Thursday, August 15, 2013
দলীয়করণ by আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ
দলীয়করণ by আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ
বহুমুখী এক ব্যক্তিত্ব আবদুল্লাহ আবু
সায়ীদ। অধ্যাপনা, সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা ও লেখালেখির বাইরে তিনি একজন
সফল সংগঠক। তার স্বপ্ন ও চিন্তার ফসল বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। যা
আজ দেশব্যাপী বইপড়া আন্দোলনের সূতিকাগার। লাখো ছাত্র-ছাত্রীর মেধা ও মননের
বিকাশে নিরন্তন কাজ করছে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। গড়ে তুলছে আগামীর
নেতৃত্বকে। সফল সংগঠক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ ২৫শে জুলাই পা রেখেছেন
পঁচাত্তরে। সবছাপিয়ে লেখালেখির নানা ক্ষেত্রে তিনি রেখেছেন প্রতিভার
স্বাক্ষর। সমস্যাসঙ্কুল দেশ নিয়ে সচেতনভাবে তিনিও চিন্তা করেন। গভীর
অন্তদৃষ্টি দিয়ে তা লেখার মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন। বাংলাদেশে গণতন্ত্র
চর্চার গতি-প্রকৃতি নিয়ে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ-এর লেখা ‘গণতন্ত্র ও নিরঙ্কুশ
ক্ষমতা’ বইটি ২০০৯ সালে মাওলা ব্রাদার্স থেকে প্রকাশিত হয়। আবদুল্লাহ আবু
সায়ীদ-এর পঁচাত্তরতম জন্মদিনের চলমান সময়ে মানবজমিন অনলাইন পাঠকদের উদ্দেশে
বইটির খণ্ড খণ্ড অংশ প্রকাশিত হলো-
১...
১৯৯০ সালের শেষ দিকে এরশাদ বিরোধী আন্দোলন যখন তুঙ্গে, আমার বড় মেয়ে তখন একদিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিরে খানিকটা দার্শনিকসুলভ ভঙ্গিতে বলল, ‘এরশাদ, দেখো আর বেশিদিন ক্ষমতায় থাকবে না।’
শুনে অবাক লাগল। এমন মহাশক্তিধর এরশাদ ক্ষমতা থেকে পড়ে যাবে? কী করে এ কথা বিশ্বাস করা যায়?
বললাম, কীভাবে বুঝলে? ও বলল, স্কুলের ছেলেমেয়েদের একদমই বাড়ি-ঘরে ধরে রাখা যাচ্ছে না। সুযোগ পেলেই পালিয়ে মিছিলে চলে যাচ্ছে। শুনে মনে হলো, তাই তো। খেয়ালই তো হয়নি। বড়রা, বয়স্করা, সজাগ সচেতন মানুষ। তারা মিছিল বা মিটিংয়ে যেতেই পারে। কিন্তু স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়েদের যাওয়া খুবই আলাদা ব্যাপার। তারাও যখন জড়িয়ে পড়ছে তখন বুঝতে হবে ব্যাপারটা জাতীয় আবেগে পরিণত হয়েছে; দেশের সবচেয়ে সচেতন মানুষটি থেকে সবচেয়ে অবোধ মানুষটি কেউ-ই এই আন্দোলনের বাইরে নেই।
মনে পড়ল এর একুশ বছর আগে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে ঠিক একই দৃশ্য আমরা দেখেছিলাম। বড়দের পাহারা এড়িয়ে কিশোর-তরুণরা এভাবেই পালিয়ে যেত রাস্তায়। ফলে লৌহমানব আইয়ুবের পতন ঘটে গিয়েছিল।
১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী গণঅভ্যুত্থানের কথা এখনও চোখের সামনে ভাসে। কী তোলপাড় সবার মধ্যে! ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ দাবিতে রাজপথে বাঁধভাঙা মানুষের কী স্বতঃস্ফূর্ত জোয়ার! মুক্তির জন্যে গণমানুষের ভেতর এ ধরনের উন্মাদনা একটা জাতির জীবনে রোজ ঘটে না।
এরশাদের পতনে আমরা ভেবেছিলাম চিরদিনের জন্যে স্বৈরতন্ত্র বিদায় নিল। মুক্ত হল গণতন্ত্র। এবার উদার আবহাওয়ায় প্রাণখুলে গণতন্ত্রের চর্চা হবে। কিন্তু গত পনেরো বছরের গণতন্ত্রের চেহারা দেখে সে ভুল আমাদের ভেঙেছে। আমরা ধীরে ধীরে টের পেয়েছি স্বৈরশাসনের হাত থেকে মুক্তি পাবার বদলে আমরা গভীরতর স্বৈরাচারের হাতে বন্দি হয়েছি। পার্থক্য এই: আগে আমরা বন্দি ছিলাম সামরিক স্বৈরতন্ত্রের হাতে, এখন গণতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্রের হাতে। যখন যে দল এদেশে ক্ষমতায় আসছে সে দল দেশ শাসন করে চলছে নিরঙ্কুশ স্বৈরাচারীর আদলে, সবরকম গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে। ফলে গণতন্ত্রের নামে একটা নিষ্ঠুর অকর্ষিত রাজনৈতিক ব্যবস্থা আজ এ দেশে জেঁকে বসে গেছে।
২...
শাসকের ব্যক্তিত্বের অসাধারণত্ব উদ্ভাসের কারণে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় যদি স্বৈরতন্ত্রের রঙ লাগে তাতে অধিকাংশ সময় ক্ষতির চেয়ে লাভই বরং বেশি, কেননা রাষ্ট্রকে তখন শাসন করে শ্রেষ্ঠ মানুষেরা। কিন্তু এই স্বৈরশাসন যদি শাসকের যোগ্যতার থেকে উ™ভূত না হয়ে উ™ভূত হয় অন্য কোনো উৎস থেকে, কোনো অনভিপ্রেত বিধান বা ক্ষতিকর সাংবিধানিক অনুমোদনের কারণে তবে তা জল্লাদের মতো জাতির বুকে বসে তার রক্তপান করতে থাকে। জাতিকে তা তখন এমন এক দুরপনেয় সংকট ও সংঘাতের মধ্যে ঠেলে দেয় যা থেকে জনগণ ও রাজনীতিকে উদ্ধার করা খুবই কঠিন হয়ে পড়ে। প্রথমে এই সংকটের মূল কারণটি নিয়ে আলোচনা করতে চাই:
এরশাদের বিদায়ের পর আমরা যা পেয়েছি তা গণতন্ত্র তো নয়ই, বরং প্রায় এর উল্টো। জাতি ইতিমধ্যেই এর নাম দিয়েছে পুরুষানুক্রমিক রাজতন্ত্র। এ এমন এক রাজনৈতিক পরিস্থিতি যেখানে গণতন্ত্র পুরোপুরি গণবিচ্ছিন্ন ও জাতীয় সমৃদ্ধির প্রধানতম প্রতিবন্ধক, জনগণের সুখ-সম্ভাবনা ভালোমন্দ রাজনীতিতে প্রায় সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষিত, এমনকি গণতন্ত্রের বিকাশ ও সমৃদ্ধিও বিভিন্ন দলের দল-প্রধানদের দ্বারা নির্দয়ভাবে শ্বাসরুদ্ধ। আজ জাতির ভাগ্য প্রধানত দুজন ব্যক্তির হাতে জিম্মি এবং এর ধারাবাহিকতায় দু’টি পরিবারের হাতে। আজ কি কেউ ভাবতে পারে শেখ মুজিব বা জিয়াউর রহমানের পরিবারের সদস্য না হয়ে কেউ এ দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন? এমনকি তিনি যদি দেশের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষটিও হন? কিছুদিন আগে তারেক রহমান শেখ হাসিনাকে ভর্ৎসনা করতে গিয়ে আওয়ামী লীগের সদস্যদের পরামর্শ দিয়েছেন তারা যেন শেখ হাসিনাকে সরিয়ে তার জায়গায় তার ছোট বোন শেখ রেহানাকে নেতৃত্বে বসায়। এখন প্রশ্ন আওয়ামী লীগাররা যদি শেখ হাসিনাকে সত্যি সত্যি অযোগ্য মনে করে তবে তার জায়গায় শেখ রেহানাকে বসাতে হবে কেন? তার চেয়ে যোগ্য মানুষ কি দলটিতে নেই! গণতন্ত্র তো জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের শাসন! আমাদের গণতন্ত্রে দলের যোগ্যতম মানুষদের দলের নেতৃত্বে আসার পথ কেন রুদ্ধ? কেন কেবল একচ্ছত্র পারিবারিক আধিপত্য? এই যদি হবে তবে পৃথিবী জুড়ে বিপুল রক্তযুগান্তরের পথ ধরে রাজতন্ত্রকে হটিয়ে গণতন্ত্র এসেছিলই-বা কী করতে। তারেক রহমানের কথা থেকে তার মনের অবচেতন মনোভাবটা স্পষ্ট: কথাটি ধৃষ্টতাপূর্ণ ও উদ্ধত। এর মূল কথা: বাংলাদেশের ভাগ্য আজ তাদের দু’টি পরিবারের ব্যক্তিগত সম্পত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। শেখ হাসিনা না হলে শাসন করবেন শেখ রেহানা, খালেদা জিয়া না হলে তার ছেলে তারেক রহমান। এদের বাইরের চৌদ্দ কোটি মানুষ মোটামুটি জীবজন্তু। জনগণের প্রতি দল-প্রধানদের মনোভাব যে কতখানি তাচ্ছিল্যপূর্ণ তার আরেকটা উদাহরণ দিই। কিছুদিন আগে ২০০৬-এর অক্টোবরে, নির্বাচন কমিশন আর রাজনৈতিক সংস্কার নিয়ে দলদুটির মধ্যে মহাসচিব পর্যায়ে আলোচনা চলছিল। জাতির জন্যে অসম্ভব সংকটপূর্ণ সময় সেটা। কেননা দুটি দলের সঙ্গে সারাদেশ তখন মুখোমুখি হয়ে রয়েছে সংঘাতপূর্ণ অবস্থায়, মহাসচিব পর্যায়ের সমঝোতা ব্যর্থ হলে গৃহযুদ্ধ বেধে যাওয়ার সম্ভাবনা, অথচ আলোচনায় অগ্রগতি নেই। এদিকে খালেদা জিয়া সরকারের মেয়াদ আর মাত্র ১৪ দিন। এর মধ্যে ঈদ আর সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে সবকিছু বন্ধ থাকবে ৬ দিন, দুটি দলের ভেতর সমঝোতা হলেও সংসদের বিশেষ অধিবেশন ডেকে কোনো কিছু সংস্কার করার সময় ফুরিয়ে যাবে। এসব টান টান উত্তেজনায় যখন দেশের মানুষ উৎকণ্ঠায় ছিঁড়ে যাচ্ছে, সেই সময় খালেদা জিয়া চলে গেলেন আরবে ওমরাহ করতে, যা জাতীয় স্বার্থের কথা ভেবে দিনকয় পিছিয়েও দেওয়া যেত। যখন তারা ফিরবেন তখন ঈদের ছুটির পর হাতে সময় থাকবে মাত্র তিন-চার দিন। হয়ত তা-ও নয়। কথাটা বললাম, এ কথাটা বোঝাতে যে নিজেদের ক্ষমতা আর স্থায়িত্বের ব্যাপারে তারা কী পরিমাণ নিশ্চিত ও উদ্বেগহীন। সামরিক একনায়কতন্ত্রীদের ক্ষমতা অবৈধ বলে এবং তাদের ক্ষমতার উৎস ক্যান্টনমেন্ট বলে তাদের তবু ক্ষমতা হারানোর আশঙ্কা থাকে। কিন্তু দেশের জনগণকে জিম্মি করা এই দল-প্রধানদের নিজেদের অবস্থান নিয়ে ন্যূনতম দুর্ভাবনা নেই। কেননা তাদের এই স্বৈরতন্ত্র এরশাদ, আইয়ুব বা ইয়াহিয়ার সামরিক স্বৈরতন্ত্রের মতো অবৈধ নয়। এ বৈধ এবং সংবিধানসম্মত। গোটা জাতি আজ এমনি নিñিদ্র স্বেচ্ছাচারী এই সংবিধান-সমর্থিত স্বৈরতন্ত্রের হাতে বন্দি।
৩...
কেবল এঁরা নন, দেশের প্রতিটি দল-প্রধানের স্বৈরতান্ত্রিক অবস্থানই আজ এমনি নিরঙ্কুশ। একটা ছোট্ট উদাহরণ দিনই। ১৯৯০ সালে ক্ষমতা হারালেও এরশাদ আজও রাজনীতিতে সক্রিয়। এখনও তিনি তার প্রতিষ্ঠিত জাতীয় পার্টির ক্ষীয়মাণ দলটির প্রধান। সংসদে এই দলের সদস্যসংখ্যা আজও বেশ। কিছুদিন আগে বিএনপি সরকারের চাপের মুখে সম্পূর্ণ একক সিদ্ধান্তে তিনি ২০০৬ সালের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন বিএনপি’র নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তার দলের একটি বড় অংশ এই সিদ্ধান্তের বিপক্ষে ছিল। সেদিন টিভির পর্দায় দেখলাম, ব্যাপারটি নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি আঙুল নেড়ে নেড়ে বলছেন, আমার দল কোন পক্ষে যাবে না যাবে এটা সম্পূর্ণভাবে আমার ব্যক্তিগত ইচ্ছার ব্যাপার। এখানে অন্য কারো কথা বলার অধিকার নেই। ভেবে দেখুন, কথাটি আমাদের গণতান্ত্রিক দেশটির একটি গণতান্ত্রিক দলের প্রধানের। দেখুন, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যাপারে কী সর্বময় ক্ষমতা তার! এই স্বৈরতন্ত্রীর নয় বছরের সামরিক শাসনামলেও তো সিদ্ধান্ত নেবার এমন নিরঙ্কুশ স্বাধীনতা বা দুঃসাহস তার ছিল না। অন্ততপক্ষে সেনাবাহিনীর ইচ্ছা-অনিচ্ছা বা সমর্থন-অসমর্থনের ধার তাকে ধারতে হত। কিন্তু আজ একটি গণতান্ত্রিক দলের প্রধান হওয়ায় সামরিক একনায়কতন্ত্রীদের চাইতেও তিনি ক্ষমতাবান। কারণ তিনি এখন তার দলের নিরঙ্কুশ প্রভু। স্বাধীন ইচ্ছায় নিজের দল বা তার অনুসারী বা সমর্থকদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি এখন যেমন খুশি ছিনিমিনি খেলতে পারেন। তাকে বাধা দেবার কেউ নেই। কেবল তিনি নন, বাংলাদেশের রাজনীতির মূল ধারা দুটির প্রধান শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া থেকে শুরু করে প্রতিটি ছোট বড় দলের প্রধানই আজ নিজ নিজ দলের এমনি নিরঙ্কুশ কর্তা। জনগণ আজ মূলত দেশের দু’টি বিরোধী রাজনৈতিক পতাকার নিচে সংঘবদ্ধ। ফলে দলগুলো থেকে গণতন্ত্র পুরো বিদায় নিয়েছে এবং দেশের গণতন্ত্রের রূপটি পুরোপুরি স্বৈরতান্ত্রিক রূপ নিয়েছে।
এখন প্রশ্ন দল-প্রধানদের এমন অফুরন্ত ক্ষমতার উৎস কি? না শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া, এরশাদ বা অন্য কেউ ষড়যন্ত্র করে এই স্বৈরতন্ত্র তৈরি করেননি। এই দুর্ভাগ্যের মূল উৎস খোদ বাংলাদেশের সংবিধান। এর ৭০ অনুচ্ছেদ। মোটামুটি এই অনুচ্ছেদটিই আজ এভাবে গণতন্ত্রকে স্বৈরাচারী করে ফেলেছে ও দেশের জনগণকে শৃঙ্খলিত করে তাদের সবাইকে দেশের জনাকয় রাজনৈতিক দল প্রধানের ভৃত্যে পরিণত করেছে। ৭০ অনুচ্ছেদ আমার এই লেখাটির একমাত্র বিষয় নয়। আমি শুধু দেখাতে চেষ্টা করবো অনুচ্ছেদটির সুদূর প্রভাবে আমাদের গণতন্ত্র কীভাবে আপাদমস্তক স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে পড়েছে; এবং গণতন্ত্র - যা মূলত স্বৈরতন্ত্রবিরোধী একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা তা কোনো কারণে স্বৈরাচারী হয়ে পড়লে জাতির জন্যে কত দিক থেকে ধ্বংসাত্মক ও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে যে ক্ষতি সামরিক বা অন্যান্য স্বৈরতন্ত্রের চাইতেও অনেক গভীর ও সুদূরপ্রসারী।
৪...
কথার শুরুতেই আমি সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সম্বন্ধে পাঠককে প্রাথমিক ধারণা দিয়ে নিতে চাই। বাংলাদেশে এই মুহূর্তে যে গণতন্ত্র চালু রয়েছে তা সংসদীয় গণতন্ত্রের হুবহু ছকটি এখানে নেই। ৭০ অনুচ্ছেদেও এমন কিছু নতুন বিষয় সংযোজিত হয়েছে যার ফলে এই দুটি দেশের গণতন্ত্রের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য ঘটে গেছে। বাংলাদেশের গণতন্ত্র এতে যে কেবল সংসদীয় গণতন্ত্রের মূল চরিত্রটি হারিয়ে ফেলেছে তাই নয়, গণতন্ত্র বিষয়টিকেই প্রায় পরিত্যাগ করেছে। কীভাবে তা ঘটেছে সে ব্যাপারটি শাদামাটাভাবে এখানে তুলে ধরছি।
বৃটিশ গণতন্ত্রে একজন নির্বাচিত সাংসদ সংসদে তার দলের উত্থাপিত কোনো প্রস্তাব ইচ্ছা করলে সমর্থন করতে পারেন অথবা প্রস্তাবটিকে কোনো কারণে জাতির জন্যে ক্ষতিকর বিবেচনা করলে, তার সমালোচনা করতে এমনকি তার বিরুদ্ধে ভোট পর্যন্ত দিতে পারেন। অর্থাৎ চাইলে তিনি বিভিন্ন বিষয়ে তার দলের বিরুদ্ধে ভোট পর্যন্ত দিতে পারেন। অর্থাৎ চাইলে তিনি বিভিন্ন বিষয়ে তার দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারেন। এতে সংসদে তাকে সদস্যপদ হারাতে হয় না। এই পুরো ব্যাপারটাকেই বলে ফ্লোর ক্রসিং। কিছুদিন আগে ইংল্যান্ডের সংসদে লেবার পার্টির নেতা প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার সাদ্দাম হোসেনকে উৎখাতের জন্যে ইরাকের বিরুদ্ধে আমেরিকার সঙ্গে যৌথভাবে যুদ্ধ করার প্রস্তাব আনলে তার দলের বহু সদস্য এর বিরুদ্ধে ভোট দেয়, ফলে শুধু নিজ দলের সদস্যদের সমর্থন নিয়ে তিনি সংসদে এই প্রস্তাব পাস করাতে পারেননি। পেরেছিলেন সংসদের বিরোধী দলের বিরাট সংখ্যক সদস্য এর পক্ষে ভোট দেওয়ায়। কাজেই ফ্লোর ক্রসিং কথাটার অর্থ দাঁড়াল: একজন সাংসদ কোনো একটি দলের পক্ষ থেকে নির্বাচিত হলেও সংসদের ভেতরে তিনি একজন সম্পূর্ণ স্বাধীন ব্যক্তি- এমন একজন জননেতা যার দায়বদ্ধতা বা জবাবদিহিতা কেবলমাত্র তার দলের কাছে নয়, তার নির্বাচনী এলাকার জনগণের কাছে (যাদের তিনি সরাসরি প্রতিনিধি), তার ব্যক্তিগত বিবেকের কাছে এবং বড় অর্থে গোটা জাতির কাছে। এই ব্যবস্থায় একটি আইন সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সাংসদের ভোটে পাস হয়, কেবলমাত্র সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের সদস্যদের বাধ্যতামূলক ভোটে নয়। গণতান্ত্রিক আদর্শের মূল কথা এটিই।
প্রথাটি কেবল বৃটিশ সংবিধানে নয়, কমবেশি পরিবর্তিত অবস্থায় অনেক দেশের সংবিধানেই রয়েছে। গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে হুবহু বৃটিশ আদলে এই ধারাটি পাকিস্তানের সংবিধানেও ছিল। কিন্তু বৃটিশ সাংসদদের তুলনায় আমাদের সাংসদদের রাষ্ট্রসম্পর্কিত ভাবনায় অপ্রতুলতা, আত্মমর্যাদাবোধ, বিবেক বা জাতীয় কল্যাণের অঙ্গীকার বা দায়বদ্ধতা নিম্নমানের ছিল বলে এবং প্রায় সবাই মোটামুটি সুবিধাবাদী চরিত্রের ছিলেন বলে এর ফল হয়েছিল আত্মঘাতী। নিজ সিদ্ধান্তে দল ত্যাগের ক্ষমতা থাকায় তারা মন্ত্রিত্বের মতো কোনো পদ বা এরও চেয়ে তুচ্ছ কোনো লোভ বা লাভের বিনিময়ে নির্বিকারে নিজ নিজ দল ছেড়ে অন্যদলে যোগ দিয়ে বসতেন এবং অনেক সময় বড় ধরনের প্রলোভনের মুখে দলবেঁধে ভিন্ন দলে চলে যেতেন। এভাবে একদল থেকে সাংসদদের ভাগিয়ে অন্যদলে নেয়ার ইংরেজি নাম ‘হর্স ট্রেডিং’। (ইংরেজি ভাষায় বাগধারাটির জনপ্রিয়তা থেকে বোঝা যায় ইংল্যান্ডের পার্লামেন্টেও একসময় ব্যাপারটা হয়ত জমজমাটভাবেই চলত)। পাকিস্তানের জাতীয় সংসদে ও পূর্বপাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদে পঞ্চাশের দশকে এই হর্স ট্রেডিং এমন ব্যাপকভাবে শুরু হয় যে সরকারগুলোর স্থিতিশীলতা পুরো বিপন্ন হয়ে পড়ে’ হর্স ট্রেডিংয়ের ফলে ঘন ঘন সরকার পতন শুরু হয়। ১৯৫৬ সালে আবু হোসেন সরকারে নেতৃত্বে গঠিত সরকার মাত্র একদিনের মাথায় ক্ষমতা থেকে পড়ে যায় এবং সাংসদদের স্বার্থলোলুপতা ও নৈরাজ্যের এক মর্মান্তিক পর্যায়ে প্রাদেশিক পরিষদের ডেপুটি স্পিকার শাহেদ আলী (সেদিন স্পিকার হিশেবে কার্যরত) অধিবেশন চলাকালে মারমুখো সদস্যদের আক্রমণে পরিষদের মধ্যেই নিহত হন। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার এই নৈরাজ্য সে সময় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রধান আইয়ুব খানের সামনে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের সুবর্ণ সুযোগ খুলে দেয় এবং রাজনীতিবিদদের ব্যর্থতা এবং দেশের বিরাজমান বিশৃঙ্খলতার অজুহাতে ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি করে তিনি পাকিস্তানের সর্বময় কর্তা হয়ে বসেন। দীর্ঘ তেরো বছর শ্বাসরুদ্ধকর সামরিক বুটের নিচে পদদলিত থাকার পর ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং স্বাধীনতাযুদ্ধের ভেতর দিয়ে দেশ ঐ অশুভ দানবের কবল থেকে মুক্ত হয়।
গণতন্ত্র খুইয়ে রাজনৈতিক নেতারা গভীর দুঃখের সঙ্গে অনুভব করেন যে জাতির গণতন্ত্র হারানোর অন্যতম কারণ সংবিধানের ফ্লোর ক্রসিং ব্যবস্থা এবং বৃটিশ গণতন্ত্র তাদের শ্রদ্ধার জিনিশ হলেও দুদেশের জনগণের সংস্কৃতি ও মূল্যবোধগত সুবিপুল ব্যবধানের কারণে ঐ সংবিধানের সবকিছু অন্ধের মতো অসুনরণ করা সুবিবেচনার কাজ হয়নি। এই ভাবনার ফলশ্রুতিতে ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সংবিধান তৈরির সময় সরকারের স্থিতিশীরতার কথা মাথায় রেখে ফ্লোর ক্রসিং ব্যাপারটি নিষিদ্ধ হয়। সংবিধানের যে অনুচ্ছেদ ফ্লোর ব্যবস্থা নিষিদ্ধ করে সেই অনুচ্ছেদের নামই ৭০ অনুচ্ছেদ। ১৯৭২ সালের সংবিধানে ৭০ অনুচ্ছেদ যুক্ত হলে রাজনৈতিক মহল মোটামুটি হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। সরকারের স্থিতিশীলতাকে যে শেষ পর্যন্ত নিশ্চিত করা গেছে তা ভেবে স্বয়ং বঙ্গবন্ধুও সে সময় নাকি স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছিলেন।
৫...
