সম্পাদকের কলাম-বাঘের লেজ দিয়ে কান চুলকানো by ইমদাদুল হক মিলন

দেশের অবস্থা কী? কোন দিকে যাচ্ছে পরিস্থিতি? ইলেকশন হবে? যেখানে যাই সেখানেই এ তিনটি প্রশ্নের মুখোমুখি হই। তত্ত্বাবধায়ক প্রথা বাতিল হওয়ার পর মানুষ আরো অস্থিরতার মধ্যে পড়েছে। বিএনপি কিছুতেই মেনে নিচ্ছে না এ পদ্ধতি।


খালেদা জিয়া পরিষ্কার বলে দিয়েছেন, তত্ত্বাবধায়ক বাতিল পদ্ধতির নির্বাচনে তাঁর দল যাবে না।
তাহলে কী হবে? ইলেকশন করবে কারা?
আওয়ামী লীগ আর জাতীয় পার্টি?
বিএনপি ইলেকশনে না গেলে জামায়াতও যাবে না বলে মনে হয়। বিএনপির অন্য শরিকরাও বয়কট করবে।
তাহলে?
আমেরিকান অ্যাম্বাসাডর ড্যান মজিনা মাঝেমধ্যেই বেশ জোর দিয়ে বলছেন, বড় দুই দলের মধ্যে সমঝোতা হতেই হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কূটনীতিকরাও আশাবাদী; কিন্তু দেশের মানুষ কোথাও কোনো আশার আলো দেখছে না। দিনকে দিন মানুষ পড়ে যাচ্ছে গভীর থেকে গভীরতর অন্ধকারে। টেলিভিশন টক শোগুলোতে তুখোড় আলোচনা-সমালোচনা চলছে সরকারি দলের নানাবিধ কর্মকাণ্ড নিয়ে। পত্রপত্রিকাগুলো মুখর হয়ে উঠছে। বিখ্যাত সব কলামিস্ট সাধারণ মানুষের হয়ে যাবতীয় ঝাল ঝেড়ে দিচ্ছেন কলমের ডগায়। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ সরকার এসব লেখালেখি, টক শোর তোয়াক্কাই করছে না। তারা আছে তাদের মতো। শেষ বেলায় এসে মন্ত্রিসভায় কিছু নতুন মুখ যুক্ত করল। তোফায়েল আহমেদ ও রাশেদ খান মেনন মন্ত্রিত্ব প্রত্যাখ্যান করলেন, এ নিয়ে চলল নানা ধরনের গুজব-গুঞ্জন। টেলিভিশন পর্দা গরম হয়ে গেল, পত্রপত্রিকা গরম হয়ে গেল। আর হাওয়ায় ভাসতে লাগল নানা গুজব। ইলেকশন হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই। বিএনপি না এলে ইলেকশন হয় কী করে! নাকি আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় আসছে! সেই মেকানিজম ইতিমধ্যে সেরে ফেলেছে তারা! গুজবগুলো এই রকম।
আবার শোনা যাচ্ছে, একটি নির্দলীয় সরকারের কথা। সৎ রাজনীতিবিদদের সঙ্গে সুশীল সমাজের কিছু খুবই গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্ব নিয়ে গঠন করা হবে সরকার। তাদের পেছনে কাজ করবে অন্য এক শক্তি। এ ক্ষেত্রে প্রথমে শোনা গেছে ড. ইউনূসের কথা। এখন শোনা যাচ্ছে স্যার ফজলে হাসান আবেদের কথা। তাঁদের কাউকে প্রধান করে পরিচালনা করা হবে রাষ্ট্র।
কেউ কেউ বলছেন, আবার এক/এগারো হতে যাচ্ছে। এবার ও ধরনের পরিস্থিতি হলে আগেরবারের মতো মাত্র দুই বছরে মিটে যাবে না সব কিছু। ব্যাপারটা দীর্ঘস্থায়ী হবে। গণতন্ত্র উধাও হয়ে যাবে দেশ থেকে। আওয়ামী লীগ চাচ্ছে, 'যা ইচ্ছে হোক গিয়ে, যেমন করে পারি আমরা আবার ক্ষমতায় আসব। যদি না আসতে পারি, তবু বিএনপিকে ক্ষমতায় আসতে দেব না, যা ঘটার ঘটুক গিয়ে।'
সাধারণ মানুষের মুখ বন্ধ করে রাখার ক্ষমতা কোনো নেতার নেই, কোনো দলের নেই। মানুষ তাদের মনের কথা, ক্ষোভ-বঞ্চনার কথা কোনো না কোনোভাবে প্রকাশ করবেই। আর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে যে দুর্নীতিগুলো হয়েছে, তাতে মানুষের নাভিশ্বাস তো অনেক আগেই উঠেছে, এখন পিঠ ঠেকে গেছে দেয়ালে। মানুষ এখন তাদের ক্ষোভের কথা বলবেই। নিজেকে বাঁচাবার জন্য মানুষ পথে নেমে আসবেই। তাদের ঠেকানো যাবে না। মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্রের ক্ষমতা থাকে সাধারণ মানুষের হাতে। গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে ব্যাপকভাবে ভোট দিয়েছিল দেশের মানুষ। তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল নতুন ভোটার, নতুন প্রজন্ম। সেই প্রজন্মের সঙ্গে কথা বললে, ব্লগ ইত্যাদিতে তাদের লেখালেখি, মন্তব্য, মতামত ইত্যাদি পড়লে আওয়ামী লীগ সরকারের ওপর যে তারা খুবই বিরক্ত, সেটা বুঝতে এক মিনিটও লাগার কথা নয়। কিন্তু 'কানে গুঁজেছি তুলো' যদি এই নীতিতে চলে কোনো সরকার তাহলে আর কী বলার থাকে! বললেই বা শুনবে কে? কানে তো তুলো গোঁজা!
