খোলা হাওয়া- জাগাতে হবে তারুণ্যকে by সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

আজ ৪ নভেম্বর প্রথম আলোর ১৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। আমার বিবেচনায় এই ১৫ বছরের পথচলায় কাগজটা সবচেয়ে বেশি সমর্থন পেয়েছে দেশের তরুণ সমাজের।
তরুণেরা সব সময়ই পরিবর্তনের পক্ষে, অচলায়তন ভাঙার পক্ষে। তরুণেরা প্রতিবাদী—সমাজের সামনে যাওয়ার পথ যারা আগলে রাখে, তরুণেরা তাদের রুখে দিতে চায়। সব সময় যে তারা পারে, তা নয়। কারণ, রাষ্ট্র ও সরকার, রাজনীতি, নানা প্রতিষ্ঠান ও সমাজের অন্তর্গত রক্ষণশীলতা তাদের প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করে। তার পরও তরুণেরা দেশটাকে বদলে দিতে চায়; তারা এমন একটা ভবিষ্যৎ চায়, যার ভিত্তি হচ্ছে বদলে দেওয়ার ও বদলে যাওয়ার মানসিকতা।

প্রথম আলো বদলে দেওয়ার ও বদলে যাওয়ার যে স্লোগানটি জনপ্রিয় করেছে, তা আসলে তরুণদের থেকেই নেওয়া। একটি সংবাদপত্রের সেই শক্তি নেই, যা দিয়ে সমাজকে বদলে দেওয়া যায়। একটি সংবাদপত্রের প্রধান শক্তি তার পাঠক। যদি সেই পাঠকেরা সমাজবদলের পক্ষে নামে, নিজেরাও সেই প্রক্রিয়ায় বদলে যেতে থাকে, তাহলেই সংবাদপত্রটির উদ্দেশ্য সফল হয়। কিন্তু ব্যাপারটা যদি এ রকম হয় যে সমাজবদলের স্বপ্ন দেখা তরুণেরাই একটি পত্রিকাকে তাদের সমাজবদলের প্রচেষ্টার সঙ্গে যুক্ত করে ফেলে, তাহলে পত্রিকাটির কাজ হয়ে দাঁড়ায় অনুঘটকের। প্রথম আলো সেই অনুঘটকের কাজটাই করছে—আরও অনেক তারুণ্যনির্ভর এবং উন্নত ভবিষ্যৎপ্রত্যাশী ব্যক্তি, সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। তরুণেরা যদি পত্রিকাটিকে সমর্থনা না দিত, তাহলে দিনবদলের কথাগুলো শুধু কথার কথা হয়েই থাকত।
পত্রিকাটি তরুণদের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে শুধু তার পৃষ্ঠায় জায়গা দিয়েছে তা নয়, এমন অনেক কর্মসূচিও হাতে নিয়েছে এবং সারা বছর যেসব কর্মসূচি সচল রেখেছে, যেগুলোতে তরুণদের অংশগ্রহণ স্বতঃস্ফূর্ত এবং ব্যাপক। আমাদের দেশে তরুণদের সমাবেশ ঘটানোর অরাজনৈতিক নজির খুব বেশি নেই। মাধ্যমিক অথবা উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা শেষে পরীক্ষার্থীরা আনন্দ-সমাবেশ করার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকে, মাদকের স্পর্শে নিজেদের হারানো তরুণদের দেখে অন্যরা মাদকবিরোধী সমাবেশ করতে চায়, ভাষা, মুক্তিযুদ্ধ এবং সংস্কৃতির নানা বিষয়ে মতবিনিময়ের জন্য তারা একত্র হতে চায়, ঘূর্ণিঝড় অথবা বন্যার মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ঘটনায় অথবা রানা প্লাজা ধসে পড়ার পর যে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ঘটে গেল, সে রকম ঘটনায় নিজেদের সব শক্তি ও সামর্থ্য নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের পাশে দাঁড়াতে চায়। এ রকম সমাবেশ ও উদ্যোগ শুরু থেকেই প্রথম আলোর কর্মসূচির অংশ হয়ে আছে এবং যে বিষয়টি আশা জাগানিয়া তা হচ্ছে, অনেক সংবাদপত্র এখন এ রকম কর্মসূচি নিচ্ছে। তাদের পাঠক সংগঠনগুলো তরুণবান্ধব সমাবেশ করছে। তরুণেরা যখন একটা ভালো কাজে নামে, প্রবীণেরা তখন হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারেন না। রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি দেশের মানুষকে দিনের পর দিন উৎকণ্ঠায় রেখেছিল, মানুষ প্রার্থনা করেছে একেকটা সুসংবাদের জন্য। তখন আমাদের মনে হয়েছে, দেশটা ঘুমিয়ে পড়েনি। এর বিবেক স্বার্থের পাথরের নিচে চাপা পড়েনি। উদ্ধারকাজে প্রধান ভূমিকা ছিল তরুণদের, সেটিই স্বাভাবিক। কিন্তু তরুণেরা সারা দেশের বিবেকটাও জাগিয়ে ছিল ওই কটি বিষাদগ্রস্ত দিনে।