ রেজা, রাজৌরির মির্জা ফকির মুহাম্মদ, চৌধুরী নুর হোসাইন, প্রফেসর ইসহাক কুরাইশি, সোপুরের খাজা গোলাম মহিউদ্দিনসহ রাজ্যের প্রতিটি অঞ্চলের মুসলমান প্রতিনিধিরা পাকিস্তানের সাথে অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব অনুমোদনকারীদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
পাকিস্তান ১৪ আগস্ট, ১৯৪৭ সালে আত্মপ্রকাশ করে। কিন্তু কাশ্মিরি মুসলমানরা ১৪ আগস্টের অনেক আগেই পাকিস্তানি হয়ে গিয়েছিলেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় যে, ১৯ জুলাইয়ের প্রস্তাব অনুমোদনকারী নেতারা নিজেরাই স্বাধীন কাশ্মিরের সমর্থক হয়ে যান। তবে তারা পাকিস্তানের বিরোধী ছিলেন না। ঐতিহাসিক বাস্তবতা এটাই যে, কাশ্মিরিদের স্বাধীনতা ১৯৩১ সালের ১৪ আগস্ট শুরু হয়েছিল। আজো জম্মু-কাশ্মির রাজ্যের সব অঞ্চলে ১৩ জুলাই কাশ্মিরি শহীদ দিবস পালন করা হয়। এরা সেই সব শহীদ, যারা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ১৬ বছর আগে শ্রীনগরে শহীদ হয়েছিলেন। আফসোস, আজ পাকিস্তান সরকারের কিছু মুসলিম লীগ মন্ত্রী দাবি করেন যে, তারা আজাদ কাশ্মিরের অধিবাসীদের পুরোপুরি কাশ্মিরি মনে করেন না। কারণ তাদের সংগ্রাম অধিকৃত কাশ্মিরের মানুষের চেয়ে কম। তাদের ভাষাও ভিন্ন।
১৯ জুলাই, ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের সাথে অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব অনুমোদনকারীদের দীর্ঘ তালিকায় শ্রীনগর থেকে জম্মু এবং মিরপুর থেকে মোজাফফরাবাদ পর্যন্ত রাজ্যের প্রতিটি অঞ্চলের প্রতিনিধিত্বের দিকে লক্ষ্য করুন, এতে প্রতিটি ভাষাভাষী মানুষ অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। ১৩ জুলাই কাশ্মিরি শহীদ দিবস শুধু শ্রীনগরেই নয়, রাওলাকোট ও বাগ থেকে শুরু করে নিলম উপত্যকা ও জম্মুতেও পালন করা হয়।
কাশ্মিরিদের ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞ পাকিস্তানের অযোগ্য শাসকগোষ্ঠী যেন ভুলে না যায় যে, ১৯৮৭ সালে অধিকৃত জম্মু-কাশ্মিরের রাজ্য নির্বাচনে কারচুপিই ভারত সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধের জন্ম দিয়েছিল। শ্রীনগর থেকে সৈয়দ ইউসুফ শাহ নামে একজন প্রার্থীর সাথে কারচুপি করা হলে, তিনি সশস্ত্র প্রতিরোধকারীদের জন্য সৈয়দ সালাহুদ্দিনরূপে আবির্ভূত হন। ভারত সরকার অধিকৃত জম্মু-কাশ্মিরে যে ভুল করেছিল, সেই একই ভুল যেন আজাদ কাশ্মিরে করা না হয়। শক্তির ব্যবহার কাশ্মিরে আরো বেশি বিদ্রোহের জন্ম দেবে। বিশ্বাস না হলে সৈয়দ সালাহুদ্দিনকে জিজ্ঞাসা করুন। নির্বাচনে কারচুপি আরো বেশি প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। লাখ লাখ কাশ্মিরি শহীদের দোহাই দিয়ে বলছি, আজাদ কাশ্মিরে জোরজুলুম ও কারচুপির পথ বেছে নেবেন না।
লেখক: হামিদ মীর, পাকিস্তানের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কলামিস্ট পাকিস্তানের উর্দু দৈনিক জং থেকে ভাষান্তর: ইমতিয়াজ বিন মাহতাব
![]() |
| কাশ্মীরে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ এবং বিদ্রোহী তৎপরতা চলছে। ছবি: বিবিসি |
Thursday, July 9, 2026
ডোনাল্ড ট্রাম্পই কি যুক্তরাষ্ট্রের শেষ জায়নবাদী প্রেসিডেন্ট by ডেভিড হার্স্ট
ট্রাম্পের প্রতি সেখানে কী পরিমাণ ক্ষোভ কাজ করছে, তার একটি বড় উদাহরণ দেশটির প্রভাবশালী ‘চ্যানেল ১৪’-এর প্রাইমটাইম শোর উপস্থাপক ইনন মাগাল। তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে সরাসরি ‘লুজার’ বলে অভিহিত করেছেন। এমনকি ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার ও স্টিভ উইটকফকে ‘ক্ষুদ্র ইহুদি’ বলে কটাক্ষ করেছেন।
ইসরায়েলি রাজনৈতিক বিশ্লেষক ইয়াকভ বারদুগো মন্তব্য করেছেন, ট্রাম্প ও তাঁর ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এখন আধুনিক যুগের ‘চেম্বারলেন’-এ পরিণত হচ্ছেন। তিনি তাঁদের ১৯৩৮ সালে হিটলারের প্রতি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী নেভিল চেম্বারলেনের তোষণনীতির সঙ্গে তুলনা করেছেন।
ডানপন্থী ‘চ্যানেল ১৪’-এর সঞ্চালক শিমন রিকলিন এক্সে লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে রয়েছে এবং ভবিষ্যতে কেউ তার মিত্র হতে চাইবে না।
বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এই বিশ্লেষকদের সুর এখন ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গেছে। তাঁরা যাঁর বিষোদ্গার করছেন, তিনি প্রথম মেয়াদে গোলান মালভূমিকে ইসরায়েলের অংশ এবং জেরুজালেমকে দেশটির রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। এমন আরও বহু উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
অনুগত থেকে ‘বিশ্বাসঘাতক’
গাজায় ইসরায়েলের আগ্রাসনের পক্ষে ট্রাম্প শুরু থেকেই শক্ত অবস্থান নিয়ে আসছেন। অন্যদিকে কুশনার ছিলেন তথাকথিত ‘বোর্ড অব পিস’-এর মূল পরিকল্পনাকারী।
হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে নেতানিয়াহু ও মোসাদপ্রধান ডেভিড বার্নিয়ার ব্রিফিংয়ের পরেই যে ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তা নিয়ে দ্বিমত নেই। মার্কিন ইতিহাসে কোনো বিদেশি নেতার সিচুয়েশন রুমে প্রবেশের এটিই প্রথম ঘটনা। এর আগে ইসরায়েলের কোনো প্রধানমন্ত্রী মার্কিন প্রশাসনের এতটা কাছাকাছি আসতে পারেননি। অথচ আজ সেই ট্রাম্পকেই তারা ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলে আখ্যা দিচ্ছে।
জায়নবাদের ইতিহাসে অবশ্য এমন ফাটল এটাই প্রথম নয়। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, জায়নবাদীরা বারবারই সেই পরাশক্তির বিরুদ্ধে অবাধ্য হয়েছে, যার ওপর তারা নিজেরা নির্ভরশীল ছিল।
একটি ঐতিহাসিক পুনরাবৃত্তি
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের শিবিরে আড়াই লাখ ইহুদি শরণার্থী আটকে থাকা অবস্থায় ব্রিটেন ফিলিস্তিনে এক লাখ ইহুদির অভিবাসনে নিষেধাজ্ঞা দেয়। এর প্রতিবাদে ইহুদি ভূগর্ভস্থ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো একজোট হয়। ফলে ১৯৪৫ থেকে ১৯৪৮ সালের মধ্যে ফিলিস্তিনে ৭৮০ জনের বেশি ব্রিটিশ সেনা, পুলিশ ও বেসামরিক নাগরিক নিহত হন, যাঁদের বড় অংশকেই লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছিল ‘ইরগুন’ এবং ‘স্টার্ন গ্যাং’ (লেহি)-এর মতো গোষ্ঠীগুলো।
অথচ এই ব্রিটেনই ১৯১৭ সালের ‘বেলফোর ঘোষণা’র মাধ্যমে ইহুদিদের স্বতন্ত্র বাসভূমির প্রতিশ্রুতি দিয়ে আরবদের স্বাধীন রাষ্ট্রের অধিকার ক্ষুণ্ন করেছিল। সবচেয়ে ভয়াবহ হামলাটি ঘটে ১৯৪৬ সালের ২২ জুলাই জেরুজালেমের কিং ডেভিড হোটেলে, যা ছিল ব্রিটিশ প্রশাসনের সদর দপ্তর। সেই বোমা হামলায় ৯১ জন নিহত হন, যাঁদের মধ্যে ২৮ জন ছিলেন ব্রিটিশ নাগরিক। আজ পর্যন্ত ইসরায়েল সেই নিহত ব্যক্তিদের কবরকে সম্মান জানাতে অস্বীকৃতি জানালেও হোটেলে বোমা হামলার নেতৃত্বদাতাদের ঠিকই বীরের মর্যাদা দিয়ে আসছে।
এমনকি হলোকাস্টের সময় চার হাজারের বেশি ইহুদিকে মুক্ত করা সুইডিশ কূটনীতিক কাউন্ট ফোল্কে বার্নাডোটও এই ইহুদি সন্ত্রাসীদের হাত থেকে রেহাই পাননি। ইতিহাসের এই ধারা ইসরায়েলের ক্ষেত্রে বারবার ফিরে এসেছে।
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ইসরায়েলকে তাঁর বিদায়ী উপহার হিসেবে ১০ বছর মেয়াদে ৩৮ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা দিয়েছিলেন, যা ছিল মার্কিন ইতিহাসের বৃহত্তম প্যাকেজ।
নেতানিয়াহুর আচরণ প্রসঙ্গে ইসরায়েলি ইতিহাসবিদ আভি শ্লাইম সে সময় ব্রিটিশ পত্রিকা দ্য গার্ডিয়ানে লিখেছিলেন, ‘নেতানিয়াহু ওবামার এই উদারতার জবাব দিয়েছেন চরম অকৃতজ্ঞতা দিয়ে। তিনি ওবামাকে আক্রমণ করার কোনো সুযোগই হাতছাড়া করেননি।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘যে হাত আপনাকে খাওয়ায়, সেই হাতেই কামড় দেওয়ার এর চেয়ে বড় উদাহরণ আর হতে পারে না।’
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ছিলেন উদারপন্থী জায়নবাদী। তিনিও একই আচরণের শিকার হন। জেনারেল আমোস গিলাদ লিখেছেন, নেতানিয়াহু যেভাবে বাইডেনকে নজিরবিহীনভাবে তিরস্কার করেছেন, তা চরম অকৃতজ্ঞতা এবং একটি প্রথম সারির কৌশলগত ব্যর্থতা।
জায়নবাদের আসল রূপ