এবার আসুন আমরা দেখি ফ্লোর ক্রসিং সম্বন্ধে এই অনুচ্ছেদে কী বলা হয়েছে:
“৭০। কোনো নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত হইয়া কোনো ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হইলে তিনি যদি-
ক. উক্ত দল হইতে পদত্যাগ করেন
খ. সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোট প্রদান করেন, তাহা হইলে সংসদে তাহার আসন শূন্য হইবে, তবে তিনি সেই কারণে পরবর্তী কোনো নির্বাচনে সংসদ সদস্য হইবার অযোগ্য হইবেন না।
তাহলে দাঁড়াল কি? দাঁড়াল: সংসদের আইন প্রণয়নে সাংসদদের নিজস্ব কোনো মতামত নেই। দলের মতই তাদের মত। অর্থাৎ বৃটিশ সাংসদদের মতো তারা স্বাধীন জনপ্রতিনিধি নন। জাতীয় স্বার্থ বা ব্যক্তিগত বিবেক তার আচরণে অবাঞ্ছিত। শেষ বিচারে দলীয় সিদ্ধান্তের তিনি একজন অনুগত ধারক ও সেবক মাত্র। যতক্ষণ তার এই আনুগত্য প্রশ্নাতীত ততক্ষণই তিনি সাংসদ। এর একটু এদিক্ল-সেদিক হলেই তিনি দল ও সংসদ থেকে বহিষ্কৃত ও ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত। এক কথায় দলের সর্বময় কর্তৃত্বের নিচে তিনি অন্তঃসারহীন অস্তিত্বহীন একটি ছায়া-মানুষ কেবল। যে দলের সাংসদ বা মন্ত্রীরাই এতখানি অর্থহীন সে দলের কোটি কোটি সাধারণ নেতাকর্মীর অবস্থা কী তা সহজেই বোঝা যায়। অর্থাৎ আমাদের গণতন্ত্রে একটা জিনিশই কেবল ঝাণ্ডার মতো উন্নত- তার নাম দলীয় কর্তৃত্বের সার্বভৌমত্ব। বাকি গোটা দল, দলের তাবৎ সদস্য বা নেতাকর্মীÑ এমনকি সমর্থকÑ সবার কাজ সেখানে একটাই: ঐ সর্বশক্তিমান দলীয় কর্তৃত্বের পায়ে সাষ্টাঙ্গে প্রণিপাত হয়ে ঐ শক্তির স্তম্ভকে মজবুত ও দীর্ঘস্থায়ী করে রাখা।
স্পষ্টই বোঝা যায় গণতন্ত্রের ভিতকে পাকাপোক্ত করার স্বপ্ন নিয়ে যে বিধান তৈরি করা হয়েছিল তা আমাদের গণতন্ত্রকে শুধু ধ্বংস করেনি, একে নিখাদ স্বৈরতন্ত্রে পরিণত করেছে। সামরিক স্বৈরতন্ত্রের চেয়েও এ স্বৈরতন্ত্র কঠোর ও নির্মম। শেখ মুজিবুর রহমানের অধিকাংশ উদ্যোগের পেছনে জনগণের বিপুল আস্থা ও অনুমোদন ছিল বলে তার আমলে ব্যাপারটা ঠিকমতো চোখে পড়েনি। কিন্তু জিয়াউর রহমান আর এরশাদের সামরিক শাসন পেরিয়ে গণতন্ত্রের যুগ আসার পর এ এখন পুরোপুরি স্পষ্ট হয়ে জেগে উঠেছে।
এখানে একটা কথা। সংবিধানে দল বলে যা বোঝানো হয়েছে শেষ বিচারে তার মানে কি? আমরা ধারণা, এর মানে একটাই: ‘দল-প্রধান’। যেহেতু তিনিই দলের সর্বময় নিয়ন্তা। ফলে দলের নিরঙ্কুশ কর্তৃত্বের নামে এখন প্রতিটি দলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে দল প্রধানের কর্তৃত্ব। এক কথায়, তার একনায়কত্ব। দেশের সব ক’টি দলই আজ তাদের দল-প্রধানের হাতে জিম্মি। তার ইচ্ছা-অনিচ্ছা, খেয়াল-খুশি, ভালো-মন্দ, বুদ্ধি-নির্বুদ্ধিতা, ক্ষুদ্রতা বা লোভের হাতে দল আজ পুরোপুরি একটা খেলনা। তার দল রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকলে তিনি হয়ে দাঁড়ান স্বৈরশাসক। যেহেতু দল নামটির আড়ালে দাঁড়িয়ে গোটা দলটিকেই তিনি পায়ের নিচে আগাপাশতলা পিষ্ট করে রেখেছেন। এই পদ্ধতি দলের ভেতর নেতাকর্মীদের স্বাধীন মত প্রকাশের অর্থাৎ গণতন্ত্র চর্চার সুযোগ প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। সার্বভৌম ক্ষমতায় বলীয়ান হয়ে দল-প্রধান তার দলের শাসনতন্ত্রকে এমনভাবে নিজের অনুকূলে রচনা ও ব্যবহার করছেন যাতে লিখিত বা অলিখিতভাবে দলের ভেতর তার একনায়কত্ব নিরঙ্কুশ হয়। এভাবে দলের মধ্যে গণতন্ত্রের মৃত্যু ঘটায় দেশের রাজনীতিতেও তা ধ্বংস হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে দল-প্রধানেরা একনায়কতন্ত্রের দিকে ঝুঁকবেন এ তো খুবই স্বাভাবিক। যিনি সাংবিধানিকভাবেই সর্বক্ষমতার অধিকারী তিনি কেন দলের ভেতর গণতন্ত্র দিয়ে অযথা নিজের বিপত্তি বাড়াবেন কিংবা নিজের ক্ষমতা খর্ব করবেন। ফলে যোগ্য হোক অযোগ্য হোক, তার সন্তান-স্বজনেরাই যে পুরুষানুক্রমে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ শাসন করবে তা অলিখিতভাবে নির্ধারিত হয়ে গেছে। নির্বাচনে দু’দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা তাদের ছাপানো পোস্টারের ওপরের দিকে দল-প্রধানের দু’তিন পুরুষের ছবি ছাপার পর যেখানে নিজের ছবিটি ভয়ে দ্বিধায় এবং অবনতভাবে নিবেদন করে তা থেকেও বোঝা যায় কীভাবে পুরুষানুক্রমিক রাজনীতির ধারা আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের পুরো উপেক্ষা করে জাতীয় জীবনে জগদ্দল পাথরের মতো জেঁকে বসেছে।
৬...
গণতন্ত্র জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের শাসন। এই ব্যবস্থায় দেশের সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তিরা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন ধাপ ডিঙিয়ে দলের শীর্ষে উঠে দেশ শাসন করে। কিন্তু বর্তমানে প্রক্রিয়াটি উল্টে যাওয়ায় একজন রাজনীতিবিদ যত যোগ্য বা প্রতিভাসম্পন্নই হোন না কেন, তার অস্তিত্ব ও ভবিষ্যৎ দলের দল-প্রধানের অনুগ্রহ বা আশীর্বাদের ওপরেই পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। সংবিধানের ঐ একটিমাত্র অনুচ্ছেদের জন্যে আজ দেশের শ্রেষ্ঠ মানুষদের রাজনীতির শীর্ষে যাবার পথ প্রায় রুদ্ধ হয়ে পড়েছে! নেতারা এখন নিচ থেকে ওপরে যাচ্ছে না, ওপর থেকে নিচে আসছেন। মোদ্দা কথা, আমাদের রাষ্ট্রশাসকরা আজ আসছেন দেশের মাত্র দুটো পরিবার থেকে। এত ছোট্ট জায়গা থেকে আসা মানুষদের মধ্যে দেশের যোগ্যতম ব্যক্তিদের পাওয়ার নিশ্চয়তা কোথায়? উচ্চতর নেতৃত্বের অভাবে দেশ আজ দিকনির্দেশনাহীন ও ধ্বংসোন্মুখ। সাহিত্যিক আবুল ফজল তার লেখকের রোজনামচায় চল্লিশ বছর আগে দুঃখ করে লিখেছিলেন, বৃদ্ধ হয়ে মৃত্যুর দরোজায় এসে তিনি দাঁড়ালেন কিন্তু কোনো সভ্য নেতার দ্বারা শাসিত হওয়ার সৌভাগ্য পেলেন না। আজ পর্যন্ত আমাদের জন্যে হয়ত কথাটা অনেকখানিই সত্যি। সুকান্ত লিখেছিলেন, এদেশে জন্মে পদাঘাতই শুধু পেলাম। আমাদেরও একই অবস্থা। ব্যক্তিগত যোগ্যতায় যারা হয়ত নিজ নিজ দলের সাধারণ সদস্যের অতিরিক্ত কিছু হতেন না তারাই আজ দলের সর্বক্ষমতার অধিকারী। এটা গণতন্ত্রের স্বাস্থ্যময় বিকাশের অন্তরায়। ইংরেজিতে একটা প্রবাদ আছে, একটা জাতি সেই মাপের নেতাই পায় যার সে যোগ্য। দুঃখের সঙ্গে এককেসময় মনে হয় জাতি হিসেবে আমরা কি এমনই অযোগ্য যে এমন নেতারাই আমাদের বিধিলিপি হয়ে গেল? একজন সামরিক শাসক যদি পেতেই হয়, তবে সামরিক বিভাগে এত উজ্জ্বল মানুষ থাকতে এরশাদের মতো একজন দুর্নীতিপরায়ণ মানুষই হবে আমাদের ভাগ্য? গণতন্ত্রের সময়ই-বা কী ঘটছে?
দলের সাধারণ মানুষের নেতৃত্বের হাতে উৎকৃষ্টরা শাসিত হতে থাকায় আজ এদেশের দলগুলো হয়ে পড়েছে হতোদ্যম, বিশৃঙ্খল। দল-প্রধান এবং তার অনুগৃহীত কিছু মানুষ ছাড়া দলে আজ আর সুখী মানুষ নেই। বাকি সবাই ক্ষমতাবর্জিত, ক্ষুব্ধ ও হতাশাক্রান্ত। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নেতাকর্মী থেকে শুরু করে সাংসদ ও মন্ত্রীদের যে গুরুত্ব বা মর্যাদা থাকে তা তাদের নেই। সবাই কার্যত আজ পার্টি প্রধানের অলিখিত সেবক। আজ বাংলাদেশে কোনো দলে টিকে থাকার ও উন্নতি করার একমাত্র যোগ্যতা হচ্ছে পদলেহন, তোয়াজ আর নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ। এর কোথাও একচুল এদিক ওদিক হলে সে নিক্ষিপ্ত হয় কালের ভাগাড়ে বা বিস্মৃতির আঁস্তাকুড়ে। আজ ছোট বড় যে কোনো জনসভার বক্তৃতায়, পোস্টারে বা বিজ্ঞাপনে দল-প্রধান ও তাদের আর্শীবাদপুষ্ট ছোট বড় প্রতিটি নেতার নামের সামনে পেছনে যেসব তোষণমূলক বিশেষণ ও নির্লজ্জ তোয়াজের প্রাচুর্য দেখা যাচ্ছে তা থেকেও ঐ পদলেহনের কথা ক্ষমতার পুরো এককেন্দ্রিকতার প্রমাণ মেলে।
ফলে এদেশে যে গণতন্ত্র আজ চলছে তা প্রশ্নহীনতার, আনুগত্যের ও দাসত্বের। দল-প্রধানের উদ্যত যষ্টির সামনে গোটা দল আজ সন্ত্রস্ত ও নতজানু। দলের প্রতিটি নেতাকর্মীর মধ্যে প্রতি মুহূর্তে অস্তিত্ব হারানোর ভয় যতখানি, ঠিক সে পরিমাণেই তাদের মরিয়া চেষ্টা দলের ভেতর নিজেদের অস্তিত্ব ও অবস্থান নিরাপদ করার। ফলে দলের ভেতর তৈরি হয়েছে অবিশ্রান্ত চাটুকারিতার এক আত্মতৃপ্ত পরিবেশ। যোগ্য মানুষের মধ্যে সবসময়ই ব্যক্তিত্ব, বিবেক বা আত্মমর্যাদাবোধ থাকে প্রবল। প্রশ্নহীন দাসত্ব ও নির্লজ্জ পদলেহন তাদের ব্যক্তিত্বের অনুকূল নয়। বর্তমানের অমর্যাদাকর পরিবেশে দেশের যোগ্য মানুষেরা তাই আর রাজনীতিতে নাম লেখাতে আগ্রহী নয়। ফলে রাজনীতিতে মেধাবী তরুণ বা উদ্যমশীল কর্মীর সংখ্যা যেমন আশঙ্কাজনকভাবে কমছে তেমনি বেড়ে যাচ্ছে দুর্নীতিপরায়ণ বিতর্কিত ও চাটুকারিতাসর্বস্ব নেতাদের ভিড়। অনেক দল-প্রধান আবার অস্তিত্ব হারানোর আতঙ্কে দলের যোগ্য মানুষদের ওপরে উঠতে দিতে নারাজ। দলের ভেতর যাদের প্রশ্নপ্রবণতা, বিবেক বা আত্মমর্যাদাবোধ দেখা যাচ্ছে তাদের দল থেকে বহিষ্কার করে স্তব্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। ফলে ক্রমাগতভাবে দলগুলো হয়ে উঠছে নেতৃত্বশূন্য এবং নিঃসঙ্গ। তরুণ নেতা প্রায় কোনো দলেই এখন নেই। দলের ‘তরুণতম’ নেতাদের বয়সও এখন ষাট বছরের ওপরে। অযোগ্য বা স্বার্থান্বেষী মানুষদের জন্যে এখন হযেছে পোয়াবারো। আত্মমর্যাদার সমস্যা না থাকায় তারা স্বার্থ হাতিয়ে নিতে তোয়াজ, আত্মবিক্রয়, চাটুকারিতা- কোনো কিছুতেই পিছ-পা নয়। তাই দলের ভেতর যোগ্য মানুষদের নিচে ফেলে এই সব বিবেকবর্জিত ও জন্তুসুলভ মানুষেরা আজ প্রাধান্য বিস্তার করেছে। আমি দেশের তরুণ সম্প্রদায়কে নিয়ে কাজ করি। আমি দেখেছি তাদের সামনে রাজনীতিবিদেরা হয়ে দাঁড়িয়েছে সবচেয়ে অশ্রদ্বেয় মানুষ। সেদিন এক জরিপ থেকে জানা গেল রাজনীতিবিদ হওয়ার কথা ভাবে এমন তরুণের সংখ্যা দেশে এখন শতকরা মাত্র আড়াইজন।
৭...
বিশ্বের বিত্তসম্পদ বৃদ্ধির ফলে আজ ব্যক্তিস্বাধীনতা ও গণতন্ত্র একনায়কতন্ত্রের চেয়ে বেশি জনপ্রিয়। তার মানে এ নয় যে শাসন ব্যবস্থা একনায়কতন্ত্রী বা স্বৈরতন্ত্রী হলেই তা সবসময় খারাপ হবে। মাও সেতুংয়ের একনায়কতন্ত্র, কামাল পাশার স্বৈরতন্ত্র, সিঙ্গাপুরের লি কুয়ানের বা মালয়েশিয়ার মহাথির মোহাম্মদের একনায়কতন্ত্রী কর্তৃত্ব যে ঐসব দেশের বিকাশ ও সমৃদ্ধিকে পিছিয়ে দিয়েছে এ কথা আশা করি কেউ বলবেন না। এসব স্বৈরাচারীই যে কেবল নিজ নিজ দেশের জন্যে ভাল কাজ করছেন তা নয়, ক্ষমতায় থাকতে হলে অধিকাংশ একনায়কতন্ত্রীকেই কমবেশি ভাল কাজ করতে হয়। জনস্বার্থে ভাল ভাল কাজ করে তাকে প্রতিনিয়ত জনসাধারণের সামনে প্রমাণ করতে হয় তিনি জনগণের বন্ধু এবং গণতন্ত্রীদের চেয়ে উচ্চতর। যখন তিনি ঠিকমতো তা হন না তখনও প্রচারণার মাধ্যমে হলেও তাকে এই ভাবমূর্তি উঁচু করে রাখতে হয়। দ্বিতীয়ত একনায়কতন্ত্রী হলেই একজন মানুষ যে দেশের জন্যে ক্ষতিকর হবেন এমন কথাও নেই। পৃথিবীর এযাবৎকালের বহু স্বৈরতন্ত্রীই ছিলেন দেশপ্রেমিক। নিজেদের বুদ্ধি-বিবেচনামতো জনগণের ভালোর জন্যেই তারা কাজ করেছেন। তাদের প্রধান অপরাধ অন্য জায়গায়: জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতাকে কৌশল ও শক্তির মাধ্যমে কুক্ষিগত করায়। এই দুর্বলতা তাদের সবসময় সন্ত্রস্ত রাখে। তাই জনগণের জন্যে নিয়মিতভাবে ভাল কিছু করতে তারা বাধ্য হয়ে যান। তাছাড়া স্বৈরাচারীদের একক ইচ্ছায় রাষ্ট্র পরিচালিত হয় বলে রাষ্ট্রের কল্যাণে বড় বড় সিদ্ধান্তগুলো তারা অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সঙ্গে বাস্তবায়িত করতে পারেন যা বহু প্রশাখাবহুল জটিল ভীরু ও দ্বিধান্বিত সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পক্ষে কঠিন। এ জন্যে দেখা যায় প্রতিভাবান ও দেশপ্রেমিক স্বৈরতন্ত্রীদের হাতে বিভিন্ন সময় নানা জাতির যে অবিশ্বাস্য সমৃদ্ধি ঘটেছে গড়পড়তা গণতান্ত্রিক শাসনে তা হয়নি। আমার ধারণা, ভাল হাতে পড়লে গণতান্ত্রিক শাসন জাতির জন্যে যতটা ফলপ্রসূ ও কার্যকর হয় একনায়কতন্ত্রী ব্যবস্থায় তার চেয়ে কম হয় না। বললে কেমন শোনাবে জানি না, তবু মনে হয় কেবল স্বৈরতন্ত্রী শাসন নয়, অনেক সময় গণতান্ত্রিক শাসনেরও সর্বোচ্চ ফসল ফলে এর পক্ষে কোনোভাবে একনায়কতন্ত্রী হয়ে ওঠা সম্ভব হলে।
আমার এই বক্তব্যের সমর্থনে বার্ট্রান্ড রাসেলের একটা চুক্তি তুলে ধরি। একটি প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন: “শ্রেষ্ঠ গণতন্ত্রী তিনিই যিনি ক্ষমতায় যান গণতান্ত্রিক উপায়ে, কিন্তু এক পর্যায়ে সেই গণতন্ত্রের বিলুপ্তি ঘটাতে সমর্থ হন।” (The best democrat is he who is elected democratically but in the end is able to abloish it.) এর অর্থ শ্রেষ্ঠ গণতন্ত্রী সেই ব্যক্তি যিনি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ভেতর থেকে বিকশিত হলেও প্রতিভা ও অসাধারণত্বের মহিমায় এমনই ভাস্কর হয়ে ওঠেন যে পুরো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাটাই তার দূরদৃষ্টি ও বিচক্ষণতার হাতে নিজেকে সঁপে দিয়ে নিরাপদ বোধ করে এবং নিজের দুর্লভ যোগ্যতার কারণে গোটা দলের উদ্বেলিত সমর্থন পেয়ে কিছুটা একচ্ছত্র ক্ষমতায় রাষ্ট্রশাসন করেন। এ ধরনের রাষ্ট্রনায়ক অনেকটা একনায়কতন্ত্রীদের আদরে দেশ চালালেও এদের হাতে দেশ নিরাপদ বা বিপন্ন হয় না। বরং এদের নেতৃত্বের যুগেই দেশের অবিশ্বাস্য উন্নতি হতে দেখা যায়। তাদের এই স্বৈরাচার আসলে উদারমনা মহৎপ্রাণ দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ও অসাধারণ রাষ্ট্রনায়কদের জনপ্রিয় স্বৈরাচার। এই স্বৈরাচারের ভিত্তি এদের দুর্লভ ব্যক্তিত্ব ও প্রজ্ঞা তাদের অসামান্যতা, দূরদৃষ্টি এবং জীবন ও রাষ্ট্র ব্যাপারে গভীর ও সমুন্নত অন্তদৃষ্টি। এদের ব্যক্তিত্বের দুর্লভ উদ্ভাসের সামনে অন্যদের অভিভূত আত্মসমর্পণই তাদের এই স্বৈরতন্ত্রের ভিত্তি, কোনো দমন বা নির্যাতনমূলক প্রক্রিয়া নয়। পেরিক্লিস বা জওহরলাল নেহেরু এই ধারার স্বৈরাচারী। কিন্তু স্বৈরাচারীদের যদি এ ধরনের ব্যক্তিগত মহত্ত্ব না থাকে, তারা যদি খুবই সাধারণ মাপের মানুষ হওয়া সত্বেও সংবিধানের বিধান বা অন্য কোনো উপায়ে স্বৈরাচারের কর্তৃত্ব পেয়ে যান তখন স্বৈরাচার জাতির জন্যে হয়ে ওঠে দুর্দৈবের কাল। আমাদের দেশে সংবিধান সমর্থিত একনায়কতন্ত্র এমনি এক বিপর্যয়ের জন্ম দিয়েছে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বদলে আমাদের শাসকরা পারিবারিক সূত্র থেকে উঠে আসছেন বলে রাজনীতির শীর্ষে আমরা শ্রেষ্ঠ মানুষদের পাচ্ছি না। আশঙ্কা বাড়ছে এ জন্যে যে সাংবিধানিক সমর্থনের কারণে দেশে এই শাসনের দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে।
দুই স্বৈরতন্ত্র
৮...
