Wednesday, March 15, 2023
গল্প- বাবার কিছু ঋণ ছিল by ইমদাদুল হক মিলন
গল্প- বাবার কিছু ঋণ ছিল by ইমদাদুল হক মিলন

৫ অক্টোবর ২০১৭ সকালবেলা
স্যার, একজন লোক আসছে।
কোত্থেকে?
বাইন্নানগর। ইয়ে মানে বানিয়ানগর। পুরান ঢাকার সূত্রাপুর এলাকা।
চোখ তুলে জিন্নাহর দিকে তাকালাম। কী নাম?
রশিদুল।
বানিয়ানগর থেকে এসেছে শুনেই বুঝেছিলাম, রশিদুলই হবে। আমার কিশোরবেলার বন্ধু। বহু বছর তার সঙ্গে দেখা নেই, যোগাযোগ নেই। অথচ একটা সময়ে আমরা দুজন দুজনার জন্য পাগল ছিলাম। দিনের বেশিরভাগ সময় একসঙ্গে। কত রাত রশিদুলের সঙ্গে ওদের বাড়িতে ঘুমিয়েছি।
বসিয়েছিস?
জি স্যার।
চা-নাশতা দে। আসছি।
ড্রয়িংরুমের কোনার দিককার একটা সোফায় বসে আছে রশিদুল। সামনে চা-বিস্কুট-মিষ্টি। আমাকে দেখে উঠে দাঁড়াল। কেমন আছ, দিপু?
ভালো আছি, ভালো আছি। দাঁড়ালে কেন? বসো, চা খাও।
রশিদুল বসল। চায়ে চুমুক দিলো। আমি বসলাম মুখোমুখি সোফায়। অপলক চোখে রশিদুলের দিকে তাকিয়ে রইলাম। ওকে আর চেনাই যায় না। শরীর একেবারেই ভেঙে গেছে। হলুদের কাছাকাছি রঙের ময়লা ফুলহাতা শার্ট পরা। কালো প্যান্টটাও যাচ্ছেতাই রকমের ময়লা। পায়ের স্যান্ডেল নতুন। তবে খুবই সস্তা ধরনের। আমি যে-রশিদুলকে দেখেছি, কে বলবে এই মানুষটাই সে।
পাকা শবরি কলার মতো রং ছিল রশিদুলের। ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় থেকে ব্যায়াম করতো। কী সুন্দর স্বাস্থ্য! চেহারা ফুটফুটে। দামি প্যান্ট-শার্ট পরতো। পকেটে সব সময় টাকা। দুহাতে আমার জন্য খরচা করতো। বাড়ির ছোট ছেলে। অবস্থাপন্ন। মা বাবা বড় দুইভাই খুবই আদর করতো। সদরঘাটে কাপড়ের দোকান ছিল চারটা না পাঁচটা। বড় দুই ছেলে নিয়ে রশিদুলের বাবা চালাতেন। পকেটে পয়সা না থাকলেই দোকানে গিয়ে নিয়ে আসতো রশিদুল। নারিন্দার মোরগ-পোলাও খাওয়াতো আমাকে। আলাউদ্দিন রোডে নিয়ে হাজির বিরিয়ানি খাওয়াতো। সোনা মিয়ার দোকানের দই মিষ্টি, গরমের দিনে গস্নলাসের পর গস্নলাস লাচ্ছি, সালাউদ্দিনের দোকানের সরভাসা চায়ের সঙ্গে পরোটা, বাকরখানি। আমার তখন শুধুই খিদা পেত। অভাবের সংসার। এতগুলো ভাইবোন। বাবার ছোট চাকরি। নিজে না খেয়ে কতদিন রশিদুল আমাকে খাইয়েছে। দুপুরের পর বা রাতের বেলা রশিদুল আমাকে নিয়ে গেছে ওদের বাড়িতে। খাওয়া-দাওয়া হয়ে গেছে। ছোট ছেলের খাবার ঢেকে রেখেছেন ওর মা। একজনের খাবার দুজনে ভাগ করে খাইনি আমরা। রশিদুল বলেছে, তুমি খাও দিপু। আমার খিদা নাই …
তুমি আছো কেমন, রশিদুল?
ভালোই আছিলাম। হঠাৎ একটু বিপদে পড়ছি।
কী করছো এখন?
ওই সেই কাজটাই।
কী যেন করতে তুমি? আমি ভুলে গেছি।
ভুইলা যাওয়ারই কথা। তুমি এত ব্যস্ত লোক। এতদিন দেখা-সাক্ষাৎ নাই। আমি অনেকবার তোমারে ফোন করছি। ধরো নাই। ব্যস্ত ছিলা বা বিদেশে ছিলা। হয়তো আমার ফোন নম্বরও তোমার কাছে সেভ করা নাই।
না সেভ করা আছে। ইচ্ছা করেই ধরিনি।
একটা টাইমে আমি সেইটা বুজছি। এই জন্য আর ফোন করি নাই।
তুমি আমার এমন বন্ধু, তোমার ফোন আমি ধরছি না, তোমার মনে হয়নি, কেন তোমার ফোন আমি ধরছি না?
হয়তো কোনো কারণে আমার উপরে রাগ হইছো।
সেটা তোমার জানতে ইচ্ছা করেনি?
রশিদুল চুপ করে রইল। চায়ে শেষ চুমুক দিলো।
শুধু চা খেলে কেন?
আমি নাশতা কইরা আইছি। তুমি আসার আগে এইখান থিকা একটা মিষ্টিও খাইছি।
ডায়াবেটিস নাই তো?
না। অসুখ-বিসুখ নাই। শরীর ভালোই আছে।
আমিও আলস্নলাহর রহমতে ভালো আছি।
সেইটা তোমারে দেইখাই বুঝা যায়।
তবে তোমার শরীর ভেঙে গেছে।
হ ভাঙছে। নানান অসুবিধায় থাকি। তুমি কাজের কথা জানতে চাইছিলা। আমি বড়লোকদের বাড়ির লনে, কোনো কোনো মিলকারখানার সামনের লনে, পিছনের বাগানে মূর্তি বানাইয়া দেই। ফোয়ারা বানাইয়া দেই। এই সমস্ত কাজ করি।
তাতে চলতে পারো?
পারি। মাঝে মাঝে ভালোই কাজ থাকে হাতে। মাঝে মাঝে থাকে না। কোনো কোনো পার্টি টাকা-পয়সা নিয়া ঘুরায়। তখন বিপদে পড়ি। এইবার সেইরকম একটা বিপদে পড়ছি। নতুন একটা কাজও পাইছি। আড়াই-তিন লাখ টাকার কাজ হইব। এইসব কাজের শুরুর সময় নিজের কিছু ইনভেস্ট করতে হয়। হাতে নাই কিছুই। বড় মেয়েটা আইএ পরীক্ষা দিব, ওর লেইগাও কিছু টাকার দরকার …
তোমার তো দুটোই মেয়ে?
হ। আমি বিয়া করলাম অনেক দেরি কইরা। বড় মেয়েটা আইএ পড়ে, ছোটটা পড়ে ক্লাস নাইনে …
আর আমি দাদা হয়ে গেছি। নাতনির বয়স আট বছর।
তাই নাকি? গগনের মেয়ের আট বছর বয়েস?
হ্যাঁ। সে হচ্ছে আমার জান। সারাক্ষণ দাদার সঙ্গে। ওর জন্যই গগনকে বিজনেস বুঝিয়ে দিয়েছি। কিছুই আমি দেখি না। গগন আর ওর বউ দেখে। আমার বউমার নাম অনন্যা। সেও অস্ট্রেলিয়া থেকে এমবিএ করে এসেছে। গগনের সঙ্গেই পড়তো। দারুণ মেয়ে। যেমন হিসাবি, তেমন সংসারি। ওরা দুজন বিজনেস সামলায় আমি আর শাহিন আছি নাতনি নিয়ে। নাতনির নাম জাইমা।
তোমার ছেলের নাম গগন, এইটা আমার মনে আছে। কাকার ডাকনাম আছিল গগন। এইজন্য তুমি তোমার ছেলের নাম রাখছো।
বাবার কথা মনে হলেই আমার দীর্ঘশ্বাস পড়ে। এখনো পড়ল। কী অমানুষিক কষ্ট একজন মানুষ তাঁর সংসার-ছেলেমেয়েদের জন্য করে গেছেন। আজকালকার দিনে সেটা ভাবাই যায় না। আমার ভাইবোনরা সবাই ভালো আছে। কেউ দেশে, কেউ আমেরিকা-অস্ট্রেলিয়ায়, কেউ ইতালিতে, কেউ ওমানে। বাবার কষ্টের কথা, আমাদের অতীতের কথা মনেও রাখেনি। এমনকি বাবার মৃত্যুদিনটির কথাও মনে রাখে না কেউ কেউ।
আমি রেখেছি। যখনই নিজের ছেলেটিকে দেখি, নাম ধরে তাকে ডাকি না, ডাকি বাবা বলে, সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে বাবার কথা। বেঁচে থাকলে বাবার বয়স হতো এখন বিরানববই বছর। এই বয়সের কত মানুষ আছে চারদিকে। বেঁচে থাকলে বাবা দেখে যেতে পারতেন তাঁর ছেলেমেয়েরা কেমন আছে। তাঁর দিপু কেমন আছে। আহা রে, আমার বাবাকে আমি বুকে তুলে রাখতাম।
রশিদুল, তুমি এখনো সেই বাড়িতেই আছো?
হ ভাই। ওই বাড়িতেই আছি। কই আর যামু, কও? সব মিলাইয়া পোনে চাইর কাঠার মতন জায়গা। লম্বা আর চিপা। দুইজন মানুষ পাশাপাশি হাঁটতে পারে না।
মনে আছে, মনে আছে। দোতলা টিনের ঘরটা আছে?
না, ওইসব কিছুই নাই। ভাগ-বাটোয়ারা হইয়া গেছে। আমার তো একটাই বইন আর আমরা তিন ভাই। বইনের অংশটা বড়ভাই কিনা রাখছিল। দুই ভাই সামনের অংশ নিছে, আমি পাইছি পিছনের অংশ। এক কাঠার মতন হইব। খালি আমার ঘরটাই টিনের। বড় ভাইরা দোতলা বিল্ডিং করছে। বড়ভাই মারা গেছে। তার ছেলেরা আছে। দুই ছেলে। ওরা থাকে। অবস্থা তেমন ভালো না। সদরঘাটের ফুটপাতে দোকানদারি করে। মাজারো ভাই সৌদিতে আছিল। কিছু টেকা-পয়সা আছে। ওর এক মাইয়া। বিয়া হইয়া গেছে। জামাই কিছু করে না। এক ছেলে এক মেয়ে নিয়া মাইয়া আমগো বাড়িতে থাকে। জামাইটা নেশা করে। ফেনসিডিল খায়।
তোমাদের একসময় খুবই ভালো অবস্থা ছিল। এমন হলো কেন? সদরঘাটের দোকানগুলোর কী হলো?
বাবা মারা যাওয়ার পর আসেত্ম আসেত্ম সব গেছে। দোকানে লোকসান হয়। ভাইরা যে যার মতন টাকা সরায়। মা হিসাব চাইলে ঝগড়া করে। আমি কথা কইলে মারামারি লাগনের দশা হয়। মায় মরণের আগেই একটা একটা কইরা গেল পাঁচটা দোকান। এখন নাই কিছুই। তাও ওই বাড়ি না থাকলে কই যে ভাইসা যাইতাম!
রশিদুল কাতর চোখে আমার দিকে তাকালো। দিপু, বিপদে পইড়া তোমার কাছে আইছি ভাই।
আমি রশিদুলের কথার ধার দিয়েও যাই না। তোমার সঙ্গে আমার যোগাযোগ নেই কত বছর হবে, রশিদুল?
আমার বিয়ার পরপরই। বাইশ-তেইশ বছর হইব।
ঠিক তেইশ বছর। তেইশ বছর পর তোমার সঙ্গে দেখা। বিয়ের আগেও তোমার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। ফোনে কথা হতো। দেখা হতো মাঝে মাঝে। তোমাদের বাসায় ফোন ছিল না। পাশের বাড়ির একটা নাম্বার ছিল আমার কাছে। ওই নাম্বারে ফোন করলে ওরা ডেকে দিতো।
মনে আছে। তখন মোবাইল আসে নাই দেশে। বিয়ার আগে তো যোগাযোগ আছিলই, বিয়ার পরও কিছুদিন আছিল। তারপরই যোগাযোগ বন্ধ হইয়া গেল। আমার বিয়াতে তোমরা যাইতে পারো নাই। শাহিনরে নিয়া তুমি গেছিলা আমরিকায়।
ঠিক। একদম ঠিক। আমেরিকা থেকে এসে তোমাদের বাড়িতেও একদিন গিয়েছিলাম। তোমার বউ দেখলাম। তাকে সোনার একটা চেন দিলাম। তোমার বউকে বললাম আমরা কী রকম বন্ধু। আমি বললাম তুমিও বললে। তার পরও তোমার বউ …
রশিদুল তীক্ষ্ণচোখে আমার দিকে তাকালো। সায়রা কী করছিল?
বলবো, বলবো। এতদিন পর তুমি যখন এসেছই, সে-কথা অবশ্যই বলবো। তোমাকে দেখে বাবার কথা মনে পড়ল। আমার বাবাকে তুমি কাকা বলতে। আজো বললে। ভালো লাগল খুব। ছেলের নাম গগন রেখেছি বাবার কথা ভেবে। বাবা ডাকি। যেন আমার বাবা বেঁচে আছেন, আমার সঙ্গেই আছেন। অফিস থেকে ফিরে এলে আমি যেমন সারাক্ষণ বাবার সঙ্গে সঙ্গে থাকতাম, বাবা বাবা করে শুধু ডাকতাম, ছেলে বাড়ি থাকলে ওকে যখন বাবা বাবা বলে ডাকতে থাকি, মনে হয় আমি আমার বাবাকেই ডাকছি।
কাকায় তোমারে সবথিকা বেশি আদর করতো। তুমিও কাকার জন্য পাগল আছিলা। কও দিপু, সায়রা কী করছিল?
তার আগে তুমি আমার দুয়েকটা প্রশ্নের উত্তর দাও। এই যে এতগুলো বছর কেটে গেল, তুমি কখনো আমার কাছে আসোনি কেন বা জানতে চাইলে না কেন, কী কারণে আমি তোমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি না?
ভাবছি কোনো কারণে তুমি আমার উপরে রাগ হইয়া রইছো।
যদি তাও হতো, সেই রাগ ভাঙাবার চেষ্টা করবে না? তুমি আমার এমন বন্ধু!
ওই যে বললাম, ভাবছি তুমি ব্যস্ত মানুষ, এতবড় ব্যবসা করো। বিদেশে থাকো বেশিরভাগ সময়, তোমারে বিরক্ত না করি। তারপর সংসারের চাপ, ভাইগো লগে বাড়ি লইয়া ঝগড়া-বিবাদ। কামকাইজের চাপ, সব মিলাইয়া জীবনডা আগের দিনের মতন নাই। এই আর কি! দুই-চাইরবার তোমারে ফোন কইরা দেকলাম। তুমি আমার ফোনও ধরো না, কাইটা দেও, কলব্যাকও করো না। মনে করলাম, তুমি বড় মানুষ, ছোটবেলার গরিব বন্ধুরে হয়তো মনে রাখতে চাও না, এই জন্য আর চেষ্টা করি নাই। ঠিক আছে, থাকি যে যার মতন।
আমি কিন্তু তোমার খবর রাখতাম। যদিও গেণ্ডারিয়ায় যাওয়া হয় না বহু বছর। নিজেদের বাড়ি আমাদের ছিল না। ভাড়ায় থাকতাম। শাহিনদের বাড়ি ছিল। মাঝে মাঝে সেই বাড়িতে যেতাম। তাও এক দুবছরে এক-আধবার। সেই বাড়ি ডেভেলপারকে দিয়ে দেওয়া হলো। শাহিনের একটা ফ্ল্যাট আছে। ভাড়া দেওয়া। শাহিনও সেই বাড়িতে আর যায় না। কেউ নেই তো! ওর চাচা-ফুফুরা, ভাইরা সবাই ওই এলাকা ছেড়েছে। কেউ উত্তরায় কেউ গুলশান বনানী বারিধারা বা বসুন্ধরায়। আর যেরকম ট্রাফিক জ্যাম! পুরান ঢাকার সঙ্গে সম্পর্কটা শেষই হয়ে গেছে আমাদের। তবে পুরনো দিনের বন্ধুদের খোঁজখবর আমি রাখি। কে কেমন আছে, জানি। তোমার খবরও রাখতাম। দুই মেয়ে নিয়ে মোটামুটি দিন চলছে তোমার, এসব জানতাম। তোমার বউর কারণে সম্পর্কটা আর রাখতে চাইনি।
কী করছিল সে এইটা আমারে কও ভাই। আমি কিছুই বুঝতে পারতাছি না।
তোমার বিয়ের মাস তিন-চারেক পরের ঘটনা। আমি বিজনেস শুরু করেছিলাম তিন বন্ধুর সঙ্গে। অর্থাৎ আমরা চারজন পার্টনার। ওদের কাউকে তুমি চেনো না। আমার অন্য সার্কেলের বন্ধু। টাকা বেশি ওদেরই। গার্মেন্টস করলাম একটা। সেখান থেকে এখন আঠারোটা প্রতিষ্ঠান আমাদের। যখন শুরু করি, তখন থাকি মগবাজারের ফ্ল্যাটে। তারপর উত্তরায় এই বাড়ি করে চলে এলাম। যা হোক, আমার ছেলেটা ছোট। ভাইরা যে যাকে নিয়ে আছে। তাদের অবস্থা ভালো। বোনদের অবস্থা ভালো। বিজনেস নিয়ে খুবই ব্যস্ত থাকি আমি। বিজনেসে আমাকে হেলপ করার বা পাশে থেকে একটু সহযোগিতা করার কেউ নেই। ওদিকে তুমি বিয়ে করেছ কিন্তু তোমার সেভাবে চলার অবস্থা নেই। ভাবলাম, একা একা দৌড়াদৌড়ি করি, তোমাকে রাখি সঙ্গে। আমি বিদেশ-টিদেশ গেলে তুমি সব দেখলে। যদিও পরে সেটা শাহিন করতো। আমি চাইনি আমার বউ বিজনেসে ইনভলভ হোক। পরে বাধ্য হয়ে তা করতে হলো। আমি দেশে না থাকলে শাহিন অফিসে যেত, ফ্ল্যাক্টরিতে যেত। ওই জায়গাটায় আমি তোমাকে চেয়েছিলাম। শাহিনও তাই বলেছিল। এক দুপুরে তোমাকে ফোন করলাম। পাশের বাড়ির সবাই আমাকে চেনে। তোমাকে চাইলে সঙ্গে সঙ্গে ডেকে দেয়। সেদিনও ডাকলো। তুমি ধরলে না, ফোন ধরলো তোমার বউ। বললাম, রশিদুলকে একটু ডেকে দাও। জরুরি কথা আছে। তোমার বউ বেশ রুক্ষ ভঙ্গিতে সরাসরি বললো, এখন ডেকে দেওয়া যাবে না। সে ঘুমায়। আমি বেশ বড় রকমের একটা ধাক্কা খেলাম। বললাম, তুমি গিয়ে আমার কথা বলো, আমার কথা বললে সে উঠে এসে ফোন ধরবে। তখন সে আরো রুক্ষ হলো। তার দরকার কী? আপনেই পরে ফোন কইরেন। রাখি এখন।
রশিদুল ফ্যালফ্যাল করে আমার দিকে তাকিয়েছিল। কোনো রকমে বলল, কও কী?