অনেকের মতে, আমরা আসলে জায়নবাদের আসল ‘শ্রেষ্ঠত্ববাদী’ রূপটিই এখন উন্মোচিত হতে দেখছি। এমনকি নেতানিয়াহু সরকারের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোশে ইয়ালনও এ মতের সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন। এক সাক্ষাৎকারে ইয়ালন বলেন, ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সঙ্গে যুক্ত ধর্মীয় জায়নবাদী আন্দোলনের একটি অংশ মূলত ‘ইহুদি শ্রেষ্ঠত্ববাদী আদর্শ’ ধারণ করে। তিনি আরও যোগ করেন, ‘ইহুদি শ্রেষ্ঠত্ববাদ আসলে হিটলারের “মাইন কাম্ফ”–এর উল্টো সংস্করণ মাত্র।’
ইহুদি শ্রেষ্ঠত্ববাদের এ ধারণা এখন ইসরায়েলের মূলধারার রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে।
ট্রাম্পের সঙ্গে ইসরায়েলের এই বিরোধের আসল কারণ হচ্ছে নতুন ধরনের ধাক্কা। একজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইসরায়েলকে যুদ্ধ থামানোর নির্দেশ দিচ্ছেন। মূলত একটি বসতি স্থাপনকারী উপনিবেশকেরা যখন টের পায়, অভিভাবকের ওপর থেকে তাদের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গেছে, তখন যে ধাক্কা খায়, এটা তারই বহিঃপ্রকাশ।
একই রকম ধাক্কা খেয়েছিল আলজেরিয়ার ফরাসি উপনিবেশবাদীরাও; তারা ১৯৫৮ সালে চার্লস ডি গলকে ফ্রান্সে ক্ষমতায় আনতে সাহায্য করেছিল, কিন্তু পরে দেখে যে সেই ফরাসি প্রেসিডেন্টই আলজেরিয়ার স্বাধীনতাকে সমর্থন করছেন।
অথবা উত্তর আয়ারল্যান্ডের ইউনিয়নিস্ট সম্প্রদায়ের সেই তীব্র ক্ষোভের কথাই ধরা যাক, যখন ব্রিটিশ ইতিহাসের সবচেয়ে কট্টর ইউনিয়নিস্ট প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার ‘অ্যাংলো-আইরিশ চুক্তি’ স্বাক্ষর করেন।
জনমতের সুনামি
ইসরায়েলের ভেতরে যা-ই ঘটুক না কেন, যুক্তরাষ্ট্রে এর প্রভাব অত্যন্ত নেতিবাচক আকার ধারণ করছে। সাম্প্রতিক ঘটনাবলি মার্কিন তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থনকে একেবারে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে বললে ভুল হবে না।
পিউ রিসার্চের এক জরিপে দেখা গেছে, রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেটিক উভয় দলের মধ্যেই ৫০ বছরের কম বয়সী অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক ইসরায়েল ও নেতানিয়াহুকে নেতিবাচকভাবে দেখেন। বর্তমানে ১৮ থেকে ৪৯ বছর বয়সী রিপাবলিকানদের মধ্যে ৫৭ শতাংশই ইসরায়েলের প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করেন।
সামগ্রিকভাবে ৬০ শতাংশ মার্কিন নাগরিকের এখন ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে। আমেরিকায় জনমতের পরিবর্তনের দিকটি এখন দিবালোকের মতো স্পষ্ট।
তবে জনমতের এই পরিবর্তন রাজনৈতিক ক্ষেত্রে কতটা অর্থবহ প্রভাব ফেলবে এবং কখন এটি মার্কিন নীতিতে বড় কোনো পরিবর্তন আনবে, তা নিয়ে এখনো নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রবাসী ইহুদি জনগোষ্ঠীর আবাসস্থল নিউইয়র্কে সম্প্রতি ডেমোক্রেটিক পার্টির তিনজন বর্তমান কংগ্রেস সদস্য পুনর্নির্বাচনে হেরে গেছেন এবং মেয়র জোহরান মামদানি সমর্থিত প্রার্থীরা পাঁচটি স্থানীয় আসনে জয়লাভ করেছেন।
এর পরপরই ডেমোক্র্যাটদের দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত শক্তিকে বড় ধাক্কা দেন আইনজীবী ও পিএইচডি শিক্ষার্থী মেলাত কিরোস। তিনি কলোরাডোর প্রথম সংসদীয় আসন থেকে ডেমোক্রেটিক প্রাইমারিতে বিজয়ী ঘোষিত হন।
কিরোস যাঁকে হারিয়ে দেন, সেই ডায়ানা ডিগেট ইসরায়েলপন্থী লবিং গ্রুপ ‘আইপ্যাক’ থেকে ১৬ লাখ ডলারের বেশি অনুদান পেয়েছিলেন।
‘জিউইশ ভয়েস ফর পিস-অ্যাকশন’ এই ফলাফল প্রসঙ্গে বলেছে, এই নির্বাচন প্রমাণ করেছে যে ডেমোক্রেটিক পার্টির ভেতরে ‘আইপ্যাক’ এখন একটি ‘বিষাক্ত ব্র্যান্ড’-এ পরিণত হয়েছে এবং সাধারণ ডেমোক্র্যাট ভোটাররা এখন আর সেই আইনপ্রণেতাদের দেখতে চান না, যাঁরা গণহত্যাকে সমর্থন বা রক্ষা করেন।
কিন্তু এই ফলাফল কি আসলেই ফিলিস্তিনের পক্ষে কোনো বড় পরিবর্তন নির্দেশ করে, নাকি এটি আইপ্যাকের সমর্থন ছাড়াই উদারপন্থী জায়নবাদীদের ডেমোক্রেটিক পার্টিতে টিকিয়ে রাখার একটি প্রক্রিয়া মাত্র? দলটি কি আসলে ‘নেতানিয়াহু-পরবর্তী’ যুগের প্রস্তুতি নিচ্ছে, যখন ইসরায়েলের প্রতি মার্কিন সমর্থন আবার আগের মতোই প্রাতিষ্ঠানিক ও স্বাভাবিক রূপ পাবে?