আমাদের দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কারণে আজ রাজনৈতিক শাসকদের ক্ষমতায় আসতে হচ্ছে ভোটের মাধ্যমে অর্থাৎ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়। কাজেই ক্ষমতায় থাকার দিনগুলোতে জনগণের কল্যাণে ভাল কাজ করলে তারা হয়ত তাদের ভোটে পরের নির্বাচনে জিতে আসতে পারতেন। কিন্তু দুঃশাসনের ফলশ্রুতিতে তারা সে সম্ভাবনা হারিয়ে ফেলেন। ফলে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্যে জনসমর্থনের বদলে তাদের কেবলি বেছে নিতে হচ্ছে চক্রান্ত আর ষড়যন্ত্রের পথ। রাষ্ট্রকাঠামোকে টুকরো টুকরো করে, দলীয়করণের মাধ্যমে আমলাতন্ত্র, সামরিক বাহিনী থেকে শুরু করে শিক্ষাঙ্গন, বিচার বিভাগ, সাংবাদিকতা, চিকিৎসা বিভাগ, প্রকৌশল বিভাগের মতো সব পেশাগত শ্রেণীসহ গোটা জাতিকে পুরোপুরি বিভক্ত ও দ্বিখণ্ডিত করে সারাদেশে এমন এক সংঘাতপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন যে কোন সঙ্কটে দেশকে অভিভাবকত্ব দেবার বা উদ্ধার করার মতো সর্বজন গ্রহণযোগ্য মানুষ বা গোষ্ঠী এখন আর নেই। প্রায় সুনিশ্চিতভাবে আমরা এগিয়ে চলেছি এক নিষ্ঠুর অন্ধকার গৃহযুদ্ধের দিকে পরাক্রান্ত রাজনৈতিক সমাজ আজ প্রলোভন আর নির্যাতনের মুখে দেশের সুশীল সমাজকে গ্রাস করে ফেলেছে। দেশের শুভবুদ্ধি বিবেক বা ন্যায়নীতি সংকীর্ণ হীন রাজনীতির আক্রমণের সামনে মুখ থুবড়ে মাটিতে পড়ে আছে।
কোন দেশে যখন স্বৈরাচার চালু থাকে তখন সেখানে একজন ব্যক্তি বা একটি মাত্র দল বা সংস্থার স্বৈরাচারই প্রতিষ্ঠিত থাকে। যেমন আইয়ুব, ইয়াহিয়া বা এরশাদের স্বৈরাচার। রাজতন্ত্রও এমনি একটি স্বৈরাচারী প্রক্রিয়া। রাজা সেখান এককভাবে দেশ শাসন করেন। তাই রাজতন্ত্রেও রাজা থাকে একজন। এসব জায়গায় অন্য রাজা বা স্বৈরাচারীকে আসতে হলে প্রাক্তন শাসক বা রাজার উচ্ছেদ ঘটিয়েই আসতে হয়। একসঙ্গে দুই শাসক বা দুই রাজার জায়গা কোথাও নেই। কিন্তু গণতন্ত্র জনগণের ভোটে নির্বাচিত রাজনৈতিক প্রক্রিয়া বলে কোন একক ব্যক্তি বা একক দলের নিরঙ্কুশ ও অব্যাহত শাসন সেখানে সম্ভব নয়। তাই গণতন্ত্র যদি কখনও স্বৈরাচারী হয়ে পড়ে সেখানে স্বৈরাচারের একটা ভিন্ন চেহারা দেখতে পাওয়া যায় যা সামরিক বা অন্যান্য স্বৈরাচার থেকে খুবই আলাদা। আমাদের গণতন্ত্রে সরকারগুলো জনগণের ভোটে নির্বাচিত হচ্ছে বলে এবং জনগণ একই দলকে নিজ স্বার্থে বারবার ক্ষমতায় আনার নির্বুদ্ধিতা দেখাচ্ছে না বলে দেশে স্বৈরাচার একটি থাকতে পারেনি, দেশের দু’টি প্রধান দলের ক্ষমতার হাতবদলের কারণে স্বৈরাচার হয়ে গেছে দু’টি। এই দু’টি স্বৈরাচারই আজ আমাদের গণতন্ত্র ও জাতির জন্যে হয়ে দাঁড়িয়েছে সবচেয়ে আত্মঘাতী ঘটনা। কেন তা এমন আত্মধ্বংসী হল তা নিয়ে এখানে দু’চারটি কথা বলে নিতে চাই।
৯...
আগেই বলেছি কোন দেশে স্বৈরাচার থাকলে তা সবসময় খারাপ হবে এমন কোন কথা নেই। কিন্তু স্বৈরাচার একটি না হয়ে দু’টি হলে তা একটি বড় ধরনের বিপদের জন্ম দিয়ে বসে। এর মূল কারণ স্বৈরাচার যে ধরনেরই হোক, তার মূল প্রবণতা রাষ্ট্রে তার সার্বভৌম কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। সাধারণভাবে স্বৈরাচার তা করেও থাকে। আমাদের দেশেও স্বৈরাচার দু’টি হওয়ায় আজ প্রত্যেকটি স্বৈরাচারই চেষ্টা করছে অন্যটিকে নিশ্চিহ্ন করে নিজের অবস্থান নিষ্কণ্টক করতে অর্থাৎ তার একচ্ছত্র স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠা করতে এর ফলে কী ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে প্রথমে সে আলোচনায় যাওয়া যেতে পারে।
আগেই বলেছি, একনায়কতন্ত্র নানা চেহারায় বহু দেশেই থাকে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাতেও থাকে। কিন্তু আমাদের গণতান্ত্রিক একনায়কতন্ত্র সেগুলো থেকে ব্যতিক্রমী কেবল নয়, খুবই ভিন্নস্বভাবী।
আলোচনার শুরুতে গণতন্ত্রের একটা মৌলিক বৈশিষ্ট্যের কথা স্মরণ করাতে চাই। রাজতন্ত্র, সামরিক একনায়কতন্ত্র বা অন্যসব স্বৈরতন্ত্রের সঙ্গে গণতন্ত্রের একটা মৌলিক পার্থক্য আছে। একনায়কতন্ত্র মনে করে একাই আমি সব পারি। দেশ শাসনের জন্যে আমার অন্য কাউকে দরকার নেই। তাই একনায়কতন্ত্র বিরুদ্ধ দলের অস্তিত্ব স্বীকার করে না। সমস্ত বিরোধীতাকে স্টিমরোলারে পিষে নিজের নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে সে নিশ্চিন্ত হতে চায়। কিন্তু গণতন্ত্র তা নয়। রাষ্ট্রের সমস্যা ও জনকল্যাণের ব্যাপারে গণতন্ত্র একনায়কতন্ত্রের তুলনায় অনেক বেশি শ্রদ্ধাশীল সহাবস্থানমূলক ও সুসংস্কৃত। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ক্ষমতাসীন দল মনে করে রাষ্ট্রের জটিল বিশাল অন্তহীন সমস্যার পুরোপুরি সমাধান একা তার পক্ষে সম্ভব নয়। এ করতে দেশের সব মানুষকে তার নিজের সঙ্গে নিতে হবে। এসব ভাবনার কারণে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিরোধী দল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে বিরোধী দলের প্রধান কেবলমাত্র একজন সাংসদ নন, রাষ্ট্রীয়ভাবে তিনি একজন অত্যন্ত মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি, তার দলের সাংসদরা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য হিসেবে এবং বিভিন্ন জাতীয় কমিটি ও কার্যক্রমে সম্পৃক্ত থেকে ক্ষমতাসীন দলকে সমর্থন ও অসমর্থন দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় সহযোগিতা করে।
এ জন্যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা একটি বহুদলীয় ব্যবস্থা। এই বহুদলীয়তা গণতন্ত্রের প্রাণ নয় কেবল, এর সৌন্দর্য ও শ্রেষ্ঠত্ব। এর ফলে দেশের ভাগ্য নির্ধারণে প্রতিনিধি নির্বাচনের ভেতর দিয়ে জাতির প্রতিটি মানুষের অংশগ্রহণ এতে নিশ্চিত হয়। দেশের প্রতিটি দল, মত ও দৃষ্টিভঙ্গিকে এই পদ্ধতি স্বীকৃতি দেয় বলে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে এক হয়ে কাজ করতে কারও কোথাও বাধে না। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা তাই একটি বন্ধুত্ব ও সহাবস্থানমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থা। এখানে পার্লামেন্টে জাতীয় রাজনীতির শত্রুরা পাশাপাশি বসে সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে গালগল্প বা রসরসিকতা করে দেশ শাসন করে। সাংসদরা এখানে স্বাধীন ও বিবেকপ্রসূত বক্তব্য এবং ভোট দেবার অধিকারী বলে দলীয় কোন্দল বা সহিংসতার অবকাশ এখানে কম। ফলে গণতন্ত্রের পুরো প্রক্রিয়াটা চলে আয়েসি মেজাজে, ঢিলেঢালা বা স্বচ্ছন্দ চালে। এতে দলীয় কোন্দলের চেয়ে বিবেকবোধ ও জনগণের কল্যাণ প্রাধান্য পায় বেশি।
কিন্তু সাংবিধানিক অনুমোদনের কারণে আমাদের দেশে দু’টি স্বৈরতন্ত্র জন্ম নেয়ায় ও দেশের জনগণ ঐ দু’টি প্রধান দলের ছত্রচ্ছায়ায় মোটামুটি সংঘবদ্ধ হওয়ায় এবং দলদু’টি, স্বৈরতন্ত্রের প্রকৃতিগত প্রবণতার পথ ধরে পরস্পরের উৎখাতে বদ্ধপরিকর হয়ে ওঠায় আমাদের গণতন্ত্র আজ হয়ে পড়েছে পুরোপুরি সংঘাতমূলক। এই সংঘাত বাড়তে বাড়তে এমন এক পর্যায়ে এসেছে যে দেশের গৃহযুদ্ধ প্রায় অনিবার্য হয়ে উঠেছে।
১০...
সামরিক স্বৈরাচার কোন ভাল জিনিশ নয়, কিন্তু গণতন্ত্র একনায়কতন্ত্রী হয়ে পড়লে যে অবস্থা হয় তা সামরিক স্বৈরতন্ত্রের চেয়েও খারাপ। সামরিক স্বৈরাচারের নিয়তি দুটো: হয় সে পূর্ণক্ষমতায় শাসন করবে। নয় বিলুপ্ত হবে। কিন্তু গণতন্ত্র স্বৈরাচারী হয়ে উঠলেও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার কারণেই, একটানা বেশিদিন থাকেও না, আবার একেবারে বিদায়ও না। বরং বড় দল, একটা স্বস্তিদায়ক বিরতির পর, আগের দুঃশাসনের রক্তাক্ত হাত মুছে উন্নত ও জ্যোতির্ময় চেহারা নিয়ে নতুনভাবে ফিরে আসে। অর্থাৎ হাত বদল করে স্বৈরাচার জাতির জীবনে চিরস্থায়ী হয়ে ওঠে। দ্বিতীয়ত সামরিক স্বৈরতন্ত্র শাসন করে গোটা জাতিকে। তার কোনো বিরোধী দল থাকে না। থাকলেও তা থাকে পাতানো খেলার মতো বা অনুগত দল হিসেবে। কিন্তু গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধে থাকে একটি শক্তিশালী বিরোধী দল। ফলে গণতন্ত্র স্বৈরতান্ত্রিক হতে চাইলে ক্ষমতাসীন দলকে নির্মূল করতে হয় তারই মতো সংবিধানসম্মত, শক্তিশালী ও বিপুল জনসমর্থনপুষ্ট একটি দলকে। গণতন্ত্রে ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে এমন বিশাল ও সংঘবদ্ধ একটি জনসমর্থনকে উচ্ছেদ করা সম্ভব নয় বলে এই নিশ্চিহ্নকরণ প্রক্রিয়া হয়ে ওঠে বিপজ্জনক ও এই সংঘাত দল ছেড়ে ক্রমে জাতীয় সংঘাতে রূপ নেয়।
পরপর তিনটি গণতান্ত্রিক সরকারের সময়ই আমরা দেখেছি, বিরোধী দল সংসদ বর্জন করেছে। অনেকেই ভেবেছেন তারা গোসা করে সংসদে যাওয়া ছেড়ে দিয়েছে। এই কিন্তু একেবারেই তা নয়। আসল কারণ প্রতিটি সরকারি দলই প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার ষড়যন্ত্র হিসেবে বিরোধী দলকে সংসদ থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। সংসদে কথা বলতে না দিয়ে, জনপ্রতিনিধিত্বের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে, হৃদয় ভেঙে দিয়ে, অসম্মান অপমানে ক্লিষ্ট করে তাদের বিতাড়িত করেছে। কেবল সংসদ থেকে নয়, রাস্তা থেকে, এমনকি তাদের বাড়িঘর থেকে তাড়িয়ে দিয়ে কার্যত পাঁচ বছরের জন্যে উদ্বাস্তু করে রেখেছে। এক কথায় ক্ষমতাসীন দল বিরোধী দলকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করে নিজস্ব স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে। প্রতিবাদ জানানোর, কথা বলার কোন পথই তারা খোলা রাখেনি। দু’টি দলই করেছে কাজটা। বিরোধীদের ওপর অত্যাচার প্রতিটি দল-প্রধান থেকে শুরু করে দুটো দলের নিম্নতম পর্যায়ের প্রতিটি কর্মী বা সমর্থকদের পর্যন্ত আক্রান্ত ও রক্তাক্ত করেছে। ফলে দুই দলে জখমির সংখ্যা ক্রমাগত বেড়েছে। এ সংখ্যা দু’টি দলের প্রতিটি মানুষকে যেমন প্রতিশোধপরায়ণ ও সহিংস করে তুলছে তেমনি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত প্রতিটি মানুষকে ক্রমাগতভাবে নিরাপত্তাহীনতার ভেতর ঠেলে দিয়েছে। রাজনীতিকের পরিচয় এখন প্রতিটি রাজনৈতিক কর্মীর জন্যে হয়ে উঠেছে ঝুঁকি ও আশঙ্কার বিষয়।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা একনায়কতন্ত্রী হওয়ার প্রধান বিপত্তি হল যারা নির্বাচনে পরাজিত হচ্ছে তারা পুরো নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। এই ব্যাপারটাই আজকের রাজনৈতিক অঙ্গনের সবচেয়ে ভয়াবহ সঙ্কট। আজ তাই নির্বাচনে সবার একমাত্র কাম্য বিজয়। এ অকারণ নয়। কেননা বিজয় মানে রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর প্রশ্নহীন ও সর্বময় কর্তৃত্ব, জাতির ক্ষমতা আর সম্পদের ওপর নিরঙ্কুশ অধিকার। পাশাপাশি পরাজয় মানেই নিশ্চিহ্ন হওয়া। কাজেই যেভাবেই হোক, দেশের ধ্বংসের বিনিময়ে হলেও, শত লক্ষ লাশ পায়ে মাড়িয়ে হলেও, ক্ষমতায় যেতে হবে। এ ব্যাপারে ছাড়ের অবকাশ নেই। তাহলে বাঁচা যাবে না, অস্তিত্ব থাকবে না, উৎখাত হতে হবে। এত বড় ঝুঁকি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে কী করে সুস্থতা সম্ভব।
তাই রাজনীতি এখন এমন অসুস্থ। নির্বাচনে জয়ের জন্যে সবাই আজ হিংস্র আর মরিয়া। এ কারণেই আমাদের নির্বাচন আজ এত সংঘাতময়। জয় নিশ্চিত করার জন্যে রাষ্ট্রযন্ত্র ধ্বংস করা থেকে শুরু করে জঘন্যতম অন্যায় বা অপরাধ করতে কারো বিকার নেই। সবার শেষ কথা যেন একটাই: আমি জিততে না পারলে আসুক সামরিক শাসন। হোক জাতি শৃঙ্খলিত। তবু প্রতিপক্ষ যেন ক্ষমতায় না যায়। সামরিক শাসন এলেও আমি বাঁচব। কিন্তু প্রতিপক্ষ এলে থাকব না। এভাবে গণতন্ত্রের স্বৈরাচার গণতন্ত্রকে পুরো ধ্বংস করে দিয়েছে। দেশকে এ এমন সংঘাতময় পরিস্থিতিতে এনেছে যেখানে সামরিক বুটের নিচে পিষ্ঠ হওয়াকেও মুক্ত স্বাধীন বা গণতান্ত্রিক জীবনের চেয়ে নিরাপদ ও কাম্য মনে হচ্ছে। এ থেকেও বোঝা যায় নিজেদের সম্পূর্ণ অনিচ্ছাতে কী উদ্ধারহীন কাদার ভেতর আটকে গেছে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো- আর কী বিপাকে পড়েছে আমাদের গণতন্ত্র তথা রাজনীতি।
১১...
ক্ষমতাসীন হতে না পারলে বিরোধী দলের অবস্থা আজ যে কতখানি করুণ হয়ে ওঠে তার প্রমাণ পাওয়া যায় তাদের ডাকা হরতাল দেখে। ক্ষমতায় থাকার সময় দু’টি দলই অঙ্গীকার করে ভবিষ্যতে তারা কখনও হরতাল করবে না, কিন্তু দেখা যায় বিরোধী দলে গেলেই তারা লাগাতার হরতাল ডেকে দেশের জনজীবন তথা অর্থনীতির ধ্বংসযজ্ঞ শুরু করে। কেন প্রতিজ্ঞা ভাঙে? কেন জাতির বা তার নিজের ভবিষ্যতের জন্যে ক্ষতিকর জেনেও এ করে? উত্তর একটাই। প্রতিবাদ জানানোর আর কোন গণতন্ত্রসম্মত বা বৈধ পথ তাদের তখন থাকে না। সমস্ত ক্ষমতা বা মর্যাদা থেকে বিতাড়িত ও নিশ্চিহ্ন হওয়া একটি দল নিজের ওপর অনুষ্ঠিত অত্যাচারের প্রতিবাদ করতে গিয়ে মুমূর্ষু গলায় হরতালের একটা ক্ষীণ করুণ ডাক আকাশে রণিত করা ছাড়া কী-ই-বা আর সে করতে পারে। সে পুরোপুরি জানে এ দিয়ে ক্ষমতাসীন দলের কোন বাস্তব ক্ষতিই সে করতে পারবে না। রাস্তায় নামার সাহস নেই বলে হরতাল শেষ অব্দি হয়ত নিছক আহ্বান-সর্বস্ব একটা করুণ কাৎরানি হয়েই হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে, অফিস-আদালত কল-কারখানা সবই যথারীতি চলবে, কেবল ব্যক্তিগত ক্ষতির ভয়ে কিছু মানুষ যে দোকানপাঠ খুলবে না বা মহাসড়ক দিয়ে গাড়ি চলতে পারবে না এটুকু দেখেই হরতালকারীরা আপাতত আত্মসান্ত্বনা পাওয়ার চেষ্টা করবে।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিভিন্ন দলের মধ্যে যে সৌহার্দ্য ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বা শোভন আচরণ থাকার কথা তা এসব কারণেই আমাদের রাজনীতি থেকে আজ পুরোপুরি উধাও। সবাই জানেন আমাদের দু’দলের শীর্ষ দুই নেত্রীর মধ্যে বাক্যালাপ পর্যন্ত নেই। থাকলেও তেমন লাভ হত না। স্বৈরতান্ত্রিক অবস্থান ও সংঘাতের কারণে অচিরেই তা বন্ধ হয়ে যেত। ব্যাপারটা এখন শীর্ষ নেতাকর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ কর্মীতে এসে ঠেকেছে। দু’দলের কর্মী বা নেতাদের মধ্যে সুসম্পর্ক থাকাকে সন্দেহজনক দৃষ্টিতে দেখা হচ্ছে ও দলদ্রোহিতার অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। পরিবর্তে ঘৃণা, বিদ্বেষ, সহিংসতা ও প্রত্যাঘাত দু’দলের প্রতিটি সদস্যের প্রতিমুহূর্তের আচরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ যে কতখানি সহিংসরূপ নিয়েছে তা বোঝা যায় একটি পরিচিত টিভি চ্যানেলে জনপ্রিয় একটি টকশো দেখলে! এটা একটা ঝগড়ার অনুষ্ঠান। ঝগড়া দেখলে মানুষ এক ধরনের স্থূল ও বিকৃত মজা পায়, এতে অকর্ষিত জনতার কাছে অনুষ্ঠান জনপ্রিয় হয়, ফলে বিজ্ঞাপন ও আয় বাড়ে। মূলত এ কারণেই চ্যানেলটি অনুষ্ঠানটিকে দীর্ঘদিন ধরে চালিয়ে যাচ্ছে। বলাবাহুল্য অনুষ্ঠানটির জনপ্রিয়তা এখন তুঙ্গে। অনুষ্ঠানটায় দু’দলের একজন করে মন্ত্রী, সাংসদ বা নেতা মুখোমুখি বসে এমন অমার্জিত ভাষা এবং অকর্ষিত চেহারা নিয়ে পরস্পরকে আক্রমণ করতে থাকে যা প্রায় জাতীয় অসম্মানের প্রতীক। স্থূলতার রগরগে অশ্লীল লালার সঙ্গে দর্শকরা তা মজাদার চাটনির মতো উপভোগ করে। অনুষ্ঠানটিতে উপস্থাপকের দু’পাশে বসে থাকে দু’জন ক্ষিপ্ত জন্তুসুলভ মানুষ। তাদের ভয়ঙ্কর চোখমুখ আর মারমুখো চেহারা দেখলে বোঝা যায় অনুষ্ঠানের মধ্যেই হয়ত হাতাহাতি তারা শুরু করত, কেবল মাঝখানে একটা জল-অচল বৈদ্যুতিক বাধা থাকায় এ যাত্রা তেমন কিছু হল না। এ দৃশ্যের ব্যতিক্রম হয় খুবই কমই। তাদের কথা শুনে মনে হবে তাদের নিজ নিজ দল যা করছে তাই শ্রেষ্ঠ। অন্যদল যা করছে সবই দুর্নীতি, সন্ত্রাস আর জঘন্য অপরাধ। কে বিরোধী পক্ষকে কতখানি দলীয় ও ব্যক্তিগতভাবে জখম করতে পারছে তার ওপর নির্ভর করছে দলের ভেতর ঐ নেতা বা কর্মীর উন্নতি। এ ঘটছে জাতীয় রাজনীতির সবখানে, ঐ অনুষ্ঠানে আমরা তার প্রতীকী রূপটি দেখছি মাত্র। সন্ত্রাসীরা, খুনিরা, আক্রমণকারী ঘাতক ও কালো টাকার মালিকরা ক্রমাগত দলের মধ্যে প্রাধান্য বিস্তার করেছে।
বিরুদ্ধ দলের মধ্যে ভাল কিছু দেখা বা নিজের দলের মধ্যে বিন্দুপরিমাণ খারাপ খুঁজে পাওয়া দুটোই এখন পুরোপুরি নিষিদ্ধ। এ করলে নিজ দল থেকে পত্রপাঠ বিদায় নিতে হয়। তাই সত্যভাষণ বা বিবেকের কাছে দায়বদ্ধতা দুটো দল থেকেই বিদায় নিয়েছে। রাজনীতি পুরোপুরি বিভক্ত হয়ে গেছে শাদা আর কালোয়। সত্য যে একটা ধূসর এলাকা, শাদা কালো মেশানো এ দুয়ের মাঝামাঝি জিনিস তা যেন কেউ শোনেও নি কখনও। বিবেক ন্যায় বা শুভবুদ্ধির কথা শোনার মানুষ রাজনীতিতে এখন আর নেই। যারা এসব তুলতে চাচ্ছে তারা আক্রান্ত ও বিতাড়িত হচ্ছে।
১২...
