যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিকে চিরতরে বদলে দিয়েছে ফিলিস্তিন -দ্য ন্যাশনের বিশ্লেষণ

যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস প্রায় কোনো বিরোধিতা ছাড়াই প্রতি বছর ইসরাইলি সামরিক বাহিনীকে শত শত কোটি ডলার অর্থায়ন করে আসছে। এই দেশে জাতীয় পদে আসীন হতে চাইলে, যেকোনো মূল্যে ইসরাইলকে সমর্থন করাটা প্রায় অপরিহার্য—দীর্ঘদিন ধরেই এটা প্রতিষ্ঠিত সত্য ছিল। অথচ সেই সমর্থনের কারণে যারা ফিলিস্তিনি ও লেবানিজ আমেরিকান, তাদের আত্মীয়স্বজনসহ লাখ লাখ মানুষ ক্রমাগত হত্যা, বাস্তুচ্যুতি ও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন।

কিন্তু ইসরাইলের জন্য অবাধ অর্থায়ন ও দায়মুক্তির দিন শেষ। তা আর কখনো ফিরে আসবে না। এই অকাট্য বাস্তবতা নিয়ে যার সন্দেহ আছে, তার নিউইয়র্ক সিটির নির্বাচনের দিকে তাকানো প্রয়োজন। নির্বাচনে ফিলিস্তিনপন্থি প্রার্থীরা পাঁচটি বরোতে বিপুল বিজয় লাভ করেছেন। এই ঐতিহাসিক ফলাফলের পেছনে অনেক কারণ ছিল। কিন্তু একটি বিষয় তারা নিঃসন্দেহে নিশ্চিত করেছেন যে, ফিলিস্তিনি অধিকারের প্রতি সমর্থন অভূতপূর্ব রাজনৈতিক পরিবর্তন আনছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে আর কিছুই আগের মতো থাকবে না।

স্থানীয় সময় মঙ্গলবার রাত ৯টায় ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার প্রায় সাথে সাথেই এটা স্পষ্ট হয়ে যায়, নিউইয়র্ক সিটির ওপর দিয়ে ফিলিস্তিনপন্থি একটি ঢেউ আছড়ে পড়ছে। এই অপ্রতিরোধ্য স্রোতের ব্যাপকতা প্রথম অনুভব করেন বিদায়ী প্রতিনিধি ড্যান গোল্ডম্যান, যিনি তার বামপন্থি প্রতিদ্বন্দ্বী নিউইয়র্ক সিটির সাবেক কম্পট্রোলার ব্র্যাড ল্যান্ডারের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার চেষ্টা করছিলেন। গোল্ডম্যান তার পুরো রাজনৈতিক জীবনে ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলের নিপীড়নের একজন সোচ্চার সমর্থক ছিলেন এবং এই প্রচারণার শেষ পর্যন্ত তিনি এই অবস্থান বজায় রেখেছিলেন। তিনি ইসরাইল যে ফিলিস্তিনি ভূমি দখল করেছে তা মেনে নিতে রাজি নন। তিনি গাজায় সংঘটিত গণহত্যাকে অস্বীকার করেন এবং এমনকি স্বীকার করেন যে গত বছরের সিটি নির্বাচনে তিনি নিউইয়র্ক সিটির মেয়র পদের ডেমোক্র্যাটিক মনোনীত প্রার্থী জোহরান মামদানিকে ভোট দেননি। আর ভোট না দেওয়ার কারণ ছিল, মামদানি ফিলিস্তিনি অধিকারের পক্ষে সোচ্চার।

যখন গোল্ডম্যানের ভোটাররা ক্রমবর্ধমান মূল্যবৃদ্ধি থেকে মুক্তির দাবি জানাচ্ছিলেন, তখন ওয়াশিংটনে তাদের প্রতিনিধি নির্লজ্জভাবে ইসরাইলের সামরিক বাহিনীকে অর্থায়নের জন্য শত শত কোটি ডলার পাঠাচ্ছিলেন। এমনকি ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তার থেকে রক্ষা করার জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপকারী রিপাবলিকান-নেতৃত্বাধীন আইনের পক্ষে ভোটও দিয়েছিলেন।

বিগত বছরগুলোতে, এই ভোটগুলো হয়তো তার পুনঃনির্বাচনকে সুনিশ্চিত করত। এ বছর সেগুলোই তার বিরুদ্ধে কাল হয়ে দাঁড়ায়-যা কোনো বড় অঙ্কের অনুদান দিয়েও মোকাবিলা করা সম্ভব ছিল না।

ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার মাত্র চার মিনিটের মধ্যেই ফলাফল ঘোষণা করা হয়। গোল্ডম্যান ল্যান্ডারের কাছে ৩০ পয়েন্টে হেরে যান। তিনি কংগ্রেসের ইতিহাসে প্রথম সদস্য হিসেবে ইসরাইলের প্রতি তার দৃঢ় সমর্থনের কারণে সুস্পষ্টভাবে পরাজিত হন।

এক ঘণ্টা পর, একই ঘটনা আবার ঘটল। কয়েক মাস আগে, খুব কম লোকই বিশ্বাস করত যে, ফিলিস্তিনি অধিকারের প্রতি সোচ্চার কণ্ঠ দারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়ার তার প্রতিদ্বন্দ্বী আদ্রিয়ানো এস্পাইলাটের মতো পাঁচবারের ক্ষমতাসীন একজনকে পরাজিত করতে পারবেন। আমেরিকান ইসরাইল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি ও তার মিত্ররা এই প্রতিযোগিতায় লাখ লাখ ডলার ঢেলেছিল, আভিলা শেভালিয়ারের ওপর অবিরাম আক্রমণ চালিয়েছিল এবং এস্পাইলাটকে জেতানোর চেষ্টা করেছিল। তবে তা কাজে আসেনি। সবচেয়ে বিস্ময়কর অঘটনে আভিলা শেভালিয়ার এস্পাইলাটকে পরাজিত করেন। তার বিজয় সমাবেশের জনতা ‘ফিলিস্তিনকে মুক্ত করো!’ ধ্বনিতে গগনভেদী স্লোগান দিয়ে উল্লাসে মেতে ওঠে।

এখন এটা স্পষ্ট যে, ইসরাইলের গণহত্যার বিরুদ্ধে আভিলা শেভালিয়ারের স্বচ্ছ নৈতিক অবস্থান তার প্রচারণার জন্য একটি হাতিয়ার ছিল—ঠিক যেমনটা ছিল ল্যান্ডার ও ক্লেয়ার ভালদেজের জন্য।

এক রাতের মধ্যেই কংগ্রেসের দুজন সদস্য হেরে গেলেন, যাদের দুজনেরই সবচেয়ে বড় দাতা হলো এআইপিএসি। এর একটি বড় কারণ হলো, তারা সেই সমর্থন পেয়েছিলেন শর্ত সাপেক্ষে: ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলের গণহত্যা অস্বীকার করা এবং আমেরিকানরা যখন জীবনধারণের জন্য সংগ্রাম করছে, তখন ইসরাইলকে দেওয়া শত শত কোটি ডলারের পক্ষে ভোট দেওয়া। এই ঘটনা আমাদের দেশের রাজধানীতে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, যেখানে উভয় দলের কংগ্রেসের অধিকাংশ সদস্য এখনো সেই একই অনুদান গ্রহণ করেন এবং সেই একই ভোট দেন। একইভাবে, এই ঘটনাটিও আলোড়ন সৃষ্টি করছে যে, ফিলিস্তিনপন্থি মেয়র মামদানি ডেমোক্র্যাটিক নেতৃত্বের প্রচণ্ড চাপ সত্ত্বেও দ্ব্যর্থহীনভাবে ল্যান্ডার, আভিলা শেভালিয়ার ও ভালদেজকে সমর্থন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এবং ভোটারদের কাছ থেকে বিপুলভাবে পুরস্কৃত হয়েছিলেন।

এরপরও নিশ্চয়ই এমন কিছু মানুষ থাকবেন যারা বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে নিজেদের বোঝাবেন যে শহরগুলো এবং ঐতিহ্যগতভাবে ডেমোক্র্যাট-সমর্থিত রাজ্যগুলো দেশের প্রতিনিধিত্ব করে না। কিন্তু জনমত জরিপ ভিন্ন কথা বলছে। টেক্সাসের সিনেট নির্বাচনের মার্চ মাসের ডেমোক্র্যাটিক প্রাইমারিতে ভোটারদের ওপর চালানো জরিপে দেখা গেছে, ৭৬ শতাংশ ভোটার বিশ্বাস করেন যে ইসরাইল গণহত্যা চালাচ্ছে। অ্যারিজোনার মতো গুরুত্বপূর্ণ সুইং স্টেটের ৭৬ শতাংশ ডেমোক্র্যাটও একই মত পোষণ করেন। এই পরিসংখ্যানটি, এই মাসে প্রকাশিত আমাদের জরিপে নিউইয়র্ক স্টেটজুড়ে ৭০ শতাংশ ডেমোক্র্যাটের মতামতের চেয়েও বেশি, যারা বলেছিলেন যে ইসরাইল গণহত্যা চালাচ্ছে।