এখানে জয়ী ব্যক্তিদের একজন হচ্ছেন ব্র্যাড ল্যান্ডার। মামদানিকে সমর্থন করার আগে নিউইয়র্কের মেয়র পদের দৌড়ে থাকা ল্যান্ডার অতীতে ইসরায়েলবিরোধী ‘বিডিএস’ আন্দোলনের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন। এমনকি নিউইয়র্ক সিটির হিসাবরক্ষক থাকাকালে তিনি ইসরায়েলি অস্ত্র প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এলবিট সিস্টেমে শহরের পেনশন ফান্ডের বিনিয়োগ বাড়িয়েছিলেন। নিজেকে তিনি একজন ‘উদারপন্থী জায়নবাদী’ হিসেবেই পরিচয় দেন।
স্টকটন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক নাজিয়া কাজী মিডল ইস্ট আইকে বলেন, যখন ফিলিস্তিনের সমর্থনে আন্দোলনকারীদের রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে, তখন ফিলিস্তিনপন্থী আন্দোলনের কিছু অংশ ল্যান্ডারের মতো একজন প্রার্থীকে উদ্যাপন করছে, এটি আন্দোলনের পিঠে এক বড় ছুরিকাঘাতের মতো।
কিরোসের বিজয়ের পর, ডেমোক্রেটিক পার্টির সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স এক্সে তাঁকে অভিনন্দন জানিয়ে লিখেছেন, ‘বাতাসের গতি পরিবর্তন হচ্ছে। আমেরিকানরা এখন স্থবির রাজনীতি থেকে মুক্তি চায়।’
মামদানি নিজে বলেছেন, এটি ছিল শ্রমজীবী মানুষের বিজয়। এটি গত বছরের একটি জরিপের ফলাফলকেই সমর্থন করে, যেখানে দেখা গিয়েছিল, মার্কিন ভোটাররা মূলত ঘরোয়া অর্থনৈতিক সমস্যা, সাশ্রয়ী আবাসন এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের মতো বিষয়গুলো দেখেই ভোট দিচ্ছেন।
তবে বিজয়ী প্রার্থীরা তাঁদের বক্তৃতায় ঘরোয়া সমস্যা এবং গাজায় যুদ্ধ বন্ধের দাবিকে একই সুতোয় গেঁথে উপস্থাপন করেছেন।
একটি দীর্ঘ পথ
‘ইউএস/মিডল ইস্ট প্রজেক্ট’-এর প্রেসিডেন্ট ড্যানিয়েল লেভির মতো ইসরায়েল-মার্কিন সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, ইসরায়েলের প্রতি মার্কিন সমর্থন পুনর্মূল্যায়নের এই যাত্রা অত্যন্ত দীর্ঘ এবং আমেরিকা কেবল এর সূচনালগ্নে রয়েছে। তিনি বলেন, ইসরায়েলি লবির শক্তিশালী চাপ, আমাদের নিজেদের পক্ষের ভুল করার প্রবণতা এবং এই পরিবর্তনকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য একটি শক্তিশালী ফিলিস্তিনি মুক্তি আন্দোলনের অনুপস্থিতি—সব মিলিয়ে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে এখনো অনেক সময় লাগবে।
তা সত্ত্বেও মার্কিন জনমতে যে একটি দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে, তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তনগুলোর একটি হলো, ফিলিস্তিন ইস্যুটি এখন রাজনীতির প্রান্তিক পর্যায় থেকে উঠে এসে মার্কিন রাজনীতির মূলধারায় জায়গা করে নিয়েছে।
একসময় যা বামপন্থীদের একটি নির্দিষ্ট এজেন্ডা কিংবা ‘ইসলামপন্থা’ বা ‘সন্ত্রাসবাদ’-এর তকমা দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া হতো, তা এখন মার্কিন রাজনৈতিক মহলের সব স্তরে আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এমনকি মার্কিন ডানপন্থীদের একটি অংশও এখন ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বড় বোঝা হিসেবে দেখতে শুরু করেছে। ইসরায়েল থেকে নিজেদের দূরত্ব বজায় রাখাকে অনেকেই এখন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষুণ্ন হওয়া বৈশ্বিক ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের একটি উপায় হিসেবে দেখছেন।
তবে ফিলিস্তিন ইস্যু মূলধারায় চলে এলেও এর বিতর্কের চারপাশে নতুন কিছু অদৃশ্য দেয়াল বা সীমাবদ্ধতা তৈরি করা হয়েছে। মার্কিন রাজনীতিতে আইপ্যাকের প্রভাব নিয়ে আলোচনা করা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। কিন্তু ফিলিস্তিনিদের প্রতিরোধ, তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের মৌলিক বিষয়গুলো এখনো মার্কিন নীতিনির্ধারণী মহলের ‘ভদ্র ও গ্রহণযোগ্য’ বিতর্কের কাঠামোর বাইরেই থেকে গেছে।