হ্যাঁ, এইভাবেই বলেছিল এবং ফোন রেখে দিয়েছিল। কেন, তুমি জানো না?
না।
না মানে? তোমাকে সে বলেনি?
না।
আমি ফোন করেছিলাম, বলেনি?
না।
বলো কী?
হ। আমারে বলে নাই। তুমি ফোন করছিলা এইটা আমি জানিই না।
নিশ্চয় বলেছে। তুমি ভুলে গেছ। তেইশ বছর আগের কথা।
যত বছর আগের কথাই হোক, তোমার ব্যাপারে কোনো কথা আমি ভুলুম না। সে আমারে কিছুই বলে নাই। কথাটা আইজ, এই পয়লা আমি শোনলাম।
আমি হতবাক হয়ে রশিদুলের দিকে তাকিয়ে রইলাম। আশ্চর্য ব্যাপার! তোমার বউর ব্যবহারে আমি তো অবাক হয়েইছিলাম, তারপর আরো অবাক হলাম যখন দেখলাম তুমি আমাকে ফোন করছো না, যোগাযোগ করছো না। ভাবলাম নিশ্চয় আমার কথা তুমি আর সেভাবে মনে রাখতে চাইছো না বা কোনো ব্যাপারে তুমি এবং তোমার বউ দুজনেই আমার ওপর বিরক্ত। এসব নিয়ে শাহিনের সঙ্গে কথা বললাম। সে একটা অদ্ভুত কথা বললো। বললো যে, রশিদুলভাই আর তার বউ বিয়েতে হয়তো আমাদের কাছ থেকে বড় রকমের কোনো কিছু আশা করেছিল। যখন দেখলো তেমন কিছু হলো না, তখন দুজনেই বিরক্ত হয়েছে। বিরক্ত থেকে হয়েছে রাগ। আশাহত হলে এমন রাগ মানুষের হতেই পারে। আমি তুমি একসঙ্গে থাকলে অন্যদিকে খেয়াল থাকে না আমাদের। বউরা কিন্তু অনেক কিছু খেয়াল করে। আমেরিকা থেকে এসে আমি আর শাহিন গেলাম তোমার বউ দেখতে। বায়তুল মোকাররম থেকে একটা চেন কিনে নিয়ে গেলাম। শাহিন সেটা দিলো তোমার বউকে। আমি খেয়াল করিনি, শাহিন খেয়াল করেছে, চেনের জন্য ছোট্ট মখমলের একটা থলি দেয় সোনার দোকান থেকে, সেই থলি থেকে চেনটা বের করে তোমার বউ নাকি হাতের তালুতে নিয়ে সেটার ওজন বোঝার চেষ্টা করছিল। সোনার জিনিস গিফট পেলে মেয়েদের মুখ আনন্দে ঝলমল করে ওঠে। তার কিছুই তোমার বউর হলো না, বরং মুখে একটু অসন্তুষ্টি দেখা গেল। অর্থাৎ সে মোটেই খুশি হলো না। শাহিন পরে আমাকে বলেছে, মানে ফোনের ঘটনা শুনে বলেছে, রশিদুলভাইয়ের বউ আমাদের ওপর বিরক্ত। নিশ্চয় রশিদুলভাইকে নানা রকম কথা বলে তোমার ব্যাপারে তার মন বিষিয়ে দিয়েছে। নয়তো সে তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করছে না কেন? কিশোর বয়স থেকে তোমরা এত ঘনিষ্ঠ বন্ধু!
রশিদুল আগের মতোই হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। চোখের পলক ফেলতেও যেন ভুলে যাচ্ছে।
তোমার বিয়ে ঠিক হয়েছে শোনার পর থেকেই ভেবে রেখেছিলাম, তোমাকে আমার সঙ্গে রাখবো। যে-কাজ করো ওই করে জীবন চলবে না। ধীরে ধীরে তোমার জীবনটা আমি বদলে দেবো। এজন্য তোমার বিয়ে নিয়ে সেভাবে আমি ভাবিনি। ভেবেছি তুমি তোমার মতো বিয়েটা সেরে ফেলো। তারপর তোমার চলার ভালো একটা পথ আমি করে দেবো। নয়তো তোমার বিয়েতে লাখখানেক টাকা তো আমি দিতেই পারতাম।
আমার একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল। ভাবলাম এক, হয়ে গেল আরেক।
রশিদুল কাতর গলায় বললো, আমার কপাল। কপালের দোষ।
তারপর তুমি যখন এক-দেড় বছর পর, হঠাৎ হঠাৎ ফোন করতে, আমি বুঝতাম, নিশ্চয় আর্থিক অসুবিধায় পড়ে ফোন করেছো। এজন্য তোমার ফোন ধরতাম না। কেটে দিতাম। শাহিনকে তোমার ফোনের কথা বলতাম। শাহিন বলতো, রশিদুলভাই থাকুক তার বউ নিয়ে। আমাদের কী দরকার তাকে নিয়ে ভাববার? যে আমাদের কথা ভাববে না তার কথা আমরা কেন ভাবব? তুমি তো চেয়েই ছিলে তার জীবন বদলে দিতে, বউটার জন্যই হলো না।
রশিদুল হাহাকারের গলায় বলল, আহা রে, আহা। কোথায় থিকা কী হইয়া গেল! কপাল, সব আমার কপাল!
এ-সময় জাইমার গলা শোনা গেল। দাদু, দাদু। কোথায় তুমি?
আমি উঠে দাঁড়ালাম। এই তো, এখানে। দাঁড়াও, আসছি।
রশিদুলের দিকে তাকিয়ে বললাম, আজ ছুটির দিন। নাতনিটা বেলা করে উঠেছে। আমি একটু ওর সঙ্গে দেখা করে আসি। আমাকে না দেখা পর্যন্ত হাতমুখ ধোবে না, খাবে না। তুমি বসো। আরেক কাপ চা দিতে বলব?
না ভাই। যেই জন্য আইছি …
বসো, বসো।
জাইমা না ডাকলেও অবশ্য আমি উঠতাম। রশিদুল কেন এসেছে তা শুরুতেই বুঝেছি। শাহিনকেও ঘটনাটা বলা দরকার। সে অবশ্য জানে না রশিদুল এসেছে। সব শোনার পর নিশ্চয় দেখা করতে আসবে। তাকে বলে দেবো বিষয়টা যেন না তোলে। তাহলে রশিদুল লজ্জা পাবে। রশিদুলকেও বলা দরকার, শাহিন এলে তাকে যেন ওসব বিষয়ে কিছুই না বলে।
দরজার কাছে গিয়ে আবার ফিরে এলাম। ব্যাপারটা তাকে বুঝিয়ে বললাম। রশিদুল মাথা নাড়লো।
জাইমা আমার জন্য দাঁড়িয়ে আছে সিঁড়ির সামনে। বললো, কোথায় ছিলে তুমি? আমি এতক্ষণ ধরে ডাকছি? শুনতে পাওনি?
পেয়েছি তো। তোমার ডাক শুনেই তো ছুটে এলাম।
আমার গলা শুনে শাহিন বেরিয়ে এলো। জাইমাকে সে ডাকে প্রিন্সেস। বলল, প্রিন্সেস তো পাগল হয়ে গেল তোমার জন্য? কে এসেছে তোমার কাছে?
রশিদুলের কথা বললাম। শুনে সে খুবই অবাক। রশিদুলভাই এত বছর পর?
সংক্ষেপে ঘটনা তাকে বললাম। সে অবাক। বলো কী?
হ্যাঁ। দেখো তো কী কা-! একটা ফোন আর রশিদুলের বউয়ের ওইটুকু কথায় কোথা দিয়ে কী হয়ে গেল! তুমি গিয়ে রশিদুলের সঙ্গে কথা বলো। আমি জাইমাকে একটু সময় দিয়ে আসছি।
জাইমা বলল, সময় আবার কী? আমাকে ব্রেকফাস্ট করিয়ে তারপর যাবে।
ওকে মাই ডিয়ার, ওকে।
মিনিট পনেরো পর ড্রয়িংরুমে এলাম। জাইমাকে ব্রেকফাস্ট করিয়ে নিজের বেডরুম ঘুরে এসেছি। জাইমাও আসতে চেয়েছিল এই রুমে। তাকে ট্যাব ধরিয়ে দিয়েছি। ওই জিনিস নিয়ে এখন গেমস খেলবে।
ড্রয়িংরুমে এসে দেখি ভালোই গল্প করছে শাহিন আর রশিদুল। আমি আসার পর শাহিন উঠল। তোমরা আড্ডা দাও। আমি যাই। রশিদুলভাই, দুপুরে আমাদের সঙ্গে খেয়ে যাবেন।
রশিদুল বিনীত গলায় বলল, না বইন, আইজ না। আরেকদিন আইসা খামুনে। আইজ তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরতে হইব। অসুবিধা আছে।
শাহিন সিঁড়ির দিকে চলে গেল। রশিদুল উঠে এসে দুহাতে আমার ডানহাতটা জড়িয়ে ধরল। সায়রার কথা তুমি মনে রাইখো না ভাই। ওর হইয়া আমি তোমার কাছে মাফ চাইতাছি।
আরে না না, মাফ চাওয়ার কিছু নেই। যা হওয়ার হয়ে গেছে। তুমি বসো।
বসনের আর টাইম নাই ভাই। দুইদিন ধইরা বাড়িতে বাজার নাই। মাইয়া দুইটার শুকনা মুখ আমি আর সহ্য করতে পারতাছি না। কত জায়গায় চেষ্টা করলাম, দুইশো টাকাও জোগাড় করতে পারি নাই। উপায় না দেইখা তোমার কাছে আইছি। অন্তত পাঁচ হাজার টাকা তুমি আমারে দেও। কামকাইজ পাইলে টাকাটা আমি ফিরত দিমু। মাইয়া দুইটার মুখের দিকে আমি তাকাইতে পারি না। দিপু …
রশিদুল হু-হু করে কাঁদতে লাগল। আর আমার তখন অদ্ভুত একটা ব্যাপার হলো, রশিদুলের কান্নায় আমি আমার বাবার মুখটা দেখতে পাই। রশিদুলের মেয়েদের শুকনা অনাহারি মুখের কথা ভেবে দেখতে পাই আমার বোনদের অনাহারি শুকনা মুখ। আমার চোখ চলে যায় বহু বহু বছর পিছনে ফেলে আসা এক জীবনে। বাবার চাকরি নেই। বাড়িভাড়া দিতে পারছেন না। বাজার করতে পারছেন না। ছেলেমেয়েদের মুখে খাবার তুলে দিতে পারছেন না তিনবেলা। ধারের আশায় অনাহারি মানুষটা কোথায় কোথায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন! এক দুপুরে খেতে বসেছেন। সামান্য ভাত আর ডাল। মা করুণ মুখে বসে আছেন সামনে। ভাত মুখে তুলতে গিয়ে এই রশিদুলের মতো করে কাঁদতে লাগলেন বাবা। চোখের পানি টপটপ করে পড়তে লাগল ভাতের থালায়। ছেলেমেয়েদের খেতে দিতে পারেন না এই কষ্টে কাঁদছিলেন মানুষটা …
রশিদুলের কান্নার সঙ্গে বাবার সেই কান্না মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছিল। আমার বুক উথাল-পাথাল করছিল। চোখে পানি আসছিল। একহাতে রশিদুলকে বুকে জড়িয়ে ধরা গলায় বললাম, কেঁদো না, কেঁদো না। সব ঠিক হয়ে যাবে।
বেডরুমে ঢুকেছিলাম টাকার জন্য। পঞ্চাশ হাজার টাকার একটা বান্ডিল খামে ভরে নিয়ে এসেছি। ট্রাউজার্সের পকেটে খামটা ছিল। বের করে রশিদুলের হাতে দিলাম। এখানে পঞ্চাশ হাজার টাকা আছে। এটা দিয়ে চলো। পরে আমি তোমার সঙ্গে কথা বলবো। দেখা যাক কী হয়।
রশিদুল তখনো কাঁদছে আর আমার মন চলে গেছে বহু বছর পিছনে ফেলে আসা একটি দিনে।
১৯৬৮ সালের কোনো একদিন
রশিদুলকে দেখার পর থেকে একটা ঘটনা খুব মনে পড়ছে।
শাহিন আমার দিকে তাকালো। বিকেলবেলা আমরা দুজন আমাদের বেডরুমের সঙ্গের বারান্দায় মাঝে মাঝে বসি। চা খাই, টুকটাক গল্প করি। কখনো কখনো জাইমা থাকে আমাদের সঙ্গে। স্থির হয়ে তো আর বসে না। একবার দৌড়ে আসে, আবার দৌড়ে চলে যায়। কত রকমের ব্যস্ততা তার।
আজ জাইমা বাড়িতে নেই। ছুটির দিন বিকেলে গগন আর অনন্যা মেয়েকে নিয়ে বেড়াতে যায়। রাতে নামকরা রেস্টুরেন্টে ডিনার করে ফেরে।
আজো সেরকম কোথাও গেছে।
জাইমা বাড়িতে না থাকলে পুরো বাড়ি ফাঁকা লাগে। নির্জন লাগে। মনে হয় বাড়িতে লোকজনই নেই।
শাহিন বলল, কোন ঘটনা বলো তো? তোমার জীবনের সব ঘটনাই আমাকে বলেছো। আমি জানি প্রায় সবই।
এটা বোধহয় জানো না। এটা তোমাকে বলা হয়নি। আমিই ভুলে গিয়েছিলাম। আজ রশিদুলকে দেখার পর মনে পড়ল।
বলো শুনি।
আটষট্টি সালের কথা। আমি আর রশিদুল ক্লাস এইটে পড়ি। বাবার চাকরি নেই। সংসারে তীব্র অভাব। কোনো কোনো দিন বাজারই হয় না। আক্ষরিক অর্থেই আমরা না খেয়ে থাকি। সারাদিন এদিক-ওদিক ঘুরে বাবা কিছু জোগাড় করতে পারলে …
তোমার এসব কষ্টের কথা শুনলে তোমার জন্য আমার খুব মায়া লাগে। মনে হয় তোমার মাথায় একটু আদর করে দিই।
শোনো, ওরকম একদিনের ঘটনা। আমি কখনো স্কুল কামাই দিতাম না। তারও একটা কারণ ছিল। স্কুলে খুব ভালো টিফিন দিত। বড় একটা মালপোয়া পিঠা, লুচি-হালুয়া, জিলাপি। কোনো কোনো দিন ওই খেয়ে আমার দিনরাত কেটে গেছে। আমার টিফিন খাওয়াটা খেয়াল করে দেখতো রশিদুল। বুঝতো সকালে আমার কিছুই খাওয়া হয়নি। সে তার টিফিনটা আমাকে দিয়ে দিত। দিত এমন করে, যেন আমি কিছু মনে না করতে পারি। অনাহারি মধ্যবিত্ত মানুষের এক ধরনের অহংকার থাকে। আড়ষ্টতা আর লজ্জা থাকে। রশিদুল ভাবতো, সরাসরি তার টিফিনটা আমাকে দিয়ে দিলে আমি নাও নিতে পারি। বুদ্ধি করে কাজটা সে করতো। টিফিন হাতে নিয়ে খেতো না। হঠাৎ আমার সামনে এসে বলতো, দিপু, আমার টিফিনটাও তুমি নেও। খাইতে ভাল ল্লাগতাছে না। স্কুলে আসার আগে মায় জোর কইরা বেশি ভাত খাওয়াইয়া দিছে। একেকদিন এরকম একেক অজুহাত। আমি আড়ষ্ট ভঙ্গিতে ওর টিফিন নিতাম। আমাকে তৃপ্তি করে খেতে দেখে গভীর আনন্দে চকচক করতো রশিদুলের চোখ।
আমার একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল।
মিতু মেয়েটা এসময় বিকালের চা-নাশতা নিয়ে এলো। পাপড় ভাজা আর লিকার চা। আমি একটা পাপড় নিয়ে মুখে দিলাম। চায়ে চুমুক দিলাম। সেদিন সকাল থেকে কিছুই খাওয়া হয়নি। বাসায় একমুঠ মুড়িও ছিল না। সাড়ে দশটার দিকে স্কুলে এসেছি। সাধারণত আমি আর রশিদুল একসঙ্গে স্কুলে আসতাম। বানিয়ানগর থেকে ও আসতো ডিস্টিলারি রোডে, আমাদের বাসায়। তারপর দুজনে হাঁটতে হাঁটতে স্কুলে যেতাম। ধূপখোলা মাঠের দক্ষিণ দিককার রাস্তা দিয়ে, সাধনা ঔষধালয়ের ওখান দিয়ে সোজা গেণ্ডারিয়া হাইস্কুল। সেদিন রশিদুল দেরি করছিল দেখে আমি একা একাই স্কুলে চলে এসেছি। ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে টুকটাক কথা হয়েছে। সে খেয়াল করছিল আমার মুখটা শুকনা। বুঝে গিয়েছিল নিশ্চয় আমার কিছু খাওয়া হয়নি। আমাদের সংসারের অবস্থা সে জানতো। টিফিনের সময় ওরকম একটা অজুহাত তৈরি করে ওর টিফিনটা আমাকে দিলো। সেদিন টিফিন ছিল লুচি-হালুয়া। বড় একটা লুচির ভিতর এক চামচ হালুয়া ঢুকিয়ে ভাঁজ করে ছাত্রদের দিত। খুব টেস্টি হতো খাবারটা। দুটো লুচি খেয়ে ভালোই পেট ভরেছে আমার। তার পরও ছুটির পর রশিদুল আমাকে ওদের বাড়িতে নিয়ে গেল। চলো দিপু, বাড়িত গিয়া দুইজনে মিলা ভাত খাইয়া ধূপখোলা মাঠে খেলা দেখতে যামুনে। আইজ ইসটেন কেলাবের (ইস্ট এন্ড ক্লাব) খেলা আছে। যতক্ষণ স্কুলে থাকি, ভালো থাকি। রশিদুলের সঙ্গে থাকি, ভালো থাকি। বাসায় গেলেই মার শুকনা মুখ। ভাইবোনদের করুণ ক্ষুধার্ত মুখ। বাবা হয়তো হতাশমুখে বাসায় ফিরেছেন …। গেলাম রশিদুলের সঙ্গে। ওদের বাড়িতে ভালো মাছ রান্না হয়, গরু-খাসির মাংস প্রচুর তেল দিয়ে রান্না হয়। বড় বড় টুকরা মাংসের। মুরগি রান্না হলে রান রেখে দেওয়া হয় রশিদুলের জন্য। রশিদুল সেসব আমাকে খাওয়ায়। তখন পর্যন্ত রশিদুলের বাবার সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। ওর মার সঙ্গে হয়েছে, ভাইদের সঙ্গে হয়েছে। শুধু বাবার সঙ্গেই দেখা হয়নি বা পরিচয় হয়নি। তিনি দোকানপাট ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত। সেদিন বাড়িতে ছিলেন। জ্বর। বাড়িতে ঢুকেই সামনের ঘরে আমাকে বসিয়েছে রশিদুল। এই ঘরটা বসার ঘর, আবার রশিদুলের পড়ারও ঘর। টিনের দোতলা ঘরের নিচতলা।
