ইরান যুদ্ধে হতাশ, মানসিক অসুস্থতার ঝুঁকিতে থাকা ৫ হাজার সেনা নিয়ে ফিরে যাচ্ছে সেই মার্কিন রণতরি

গালফ নিউজঃ যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ২৬৬ দিন অভিযানে থাকার পর দেশে ফিরতে যাচ্ছে। এর মধ্যে অন্তত ২০০ দিন এটি সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি হাং কাও এ কথা জানিয়েছেন।

দীর্ঘ সময় ধরে রণতরিটির মোতায়েন থাকা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর নাবিকদের মধ্যে মনোবল কমে যাওয়া ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সমস্যার খবর প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মার্কিন কংগ্রেসের সদস্য ও জাহাজটিতে কর্মরত নাবিকদের পরিবারের সদস্যরা।

হাং কাও বলেন, পরিকল্পিত পালাবদলের অংশ হিসেবে রণতরিটি শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্রে ফিরবে। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, জাহাজের নাবিকদের কল্যাণ ও নিরাপত্তাই অগ্রাধিকার।

হাং কাও বলেন, মিশনের প্রয়োজনেই লিংকনের মোতায়েনের সময় বাড়ানো হয়েছিল। দীর্ঘ সময়ের মোতায়েন কঠিন। আর যুদ্ধ অভিযান সেটিকে আরও কঠিন করে তোলে।

দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েনে উদ্বেগ

সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের মধ্যে মার্কিন অভিযানকে সহায়তা করতে আব্রাহাম লিংকনকে পশ্চিম এশিয়ায় (মধ্যপ্রাচ্য) পাঠানো হয়। যুদ্ধটি এখন ষষ্ঠ মাসে পড়েছে। রণতরিটি ২৫০ দিনের বেশি সময় ধরে মোতায়েন রয়েছে।

গত ২০০ দিনের বেশি সময়ে রণতরিটি কোনো বন্দরে নোঙর করেনি।

হাং কাও বলেন, মোতায়েনের সময় জাহাজের নাবিকদের কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। তাজা খাবারের সরবরাহ না থাকায় খাবারের তালিকায় পরিবর্তন আনতে হয়েছে। আবার অভিযান নিয়ে হুমকি বেড়ে গেলে বাড়িতে ফোন করার ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

নৌ সেক্রেটারি বলেন, মোতায়েনের সময় অল্পসংখ্যক নাবিক মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যার জন্য চিকিৎসা নিয়েছেন। তবে কোনো প্রাণহানি ঘটেনি।

সিএনএন জানিয়েছে, গত মাসে রণতরিটি থেকে এক নাবিক পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। পরে দ্রুত তাঁকে উদ্ধার করা হয় এবং চিকিৎসকেরা তাঁর শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করেন। ওই নাবিক পরে দায়িত্বে ফিরেছেন, নাকি তাঁকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত জানা যায়নি।

হাজারো অভিযান পরিচালনা

আব্রাহাম লিংকন গত বছরের নভেম্বরে সান ডিয়েগোতে অবস্থিত নিজ ঘাঁটি থেকে যাত্রা শুরু করে। পরে এটিকে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধক্ষেত্রে মোতায়েন করা হয়।

হাং কাও বলেন, মোতায়েনের সময় রণতরিটি ১০ হাজারের বেশি উড্ডয়ন অভিযান পরিচালনা করেছে এবং ১৫ লাখ পাউন্ডের গোলাবারুদ নিক্ষেপ করেছে। তিনি আরও বলেন, মার্কিন বিমানবাহী রণতরিগুলোর মধ্যে এই জাহাজের নাবিকদের মোতায়েন রাখার হার অন্যতম সর্বোচ্চ।

হাং কাও বলেন, ‘এতে কোনো সন্দেহ নেই যে আমাদের তরুণ নারী–পুরুষদের সক্ষমতার শেষ সীমা পর্যন্ত ঠেলে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তাঁরা কখনো ভেঙে পড়েননি।’