নেতানিয়াহু বা তাঁর পরে যিনিই ক্ষমতায় আসুন না কেন, যুক্তরাষ্ট্রের ডানপন্থীদের কাছে ইসরায়েলকে পুনরায় আগের মতো গুরুত্বপূর্ণ করে তোলা মোটেও সহজ হবে না। ইরানের বিষয়ে সুবিধা করতে না পেরে নেতানিয়াহুর পরবর্তী পদক্ষেপ হতে পারে গাজাকে পুরোপুরি পুনর্দখল করার জন্য নতুন করে যুদ্ধ শুরু করা। কিন্তু গাজায় নতুন করে যেকোনো ধরনের রক্তপাত যুক্তরাষ্ট্রের উভয় রাজনৈতিক শিবিরের মধ্যেই তীব্র ঘৃণার উদ্রেক করবে।
* ডেভিড হার্স্ট, মিডল ইস্ট আইয়ের প্রধান সম্পাদক। মিডল ইস্ট আই থেকে অনূদিত।
![]() |
| যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স |
Tuesday, June 23, 2026
পদ্মা নদীর হক চেয়েছিলেন ভাসানী by গওহার নঈম ওয়ারা
ঢাকা ছাড়া রাজশাহীতে সভা-সমাবেশ-সেমিনার হয়েছে। ঢাকা থেকে এক দিনের ট্রিপে সেখানে যোগ দিয়েছিলেন অনেকে। এসবই খুব উৎসাহের কথা। উদ্যাপন ‘পছন্দ’ মানুষের দেশে এটাই স্বাভাবিক। চোখের বা শরীরের অন্য কোনো পানি দিয়ে ফারাক্কা সমস্যার যে সমাধান সম্ভব নয়, এটা কি আমরা মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর মতো করে আত্মস্থ করতে পেরেছি? আহমদ ছফা বলতেন, ‘ফারাক্কা ব্যারাজের কারণে বাংলাদেশের যে সর্বনাশ ঘটছে, এটা তাঁর (ভাসানীর) চেয়ে স্পষ্ট করে কেউই বোঝে নাই।’
অনেকেই মনে করেন, ফারাক্কার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে (২১ এপ্রিল, ১৯৭৫) আমন্ত্রণ সত্ত্বেও বাংলাদেশের না যাওয়াটা ‘বেয়াদবি’ হলেও সে দিনের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর প্রিয় মাওলানা ভাসানীর কথা শুনেছিলেন। মূলত ভাসানীর অনুরোধে তৎকালীন পানিসম্পদমন্ত্রী আবদুর রব সেরনিয়াবাতকে যাত্রা বাতিল করতে বলা হয়েছিল। ভারতের রাষ্ট্রদূত দুঁদে কূটনীতিক সমর সেন বিস্মিত হয়েছিলেন শেষ মুহূর্তের সেই সিদ্ধান্তে। মুখে কিছু না বললেও সেই অনুষ্ঠানের মধ্যমণি ভারতের কৃষি ও সেচমন্ত্রী জগজীবন রাম যে বেজার হয়েছিলেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। একাত্তরে তিনি ছিলেন ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী; হয়তো সেই সুবাদে তাঁর ধারণা ছিল, ওদের ডাকলেই চলে আসবে।
মাওলানা সাহেবের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবের কী কথা হয়েছিল, তার কোনো রেকর্ড নেই। তবে অনুমান করা যায়, তিনি তাঁকে মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, ১৯৭৪ সালের ১৬ মে বাংলাদেশ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রীদের সেই বৈঠকের কথা। যেখানে দুই প্রধানমন্ত্রী একমত হয়েছিলেন যে শুষ্ক মৌসুমে পানি ভাগাভাগির বিষয়ে দুই দেশ একটি চুক্তিতে না পৌঁছানো পর্যন্ত ফারাক্কা ব্যারাজ চালু করা হবে না। (সূত্র: Rameez Mohd Bhat, International Journal of Applied Research 2020; 6 (2): 264-268 Hydro-politics between India and Bangladesh: A study of Farakka barrage dispute)
সেই ঐকমত্যকে সম্মান না করে ভারত একতরফাভাবে ব্যারাজ খুলে দিতে পারে না। আর খুলে দেওয়ার সেই অনুষ্ঠানের সাক্ষী হওয়া মানে আমাদের পানির অধিকার থেকে পিছু হাঁটা। মাওলানা হয়তো মনে করিয়ে দিয়েছিলেন ১৯৭৩ সালে গঙ্গা নিয়ে ভারতের সঙ্গে প্রথম বৈঠকের কথা। ওই বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় দুই দেশে পানিবণ্টন নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর পরই ফারাক্কা চালু হবে। (সূত্র: প্রাগুক্ত) এরপর ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত দুই দেশের বেশ কয়েকটি বৈঠক হলেও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মতবিরোধের জেরে পানিবণ্টনের বিষয়ে কোনো সমাধানে পৌঁছাতে পারেনি।
ছিয়াত্তরে মাওলানা ভাসানী নব্বই পেরিয়ে গেছেন। বেশির ভাগ সময় থাকেন হাসপাতালে। সেই বছর পয়লা বৈশাখেও (১৫ এপ্রিল) তিনি হাসপাতালে ছিলেন। রমনায় ছায়ানটের অনুষ্ঠান শেষে শাহবাগে এসে তখনকার তরুণ উদীয়মান গায়ক ফকির আলমগীর বললেন, ‘চল হুজুরকে সালাম দিয়ে আসি।’ বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়ন করার সুবাদেই হোক বা ভক্তি থেকেই হোক, তিনি সব সময় মাওলানা ভাসানীকে ‘হুজুর’ বলতেন। মাওলানা ভাসানী ঘুমিয়ে ছিলেন। মনে হলো খুবই ক্লান্ত একটা শরীর অনেক বিশ্রাম চাইছে।