অনেকক্ষণ পর কথা বলল শাহিন। ওই ঘরটা আমি দেখেছি। বিয়ের পর তোমার সঙ্গে একদিন গিয়েছিলাম। রশিদুলভাইয়ের বিয়ের পরও তো গেলাম।
হ্যাঁ। যাহোক যা বলছিলাম। বাড়িতে ঢুকেই রান্নাঘরে গিয়েপেস্নলটে করে ভাত নিয়ে এলো রশিদুল। বিকাল সাড়ে চারটার মতো বাজে। গরমের দিন। পেস্নট ঠেসে ভাত এনেছে রশিদুল। খাসির মাংসের বড় দুটো টুকরা দিয়েছে আমাকে। ঝোল আলু দিয়েছে। নিজে নিয়েছে একটু কম। আমরা খাওয়া শুরু করিনি, রশিদুলের বাবা ডাকলেন, রশিদুল, ওই রশিদুল, হুইন্না যা। তুমি তো বোধহয় জানোই রশিদুলরাও আমাদের মতোই, বিক্রমপুরের লোক। ওই ভাষায়ই কথা বলে। রশিদুল অবশ্য আগে আমাকে একদিন বলেছিল আমার বাবা ওদের বাড়িতে অনেকবার গিয়েছেন। ওর বাবাকে আমার বাবা ‘দাদা’ ডাকেন। রশিদুলের বাবা বয়সে বড়। বিক্রমপুরে ভাইশ্রেণির বড়দের দাদা ডাকারই নিয়ম। আর সেই জন্যই রশিদুল আমার বাবাকে কাকা ডাকে। তো, বাবার ডাক শুনে রাশিদুল বলল, বাবায় ডাকতাছে। লও দিপু, বাবার লগে তোমার পরিচয় করাইয়া দেই। তারবাদে আইসা ভাত খামুনে। গেছি রশিদুলের পিছন পিছন। রশিদুলের বাবা কাঁথা গায়ে দিয়ে শুয়ে আছেন খাটে। রশিদুলকে দেখে বললেন, তুই কেমুন পোলা? আমার জ্বর। ইশকুল থিকা আইয়া একবার খবরও লইলি না? রশিদুল কথাটা তেমন গায়ে মাখলো না। বললো, আর কিছু কইবেন? আমার খিদা লাগছে। আমি অহন ভাত খামু। এই যে দিপু। আমার বন্ধু। গগন কাকার পোলা। বাবার কথা শুনে রশিদুলের বাবা তীক্ষ্ণচোখে আমার দিকে তাকালেন। তুই গগনের পোলা? ও আইচ্ছা। আরে তর বাপে তো আমার কাছ থিকা একশটা টেকা ধার নিছিল কয়দিন পরে দেওনের কথা কইয়া। টেকাডা তো আর দিলোই না, আমার লগে দেহাও করে না। শুনে আমার মনে হলো কেউ যেন ঠাস করে আমার গালে একটা চড় মেরেছে। লজ্জায় মুখটা চুন হয়ে গেল। রশিদুল আমার দিকে তাকাল। আমার মুখ দেখে যা বোঝার বুঝে গেল। বললো, দিপু, তুমি গিয়া বহো। আমি আইতাছি। আমি চুপচাপ বেরিয়ে এলাম। আসতে আসতে শুনি রশিদুল তার বাবার ওপর বেশ চোটপাট করছে। আপনে গগন কাকার কাছে টেকা পাইবেন হেইডা দিপুরে কইলেন ক্যা? ও শরম পাইলো না? ওরে আমি লইয়াইছি ভাত খাওয়াইতে আর আপনে ওরে এইসব কইলেন! রশিদুলের বাবা কী কী বললো সে-কথা আর আমার কানে গেল না। আমার তখন খুব কান্না পাচ্ছিল। দুহাতে চোখ মুছতে মুছতে রাস্তায় বেরুলাম। খাসির মাংস আর ভাত পড়ে রইল। পেটে খিদা। তাও সেই খাবারের কথা মনে হলো না। বিষণ্ণমুখে বাসায় এসে বই রেখে ধূপখোলা মাঠের দিকে চলে গেলাম। অনেকক্ষণ পর রশিদুল আমাকে খুঁজতে খুঁজতে এলো। কত রকমভাবে যে আমাকে ম্যানেজ করার চেষ্টা করলো! কত কিছু যে আমাকে বোঝালো! বাবার সঙ্গে সে ঝগড়া করেছে – ওসবও বললো। মনে আছে, একটা সময়ে আমি বলেছিলাম, চাকরি হলে তোমার বাবার টাকা আমার বাবা শোধ করে দেবেন। যদি বাবা না দিতে পারেন বড় হয়ে আমি দিয়ে দেবো। ওই বয়সে যেমন বলে সেনসেটিভ কিশোর ছেলেরা। রশিদুলের বাবার সেই একশ টাকা বাবা দিতে পারেননি, আমি জানি। বছর দুয়েক পর বাবার চাকরি হলো। তারপর বছরখানেক বেঁচে ছিলেন। একাত্তর সালে মারা গেলেন। আজ রশিদুলকে দেখার পর থেকে ঘটনাটা আমার বারবার মনে পড়ছে। বাবা মারা যাওয়ার পর কতদিন কেটে গেছে! রশিদুলের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধুত্ব তেইশ বছর আগ পর্যন্ত চলছিল। টাকা-পয়সাও অনেক সময় ওকে আমি দিয়েছি।
পাঁচ-দশ হাজার, বিশ হাজার। তবে একদম দায়ে না পড়লে ও কখনো আমার কাছে চাইতো না। চাইলেই বুঝতাম, একেবারেই অপারগ হয়ে চেয়েছে। আমি দিতাম। ও আরেকটা কথা বোধহয় তোমাকে বলা হয়নি। ছেলেবেলা থেকেই বিচিত্র স্বভাব ছিল রশিদুলের। নানা রকমের পাখি পালতো।
বলেছো বলেছো। আমি জানি। রশিদুলভাই অনেক রকমের পাখি পালতো। টিয়া ময়না ছিল তার। কবুতর ছিল অনেক রকমের। পোষা শালিক ছিল একটা। খাঁচায় থাকতো না শালিকটা। বাইরে থাকতো। রশিদুলভাই ডাক দিলেই তার কাঁধে এসে বসতো।
ঠিক। তোমার ভালোই তো মনে আছে। শালিকটা বিড়ালে খেয়ে ফেলেছিল। বিড়ালটাও রশিদুলের পোষাই ছিল। তারপর সেই বিড়াল আর রাখেনি সে। খুবই রেগে ছিল বিড়ালের ওপর। রশিদুল খরগোশ পালতো, সাদা ইঁদুর পালতো।
ওগুলোকে বলে বিলাতি ইঁদুর।
রাইট। পোষা বেজি ছিল একটা। আশ্চর্য ব্যাপার, রশিদুল একবার একটা সাপও পুষতে শুরু করেছিল।
বলো কী? সাপ?
হ্যাঁ। তবে বিষাক্ত সাপ না। একটা খাঁচায় আটকে রাখতো। জ্যান্ত ছোট ইঁদুর ধরে এনে সাপের খাঁচায় ঢুকিয়ে দিত। সেটা প্যাঁচ দিয়ে বা থাবা দিয়ে ধরে খেতো সাপটা। অদ্ভুত ছেলে ছিল রশিদুল। ঝাঁকে ঝাঁকে কবুতর ওড়াতো আকাশে। একবার সেই আমলে দেড়শো টাকা দিয়ে একটা মোরগ কিনে আনলো। বিশাল মোরগ। পায়ের নখ লম্বা, ধারালো। ঠোঁট তীক্ষ্ণ। ওই মোরগের নাম ‘আসলি’। ফাইটার মোরগ। রশিদুল সেই মোরগ কোলে নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় মোরগের লড়াই করাতে নিয়ে যেত। দশ টাকা বিশ টাকা বাজিতে চলতো মোরগের লড়াই। আমি সেই লড়াই দেখতে কয়েকবার গেছি রশিদুলের সঙ্গে। কখনো কখনো মোরগের পায়ে ছোট্ট ধারালো চাকু এমনভাবে বেঁধে দিত, মোরগ যখন পা দিয়ে অন্য মোরগটাকে আঘাত করতো, চাকুতে ফালা ফালা হতো সেই মোরগের পা, মুখ, মাথা।
অদ্ভুত ব্যাপার।
সত্যি অদ্ভুত ব্যাপার। এবার আরেকটা অদ্ভুত ঘটনা শোনো। রশিদুল এক কোরবানি ঈদে গরুর ছোট্ট এক টুকরা সলিড কাঁচা মাংস চিবিয়ে খেয়েছিল। ওদের বাড়িতেই। আমার সামনে।
শাহিন মুখ কুঁচকে ওয়াক করলো। ছি, কী বলছো?
সত্যি। রশিদুল ওই টাইপই ছিল। তবে ওর মধ্যে একটা শিল্পী মন ছিল। মাটি দিয়ে অনেক কিছু বানাতে পারতো। নানা রকমের পুতুল। হাতি ঘোড়া বাঘ ভালুক। কাঠ দিয়েও বানাতে পারতো। কোথাও শেখেনি। নিজে নিজেই পারতো। নেশা ছিল। সেই নেশাই শেষ পর্যন্ত ওর পেশা হয়ে গেল।
কথার ফাঁকে ফাঁকে চা শেষ করেছি আমরা। আমি শেষ বিকেলের আকাশের দিকে তাকিয়ে পিছনে ফেলে আসা সেই জীবনে চলে গেছি। রশিদুলকে নিয়ে কতদিনকার কত কথা মনে পড়ছে। বাবার মৃত্যুর দিন থেকে একটানা চারদিন বাড়িতে যায়নি রশিদুল। সারাটাক্ষণ আমার সঙ্গে। আমাকে বুক দিয়ে আগলে রাখছিল। কত রকমের প্রবোধ, সান্তবনা। আমার চোখে পানি দেখলেই দুহাতে আমার মাথাটা বুকে চেপে ধরতো। আমার এমন বন্ধু! ওর বউর আচরণে আমি তেইশ বছর সরে থাকলাম। এটা আমারও উচিত হয়নি। রশিদুলের কান্নাটা ভুলতে পারছি না। রাজপুত্রের মতো জীবন ছিল রশিদুলের। আর আমি ছিলাম … সময় পুরো ব্যাপারটাই উলটে দিয়েছে।
শাহিন।
বলো।
আমি একটু রশিদুলদের বাড়িতে যেতে চাই। দুয়েকদিনের মধ্যেই। তুমি যাবে আমার সঙ্গে?
চলো যাই। কতদিন ওদিকটায় যাই না।
তারপর রশিদুলকে নিয়ে কিছু পরিকল্পনার কথা শাহিনকে বললাম। শাহিন হাসিমুখে বলল, বন্ধুর জন্য তো করা উচিতই। করো তুমি যা করতে চাইছো।
সাত মাস পর
কাঠাখানেক জমির পুরোটাই কাজে লাগানো হয়েছে। সুন্দর দোতলা বিল্ডিং হয়েছে। ছোট ছোট চারটা রুম একতলা-দোতলা মিলে। নিচতলায় একপাশে ছোট্ট রান্নাঘর আর বাথরুম। বাড়ির পিছনের অংশ রশিদুলের। ওদিক দিয়ে গেটও করা হয়েছে। চিপা একটা গলি আছে গেটের বাইরে। ওদিক দিয়েও চলাচল করা যায়। মূল গেট সামনের দিকে। সেই আগের মতোই বাড়িটা। দুজন মানুষ পাশাপাশি হেঁটে ঢুকতে পারবে না।
শাহিন আমার আগে আগে হাঁটছিল। বাড়িতে বেশ একটা সাজসাজ রব। আজ নিজের বিল্ডিংয়ে উঠবে রশিদুল। মিলাদের ব্যবস্থা হয়েছে। রশিদুল আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল।
যে ধোলাইখালে বর্ষাকালে আমি আর রশিদুল সাঁতার কেটেছি সেই ধোলাইখাল এখন বিশাল রাস্তা। রশিদুলের গলিতেও গাড়ি ঢোকে। আমরা নেমেছিলাম সামনের গেটে। শাজাহান ড্রাইভার জায়গাটা এখন ভালোই চেনে। এই নিয়ে কয়েকবার এলো সে।
সাত মাস আগে রশিদুল যেদিন আমার কাছে গিয়েছিল তার দুদিন পরই বিকেলবেলা শাহিনকে নিয়ে রশিদুলের বাড়িতে এসেছিলাম। বাড়ির পিছনদিককার প্রায় ভেঙেপড়া টিনের ঘরটায় দুই মেয়ে আর বউ নিয়ে থাকে রশিদুল। ওর যে এত খারাপ অবস্থা তা আমি কল্পনাও করতে পারিনি। বউটা একসময় দেখতে মন্দ ছিল না। সেই মহিলা ভেঙেচুরে একেবারে শেষ হয়ে গেছে। মেয়ে দুটোর নাম মুন্নি আর তিন্নি। হামিদুলের চেহারা আর প্রথম জীবনের গায়ের রং পেয়েছে। মিষ্টি চেহারা। সেই চেহারায় দারিদ্র্য হতাশা আর বিষণ্ণতা। এত মায়া লাগছিল মেয়েদুটোর মুখ দেখে। ওই ঘরেই আমরা বসেছিলাম। সায়রা বারবার সেই টেলিফোনের ব্যাপারটা নিয়ে মাফ চাইলো, মুখে আঁচল চেপে কাঁদলো। কাঁদতে কাঁদতে বললো, আমার জইন্য আপনের বন্ধুর জীবন নষ্ট হইয়া গেছে ভাই। আমি তার জীবনডা নষ্ট কইরা দিছি। আমার বড় অন্যায় হইছিল, বড় ভুল হইছিল আপনের লগে ওই রকম ব্যবহার করা। আপনের বাড়ি থিকা আইসা সে যখন সব বলল, বইলা কান্নাকাটি করল, আমার দুই মাইয়ায় আমারে খুব বকলো। তুমি এইডা ক্যান করছিলা মা? আমার বাবার জীবন নষ্ট করছো, আমগো জীবন নষ্ট করছো। তয় আপনের বন্ধু কিন্তু আমারে কিছু বলে নাই। সে খুব ভালো মানুষ। জীবনে আমার লগে খারাপ ব্যবহার করে নাই।
সায়রা আমার পা জড়িয়ে ধরতে এলো। আপনে আমারে মাপ কইরা দেন ভাই।
শাহিন তাকে জড়িয়ে ধরল। আরে এ কী! ওসব ভুলে যাও। সব ঠিক আছে। মানুষের জীবনে অনেক রকমের ভুল হয়। বসো, বসো তুমি।
রশিদুল দাঁড়িয়ে ছিল এককোণে। মুখটা নিচু করে আছে। টপটপ করে চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। মেয়েদুটো বাবার দুপাশে দাঁড়িয়ে আছে। বাবাকে কাঁদতে দেখে ওরাও কাঁদতে লাগল। বোঝা গেল বাবার জন্য পাগল দুই মেয়ে।
আমি উঠে গিয়ে রশিদুলের কাঁধে হাত রাখলাম। কেঁদো না রশিদুল, কেঁদো না। সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি আছি।
মেয়েদুটোকেও সান্তবনা দিলাম।
শাহিনকে আর আমাকে দেখে, আমাদের দামি গাড়ি দেখে রশিদুলদের বাড়িতে বেশ একটা সাড়া পড়েছে। রশিদুলের বড় দুই ভাইয়ের পরিবারের লোকজন, বাচ্চাকাচ্চারা উঁকিঝুঁকি মারছিল। গেটের বাইরেও দেখা যাচ্ছে কাউকে কাউকে। ড্রাইভারকে এটা-ওটা জিজ্ঞেস করছে।
সেদিনই পরিকল্পনাটা আমি রশিদুলকে বলে এসেছিলাম। এই পাড়াতেই তুমি একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নাও। আমাদের ফ্যাক্টরির সিকিউরিটির লোকজনের, কেয়ারটেকারদের কোয়ার্টার তৈরির কাজ করে একজন কন্ট্রাক্টর। ওর নাম গোলাম হোসেন। তাকে আমি পাঠাবো। এইটুকু জায়গার মধ্যেই দেখবে কী সুন্দর দোতলা একটা বিল্ডিং করে দিয়েছে সে। কোনো কিছুই তোমাকে ভাবতে হবে না। তুমি শুধু কাজের তদারকি করবে। কাজটা ঠিকমতো হলো কি না দেখবে। ফ্ল্যাট ভাড়া, তোমার সংসার খরচ, মেয়েদের পড়াশোনা সব মিলিয়ে মাসে তোমার কত টাকা করে লাগবে আমাকে জানাবে। তোমার দায়িত্ব আমার। তোমার মেয়েদের পড়ালেখা বিয়েশাদি কোনো কিছু নিয়েই তুমি ভাববে না। লেখাপড়া শেষ করে ওরা চাকরি-বাকরি করবে। আমি বেঁচে না থাকলে গগন ওদের দেখবে।
রশিদুল কথা বলতে পারেনি। বারবার চোখ মুছছিল।
তারপর গত সাত মাসে তিনবার আমি এসেছি। বাড়ির কাজ কতটা হলো দেখে গেছি। গত সপ্তাহে কিছু ফার্নিচার কিনে দিয়েছি রশিদুলকে। বাড়ি গোছগাছ হয়ে গেছে। আজ ওরা উঠবে। আমি আর শাহিন এসেছি গৃহপ্রবেশে।
রশিদুলদের আত্মীয়স্বজন, পাড়ার লোকজন যাঁরা মিলাদ পড়তে এসেছিলেন প্রত্যেকে আমার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। আজকালকার দিনে এরকম বন্ধুত্বের নজির পাওয়া যাবে না ইত্যাদি ইত্যাদি বলছিল। আমি তাকিয়ে তাকিয়ে রশিদুলকে দেখছিলাম, সায়রা আর ওদের দুই মেয়েকে দেখছিলাম। বিষণ্ণ মুখগুলোয় যে কী অপূর্ব এক আলো খেলা করছে! এই আলো যে দেখে তাঁর অন্তরটাও আলোকিত হয়।
ফেরার সময় শাহিনকে বললাম, শাহিন, রশিদুলের জন্য এত কিছু কেন করলাম, জানো?
শাহিন আমার দিকে তাকালো। কেন বলো তো?
