ট্রাম্প প্রশাসনে ফাটল?
তিনি বলেন, দুই পক্ষের মধ্যে আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে। সুইজারল্যান্ডে ইরানের সঙ্গে আলোচনায় নেতৃত্ব দেয়া ভ্যান্স ইসরাইলের প্রকাশ্য বিরোধিতার জবাবে কঠোর ভাষা ব্যবহার করেছেন।
তিনি বলেন, আপনারা ৯০ লাখ মানুষের একটি দেশ। জাতীয় নিরাপত্তার প্রতিটি সমস্যার সমাধান শুধু মানুষ হত্যা করে করা সম্ভব নয়। ইসরাইলের সামরিক কৌশলের সমালোচনা করে ভ্যান্সের এই মন্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে সম্ভাব্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রুবিওর ভিন্ন অবস্থান
অন্যদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও প্রকাশ্যে ইসরাইলের সমালোচনা না করে বরং ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছেন। গত সপ্তাহে তিনি মধ্যপ্রাচ্য সফর করে উপসাগরীয় মিত্রদের আশ্বস্ত করেন, যারা যুদ্ধ চলাকালে ইরানের হামলার শিকার হয়েছিল।
২৫ জুন বাহরাইনে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক নৌপথ (হরমুজ প্রণালি) কোনো একক রাষ্ট্রের সম্পত্তি নয়। এর কয়েক দিন পরই হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটে। ১৭ জুন এমওইউ স্বাক্ষরের পর এটিই ছিল প্রথম সামরিক উত্তেজনা।
বর্তমানে উভয় পক্ষ হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা কমাতে কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিশ্বে সরবরাহ হওয়া মোট জ্বালানির প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। গত সপ্তাহে ভ্যান্স ও রুবিওর দেয়া বিভিন্ন বক্তব্যে কিছু পার্থক্য লক্ষ্য করায় ট্রাম্প প্রশাসনের অভ্যন্তরে নীতিগত বিভক্তির জল্পনা শুরু হয়। তবে হোয়াইট হাউস জোরালোভাবে সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।
হোয়াইট হাউসে বক্তব্য দিতে গিয়ে ভ্যান্স বলেন, বৈরুতে ইসরাইলের বেসামরিক স্থাপনায় বোমা হামলা যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে চলমান শান্তি প্রচেষ্টাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও এর আগে ইসরাইলের সমালোচনা করে বলেছিলেন, কাউকে খুঁজছেন বলে প্রতিবার একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবন ধ্বংস করার প্রয়োজন নেই। কারণ ওই ভবনে অনেক মানুষ থাকে, তারা সবাই হিজবুল্লাহর সদস্য নয়।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ২ মার্চ থেকে দেশটিতে ইসরাইলি হামলায় চার হাজারের বেশি মানুষ নিহত এবং প্রায় ১২ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
ভ্যান্স আরও বলেন, ডনাল্ড ট্রাম্পই এই মুহূর্তে বিশ্বের একমাত্র রাষ্ট্রনেতা, যিনি ইসরাইলের প্রতি সহানুভূতিশীল। আমি যদি ইসরাইলি সরকারের সদস্য হতাম, তাহলে আমার সবচেয়ে শক্তিশালী মিত্রকে প্রকাশ্যে আক্রমণ করতাম না।
অন্যদিকে রুবিও লেবাননে ইসরাইলের সামরিক অভিযানকে হিজবুল্লাহর হামলার বৈধ জবাব হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ভ্যান্সের মন্তব্য সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি সরাসরি উত্তর এড়িয়ে যান।
উপসাগরীয় দেশগুলো নিয়ে ভিন্ন সুর
ইরানের সঙ্গে আলোচনার জন্য ভ্যান্স সুইজারল্যান্ড সফর করেন এবং আলোচনা নিয়ে আশাবাদ প্রকাশ করেন। তিনি এমনও ইঙ্গিত দেন যে ভবিষ্যতে আরব দেশগুলো ইরানের পুনর্গঠন তহবিলে অবদান রাখতে পারে।
অন্যদিকে রুবিও সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও বাহরাইন সফর করে মিত্র দেশগুলোকে আশ্বস্ত করেন যে যুক্তরাষ্ট্র তাদের স্বার্থ রক্ষা করবে।
২৩ জুন তিনি বলেন, ইরানের পুনর্গঠনে উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থায়নের প্রশ্ন এখনো অনেক দূরের বিষয়। তিনি বলেন, আমরা অবশ্যই একটি চুক্তি চাই। তবে যে কোনো মূল্যে চুক্তি করতে চাই না।
ইরানকে নিয়ে অবস্থানের পার্থক্য
ভ্যান্স ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আরও সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে ওঠার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেছেন। তার ভাষায়, দুই দেশ একসঙ্গে শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য কাজ করতে পারে।
তিনি অতীতের সেই মার্কিন অবস্থান থেকেও কিছুটা সরে আসেন, যেখানে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংসের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল।
ভ্যান্স বলেন, ইসরাইল হোক বা ইরান- কোনো দেশকেই আত্মরক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যায় না।
অন্যদিকে রুবিও স্পষ্টভাবে বলেন, ইরানকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের কাছ থেকে কোনো ধরনের টোল বা ফি আদায় করতে দেয়া হবে না।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি বলেন, এখানে একটিই শিবির রয়েছে- প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শিবির। পুরো প্রশাসনই প্রেসিডেন্টের সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে একমত যে ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হতে পারবে না।
পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র টমি পিগটও বলেন, রুবিও ও ভ্যান্সের মধ্যে পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে বিভক্তির দাবি ‘পুরোনো ও ভিত্তিহীন’। রুবিও নিজেও এ ধরনের জল্পনা প্রত্যাখ্যান করে বলেন, আমরা সবাই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নেতৃত্বেই কাজ করছি। পুরো প্রশাসন একই অবস্থানে রয়েছে।
ভ্যান্স ও রুবিও ট্রাম্প প্রশাসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুই কূটনৈতিক ব্যক্তিত্ব। দীর্ঘদিন ধরেই তাদের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে ভিন্নধর্মী অবস্থান রয়েছে।
ক্ষমতায় আসার আগে ভ্যান্স বিদেশে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধকে প্রাণহানি ও অর্থের অপচয় হিসেবে সমালোচনা করতেন। অন্যদিকে রুবিও সিনেটে থাকাকালে ইরান, রাশিয়া ও কিউবার বিরুদ্ধে কঠোর নীতির পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় “হক” বা কঠোরপন্থী রাজনীতিক হিসেবে পরিচিতি পান।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে ট্রাম্পের সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচিত এই দুই নেতা রিপাবলিকান পার্টির দুটি ভিন্ন ধারার প্রতিনিধিত্ব করেন। একদিকে রয়েছেন বিদেশে সামরিক হস্তক্ষেপ সমর্থনকারী নব্য রক্ষণশীলরা (নিওকনজারভেটিভ), অন্যদিকে রয়েছেন সেই রিপাবলিকানরা, যারা মনে করেন সাম্প্রতিক অনেক বিদেশি যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ব্যয়বহুল ও অপ্রয়োজনীয় ছিল।

No comments