সত্তর সালে মনপুরার ‘রিলিফ লঞ্চে’ (সত্তরের সাইক্লোনে বিধ্বস্ত জনপদে ত্রাণ তৎপরতা) প্রথম দেখা মাওলানার সঙ্গে হাসপাতালে শুয়ে থাকা মাওলানার কোনো মিল দেখলাম না। একটা প্রাণবন্ত বড় আঙুর যেন নিমেষে কিশমিশ হয়ে গেছে। কদিন পর অর্থাৎ ১৯৭৬ সালের ১৮ এপ্রিল হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েই তাঁর ভেতরের সিংহটা যেন জেগে উঠল। মাওলানা ভাসানী ঘোষণা দিলেন ভারত যদি বাংলাদেশকে পানির অধিকার থেকে বঞ্চিত করে, তাহলে তিনি লংমার্চ করবেন। তাঁর এই কর্মসূচি তখন অনেককে বেশ চমকে দিয়েছিল। এটাকে অনেকেই বলেছিলেন তাঁর রাজনৈতিক ‘স্টান্টবাজি’। আদতে এটা ছিল তাঁর শেষ জানবাজি সংগ্রাম। দৈনিক সংবাদ-এর প্রতিনিধি মোনাজাতউদ্দিন ছিলেন সেই মিছিলে (১৬ মে, ১৯৭৬)। পরদিন সংবাদ-এ তাঁর রিপোর্টে লিখেছিলেন, লংমার্চের ৬৪ কিলোমিটার যাত্রা ছিল বেশ কঠিন। সবচেয়ে বড় আশঙ্কা ছিল মাওলানা ভাসানীকে নিয়ে। এমনিতেই তাঁর বয়স ৯০ বছরের বেশি। মোনাজাতউদ্দিনের স্মৃতিচারণামূলক লেখা পথ থেকে পথে বইয়ে (১ জানুয়ারি, ১৯৯১) সে কথা তিনি আবারও উল্লেখ করেছিলেন।
১৯৭৬ সালের ২৮ এপ্রিল মাওলানা ভাসানী এক বিবৃতিতে লংমার্চ সফল করার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানান। এই লংমার্চের আগে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কাছে একটি চিঠি লেখেন মাওলানা ভাসানী। সেই চিঠিতে ইন্দিরা গান্ধীর কাছে লংমার্চের পূর্বাপর কারণ বর্ণনা করেন মাওলানা। এসব কর্মকাণ্ড থেকে অনুমান করা যায়, লংমার্চ কোনো চমক দেখানোর কর্মসূচি ছিল না। ইতিহাসের অংশ সেই চিঠি আজকের তরুণদের অবশ্যপাঠ্য হওয়া উচিত। (সূত্র: ১. বিবিসি বাংলা প্রতিবেদন, ঢাকা ১৬ মে ২০২২; ২. মহসিন শাস্ত্রপাণি/বুলবুল খান মাহবুব সম্পাদিত ‘মজলুম জননেতা মাওলানা ভাসানী স্মারক-সংকলন’; ৩. এম গোলাম মোস্তফা, আহ্বায়ক, জাতীয় কৃষক-শ্রমিক মুক্তি আন্দোলন কর্তৃক লিখিত প্রতিবেদন, ১৯৭৬-এর ভাসানীর ফারাক্কা লংমার্চ, ১৪ মে ২০২৪)
মাওলানা ভাসানীর সেই লংমার্চ আসলে বিষয়টিকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে উপস্থাপনের একটা পটভূমি তৈরি করে। পরে জাতিসংঘের ৩১তম অধিবেশনে জিয়াউর রহমান ফারাক্কার বিষয়টি উত্থাপন করেন। জাতিসংঘ দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের পরামর্শ দেয়। মোরারজি দেশাইয়ের নেতৃত্বে ১৯৭৭ সালে ভারতে প্রথম অ-কংগ্রেস সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করলে দুই দেশের সম্পর্ক কিছুটা উন্নত হয়। সে বছর গঙ্গার পানিবণ্টন নিয়ে পাঁচ বছরের চুক্তি হয়।
এরপর আরও চুক্তি হয়েছে। চলমান চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে ২০২৬ সালে। গঙ্গার পানিবণ্টন নিয়ে স্বাক্ষরিত মোট পাঁচটি চুক্তি বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, বাংলাদেশের পানির হিস্যা ক্রমেই কমেছে। এ ছাড়া উপমহাদেশে অন্যান্য পানিবণ্টন চুক্তির ক্ষেত্রে দেশগুলোয় নদীর মোট প্রবাহকে বিবেচনা করা হয় এবং উজানে নদীর ওপর নির্মিত সব ব্যারাজ, ড্যাম বা বাঁধের তথ্য ভাটির দেশকে দেওয়া হয়। এমনকি ভারত-পাকিস্তানের মধ্যকার সিন্ধু চুক্তিতেও বিষয়টি অনুসরণ করা হয়েছে। কিন্তু গঙ্গা চুক্তির ক্ষেত্রে বিষয়গুলো উপেক্ষা করা হয়েছে।