আমি আসলে বাবার সেই ঋণটা শোধ করলাম। যেখানে রশিদুলের বিল্ডিংটা হয়েছে ঠিক ওখানকার ঘরটায় শুয়েই আমার বাবার কাছে একশটা টাকা পাওনা থাকার কথা বলেছিলেন রশিদুলের বাবা। বাবার সেই ঋণটা বহু বহু বছর পর অন্যভাবে শোধ করলাম আমি। রশিদুল আমার জন্য সেই কিশোর বয়সে যা করেছে সেই ঋণও শোধ করলাম।
শাহিন হাসল। অদ্ভুত কথা বললে তুমি। বন্ধুত্বের ঋণ, ভালোবাসার ঋণ কি শোধ করা যায়? যেরকম ভালোবেসে, আবেগে আর মমতায় রশিদুলভাই সেই বয়সে নিজে না খেয়ে তোমাকে খাইয়েছে, তোমাকে বুক দিয়ে আগলে রেখেছে, ওইটুকু একটা বাড়ি করে দিয়ে বা কিছু টাকা-পয়সা দিয়ে তুমি সেই বন্ধুত্বের ঋণ শোধ করবে? এটা হয়? হয় না দিপু। তোমার অসহায় সময়ে যে তোমার পাশে দাঁড়িয়েছে, তার অসহায়ত্বের সময় তুমি তার পাশে দাঁড়িয়েছ, এইভাবে ভাবো। বন্ধুত্বের ঋণ শোধ করেছ, তা কখনো ভেবো না। বন্ধুত্বের ঋণ শোধ করা যায় না। ভালোবাসার ঋণ শোধ করা যায় না। বাবার ঋণ শোধ করলে সেটা ভাবতে পারো।
শাহিনের কথা শুনে খুবই ভালো লাগলো। বললাম, ঠিকই বলেছ তুমি। বন্ধুত্বের ঋণ শোধ করা যায় না।
স্যার, একজন লোক আসছে।
কোত্থেকে?
বাইন্নানগর। ইয়ে মানে বানিয়ানগর। পুরান ঢাকার সূত্রাপুর এলাকা।
চোখ তুলে জিন্নাহর দিকে তাকালাম। কী নাম?
রশিদুল।
বানিয়ানগর থেকে এসেছে শুনেই বুঝেছিলাম, রশিদুলই হবে। আমার কিশোরবেলার বন্ধু। বহু বছর তার সঙ্গে দেখা নেই, যোগাযোগ নেই। অথচ একটা সময়ে আমরা দুজন দুজনার জন্য পাগল ছিলাম। দিনের বেশিরভাগ সময় একসঙ্গে। কত রাত রশিদুলের সঙ্গে ওদের বাড়িতে ঘুমিয়েছি।
বসিয়েছিস?
জি স্যার।
চা-নাশতা দে। আসছি।
ড্রয়িংরুমের কোনার দিককার একটা সোফায় বসে আছে রশিদুল। সামনে চা-বিস্কুট-মিষ্টি। আমাকে দেখে উঠে দাঁড়াল। কেমন আছ, দিপু?
ভালো আছি, ভালো আছি। দাঁড়ালে কেন? বসো, চা খাও।
রশিদুল বসল। চায়ে চুমুক দিলো। আমি বসলাম মুখোমুখি সোফায়। অপলক চোখে রশিদুলের দিকে তাকিয়ে রইলাম। ওকে আর চেনাই যায় না। শরীর একেবারেই ভেঙে গেছে। হলুদের কাছাকাছি রঙের ময়লা ফুলহাতা শার্ট পরা। কালো প্যান্টটাও যাচ্ছেতাই রকমের ময়লা। পায়ের স্যান্ডেল নতুন। তবে খুবই সস্তা ধরনের। আমি যে-রশিদুলকে দেখেছি, কে বলবে এই মানুষটাই সে।
পাকা শবরি কলার মতো রং ছিল রশিদুলের। ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় থেকে ব্যায়াম করতো। কী সুন্দর স্বাস্থ্য! চেহারা ফুটফুটে। দামি প্যান্ট-শার্ট পরতো। পকেটে সব সময় টাকা। দুহাতে আমার জন্য খরচা করতো। বাড়ির ছোট ছেলে। অবস্থাপন্ন। মা বাবা বড় দুইভাই খুবই আদর করতো। সদরঘাটে কাপড়ের দোকান ছিল চারটা না পাঁচটা। বড় দুই ছেলে নিয়ে রশিদুলের বাবা চালাতেন। পকেটে পয়সা না থাকলেই দোকানে গিয়ে নিয়ে আসতো রশিদুল। নারিন্দার মোরগ-পোলাও খাওয়াতো আমাকে। আলাউদ্দিন রোডে নিয়ে হাজির বিরিয়ানি খাওয়াতো। সোনা মিয়ার দোকানের দই মিষ্টি, গরমের দিনে গস্নলাসের পর গস্নলাস লাচ্ছি, সালাউদ্দিনের দোকানের সরভাসা চায়ের সঙ্গে পরোটা, বাকরখানি। আমার তখন শুধুই খিদা পেত। অভাবের সংসার। এতগুলো ভাইবোন। বাবার ছোট চাকরি। নিজে না খেয়ে কতদিন রশিদুল আমাকে খাইয়েছে। দুপুরের পর বা রাতের বেলা রশিদুল আমাকে নিয়ে গেছে ওদের বাড়িতে। খাওয়া-দাওয়া হয়ে গেছে। ছোট ছেলের খাবার ঢেকে রেখেছেন ওর মা। একজনের খাবার দুজনে ভাগ করে খাইনি আমরা। রশিদুল বলেছে, তুমি খাও দিপু। আমার খিদা নাই …
তুমি আছো কেমন, রশিদুল?
ভালোই আছিলাম। হঠাৎ একটু বিপদে পড়ছি।
কী করছো এখন?
ওই সেই কাজটাই।
কী যেন করতে তুমি? আমি ভুলে গেছি।
ভুইলা যাওয়ারই কথা। তুমি এত ব্যস্ত লোক। এতদিন দেখা-সাক্ষাৎ নাই। আমি অনেকবার তোমারে ফোন করছি। ধরো নাই। ব্যস্ত ছিলা বা বিদেশে ছিলা। হয়তো আমার ফোন নম্বরও তোমার কাছে সেভ করা নাই।
না সেভ করা আছে। ইচ্ছা করেই ধরিনি।
একটা টাইমে আমি সেইটা বুজছি। এই জন্য আর ফোন করি নাই।
তুমি আমার এমন বন্ধু, তোমার ফোন আমি ধরছি না, তোমার মনে হয়নি, কেন তোমার ফোন আমি ধরছি না?
হয়তো কোনো কারণে আমার উপরে রাগ হইছো।
সেটা তোমার জানতে ইচ্ছা করেনি?
রশিদুল চুপ করে রইল। চায়ে শেষ চুমুক দিলো।
শুধু চা খেলে কেন?
আমি নাশতা কইরা আইছি। তুমি আসার আগে এইখান থিকা একটা মিষ্টিও খাইছি।
ডায়াবেটিস নাই তো?
না। অসুখ-বিসুখ নাই। শরীর ভালোই আছে।
আমিও আলস্নলাহর রহমতে ভালো আছি।
সেইটা তোমারে দেইখাই বুঝা যায়।
তবে তোমার শরীর ভেঙে গেছে।
হ ভাঙছে। নানান অসুবিধায় থাকি। তুমি কাজের কথা জানতে চাইছিলা। আমি বড়লোকদের বাড়ির লনে, কোনো কোনো মিলকারখানার সামনের লনে, পিছনের বাগানে মূর্তি বানাইয়া দেই। ফোয়ারা বানাইয়া দেই। এই সমস্ত কাজ করি।
তাতে চলতে পারো?
পারি। মাঝে মাঝে ভালোই কাজ থাকে হাতে। মাঝে মাঝে থাকে না। কোনো কোনো পার্টি টাকা-পয়সা নিয়া ঘুরায়। তখন বিপদে পড়ি। এইবার সেইরকম একটা বিপদে পড়ছি। নতুন একটা কাজও পাইছি। আড়াই-তিন লাখ টাকার কাজ হইব। এইসব কাজের শুরুর সময় নিজের কিছু ইনভেস্ট করতে হয়। হাতে নাই কিছুই। বড় মেয়েটা আইএ পরীক্ষা দিব, ওর লেইগাও কিছু টাকার দরকার …
তোমার তো দুটোই মেয়ে?
হ। আমি বিয়া করলাম অনেক দেরি কইরা। বড় মেয়েটা আইএ পড়ে, ছোটটা পড়ে ক্লাস নাইনে …
আর আমি দাদা হয়ে গেছি। নাতনির বয়স আট বছর।
তাই নাকি? গগনের মেয়ের আট বছর বয়েস?
হ্যাঁ। সে হচ্ছে আমার জান। সারাক্ষণ দাদার সঙ্গে। ওর জন্যই গগনকে বিজনেস বুঝিয়ে দিয়েছি। কিছুই আমি দেখি না। গগন আর ওর বউ দেখে। আমার বউমার নাম অনন্যা। সেও অস্ট্রেলিয়া থেকে এমবিএ করে এসেছে। গগনের সঙ্গেই পড়তো। দারুণ মেয়ে। যেমন হিসাবি, তেমন সংসারি। ওরা দুজন বিজনেস সামলায় আমি আর শাহিন আছি নাতনি নিয়ে। নাতনির নাম জাইমা।
তোমার ছেলের নাম গগন, এইটা আমার মনে আছে। কাকার ডাকনাম আছিল গগন। এইজন্য তুমি তোমার ছেলের নাম রাখছো।
বাবার কথা মনে হলেই আমার দীর্ঘশ্বাস পড়ে। এখনো পড়ল। কী অমানুষিক কষ্ট একজন মানুষ তাঁর সংসার-ছেলেমেয়েদের জন্য করে গেছেন। আজকালকার দিনে সেটা ভাবাই যায় না। আমার ভাইবোনরা সবাই ভালো আছে। কেউ দেশে, কেউ আমেরিকা-অস্ট্রেলিয়ায়, কেউ ইতালিতে, কেউ ওমানে। বাবার কষ্টের কথা, আমাদের অতীতের কথা মনেও রাখেনি। এমনকি বাবার মৃত্যুদিনটির কথাও মনে রাখে না কেউ কেউ।
আমি রেখেছি। যখনই নিজের ছেলেটিকে দেখি, নাম ধরে তাকে ডাকি না, ডাকি বাবা বলে, সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে বাবার কথা। বেঁচে থাকলে বাবার বয়স হতো এখন বিরানববই বছর। এই বয়সের কত মানুষ আছে চারদিকে। বেঁচে থাকলে বাবা দেখে যেতে পারতেন তাঁর ছেলেমেয়েরা কেমন আছে। তাঁর দিপু কেমন আছে। আহা রে, আমার বাবাকে আমি বুকে তুলে রাখতাম।
রশিদুল, তুমি এখনো সেই বাড়িতেই আছো?
হ ভাই। ওই বাড়িতেই আছি। কই আর যামু, কও? সব মিলাইয়া পোনে চাইর কাঠার মতন জায়গা। লম্বা আর চিপা। দুইজন মানুষ পাশাপাশি হাঁটতে পারে না।
মনে আছে, মনে আছে। দোতলা টিনের ঘরটা আছে?
না, ওইসব কিছুই নাই। ভাগ-বাটোয়ারা হইয়া গেছে। আমার তো একটাই বইন আর আমরা তিন ভাই। বইনের অংশটা বড়ভাই কিনা রাখছিল। দুই ভাই সামনের অংশ নিছে, আমি পাইছি পিছনের অংশ। এক কাঠার মতন হইব। খালি আমার ঘরটাই টিনের। বড় ভাইরা দোতলা বিল্ডিং করছে। বড়ভাই মারা গেছে। তার ছেলেরা আছে। দুই ছেলে। ওরা থাকে। অবস্থা তেমন ভালো না। সদরঘাটের ফুটপাতে দোকানদারি করে। মাজারো ভাই সৌদিতে আছিল। কিছু টেকা-পয়সা আছে। ওর এক মাইয়া। বিয়া হইয়া গেছে। জামাই কিছু করে না। এক ছেলে এক মেয়ে নিয়া মাইয়া আমগো বাড়িতে থাকে। জামাইটা নেশা করে। ফেনসিডিল খায়।
তোমাদের একসময় খুবই ভালো অবস্থা ছিল। এমন হলো কেন? সদরঘাটের দোকানগুলোর কী হলো?
বাবা মারা যাওয়ার পর আসেত্ম আসেত্ম সব গেছে। দোকানে লোকসান হয়। ভাইরা যে যার মতন টাকা সরায়। মা হিসাব চাইলে ঝগড়া করে। আমি কথা কইলে মারামারি লাগনের দশা হয়। মায় মরণের আগেই একটা একটা কইরা গেল পাঁচটা দোকান। এখন নাই কিছুই। তাও ওই বাড়ি না থাকলে কই যে ভাইসা যাইতাম!
রশিদুল কাতর চোখে আমার দিকে তাকালো। দিপু, বিপদে পইড়া তোমার কাছে আইছি ভাই।
আমি রশিদুলের কথার ধার দিয়েও যাই না। তোমার সঙ্গে আমার যোগাযোগ নেই কত বছর হবে, রশিদুল?
আমার বিয়ার পরপরই। বাইশ-তেইশ বছর হইব।
ঠিক তেইশ বছর। তেইশ বছর পর তোমার সঙ্গে দেখা। বিয়ের আগেও তোমার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। ফোনে কথা হতো। দেখা হতো মাঝে মাঝে। তোমাদের বাসায় ফোন ছিল না। পাশের বাড়ির একটা নাম্বার ছিল আমার কাছে। ওই নাম্বারে ফোন করলে ওরা ডেকে দিতো।
মনে আছে। তখন মোবাইল আসে নাই দেশে। বিয়ার আগে তো যোগাযোগ আছিলই, বিয়ার পরও কিছুদিন আছিল। তারপরই যোগাযোগ বন্ধ হইয়া গেল। আমার বিয়াতে তোমরা যাইতে পারো নাই। শাহিনরে নিয়া তুমি গেছিলা আমরিকায়।
ঠিক। একদম ঠিক। আমেরিকা থেকে এসে তোমাদের বাড়িতেও একদিন গিয়েছিলাম। তোমার বউ দেখলাম। তাকে সোনার একটা চেন দিলাম। তোমার বউকে বললাম আমরা কী রকম বন্ধু। আমি বললাম তুমিও বললে। তার পরও তোমার বউ …
রশিদুল তীক্ষ্ণচোখে আমার দিকে তাকালো। সায়রা কী করছিল?
বলবো, বলবো। এতদিন পর তুমি যখন এসেছই, সে-কথা অবশ্যই বলবো। তোমাকে দেখে বাবার কথা মনে পড়ল। আমার বাবাকে তুমি কাকা বলতে। আজো বললে। ভালো লাগল খুব। ছেলের নাম গগন রেখেছি বাবার কথা ভেবে। বাবা ডাকি। যেন আমার বাবা বেঁচে আছেন, আমার সঙ্গেই আছেন। অফিস থেকে ফিরে এলে আমি যেমন সারাক্ষণ বাবার সঙ্গে সঙ্গে থাকতাম, বাবা বাবা করে শুধু ডাকতাম, ছেলে বাড়ি থাকলে ওকে যখন বাবা বাবা বলে ডাকতে থাকি, মনে হয় আমি আমার বাবাকেই ডাকছি।
কাকায় তোমারে সবথিকা বেশি আদর করতো। তুমিও কাকার জন্য পাগল আছিলা। কও দিপু, সায়রা কী করছিল?
তার আগে তুমি আমার দুয়েকটা প্রশ্নের উত্তর দাও। এই যে এতগুলো বছর কেটে গেল, তুমি কখনো আমার কাছে আসোনি কেন বা জানতে চাইলে না কেন, কী কারণে আমি তোমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি না?
ভাবছি কোনো কারণে তুমি আমার উপরে রাগ হইয়া রইছো।
যদি তাও হতো, সেই রাগ ভাঙাবার চেষ্টা করবে না? তুমি আমার এমন বন্ধু!
ওই যে বললাম, ভাবছি তুমি ব্যস্ত মানুষ, এতবড় ব্যবসা করো। বিদেশে থাকো বেশিরভাগ সময়, তোমারে বিরক্ত না করি। তারপর সংসারের চাপ, ভাইগো লগে বাড়ি লইয়া ঝগড়া-বিবাদ। কামকাইজের চাপ, সব মিলাইয়া জীবনডা আগের দিনের মতন নাই। এই আর কি! দুই-চাইরবার তোমারে ফোন কইরা দেকলাম। তুমি আমার ফোনও ধরো না, কাইটা দেও, কলব্যাকও করো না। মনে করলাম, তুমি বড় মানুষ, ছোটবেলার গরিব বন্ধুরে হয়তো মনে রাখতে চাও না, এই জন্য আর চেষ্টা করি নাই। ঠিক আছে, থাকি যে যার মতন।
আমি কিন্তু তোমার খবর রাখতাম। যদিও গেণ্ডারিয়ায় যাওয়া হয় না বহু বছর। নিজেদের বাড়ি আমাদের ছিল না। ভাড়ায় থাকতাম। শাহিনদের বাড়ি ছিল। মাঝে মাঝে সেই বাড়িতে যেতাম। তাও এক দুবছরে এক-আধবার। সেই বাড়ি ডেভেলপারকে দিয়ে দেওয়া হলো। শাহিনের একটা ফ্ল্যাট আছে। ভাড়া দেওয়া। শাহিনও সেই বাড়িতে আর যায় না। কেউ নেই তো! ওর চাচা-ফুফুরা, ভাইরা সবাই ওই এলাকা ছেড়েছে। কেউ উত্তরায় কেউ গুলশান বনানী বারিধারা বা বসুন্ধরায়। আর যেরকম ট্রাফিক জ্যাম! পুরান ঢাকার সঙ্গে সম্পর্কটা শেষই হয়ে গেছে আমাদের। তবে পুরনো দিনের বন্ধুদের খোঁজখবর আমি রাখি। কে কেমন আছে, জানি। তোমার খবরও রাখতাম। দুই মেয়ে নিয়ে মোটামুটি দিন চলছে তোমার, এসব জানতাম। তোমার বউর কারণে সম্পর্কটা আর রাখতে চাইনি।
কী করছিল সে এইটা আমারে কও ভাই। আমি কিছুই বুঝতে পারতাছি না।
তোমার বিয়ের মাস তিন-চারেক পরের ঘটনা। আমি বিজনেস শুরু করেছিলাম তিন বন্ধুর সঙ্গে। অর্থাৎ আমরা চারজন পার্টনার। ওদের কাউকে তুমি চেনো না। আমার অন্য সার্কেলের বন্ধু। টাকা বেশি ওদেরই। গার্মেন্টস করলাম একটা। সেখান থেকে এখন আঠারোটা প্রতিষ্ঠান আমাদের। যখন শুরু করি, তখন থাকি মগবাজারের ফ্ল্যাটে। তারপর উত্তরায় এই বাড়ি করে চলে এলাম। যা হোক, আমার ছেলেটা ছোট। ভাইরা যে যাকে নিয়ে আছে। তাদের অবস্থা ভালো। বোনদের অবস্থা ভালো। বিজনেস নিয়ে খুবই ব্যস্ত থাকি আমি। বিজনেসে আমাকে হেলপ করার বা পাশে থেকে একটু সহযোগিতা করার কেউ নেই। ওদিকে তুমি বিয়ে করেছ কিন্তু তোমার সেভাবে চলার অবস্থা নেই। ভাবলাম, একা একা দৌড়াদৌড়ি করি, তোমাকে রাখি সঙ্গে। আমি বিদেশ-টিদেশ গেলে তুমি সব দেখলে। যদিও পরে সেটা শাহিন করতো। আমি চাইনি আমার বউ বিজনেসে ইনভলভ হোক। পরে বাধ্য হয়ে তা করতে হলো। আমি দেশে না থাকলে শাহিন অফিসে যেত, ফ্ল্যাক্টরিতে যেত। ওই জায়গাটায় আমি তোমাকে চেয়েছিলাম। শাহিনও তাই বলেছিল। এক দুপুরে তোমাকে ফোন করলাম। পাশের বাড়ির সবাই আমাকে চেনে। তোমাকে চাইলে সঙ্গে সঙ্গে ডেকে দেয়। সেদিনও ডাকলো। তুমি ধরলে না, ফোন ধরলো তোমার বউ। বললাম, রশিদুলকে একটু ডেকে দাও। জরুরি কথা আছে। তোমার বউ বেশ রুক্ষ ভঙ্গিতে সরাসরি বললো, এখন ডেকে দেওয়া যাবে না। সে ঘুমায়। আমি বেশ বড় রকমের একটা ধাক্কা খেলাম। বললাম, তুমি গিয়ে আমার কথা বলো, আমার কথা বললে সে উঠে এসে ফোন ধরবে। তখন সে আরো রুক্ষ হলো। তার দরকার কী? আপনেই পরে ফোন কইরেন। রাখি এখন।
রশিদুল ফ্যালফ্যাল করে আমার দিকে তাকিয়েছিল। কোনো রকমে বলল, কও কী?