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে শাহবাগে যখন তরুণেরা জমায়েত হতে শুরু করল, সারা দেশের মানুষ তাদের সমর্থন জানাল। কিন্তু সেই তরুণদের সঙ্গে যখন সরকারি দলের ছাত্রসংগঠনের কিছু নেতা একই মঞ্চে জায়গা নিয়ে নিল, মানুষ বিরক্ত হলো। আমাদের রাজনীতি তারুণ্যবিরোধী; এই রাজনীতি সবকিছুকেই লাভ-ক্ষতির অঙ্কে ফেলে বিচার করে। ফলে তরুণদের যেকোনো বড় সমাবেশ ও উদ্যোগকে নিজেদের অধিকারে নিয়ে নিতে চেষ্টা করে রাজনৈতিক দলগুলো। এ জন্য অরাজনৈতিক সমাবেশের অনুমতি পাওয়াটাও অনেক সময় কঠিন হয়ে দাঁড়ায়, দুস্থ মানুষের জন্য হাতে নেওয়া কাজ করাটাও অসম্ভব হয়ে পড়ে। ঢাকার কুড়িল বস্তিতে একটি স্কুল পরিচালনা করে আসছিল একটি সংগঠন। একদিন এক ম্যাজিস্ট্রেট কিছু পুলিশ নিয়ে উপস্থিত হয়ে স্কুলটি উচ্ছেদ করলেন। কেন? না, স্কুলটি অনুমতি ছাড়া চালানো হচ্ছিল। যেখানে স্কুলটির জন্য সরকারের অনুদান এবং সরকারের সাহায্য-সহায়তা দেওয়ার কথা, সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পাঠিয়ে সেটি উচ্ছেদ করা হলো। অথচ হাতিরঝিল প্রকল্পকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দাঁড়িয়ে আছে যে বিজিএমইএ ভবন, সেটি কিন্তু ঠিকই দাঁড়িয়ে থাকল।
তারুণ্যকে সমর্থন করতে হবে, তাদের সামনে যাতে ভালো উদাহরণ থাকে তা নিশ্চিত করতে হবে। তরুণেরা চায় রোল মডেল—অর্থাৎ সেসব সমাজনায়ক, যাঁদের দেখে তারা উৎসাহিত হবে। সমস্যা হচ্ছে, সেসব সমাজনায়ক ছড়িয়ে আছেন সারা দেশে, গ্রামে-গঞ্জে। তাঁদের খুঁজে বের করে তরুণদের সামনে নিয়ে আসতে হবে। প্রথম আলো ও অন্য কিছু সংবাদপত্র ও টিভি চ্যানেল সেই কাজটি করছে—কিন্তু ভবিষ্যতে তা আরও জোরদার করতে হবে। শুধু যে একজন বড় বিজ্ঞানী অথবা উদ্ভাবক অথবা পরিশ্রমী উদ্যোক্তাকেই পরিচিত করাতে হবে, তা নয়; একজন কৃষক অথবা একজন প্রবাসী অথবা তৈরি পোশাকশ্রমিক, যিনি হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রেখেছেন, একজন প্রাইমারি শিক্ষক, যিনি অনেক কষ্টে শিক্ষার আলো জ্বালিয়ে রেখেছেন, অথবা একজন ট্রেনচালক, যিনি হরতালের আগুনে পুড়তে থাকা ট্রেনটি নিজের জীবনের ঝুঁকি সত্ত্বেও ছেড়ে না গিয়ে একটা নিরাপদ গন্তব্যে নিয়ে গেছেন—সমাজনায়কের আসনে বসার অধিকারটি যাঁদের প্রকৃত—তাঁদের ওপর আলো ফেলতে হবে। তারুণ্যের স্বভাবধর্ম অস্থিরতা—সেটিকে গঠনশীল কাজে লাগাতে পারলে আমরা অসাধ্য সাধন করতে পারব।

২.
প্রতিদিন সংবাদপত্রের পাতা খুললেই বিরক্ত হতে হয়। প্রথম পৃষ্ঠাজুড়ে শুধুই রাজনীতি এবং রাজনীতিবিদদের খবর। এই রাজনীতিবিদদের অনেকেই দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত, দু-একজনের বিরুদ্ধে খুন-রাহাজানির মামলাও আছে। এই দল অথবা ওই দলের আদর্শ থাকে তাদের মুখে, জনসেবার নানা বাণী থাকে তাঁদের ঠোঁটে। অথচ সংবাদপত্রের সবচেয়ে অনুৎসুক পাঠকও জানেন তাঁদের নানা কীর্তির কথা। তাঁদের কেন প্রতিদিন প্রথম পৃষ্ঠায় দেখতে হবে? কেন তাঁদের হঠকারী কথাগুলো সংবাদ হবে? আমাদের সংবাদপত্রগুলো কি এ রকম কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারে না, যে দুর্নীতিবাজ ও সন্ত্রাসীদের প্রথম পাতায় জায়গা দেওয়া হবে না, যত বড় ‘সংবাদ’-এর জন্মই তাঁরা দেন না কেন?