দুটি স্বৈরতন্ত্রের প্রত্যেককে বিরুদ্ধ পক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টায় ও বিরুদ্ধ পক্ষের হাতে নিজের নিশ্চিহ্ন হওয়া ঠেকাতে এমন নিষ্ঠুরভাবে ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে যে দল দু’টিকেই নিজ দলের স্বৈরাচারকে নিñিদ্র ও নির্মম করে তুলতে হচ্ছে। এর একটি কুফল হল দলের ভেতরকার গণতন্ত্রের বিলুপ্তি। প্রতিটি দলেই ঘটেছে এটা। দলগুলো এখন চলেছে দল প্রধানের পুরোপুরি নিজস্ব ইচ্ছায়। দলের গঠনতন্ত্রও তৈরি হয়েছে সম্পূর্ণ তার অনুকূলে, দলের কর্মী বা নেতাদের চাওয়া-পাওয়াকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে। গঠনতন্ত্রে গণতান্ত্রিক কিছু থাকলেও দলের প্রধান ও শীর্ষ ব্যক্তিদের আচরণে তা প্রত্যাখ্যাত। দলের বার্ষিক কাউন্সিল হবে কী হবে না, হলে ক’বছর পরে, সেখানে কে কতখানি বলবে বা কার কথা শোনা হবে না হবে তা নিরঙ্কুশভাবে দল-প্রধানের। সে সভায় (যদি সভা আদৌ হয়) যা কিছু কথাবার্তা তার সবই তার গুণগান, এবং সব বিষয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই দল প্রধানের একক ইচ্ছার হাতে সমর্পিত। জাতীয় সংসদের যাবতীয় মনোনয়ন চলছে দল-প্রধানের ইচ্ছায়, প্রার্থীদের টাকার বিনিময়ে কিনতে হচ্ছে মনোনয়ন, ফলে দেদারসে জমে উঠেছে রমরমা মনোনয়ন বাণিজ্য, সেখানে তৃণমূল নেতাকর্মীদের পছন্দ-অপছন্দ, মতামত বা গণতান্ত্রিক অধিকার পুরোপুরি উপেক্ষিত হচ্ছে।
বাংলাদেশের খোদ সংবিধানই যদি দল প্রধানের এই সর্বময় কর্তৃত্ব নিশ্চিত করে থাকে তবে কেনই বা তারা এই ক্ষমতা স্বেচ্ছাখুশিতে ব্যবহার করবেন না। কেন দলের ভেতর গণতন্ত্র দিয়ে নিজের কর্তৃত্বের সমস্যা বাড়াবেন।
১৩...
এই পরিস্থিতির কারণে দলগুলোর আদর্শিক অবস্থান পুরো ভেঙে পড়েছে। নির্বাচন-জয়ের মরিয়া চেষ্টায় দলগুলো দলীয় চেতনা বা আদর্শের সম্পূর্ণ বিরুদ্ধবাদী শক্তির সঙ্গেও মোর্চা করতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে রাজনীতি পরিণিত হচ্ছে নিখাদ ক্ষমতা ও স্বার্থের দ্বন্দ্বে। জয়ের লিপ্সা আর পরাজয়ের আতঙ্ক দলের ভেতরকার ন্যায়নীতি, আদর্শ ও গণতান্ত্রিক চেতনাকে চুরমার করে দিয়েছে। নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হওয়ায় কালো টাকা আজ নির্বাচন মাঠের ঈশ্বরে পরিণত হয়েছে। জয় নিশ্চিত করার জন্যে তাই কেবল বিরোধী আদর্শের সঙ্গেই যে দলগুলো হাত মেলাচ্ছে তাই নয়, দলের ভেতরকার দুর্বৃত্ত আর কালো টাকার মালিকদেরও নির্বিকারে প্রাধান্য দিয়ে চলেছে। দলের পরীক্ষিত ও আত্মোৎসর্গিত সদস্যদের বদলে অবৈধ টাকার মালিক এবং জনগণ প্রত্যাখ্যাত ব্যক্তিরাই সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন পেয়ে যাচ্ছেন। ফলে দলের ভেতরকার সৎ ও আত্মোৎসর্গিত নেতাকর্মীরা তাদের ভেঙে যাওয়া হৃদয়ের সাথে নিঃশব্দে দল থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে জাতীয় সংসদের ভেতর শুভশক্তির বিলুপ্তি ঘটেছে এবং স্থূল ও দাঁতাল পশুশক্তি জাতির কর্তৃত্ব দখল করছে।
মনে রাখতে হবে আমাদের জাতির কোনদিন নিজস্ব রাষ্ট্র ছিল না। আমরা একটি রাষ্ট্রের অভিজ্ঞতাহীন জাতি। নিজেদের ভাগ্য নির্মাণের অধিকার আমরা কখনও পাইনি। আমরা এমন এক যুগসন্ধিতে আজ দাঁড়িয়ে আছি যখন আমরা নিজেদের একটি রাষ্ট্র পেয়েছি কিন্তু তার যোগ্য কাঠামো গড়ে তুলতে পারিনি। আমার এই লেখা সেই শূন্য সময়ের গল্প। ধীরে ধীরে আমাদের রাষ্ট্রের কাঠামো গড়ে উঠলে, এর অঙ্গগুলো সুপরিণতি পেয়ে শক্তপোক্ত হলে এই নৈরাজ্য প্রকৃতির নিয়মেই কমতে থাকবে।
১৪...
আজ প্রতিটি দলের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন ও আত্মোৎসর্গিত নেতাকর্মীদের সঙ্গে সারা জাতি যদি সমবেত হয়ে সংবিধান পরিবর্তনের মাধ্যমে দলের ভেতর দল প্রধানের নিরঙ্কুশ কর্তৃত্বের অবসান না ঘটায় তবে জাতীয় জীবনে গণতন্ত্রের বিকাশের পরিবর্তে তার পুরো বিলুপ্তি ঘটবে এবং দুই স্বৈরনায়কের নেতৃত্বে জাতি অচিরেই সংঘাতের ভেতর বিধ্বস্ত হবে। আমাদের দেশের দলগুলোর কর্মী ও নেতারা যদি একনায়ক বা রাজার অধীনস্থ রাজনীতিবিদ হতেন তবে এই আক্রোশ ও হতাশা তাদের জন্যে এমন অসহনীয় হতো না। কারণ অধীনতার দাসখত দিয়েই তারা তখন রাজনীতিতে আসতেন। কিন্তু স্বাধীন সত্তাসম্পন্ন গণতান্ত্রিক নেতার পক্ষে এই দাসত্ব দুর্বিষহ। কেবল রাজনীতিবেদরা নয়, গোটা জাতি আজ মূলত দুটি দলনায়কের হাতে জিম্মি। দেশের প্রধান দুর্দৈব হিসেবে সবাই আজ নাম ধরে তাদের চিহ্নিত করছে। তাদের অপশাসনের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগতভাবে প্রতিমুহূর্তে বিদ্বেষ প্রকাশ করছে, কিন্তু কিছুই করতে পারছে না। বুঝতেও পারছে না ব্যাপারটা দুজন বা চারজন মানুষের ব্যক্তিগত ষড়যন্ত্রের ফলে ঘটছে না, ঘটছে সংবিধানের ধারাটির কারণে। এ থেকেও বোঝা যায় জাতির ভাগ্যের ক্ষেত্রে সংবিধান কত বড় জিনিশ, একটা ছোট্ট অনুচ্ছেদ কীভাবে জাতির অগ্রযাত্রাকে পুরো রুখে দিয়ে তাকে খাদের মধ্যে ফেলে দিতে পারে। এই অনুচ্ছেদের মাধ্যমে আমরা গণতন্ত্রের নামে কার্যত বংশগত রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছি। ইলিয়ড মহাকাব্যে হেলেনের অপহরণকারী রাজপুত্র প্যারিস গোটা ট্রোজান জাতিকে যে দুঃস্বপ্নের মধ্যে ফেলেছিল, এই অনুচ্ছেদও যেন আজ আমাদের জাতির জীবনকে প্রায় তাই করছে। সংবিধান একটা জাতির জীবনে হালের মতো। হাল একটু এদিক ওদিক বেঁকে গেলে যেমন বহু লোক একসঙ্গে দাঁড় টেনেও নৌকার গতি ফেরাতে পারে না, তেমনি সংবিধানের কোথাও বড় ধরনের ত্রুটি থাকলেও জাতির বিপর্যয় ঠেকানো দুরূহ হয়। কাজেই দরকার সংবিধানকে ঠিক পথে নিয়ে আসা। লাইনচ্যুত ট্রেনকে আবার লাইনের ওপর দাঁড় করানো।
১৫...
দুই স্বৈরাচারের ফলে দেশের সবচেয়ে বড় যে ক্ষতিটি হয়েছে তা হল গোটা জাতিকে এ পুরোপুরি দ্বিখণ্ডিত করে ফেলেছে। এদের এই অনিচ্ছাকৃত সংঘাত আমাদের দরিদ্র দেশটির সমৃদ্ধি ব্যাহত করে, গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে নিজেদের অন্ধকার কবর খোঁড়ার দিকে এগিয়ে নিচ্ছে। বছর পঁচিশ তিরিশ আগে রাশিয়া থেকে প্রকাশিত শিশুদের একটি সচিত্র গল্পের বই দেখেছিলাম। বইটি দুটি বেড়ালের ঝগড়া নিয়ে। বইটির শুরুতে আছে সকাল বেলার ছবি। দুটো শাদা লোমওয়ালা হৃষ্টপুষ্ট বেড়াল কিছু একটা নিয়ে মারামারি শুরু করেছে। পরের ছবিটি সন্ধ্যার। সারাদিন মারামরি করার পরের দৃশ্য। তাতে দেখা যাচ্ছে দু’জনের গোটা শরীর রক্তাক্ত, ছিন্নভিন্ন। আগাগোড়া শরীর পুরু ব্যাণ্ডেজে বাঁধা। কেবল চোখ আর লেজদুটো অক্ষত। আজ আমাদের জাতির দিকে তাকিয়ে ঠিক ঐ ধরনের একটা আশঙ্কা হচ্ছে। মনে হচ্ছে ছিন্নভিন্ন অবস্থায় অমনি অবশিষ্ট একজোড়া চোখ আর লেজ নিয়ে জাতির রাজনীতির মতো আমরাও কি তাহলে শেষ হব! মহাভারতের যুদ্ধের কথা মনে পড়ে। কী দীর্ঘ শ্বাসরুদ্ধকর উদ্ধারহীন একটা যুদ্ধ। দু’পক্ষে কত মহা মহা যোদ্ধা, কত অযুত অক্ষৌহিণী (ডিভিশন) সৈন্য যুদ্ধ করল। কিন্তু যুদ্ধ শেষে পাণ্ডবেরা বিজয়ীর বেশে যখন জনশূন্য নিঃশব্দ হস্তিনাপুরের রাজপথে প্রবেশ করল তখন তাদের সঙ্গে মাত্র কয়েক হাজার সৈন্য। সবই যদি ধ্বংসের আগুনে ছাই হয়ে গেল তবে পৃথিবীকে ভোগ করবে কে?
আমি নিশ্চিত রাজনীতির দুটি পক্ষের কেউই এই অনভিপ্রেত পরিস্থিতি চান না। কেবল তারা কেন, ন্যূনতম মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষও এটা চাইতে পারে না। কিন্তু রোমান গ্ল্যাডিয়েটাররা যেমন রাজার খেয়ালি ইশারায় শুধুমাত্র জীবন বাঁচানোর তাগিদে বন্ধু হয়ে বন্ধুকে হত্যা করতে বাধ্য হতো, সংবিধানের এমনি ক্ষতিকর একটি ধারার জন্যে আজ তেমনি রাজনৈতিক দলগুলো একে অন্যকে নিশ্চিহ্ন করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। এই হিংস্রতা দল ছেড়ে এখন রাজনৈতিক নেতাকর্মী, সমর্থক এমনকি সাধারণ মানুষের মধ্যেও সংক্রমিত হয়েছে- যেসব রাজনৈতিক নেতাকর্মীর সম্পর্ক চার পাঁচ দশক ধরে ছিল উষ্ণ ও বন্ধুত্বপূর্ণ, যারা ছিলেন একটি বড় ও অভিন্ন রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য।
১৬...
সব দেশেই সাধারণ মানুষ চাকরি-বাকরি, অফিস-আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্যের মতো ব্যাপার-স্যাপার নিয়েই জীবন কাটায়। দেশের ভালোমন্দ দেখভালের দায়িত্ব তারা তুলে দেয় রাজনীতিবিদদের হাতে। সরকার পরিচালনার জন্যে ভোট দিয়ে জনগণ রাজনীতিবিদদের নির্বাচিত করে ছুটি নেয়। এটাই আধুনিক রাষ্ট্রের ধারা। কিন্তু ক্ষমতা নিরঙ্কুশ করতে ও অস্তিত্ব বিলুপ্তির ভয়ে দুটি পক্ষই আজ দেশের প্রতিটি মানুষকে রাজনীতির ভেতর জড়িয়ে ফেলতে বাধ্য হয়েছে। আজ দেশের প্রতিটি মানুষই তাই প্রায় রাজনীতিবিদ। জনগণ বলে এখন আর প্রায় কেউ নেই। ছাত্র, শিক্ষক, উকিল, সাংবাদিক, ডাক্তার, বিচারপতি সবাই রাজনৈতিক নেতা, রাজনৈতিক কর্মী। শিক্ষ এমনকি বিচারপতির চেহারার ভেতরও যেন জেগে উঠছে মাস্তান আর সন্ত্রাসীর ঘাতক মুখ। প্রতিটি মানুষ আজ যেন রাজনৈতিক মাস্তান। সুশীল সমাজও আজ পুরো রাজনৈতিক সমাজ। অবস্থা দেখে মনে হয় কিছুদিনের মধ্যে সদ্যোজাত শিশুরাও জিন্দাবাদ দিয়ে রাস্তায় বেরোবে।
গল্পটা খুব সম্ভব নাসিরুদ্দিন হোজ্জার। হোজ্জাকে একবার জিগ্যেস করা হয়েছিল, ‘সকালে ঘুম থেকে উঠে মানুষেরা কেন একেকজন একেকদিকে যায়। কেউ যায় ব্যবসা-বাণিজ্যে, কেউ চাকরিতে, কেউ অফিস-আদালতে, কেউ স্কুল-কলেজে।’ প্রশ্ন শুনে হোজ্জা হেসে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘সবাই একদিকে গেলে পৃথিবীটা কাত হয় যাবে যে।’ আমাদের দেশেও হয়েছে তাই। সবাই রাজনীতিবিদ হওয়ায় দেশটা আজ রাজনীতির দিকে কাত হয়ে গেছে। আজ মানুষের মুখে, প্রিন্ট-ইলেকট্রনিক মিডিয়ায়, রাস্তায়, গঞ্জে, হাটে-বাজারে একমাত্র আলোচ্য বিষয় রাজনীতি। আজ সেই মানুষই ভাগ্যহীন, যে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নয়। দুই দলের নেতৃত্বে দেশে আজ যে অবাধ লুণ্ঠন চলছে সে-ই আজ কেবল তার ভাগ থেকে বঞ্চিত।
দুই বৈরী স্বৈরতন্ত্রের কারণে গোটা দেশ দ্বিখণ্ডিত হয়ে পড়ায়, সমাজ, পরিবার, জনজীবন থেকে শুরু করে প্রতিটি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান আজ ভেঙে গিয়ে পরিণত হয়েছে দুটি প্রতিষ্ঠানে। সাংসদরা পারলে জাতীয় সংসদকেও হয়তো এতদিনে দুভাগ করে ফেলত; পারেনি কেবল সাংবিধানিক বাধার কারণে। জাতীয় জীবনের প্রতিটি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে ঘটছে এই ঘটনা। এগুলোর প্রত্যেকটি আজ দ্বিখণ্ডিত হয়ে দুটো আলাদা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। দেশ পরিণত হয়েছে দুটি দেশে। ফলে বিবেক ও জনস্বার্থের প্রতিনিধি সুশীল সমাজের কল্যাণধর্মী নেতৃত্ব এগুলো এসব প্রতিষ্ঠান থেকে বিদায় নিয়েছে এবং বিভক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর দুটো অংশই দুই মোর্চার অকর্ষিত রাজনৈতিক নেতাকর্মীর অবারিত চারণ ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। লুণ্ঠন আর স্বার্থলোলুপতা ছাড়া আজ আর কোনো আপাত লক্ষ্য এগুলোতে নেই। ছাত্র, শিক্ষক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, সাংবাদিক, আইনজীবী-এদের কারো সংগঠনই আজ একটি নয়, দুটি। দুটি যুদ্ধোন্মাত্ত রাজনৈতিক দলের মদদে এখন পরস্পরের বিনাশে এরা বদ্ধপরিকর। যে রাজনৈতিক দল রাষ্ট্র-ক্ষমতায় আসছে সেই দলের সমর্থকরা বিরুদ্ধপক্ষকে তাদের প্রতিষ্ঠান থেকে পুরোপুরি তাড়িয়ে গোটা প্রতিষ্ঠানটি দখল করে স্বৈরাচারী ধাঁচে সেটিকে লুণ্ঠন ও পরিচালনা করছে।
১৭...
এককথায় স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের স্বার্থে দেশের প্রতিটি সংগঠন আজ দলীয়করণের শিকার। এদের মধ্যে যে দলীয়করণটি জাতির জন্যে সবচেয়ে বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে তা হল আমলাতন্ত্রের দলীয়করণ বা দ্বিখণ্ডকরণ। রাজনৈতিক আদেশ নির্দেশে কাজ করলেও সংসদীয় রাজনীতিতে আমলাতন্ত্রের নিজস্ব একটি সার্বভৌম ও কল্যাণধর্মী ভূমিকা আছে। দেশের জনগণের কাছে তাদের যেমন আছে নৈতিক দায়বদ্ধতা তেমনি রাজনৈতিক নেতৃত্বকে জনকল্যাণের অনুকূলে পরামর্শ ও সহায়তা দেওয়াও তাদের কর্তব্য। তাছাড়া সংসদীয় গণতন্ত্রে যে কোনো মুহূর্তে সরকার বদল ঘটতে পারে বলে আমলাতন্ত্রের নিরপেক্ষতা এই পদ্ধতিতে হতে হয় নিরঙ্কুশ। বহুদিন ধরে এদেশের আমলাতন্ত্রের চরিত্র কার্যত ছিল নিরপেক্ষই। পাকিস্তানি আমল তো বটেই এমনকি বাংলাদেশ আমলের এরশাদের যুগ পর্যন্ত এ ছিল অনেকটাই তাই। কিন্তু গত দুই সরকারের আমলে ক্রমাগতভাবে আমলাতন্ত্রকে ভেঙে দ্বিখণ্ডিত করা হয়েছে। এ করা হয়েছে মূলত দুটো কারণে। প্রথম কারণটি নিয়ে আগে কিছু কথা বলে নিই।
আগেই বলেছি আমলাতন্ত্রের মাধ্যমে সরকার রাষ্ট্রযন্ত্র পরিচালনা করলেও এই ভূমিকার বাইরেও রাষ্ট্রের স্থিতিস্থাপকতার স্বার্থে আমলাতন্ত্রের একটা শুভত্বমুখী ভূমিকা থাকে। রাষ্ট্রের আইনকানুন ও নীতিমালা নিরপেক্ষভাবে সমুন্নত রাখা তার কর্তব্য। এই নিরপেক্ষতা ও ন্যায়নীতি সরকারের নির্বিচার দুরভিসন্ধি ও দুর্নীতিগ্রস্ত পদক্ষেপগুলোকে বাধাগ্রস্ত করে। তাই স্বৈরতন্ত্রকে নিñিদ্র করতে চাইলে আমলাতন্ত্রকে দলীয়করণ করা অনিবার্য হয়ে যায়। দেশের প্রতিটি মানুষের মতো আমারও সঙ্গতভাবেই কোনো না কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শ আছে। কিন্তু তা নিতান্তই তাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার। জনস্বার্থ, বিবেক বা পেশাগত আচরণে সেই মতাদর্শের কোনো ভূমিকা নেই। কিন্তু দলীয়করণ করতে গিয়ে ক্ষমতাসীন দল তার মতাদর্শের সমর্থক আমলাদের আজ দলীয় রাজনীতিবিদে পরিণত করেছে। প্রজাতন্ত্রের সেবককে পরিণত করা হয়েছে দলীয় ক্যাডারে। পেশাগত নৈতিকতা ও রাষ্ট্রীয় কল্যাণ বর্জনের পারিতোষিক হিসেবে চাকরি ক্ষেত্রে তাদের যে পুরস্কার দিতে হয়েছে তাতে আমলাতন্ত্রের কর্তৃত্ব-পারম্পর্য বিপন্ন হয়ে পড়েছে। নিজ দলের অযোগ্য আমলাদের পদোন্নতি দিয়ে উঠানো হযেছে বিপরীত মতাদর্শের যোগ্য আমলাদের ওপরে। অকারণে বঞ্চিত করা হয়েছে বহু যোগ্য মানুষকে। এর ফলাফল হয়েছে নির্মম। গোটা চাকরিজীবন জুড়ে যে অধস্তন কর্মকর্তা কোনো একজনকে স্যার বলে সম্বোধন করেছে আজ সেই অধনস্তকেই উল্টো তাকে স্যার বলে সম্বোধন করতে হচ্ছে। এই অবমাননা বহু কর্মকর্তার হৃদয়কে রক্তাপ্লুত করেছে। দু’দলের যে বিরাট সংখ্যক কর্মকর্তা এভাবে বিরুদ্ধ দলের সরাসরি আক্রমণের শিকার হচ্ছে তাদের মিলিত ঘৃণা আর প্রতিরোধ দু’দলকে আত্মধ্বংসী সংঘাতে জড়িয়ে ফেলেছে এককালের বন্ধু, প্রিয়, শ্রদ্ধেয় ও স্নেহাস্পদেরা স্বৈরাচারের স্বার্থোদ্ধারের গুঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আজ পরস্পরের বিনাশে উদ্যত। অথচ গোটা চাকরিজীবন ধরে তারা বাস করেছে সৌহার্দ্য ও প্রীতিপূর্ণ পরিবেশে। ফলে যুগ যুগ ধরে আমলাতন্ত্রের ভেতর শ্রেয়বোধ ও নিরপেক্ষতার যে উচ্চ ঐতিহ্য গড়ে উঠেছিল তা লুপ্ত হয়েছে এবং নৈরাজ্যের ভেতর আমলাতন্ত্র মুখ থুবড়ে পড়েছে।
আগেই বলেছি আমলাতন্ত্রের দলীয়করণ বা দ্বিখণ্ডিতকরণের সবচেয়ে বড় কারণ পরবর্তী নির্বাচনে দলের বিজয় নিশ্চিত করা। অর্থাৎ স্বৈরতন্ত্রকে দুটি থেকে স্থায়ীভাবে একটিতে নামিয়ে আনা। এটা করতে গিয়ে আমলাতন্ত্রের কর্তৃত্ব-পারম্পর্যকে পুরো লন্ডভন্ড করে ফেলতেও দ্বিধা করা হয়নি ও নিজ দলের সমর্থকদের এমনভাবে ওপরে তোলা হয়েছে যাতে তারা গোপন ষড়যন্ত্রের পথে বিজয় নিশ্চিত করতে পারে। কেবল আমলাতন্ত্র নয়, গোটা রাষ্ট্রযন্ত্রটাকেই এভাবে দ্বিখণ্ডিত করা হয়েছে।
গণতন্ত্রের প্রাণ নির্বাচন এবং নির্বাচনের প্রাণ নির্বাচন কমিশন। এই নির্বাচন কমিশনকে পূর্ণ স্বাধীনতা তো দেওয়া হয়ই না, বরং তাকে পুরো দলীয়করণ করে নির্বাচনে বিজয় নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচন সুষ্ঠু না হওয়া গণতন্ত্র হত্যারই শামিল। এতে নির্বাচিত সরকার জনচক্ষে কার্যত অবৈধ হয়ে যায়। এ অবস্থায় ক্ষুব্ধ পরাজিতদের সহিংস প্রতিরোধের মুখে গৃহযুদ্ধ, সামরিক শক্তি কিংবা অন্য কোনো অকর্ষিত ক্ষমতাগোষ্ঠীর উত্থান ঘটে গণতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
নির্বাচন কমিশনের মতো বিচার বিভাগকে দলীয়করণ করে বিচারের নিরপেক্ষতার ঐতিহ্যকে যেমন নষ্ট করা হয়েছে তেমনি পাবলিক সার্ভিস কমিশনকে দলীয়করণ করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর নিজ নিজ দলের কর্তৃত্বকে নিñিন্দ্র করা হয়েছে। দেশের পেশাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে শুরু করে তাবৎ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চাকুরেদের নিয়োগ, পদোন্নতি ও সুযোগ সুবিধার ক্ষেত্রে চলেছে এই বৈষম্য।
১৯৯০ সালের শেষ দিকে এরশাদ বিরোধী আন্দোলন যখন তুঙ্গে, আমার বড় মেয়ে তখন একদিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিরে খানিকটা দার্শনিকসুলভ ভঙ্গিতে বলল, ‘এরশাদ, দেখো আর বেশিদিন ক্ষমতায় থাকবে না।’
শুনে অবাক লাগল। এমন মহাশক্তিধর এরশাদ ক্ষমতা থেকে পড়ে যাবে? কী করে এ কথা বিশ্বাস করা যায়?