হ্যাঁ, এইভাবেই বলেছিল এবং ফোন রেখে দিয়েছিল। কেন, তুমি জানো না?
না।
না মানে? তোমাকে সে বলেনি?
না।
আমি ফোন করেছিলাম, বলেনি?
না।
বলো কী?
হ। আমারে বলে নাই। তুমি ফোন করছিলা এইটা আমি জানিই না।
নিশ্চয় বলেছে। তুমি ভুলে গেছ। তেইশ বছর আগের কথা।
যত বছর আগের কথাই হোক, তোমার ব্যাপারে কোনো কথা আমি ভুলুম না। সে আমারে কিছুই বলে নাই। কথাটা আইজ, এই পয়লা আমি শোনলাম।
আমি হতবাক হয়ে রশিদুলের দিকে তাকিয়ে রইলাম। আশ্চর্য ব্যাপার! তোমার বউর ব্যবহারে আমি তো অবাক হয়েইছিলাম, তারপর আরো অবাক হলাম যখন দেখলাম তুমি আমাকে ফোন করছো না, যোগাযোগ করছো না। ভাবলাম নিশ্চয় আমার কথা তুমি আর সেভাবে মনে রাখতে চাইছো না বা কোনো ব্যাপারে তুমি এবং তোমার বউ দুজনেই আমার ওপর বিরক্ত। এসব নিয়ে শাহিনের সঙ্গে কথা বললাম। সে একটা অদ্ভুত কথা বললো। বললো যে, রশিদুলভাই আর তার বউ বিয়েতে হয়তো আমাদের কাছ থেকে বড় রকমের কোনো কিছু আশা করেছিল। যখন দেখলো তেমন কিছু হলো না, তখন দুজনেই বিরক্ত হয়েছে। বিরক্ত থেকে হয়েছে রাগ। আশাহত হলে এমন রাগ মানুষের হতেই পারে। আমি তুমি একসঙ্গে থাকলে অন্যদিকে খেয়াল থাকে না আমাদের। বউরা কিন্তু অনেক কিছু খেয়াল করে। আমেরিকা থেকে এসে আমি আর শাহিন গেলাম তোমার বউ দেখতে। বায়তুল মোকাররম থেকে একটা চেন কিনে নিয়ে গেলাম। শাহিন সেটা দিলো তোমার বউকে। আমি খেয়াল করিনি, শাহিন খেয়াল করেছে, চেনের জন্য ছোট্ট মখমলের একটা থলি দেয় সোনার দোকান থেকে, সেই থলি থেকে চেনটা বের করে তোমার বউ নাকি হাতের তালুতে নিয়ে সেটার ওজন বোঝার চেষ্টা করছিল। সোনার জিনিস গিফট পেলে মেয়েদের মুখ আনন্দে ঝলমল করে ওঠে। তার কিছুই তোমার বউর হলো না, বরং মুখে একটু অসন্তুষ্টি দেখা গেল। অর্থাৎ সে মোটেই খুশি হলো না। শাহিন পরে আমাকে বলেছে, মানে ফোনের ঘটনা শুনে বলেছে, রশিদুলভাইয়ের বউ আমাদের ওপর বিরক্ত। নিশ্চয় রশিদুলভাইকে নানা রকম কথা বলে তোমার ব্যাপারে তার মন বিষিয়ে দিয়েছে। নয়তো সে তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করছে না কেন? কিশোর বয়স থেকে তোমরা এত ঘনিষ্ঠ বন্ধু!
রশিদুল আগের মতোই হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। চোখের পলক ফেলতেও যেন ভুলে যাচ্ছে।
তোমার বিয়ে ঠিক হয়েছে শোনার পর থেকেই ভেবে রেখেছিলাম, তোমাকে আমার সঙ্গে রাখবো। যে-কাজ করো ওই করে জীবন চলবে না। ধীরে ধীরে তোমার জীবনটা আমি বদলে দেবো। এজন্য তোমার বিয়ে নিয়ে সেভাবে আমি ভাবিনি। ভেবেছি তুমি তোমার মতো বিয়েটা সেরে ফেলো। তারপর তোমার চলার ভালো একটা পথ আমি করে দেবো। নয়তো তোমার বিয়েতে লাখখানেক টাকা তো আমি দিতেই পারতাম।
আমার একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল। ভাবলাম এক, হয়ে গেল আরেক।
রশিদুল কাতর গলায় বললো, আমার কপাল। কপালের দোষ।
তারপর তুমি যখন এক-দেড় বছর পর, হঠাৎ হঠাৎ ফোন করতে, আমি বুঝতাম, নিশ্চয় আর্থিক অসুবিধায় পড়ে ফোন করেছো। এজন্য তোমার ফোন ধরতাম না। কেটে দিতাম। শাহিনকে তোমার ফোনের কথা বলতাম। শাহিন বলতো, রশিদুলভাই থাকুক তার বউ নিয়ে। আমাদের কী দরকার তাকে নিয়ে ভাববার? যে আমাদের কথা ভাববে না তার কথা আমরা কেন ভাবব? তুমি তো চেয়েই ছিলে তার জীবন বদলে দিতে, বউটার জন্যই হলো না।
রশিদুল হাহাকারের গলায় বলল, আহা রে, আহা। কোথায় থিকা কী হইয়া গেল! কপাল, সব আমার কপাল!
এ-সময় জাইমার গলা শোনা গেল। দাদু, দাদু। কোথায় তুমি?
আমি উঠে দাঁড়ালাম। এই তো, এখানে। দাঁড়াও, আসছি।
রশিদুলের দিকে তাকিয়ে বললাম, আজ ছুটির দিন। নাতনিটা বেলা করে উঠেছে। আমি একটু ওর সঙ্গে দেখা করে আসি। আমাকে না দেখা পর্যন্ত হাতমুখ ধোবে না, খাবে না। তুমি বসো। আরেক কাপ চা দিতে বলব?
না ভাই। যেই জন্য আইছি …
বসো, বসো।
জাইমা না ডাকলেও অবশ্য আমি উঠতাম। রশিদুল কেন এসেছে তা শুরুতেই বুঝেছি। শাহিনকেও ঘটনাটা বলা দরকার। সে অবশ্য জানে না রশিদুল এসেছে। সব শোনার পর নিশ্চয় দেখা করতে আসবে। তাকে বলে দেবো বিষয়টা যেন না তোলে। তাহলে রশিদুল লজ্জা পাবে। রশিদুলকেও বলা দরকার, শাহিন এলে তাকে যেন ওসব বিষয়ে কিছুই না বলে।
দরজার কাছে গিয়ে আবার ফিরে এলাম। ব্যাপারটা তাকে বুঝিয়ে বললাম। রশিদুল মাথা নাড়লো।
জাইমা আমার জন্য দাঁড়িয়ে আছে সিঁড়ির সামনে। বললো, কোথায় ছিলে তুমি? আমি এতক্ষণ ধরে ডাকছি? শুনতে পাওনি?
পেয়েছি তো। তোমার ডাক শুনেই তো ছুটে এলাম।
আমার গলা শুনে শাহিন বেরিয়ে এলো। জাইমাকে সে ডাকে প্রিন্সেস। বলল, প্রিন্সেস তো পাগল হয়ে গেল তোমার জন্য? কে এসেছে তোমার কাছে?
রশিদুলের কথা বললাম। শুনে সে খুবই অবাক। রশিদুলভাই এত বছর পর?
সংক্ষেপে ঘটনা তাকে বললাম। সে অবাক। বলো কী?
হ্যাঁ। দেখো তো কী কা-! একটা ফোন আর রশিদুলের বউয়ের ওইটুকু কথায় কোথা দিয়ে কী হয়ে গেল! তুমি গিয়ে রশিদুলের সঙ্গে কথা বলো। আমি জাইমাকে একটু সময় দিয়ে আসছি।
জাইমা বলল, সময় আবার কী? আমাকে ব্রেকফাস্ট করিয়ে তারপর যাবে।
ওকে মাই ডিয়ার, ওকে।
মিনিট পনেরো পর ড্রয়িংরুমে এলাম। জাইমাকে ব্রেকফাস্ট করিয়ে নিজের বেডরুম ঘুরে এসেছি। জাইমাও আসতে চেয়েছিল এই রুমে। তাকে ট্যাব ধরিয়ে দিয়েছি। ওই জিনিস নিয়ে এখন গেমস খেলবে।
ড্রয়িংরুমে এসে দেখি ভালোই গল্প করছে শাহিন আর রশিদুল। আমি আসার পর শাহিন উঠল। তোমরা আড্ডা দাও। আমি যাই। রশিদুলভাই, দুপুরে আমাদের সঙ্গে খেয়ে যাবেন।
রশিদুল বিনীত গলায় বলল, না বইন, আইজ না। আরেকদিন আইসা খামুনে। আইজ তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরতে হইব। অসুবিধা আছে।
শাহিন সিঁড়ির দিকে চলে গেল। রশিদুল উঠে এসে দুহাতে আমার ডানহাতটা জড়িয়ে ধরল। সায়রার কথা তুমি মনে রাইখো না ভাই। ওর হইয়া আমি তোমার কাছে মাফ চাইতাছি।
আরে না না, মাফ চাওয়ার কিছু নেই। যা হওয়ার হয়ে গেছে। তুমি বসো।
বসনের আর টাইম নাই ভাই। দুইদিন ধইরা বাড়িতে বাজার নাই। মাইয়া দুইটার শুকনা মুখ আমি আর সহ্য করতে পারতাছি না। কত জায়গায় চেষ্টা করলাম, দুইশো টাকাও জোগাড় করতে পারি নাই। উপায় না দেইখা তোমার কাছে আইছি। অন্তত পাঁচ হাজার টাকা তুমি আমারে দেও। কামকাইজ পাইলে টাকাটা আমি ফিরত দিমু। মাইয়া দুইটার মুখের দিকে আমি তাকাইতে পারি না। দিপু …
রশিদুল হু-হু করে কাঁদতে লাগল। আর আমার তখন অদ্ভুত একটা ব্যাপার হলো, রশিদুলের কান্নায় আমি আমার বাবার মুখটা দেখতে পাই। রশিদুলের মেয়েদের শুকনা অনাহারি মুখের কথা ভেবে দেখতে পাই আমার বোনদের অনাহারি শুকনা মুখ। আমার চোখ চলে যায় বহু বহু বছর পিছনে ফেলে আসা এক জীবনে। বাবার চাকরি নেই। বাড়িভাড়া দিতে পারছেন না। বাজার করতে পারছেন না। ছেলেমেয়েদের মুখে খাবার তুলে দিতে পারছেন না তিনবেলা। ধারের আশায় অনাহারি মানুষটা কোথায় কোথায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন! এক দুপুরে খেতে বসেছেন। সামান্য ভাত আর ডাল। মা করুণ মুখে বসে আছেন সামনে। ভাত মুখে তুলতে গিয়ে এই রশিদুলের মতো করে কাঁদতে লাগলেন বাবা। চোখের পানি টপটপ করে পড়তে লাগল ভাতের থালায়। ছেলেমেয়েদের খেতে দিতে পারেন না এই কষ্টে কাঁদছিলেন মানুষটা …
রশিদুলের কান্নার সঙ্গে বাবার সেই কান্না মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছিল। আমার বুক উথাল-পাথাল করছিল। চোখে পানি আসছিল। একহাতে রশিদুলকে বুকে জড়িয়ে ধরা গলায় বললাম, কেঁদো না, কেঁদো না। সব ঠিক হয়ে যাবে।
বেডরুমে ঢুকেছিলাম টাকার জন্য। পঞ্চাশ হাজার টাকার একটা বান্ডিল খামে ভরে নিয়ে এসেছি। ট্রাউজার্সের পকেটে খামটা ছিল। বের করে রশিদুলের হাতে দিলাম। এখানে পঞ্চাশ হাজার টাকা আছে। এটা দিয়ে চলো। পরে আমি তোমার সঙ্গে কথা বলবো। দেখা যাক কী হয়।
রশিদুল তখনো কাঁদছে আর আমার মন চলে গেছে বহু বছর পিছনে ফেলে আসা একটি দিনে।
১৯৬৮ সালের কোনো একদিন
রশিদুলকে দেখার পর থেকে একটা ঘটনা খুব মনে পড়ছে।
শাহিন আমার দিকে তাকালো। বিকেলবেলা আমরা দুজন আমাদের বেডরুমের সঙ্গের বারান্দায় মাঝে মাঝে বসি। চা খাই, টুকটাক গল্প করি। কখনো কখনো জাইমা থাকে আমাদের সঙ্গে। স্থির হয়ে তো আর বসে না। একবার দৌড়ে আসে, আবার দৌড়ে চলে যায়। কত রকমের ব্যস্ততা তার।
আজ জাইমা বাড়িতে নেই। ছুটির দিন বিকেলে গগন আর অনন্যা মেয়েকে নিয়ে বেড়াতে যায়। রাতে নামকরা রেস্টুরেন্টে ডিনার করে ফেরে।
আজো সেরকম কোথাও গেছে।
জাইমা বাড়িতে না থাকলে পুরো বাড়ি ফাঁকা লাগে। নির্জন লাগে। মনে হয় বাড়িতে লোকজনই নেই।
শাহিন বলল, কোন ঘটনা বলো তো? তোমার জীবনের সব ঘটনাই আমাকে বলেছো। আমি জানি প্রায় সবই।
এটা বোধহয় জানো না। এটা তোমাকে বলা হয়নি। আমিই ভুলে গিয়েছিলাম। আজ রশিদুলকে দেখার পর মনে পড়ল।
বলো শুনি।
আটষট্টি সালের কথা। আমি আর রশিদুল ক্লাস এইটে পড়ি। বাবার চাকরি নেই। সংসারে তীব্র অভাব। কোনো কোনো দিন বাজারই হয় না। আক্ষরিক অর্থেই আমরা না খেয়ে থাকি। সারাদিন এদিক-ওদিক ঘুরে বাবা কিছু জোগাড় করতে পারলে …
তোমার এসব কষ্টের কথা শুনলে তোমার জন্য আমার খুব মায়া লাগে। মনে হয় তোমার মাথায় একটু আদর করে দিই।
শোনো, ওরকম একদিনের ঘটনা। আমি কখনো স্কুল কামাই দিতাম না। তারও একটা কারণ ছিল। স্কুলে খুব ভালো টিফিন দিত। বড় একটা মালপোয়া পিঠা, লুচি-হালুয়া, জিলাপি। কোনো কোনো দিন ওই খেয়ে আমার দিনরাত কেটে গেছে। আমার টিফিন খাওয়াটা খেয়াল করে দেখতো রশিদুল। বুঝতো সকালে আমার কিছুই খাওয়া হয়নি। সে তার টিফিনটা আমাকে দিয়ে দিত। দিত এমন করে, যেন আমি কিছু মনে না করতে পারি। অনাহারি মধ্যবিত্ত মানুষের এক ধরনের অহংকার থাকে। আড়ষ্টতা আর লজ্জা থাকে। রশিদুল ভাবতো, সরাসরি তার টিফিনটা আমাকে দিয়ে দিলে আমি নাও নিতে পারি। বুদ্ধি করে কাজটা সে করতো। টিফিন হাতে নিয়ে খেতো না। হঠাৎ আমার সামনে এসে বলতো, দিপু, আমার টিফিনটাও তুমি নেও। খাইতে ভাল ল্লাগতাছে না। স্কুলে আসার আগে মায় জোর কইরা বেশি ভাত খাওয়াইয়া দিছে। একেকদিন এরকম একেক অজুহাত। আমি আড়ষ্ট ভঙ্গিতে ওর টিফিন নিতাম। আমাকে তৃপ্তি করে খেতে দেখে গভীর আনন্দে চকচক করতো রশিদুলের চোখ।
আমার একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল।
মিতু মেয়েটা এসময় বিকালের চা-নাশতা নিয়ে এলো। পাপড় ভাজা আর লিকার চা। আমি একটা পাপড় নিয়ে মুখে দিলাম। চায়ে চুমুক দিলাম। সেদিন সকাল থেকে কিছুই খাওয়া হয়নি। বাসায় একমুঠ মুড়িও ছিল না। সাড়ে দশটার দিকে স্কুলে এসেছি। সাধারণত আমি আর রশিদুল একসঙ্গে স্কুলে আসতাম। বানিয়ানগর থেকে ও আসতো ডিস্টিলারি রোডে, আমাদের বাসায়। তারপর দুজনে হাঁটতে হাঁটতে স্কুলে যেতাম। ধূপখোলা মাঠের দক্ষিণ দিককার রাস্তা দিয়ে, সাধনা ঔষধালয়ের ওখান দিয়ে সোজা গেণ্ডারিয়া হাইস্কুল। সেদিন রশিদুল দেরি করছিল দেখে আমি একা একাই স্কুলে চলে এসেছি। ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে টুকটাক কথা হয়েছে। সে খেয়াল করছিল আমার মুখটা শুকনা। বুঝে গিয়েছিল নিশ্চয় আমার কিছু খাওয়া হয়নি। আমাদের সংসারের অবস্থা সে জানতো। টিফিনের সময় ওরকম একটা অজুহাত তৈরি করে ওর টিফিনটা আমাকে দিলো। সেদিন টিফিন ছিল লুচি-হালুয়া। বড় একটা লুচির ভিতর এক চামচ হালুয়া ঢুকিয়ে ভাঁজ করে ছাত্রদের দিত। খুব টেস্টি হতো খাবারটা। দুটো লুচি খেয়ে ভালোই পেট ভরেছে আমার। তার পরও ছুটির পর রশিদুল আমাকে ওদের বাড়িতে নিয়ে গেল। চলো দিপু, বাড়িত গিয়া দুইজনে মিলা ভাত খাইয়া ধূপখোলা মাঠে খেলা দেখতে যামুনে। আইজ ইসটেন কেলাবের (ইস্ট এন্ড ক্লাব) খেলা আছে। যতক্ষণ স্কুলে থাকি, ভালো থাকি। রশিদুলের সঙ্গে থাকি, ভালো থাকি। বাসায় গেলেই মার শুকনা মুখ। ভাইবোনদের করুণ ক্ষুধার্ত মুখ। বাবা হয়তো হতাশমুখে বাসায় ফিরেছেন …। গেলাম রশিদুলের সঙ্গে। ওদের বাড়িতে ভালো মাছ রান্না হয়, গরু-খাসির মাংস প্রচুর তেল দিয়ে রান্না হয়। বড় বড় টুকরা মাংসের। মুরগি রান্না হলে রান রেখে দেওয়া হয় রশিদুলের জন্য। রশিদুল সেসব আমাকে খাওয়ায়। তখন পর্যন্ত রশিদুলের বাবার সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। ওর মার সঙ্গে হয়েছে, ভাইদের সঙ্গে হয়েছে। শুধু বাবার সঙ্গেই দেখা হয়নি বা পরিচয় হয়নি। তিনি দোকানপাট ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত। সেদিন বাড়িতে ছিলেন। জ্বর। বাড়িতে ঢুকেই সামনের ঘরে আমাকে বসিয়েছে রশিদুল। এই ঘরটা বসার ঘর, আবার রশিদুলের পড়ারও ঘর। টিনের দোতলা ঘরের নিচতলা।