শেয়ারবাজার বিপর্যয়ে ৩৫ লাখ লোক পথে বসে গেছে। আত্মহত্যা করেছে মানুষ, রাস্তায় বুক চাপড়ে কেঁদেছে। অনেক মধ্যবিত্ত পরিবার সর্বস্বান্ত হয়ে গেছে। কোনো কোনো পরিবারে চলছে নীরব দুর্ভিক্ষ। তিন বেলার জায়গায় দুই বেলাও খাওয়া হয় না কোনো কোনো পরিবারে। এই কষ্টের কথা তারা কাউকে বলতেও পারে না। বাজারে আগুন। দ্রব্যমূল্য লাগামছাড়া। অন্যদিকে খাদ্যে বিষ। ফরমালিন ধারণ করেছে ভয়াবহ রূপ। কোনো কোনো ভাতের হোটেলেও ব্যবহৃত হচ্ছে ফরমালিন। এক দিনের ভাত যাতে তিন দিন ধরে বিক্রি করা যায়। মানুষ ধীরে ধীরে যাচ্ছে মৃত্যুর দিকে।
এরপর বহু পর্বের ধারাবাহিক নাটক চলল পদ্মা সেতু নিয়ে। নানা প্রকার উত্থান-পতন, দুর্নীতির পর দুর্নীতির চিত্র বেরোতে লাগল। আবুল সাহেবের পদত্যাগ নিয়ে চলল অনেক পর্ব, অর্থমন্ত্রীর অসংলগ্ন কথাবার্তা, মসিউর রহমান স্ট্রোক কিংবা হার্টফেল করার কথা বলে ছুটিতে গেলেন কি গেলেন না, এ নিয়ে চলল টানাপড়েন। কোনো কোনো দুর্মুখ বলল, ড. ইউনূস পদ্মা সেতু আটকে দিয়েছেন। তাঁর কথা ছাড়া বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুর অর্থায়নে আসবে না। জাইকা, এডিবিও সরে যাবে। আর এ সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই তো ড. ইউনূস আর তাঁর গ্রামীণ ব্যাংক নিয়ে তোলপাড় চলছেই।
যা হোক, পদ্মা সেতুর ব্যাপারে শেষ পর্যন্ত বিশ্বব্যাংক বহু শর্ত দিয়ে ফিরেছে। এ ক্ষেত্রে আশার আলো দেখতে পাচ্ছে দেশের মানুষ। এর পরও কবে টেন্ডার হবে পদ্মা সেতুর, কবে শুরু হবে কাজ, কবে শেষ হবে- এসব নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা রয়েই গেছে।
আওয়ামী লীগ সরকার কী পদ্মা সেতুর কাজ শুরু করে যেতে পারবে?
সাগর-রুনী হত্যাকাণ্ডের কোনো কূলকিনারা হলো না। এখন চলছে চারজন চোর নিয়ে সন্দেহ। তাদের ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়েছে। কে জানে, এ ক্ষেত্রেও তৈরি হবে কি না আরেক জজ মিয়া নাটক?
বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী গুম হলেন তো হলেনই। তাঁর গুম রহস্য উন্মোচনই হলো না। প্রবীণ সাংবাদিক এবিএম মূসা বললেন, সরকারে যেসব দুর্নীতিবাজ আছে, রাস্তাঘাটে তাদের দেখলেই বলা হবে, 'তুই চোর'।
সর্বশেষ যে ভয়াবহ কাণ্ডটি হলো, সেই কাণ্ডের নাম 'হলমার্ক'। হলমার্ক কেলেঙ্কারি ব্যাংকিং সেক্টরের ওপর থেকেও আস্থা নষ্ট করে দিল মানুষের। দেশের একজন খুব বড় ব্যবসায়ী বললেন, 'আমরা সৎভাবে ব্যবসা করে সোনালী ব্যাংকে আবেদন করেও কোনো লোন পাইনি। আর কোথাকার কোন হলমার্ক এত টাকা লোন পেল একটা সরকারি ব্যাংক থেকে! এখন তো মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখতেও ভয় পাবে।' মানুষের সবচেয়ে আস্থার জায়গাগুলো যদি এভাবে নষ্ট হতে থাকে তাহলে তারা কাউকে ছেড়ে দেবে না। কোনো সরকারেরই ভুলে যাওয়া উচিত নয়, দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি সেই দেশের সাধারণ মানুষ, রাজনৈতিক নেতা বা সরকার নয়। সাধারণ মানুষ পথে নামলে খড়কুটোর মতো উড়ে যাবে সব কিছু।
একটা গল্প বলি।
এক কাঠুরে সকাল থেকে বনে কাঠ কাটে। দুপুরের খাবার বাড়ি থেকে নিয়ে যায়। সকাল থেকে একটানা কাঠ কেটে দুপুরের খাবার খেয়ে একটা গাছে চড়ে আরামে ঘুমায়। বিকেলের দিকে ঘুম থেকে উঠে কাটা কাঠ মাথায় নিয়ে বাড়ি ফেরে। একদিন ঘুমের ভেতর থেকে শোনে, কাছে কোথায় যেন ঘড়ঘড় ঘড়ঘড় শব্দ হচ্ছে। চোখ মেলে গাছতলায় তাকিয়ে দেখে, সে যে গাছে ঘুমাচ্ছে, ঠিক সেই গাছের তলায় নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে একটা বাঘ। তার লেজটা লম্বা হয়ে পড়ে আছে। কাঠুরের শখ হলো বাঘের লেজ দিয়ে যদি নিজের কানটা একটু চুলকে নেওয়া যেত তাহলে কানের আরাম তো হতোই, লোকের কাছে গল্প করা যেত, জানিস, আমি না বাঘের লেজ দিয়ে কান চুলকিয়েছি।
যেমন চিন্তা, তেমন কাজ।
বাঘ নাক ডেকে ঘুমাচ্ছিল। এই ফাঁকে মনের শখ পূরণ করার জন্য কাঠুরে নিঃশব্দে গাছ থেকে নামল। অতি সাবধানে বাঘের লেজ দিয়ে কানটা একটু চুলকাল। এরপর টুক করে আবার গাছে উঠে গেল। প্রথম দিন বাঘ কিছু টেরই পেল না।
দ্বিতীয় দিনও একই কাজ করল কাঠুরে। সাবধানে গাছ থেকে নেমে কানটা গতকালের তুলনায় আজ একটু বেশিক্ষণ চুলকাল। বাঘ আজও কিছু টের পেল না। ফলে কাঠুরের সাহস গেল বেড়ে। আরে, এ বাঘটা তো কিছু টেরই পায় না। ঘুম খুবই গভীর। অনেকক্ষণ ধরে কান চুলকালেও কিছু হবে না।
তৃতীয় দিন গাছ থেকে নেমে বাঘের লেজ দিয়ে প্রথমে বাম কান একটু চুলকাল সে। এরপর ডান কান চুলকাতে লাগল।
বাঘের ততক্ষণে ঘুম ভেঙে গেছে। প্রথমে সে ব্যাপারটা খেয়াল করল। তারপর হুংকার দিয়ে উঠে একটা থাবা মারল কাঠুরের মুখ-মাথা বরাবর। ওই এক থাবাতেই ভবলীলা সাঙ্গ হলো কাঠুরের।
গল্পের সারমর্ম পাঠক নিশ্চয় বুঝতে পেরেছেন। জনগণ হচ্ছে ঘুমন্ত বাঘ। তাদের নিয়ে খেলাধুলা করার পরিণতি কখনোই ভালো হয় না। তারা জেগে উঠলে কী হতে পারে, অতীতের দিকে তাকালেই তা বুঝতে পারার কথা। সুতরাং...