বললাম, কীভাবে বুঝলে? ও বলল, স্কুলের ছেলেমেয়েদের একদমই বাড়ি-ঘরে ধরে রাখা যাচ্ছে না। সুযোগ পেলেই পালিয়ে মিছিলে চলে যাচ্ছে। শুনে মনে হলো, তাই তো। খেয়ালই তো হয়নি। বড়রা, বয়স্করা, সজাগ সচেতন মানুষ। তারা মিছিল বা মিটিংয়ে যেতেই পারে। কিন্তু স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়েদের যাওয়া খুবই আলাদা ব্যাপার। তারাও যখন জড়িয়ে পড়ছে তখন বুঝতে হবে ব্যাপারটা জাতীয় আবেগে পরিণত হয়েছে; দেশের সবচেয়ে সচেতন মানুষটি থেকে সবচেয়ে অবোধ মানুষটি কেউ-ই এই আন্দোলনের বাইরে নেই।
মনে পড়ল এর একুশ বছর আগে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে ঠিক একই দৃশ্য আমরা দেখেছিলাম। বড়দের পাহারা এড়িয়ে কিশোর-তরুণরা এভাবেই পালিয়ে যেত রাস্তায়। ফলে লৌহমানব আইয়ুবের পতন ঘটে গিয়েছিল।
১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী গণঅভ্যুত্থানের কথা এখনও চোখের সামনে ভাসে। কী তোলপাড় সবার মধ্যে! ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ দাবিতে রাজপথে বাঁধভাঙা মানুষের কী স্বতঃস্ফূর্ত জোয়ার! মুক্তির জন্যে গণমানুষের ভেতর এ ধরনের উন্মাদনা একটা জাতির জীবনে রোজ ঘটে না।
এরশাদের পতনে আমরা ভেবেছিলাম চিরদিনের জন্যে স্বৈরতন্ত্র বিদায় নিল। মুক্ত হল গণতন্ত্র। এবার উদার আবহাওয়ায় প্রাণখুলে গণতন্ত্রের চর্চা হবে। কিন্তু গত পনেরো বছরের গণতন্ত্রের চেহারা দেখে সে ভুল আমাদের ভেঙেছে। আমরা ধীরে ধীরে টের পেয়েছি স্বৈরশাসনের হাত থেকে মুক্তি পাবার বদলে আমরা গভীরতর স্বৈরাচারের হাতে বন্দি হয়েছি। পার্থক্য এই: আগে আমরা বন্দি ছিলাম সামরিক স্বৈরতন্ত্রের হাতে, এখন গণতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্রের হাতে। যখন যে দল এদেশে ক্ষমতায় আসছে সে দল দেশ শাসন করে চলছে নিরঙ্কুশ স্বৈরাচারীর আদলে, সবরকম গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে। ফলে গণতন্ত্রের নামে একটা নিষ্ঠুর অকর্ষিত রাজনৈতিক ব্যবস্থা আজ এ দেশে জেঁকে বসে গেছে।
২...
শাসকের ব্যক্তিত্বের অসাধারণত্ব উদ্ভাসের কারণে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় যদি স্বৈরতন্ত্রের রঙ লাগে তাতে অধিকাংশ সময় ক্ষতির চেয়ে লাভই বরং বেশি, কেননা রাষ্ট্রকে তখন শাসন করে শ্রেষ্ঠ মানুষেরা। কিন্তু এই স্বৈরশাসন যদি শাসকের যোগ্যতার থেকে উ™ভূত না হয়ে উ™ভূত হয় অন্য কোনো উৎস থেকে, কোনো অনভিপ্রেত বিধান বা ক্ষতিকর সাংবিধানিক অনুমোদনের কারণে তবে তা জল্লাদের মতো জাতির বুকে বসে তার রক্তপান করতে থাকে। জাতিকে তা তখন এমন এক দুরপনেয় সংকট ও সংঘাতের মধ্যে ঠেলে দেয় যা থেকে জনগণ ও রাজনীতিকে উদ্ধার করা খুবই কঠিন হয়ে পড়ে। প্রথমে এই সংকটের মূল কারণটি নিয়ে আলোচনা করতে চাই:
এরশাদের বিদায়ের পর আমরা যা পেয়েছি তা গণতন্ত্র তো নয়ই, বরং প্রায় এর উল্টো। জাতি ইতিমধ্যেই এর নাম দিয়েছে পুরুষানুক্রমিক রাজতন্ত্র। এ এমন এক রাজনৈতিক পরিস্থিতি যেখানে গণতন্ত্র পুরোপুরি গণবিচ্ছিন্ন ও জাতীয় সমৃদ্ধির প্রধানতম প্রতিবন্ধক, জনগণের সুখ-সম্ভাবনা ভালোমন্দ রাজনীতিতে প্রায় সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষিত, এমনকি গণতন্ত্রের বিকাশ ও সমৃদ্ধিও বিভিন্ন দলের দল-প্রধানদের দ্বারা নির্দয়ভাবে শ্বাসরুদ্ধ। আজ জাতির ভাগ্য প্রধানত দুজন ব্যক্তির হাতে জিম্মি এবং এর ধারাবাহিকতায় দু’টি পরিবারের হাতে। আজ কি কেউ ভাবতে পারে শেখ মুজিব বা জিয়াউর রহমানের পরিবারের সদস্য না হয়ে কেউ এ দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন? এমনকি তিনি যদি দেশের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষটিও হন? কিছুদিন আগে তারেক রহমান শেখ হাসিনাকে ভর্ৎসনা করতে গিয়ে আওয়ামী লীগের সদস্যদের পরামর্শ দিয়েছেন তারা যেন শেখ হাসিনাকে সরিয়ে তার জায়গায় তার ছোট বোন শেখ রেহানাকে নেতৃত্বে বসায়। এখন প্রশ্ন আওয়ামী লীগাররা যদি শেখ হাসিনাকে সত্যি সত্যি অযোগ্য মনে করে তবে তার জায়গায় শেখ রেহানাকে বসাতে হবে কেন? তার চেয়ে যোগ্য মানুষ কি দলটিতে নেই! গণতন্ত্র তো জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের শাসন! আমাদের গণতন্ত্রে দলের যোগ্যতম মানুষদের দলের নেতৃত্বে আসার পথ কেন রুদ্ধ? কেন কেবল একচ্ছত্র পারিবারিক আধিপত্য? এই যদি হবে তবে পৃথিবী জুড়ে বিপুল রক্তযুগান্তরের পথ ধরে রাজতন্ত্রকে হটিয়ে গণতন্ত্র এসেছিলই-বা কী করতে। তারেক রহমানের কথা থেকে তার মনের অবচেতন মনোভাবটা স্পষ্ট: কথাটি ধৃষ্টতাপূর্ণ ও উদ্ধত। এর মূল কথা: বাংলাদেশের ভাগ্য আজ তাদের দু’টি পরিবারের ব্যক্তিগত সম্পত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। শেখ হাসিনা না হলে শাসন করবেন শেখ রেহানা, খালেদা জিয়া না হলে তার ছেলে তারেক রহমান। এদের বাইরের চৌদ্দ কোটি মানুষ মোটামুটি জীবজন্তু। জনগণের প্রতি দল-প্রধানদের মনোভাব যে কতখানি তাচ্ছিল্যপূর্ণ তার আরেকটা উদাহরণ দিই। কিছুদিন আগে ২০০৬-এর অক্টোবরে, নির্বাচন কমিশন আর রাজনৈতিক সংস্কার নিয়ে দলদুটির মধ্যে মহাসচিব পর্যায়ে আলোচনা চলছিল। জাতির জন্যে অসম্ভব সংকটপূর্ণ সময় সেটা। কেননা দুটি দলের সঙ্গে সারাদেশ তখন মুখোমুখি হয়ে রয়েছে সংঘাতপূর্ণ অবস্থায়, মহাসচিব পর্যায়ের সমঝোতা ব্যর্থ হলে গৃহযুদ্ধ বেধে যাওয়ার সম্ভাবনা, অথচ আলোচনায় অগ্রগতি নেই। এদিকে খালেদা জিয়া সরকারের মেয়াদ আর মাত্র ১৪ দিন। এর মধ্যে ঈদ আর সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে সবকিছু বন্ধ থাকবে ৬ দিন, দুটি দলের ভেতর সমঝোতা হলেও সংসদের বিশেষ অধিবেশন ডেকে কোনো কিছু সংস্কার করার সময় ফুরিয়ে যাবে। এসব টান টান উত্তেজনায় যখন দেশের মানুষ উৎকণ্ঠায় ছিঁড়ে যাচ্ছে, সেই সময় খালেদা জিয়া চলে গেলেন আরবে ওমরাহ করতে, যা জাতীয় স্বার্থের কথা ভেবে দিনকয় পিছিয়েও দেওয়া যেত। যখন তারা ফিরবেন তখন ঈদের ছুটির পর হাতে সময় থাকবে মাত্র তিন-চার দিন। হয়ত তা-ও নয়। কথাটা বললাম, এ কথাটা বোঝাতে যে নিজেদের ক্ষমতা আর স্থায়িত্বের ব্যাপারে তারা কী পরিমাণ নিশ্চিত ও উদ্বেগহীন। সামরিক একনায়কতন্ত্রীদের ক্ষমতা অবৈধ বলে এবং তাদের ক্ষমতার উৎস ক্যান্টনমেন্ট বলে তাদের তবু ক্ষমতা হারানোর আশঙ্কা থাকে। কিন্তু দেশের জনগণকে জিম্মি করা এই দল-প্রধানদের নিজেদের অবস্থান নিয়ে ন্যূনতম দুর্ভাবনা নেই। কেননা তাদের এই স্বৈরতন্ত্র এরশাদ, আইয়ুব বা ইয়াহিয়ার সামরিক স্বৈরতন্ত্রের মতো অবৈধ নয়। এ বৈধ এবং সংবিধানসম্মত। গোটা জাতি আজ এমনি নিñিদ্র স্বেচ্ছাচারী এই সংবিধান-সমর্থিত স্বৈরতন্ত্রের হাতে বন্দি।
৩...
কেবল এঁরা নন, দেশের প্রতিটি দল-প্রধানের স্বৈরতান্ত্রিক অবস্থানই আজ এমনি নিরঙ্কুশ। একটা ছোট্ট উদাহরণ দিনই। ১৯৯০ সালে ক্ষমতা হারালেও এরশাদ আজও রাজনীতিতে সক্রিয়। এখনও তিনি তার প্রতিষ্ঠিত জাতীয় পার্টির ক্ষীয়মাণ দলটির প্রধান। সংসদে এই দলের সদস্যসংখ্যা আজও বেশ। কিছুদিন আগে বিএনপি সরকারের চাপের মুখে সম্পূর্ণ একক সিদ্ধান্তে তিনি ২০০৬ সালের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন বিএনপি’র নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তার দলের একটি বড় অংশ এই সিদ্ধান্তের বিপক্ষে ছিল। সেদিন টিভির পর্দায় দেখলাম, ব্যাপারটি নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি আঙুল নেড়ে নেড়ে বলছেন, আমার দল কোন পক্ষে যাবে না যাবে এটা সম্পূর্ণভাবে আমার ব্যক্তিগত ইচ্ছার ব্যাপার। এখানে অন্য কারো কথা বলার অধিকার নেই। ভেবে দেখুন, কথাটি আমাদের গণতান্ত্রিক দেশটির একটি গণতান্ত্রিক দলের প্রধানের। দেখুন, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যাপারে কী সর্বময় ক্ষমতা তার! এই স্বৈরতন্ত্রীর নয় বছরের সামরিক শাসনামলেও তো সিদ্ধান্ত নেবার এমন নিরঙ্কুশ স্বাধীনতা বা দুঃসাহস তার ছিল না। অন্ততপক্ষে সেনাবাহিনীর ইচ্ছা-অনিচ্ছা বা সমর্থন-অসমর্থনের ধার তাকে ধারতে হত। কিন্তু আজ একটি গণতান্ত্রিক দলের প্রধান হওয়ায় সামরিক একনায়কতন্ত্রীদের চাইতেও তিনি ক্ষমতাবান। কারণ তিনি এখন তার দলের নিরঙ্কুশ প্রভু। স্বাধীন ইচ্ছায় নিজের দল বা তার অনুসারী বা সমর্থকদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি এখন যেমন খুশি ছিনিমিনি খেলতে পারেন। তাকে বাধা দেবার কেউ নেই। কেবল তিনি নন, বাংলাদেশের রাজনীতির মূল ধারা দুটির প্রধান শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া থেকে শুরু করে প্রতিটি ছোট বড় দলের প্রধানই আজ নিজ নিজ দলের এমনি নিরঙ্কুশ কর্তা। জনগণ আজ মূলত দেশের দু’টি বিরোধী রাজনৈতিক পতাকার নিচে সংঘবদ্ধ। ফলে দলগুলো থেকে গণতন্ত্র পুরো বিদায় নিয়েছে এবং দেশের গণতন্ত্রের রূপটি পুরোপুরি স্বৈরতান্ত্রিক রূপ নিয়েছে।
এখন প্রশ্ন দল-প্রধানদের এমন অফুরন্ত ক্ষমতার উৎস কি? না শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া, এরশাদ বা অন্য কেউ ষড়যন্ত্র করে এই স্বৈরতন্ত্র তৈরি করেননি। এই দুর্ভাগ্যের মূল উৎস খোদ বাংলাদেশের সংবিধান। এর ৭০ অনুচ্ছেদ। মোটামুটি এই অনুচ্ছেদটিই আজ এভাবে গণতন্ত্রকে স্বৈরাচারী করে ফেলেছে ও দেশের জনগণকে শৃঙ্খলিত করে তাদের সবাইকে দেশের জনাকয় রাজনৈতিক দল প্রধানের ভৃত্যে পরিণত করেছে। ৭০ অনুচ্ছেদ আমার এই লেখাটির একমাত্র বিষয় নয়। আমি শুধু দেখাতে চেষ্টা করবো অনুচ্ছেদটির সুদূর প্রভাবে আমাদের গণতন্ত্র কীভাবে আপাদমস্তক স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে পড়েছে; এবং গণতন্ত্র - যা মূলত স্বৈরতন্ত্রবিরোধী একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা তা কোনো কারণে স্বৈরাচারী হয়ে পড়লে জাতির জন্যে কত দিক থেকে ধ্বংসাত্মক ও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে যে ক্ষতি সামরিক বা অন্যান্য স্বৈরতন্ত্রের চাইতেও অনেক গভীর ও সুদূরপ্রসারী।
৪...
কথার শুরুতেই আমি সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সম্বন্ধে পাঠককে প্রাথমিক ধারণা দিয়ে নিতে চাই। বাংলাদেশে এই মুহূর্তে যে গণতন্ত্র চালু রয়েছে তা সংসদীয় গণতন্ত্রের হুবহু ছকটি এখানে নেই। ৭০ অনুচ্ছেদেও এমন কিছু নতুন বিষয় সংযোজিত হয়েছে যার ফলে এই দুটি দেশের গণতন্ত্রের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য ঘটে গেছে। বাংলাদেশের গণতন্ত্র এতে যে কেবল সংসদীয় গণতন্ত্রের মূল চরিত্রটি হারিয়ে ফেলেছে তাই নয়, গণতন্ত্র বিষয়টিকেই প্রায় পরিত্যাগ করেছে। কীভাবে তা ঘটেছে সে ব্যাপারটি শাদামাটাভাবে এখানে তুলে ধরছি।
বৃটিশ গণতন্ত্রে একজন নির্বাচিত সাংসদ সংসদে তার দলের উত্থাপিত কোনো প্রস্তাব ইচ্ছা করলে সমর্থন করতে পারেন অথবা প্রস্তাবটিকে কোনো কারণে জাতির জন্যে ক্ষতিকর বিবেচনা করলে, তার সমালোচনা করতে এমনকি তার বিরুদ্ধে ভোট পর্যন্ত দিতে পারেন। অর্থাৎ চাইলে তিনি বিভিন্ন বিষয়ে তার দলের বিরুদ্ধে ভোট পর্যন্ত দিতে পারেন। অর্থাৎ চাইলে তিনি বিভিন্ন বিষয়ে তার দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারেন। এতে সংসদে তাকে সদস্যপদ হারাতে হয় না। এই পুরো ব্যাপারটাকেই বলে ফ্লোর ক্রসিং। কিছুদিন আগে ইংল্যান্ডের সংসদে লেবার পার্টির নেতা প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার সাদ্দাম হোসেনকে উৎখাতের জন্যে ইরাকের বিরুদ্ধে আমেরিকার সঙ্গে যৌথভাবে যুদ্ধ করার প্রস্তাব আনলে তার দলের বহু সদস্য এর বিরুদ্ধে ভোট দেয়, ফলে শুধু নিজ দলের সদস্যদের সমর্থন নিয়ে তিনি সংসদে এই প্রস্তাব পাস করাতে পারেননি। পেরেছিলেন সংসদের বিরোধী দলের বিরাট সংখ্যক সদস্য এর পক্ষে ভোট দেওয়ায়। কাজেই ফ্লোর ক্রসিং কথাটার অর্থ দাঁড়াল: একজন সাংসদ কোনো একটি দলের পক্ষ থেকে নির্বাচিত হলেও সংসদের ভেতরে তিনি একজন সম্পূর্ণ স্বাধীন ব্যক্তি- এমন একজন জননেতা যার দায়বদ্ধতা বা জবাবদিহিতা কেবলমাত্র তার দলের কাছে নয়, তার নির্বাচনী এলাকার জনগণের কাছে (যাদের তিনি সরাসরি প্রতিনিধি), তার ব্যক্তিগত বিবেকের কাছে এবং বড় অর্থে গোটা জাতির কাছে। এই ব্যবস্থায় একটি আইন সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সাংসদের ভোটে পাস হয়, কেবলমাত্র সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের সদস্যদের বাধ্যতামূলক ভোটে নয়। গণতান্ত্রিক আদর্শের মূল কথা এটিই।
প্রথাটি কেবল বৃটিশ সংবিধানে নয়, কমবেশি পরিবর্তিত অবস্থায় অনেক দেশের সংবিধানেই রয়েছে। গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে হুবহু বৃটিশ আদলে এই ধারাটি পাকিস্তানের সংবিধানেও ছিল। কিন্তু বৃটিশ সাংসদদের তুলনায় আমাদের সাংসদদের রাষ্ট্রসম্পর্কিত ভাবনায় অপ্রতুলতা, আত্মমর্যাদাবোধ, বিবেক বা জাতীয় কল্যাণের অঙ্গীকার বা দায়বদ্ধতা নিম্নমানের ছিল বলে এবং প্রায় সবাই মোটামুটি সুবিধাবাদী চরিত্রের ছিলেন বলে এর ফল হয়েছিল আত্মঘাতী। নিজ সিদ্ধান্তে দল ত্যাগের ক্ষমতা থাকায় তারা মন্ত্রিত্বের মতো কোনো পদ বা এরও চেয়ে তুচ্ছ কোনো লোভ বা লাভের বিনিময়ে নির্বিকারে নিজ নিজ দল ছেড়ে অন্যদলে যোগ দিয়ে বসতেন এবং অনেক সময় বড় ধরনের প্রলোভনের মুখে দলবেঁধে ভিন্ন দলে চলে যেতেন। এভাবে একদল থেকে সাংসদদের ভাগিয়ে অন্যদলে নেয়ার ইংরেজি নাম ‘হর্স ট্রেডিং’। (ইংরেজি ভাষায় বাগধারাটির জনপ্রিয়তা থেকে বোঝা যায় ইংল্যান্ডের পার্লামেন্টেও একসময় ব্যাপারটা হয়ত জমজমাটভাবেই চলত)। পাকিস্তানের জাতীয় সংসদে ও পূর্বপাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদে পঞ্চাশের দশকে এই হর্স ট্রেডিং এমন ব্যাপকভাবে শুরু হয় যে সরকারগুলোর স্থিতিশীলতা পুরো বিপন্ন হয়ে পড়ে’ হর্স ট্রেডিংয়ের ফলে ঘন ঘন সরকার পতন শুরু হয়। ১৯৫৬ সালে আবু হোসেন সরকারে নেতৃত্বে গঠিত সরকার মাত্র একদিনের মাথায় ক্ষমতা থেকে পড়ে যায় এবং সাংসদদের স্বার্থলোলুপতা ও নৈরাজ্যের এক মর্মান্তিক পর্যায়ে প্রাদেশিক পরিষদের ডেপুটি স্পিকার শাহেদ আলী (সেদিন স্পিকার হিশেবে কার্যরত) অধিবেশন চলাকালে মারমুখো সদস্যদের আক্রমণে পরিষদের মধ্যেই নিহত হন। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার এই নৈরাজ্য সে সময় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রধান আইয়ুব খানের সামনে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের সুবর্ণ সুযোগ খুলে দেয় এবং রাজনীতিবিদদের ব্যর্থতা এবং দেশের বিরাজমান বিশৃঙ্খলতার অজুহাতে ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি করে তিনি পাকিস্তানের সর্বময় কর্তা হয়ে বসেন। দীর্ঘ তেরো বছর শ্বাসরুদ্ধকর সামরিক বুটের নিচে পদদলিত থাকার পর ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং স্বাধীনতাযুদ্ধের ভেতর দিয়ে দেশ ঐ অশুভ দানবের কবল থেকে মুক্ত হয়।
গণতন্ত্র খুইয়ে রাজনৈতিক নেতারা গভীর দুঃখের সঙ্গে অনুভব করেন যে জাতির গণতন্ত্র হারানোর অন্যতম কারণ সংবিধানের ফ্লোর ক্রসিং ব্যবস্থা এবং বৃটিশ গণতন্ত্র তাদের শ্রদ্ধার জিনিশ হলেও দুদেশের জনগণের সংস্কৃতি ও মূল্যবোধগত সুবিপুল ব্যবধানের কারণে ঐ সংবিধানের সবকিছু অন্ধের মতো অসুনরণ করা সুবিবেচনার কাজ হয়নি। এই ভাবনার ফলশ্রুতিতে ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সংবিধান তৈরির সময় সরকারের স্থিতিশীরতার কথা মাথায় রেখে ফ্লোর ক্রসিং ব্যাপারটি নিষিদ্ধ হয়। সংবিধানের যে অনুচ্ছেদ ফ্লোর ব্যবস্থা নিষিদ্ধ করে সেই অনুচ্ছেদের নামই ৭০ অনুচ্ছেদ। ১৯৭২ সালের সংবিধানে ৭০ অনুচ্ছেদ যুক্ত হলে রাজনৈতিক মহল মোটামুটি হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। সরকারের স্থিতিশীলতাকে যে শেষ পর্যন্ত নিশ্চিত করা গেছে তা ভেবে স্বয়ং বঙ্গবন্ধুও সে সময় নাকি স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছিলেন।
৫...