অনেকক্ষণ পর কথা বলল শাহিন। ওই ঘরটা আমি দেখেছি। বিয়ের পর তোমার সঙ্গে একদিন গিয়েছিলাম। রশিদুলভাইয়ের বিয়ের পরও তো গেলাম।
হ্যাঁ। যাহোক যা বলছিলাম। বাড়িতে ঢুকেই রান্নাঘরে গিয়েপেস্নলটে করে ভাত নিয়ে এলো রশিদুল। বিকাল সাড়ে চারটার মতো বাজে। গরমের দিন। পেস্নট ঠেসে ভাত এনেছে রশিদুল। খাসির মাংসের বড় দুটো টুকরা দিয়েছে আমাকে। ঝোল আলু দিয়েছে। নিজে নিয়েছে একটু কম। আমরা খাওয়া শুরু করিনি, রশিদুলের বাবা ডাকলেন, রশিদুল, ওই রশিদুল, হুইন্না যা। তুমি তো বোধহয় জানোই রশিদুলরাও আমাদের মতোই, বিক্রমপুরের লোক। ওই ভাষায়ই কথা বলে। রশিদুল অবশ্য আগে আমাকে একদিন বলেছিল আমার বাবা ওদের বাড়িতে অনেকবার গিয়েছেন। ওর বাবাকে আমার বাবা ‘দাদা’ ডাকেন। রশিদুলের বাবা বয়সে বড়। বিক্রমপুরে ভাইশ্রেণির বড়দের দাদা ডাকারই নিয়ম। আর সেই জন্যই রশিদুল আমার বাবাকে কাকা ডাকে। তো, বাবার ডাক শুনে রাশিদুল বলল, বাবায় ডাকতাছে। লও দিপু, বাবার লগে তোমার পরিচয় করাইয়া দেই। তারবাদে আইসা ভাত খামুনে। গেছি রশিদুলের পিছন পিছন। রশিদুলের বাবা কাঁথা গায়ে দিয়ে শুয়ে আছেন খাটে। রশিদুলকে দেখে বললেন, তুই কেমুন পোলা? আমার জ্বর। ইশকুল থিকা আইয়া একবার খবরও লইলি না? রশিদুল কথাটা তেমন গায়ে মাখলো না। বললো, আর কিছু কইবেন? আমার খিদা লাগছে। আমি অহন ভাত খামু। এই যে দিপু। আমার বন্ধু। গগন কাকার পোলা। বাবার কথা শুনে রশিদুলের বাবা তীক্ষ্ণচোখে আমার দিকে তাকালেন। তুই গগনের পোলা? ও আইচ্ছা। আরে তর বাপে তো আমার কাছ থিকা একশটা টেকা ধার নিছিল কয়দিন পরে দেওনের কথা কইয়া। টেকাডা তো আর দিলোই না, আমার লগে দেহাও করে না। শুনে আমার মনে হলো কেউ যেন ঠাস করে আমার গালে একটা চড় মেরেছে। লজ্জায় মুখটা চুন হয়ে গেল। রশিদুল আমার দিকে তাকাল। আমার মুখ দেখে যা বোঝার বুঝে গেল। বললো, দিপু, তুমি গিয়া বহো। আমি আইতাছি। আমি চুপচাপ বেরিয়ে এলাম। আসতে আসতে শুনি রশিদুল তার বাবার ওপর বেশ চোটপাট করছে। আপনে গগন কাকার কাছে টেকা পাইবেন হেইডা দিপুরে কইলেন ক্যা? ও শরম পাইলো না? ওরে আমি লইয়াইছি ভাত খাওয়াইতে আর আপনে ওরে এইসব কইলেন! রশিদুলের বাবা কী কী বললো সে-কথা আর আমার কানে গেল না। আমার তখন খুব কান্না পাচ্ছিল। দুহাতে চোখ মুছতে মুছতে রাস্তায় বেরুলাম। খাসির মাংস আর ভাত পড়ে রইল। পেটে খিদা। তাও সেই খাবারের কথা মনে হলো না। বিষণ্ণমুখে বাসায় এসে বই রেখে ধূপখোলা মাঠের দিকে চলে গেলাম। অনেকক্ষণ পর রশিদুল আমাকে খুঁজতে খুঁজতে এলো। কত রকমভাবে যে আমাকে ম্যানেজ করার চেষ্টা করলো! কত কিছু যে আমাকে বোঝালো! বাবার সঙ্গে সে ঝগড়া করেছে – ওসবও বললো। মনে আছে, একটা সময়ে আমি বলেছিলাম, চাকরি হলে তোমার বাবার টাকা আমার বাবা শোধ করে দেবেন। যদি বাবা না দিতে পারেন বড় হয়ে আমি দিয়ে দেবো। ওই বয়সে যেমন বলে সেনসেটিভ কিশোর ছেলেরা। রশিদুলের বাবার সেই একশ টাকা বাবা দিতে পারেননি, আমি জানি। বছর দুয়েক পর বাবার চাকরি হলো। তারপর বছরখানেক বেঁচে ছিলেন। একাত্তর সালে মারা গেলেন। আজ রশিদুলকে দেখার পর থেকে ঘটনাটা আমার বারবার মনে পড়ছে। বাবা মারা যাওয়ার পর কতদিন কেটে গেছে! রশিদুলের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধুত্ব তেইশ বছর আগ পর্যন্ত চলছিল। টাকা-পয়সাও অনেক সময় ওকে আমি দিয়েছি।
পাঁচ-দশ হাজার, বিশ হাজার। তবে একদম দায়ে না পড়লে ও কখনো আমার কাছে চাইতো না। চাইলেই বুঝতাম, একেবারেই অপারগ হয়ে চেয়েছে। আমি দিতাম। ও আরেকটা কথা বোধহয় তোমাকে বলা হয়নি। ছেলেবেলা থেকেই বিচিত্র স্বভাব ছিল রশিদুলের। নানা রকমের পাখি পালতো।
বলেছো বলেছো। আমি জানি। রশিদুলভাই অনেক রকমের পাখি পালতো। টিয়া ময়না ছিল তার। কবুতর ছিল অনেক রকমের। পোষা শালিক ছিল একটা। খাঁচায় থাকতো না শালিকটা। বাইরে থাকতো। রশিদুলভাই ডাক দিলেই তার কাঁধে এসে বসতো।
ঠিক। তোমার ভালোই তো মনে আছে। শালিকটা বিড়ালে খেয়ে ফেলেছিল। বিড়ালটাও রশিদুলের পোষাই ছিল। তারপর সেই বিড়াল আর রাখেনি সে। খুবই রেগে ছিল বিড়ালের ওপর। রশিদুল খরগোশ পালতো, সাদা ইঁদুর পালতো।
ওগুলোকে বলে বিলাতি ইঁদুর।
রাইট। পোষা বেজি ছিল একটা। আশ্চর্য ব্যাপার, রশিদুল একবার একটা সাপও পুষতে শুরু করেছিল।
বলো কী? সাপ?
হ্যাঁ। তবে বিষাক্ত সাপ না। একটা খাঁচায় আটকে রাখতো। জ্যান্ত ছোট ইঁদুর ধরে এনে সাপের খাঁচায় ঢুকিয়ে দিত। সেটা প্যাঁচ দিয়ে বা থাবা দিয়ে ধরে খেতো সাপটা। অদ্ভুত ছেলে ছিল রশিদুল। ঝাঁকে ঝাঁকে কবুতর ওড়াতো আকাশে। একবার সেই আমলে দেড়শো টাকা দিয়ে একটা মোরগ কিনে আনলো। বিশাল মোরগ। পায়ের নখ লম্বা, ধারালো। ঠোঁট তীক্ষ্ণ। ওই মোরগের নাম ‘আসলি’। ফাইটার মোরগ। রশিদুল সেই মোরগ কোলে নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় মোরগের লড়াই করাতে নিয়ে যেত। দশ টাকা বিশ টাকা বাজিতে চলতো মোরগের লড়াই। আমি সেই লড়াই দেখতে কয়েকবার গেছি রশিদুলের সঙ্গে। কখনো কখনো মোরগের পায়ে ছোট্ট ধারালো চাকু এমনভাবে বেঁধে দিত, মোরগ যখন পা দিয়ে অন্য মোরগটাকে আঘাত করতো, চাকুতে ফালা ফালা হতো সেই মোরগের পা, মুখ, মাথা।
অদ্ভুত ব্যাপার।
সত্যি অদ্ভুত ব্যাপার। এবার আরেকটা অদ্ভুত ঘটনা শোনো। রশিদুল এক কোরবানি ঈদে গরুর ছোট্ট এক টুকরা সলিড কাঁচা মাংস চিবিয়ে খেয়েছিল। ওদের বাড়িতেই। আমার সামনে।
শাহিন মুখ কুঁচকে ওয়াক করলো। ছি, কী বলছো?
সত্যি। রশিদুল ওই টাইপই ছিল। তবে ওর মধ্যে একটা শিল্পী মন ছিল। মাটি দিয়ে অনেক কিছু বানাতে পারতো। নানা রকমের পুতুল। হাতি ঘোড়া বাঘ ভালুক। কাঠ দিয়েও বানাতে পারতো। কোথাও শেখেনি। নিজে নিজেই পারতো। নেশা ছিল। সেই নেশাই শেষ পর্যন্ত ওর পেশা হয়ে গেল।
কথার ফাঁকে ফাঁকে চা শেষ করেছি আমরা। আমি শেষ বিকেলের আকাশের দিকে তাকিয়ে পিছনে ফেলে আসা সেই জীবনে চলে গেছি। রশিদুলকে নিয়ে কতদিনকার কত কথা মনে পড়ছে। বাবার মৃত্যুর দিন থেকে একটানা চারদিন বাড়িতে যায়নি রশিদুল। সারাটাক্ষণ আমার সঙ্গে। আমাকে বুক দিয়ে আগলে রাখছিল। কত রকমের প্রবোধ, সান্তবনা। আমার চোখে পানি দেখলেই দুহাতে আমার মাথাটা বুকে চেপে ধরতো। আমার এমন বন্ধু! ওর বউর আচরণে আমি তেইশ বছর সরে থাকলাম। এটা আমারও উচিত হয়নি। রশিদুলের কান্নাটা ভুলতে পারছি না। রাজপুত্রের মতো জীবন ছিল রশিদুলের। আর আমি ছিলাম … সময় পুরো ব্যাপারটাই উলটে দিয়েছে।
শাহিন।
বলো।
আমি একটু রশিদুলদের বাড়িতে যেতে চাই। দুয়েকদিনের মধ্যেই। তুমি যাবে আমার সঙ্গে?
চলো যাই। কতদিন ওদিকটায় যাই না।
তারপর রশিদুলকে নিয়ে কিছু পরিকল্পনার কথা শাহিনকে বললাম। শাহিন হাসিমুখে বলল, বন্ধুর জন্য তো করা উচিতই। করো তুমি যা করতে চাইছো।
সাত মাস পর
কাঠাখানেক জমির পুরোটাই কাজে লাগানো হয়েছে। সুন্দর দোতলা বিল্ডিং হয়েছে। ছোট ছোট চারটা রুম একতলা-দোতলা মিলে। নিচতলায় একপাশে ছোট্ট রান্নাঘর আর বাথরুম। বাড়ির পিছনের অংশ রশিদুলের। ওদিক দিয়ে গেটও করা হয়েছে। চিপা একটা গলি আছে গেটের বাইরে। ওদিক দিয়েও চলাচল করা যায়। মূল গেট সামনের দিকে। সেই আগের মতোই বাড়িটা। দুজন মানুষ পাশাপাশি হেঁটে ঢুকতে পারবে না।
শাহিন আমার আগে আগে হাঁটছিল। বাড়িতে বেশ একটা সাজসাজ রব। আজ নিজের বিল্ডিংয়ে উঠবে রশিদুল। মিলাদের ব্যবস্থা হয়েছে। রশিদুল আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল।
যে ধোলাইখালে বর্ষাকালে আমি আর রশিদুল সাঁতার কেটেছি সেই ধোলাইখাল এখন বিশাল রাস্তা। রশিদুলের গলিতেও গাড়ি ঢোকে। আমরা নেমেছিলাম সামনের গেটে। শাজাহান ড্রাইভার জায়গাটা এখন ভালোই চেনে। এই নিয়ে কয়েকবার এলো সে।
সাত মাস আগে রশিদুল যেদিন আমার কাছে গিয়েছিল তার দুদিন পরই বিকেলবেলা শাহিনকে নিয়ে রশিদুলের বাড়িতে এসেছিলাম। বাড়ির পিছনদিককার প্রায় ভেঙেপড়া টিনের ঘরটায় দুই মেয়ে আর বউ নিয়ে থাকে রশিদুল। ওর যে এত খারাপ অবস্থা তা আমি কল্পনাও করতে পারিনি। বউটা একসময় দেখতে মন্দ ছিল না। সেই মহিলা ভেঙেচুরে একেবারে শেষ হয়ে গেছে। মেয়ে দুটোর নাম মুন্নি আর তিন্নি। হামিদুলের চেহারা আর প্রথম জীবনের গায়ের রং পেয়েছে। মিষ্টি চেহারা। সেই চেহারায় দারিদ্র্য হতাশা আর বিষণ্ণতা। এত মায়া লাগছিল মেয়েদুটোর মুখ দেখে। ওই ঘরেই আমরা বসেছিলাম। সায়রা বারবার সেই টেলিফোনের ব্যাপারটা নিয়ে মাফ চাইলো, মুখে আঁচল চেপে কাঁদলো। কাঁদতে কাঁদতে বললো, আমার জইন্য আপনের বন্ধুর জীবন নষ্ট হইয়া গেছে ভাই। আমি তার জীবনডা নষ্ট কইরা দিছি। আমার বড় অন্যায় হইছিল, বড় ভুল হইছিল আপনের লগে ওই রকম ব্যবহার করা। আপনের বাড়ি থিকা আইসা সে যখন সব বলল, বইলা কান্নাকাটি করল, আমার দুই মাইয়ায় আমারে খুব বকলো। তুমি এইডা ক্যান করছিলা মা? আমার বাবার জীবন নষ্ট করছো, আমগো জীবন নষ্ট করছো। তয় আপনের বন্ধু কিন্তু আমারে কিছু বলে নাই। সে খুব ভালো মানুষ। জীবনে আমার লগে খারাপ ব্যবহার করে নাই।
সায়রা আমার পা জড়িয়ে ধরতে এলো। আপনে আমারে মাপ কইরা দেন ভাই।
শাহিন তাকে জড়িয়ে ধরল। আরে এ কী! ওসব ভুলে যাও। সব ঠিক আছে। মানুষের জীবনে অনেক রকমের ভুল হয়। বসো, বসো তুমি।
রশিদুল দাঁড়িয়ে ছিল এককোণে। মুখটা নিচু করে আছে। টপটপ করে চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। মেয়েদুটো বাবার দুপাশে দাঁড়িয়ে আছে। বাবাকে কাঁদতে দেখে ওরাও কাঁদতে লাগল। বোঝা গেল বাবার জন্য পাগল দুই মেয়ে।
আমি উঠে গিয়ে রশিদুলের কাঁধে হাত রাখলাম। কেঁদো না রশিদুল, কেঁদো না। সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি আছি।
মেয়েদুটোকেও সান্তবনা দিলাম।
শাহিনকে আর আমাকে দেখে, আমাদের দামি গাড়ি দেখে রশিদুলদের বাড়িতে বেশ একটা সাড়া পড়েছে। রশিদুলের বড় দুই ভাইয়ের পরিবারের লোকজন, বাচ্চাকাচ্চারা উঁকিঝুঁকি মারছিল। গেটের বাইরেও দেখা যাচ্ছে কাউকে কাউকে। ড্রাইভারকে এটা-ওটা জিজ্ঞেস করছে।
সেদিনই পরিকল্পনাটা আমি রশিদুলকে বলে এসেছিলাম। এই পাড়াতেই তুমি একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নাও। আমাদের ফ্যাক্টরির সিকিউরিটির লোকজনের, কেয়ারটেকারদের কোয়ার্টার তৈরির কাজ করে একজন কন্ট্রাক্টর। ওর নাম গোলাম হোসেন। তাকে আমি পাঠাবো। এইটুকু জায়গার মধ্যেই দেখবে কী সুন্দর দোতলা একটা বিল্ডিং করে দিয়েছে সে। কোনো কিছুই তোমাকে ভাবতে হবে না। তুমি শুধু কাজের তদারকি করবে। কাজটা ঠিকমতো হলো কি না দেখবে। ফ্ল্যাট ভাড়া, তোমার সংসার খরচ, মেয়েদের পড়াশোনা সব মিলিয়ে মাসে তোমার কত টাকা করে লাগবে আমাকে জানাবে। তোমার দায়িত্ব আমার। তোমার মেয়েদের পড়ালেখা বিয়েশাদি কোনো কিছু নিয়েই তুমি ভাববে না। লেখাপড়া শেষ করে ওরা চাকরি-বাকরি করবে। আমি বেঁচে না থাকলে গগন ওদের দেখবে।
রশিদুল কথা বলতে পারেনি। বারবার চোখ মুছছিল।
তারপর গত সাত মাসে তিনবার আমি এসেছি। বাড়ির কাজ কতটা হলো দেখে গেছি। গত সপ্তাহে কিছু ফার্নিচার কিনে দিয়েছি রশিদুলকে। বাড়ি গোছগাছ হয়ে গেছে। আজ ওরা উঠবে। আমি আর শাহিন এসেছি গৃহপ্রবেশে।
রশিদুলদের আত্মীয়স্বজন, পাড়ার লোকজন যাঁরা মিলাদ পড়তে এসেছিলেন প্রত্যেকে আমার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। আজকালকার দিনে এরকম বন্ধুত্বের নজির পাওয়া যাবে না ইত্যাদি ইত্যাদি বলছিল। আমি তাকিয়ে তাকিয়ে রশিদুলকে দেখছিলাম, সায়রা আর ওদের দুই মেয়েকে দেখছিলাম। বিষণ্ণ মুখগুলোয় যে কী অপূর্ব এক আলো খেলা করছে! এই আলো যে দেখে তাঁর অন্তরটাও আলোকিত হয়।
ফেরার সময় শাহিনকে বললাম, শাহিন, রশিদুলের জন্য এত কিছু কেন করলাম, জানো?