ভারত বাংলাদেশকে শুধু ফারাক্কা ব্যারাজের পানির তথ্য প্রদান করে। যদিও গঙ্গার উজানে আরও একাধিক ব্যারাজ ও ড্যাম নির্মাণ করে ফারাক্কা পর্যন্ত গঙ্গার স্বাভাবিক প্রবাহকে নানাভাবে বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে/হচ্ছে। তা ছাড়া পশ্চিমবঙ্গের উজানের রাজ্যগুলোও ফারাক্কা নিয়ে তাদের টেনশন চেপে রাখতে পারছে না। গঙ্গার পানির প্রতি তাদের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। যার অর্থ হচ্ছে সামনের দিনগুলোতে আমাদের হিস্যা আরও কমবে বই বাড়বে না। কিন্তু আমাদের পানির প্রয়োজন বাড়ছে। শুধু সুন্দরবনকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে পদ্মার শাখা গড়াই, কুমার, মধুমতীতে বান ডাকা পানি লাগবে। সে পানির সুরাহা হতে পারে আমাদের পানি ধরে রাখার ক্ষমতা বৃদ্ধি আর পানির সাশ্রয়ী ব্যবহারে।
অবশ্য ফারাক্কা দিবসের আলোচনায় ভারত আমাদের চাহিদামতো পানি না দিলে আমরা নিজেদের শক্তিতে কী করতে পারি, সেটার কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি।
মাওলানা ভাসানীর লংমার্চের সমাপনী ভাষণে (১৭ মে, ১৯৭৬) জানিয়েছিলেন, ‘ফারাক্কা সমস্যার সমাধানের জন্য ভারত যদি বাংলাদেশের মানুষের দাবি উপেক্ষা করে, তাহলে ভারতীয় পণ্য বর্জনের আন্দোলন শুরু হবে।’ সে দিন এই লেখক নিজেও মাওলানার কথা শুনেছিলেন। তিনি আরেকটি কথা বলেছিলেন, ‘নদীর একটা হক আছে; সাগরের সঙ্গে তার দেখা করার হক না দিলে দুনিয়া খাঁ খাঁ হয়ে যাবে। মখলুকাত ধ্বংস হয়ে যাবে। ফানা ফিল্লা হবে।’ ভাষণের এই কথাগুলো পরের দিনের কোনো সংবাদপত্রে সেভাবে ছাপা হয়নি।
মোনাজাতউদ্দিনের বই বা সেদিনের মিছিলের অন্যতম সাক্ষী জাতীয় কৃষক সমিতির সাবেক দপ্তর সম্পাদক আবু নোমান খান রচিত প্রবন্ধ মাওলানা ভাসানীর জীবনস্রোত (মহসিন শাস্ত্রপাণি/বুলবুল খান মাহবুব সম্পাদিত মজলুম জননেতা মাওলানা ভাসানী স্মারক-সংকলন বইয়ে প্রকাশিত) লংমার্চের অনেক খুঁটিনাটি থাকলেও ‘নদীর হকের’ কোনো বয়ান নেই। রাজশাহী বেতারের তদানীন্তন কর্মকর্তা জনাব হাসান মীর (গত বছর প্রয়াত) এই লেখককে বলেছিলেন, ‘আমরা আসলে কথাটার মানে বা ইমপ্লিকেশন বুঝতে পারিনি। তাই বেতারের খবরে সেটা জায়গা পায়নি।’ ‘পণ্য বয়কটের’ ঘোষণা বেশি প্রাধান্য পেয়েছিল। তবে নদীর হকের কথা তিনি কয়েকবার উচ্চারণ করেছিলেন।
নদীর হক কী
এই প্রকল্পের আগে ২০১১ সালে রাজশাহীর শ্যামপুরে ১০৩ কোটি টাকার পানি শোধনাগারটি পদ্মায় পানি না থাকায় বছরের অধিকাংশ সময় বন্ধ থাকে।
দেখলাম গোদাগাড়ী উপজেলার সারাংপুর এলাকায় পদ্মা নদীর যে জায়গায় পানি শোধনাগার বসানো হচ্ছে, সেখানে ভারত থেকে গঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকে পদ্মা নাম নিয়েছে। এখান থেকে আবার পদ্মার শাখা নদী হিসেবে বেরিয়ে গেছে মহানন্দা। এই দুই নদীর মোহনায় ওয়াসার এই পানি শোধনাগার বসছে।
শুধু রাজশাহী নয়, পদ্মার পানি উঠিয়ে নেওয়া হচ্ছে ঢাকা নগরবাসীর জন্য। এর জন্য বসেছে ২০১৯ সালে মুন্সিগঞ্জের লৌহজংয়ে পদ্মা-যশলদিয়া পানি শোধনাগার।
আজকাল যে বলা হয় নদী একটি জীবন্ত সত্তা, সেদিন মাওলানা সে কথাটাই বলেছিলেন। পাঠকের নিশ্চয় মনে আছে, ২০১৯ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি দেশের উচ্চ আদালত একটি রায়ে নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ (লিভিং এনটিটি) বলে আদেশ দেন। এর অর্থ মানুষের মতো নদীরও সুস্থ সুন্দর থাকার অধিকার রয়েছে। দখল দূষণ ভরাটের সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে রয়েছে আইনি অধিকার। আদালতের নির্দেশনার ৪৩ বছর আগে নদীর হকের মাধ্যমে মাওলানা সে কথাই বলেছিলেন।
ফারাক্কা দিবসের আলোচনায় কেউ টুঁ শব্দ করেনি নদীদূষণ আর নদীর হক মেরে পদ্মার পানি উত্তোলন নিয়ে। শুধু রাজশাহী মহানগরবাসীর জন্য প্রতিদিন ২০ কোটি লিটার পানি উত্তোলনের মেগা প্রকল্প চালু হয়েছে গোদাগাড়ীতে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সরোয়ার জাহান জানালেন সে কথা। বিগত সরকার ২০২১ সালের ২১ মার্চ চীনের এক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এই প্রকল্প স্থাপনের চুক্তি করে। প্রতিদিন এই পরিমাণ পানি উঠিয়ে নিলে পদ্মা তো পাবনা পর্যন্তই পৌঁছাতে পারবে না। রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্যও পানি লাগবে। সেখানে প্রতিদিন কত কোটি লিটার লাগবে, তার পরিমাণ কোথায়?