এবার আসুন আমরা দেখি ফ্লোর ক্রসিং সম্বন্ধে এই অনুচ্ছেদে কী বলা হয়েছে:
“৭০। কোনো নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত হইয়া কোনো ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হইলে তিনি যদি-
ক. উক্ত দল হইতে পদত্যাগ করেন
খ. সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোট প্রদান করেন, তাহা হইলে সংসদে তাহার আসন শূন্য হইবে, তবে তিনি সেই কারণে পরবর্তী কোনো নির্বাচনে সংসদ সদস্য হইবার অযোগ্য হইবেন না।
তাহলে দাঁড়াল কি? দাঁড়াল: সংসদের আইন প্রণয়নে সাংসদদের নিজস্ব কোনো মতামত নেই। দলের মতই তাদের মত। অর্থাৎ বৃটিশ সাংসদদের মতো তারা স্বাধীন জনপ্রতিনিধি নন। জাতীয় স্বার্থ বা ব্যক্তিগত বিবেক তার আচরণে অবাঞ্ছিত। শেষ বিচারে দলীয় সিদ্ধান্তের তিনি একজন অনুগত ধারক ও সেবক মাত্র। যতক্ষণ তার এই আনুগত্য প্রশ্নাতীত ততক্ষণই তিনি সাংসদ। এর একটু এদিক্ল-সেদিক হলেই তিনি দল ও সংসদ থেকে বহিষ্কৃত ও ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত। এক কথায় দলের সর্বময় কর্তৃত্বের নিচে তিনি অন্তঃসারহীন অস্তিত্বহীন একটি ছায়া-মানুষ কেবল। যে দলের সাংসদ বা মন্ত্রীরাই এতখানি অর্থহীন সে দলের কোটি কোটি সাধারণ নেতাকর্মীর অবস্থা কী তা সহজেই বোঝা যায়। অর্থাৎ আমাদের গণতন্ত্রে একটা জিনিশই কেবল ঝাণ্ডার মতো উন্নত- তার নাম দলীয় কর্তৃত্বের সার্বভৌমত্ব। বাকি গোটা দল, দলের তাবৎ সদস্য বা নেতাকর্মীÑ এমনকি সমর্থকÑ সবার কাজ সেখানে একটাই: ঐ সর্বশক্তিমান দলীয় কর্তৃত্বের পায়ে সাষ্টাঙ্গে প্রণিপাত হয়ে ঐ শক্তির স্তম্ভকে মজবুত ও দীর্ঘস্থায়ী করে রাখা।
স্পষ্টই বোঝা যায় গণতন্ত্রের ভিতকে পাকাপোক্ত করার স্বপ্ন নিয়ে যে বিধান তৈরি করা হয়েছিল তা আমাদের গণতন্ত্রকে শুধু ধ্বংস করেনি, একে নিখাদ স্বৈরতন্ত্রে পরিণত করেছে। সামরিক স্বৈরতন্ত্রের চেয়েও এ স্বৈরতন্ত্র কঠোর ও নির্মম। শেখ মুজিবুর রহমানের অধিকাংশ উদ্যোগের পেছনে জনগণের বিপুল আস্থা ও অনুমোদন ছিল বলে তার আমলে ব্যাপারটা ঠিকমতো চোখে পড়েনি। কিন্তু জিয়াউর রহমান আর এরশাদের সামরিক শাসন পেরিয়ে গণতন্ত্রের যুগ আসার পর এ এখন পুরোপুরি স্পষ্ট হয়ে জেগে উঠেছে।
এখানে একটা কথা। সংবিধানে দল বলে যা বোঝানো হয়েছে শেষ বিচারে তার মানে কি? আমরা ধারণা, এর মানে একটাই: ‘দল-প্রধান’। যেহেতু তিনিই দলের সর্বময় নিয়ন্তা। ফলে দলের নিরঙ্কুশ কর্তৃত্বের নামে এখন প্রতিটি দলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে দল প্রধানের কর্তৃত্ব। এক কথায়, তার একনায়কত্ব। দেশের সব ক’টি দলই আজ তাদের দল-প্রধানের হাতে জিম্মি। তার ইচ্ছা-অনিচ্ছা, খেয়াল-খুশি, ভালো-মন্দ, বুদ্ধি-নির্বুদ্ধিতা, ক্ষুদ্রতা বা লোভের হাতে দল আজ পুরোপুরি একটা খেলনা। তার দল রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকলে তিনি হয়ে দাঁড়ান স্বৈরশাসক। যেহেতু দল নামটির আড়ালে দাঁড়িয়ে গোটা দলটিকেই তিনি পায়ের নিচে আগাপাশতলা পিষ্ট করে রেখেছেন। এই পদ্ধতি দলের ভেতর নেতাকর্মীদের স্বাধীন মত প্রকাশের অর্থাৎ গণতন্ত্র চর্চার সুযোগ প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। সার্বভৌম ক্ষমতায় বলীয়ান হয়ে দল-প্রধান তার দলের শাসনতন্ত্রকে এমনভাবে নিজের অনুকূলে রচনা ও ব্যবহার করছেন যাতে লিখিত বা অলিখিতভাবে দলের ভেতর তার একনায়কত্ব নিরঙ্কুশ হয়। এভাবে দলের মধ্যে গণতন্ত্রের মৃত্যু ঘটায় দেশের রাজনীতিতেও তা ধ্বংস হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে দল-প্রধানেরা একনায়কতন্ত্রের দিকে ঝুঁকবেন এ তো খুবই স্বাভাবিক। যিনি সাংবিধানিকভাবেই সর্বক্ষমতার অধিকারী তিনি কেন দলের ভেতর গণতন্ত্র দিয়ে অযথা নিজের বিপত্তি বাড়াবেন কিংবা নিজের ক্ষমতা খর্ব করবেন। ফলে যোগ্য হোক অযোগ্য হোক, তার সন্তান-স্বজনেরাই যে পুরুষানুক্রমে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ শাসন করবে তা অলিখিতভাবে নির্ধারিত হয়ে গেছে। নির্বাচনে দু’দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা তাদের ছাপানো পোস্টারের ওপরের দিকে দল-প্রধানের দু’তিন পুরুষের ছবি ছাপার পর যেখানে নিজের ছবিটি ভয়ে দ্বিধায় এবং অবনতভাবে নিবেদন করে তা থেকেও বোঝা যায় কীভাবে পুরুষানুক্রমিক রাজনীতির ধারা আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের পুরো উপেক্ষা করে জাতীয় জীবনে জগদ্দল পাথরের মতো জেঁকে বসেছে।
৬...
গণতন্ত্র জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের শাসন। এই ব্যবস্থায় দেশের সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তিরা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন ধাপ ডিঙিয়ে দলের শীর্ষে উঠে দেশ শাসন করে। কিন্তু বর্তমানে প্রক্রিয়াটি উল্টে যাওয়ায় একজন রাজনীতিবিদ যত যোগ্য বা প্রতিভাসম্পন্নই হোন না কেন, তার অস্তিত্ব ও ভবিষ্যৎ দলের দল-প্রধানের অনুগ্রহ বা আশীর্বাদের ওপরেই পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। সংবিধানের ঐ একটিমাত্র অনুচ্ছেদের জন্যে আজ দেশের শ্রেষ্ঠ মানুষদের রাজনীতির শীর্ষে যাবার পথ প্রায় রুদ্ধ হয়ে পড়েছে! নেতারা এখন নিচ থেকে ওপরে যাচ্ছে না, ওপর থেকে নিচে আসছেন। মোদ্দা কথা, আমাদের রাষ্ট্রশাসকরা আজ আসছেন দেশের মাত্র দুটো পরিবার থেকে। এত ছোট্ট জায়গা থেকে আসা মানুষদের মধ্যে দেশের যোগ্যতম ব্যক্তিদের পাওয়ার নিশ্চয়তা কোথায়? উচ্চতর নেতৃত্বের অভাবে দেশ আজ দিকনির্দেশনাহীন ও ধ্বংসোন্মুখ। সাহিত্যিক আবুল ফজল তার লেখকের রোজনামচায় চল্লিশ বছর আগে দুঃখ করে লিখেছিলেন, বৃদ্ধ হয়ে মৃত্যুর দরোজায় এসে তিনি দাঁড়ালেন কিন্তু কোনো সভ্য নেতার দ্বারা শাসিত হওয়ার সৌভাগ্য পেলেন না। আজ পর্যন্ত আমাদের জন্যে হয়ত কথাটা অনেকখানিই সত্যি। সুকান্ত লিখেছিলেন, এদেশে জন্মে পদাঘাতই শুধু পেলাম। আমাদেরও একই অবস্থা। ব্যক্তিগত যোগ্যতায় যারা হয়ত নিজ নিজ দলের সাধারণ সদস্যের অতিরিক্ত কিছু হতেন না তারাই আজ দলের সর্বক্ষমতার অধিকারী। এটা গণতন্ত্রের স্বাস্থ্যময় বিকাশের অন্তরায়। ইংরেজিতে একটা প্রবাদ আছে, একটা জাতি সেই মাপের নেতাই পায় যার সে যোগ্য। দুঃখের সঙ্গে এককেসময় মনে হয় জাতি হিসেবে আমরা কি এমনই অযোগ্য যে এমন নেতারাই আমাদের বিধিলিপি হয়ে গেল? একজন সামরিক শাসক যদি পেতেই হয়, তবে সামরিক বিভাগে এত উজ্জ্বল মানুষ থাকতে এরশাদের মতো একজন দুর্নীতিপরায়ণ মানুষই হবে আমাদের ভাগ্য? গণতন্ত্রের সময়ই-বা কী ঘটছে?
দলের সাধারণ মানুষের নেতৃত্বের হাতে উৎকৃষ্টরা শাসিত হতে থাকায় আজ এদেশের দলগুলো হয়ে পড়েছে হতোদ্যম, বিশৃঙ্খল। দল-প্রধান এবং তার অনুগৃহীত কিছু মানুষ ছাড়া দলে আজ আর সুখী মানুষ নেই। বাকি সবাই ক্ষমতাবর্জিত, ক্ষুব্ধ ও হতাশাক্রান্ত। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নেতাকর্মী থেকে শুরু করে সাংসদ ও মন্ত্রীদের যে গুরুত্ব বা মর্যাদা থাকে তা তাদের নেই। সবাই কার্যত আজ পার্টি প্রধানের অলিখিত সেবক। আজ বাংলাদেশে কোনো দলে টিকে থাকার ও উন্নতি করার একমাত্র যোগ্যতা হচ্ছে পদলেহন, তোয়াজ আর নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ। এর কোথাও একচুল এদিক ওদিক হলে সে নিক্ষিপ্ত হয় কালের ভাগাড়ে বা বিস্মৃতির আঁস্তাকুড়ে। আজ ছোট বড় যে কোনো জনসভার বক্তৃতায়, পোস্টারে বা বিজ্ঞাপনে দল-প্রধান ও তাদের আর্শীবাদপুষ্ট ছোট বড় প্রতিটি নেতার নামের সামনে পেছনে যেসব তোষণমূলক বিশেষণ ও নির্লজ্জ তোয়াজের প্রাচুর্য দেখা যাচ্ছে তা থেকেও ঐ পদলেহনের কথা ক্ষমতার পুরো এককেন্দ্রিকতার প্রমাণ মেলে।
ফলে এদেশে যে গণতন্ত্র আজ চলছে তা প্রশ্নহীনতার, আনুগত্যের ও দাসত্বের। দল-প্রধানের উদ্যত যষ্টির সামনে গোটা দল আজ সন্ত্রস্ত ও নতজানু। দলের প্রতিটি নেতাকর্মীর মধ্যে প্রতি মুহূর্তে অস্তিত্ব হারানোর ভয় যতখানি, ঠিক সে পরিমাণেই তাদের মরিয়া চেষ্টা দলের ভেতর নিজেদের অস্তিত্ব ও অবস্থান নিরাপদ করার। ফলে দলের ভেতর তৈরি হয়েছে অবিশ্রান্ত চাটুকারিতার এক আত্মতৃপ্ত পরিবেশ। যোগ্য মানুষের মধ্যে সবসময়ই ব্যক্তিত্ব, বিবেক বা আত্মমর্যাদাবোধ থাকে প্রবল। প্রশ্নহীন দাসত্ব ও নির্লজ্জ পদলেহন তাদের ব্যক্তিত্বের অনুকূল নয়। বর্তমানের অমর্যাদাকর পরিবেশে দেশের যোগ্য মানুষেরা তাই আর রাজনীতিতে নাম লেখাতে আগ্রহী নয়। ফলে রাজনীতিতে মেধাবী তরুণ বা উদ্যমশীল কর্মীর সংখ্যা যেমন আশঙ্কাজনকভাবে কমছে তেমনি বেড়ে যাচ্ছে দুর্নীতিপরায়ণ বিতর্কিত ও চাটুকারিতাসর্বস্ব নেতাদের ভিড়। অনেক দল-প্রধান আবার অস্তিত্ব হারানোর আতঙ্কে দলের যোগ্য মানুষদের ওপরে উঠতে দিতে নারাজ। দলের ভেতর যাদের প্রশ্নপ্রবণতা, বিবেক বা আত্মমর্যাদাবোধ দেখা যাচ্ছে তাদের দল থেকে বহিষ্কার করে স্তব্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। ফলে ক্রমাগতভাবে দলগুলো হয়ে উঠছে নেতৃত্বশূন্য এবং নিঃসঙ্গ। তরুণ নেতা প্রায় কোনো দলেই এখন নেই। দলের ‘তরুণতম’ নেতাদের বয়সও এখন ষাট বছরের ওপরে। অযোগ্য বা স্বার্থান্বেষী মানুষদের জন্যে এখন হযেছে পোয়াবারো। আত্মমর্যাদার সমস্যা না থাকায় তারা স্বার্থ হাতিয়ে নিতে তোয়াজ, আত্মবিক্রয়, চাটুকারিতা- কোনো কিছুতেই পিছ-পা নয়। তাই দলের ভেতর যোগ্য মানুষদের নিচে ফেলে এই সব বিবেকবর্জিত ও জন্তুসুলভ মানুষেরা আজ প্রাধান্য বিস্তার করেছে। আমি দেশের তরুণ সম্প্রদায়কে নিয়ে কাজ করি। আমি দেখেছি তাদের সামনে রাজনীতিবিদেরা হয়ে দাঁড়িয়েছে সবচেয়ে অশ্রদ্বেয় মানুষ। সেদিন এক জরিপ থেকে জানা গেল রাজনীতিবিদ হওয়ার কথা ভাবে এমন তরুণের সংখ্যা দেশে এখন শতকরা মাত্র আড়াইজন।
৭...
বিশ্বের বিত্তসম্পদ বৃদ্ধির ফলে আজ ব্যক্তিস্বাধীনতা ও গণতন্ত্র একনায়কতন্ত্রের চেয়ে বেশি জনপ্রিয়। তার মানে এ নয় যে শাসন ব্যবস্থা একনায়কতন্ত্রী বা স্বৈরতন্ত্রী হলেই তা সবসময় খারাপ হবে। মাও সেতুংয়ের একনায়কতন্ত্র, কামাল পাশার স্বৈরতন্ত্র, সিঙ্গাপুরের লি কুয়ানের বা মালয়েশিয়ার মহাথির মোহাম্মদের একনায়কতন্ত্রী কর্তৃত্ব যে ঐসব দেশের বিকাশ ও সমৃদ্ধিকে পিছিয়ে দিয়েছে এ কথা আশা করি কেউ বলবেন না। এসব স্বৈরাচারীই যে কেবল নিজ নিজ দেশের জন্যে ভাল কাজ করছেন তা নয়, ক্ষমতায় থাকতে হলে অধিকাংশ একনায়কতন্ত্রীকেই কমবেশি ভাল কাজ করতে হয়। জনস্বার্থে ভাল ভাল কাজ করে তাকে প্রতিনিয়ত জনসাধারণের সামনে প্রমাণ করতে হয় তিনি জনগণের বন্ধু এবং গণতন্ত্রীদের চেয়ে উচ্চতর। যখন তিনি ঠিকমতো তা হন না তখনও প্রচারণার মাধ্যমে হলেও তাকে এই ভাবমূর্তি উঁচু করে রাখতে হয়। দ্বিতীয়ত একনায়কতন্ত্রী হলেই একজন মানুষ যে দেশের জন্যে ক্ষতিকর হবেন এমন কথাও নেই। পৃথিবীর এযাবৎকালের বহু স্বৈরতন্ত্রীই ছিলেন দেশপ্রেমিক। নিজেদের বুদ্ধি-বিবেচনামতো জনগণের ভালোর জন্যেই তারা কাজ করেছেন। তাদের প্রধান অপরাধ অন্য জায়গায়: জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতাকে কৌশল ও শক্তির মাধ্যমে কুক্ষিগত করায়। এই দুর্বলতা তাদের সবসময় সন্ত্রস্ত রাখে। তাই জনগণের জন্যে নিয়মিতভাবে ভাল কিছু করতে তারা বাধ্য হয়ে যান। তাছাড়া স্বৈরাচারীদের একক ইচ্ছায় রাষ্ট্র পরিচালিত হয় বলে রাষ্ট্রের কল্যাণে বড় বড় সিদ্ধান্তগুলো তারা অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সঙ্গে বাস্তবায়িত করতে পারেন যা বহু প্রশাখাবহুল জটিল ভীরু ও দ্বিধান্বিত সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পক্ষে কঠিন। এ জন্যে দেখা যায় প্রতিভাবান ও দেশপ্রেমিক স্বৈরতন্ত্রীদের হাতে বিভিন্ন সময় নানা জাতির যে অবিশ্বাস্য সমৃদ্ধি ঘটেছে গড়পড়তা গণতান্ত্রিক শাসনে তা হয়নি। আমার ধারণা, ভাল হাতে পড়লে গণতান্ত্রিক শাসন জাতির জন্যে যতটা ফলপ্রসূ ও কার্যকর হয় একনায়কতন্ত্রী ব্যবস্থায় তার চেয়ে কম হয় না। বললে কেমন শোনাবে জানি না, তবু মনে হয় কেবল স্বৈরতন্ত্রী শাসন নয়, অনেক সময় গণতান্ত্রিক শাসনেরও সর্বোচ্চ ফসল ফলে এর পক্ষে কোনোভাবে একনায়কতন্ত্রী হয়ে ওঠা সম্ভব হলে।
আমার এই বক্তব্যের সমর্থনে বার্ট্রান্ড রাসেলের একটা চুক্তি তুলে ধরি। একটি প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন: “শ্রেষ্ঠ গণতন্ত্রী তিনিই যিনি ক্ষমতায় যান গণতান্ত্রিক উপায়ে, কিন্তু এক পর্যায়ে সেই গণতন্ত্রের বিলুপ্তি ঘটাতে সমর্থ হন।” (The best democrat is he who is elected democratically but in the end is able to abloish it.) এর অর্থ শ্রেষ্ঠ গণতন্ত্রী সেই ব্যক্তি যিনি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ভেতর থেকে বিকশিত হলেও প্রতিভা ও অসাধারণত্বের মহিমায় এমনই ভাস্কর হয়ে ওঠেন যে পুরো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাটাই তার দূরদৃষ্টি ও বিচক্ষণতার হাতে নিজেকে সঁপে দিয়ে নিরাপদ বোধ করে এবং নিজের দুর্লভ যোগ্যতার কারণে গোটা দলের উদ্বেলিত সমর্থন পেয়ে কিছুটা একচ্ছত্র ক্ষমতায় রাষ্ট্রশাসন করেন। এ ধরনের রাষ্ট্রনায়ক অনেকটা একনায়কতন্ত্রীদের আদরে দেশ চালালেও এদের হাতে দেশ নিরাপদ বা বিপন্ন হয় না। বরং এদের নেতৃত্বের যুগেই দেশের অবিশ্বাস্য উন্নতি হতে দেখা যায়। তাদের এই স্বৈরাচার আসলে উদারমনা মহৎপ্রাণ দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ও অসাধারণ রাষ্ট্রনায়কদের জনপ্রিয় স্বৈরাচার। এই স্বৈরাচারের ভিত্তি এদের দুর্লভ ব্যক্তিত্ব ও প্রজ্ঞা তাদের অসামান্যতা, দূরদৃষ্টি এবং জীবন ও রাষ্ট্র ব্যাপারে গভীর ও সমুন্নত অন্তদৃষ্টি। এদের ব্যক্তিত্বের দুর্লভ উদ্ভাসের সামনে অন্যদের অভিভূত আত্মসমর্পণই তাদের এই স্বৈরতন্ত্রের ভিত্তি, কোনো দমন বা নির্যাতনমূলক প্রক্রিয়া নয়। পেরিক্লিস বা জওহরলাল নেহেরু এই ধারার স্বৈরাচারী। কিন্তু স্বৈরাচারীদের যদি এ ধরনের ব্যক্তিগত মহত্ত্ব না থাকে, তারা যদি খুবই সাধারণ মাপের মানুষ হওয়া সত্বেও সংবিধানের বিধান বা অন্য কোনো উপায়ে স্বৈরাচারের কর্তৃত্ব পেয়ে যান তখন স্বৈরাচার জাতির জন্যে হয়ে ওঠে দুর্দৈবের কাল। আমাদের দেশে সংবিধান সমর্থিত একনায়কতন্ত্র এমনি এক বিপর্যয়ের জন্ম দিয়েছে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বদলে আমাদের শাসকরা পারিবারিক সূত্র থেকে উঠে আসছেন বলে রাজনীতির শীর্ষে আমরা শ্রেষ্ঠ মানুষদের পাচ্ছি না। আশঙ্কা বাড়ছে এ জন্যে যে সাংবিধানিক সমর্থনের কারণে দেশে এই শাসনের দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে।
দুই স্বৈরতন্ত্র
৮...
আমাদের দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কারণে আজ রাজনৈতিক শাসকদের ক্ষমতায় আসতে হচ্ছে ভোটের মাধ্যমে অর্থাৎ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়। কাজেই ক্ষমতায় থাকার দিনগুলোতে জনগণের কল্যাণে ভাল কাজ করলে তারা হয়ত তাদের ভোটে পরের নির্বাচনে জিতে আসতে পারতেন। কিন্তু দুঃশাসনের ফলশ্রুতিতে তারা সে সম্ভাবনা হারিয়ে ফেলেন। ফলে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্যে জনসমর্থনের বদলে তাদের কেবলি বেছে নিতে হচ্ছে চক্রান্ত আর ষড়যন্ত্রের পথ। রাষ্ট্রকাঠামোকে টুকরো টুকরো করে, দলীয়করণের মাধ্যমে আমলাতন্ত্র, সামরিক বাহিনী থেকে শুরু করে শিক্ষাঙ্গন, বিচার বিভাগ, সাংবাদিকতা, চিকিৎসা বিভাগ, প্রকৌশল বিভাগের মতো সব পেশাগত শ্রেণীসহ গোটা জাতিকে পুরোপুরি বিভক্ত ও দ্বিখণ্ডিত করে সারাদেশে এমন এক সংঘাতপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন যে কোন সঙ্কটে দেশকে অভিভাবকত্ব দেবার বা উদ্ধার করার মতো সর্বজন গ্রহণযোগ্য মানুষ বা গোষ্ঠী এখন আর নেই। প্রায় সুনিশ্চিতভাবে আমরা এগিয়ে চলেছি এক নিষ্ঠুর অন্ধকার গৃহযুদ্ধের দিকে পরাক্রান্ত রাজনৈতিক সমাজ আজ প্রলোভন আর নির্যাতনের মুখে দেশের সুশীল সমাজকে গ্রাস করে ফেলেছে। দেশের শুভবুদ্ধি বিবেক বা ন্যায়নীতি সংকীর্ণ হীন রাজনীতির আক্রমণের সামনে মুখ থুবড়ে মাটিতে পড়ে আছে।
কোন দেশে যখন স্বৈরাচার চালু থাকে তখন সেখানে একজন ব্যক্তি বা একটি মাত্র দল বা সংস্থার স্বৈরাচারই প্রতিষ্ঠিত থাকে। যেমন আইয়ুব, ইয়াহিয়া বা এরশাদের স্বৈরাচার। রাজতন্ত্রও এমনি একটি স্বৈরাচারী প্রক্রিয়া। রাজা সেখান এককভাবে দেশ শাসন করেন। তাই রাজতন্ত্রেও রাজা থাকে একজন। এসব জায়গায় অন্য রাজা বা স্বৈরাচারীকে আসতে হলে প্রাক্তন শাসক বা রাজার উচ্ছেদ ঘটিয়েই আসতে হয়। একসঙ্গে দুই শাসক বা দুই রাজার জায়গা কোথাও নেই। কিন্তু গণতন্ত্র জনগণের ভোটে নির্বাচিত রাজনৈতিক প্রক্রিয়া বলে কোন একক ব্যক্তি বা একক দলের নিরঙ্কুশ ও অব্যাহত শাসন সেখানে সম্ভব নয়। তাই গণতন্ত্র যদি কখনও স্বৈরাচারী হয়ে পড়ে সেখানে স্বৈরাচারের একটা ভিন্ন চেহারা দেখতে পাওয়া যায় যা সামরিক বা অন্যান্য স্বৈরাচার থেকে খুবই আলাদা। আমাদের গণতন্ত্রে সরকারগুলো জনগণের ভোটে নির্বাচিত হচ্ছে বলে এবং জনগণ একই দলকে নিজ স্বার্থে বারবার ক্ষমতায় আনার নির্বুদ্ধিতা দেখাচ্ছে না বলে দেশে স্বৈরাচার একটি থাকতে পারেনি, দেশের দু’টি প্রধান দলের ক্ষমতার হাতবদলের কারণে স্বৈরাচার হয়ে গেছে দু’টি। এই দু’টি স্বৈরাচারই আজ আমাদের গণতন্ত্র ও জাতির জন্যে হয়ে দাঁড়িয়েছে সবচেয়ে আত্মঘাতী ঘটনা। কেন তা এমন আত্মধ্বংসী হল তা নিয়ে এখানে দু’চারটি কথা বলে নিতে চাই।
৯...