শাহিন আমার দিকে তাকালো। কেন বলো তো?
আমি আসলে বাবার সেই ঋণটা শোধ করলাম। যেখানে রশিদুলের বিল্ডিংটা হয়েছে ঠিক ওখানকার ঘরটায় শুয়েই আমার বাবার কাছে একশটা টাকা পাওনা থাকার কথা বলেছিলেন রশিদুলের বাবা। বাবার সেই ঋণটা বহু বহু বছর পর অন্যভাবে শোধ করলাম আমি। রশিদুল আমার জন্য সেই কিশোর বয়সে যা করেছে সেই ঋণও শোধ করলাম।
শাহিন হাসল। অদ্ভুত কথা বললে তুমি। বন্ধুত্বের ঋণ, ভালোবাসার ঋণ কি শোধ করা যায়? যেরকম ভালোবেসে, আবেগে আর মমতায় রশিদুলভাই সেই বয়সে নিজে না খেয়ে তোমাকে খাইয়েছে, তোমাকে বুক দিয়ে আগলে রেখেছে, ওইটুকু একটা বাড়ি করে দিয়ে বা কিছু টাকা-পয়সা দিয়ে তুমি সেই বন্ধুত্বের ঋণ শোধ করবে? এটা হয়? হয় না দিপু। তোমার অসহায় সময়ে যে তোমার পাশে দাঁড়িয়েছে, তার অসহায়ত্বের সময় তুমি তার পাশে দাঁড়িয়েছ, এইভাবে ভাবো। বন্ধুত্বের ঋণ শোধ করেছ, তা কখনো ভেবো না। বন্ধুত্বের ঋণ শোধ করা যায় না। ভালোবাসার ঋণ শোধ করা যায় না। বাবার ঋণ শোধ করলে সেটা ভাবতে পারো।
শাহিনের কথা শুনে খুবই ভালো লাগলো। বললাম, ঠিকই বলেছ তুমি। বন্ধুত্বের ঋণ শোধ করা যায় না।
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
eCoxs Special
BNM Archive
- ► 2026 (1398)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...
Recent Comments
Cox's Bazar Us Categories
Cox's Bazar Us Categories
Cox's Bazar Us Categories
প্রথম আলো
আন্তর্জাতিক
মানবজমিন
আলোচনা
কালের কণ্ঠ
উপ-সম্পাদকীয়
যুগান্তর
প্রথম পাতা
মতামত
জাতীয়
সমকাল
নয়া দিগন্ত
রাজনীতি
জনকণ্ঠ
সুশীল কথন
ভারত
অর্থনীতি
শেষের পাতা
বিনোদন
ক্রিকেট খেলা
দেশে দেশে
যুক্তরাষ্ট্র
মধ্যপ্রাচ্য
স্পেশাল প্রতিবেদন
নির্বাচন
প্রথম আলো
খেলা
খোলা কলম
আইন আদালত ও বিচার
ফুটবল খেলা
আমার দেশ
ইসরায়েল
বাংলানিউজ
মুক্তধারা
স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা
Lead
ফিলিস্তিন
রাজধানী
অপরাধ
আন্দোলন
এক্সক্লুসিভ
আইন ও মানবাধিকার
নারী
শিক্ষা
বিএনপি
সারা বিশ্ব
ক্রিকেট
ইরান
সাহিত্য
পাকিস্তান
মুক্তমঞ্চ
আওয়ামী লীগ
বাংলা ট্রিবিউন
শিশু
দুর্নীতি
সারা দেশ
বিশাল বাংলা
চট্টগ্রাম
ব্রেকিং নিউজ
সাউথ এশিয়ান মনিটর
সিলেট
ক্রীড়া
পার্সটুডে
অর্থ
খালেদা জিয়া
কালবেলা
অর্থ ও বাণিজ্য
শিল্প বাণিজ্য
চীন
বিবিসি বাংলা
কাশ্মীর
চতুরঙ্গ
খবরাখবর
প্রধানমন্ত্রী
বিশ্ব
নতুন বার্তা
হত্যা
ধর্ম
স্মরণ
গল্প
যুক্তরাজ্য
শিক্ষাঙ্গন
শেখ হাসিনা
ফুটবল
বার্তা২৪ ডটনেট
রস+আলো
সাক্ষাৎকার
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
মুসলিম
জাতিসংঘ
মুক্তিযুদ্ধ
রাশিয়া
মিডিয়া
হরতাল-অবরোধ
খেলা ধুলা
ছাত্রলীগ
প্রতিবেদন
ইতিহাস
ইউরোপ
সোহরাব হাসান
জামায়াতে ইসলামী
অমানবিক
সৌদি আরব
আলোকিত চট্টগ্রাম
পশ্চিমবঙ্গ
আইন
চাষাবাদ- কৃষি ও কৃষক
ফিচার
ভ্রমণ
মিজানুর রহমান খান
ওয়েছ খছরু
খোলা চোখে
বাংলাদেশ-ভারত
ইসলাম ও সমাজ
সিরিয়া
যৌন নির্যাতন
নারায়ণগঞ্জ
নারী ধর্ষণ
জাতীয় সংসদ
আনন্দ
খেলাধুলা
ব্যাংকিং ও বিনিয়োগ
বিজ্ঞান ও গবেষণা
মাদক
আফ্রিকা
সন্ত্রাস
আনিসুল হক
যৌন আবেদনময়ী
প্রবাস
মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান
ছুটির দিনে
সৈয়দ আবুল মকসুদ
সংখ্যালঘু
নকশা
বিজ্ঞান প্রজন্ম ও কম্পিউটার
গোল্লাছুট
তুরস্ক
আফগানিস্তান
বইপত্র
ড. মুহাম্মদ ইউনূস
অন্য আলো
প্রতারণা
ছবি
টাইমস্ আই বেঙ্গলী
প্রকৃতি
ব্যবসা বাণিজ্য
অপহরণ
দুর্ঘটনা
সাহিত্যালোচনা
ইউক্রেন
গার্মেন্টস শিল্প শ্রমিক
জাতীয় পার্টি
রাজশাহী
স্টেডিয়াম
দীন ইসলাম
মানবাধিকার
তরুণ প্রজন্ম
ফূটবল খেলা
রোহিঙ্গা
মিজানুর রহমান
মশিউল আলম
আইন ও বিচার
আলী যাকের
রুদ্র মিজান
হিন্দু
মানবকণ্ঠ
খুলনা
হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ
আব্দুল কাইয়ুম
মালয়েশিয়া
তারেক শামসুর রেহমান
আসিফ নজরুল
নেপাল
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
সাজেদুল হক
ফারুক ওয়াসিফ
কাফি কামাল
মৌলভীবাজার
হাসান ফেরদৌস
স্বাস্থ্য
আনন্দ কণ্ঠ
তৃতীয় পাতা
যাপিত জীবন
সড়ক দুর্ঘটনা
ক্রিখেট খেলা
জ্যোতির্বিজ্ঞান
ফুটবল খলা
বদরুদ্দীন উমর
মরিয়ম চম্পা
আলী রীয়াজ
রংপুর
টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া
নতুনের জানালা
বৃষ্টি ও বন্যা
মোস্তফা কামাল
শিল্প ও সাহিত্য
এ এম এম শওকত আলী
কক্সবাজার
বন্ধুসভা
সংবিধান ও রাষ্ট্র
ঢাকা
বগুড়া
মিয়ানমার
ঈদ বিশেষ সংখ্যা
বাংলাদেশ
অবৈধ-অনিয়ম-কারচুপি
এ কে এম জাকারিয়া
গবেষণা
নির্বাচনী কূটনীতি
বদিউল আলম মজুমদার
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি
মিসর
এম আবদুল হাফিজ
পরিবেশ
শোক
সংস্কৃতি
খবর
বাংলাদেশে
ব্রাহ্মণবাড়িয়া
অজয় দাশগুপ্ত
প্রজন্ম ডট কম
শুভ্র দেব
আবুল কাশেম
আমদানি ও রপ্তানি
ফ্রান্স
কিশোরগঞ্জ
আবদুল মান্নান
রঙের মেলা
ঐতিহ্য
জাপান
কুমিল্লা
মুক্তমত
রাজনৈতিক আলোচনা
শরিফুল হাসান
শিল্প
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল
মাহমুদুর রহমান
ময়মনসিংহ
লেবানন
সংবাদ২৪.নেট
পার্বত্য চট্টগ্রাম
সীমান্ত সন্ত্রাস
আহমদ রফিক
ইফতেখার মাহমুদ
কাজের খবর
ইরাক
স্বপ্ন নিয়ে
টাঙ্গাইল
HotTopic
জীবনযাপন
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর
যশোর
অমর সাহা
আনোয়ার হোসেন
আলী ইমাম মজুমদার
গাজীপুর
রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন
আবুল মোমেন
থাইল্যান্ড
মুফতি এনায়েতুল্লাহ
শ্রীলঙ্কা
চিকিৎসা
সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়
মেহেদী হাসান
রসালোচনা
কামরুজ্জামান মিলু
পরিবেশ-জীববৈচিত্র্য
বরগুনা
কাজী সোহাগ
স্মৃতিচারণ
আনু মুহাম্মদ
কলকাতা
কুলদীপ নায়ার
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
সারাবেলা
অস্ট্রেলিয়া
তথ্য প্রযুক্তি
মারুফ কিবরিয়া
ব্রাজিল
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম
অন্য দিগন্ত
মহিউদ্দীন জুয়েল
মানসুরা হোসাইন
মুনতাসীর মামুন
শিরোনাম
শেখ রোকন
আবু সাঈদ খান
জেল থেকে জেলে
ফেসবুক
মহিউদ্দিন আহমদ
সংবাদ
কবিতা
বিশ্বজিৎ চৌধুরী
আলী হাবিব
প্রকৃতি ও পরিবেশ
শিল্প ও বাণিজ্য
শেষ পাতা
আবু আহমেদ
এম সাখাওয়াত হোসেন
নুরুজ্জামান লাবু
নূর মোহাম্মদ
সুভাষ সাহা
আতাউস সামাদ
আলোচনা মতামত
অর্থনীতি ও বানিজ্য
এবিএম মূসা
আতাউর রহমান
কামাল আহমেদ
পিয়াস সরকার
আসাম
মসজিদ
রংবেরং
রাহীদ এজাজ
শ্রদ্ধাঞ্জলি
আশরাফুল ইসলাম
ফেনী
বরিশাল
রণজিৎ বিশ্বাস
রোকনুজ্জামান পিয়াস
অরুণ কর্মকার
ইয়েমেন
প্রকৃতি ও বিজ্ঞান
মোস্তফা হোসেইন
Exclusive
একরামুল হক
আশীষ-উর-রহমান
একরামুল হক শামীম
ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ
তুহিন ওয়াদুদ
অপরাজিতা
ইন্দোনেশিয়া
উত্তর কোরিয়া
কালি ও কলম
জলবায়ু ও পরিবেশ
জাগোনিউজ২৪.কম
মইনুল ইসলাম
মানিকগঞ্জ
মুহম্মদ জাফর ইকবাল
মোশতাক আহমেদ
আশরাফুল হক রাজীব
ফরহাদ মাহমুদ
প্রণব বল
শংকর কুমার দে
সেলিম জাহিদ
আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ
কামরুল হাসান
পার্থ প্রতীম ভট্টাচার্য্য
রাজীব আহমেদ
শিল্পী
সাময়িকী ফ্যাশন
দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু
বিদ্যুৎ
মোরসালিন মিজান
রবার্ট ফিস্ক
অভিজিৎ ভট্টাচার্য্য
ঈদ
কাজী সুমন
ঝিলিমিলি
মুস্তাফা জামান আব্বাসী
কুষ্টিয়া
জাতীয় নাগরিক পার্টি
মনজুরুল হক
মহসীন হাবিব
মাহবুব মোর্শেদ
রফিকুল ইসলাম
শিলালিপি
শুভ রহমান
চৌধুরী মুমতাজ আহমদ
ছিটমহল
নিবন্ধ
jugantor
নোবেল পুরস্কার
পাঠকের মতামত
পাবনা
মোশাররফ বাবলু
তানভীর সোহেল
মামুন রশীদ
আনন্দ প্রতিদিন
উৎপল রায়
এনামুল হক
কাজল ঘোষ
নদী দূষণ
নাটোর
নিত্যপণ্য
ফাহিমা আক্তার সুমি
বাংলা নববর্ষ
উচ্চশিক্ষা
চারু শিল্প
ভেনেজুয়েলা
শওকত হোসেন
নজরুল ইসলাম
নিউজিল্যান্ড
বিজ্ঞান
পার্থ সারথি দাস
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান
গোলাম মর্তুজা
ফরহাদ মজহার
শারমিন নাহার
principalsanaullah
আদিবাসী
কালের খেয়া
দিল্লি
ফখরুল ইসলাম
বাংলাদেশ প্রতিদিন
মুখোমুখি প্রতিদিন
মোহীত উল আলম
রাহাত খান
অমিতোষ পাল
গল্পালোচনা
পানি আগ্রাসন
প্রযুক্তি
বিশ্বজিৎ পাল বাবু
মাহবুব তালুকদার
আব্দুল কুদ্দুস
কানাডা
বিদেশ
WikiOpinion
জনস্বাস্থ্য
তোফায়েল আহমেদ
তৌহিদা শিরোপা
কাতার
আলোকিত বাংলাদেশ
কাদের সিদ্দিকী
ড. আবু এন এম ওয়াহিদ
ফারুক মঈনউদ্দীন
মোছাব্বের হোসেন
উৎপল শুভ্র
দিনাজপুর
নোমান মোহাম্মদ
সুদীপ অধিকারী
অরূপ দত্ত
পাভেল পার্থ
ফরিদপুর
ফিরোজ মান্না
মাসুদ পারভেজ
রোজিনা ইসলাম
শরিফুজ্জামান
হামিদ-উজ-জামান মামুন
আকমল হোসেন
আজিজুর রহমান
আলম শাইন
ঝড় ও দুর্যোগ
তারেক মাহমুদ
দীপংকর চন্দ
পাভেল হায়দার চৌধুরী
ফখরে আলম
মাসুদ রানা
শহিদুল ইসলাম
আবুল হাসনাত
আসিফ আহমেদ
ইশতিয়াক পারভেজ
জিয়া চৌধুরী
শিশির মোড়ল
হারুন হাবীব
হুমায়ূন আহমেদ
অমিত বসু
আল আমিন
ওমর ফারুক
ফজলুল বারী
ফারুক চৌধুরী
মাসুদ মিলাদ
শর্মিলা সিনড্রেলা
শাহাদুজ্জামান
হায়দার আকবর খান রনো
জাবেদ রহিম বিজন
জাহাঙ্গীর আলম
ট্রানজিট
নন্দন
যতীন সরকার
যুবলীগ
আরিফুজ্জামান তুহিন
কাজী আনিছ
খাবার
গাজীউল হাসান খান
তারেক রহমান
বাংলার দিগন্ত
মোহাম্মদ কায়কোবাদ
লাতিন আমেরিকা
শেখ হাফিজুর রহমান
শৈলী
সাতকানিয়া
সুদান
কাজী হাফিজ
জার্মানি
জোবাইদা নাসরীন
নিয়ামত হোসেন
মাহফুজুর রহমান মানিক
লুৎফর রহমান রনো
ইমরান আলী
এস এম আজাদ
জাহাঙ্গীর শাহ
মাহমুদুর রহমান মান্না
মুশফিকুর রহমান
সাতক্ষীরা
ইকতেদার আহমেদ
উৎসব
ঝিনাইদহ
মাসুদা ভাট্টি
মোকারম হোসেন
শেখ সাবিহা আলম
সিরাজগঞ্জ
সৈয়দ মাহবুবুর রশিদ
হারুন আল রশীদ
WikiEducation
উজ্জ্বল মেহেদী
কনকচাঁপা
ড. মাহফুজ পারভেজ
পরিতোষ পাল
মিঠুন চৌধুরী
শাহদীন মালিক
হায়দার আলী
আহমেদ জামাল
ইমদাদুল হক মিলন
নওগাঁ
পোশাকশিল্প
বাতায়ন
ব্যবসা
আবু সালেহ আকন
এমাজউদ্দীন আহমদ
টিপু সুলতান
ড. মাহবুব উল্লাহ্
ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী
শোকাবহ ১৫ ও ২১ আগস্ট
WikiInternational
এবনে গোলাম সামাদ
পারভেজ খান
ফজলুল আলম
ফরিদা আখতার
বিভাষ বাড়ৈ
মাহমুদুজ্জামান বাবু
মুনির হাসান
মোশতাক আহমদ
সুনামগঞ্জ
আপেল মাহমুদ
আরব আমিরাত বা দুবাই
জহির উদ্দিন বাবর
নোয়াখালী
রিপন আনসারী
শরীফুল ইসলাম
সুব্রত আচার্য্য
উপন্যাস
কাল স্রোত
ক্রীড়া দিগন্ত
খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ
গাজীউল হক
জাহীদ রেজা নূর
শাহনেওয়াজ বিপ্লব
সাইদুজ্জামান
সাময়িকী
অধ্যাপক শুভাগত চৌধুরী
অনন্যা আশরাফ
অনিকা ফারজানা
আদিত্য আরাফাত
ইফতেখার আহমেদ টিপু
কামাল লোহানী
ড. সা'দত হুসাইন
তামান্না ইসলাম অলি
দক্ষিণ কোরিয়া
ফারজানা লাবনী
ফারুক যোশী
মনজুর আহমেদ
রিয়েল-টাইম নিউজ
লিবিয়া
আসজাদুল কিবরিয়া
জলবায়ু
বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য বাপন
মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী
রশিদ মামুন
লক্ষ্মীপুর
সম্পাদকীয়
সাইফুদ্দীন চৌধুরী
সুমন বর্মণ
BBC
ইমরান রহমান
ইলিরা দেওয়ান
এম শাহজাহান
কাক ছোট গল্প
ছিনতাই
নওশাদ জামিল
নুরুন্নবী চৌধুরী
প্রতীক ওমর
বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম
বিকাশ দত্ত
মনিরুজ্জামান
মহিউদ্দিন আহমেদ
উইঘুর মুসলিম
দৈনিক ইত্তেফাক
পিটার কাস্টার্স
পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রিয় চট্রগ্রাম
বাজেট
বাণিজ্য
মোবাশ্বির আলম মজুমদার
সঞ্জয় সাহা পিয়াল
হবিগঞ্জ
খুন
টাকা আনা পাই
মাহবুবুর রহমান
শুভজ্যোতি ঘোষ
হাছান কুতুবী
Hot Topic
অমর একুশে বিশেষ সংখ্যা ২০১২
অমর একুশে বিশেষ সংখ্যা ২০১২
আবিষ্কার
ড. কামাল
দৈনিক ইনকিলাব
ফিলিপাইন
ভুটান
সাভার
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ
নিয়ন আলোয়
শফিক রহমান
শামীমুল হক
শেয়ারবাজার
আইন আদালত
ইতালি
গ্রিনল্যান্ড
নারী নির্যাতন
পটুয়াখালী
ফরিদ উদ্দিন আহমেদ
মণিপুর
মাগুরা
মেক্সিকো
অনিম আরাফাত
ইসলাম
কিরণ শেখ
জাভেদ ইকবাল
দুদক
মহাকাশচারী
রাঙ্গামাটি
Art Mag
আরিফুল ইসলাম
প্রতিবাদ
প্রবাসী বাঙালি
বান্দরবান
মালদ্বীপ
শফিকুল ইসলাম
শিক্ষানীতি
সংবিধান
ডিডাব্লিউ
শরিফ রুবেল
কূটনীতি
গাইবান্ধা
ঝালকাঠি
নরসিংদী
নাইজেরিয়া
বায়ুদূষণ
শাহনাজ পারভীন
স্বাধীনতা
WikiCity
WikiPolitics
জোহরান মামদানি
বৌদ্ধ
মতিউর রহমান চৌধুরী
যৌন অপরাধ
WikiInterview
আকবর হোসেন
কিশোর আলো
জলবায়ু পরিবর্তন
দৈনিক সংগ্রাম
Exclusive Articles
WikiEconomy
WikiLaw
ইসলামী ছাত্রশিবির
ঘূর্ণিঝড়-হারিকেন
বাগেরহাট
ভূমিকম্প
রাজনৈতিক
সমিতির খবর
সানজানা চৌধুরী
সায়েদুল ইসলাম
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল
আমাদের সময় ডট কম
কুতুবদিয়া স্পেশাল
খাগড়াছড়ি
চুয়াডাঙ্গা
ধর্মঘট
আইন ও আদালত
ইহুদি
কাদির কল্লোল
তাইওয়ান
দুর্গোৎসব ও পূজা
দৈনিক আমার সংবাদ
নববর্ষ বিশেষ সংখ্যা 2013.