তবে এটি কেবল জনমতের বিষয় নয় বরং ভোটারদের সংগঠিত করারও বিষয়। ফিলিস্তিনি অধিকারের পক্ষে জোরালো অবস্থান গ্রহণ করা আজকের রাজনীতিতে অন্য যেকোনো বিষয়ের চেয়ে বেশি শক্তি জোগায়। এই পরিবর্তনটি ঘটার জন্য একটি ‘লাইভস্ট্রিম’ করা গণহত্যার প্রয়োজন হয়েছিল। ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলের নিপীড়ন ও নৃশংসতার মাত্রা একে লাখ লাখ ভোটারের জন্য একটি রেড-লাইন ইস্যুতে পরিণত করেছে, যারা এই ধরনের ভয়াবহতায় জড়িত কাউকেই সমর্থন করবে না।

যদিও ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতৃত্ব তা অস্বীকার করে যেতে পারেন, কিন্তু এটা স্পষ্ট যে, বাস্তবতাকে উপেক্ষা করার এই মনোভাবের কারণেই কমলা হ্যারিস ২০২৪ সালের নির্বাচনে জেতার জন্য প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ ভোট হারিয়েছেন। একই মনোভাব বজায় রাখলে ২০২৮ সালেও সেই একই ভুলের পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি রয়েছে। আগামীতে ভোটারদের দাবি স্পষ্ট: জাতীয়ভাবে, ডেমোক্রেটিক প্রাইমারিতে ভোট দিতে ইচ্ছুক ভোটারদের মধ্যে ৭১ শতাংশ চান যে তাদের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ইসরাইলের কাছে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করার বিষয়টিকে সমর্থন করবে। সেইসঙ্গে তারা ইসরাইলি সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়টিকেও সমর্থন করেন।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে, ইরানের সঙ্গে আলোচনা নিয়ে ইসরাইলি সরকারের সাথে প্রকাশ্য বিরোধ আরো বাড়িয়ে দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। যা থেকে মনে হচ্ছে যে রক্ষণশীল ভোটাররাও ইসরাইলকে সমর্থন করা থেকে সরে এসেছেন। মে মাসে নিউইয়র্ক টাইমসের এক জরিপে দেখা গেছে, ৪৫ বছরের কম বয়সী ৬৩ শতাংশ রিপাবলিকান ইসরাইলকে সামরিক সহায়তা বন্ধ করার পক্ষে। এখনই কিছু বলাটা বেশি তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে, কিন্তু ডেমোক্র্যাটরা এখন পর্যন্ত যে সুযোগটি হাতছাড়া করেছেন, রিপাবলিকানরা তা গ্রহণ করে ‘ইসরাইলের প্রতি কঠোর’ দলের তকমা দাবি করবেন—এই সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

ভোটাররা যেদিকে ঝুঁকে আছেন, সেদিকে সরে আসা ডেমোক্র্যাটিক পার্টির নেতৃত্বের জন্য কঠিন হওয়া ঠিক হবে না। ডেমোক্র্যাটিক ভোটারদের কাছে ইসরাইলের সামরিক বাহিনীকে অর্থায়ন চালিয়ে যাওয়া সমকামী বিবাহ নিষিদ্ধ করার চেয়ে বেশি জনপ্রিয় নয়। যদি নিজেদের অবস্থান দ্রুত সংশোধন করা না হয়, তবে ডেমোক্র্যাটরা দেখতে পাবে যে সরকার গঠনের জন্য তারা নিজেরাই নিজেদের সবচেয়ে বড় বাধা।

সঠিক ও নৈতিক অবস্থান রাজনৈতিক কৌশলগত অবস্থানের সাথে মিলে যাবে-রাজনীতিতে এটা সবসময় নাও হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ফিলিস্তিনি অধিকার কর্মীরা, যারা কয়েক দশক ধরে এই কাজ করে আসছেন, তারা জানেন যে অবিশ্বাস্য সাহসিকতার ফলেই তারা আজ এই অবস্থানে এসে পৌঁছেছেন। ডেমোক্র্যাটদের কাছে এখন সুযোগ রয়েছে তাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ানোর এবং সেই মূল্যবোধগুলোকে সমুন্নত রাখার, যেগুলোকে দলটি সবচেয়ে গভীরভাবে গুরুত্ব দেয় বলে দাবি করে। যা সঠিক এবং যা চিরকাল সঠিক ছিল, তা করে দেখানোর এখনই সময়। তা না করার আর কোনো অজুহাত বাকি নেই।

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিকে চিরতরে বদলে দিয়েছে ফিলিস্তিন

No comments

Powered by Blogger.