আগেই বলেছি কোন দেশে স্বৈরাচার থাকলে তা সবসময় খারাপ হবে এমন কোন কথা নেই। কিন্তু স্বৈরাচার একটি না হয়ে দু’টি হলে তা একটি বড় ধরনের বিপদের জন্ম দিয়ে বসে। এর মূল কারণ স্বৈরাচার যে ধরনেরই হোক, তার মূল প্রবণতা রাষ্ট্রে তার সার্বভৌম কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। সাধারণভাবে স্বৈরাচার তা করেও থাকে। আমাদের দেশেও স্বৈরাচার দু’টি হওয়ায় আজ প্রত্যেকটি স্বৈরাচারই চেষ্টা করছে অন্যটিকে নিশ্চিহ্ন করে নিজের অবস্থান নিষ্কণ্টক করতে অর্থাৎ তার একচ্ছত্র স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠা করতে এর ফলে কী ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে প্রথমে সে আলোচনায় যাওয়া যেতে পারে।
আগেই বলেছি, একনায়কতন্ত্র নানা চেহারায় বহু দেশেই থাকে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাতেও থাকে। কিন্তু আমাদের গণতান্ত্রিক একনায়কতন্ত্র সেগুলো থেকে ব্যতিক্রমী কেবল নয়, খুবই ভিন্নস্বভাবী।
আলোচনার শুরুতে গণতন্ত্রের একটা মৌলিক বৈশিষ্ট্যের কথা স্মরণ করাতে চাই। রাজতন্ত্র, সামরিক একনায়কতন্ত্র বা অন্যসব স্বৈরতন্ত্রের সঙ্গে গণতন্ত্রের একটা মৌলিক পার্থক্য আছে। একনায়কতন্ত্র মনে করে একাই আমি সব পারি। দেশ শাসনের জন্যে আমার অন্য কাউকে দরকার নেই। তাই একনায়কতন্ত্র বিরুদ্ধ দলের অস্তিত্ব স্বীকার করে না। সমস্ত বিরোধীতাকে স্টিমরোলারে পিষে নিজের নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে সে নিশ্চিন্ত হতে চায়। কিন্তু গণতন্ত্র তা নয়। রাষ্ট্রের সমস্যা ও জনকল্যাণের ব্যাপারে গণতন্ত্র একনায়কতন্ত্রের তুলনায় অনেক বেশি শ্রদ্ধাশীল সহাবস্থানমূলক ও সুসংস্কৃত। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ক্ষমতাসীন দল মনে করে রাষ্ট্রের জটিল বিশাল অন্তহীন সমস্যার পুরোপুরি সমাধান একা তার পক্ষে সম্ভব নয়। এ করতে দেশের সব মানুষকে তার নিজের সঙ্গে নিতে হবে। এসব ভাবনার কারণে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিরোধী দল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে বিরোধী দলের প্রধান কেবলমাত্র একজন সাংসদ নন, রাষ্ট্রীয়ভাবে তিনি একজন অত্যন্ত মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি, তার দলের সাংসদরা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য হিসেবে এবং বিভিন্ন জাতীয় কমিটি ও কার্যক্রমে সম্পৃক্ত থেকে ক্ষমতাসীন দলকে সমর্থন ও অসমর্থন দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় সহযোগিতা করে।
এ জন্যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা একটি বহুদলীয় ব্যবস্থা। এই বহুদলীয়তা গণতন্ত্রের প্রাণ নয় কেবল, এর সৌন্দর্য ও শ্রেষ্ঠত্ব। এর ফলে দেশের ভাগ্য নির্ধারণে প্রতিনিধি নির্বাচনের ভেতর দিয়ে জাতির প্রতিটি মানুষের অংশগ্রহণ এতে নিশ্চিত হয়। দেশের প্রতিটি দল, মত ও দৃষ্টিভঙ্গিকে এই পদ্ধতি স্বীকৃতি দেয় বলে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে এক হয়ে কাজ করতে কারও কোথাও বাধে না। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা তাই একটি বন্ধুত্ব ও সহাবস্থানমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থা। এখানে পার্লামেন্টে জাতীয় রাজনীতির শত্রুরা পাশাপাশি বসে সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে গালগল্প বা রসরসিকতা করে দেশ শাসন করে। সাংসদরা এখানে স্বাধীন ও বিবেকপ্রসূত বক্তব্য এবং ভোট দেবার অধিকারী বলে দলীয় কোন্দল বা সহিংসতার অবকাশ এখানে কম। ফলে গণতন্ত্রের পুরো প্রক্রিয়াটা চলে আয়েসি মেজাজে, ঢিলেঢালা বা স্বচ্ছন্দ চালে। এতে দলীয় কোন্দলের চেয়ে বিবেকবোধ ও জনগণের কল্যাণ প্রাধান্য পায় বেশি।
কিন্তু সাংবিধানিক অনুমোদনের কারণে আমাদের দেশে দু’টি স্বৈরতন্ত্র জন্ম নেয়ায় ও দেশের জনগণ ঐ দু’টি প্রধান দলের ছত্রচ্ছায়ায় মোটামুটি সংঘবদ্ধ হওয়ায় এবং দলদু’টি, স্বৈরতন্ত্রের প্রকৃতিগত প্রবণতার পথ ধরে পরস্পরের উৎখাতে বদ্ধপরিকর হয়ে ওঠায় আমাদের গণতন্ত্র আজ হয়ে পড়েছে পুরোপুরি সংঘাতমূলক। এই সংঘাত বাড়তে বাড়তে এমন এক পর্যায়ে এসেছে যে দেশের গৃহযুদ্ধ প্রায় অনিবার্য হয়ে উঠেছে।
১০...
সামরিক স্বৈরাচার কোন ভাল জিনিশ নয়, কিন্তু গণতন্ত্র একনায়কতন্ত্রী হয়ে পড়লে যে অবস্থা হয় তা সামরিক স্বৈরতন্ত্রের চেয়েও খারাপ। সামরিক স্বৈরাচারের নিয়তি দুটো: হয় সে পূর্ণক্ষমতায় শাসন করবে। নয় বিলুপ্ত হবে। কিন্তু গণতন্ত্র স্বৈরাচারী হয়ে উঠলেও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার কারণেই, একটানা বেশিদিন থাকেও না, আবার একেবারে বিদায়ও না। বরং বড় দল, একটা স্বস্তিদায়ক বিরতির পর, আগের দুঃশাসনের রক্তাক্ত হাত মুছে উন্নত ও জ্যোতির্ময় চেহারা নিয়ে নতুনভাবে ফিরে আসে। অর্থাৎ হাত বদল করে স্বৈরাচার জাতির জীবনে চিরস্থায়ী হয়ে ওঠে। দ্বিতীয়ত সামরিক স্বৈরতন্ত্র শাসন করে গোটা জাতিকে। তার কোনো বিরোধী দল থাকে না। থাকলেও তা থাকে পাতানো খেলার মতো বা অনুগত দল হিসেবে। কিন্তু গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধে থাকে একটি শক্তিশালী বিরোধী দল। ফলে গণতন্ত্র স্বৈরতান্ত্রিক হতে চাইলে ক্ষমতাসীন দলকে নির্মূল করতে হয় তারই মতো সংবিধানসম্মত, শক্তিশালী ও বিপুল জনসমর্থনপুষ্ট একটি দলকে। গণতন্ত্রে ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে এমন বিশাল ও সংঘবদ্ধ একটি জনসমর্থনকে উচ্ছেদ করা সম্ভব নয় বলে এই নিশ্চিহ্নকরণ প্রক্রিয়া হয়ে ওঠে বিপজ্জনক ও এই সংঘাত দল ছেড়ে ক্রমে জাতীয় সংঘাতে রূপ নেয়।
পরপর তিনটি গণতান্ত্রিক সরকারের সময়ই আমরা দেখেছি, বিরোধী দল সংসদ বর্জন করেছে। অনেকেই ভেবেছেন তারা গোসা করে সংসদে যাওয়া ছেড়ে দিয়েছে। এই কিন্তু একেবারেই তা নয়। আসল কারণ প্রতিটি সরকারি দলই প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার ষড়যন্ত্র হিসেবে বিরোধী দলকে সংসদ থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। সংসদে কথা বলতে না দিয়ে, জনপ্রতিনিধিত্বের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে, হৃদয় ভেঙে দিয়ে, অসম্মান অপমানে ক্লিষ্ট করে তাদের বিতাড়িত করেছে। কেবল সংসদ থেকে নয়, রাস্তা থেকে, এমনকি তাদের বাড়িঘর থেকে তাড়িয়ে দিয়ে কার্যত পাঁচ বছরের জন্যে উদ্বাস্তু করে রেখেছে। এক কথায় ক্ষমতাসীন দল বিরোধী দলকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করে নিজস্ব স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে। প্রতিবাদ জানানোর, কথা বলার কোন পথই তারা খোলা রাখেনি। দু’টি দলই করেছে কাজটা। বিরোধীদের ওপর অত্যাচার প্রতিটি দল-প্রধান থেকে শুরু করে দুটো দলের নিম্নতম পর্যায়ের প্রতিটি কর্মী বা সমর্থকদের পর্যন্ত আক্রান্ত ও রক্তাক্ত করেছে। ফলে দুই দলে জখমির সংখ্যা ক্রমাগত বেড়েছে। এ সংখ্যা দু’টি দলের প্রতিটি মানুষকে যেমন প্রতিশোধপরায়ণ ও সহিংস করে তুলছে তেমনি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত প্রতিটি মানুষকে ক্রমাগতভাবে নিরাপত্তাহীনতার ভেতর ঠেলে দিয়েছে। রাজনীতিকের পরিচয় এখন প্রতিটি রাজনৈতিক কর্মীর জন্যে হয়ে উঠেছে ঝুঁকি ও আশঙ্কার বিষয়।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা একনায়কতন্ত্রী হওয়ার প্রধান বিপত্তি হল যারা নির্বাচনে পরাজিত হচ্ছে তারা পুরো নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। এই ব্যাপারটাই আজকের রাজনৈতিক অঙ্গনের সবচেয়ে ভয়াবহ সঙ্কট। আজ তাই নির্বাচনে সবার একমাত্র কাম্য বিজয়। এ অকারণ নয়। কেননা বিজয় মানে রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর প্রশ্নহীন ও সর্বময় কর্তৃত্ব, জাতির ক্ষমতা আর সম্পদের ওপর নিরঙ্কুশ অধিকার। পাশাপাশি পরাজয় মানেই নিশ্চিহ্ন হওয়া। কাজেই যেভাবেই হোক, দেশের ধ্বংসের বিনিময়ে হলেও, শত লক্ষ লাশ পায়ে মাড়িয়ে হলেও, ক্ষমতায় যেতে হবে। এ ব্যাপারে ছাড়ের অবকাশ নেই। তাহলে বাঁচা যাবে না, অস্তিত্ব থাকবে না, উৎখাত হতে হবে। এত বড় ঝুঁকি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে কী করে সুস্থতা সম্ভব।
তাই রাজনীতি এখন এমন অসুস্থ। নির্বাচনে জয়ের জন্যে সবাই আজ হিংস্র আর মরিয়া। এ কারণেই আমাদের নির্বাচন আজ এত সংঘাতময়। জয় নিশ্চিত করার জন্যে রাষ্ট্রযন্ত্র ধ্বংস করা থেকে শুরু করে জঘন্যতম অন্যায় বা অপরাধ করতে কারো বিকার নেই। সবার শেষ কথা যেন একটাই: আমি জিততে না পারলে আসুক সামরিক শাসন। হোক জাতি শৃঙ্খলিত। তবু প্রতিপক্ষ যেন ক্ষমতায় না যায়। সামরিক শাসন এলেও আমি বাঁচব। কিন্তু প্রতিপক্ষ এলে থাকব না। এভাবে গণতন্ত্রের স্বৈরাচার গণতন্ত্রকে পুরো ধ্বংস করে দিয়েছে। দেশকে এ এমন সংঘাতময় পরিস্থিতিতে এনেছে যেখানে সামরিক বুটের নিচে পিষ্ঠ হওয়াকেও মুক্ত স্বাধীন বা গণতান্ত্রিক জীবনের চেয়ে নিরাপদ ও কাম্য মনে হচ্ছে। এ থেকেও বোঝা যায় নিজেদের সম্পূর্ণ অনিচ্ছাতে কী উদ্ধারহীন কাদার ভেতর আটকে গেছে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো- আর কী বিপাকে পড়েছে আমাদের গণতন্ত্র তথা রাজনীতি।
১১...
ক্ষমতাসীন হতে না পারলে বিরোধী দলের অবস্থা আজ যে কতখানি করুণ হয়ে ওঠে তার প্রমাণ পাওয়া যায় তাদের ডাকা হরতাল দেখে। ক্ষমতায় থাকার সময় দু’টি দলই অঙ্গীকার করে ভবিষ্যতে তারা কখনও হরতাল করবে না, কিন্তু দেখা যায় বিরোধী দলে গেলেই তারা লাগাতার হরতাল ডেকে দেশের জনজীবন তথা অর্থনীতির ধ্বংসযজ্ঞ শুরু করে। কেন প্রতিজ্ঞা ভাঙে? কেন জাতির বা তার নিজের ভবিষ্যতের জন্যে ক্ষতিকর জেনেও এ করে? উত্তর একটাই। প্রতিবাদ জানানোর আর কোন গণতন্ত্রসম্মত বা বৈধ পথ তাদের তখন থাকে না। সমস্ত ক্ষমতা বা মর্যাদা থেকে বিতাড়িত ও নিশ্চিহ্ন হওয়া একটি দল নিজের ওপর অনুষ্ঠিত অত্যাচারের প্রতিবাদ করতে গিয়ে মুমূর্ষু গলায় হরতালের একটা ক্ষীণ করুণ ডাক আকাশে রণিত করা ছাড়া কী-ই-বা আর সে করতে পারে। সে পুরোপুরি জানে এ দিয়ে ক্ষমতাসীন দলের কোন বাস্তব ক্ষতিই সে করতে পারবে না। রাস্তায় নামার সাহস নেই বলে হরতাল শেষ অব্দি হয়ত নিছক আহ্বান-সর্বস্ব একটা করুণ কাৎরানি হয়েই হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে, অফিস-আদালত কল-কারখানা সবই যথারীতি চলবে, কেবল ব্যক্তিগত ক্ষতির ভয়ে কিছু মানুষ যে দোকানপাঠ খুলবে না বা মহাসড়ক দিয়ে গাড়ি চলতে পারবে না এটুকু দেখেই হরতালকারীরা আপাতত আত্মসান্ত্বনা পাওয়ার চেষ্টা করবে।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিভিন্ন দলের মধ্যে যে সৌহার্দ্য ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বা শোভন আচরণ থাকার কথা তা এসব কারণেই আমাদের রাজনীতি থেকে আজ পুরোপুরি উধাও। সবাই জানেন আমাদের দু’দলের শীর্ষ দুই নেত্রীর মধ্যে বাক্যালাপ পর্যন্ত নেই। থাকলেও তেমন লাভ হত না। স্বৈরতান্ত্রিক অবস্থান ও সংঘাতের কারণে অচিরেই তা বন্ধ হয়ে যেত। ব্যাপারটা এখন শীর্ষ নেতাকর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ কর্মীতে এসে ঠেকেছে। দু’দলের কর্মী বা নেতাদের মধ্যে সুসম্পর্ক থাকাকে সন্দেহজনক দৃষ্টিতে দেখা হচ্ছে ও দলদ্রোহিতার অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। পরিবর্তে ঘৃণা, বিদ্বেষ, সহিংসতা ও প্রত্যাঘাত দু’দলের প্রতিটি সদস্যের প্রতিমুহূর্তের আচরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ যে কতখানি সহিংসরূপ নিয়েছে তা বোঝা যায় একটি পরিচিত টিভি চ্যানেলে জনপ্রিয় একটি টকশো দেখলে! এটা একটা ঝগড়ার অনুষ্ঠান। ঝগড়া দেখলে মানুষ এক ধরনের স্থূল ও বিকৃত মজা পায়, এতে অকর্ষিত জনতার কাছে অনুষ্ঠান জনপ্রিয় হয়, ফলে বিজ্ঞাপন ও আয় বাড়ে। মূলত এ কারণেই চ্যানেলটি অনুষ্ঠানটিকে দীর্ঘদিন ধরে চালিয়ে যাচ্ছে। বলাবাহুল্য অনুষ্ঠানটির জনপ্রিয়তা এখন তুঙ্গে। অনুষ্ঠানটায় দু’দলের একজন করে মন্ত্রী, সাংসদ বা নেতা মুখোমুখি বসে এমন অমার্জিত ভাষা এবং অকর্ষিত চেহারা নিয়ে পরস্পরকে আক্রমণ করতে থাকে যা প্রায় জাতীয় অসম্মানের প্রতীক। স্থূলতার রগরগে অশ্লীল লালার সঙ্গে দর্শকরা তা মজাদার চাটনির মতো উপভোগ করে। অনুষ্ঠানটিতে উপস্থাপকের দু’পাশে বসে থাকে দু’জন ক্ষিপ্ত জন্তুসুলভ মানুষ। তাদের ভয়ঙ্কর চোখমুখ আর মারমুখো চেহারা দেখলে বোঝা যায় অনুষ্ঠানের মধ্যেই হয়ত হাতাহাতি তারা শুরু করত, কেবল মাঝখানে একটা জল-অচল বৈদ্যুতিক বাধা থাকায় এ যাত্রা তেমন কিছু হল না। এ দৃশ্যের ব্যতিক্রম হয় খুবই কমই। তাদের কথা শুনে মনে হবে তাদের নিজ নিজ দল যা করছে তাই শ্রেষ্ঠ। অন্যদল যা করছে সবই দুর্নীতি, সন্ত্রাস আর জঘন্য অপরাধ। কে বিরোধী পক্ষকে কতখানি দলীয় ও ব্যক্তিগতভাবে জখম করতে পারছে তার ওপর নির্ভর করছে দলের ভেতর ঐ নেতা বা কর্মীর উন্নতি। এ ঘটছে জাতীয় রাজনীতির সবখানে, ঐ অনুষ্ঠানে আমরা তার প্রতীকী রূপটি দেখছি মাত্র। সন্ত্রাসীরা, খুনিরা, আক্রমণকারী ঘাতক ও কালো টাকার মালিকরা ক্রমাগত দলের মধ্যে প্রাধান্য বিস্তার করেছে।
বিরুদ্ধ দলের মধ্যে ভাল কিছু দেখা বা নিজের দলের মধ্যে বিন্দুপরিমাণ খারাপ খুঁজে পাওয়া দুটোই এখন পুরোপুরি নিষিদ্ধ। এ করলে নিজ দল থেকে পত্রপাঠ বিদায় নিতে হয়। তাই সত্যভাষণ বা বিবেকের কাছে দায়বদ্ধতা দুটো দল থেকেই বিদায় নিয়েছে। রাজনীতি পুরোপুরি বিভক্ত হয়ে গেছে শাদা আর কালোয়। সত্য যে একটা ধূসর এলাকা, শাদা কালো মেশানো এ দুয়ের মাঝামাঝি জিনিস তা যেন কেউ শোনেও নি কখনও। বিবেক ন্যায় বা শুভবুদ্ধির কথা শোনার মানুষ রাজনীতিতে এখন আর নেই। যারা এসব তুলতে চাচ্ছে তারা আক্রান্ত ও বিতাড়িত হচ্ছে।
১২...
দুটি স্বৈরতন্ত্রের প্রত্যেককে বিরুদ্ধ পক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টায় ও বিরুদ্ধ পক্ষের হাতে নিজের নিশ্চিহ্ন হওয়া ঠেকাতে এমন নিষ্ঠুরভাবে ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে যে দল দু’টিকেই নিজ দলের স্বৈরাচারকে নিñিদ্র ও নির্মম করে তুলতে হচ্ছে। এর একটি কুফল হল দলের ভেতরকার গণতন্ত্রের বিলুপ্তি। প্রতিটি দলেই ঘটেছে এটা। দলগুলো এখন চলেছে দল প্রধানের পুরোপুরি নিজস্ব ইচ্ছায়। দলের গঠনতন্ত্রও তৈরি হয়েছে সম্পূর্ণ তার অনুকূলে, দলের কর্মী বা নেতাদের চাওয়া-পাওয়াকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে। গঠনতন্ত্রে গণতান্ত্রিক কিছু থাকলেও দলের প্রধান ও শীর্ষ ব্যক্তিদের আচরণে তা প্রত্যাখ্যাত। দলের বার্ষিক কাউন্সিল হবে কী হবে না, হলে ক’বছর পরে, সেখানে কে কতখানি বলবে বা কার কথা শোনা হবে না হবে তা নিরঙ্কুশভাবে দল-প্রধানের। সে সভায় (যদি সভা আদৌ হয়) যা কিছু কথাবার্তা তার সবই তার গুণগান, এবং সব বিষয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই দল প্রধানের একক ইচ্ছার হাতে সমর্পিত। জাতীয় সংসদের যাবতীয় মনোনয়ন চলছে দল-প্রধানের ইচ্ছায়, প্রার্থীদের টাকার বিনিময়ে কিনতে হচ্ছে মনোনয়ন, ফলে দেদারসে জমে উঠেছে রমরমা মনোনয়ন বাণিজ্য, সেখানে তৃণমূল নেতাকর্মীদের পছন্দ-অপছন্দ, মতামত বা গণতান্ত্রিক অধিকার পুরোপুরি উপেক্ষিত হচ্ছে।
বাংলাদেশের খোদ সংবিধানই যদি দল প্রধানের এই সর্বময় কর্তৃত্ব নিশ্চিত করে থাকে তবে কেনই বা তারা এই ক্ষমতা স্বেচ্ছাখুশিতে ব্যবহার করবেন না। কেন দলের ভেতর গণতন্ত্র দিয়ে নিজের কর্তৃত্বের সমস্যা বাড়াবেন।
১৩...