নূরে আলম সিদ্দিকী
প্রতিক্রিয়া
বিডিআর বিদ্রোহ
ব্যাংক
মুন্সীগঞ্জ
শিশুসাহিত্য
খ্রিষ্টধর্ম
গদ্যকার্টুন
প্রতিদিনের সংবাদ
ভোরের কাগজ
রুমিন ফারহানা
Hit
আর্জেন্টিনা
পিরোজপুর
বন্যা
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
সরল গরল
স্পেন
Asia
গণমাধ্যম
ডেনমার্ক
পরামর্শ
প্রকৃত্
ভাষা
ভোলা
MERIT
Soikot
WikiWoman
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ
উন্নয়ন
জর্ডান
জ্বালানি
পিলখানা হত্যাকাণ্ড
ফ্যাশন
রঞ্জন বসু
সাংসদ
হরতাল
WikiCrime
উইকিলিকস
ক্রিকেট ও রাজনীতি
গণতন্ত্র
গোপালগঞ্জ
চাঁদপুর
চিত্রকর্ম
ছাত্ররাজনীতি
জঙ্গিবাদ
জন্মদিন
তেল-গ্যাস
দক্ষিণ ধুরুং
দূর পরবাস
নাকিবুল আহসান নিশাদ
নারী অধিকার
নোবেল শান্তি পুরস্কার
পঞ্চগড়
পরীক্ষা
বিজয় দিবস
মেঘালয়
রাঙামাটি
সুশাসনের জন্য নাগরিক
হামলা
আন্দালিব রাশদী
ঈদুল আজহা
এনটিভি
কক্সবাজার নিউজ ডটকম
কুতুবদিয়া নিউজ
চট্টগ্রাম বন্দর
ছাত্র রাজনীতি
ঠাকুরগাঁও
ডিজিটাল বাংলাদেশ
তথ্য অধিকার
দ্বিজেন শর্মা
নির্যাতন
নড়াইল
প্রবাসী শ্রমিক
ভারতের প্রধানমন্ত্রী
মৃত্যু
শারদীয় দুর্গোত্সব
শিশুমৃত্যু
শিশুহত্যা
সালমান রাফি শেখ
সুবীর ভৌমিক
সুশাসন
স্মৃতি
Africa
My Art
অধিকার
আন্তর্জাতিক নারী দিবস
একুশে টেলিভিশন
কলম্বিয়া
কুয়েত
চিঠিপত্র
চুক্তি
তিউনিসিয়া
দুর্যোগ
নির্বাচন ও রাজনীতি
নেত্রকোণা
পরিবহন
পর্যটন কেন্দ্র
প্রশাসন
ফ্রান্সিস বুলাতসিঙ্ঘালা
বিশ্বকাপ ফুটবল
বেলজিয়াম
বড়ঘোপ
ভি এস নাইপল
ভৈরব
মরক্কো
মাওবাদী
মামলা
যানজট
লেমশীখালী
সংসদ
সন্ত্রাসী
সমাজ
সামাজ
সুন্দরবন
সৈয়দ দিদার বখত
সোমালিয়া
হংকং
Middle East
Principal Sanaullah
Special Day
অগ্নিসংযোগ
অমৃতবাজার পত্রিকা
অরবিন্দ কেজরিওয়াল
আইন ও অধিকার
আগুন ও মৃত্যু
আজকের কাগজ
আল মাহমুদ
আহসান কবির
এম.এ মান্নান
এল সালভাদোর
কমল জোহা খান
কিউবা
খাদ্যসমস্যা
চাঁপাইনবাবগঞ্জ
জঙ্গি
তথ্য অধিকার আইন
দ্য ডেইলি স্টার বাংলা
পানামা
পূর্বপশ্চিম
প্রাণি ও উদ্ভিদ
বঙ্গবন্ধু হত্যা বিচার
বন্য প্রাণী
বেলুচিস্তান
ভিয়েতনাম
ভোরের ঈদ ১৯
ভয়েস অফ আমেরিকা
যায়যায়দিন
লালমনিরহাট
শিক্ষা অধিকার
শিক্ষা ও সমাজব্যবস্থা
শিশুশিক্ষা
শ্রমিক
সন্ত্রাসবাদ
সুইডেন
সুজন সুপান্থ
NEWS
Palestine
fd
অরণ্যে রোদন
অরুণাচল
অর্থনৈতিক
অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক
ইকরাম সেহগাল
উত্তর ধুরুং
উমর মনজুর শাহ
একুশে ফেব্রুয়ারি
ঐতিহাসিক
কিশোরকণ্ঠ
কুড়িগ্রাম
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
কোরবান
ঘূর্ণিঝড়
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন
জর্দান
জাইমা রহমান
জাদুঘর
জামালপুর
জীবন
জেসমিন আখতার
জ্বালানি তেল
টেলিভিশন
তথ্যপ্র্রযুক্তি
তুষার আবদুল্লাহ
দেশপ্রেম
দৈনিক কক্সবাজার
নাগরিক সংবাদ
নারীঅধিকার
নিরাপত্তা
নির্বাচিত
নেদারল্যান্ডস
পাহাড়
পয়লা বৈশাখ
বঙ্গবন্ধু
বন্দর
বিশ্ব অর্থনীতি
ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা
মহান বিজয় দিবস
মা
মাদারীপুর
মানবতা
মানববন্ধন
মিজোরাম
মিডিয়া ভাবনা
মে দিবস
শরীয়তপুর
শিক্ষা দিবস
শিক্ষা-প্রশাসন
শুভ বড়দিন
শেরপুর
সজীব ওয়াজেদ জয়
সময়চিত্র
সরেজমিন প্রতিবেদন
সাতকানিয়া পৌরসভা
সিঙ্গাপুর
সুইজ়ারল্যান্ড
সুশান্ত মজুমদার
স্মরণ সভা
স্মর্রণ
হাসান আজিজুল হক
America
Burma
Child
China
Hot Video
Huw Cordey
Latin America
Marwan Barghouti
Tom Geoghegan
Tom Heap
Washington
kolkata24x7
অ্যান্টার্কটিকা
আহমদ ছফা
আহমেদ মুনির
উখিয়া
উত্সব
উদ্যোগ
এসিড-সন্ত্রাস
ওমান
ওয়াসি আহমেদ
কর্মসূচি
কেনিয়া
ঘড়ি
চট্টগ্রাম বন্দর
চাকরি
চারদিক
চীন ও জাপান
জনসংখ্যা
জাকির তালুকদার
জাহাজ
জাহিদ হোসাইন খান
জায়গা
জায়মা জারনাজ রহমান
জীবনী
জেলহত্যা দিবস
জ্বালানী সম্পদ
ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন
ড. সাজিদ হক
ডিজিটাল
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন
তিব্বত
ত্রিপুরা
নগরজীবন
নরওয়ে
নিবন্ধন
নীলফামারী
পবিত্র আশুরা
পবিত্র ঈদুল ফিতর
পরিকল্পনা
পানিসম্পদ
পুলিশ
পেরু
প্যারিস
প্রান্তকথা
প্রিয়.কম
প্রেক্ষিত
বর্নাঢ্য র্যালী
বলিভিয়া
বাংলাভিশন
বাজারসুবিধা
বাস্তবসম্মত
বিচার
বিশ্ব খাদ্য দিবস
বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস
বিশ্ব নদী দিবস
বিশ্ব প্রতিবন্ধী দিবস
বিশ্ব শিক্ষক দিবস
বিশ্ববিদ্যালয়
ব্যবস্থাপনা
ব্যাংক ব্যবস্থা
ব্রিটিশ
ভাষাসৈনিক
মাহমুদ আহমাদ
মুস্তাফিজ মামুন
মোস্তফা সরয়ার ফারুকী
যুদ্ধ ও শান্তি
যুদ্ধাপরাধ
যুদ্ধাপরাধের বিচার
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রাজবাড়ী
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
লবন চাষ
লামিনে ইয়ামাল
শহীদের স্মৃতি
শান্তি
শিল্প ও পরিবেশ
শিশুশ্রম
সন্ত্রাস ও রাজনীতি
সহজিয়া কড়চা
সিগন্যাল
সেলিনা হোসেন
স্বাধীন
স্বাস্থ্যনীতি
স্মরণ মুক্তিযুদ্ধ
স্মৃতিঘর
হাসপাতাল
Afghanistan
Bangladesh
Brazil
CNN
California
Comments
Croatia
Delhi
Denise Winterman
Dome of the Rock
God Mag
Google
Hugh Schofield
India
Indonesia
Jane O'Brien
Japan
Jeremy Bowen
Jerusalem
Jon Kelly
Kareem Khadder
Kate Dailey
Kim Ghattas
Lead News
Libya
Mahfuz Anam
Michal Zippori
New York
Nigeria
Pakistan
Paris
Paul Colsey
Qamrul Islam
Rosie Goldsmith
Rupert Wingfield-Hayes
Sanjoy Majumder
Source
South Sudan
The Daily Star
The Telegraph
Thomas Fessy
Tours
Vietventures
Wall Street
World's Last Chance
Young
a excellent photo in Kutubdia Island
bdnews24
google search
image
অদিতি ফাল্গুনী
অমানবিকতা
অযোগ্যদে
অসারপনা
আইনকানুন
আজারবাইজান
আদিবাসী দিবস
আনোয়ারা সৈয়দ হক
আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস
আফসার আমেদ
আবদুল লতিফ মাসুম
আবু আজাদ
আশান উজ জামান
আহমদ ফাহমি
ইথিওপিয়া
ইভ টিজিং
ইমরান খান
ইমাম খাইর
ইসলাম ও জীবন
ঈদের খুশি ও আনন্দ
ঈদের বেতন
উজবেকিস্তান
উপনির্বাচ
উপনির্বাচন
উর্দুভাষী
এ পি জে আবদুল কালাম
একুশে ফেব্রুয়ারি:
ঐতিহাস
ওবামা
কক্সবাজার নিউজ
কমিল্লা
কম্বোডিয়া
কলকাতার চিঠি
কাকন রেজা
কাজাখস্তান
কাটরা
কানাই কুণ্ডূ
কালের পুরাণ
কুতুবদিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়
কৈয়ারবিল
ক্রসফায়ার
ক্ষত
ক্ষমাপ্রার্থনা
ক্ষুদ্রঋণ
কয়লানীতি
খায়ের মাহমুদ
খোন্দকার শওকত হোসেন
গাম্বিয়া
গোধূলি
গোড়ার
গৌড়
গ্রামীণ অর্থনীতি
গ্রেপ্তার
ঘূর্ণিঝড় সম্পাদকীয়
ঘোড়া
চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচন
চরমোনাই পীর
চলতি পথে
চাঁদ
চাদ
চিনি
চিরকুট
চিলি
চেয়ারম্যান
ছাত্র-রাজনীতি
ছাড়পত্র
ছুটিদন
জজ হত্যা দিবস
জনদুর্ভোগ
জনস্বাস্থ্যের
জবাবদিহি
জম্মদিন
জলদস্যু
জাতিগত সহিংসতা
জারদারি
জি. মুনীর
জীবনযুদ্ধ
জীবিকা
জুমকন্যার
জ্বালানি রাজনীতি
জ্বালানি সম্পদ
জ্বালানিসম্পদ
জয়পুরহাট
ঝুঁকি
ঝুঁকি হ্রাস দিবস
টিপাইমুখ
টিপাইমুখ বাঁধ
টিপাইমুখে বাঁধ
টিভি চ্যানেল
টোঙ্গা
ঢাকা টাইমস
তানজির আহমেদ রাসেল
তুর্কমেনিস্তান
তেঁতুল
তেলকূপ দুর্ঘটনা
তেলিরকাটা
দক্ষিণ মগডেইল
দারিদ্র্য বিমোচন
দায়গুলো
দায়িত্ব
দুই দু’গুণে পাঁচ
দুর্গ
দূর পরবাসে
দেবনারায়ণ চক্রবর্তী
দৈনিক আজাদী
নগরদর্পণ
নদীকৃত্য দিবস
নববধূ
নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচন
নারীর ক্ষমতায়ন
নাসরীন জাহান
নাসিমা আনিস
নাসির উদ্দিনের স্বাভাবিক মৃত্যু
নিকারাগুয়া
নিজাম কুতুবী
নিপীড়ন
নিরাপতা
নির্বাসনে
নিষেধাজ্ঞা’
নূরে আলম জিকু
নেতা ইমরান খান
নেতৃত্বে
নোযাখালী
পণ্যবাজার
পদক
পবিত্র হজ
পররাষ্ট্রনীতি
পরিস্থিতি
পর্তুগাল
পাঠকের মন্তব্
পাপুয়া নিউগিনি
পাপড়ি রহমান
পাসপোর্ট
পাহাড়ধস
পিলখানা হত্যা
পোল্যান্ড
পোশাক
প্রশ্নবিদ্ধ
প্রস্তাবিত
প্রাণীজী
প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ
প্রয়াণ
ফাঁসি
ফিনল্যান্ড
ফেরি ও পন্টুন
বঙ্গবন্ধু হত্যা
বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তন
বঞ্চনা
বনসম্পদ
বরিশাল ছাত্রলীগ
বর্ণবৈষম্যবিলোপ দিবস
বাঁকখালী
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি
বাংলাদেশের পতাকা
বার্লিন দেয়াল
বাল্যবিয়ে
বাস্তবা
বাস্তবায়
বিচার বিভাগ
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড
বিজ্ঞানচিন্তা
বিজ্ঞাপন
বিজয়
বিদ্যুত
বিদ্যুৎ-সংকট
বিদ্যুৎকেন্দ্রে
বিপ্রদাশ বড়ুয়া
বিলবোর্ড দুর্ঘটনা
বিলেতের স্ন্যাপশট
বিশ্ব কুষ্ঠ দিবস
বিশ্ব পরিবেশ দিবস
বিসিবি
বুলবন ওসমান
বুড়িগঙ্গা
বৃক্ষরোপণ
বৈশ্বিক উষ্ণায়ন
বৈষম্য
বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর
ব্যারিস্টার নাজির আহমদ
ব্রুনাই
বড়পুকুরিয়া
ভাজিরালংকর্ন
ভালোবাসা
ভাষণ
ভেজাল
ভোজ্যতেল
মংলা থেকে
মঈনুল হাসান
মঙ্গোলিয়া
মঞ্জু সরকার
মনযূরুল হক
মনি হায়দার
মন্ত্রিসভা
মাওবাদী সহিংসতা
মাতৃভাষা ও পরভাষা
মানচিত্র নিউজ
মানব
মানসিক স্বাস্থ্য দিব্স
মানসিকতা
মালি
মাল্টা
মাহবুব রেজা
মাহামুদা খাতুন
মিথিলেশ ভট্টাচার্য
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম
মুরগি জমা
মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন
মূল্যস্ফীতি
মৃত্যু ও কিছু ভাবনা
মোহাম্মদ কামরুজ্জামান
মোহাম্মদ মোশাররফ হুসাইন
ম্যাডোনা
ম্যান্ডেলা দিবস
যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল
যুদ্ধাপরাধ-বিচার
রক্ত
রদ্ধাঞ্জলি
রবাণিজ্যে
রাগবি
রাজনৈতিক সংস্কৃতি
রাজপথ
রাষ্ট্রীয়
রাস্তার
রিয়াল মাদ্রিদ
রুবেল হোসেনের
রেলওয়ের
রোমাঞ্চিত
রোমানিয়া
র্বিজ্ঞান
শক্তিশালী
শঙ্কা
শরীরের
শশী থারুর
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস
শাকিরা
শাহ্নাজ মুন্নী
শায়খ আহমাদুল্লাহ
শিক্ষক খুন
শিক্ষক-রাজনীতি
শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস
শিক্ষাচিত্রে
শিক্ষাবিদের
শিবের গীত
শুঁটকি উৎপাদন
শেরাটনীয়
শোনা
শ্রদ্ধাঞ্জল
শ্রমবাজার
শ্রমশক্তি
ষড়যন্ত্র
সংকট
সংঘাত
সংশোধন
সঙ্গী
সততা
সন্দেশ
সমন্বয়সাধন
সমাজ ও নারী
সমুদ্রস্নান
সময়
সময় নিউজ টিভি
সময়ের প্রতিবিম্ব
সরকার
সাংবাদ
সাইক্লোন শেল্টার
সাইপ্রাস
সাজিদ গ্রেফতার
সাদাসিধে কথা
সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম
সামন্ততন্ত্র
সামরিক শাসন
সামাজি
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম
সাহসী
সিডনি
সিয়াম
সুপ্রভাত
সূর্যে
সেচসুবিধা
সোনার বাংলা
স্কাইপি
স্বকৃত নোমান
স্বচ্ছতা
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
স্বাধীনত
স্বাধীনতাযুদ্ধ
স্বামী
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
স্বীকৃতি
স্মৃত-নিদর্শন
স্মৃতিসৌধ
স্মৃতিসৌধে
স্লোভাকিয়া
হত্যা ও হরতাল
হাইতি
হামিদ মীর
হুগজিল্ট
No comments:
Post a Comment