৩.
আজ থেকে আবারও চলবে টানা ৬০ ঘণ্টা হরতালের কর্মসূচি। হরতাল সম্পর্কে একটি প্রচলিত প্রবাদ এ রকম—এটি একটি রাজনৈতিক অধিকার। কোথায় সেই অধিকারের কথা লেখা আছে, তা কিন্তু খুঁজে পাওয়া যায় না। সংবিধানে হরতাল শব্দটি নেই; তাহলে? হরতাল এখন একটি ভোঁতা অস্ত্র—এ দিয়ে সরকারকে নড়ানো যায় না। যা হয় তা হলো, মানুষের মাথা থেঁতলে দেওয়া। এতদিন হরতালের ‘আওতামুক্ত’ থাকত পরীক্ষাগুলো, যদিও বোমা-ককটেল-জ্বলন্ত বাস উপেক্ষা করে পরীক্ষা দিতে যাবে, সে রকম টারজান-প্রতিভা কজন শিক্ষার্থীর আছে? এবার অবশ্য ঘোষণা করা হলো, পরীক্ষা আর হরতালের আওতামুক্ত নয়। এই ঘোষণা দুটি বাণী পাঠাল তরুণদের কাছে—এক. পড়াশোনার চেয়ে, জাতির মেধা ও মনন লালন করার চেয়ে ক্ষমতার দ্বন্দ্বটি অনেক বেশি মূল্যবান। আর দুই. এবারের হরতালে বোমাবাজি বাড়বে, কাজেই শিক্ষার্থীদের ঘরে থাকাটাই মঙ্গল। হরতাল এখন দেশবিরোধী একটি কর্মসূচি—তারুণ্যবিরোধী তো বটেই। হরতালে যে তরুণদের সমাবেশ হয়, তারা রাজনীতির কাদা-পিচ্ছিল পথে পা রেখে দিগ্ভ্রান্ত। অসংখ্য তরুণ যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে রাস্তায় নেমে গাড়িতে আগুন দেয়, ট্রেন পোড়ায়, গাছ কেটে পথে ফেলে। এরাও বিভ্রান্ত। এবং বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে যে উৎস থেকে তা হচ্ছে আমাদের অপরাজনীতি।

৪.
২ নভেম্বর পাবনার সাঁথিয়ায় পুনরাবৃত্ত হলো রামুর ঘটনা। ফেসবুকে মহানবী (সা.) সম্পর্কে কটূক্তির গুজব ছড়িয়ে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা হলো। রামুতে যে রকম প্রমাণিত হয়েছিল, পুরো ব্যাপারটাই ছিল সাজানো, বৌদ্ধদের ওপর হামলা করাটা ছিল মূল উদ্দেশ্য, সাঁথিয়ার ব্যাপারটা যে ওই একই, তা লিখছে সংবাদপত্রগুলো। যারা এই হামলা ঘটিয়েছে তারাও তরুণদের ব্যবহার করছে, তবে একটি ঘৃণ্য চক্রান্তকে সফল করতে। তরুণদের ভালো ও মন্দ ভূমিকা দেখে পশ্চিমা জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে বলা রবীন্দ্রনাথের কথাটির প্রতিধ্বনি করে বলতে ইচ্ছে করে: তরুণেরা হচ্ছে মশালের মতো—তাদের আগুনে মানুষ পথ দেখতে পারে, আবার তাদের আগুন ঘরবাড়ি পোড়াতেও পারে।
তরুণদেরই সিদ্ধান্ত নিতে হবে কোন ধরনের মশাল তারা হতে চায়। আমার বিশ্বাস, তরুণেরা পথ দেখানোর মশালই হতে চাইবে। কিন্তু
তাদের আলো ছড়ানো জ্বলে ওঠা অনেক সহজ হবে যদি আমাদের সমাজ ও রাজনীতি সুস্থ হয়। দেশের ভবিষ্যতের জন্যই তাদের ভেতরের শক্তিকে জাগাতে হবে, যাতে তারা যখন সমাজ ও রাজনীতির দায়িত্ব নেবে, তারা দেশকে পথ দেখাবে।
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম: কথাসাহিত্যিক। অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

No comments

Powered by Blogger.