তবে এই শীর্ষ কর্মকর্তা স্বীকার করেন, দীর্ঘ সময়ের যুদ্ধ অভিযান অনিশ্চয়তা ও নানা ধরনের বিঘ্ন তৈরি করে। সামরিক নেতৃত্বকে তাই অভিযানের প্রয়োজন ও সেনাসদস্যদের কল্যাণের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হয়।

তবে যুদ্ধজাহাজটির নাবিক ও মেরিন সেনাদের ‘ভুক্তভোগী’ হিসেবে বর্ণনা করতেও আপত্তি জানান হাং কাও। তিনি বলেন, অভিযানজুড়ে তাঁরা ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছেন।

হাং কাও বলেন, ‘তাঁদের (মার্কিন সামরিক বাহিনীর সদস্য) নিরাপত্তা ও সুরক্ষাই সব সময় প্রথম অগ্রাধিকার। রণতরিটি দেশে ফেরার পর এর নাবিকদের জন্য “বীরোচিত অভ্যর্থনা”র আয়োজন করা উচিত।’

প্রসঙ্গত, সম্প্রতি নিউইয়র্ক টাইমস, এনবিসি নিউজসহ বিভিন্ন মার্কিন গণমাধ্যমের খবরে জানা যায়, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর দায়িত্ব পালন শেষে কবে নাগাদ দেশে ফেরা যাবে, তা নিয়ে অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে থাকা যুদ্ধজাহাজটির নাবিক ও সেনাদের মানসিক স্বাস্থ্যের চরম অবনতি ঘটেছে। সেই সঙ্গে তাঁদের মধ্যে আত্মহত্যার ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নাবিকদের পরিবার ও সহকর্মীরা।

এই উদ্বেগের কথা সরাসরি মার্কিন নৌবাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে তুলে ধরেছে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। সান ডিয়েগোতে গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত এক উত্তপ্ত টাউন হল সভায় হাং কাও ও অন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সামনে পরিবারের সদস্যরা এ ক্ষোভ উগরে দেন। কর্মকর্তারা তাঁদের বক্তব্যের কোনো সরাসরি জবাব দেননি।

সভায় নাবিকদের মানসিক স্বাস্থ্য ও আত্মহত্যার ঝুঁকি নিয়ে পরিবারের সদস্যরা যে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, সে বিষয়ে নৌবাহিনী ঠিক কী ব্যবস্থা নিচ্ছে, তা–ও সুনির্দিষ্টভাবে জানানো হয়নি।

তবে নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়, রণতরিটিতে পরামর্শক, চ্যাপলিন (ধর্মীয় শিক্ষক), বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, অন্যান্য জরুরি সহায়তাসহ মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক বা ব্যবস্থা চালু রয়েছে।

পরিবারের সদস্য ও নাবিকদের অভিযোগ, ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনে থাকা প্রায় পাঁচ হাজার সেনাসদস্য চরম খাদ্য ও পানিসংকটের মুখোমুখি হয়েছেন। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চিঠি বা ডাক যোগাযোগে বিঘ্ন এবং একটানা দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, যেখানে বিশ্রামের সুযোগ মেলাই ভার।

বর্তমানে নাবিক ও ক্রুদের মনোবল এতটাই ভেঙে পড়েছে যে তাঁরা সামনে কোনো বন্দরে বিশ্রামের সুযোগও চান না; বরং যত দ্রুত সম্ভব দেশে ফিরতে চান। এক নাবিকের আকুতি, ‘এ মুহূর্তে আসলে আমাদের আর কোনো প্রত্যাশা নেই। আমরা শুধু বাড়ি ফেরার একটি সুনির্দিষ্ট তারিখ চাই।’

যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের ফ্লাইট ডেকে এফ/এ–১৮ই সুপার হর্নেট যুদ্ধবিমান পরিদর্শন করছেন এক মার্কিন নাবিক। ছবিটি ২৭ জুন ২০২৬–এ তোলা
যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের ফ্লাইট ডেকে এফ/এ–১৮ই সুপার হর্নেট যুদ্ধবিমান পরিদর্শন করছেন এক মার্কিন নাবিক। ছবিটি ২৭ জুন ২০২৬–এ তোলা। ছবি: মার্কিন নৌবাহিনী