কাউনিয়ার টুপি রপ্তানি হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে by মনিরুল ইসলাম মিন্টু

রংপুরের কাউনিয়া উপজেলা তিস্তা নদীর  কোলঘেঁষা পল্লীগুলোর অপরূপ সৌন্দর্য্য বৈচিত্র্য দারিদ্র্যসহ মঙ্গা এখানকার মহিলাদের একমাত্র অবলম্বন। মেশিনের গতিতে হাতের আঙ্গুলে সুঁই-সুতায় টুপির উপর কারুকায এখানকার মহিলাদের কর্মদক্ষতার প্রকাশ ঘটাতে সক্ষম হয়েছে। সেইসঙ্গে এই তিস্তা পাড়ের প্রায় ১৫ হাজার হতদরিদ্র মহিলাদের জীবন-জীবিকার অন্ন যোগানের পথ করে দিয়েছে টুপি। এই হস্তশিল্প টুপি তৈরির কারখানায় কাজ করে হাজার হাজার মানুষ মঙ্গা  মোকাবিলা করে স্বাবলম্বী হচ্ছে।
কাউনিয়ার মঙ্গাকবলিত মানুষের হাতে তৈরি হস্ত শিল্পের দৃষ্টি নন্দন টুপি দেশের চাহিদা মিটিয়ে এখন রপ্তানী হচ্ছে মধ্য প্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে। বিনিময়ে দেশের জন্য নিয়ে আসছে বিপুল অংকের বৈদেশিক মুদ্রা। উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে দেখা গেছে, হতদরিদ্র নারীরা আনমনে টুপি তৈরির কাজ করছে। দেখে মনে হয় এ যেন তাদের ভাল ভাবে বেঁচে থাকার জীবনযুদ্ধ। এখন উপজেলার নিভৃত পল্লীর দারিদ্র্য মানুষেরা ভুলে যাচ্ছে মঙ্গা শব্দটি। উপজেলার খোপাতী গ্রামের আফরোজা (২৫), রেহানা (২৯), চাঁন্দঘাট গ্রামের মঞ্জুমা (২৬), মোর্শেদা (৩৫), হরিশ্বর গ্রামের মরিয়ম (২৮), মহেশা গ্রামের জহুরা (৩০), ফুলচান (২২)সহ অনেকেই জানান, আগে মঙ্গা এলেই আমাদের খাবারের অভাব দেখা দিত। এখন দুইবেলা খাবারের চিন্তা করতে হয় না। উপজেলার চর ঢুষমারা, চর হয়বৎ খাঁ, নাজিরদহচর, পল্লীমারীচর, গদাই, পাঞ্জর ভাঙ্গারচর, গোপীডাঙ্গা, প্রাণনাথচরসহ তিস্তা নদীর কোলঘেঁষা ২০টি চর অঞ্চলের হতদরিদ্র মানুষ এখন খুঁজে পেয়েছে টুপি তৈরির কাজ। শুধু তাই নয়, উপজেলায় ৬টি ইউনিয়নের মধ্যে ৫টি ইউনিয়নের প্রত্যেক গ্রামেই মহিলারা অবসর সময় টুপিতে কারুকাজ করে বাড়তি আয় করছেন। কাউনিয়ার এমএমসি টুপি তৈরির কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, আমাদের দেশের ২০০২ সালে প্রথম মধ্য প্রাচ্যে হস্তশিল্প কারুকাজ করার টুপি রপ্তানি শুরু করেন চট্টগ্রামের হালিশহরে। তিনি নিজের ৩০ বিঘা জমি বন্দক রেখে প্রায় ৫ লাখ টাকা দিয়ে সম্পূর্ণ নিজ উদ্যোগে হালিশহর এবং ফেনীর রাজাপুর থেকে রেশমী সুতা গুটি সুতা কিনে দেশীয় কাপড় দিয়ে ৩ বছর আগে নিজবাড়িতে টুপি তৈরির কাজ শুরু করেন। এ সময় কাজ করতো মাত্র ৯/১০ জন মহিলা। এরপর অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে ২০০৫ সালে কাউনিয়া সদর এলাকায় টুপি তৈরির কারখানার শুরু করেন। ২০০৬ সালে ভাড়া করা বাসায় কারখানার উদ্বোধন করেন তিনি। বর্তমানে কারখানায় কর্মরত আছেন ৮০ জন পুরুষ ও মহিলা শ্রমিক। মহিলাদের  টুপি প্রতি ৩০ টাকা করে প্রদান করা হয়। তিনি জানান, ২ ধরনের টুপি তৈরি হয় কারখানায়। ১টি টুপি তৈরিতে তার খরচ হয় কাপড়-সুতা মিলে প্রায় ১৫০/- টাকা। প্রতিটি টুপিতে ব্লক ছাপাতে ৬ জনের বেতন দেন মাসিক প্রায় ১১ হাজার টাকা। টুপির কারুকাজ বা হস্তশিল্প ‘হাসু-র’ কাজ করে ৪৭ জন। টুপি প্রতি এরাও পায় প্রায় ১৫ টাকা। এছাড়াও গুটি সেলাইয়ের জন্য তিনটি কারখানার অধীনে বর্তমানে কর্মরত আছে প্রায় ১৫ হাজার মহিলা ও পুরুষ।
এরা অবসর সময়ে নিজ বাড়িতে বসে একটি টুপির গুটি সেলাইয়ের কাজ করে পায় ৩২০-৩৩০ টাকা। সপ্তাহে বৃহস্পতিবার কারখানার সুপারভাইজারদের মাধ্যমে তাদের প্রাপ্য মজুরি প্রদান করা হয়। সব মিলে ১টি টুপির কাজ শেষ করতে খরচ হয় প্রায় ৪৮০ টাকা থেকে ৫৩০ টাকা পর্যন্ত। সপ্তাহে টুপি তৈরি হয় ৪০০ থেকে ৫০০টি। বর্তমানে হালিশহরের দেশ-বিদেশ মিডিয়া সেন্টার, ফেনী জেলার রাজাপুরে জনসেবা হস্তশিল্প, জনতা হস্তশিল্পের মাধ্যমে মধ্য প্রাচ্যের ওমানসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানির জন্য টুপি বিক্রি হচ্ছে। কারখানায় এসে এজেন্টরা তৈরিকৃত টুপি নিয়ে যান। এতে প্রতিটি  টুপি বিক্রি হয় ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা। সব মিটিয়ে তাদের মাসিক আয় হয় ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা। নিজ বাড়ীতে বসে তারা টুপির গুটির কাজ করে পায় ৩২০ টাকা থেকে ৩৩০ টাকা। গ্রামের হতদরিদ্র মহিলারা মাসে ৩/৪টি টুপির কাজ করে ১২ থেকে ১৫ শ’ টাকা বাড়তি আয় করছেন।