খুলনা মহানগরী কেন বসে থাকবে? তারাও পদ্মার শাখা নদীর ওপর ভাগ বসাচ্ছে। মধুমতীর পানি নিয়ে যাওয়া হচ্ছে খুলনায়। এখন খুলনা নগরের সুপেয় পানির প্রায় ৫৩ শতাংশ চাহিদা মেটাচ্ছে মধুমতী একা। এ প্রকল্পের আওতায় খুলনা শহর থেকে ৭১ কিলোমিটার দূরের মধুমতীর পানি পাইপের মাধ্যমে নিয়ে এসে খুলনার সামন্তসেনা এলাকায় পরিশোধন করা হয়। দৈনিক ১১ কোটি লিটার পরিশোধন ক্ষমতাসম্পন্ন একটি শোধনাগারের পাশাপাশি অপরিশোধিত পানি সংরক্ষণের জন্য ৭ লাখ ৭৫ হাজার কিউবিক মিটার ধারণক্ষমতার একটি জলাধার নির্মাণ করা হয়। এতে নগরবাসীর জন্য তিন মাসের পানি মজুত থাকে। ২০১৯ সালের জুন থেকে এই প্রকল্প পুরোদমে কাজ করছে, আর মধুমতী মরছে।
আরও আগে ২০০০-০১ সালে গোপালগঞ্জ শহরের পানির চাহিদা মেটানোর জন্য মধুমতী নদীর পানি উত্তোলন, শোধন ও সরবরাহকাজ শুরু হয় মানিকহার এলাকায়। এটা ছিল প্রথম পানি শোধনাগার; একই এলাকায় দ্বিতীয় পানি শোধনাগারটি বসে ২০১৯-২০২০ সালে।
আমাদের ভুলে গেলে চলবে না পদ্মার শাখা নদ–নদী গড়াই, কুমার, মধুমতী ছাড়া সুন্দরবনে মিঠাপানি পৌঁছানোর আর কোনো পথ নেই। প্রয়োজনের মিঠাপানি না পেলে সুন্দরবন বাঁচবে কীভাবে?
পদ্মাকে বাঁচানোর কোনো পথ নেই?
নগরের প্রয়োজনে পদ্মার পানি ওঠানোর ঝোঁক সামাল দিতে হবে। পদ্মার হক সাগরের সঙ্গে মিলনের অন্তরায় তৈরি করা যাবে না। পদ্মাকে তাজা রাখার আরেকটি জিয়ন কাঠির গল্প পাকিস্তান আমল থেকেই শোনা যেত ‘গঙ্গা/পদ্মা ব্যারাজ’।
১৯৬১ সাল থেকে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ চলছে। ১৯৭০ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান গঙ্গা ব্যারাজের প্রাথমিক কাজের জন্য ৫ কোটি টাকা (রুপি) বরাদ্দ করেছিলেন। হার্ডিঞ্জ ব্রিজের আড়াই মাইল ভাটিতে এই ব্যারাজ নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধের পর ১৯৭৪ সালে গঙ্গা ব্যারাজ সার্কেল গুটিয়ে ফেলা হয়। ফারাক্কার ভয়াবহতা কাটিয়ে উঠতে ১৯৮০ সালে জেনারেল জিয়া কুষ্টিয়ার তালবাড়িয়ায় এই প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। পরে বেশ কয়েকটি সমীক্ষার পর পাংশায় গঙ্গা ব্যারাজ নির্মাণের সুপারিশ করা হয়। ওই সুপারিশমালায় বলা হয়, গঙ্গা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে গড়াইসহ ১৬টি নদ–নদী নাব্যতা ফিরে পাবে; সেই সঙ্গে দূর হবে এই অঞ্চলের লবণাক্ততার আগ্রাসন এবং ফিরে আসবে ফারাক্কার প্রভাবে বিনষ্ট হয়ে যাওয়া প্রাকৃতিক ভারসাম্য।
ব্যারাজের দৈর্ঘ্য ধরা হয়েছে ২ দশমিক ১ কিলোমিটার। পাবনার সুজানগর উপজেলার সাতবাড়িয়া ও নদীর ডান তীর অর্থাৎ নদীর ওপারে রাজবাড়ী জেলার পাংশা উপজেলার হাবাসপুর পর্যন্ত। এই ব্যারাজ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে অন্যান্য অঞ্চলের সরাসরি সড়ক সংযোগ স্থাপন করবে বলে উল্লেখ করে সমীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যারাজের ডেকের ওপর স্থাপিত চার লেন বিশিষ্ট সড়ক সেতু বা প্রান্তে সাত কিলোমিটার সংযোগ সড়কের মাধ্যমে ডান প্রান্তে পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে রাজবাড়ী-কুষ্টিয়া মহাসড়কের সঙ্গে ৮ দশমিক ৫ কিলোমিটার সংযোগ সড়কের মাধ্যমে যুক্ত করবে।
ব্যারাজটি হবে নীলফামারীর ডালিয়ায় নির্মিত তিস্তা ব্যারাজের আদলে। ব্যারাজ থেকে উজানে চাঁপাইনবাবগঞ্জের পাংখা পর্যন্ত ১৬৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে থাকবে বিশাল রিজার্ভার। যার পানি ধারণক্ষমতা থাকবে ২ হাজার ৯০০ মিলিয়ন কিউবিক মিটার। এই পরিমাণ পানি থেকে ব্যারাজের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে ২ হাজার মিলিয়ন কিউবিক মিটার পানি সরবরাহ করা হবে। কিন্তু লাগবে ‘সাত মণ ঘি’। ঘি জোগাড়ের আমল না করে ফারাক্কা মিছিলের স্মৃতিচারণায় পদ্মাকে বাঁচানো যাবে কি? যেকোনো নাগরিককে প্রয়োজনে পদ্মার এক লিটার পানি উত্তোলনের আগে ভাটির জেলাগুলোর কথা ভাবতে হবে। ভাবতে হবে সুন্দরবনের কথা। আর পদ্মার মায়ের সাগরের সঙ্গে মিলনের অধিকারের কথা। নদী মেরে সভ্যতা বাঁচে না, এটা না বুঝলে আমরা সভ্য হই কীভাবে?
লেখক: গবেষক wahragawher@gmail.com
![]() |
| মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে ১৯৭৬ সালের ১৬ মে রাজশাহী থেকে ভারতের ফারাক্কা বাঁধের দিকে বিরাট লংমার্চ হয়। ছবি: ইউএনবি |
BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
- ▼ 2026 (1767)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...
-এর-বাজার-ব্যবস্থাপনা-2c4045.jpg)