এই পরিস্থিতির কারণে দলগুলোর আদর্শিক অবস্থান পুরো ভেঙে পড়েছে। নির্বাচন-জয়ের মরিয়া চেষ্টায় দলগুলো দলীয় চেতনা বা আদর্শের সম্পূর্ণ বিরুদ্ধবাদী শক্তির সঙ্গেও মোর্চা করতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে রাজনীতি পরিণিত হচ্ছে নিখাদ ক্ষমতা ও স্বার্থের দ্বন্দ্বে। জয়ের লিপ্সা আর পরাজয়ের আতঙ্ক দলের ভেতরকার ন্যায়নীতি, আদর্শ ও গণতান্ত্রিক চেতনাকে চুরমার করে দিয়েছে। নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হওয়ায় কালো টাকা আজ নির্বাচন মাঠের ঈশ্বরে পরিণত হয়েছে। জয় নিশ্চিত করার জন্যে তাই কেবল বিরোধী আদর্শের সঙ্গেই যে দলগুলো হাত মেলাচ্ছে তাই নয়, দলের ভেতরকার দুর্বৃত্ত আর কালো টাকার মালিকদেরও নির্বিকারে প্রাধান্য দিয়ে চলেছে। দলের পরীক্ষিত ও আত্মোৎসর্গিত সদস্যদের বদলে অবৈধ টাকার মালিক এবং জনগণ প্রত্যাখ্যাত ব্যক্তিরাই সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন পেয়ে যাচ্ছেন। ফলে দলের ভেতরকার সৎ ও আত্মোৎসর্গিত নেতাকর্মীরা তাদের ভেঙে যাওয়া হৃদয়ের সাথে নিঃশব্দে দল থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে জাতীয় সংসদের ভেতর শুভশক্তির বিলুপ্তি ঘটেছে এবং স্থূল ও দাঁতাল পশুশক্তি জাতির কর্তৃত্ব দখল করছে।
মনে রাখতে হবে আমাদের জাতির কোনদিন নিজস্ব রাষ্ট্র ছিল না। আমরা একটি রাষ্ট্রের অভিজ্ঞতাহীন জাতি। নিজেদের ভাগ্য নির্মাণের অধিকার আমরা কখনও পাইনি। আমরা এমন এক যুগসন্ধিতে আজ দাঁড়িয়ে আছি যখন আমরা নিজেদের একটি রাষ্ট্র পেয়েছি কিন্তু তার যোগ্য কাঠামো গড়ে তুলতে পারিনি। আমার এই লেখা সেই শূন্য সময়ের গল্প। ধীরে ধীরে আমাদের রাষ্ট্রের কাঠামো গড়ে উঠলে, এর অঙ্গগুলো সুপরিণতি পেয়ে শক্তপোক্ত হলে এই নৈরাজ্য প্রকৃতির নিয়মেই কমতে থাকবে।
১৪...
আজ প্রতিটি দলের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন ও আত্মোৎসর্গিত নেতাকর্মীদের সঙ্গে সারা জাতি যদি সমবেত হয়ে সংবিধান পরিবর্তনের মাধ্যমে দলের ভেতর দল প্রধানের নিরঙ্কুশ কর্তৃত্বের অবসান না ঘটায় তবে জাতীয় জীবনে গণতন্ত্রের বিকাশের পরিবর্তে তার পুরো বিলুপ্তি ঘটবে এবং দুই স্বৈরনায়কের নেতৃত্বে জাতি অচিরেই সংঘাতের ভেতর বিধ্বস্ত হবে। আমাদের দেশের দলগুলোর কর্মী ও নেতারা যদি একনায়ক বা রাজার অধীনস্থ রাজনীতিবিদ হতেন তবে এই আক্রোশ ও হতাশা তাদের জন্যে এমন অসহনীয় হতো না। কারণ অধীনতার দাসখত দিয়েই তারা তখন রাজনীতিতে আসতেন। কিন্তু স্বাধীন সত্তাসম্পন্ন গণতান্ত্রিক নেতার পক্ষে এই দাসত্ব দুর্বিষহ। কেবল রাজনীতিবেদরা নয়, গোটা জাতি আজ মূলত দুটি দলনায়কের হাতে জিম্মি। দেশের প্রধান দুর্দৈব হিসেবে সবাই আজ নাম ধরে তাদের চিহ্নিত করছে। তাদের অপশাসনের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগতভাবে প্রতিমুহূর্তে বিদ্বেষ প্রকাশ করছে, কিন্তু কিছুই করতে পারছে না। বুঝতেও পারছে না ব্যাপারটা দুজন বা চারজন মানুষের ব্যক্তিগত ষড়যন্ত্রের ফলে ঘটছে না, ঘটছে সংবিধানের ধারাটির কারণে। এ থেকেও বোঝা যায় জাতির ভাগ্যের ক্ষেত্রে সংবিধান কত বড় জিনিশ, একটা ছোট্ট অনুচ্ছেদ কীভাবে জাতির অগ্রযাত্রাকে পুরো রুখে দিয়ে তাকে খাদের মধ্যে ফেলে দিতে পারে। এই অনুচ্ছেদের মাধ্যমে আমরা গণতন্ত্রের নামে কার্যত বংশগত রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছি। ইলিয়ড মহাকাব্যে হেলেনের অপহরণকারী রাজপুত্র প্যারিস গোটা ট্রোজান জাতিকে যে দুঃস্বপ্নের মধ্যে ফেলেছিল, এই অনুচ্ছেদও যেন আজ আমাদের জাতির জীবনকে প্রায় তাই করছে। সংবিধান একটা জাতির জীবনে হালের মতো। হাল একটু এদিক ওদিক বেঁকে গেলে যেমন বহু লোক একসঙ্গে দাঁড় টেনেও নৌকার গতি ফেরাতে পারে না, তেমনি সংবিধানের কোথাও বড় ধরনের ত্রুটি থাকলেও জাতির বিপর্যয় ঠেকানো দুরূহ হয়। কাজেই দরকার সংবিধানকে ঠিক পথে নিয়ে আসা। লাইনচ্যুত ট্রেনকে আবার লাইনের ওপর দাঁড় করানো।
১৫...
দুই স্বৈরাচারের ফলে দেশের সবচেয়ে বড় যে ক্ষতিটি হয়েছে তা হল গোটা জাতিকে এ পুরোপুরি দ্বিখণ্ডিত করে ফেলেছে। এদের এই অনিচ্ছাকৃত সংঘাত আমাদের দরিদ্র দেশটির সমৃদ্ধি ব্যাহত করে, গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে নিজেদের অন্ধকার কবর খোঁড়ার দিকে এগিয়ে নিচ্ছে। বছর পঁচিশ তিরিশ আগে রাশিয়া থেকে প্রকাশিত শিশুদের একটি সচিত্র গল্পের বই দেখেছিলাম। বইটি দুটি বেড়ালের ঝগড়া নিয়ে। বইটির শুরুতে আছে সকাল বেলার ছবি। দুটো শাদা লোমওয়ালা হৃষ্টপুষ্ট বেড়াল কিছু একটা নিয়ে মারামারি শুরু করেছে। পরের ছবিটি সন্ধ্যার। সারাদিন মারামরি করার পরের দৃশ্য। তাতে দেখা যাচ্ছে দু’জনের গোটা শরীর রক্তাক্ত, ছিন্নভিন্ন। আগাগোড়া শরীর পুরু ব্যাণ্ডেজে বাঁধা। কেবল চোখ আর লেজদুটো অক্ষত। আজ আমাদের জাতির দিকে তাকিয়ে ঠিক ঐ ধরনের একটা আশঙ্কা হচ্ছে। মনে হচ্ছে ছিন্নভিন্ন অবস্থায় অমনি অবশিষ্ট একজোড়া চোখ আর লেজ নিয়ে জাতির রাজনীতির মতো আমরাও কি তাহলে শেষ হব! মহাভারতের যুদ্ধের কথা মনে পড়ে। কী দীর্ঘ শ্বাসরুদ্ধকর উদ্ধারহীন একটা যুদ্ধ। দু’পক্ষে কত মহা মহা যোদ্ধা, কত অযুত অক্ষৌহিণী (ডিভিশন) সৈন্য যুদ্ধ করল। কিন্তু যুদ্ধ শেষে পাণ্ডবেরা বিজয়ীর বেশে যখন জনশূন্য নিঃশব্দ হস্তিনাপুরের রাজপথে প্রবেশ করল তখন তাদের সঙ্গে মাত্র কয়েক হাজার সৈন্য। সবই যদি ধ্বংসের আগুনে ছাই হয়ে গেল তবে পৃথিবীকে ভোগ করবে কে?
আমি নিশ্চিত রাজনীতির দুটি পক্ষের কেউই এই অনভিপ্রেত পরিস্থিতি চান না। কেবল তারা কেন, ন্যূনতম মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষও এটা চাইতে পারে না। কিন্তু রোমান গ্ল্যাডিয়েটাররা যেমন রাজার খেয়ালি ইশারায় শুধুমাত্র জীবন বাঁচানোর তাগিদে বন্ধু হয়ে বন্ধুকে হত্যা করতে বাধ্য হতো, সংবিধানের এমনি ক্ষতিকর একটি ধারার জন্যে আজ তেমনি রাজনৈতিক দলগুলো একে অন্যকে নিশ্চিহ্ন করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। এই হিংস্রতা দল ছেড়ে এখন রাজনৈতিক নেতাকর্মী, সমর্থক এমনকি সাধারণ মানুষের মধ্যেও সংক্রমিত হয়েছে- যেসব রাজনৈতিক নেতাকর্মীর সম্পর্ক চার পাঁচ দশক ধরে ছিল উষ্ণ ও বন্ধুত্বপূর্ণ, যারা ছিলেন একটি বড় ও অভিন্ন রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য।
১৬...
সব দেশেই সাধারণ মানুষ চাকরি-বাকরি, অফিস-আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্যের মতো ব্যাপার-স্যাপার নিয়েই জীবন কাটায়। দেশের ভালোমন্দ দেখভালের দায়িত্ব তারা তুলে দেয় রাজনীতিবিদদের হাতে। সরকার পরিচালনার জন্যে ভোট দিয়ে জনগণ রাজনীতিবিদদের নির্বাচিত করে ছুটি নেয়। এটাই আধুনিক রাষ্ট্রের ধারা। কিন্তু ক্ষমতা নিরঙ্কুশ করতে ও অস্তিত্ব বিলুপ্তির ভয়ে দুটি পক্ষই আজ দেশের প্রতিটি মানুষকে রাজনীতির ভেতর জড়িয়ে ফেলতে বাধ্য হয়েছে। আজ দেশের প্রতিটি মানুষই তাই প্রায় রাজনীতিবিদ। জনগণ বলে এখন আর প্রায় কেউ নেই। ছাত্র, শিক্ষক, উকিল, সাংবাদিক, ডাক্তার, বিচারপতি সবাই রাজনৈতিক নেতা, রাজনৈতিক কর্মী। শিক্ষ এমনকি বিচারপতির চেহারার ভেতরও যেন জেগে উঠছে মাস্তান আর সন্ত্রাসীর ঘাতক মুখ। প্রতিটি মানুষ আজ যেন রাজনৈতিক মাস্তান। সুশীল সমাজও আজ পুরো রাজনৈতিক সমাজ। অবস্থা দেখে মনে হয় কিছুদিনের মধ্যে সদ্যোজাত শিশুরাও জিন্দাবাদ দিয়ে রাস্তায় বেরোবে।
গল্পটা খুব সম্ভব নাসিরুদ্দিন হোজ্জার। হোজ্জাকে একবার জিগ্যেস করা হয়েছিল, ‘সকালে ঘুম থেকে উঠে মানুষেরা কেন একেকজন একেকদিকে যায়। কেউ যায় ব্যবসা-বাণিজ্যে, কেউ চাকরিতে, কেউ অফিস-আদালতে, কেউ স্কুল-কলেজে।’ প্রশ্ন শুনে হোজ্জা হেসে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘সবাই একদিকে গেলে পৃথিবীটা কাত হয় যাবে যে।’ আমাদের দেশেও হয়েছে তাই। সবাই রাজনীতিবিদ হওয়ায় দেশটা আজ রাজনীতির দিকে কাত হয়ে গেছে। আজ মানুষের মুখে, প্রিন্ট-ইলেকট্রনিক মিডিয়ায়, রাস্তায়, গঞ্জে, হাটে-বাজারে একমাত্র আলোচ্য বিষয় রাজনীতি। আজ সেই মানুষই ভাগ্যহীন, যে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নয়। দুই দলের নেতৃত্বে দেশে আজ যে অবাধ লুণ্ঠন চলছে সে-ই আজ কেবল তার ভাগ থেকে বঞ্চিত।
দুই বৈরী স্বৈরতন্ত্রের কারণে গোটা দেশ দ্বিখণ্ডিত হয়ে পড়ায়, সমাজ, পরিবার, জনজীবন থেকে শুরু করে প্রতিটি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান আজ ভেঙে গিয়ে পরিণত হয়েছে দুটি প্রতিষ্ঠানে। সাংসদরা পারলে জাতীয় সংসদকেও হয়তো এতদিনে দুভাগ করে ফেলত; পারেনি কেবল সাংবিধানিক বাধার কারণে। জাতীয় জীবনের প্রতিটি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে ঘটছে এই ঘটনা। এগুলোর প্রত্যেকটি আজ দ্বিখণ্ডিত হয়ে দুটো আলাদা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। দেশ পরিণত হয়েছে দুটি দেশে। ফলে বিবেক ও জনস্বার্থের প্রতিনিধি সুশীল সমাজের কল্যাণধর্মী নেতৃত্ব এগুলো এসব প্রতিষ্ঠান থেকে বিদায় নিয়েছে এবং বিভক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর দুটো অংশই দুই মোর্চার অকর্ষিত রাজনৈতিক নেতাকর্মীর অবারিত চারণ ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। লুণ্ঠন আর স্বার্থলোলুপতা ছাড়া আজ আর কোনো আপাত লক্ষ্য এগুলোতে নেই। ছাত্র, শিক্ষক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, সাংবাদিক, আইনজীবী-এদের কারো সংগঠনই আজ একটি নয়, দুটি। দুটি যুদ্ধোন্মাত্ত রাজনৈতিক দলের মদদে এখন পরস্পরের বিনাশে এরা বদ্ধপরিকর। যে রাজনৈতিক দল রাষ্ট্র-ক্ষমতায় আসছে সেই দলের সমর্থকরা বিরুদ্ধপক্ষকে তাদের প্রতিষ্ঠান থেকে পুরোপুরি তাড়িয়ে গোটা প্রতিষ্ঠানটি দখল করে স্বৈরাচারী ধাঁচে সেটিকে লুণ্ঠন ও পরিচালনা করছে।
১৭...
এককথায় স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের স্বার্থে দেশের প্রতিটি সংগঠন আজ দলীয়করণের শিকার। এদের মধ্যে যে দলীয়করণটি জাতির জন্যে সবচেয়ে বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে তা হল আমলাতন্ত্রের দলীয়করণ বা দ্বিখণ্ডকরণ। রাজনৈতিক আদেশ নির্দেশে কাজ করলেও সংসদীয় রাজনীতিতে আমলাতন্ত্রের নিজস্ব একটি সার্বভৌম ও কল্যাণধর্মী ভূমিকা আছে। দেশের জনগণের কাছে তাদের যেমন আছে নৈতিক দায়বদ্ধতা তেমনি রাজনৈতিক নেতৃত্বকে জনকল্যাণের অনুকূলে পরামর্শ ও সহায়তা দেওয়াও তাদের কর্তব্য। তাছাড়া সংসদীয় গণতন্ত্রে যে কোনো মুহূর্তে সরকার বদল ঘটতে পারে বলে আমলাতন্ত্রের নিরপেক্ষতা এই পদ্ধতিতে হতে হয় নিরঙ্কুশ। বহুদিন ধরে এদেশের আমলাতন্ত্রের চরিত্র কার্যত ছিল নিরপেক্ষই। পাকিস্তানি আমল তো বটেই এমনকি বাংলাদেশ আমলের এরশাদের যুগ পর্যন্ত এ ছিল অনেকটাই তাই। কিন্তু গত দুই সরকারের আমলে ক্রমাগতভাবে আমলাতন্ত্রকে ভেঙে দ্বিখণ্ডিত করা হয়েছে। এ করা হয়েছে মূলত দুটো কারণে। প্রথম কারণটি নিয়ে আগে কিছু কথা বলে নিই।
আগেই বলেছি আমলাতন্ত্রের মাধ্যমে সরকার রাষ্ট্রযন্ত্র পরিচালনা করলেও এই ভূমিকার বাইরেও রাষ্ট্রের স্থিতিস্থাপকতার স্বার্থে আমলাতন্ত্রের একটা শুভত্বমুখী ভূমিকা থাকে। রাষ্ট্রের আইনকানুন ও নীতিমালা নিরপেক্ষভাবে সমুন্নত রাখা তার কর্তব্য। এই নিরপেক্ষতা ও ন্যায়নীতি সরকারের নির্বিচার দুরভিসন্ধি ও দুর্নীতিগ্রস্ত পদক্ষেপগুলোকে বাধাগ্রস্ত করে। তাই স্বৈরতন্ত্রকে নিñিদ্র করতে চাইলে আমলাতন্ত্রকে দলীয়করণ করা অনিবার্য হয়ে যায়। দেশের প্রতিটি মানুষের মতো আমারও সঙ্গতভাবেই কোনো না কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শ আছে। কিন্তু তা নিতান্তই তাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার। জনস্বার্থ, বিবেক বা পেশাগত আচরণে সেই মতাদর্শের কোনো ভূমিকা নেই। কিন্তু দলীয়করণ করতে গিয়ে ক্ষমতাসীন দল তার মতাদর্শের সমর্থক আমলাদের আজ দলীয় রাজনীতিবিদে পরিণত করেছে। প্রজাতন্ত্রের সেবককে পরিণত করা হয়েছে দলীয় ক্যাডারে। পেশাগত নৈতিকতা ও রাষ্ট্রীয় কল্যাণ বর্জনের পারিতোষিক হিসেবে চাকরি ক্ষেত্রে তাদের যে পুরস্কার দিতে হয়েছে তাতে আমলাতন্ত্রের কর্তৃত্ব-পারম্পর্য বিপন্ন হয়ে পড়েছে। নিজ দলের অযোগ্য আমলাদের পদোন্নতি দিয়ে উঠানো হযেছে বিপরীত মতাদর্শের যোগ্য আমলাদের ওপরে। অকারণে বঞ্চিত করা হয়েছে বহু যোগ্য মানুষকে। এর ফলাফল হয়েছে নির্মম। গোটা চাকরিজীবন জুড়ে যে অধস্তন কর্মকর্তা কোনো একজনকে স্যার বলে সম্বোধন করেছে আজ সেই অধনস্তকেই উল্টো তাকে স্যার বলে সম্বোধন করতে হচ্ছে। এই অবমাননা বহু কর্মকর্তার হৃদয়কে রক্তাপ্লুত করেছে। দু’দলের যে বিরাট সংখ্যক কর্মকর্তা এভাবে বিরুদ্ধ দলের সরাসরি আক্রমণের শিকার হচ্ছে তাদের মিলিত ঘৃণা আর প্রতিরোধ দু’দলকে আত্মধ্বংসী সংঘাতে জড়িয়ে ফেলেছে এককালের বন্ধু, প্রিয়, শ্রদ্ধেয় ও স্নেহাস্পদেরা স্বৈরাচারের স্বার্থোদ্ধারের গুঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আজ পরস্পরের বিনাশে উদ্যত। অথচ গোটা চাকরিজীবন ধরে তারা বাস করেছে সৌহার্দ্য ও প্রীতিপূর্ণ পরিবেশে। ফলে যুগ যুগ ধরে আমলাতন্ত্রের ভেতর শ্রেয়বোধ ও নিরপেক্ষতার যে উচ্চ ঐতিহ্য গড়ে উঠেছিল তা লুপ্ত হয়েছে এবং নৈরাজ্যের ভেতর আমলাতন্ত্র মুখ থুবড়ে পড়েছে।
আগেই বলেছি আমলাতন্ত্রের দলীয়করণ বা দ্বিখণ্ডিতকরণের সবচেয়ে বড় কারণ পরবর্তী নির্বাচনে দলের বিজয় নিশ্চিত করা। অর্থাৎ স্বৈরতন্ত্রকে দুটি থেকে স্থায়ীভাবে একটিতে নামিয়ে আনা। এটা করতে গিয়ে আমলাতন্ত্রের কর্তৃত্ব-পারম্পর্যকে পুরো লন্ডভন্ড করে ফেলতেও দ্বিধা করা হয়নি ও নিজ দলের সমর্থকদের এমনভাবে ওপরে তোলা হয়েছে যাতে তারা গোপন ষড়যন্ত্রের পথে বিজয় নিশ্চিত করতে পারে। কেবল আমলাতন্ত্র নয়, গোটা রাষ্ট্রযন্ত্রটাকেই এভাবে দ্বিখণ্ডিত করা হয়েছে।
গণতন্ত্রের প্রাণ নির্বাচন এবং নির্বাচনের প্রাণ নির্বাচন কমিশন। এই নির্বাচন কমিশনকে পূর্ণ স্বাধীনতা তো দেওয়া হয়ই না, বরং তাকে পুরো দলীয়করণ করে নির্বাচনে বিজয় নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচন সুষ্ঠু না হওয়া গণতন্ত্র হত্যারই শামিল। এতে নির্বাচিত সরকার জনচক্ষে কার্যত অবৈধ হয়ে যায়। এ অবস্থায় ক্ষুব্ধ পরাজিতদের সহিংস প্রতিরোধের মুখে গৃহযুদ্ধ, সামরিক শক্তি কিংবা অন্য কোনো অকর্ষিত ক্ষমতাগোষ্ঠীর উত্থান ঘটে গণতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
নির্বাচন কমিশনের মতো বিচার বিভাগকে দলীয়করণ করে বিচারের নিরপেক্ষতার ঐতিহ্যকে যেমন নষ্ট করা হয়েছে তেমনি পাবলিক সার্ভিস কমিশনকে দলীয়করণ করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর নিজ নিজ দলের কর্তৃত্বকে নিñিন্দ্র করা হয়েছে। দেশের পেশাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে শুরু করে তাবৎ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চাকুরেদের নিয়োগ, পদোন্নতি ও সুযোগ সুবিধার ক্ষেত্রে চলেছে এই বৈষম্য।
About: mid tip
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
eCoxs Special
BNM Archive
- ► 2026 (1332)
- ► 2025 (3280)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
-
▼
2013
(14877)
-
▼
August
(269)
-
▼
Aug 15
(12)
- দৃষ্টিনন্দন ক্যাম্পাসে নষ্ট রাজনীতির থাবা by ফরিদ ...
- বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অপপরিকল্পনার শিকার...
- কেন তত্ত্বাবধায়ক ভীতি by আহমেদ সুমন
- ভালোবাসায় সব জয় করা যায় by নুরুল ইসলাম বিএসসি
- ১৫ আগস্ট ট্রাজেডি : বঙ্গভবন ও ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের...
- দলীয়করণ by আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ
- নিজের পছন্দে একটি প্রেমও করিনি, অন্যের পছন্দের বলি...
- জামায়াত মৌলিক বিষয়ে কম্প্রোমাইজ করবে না: ডা. তাহের...
- সজীব ওয়াজেদ জয়, আপনাকেই কিছু কথা by শাখাওয়াৎ নয়ন
- যুদ্ধাপরাধের কোন ২ রায় কার্যকর? by সাজেদুল হক
- নিউইয়র্কের রাস্তায় প্রিয়াঙ্কা
- রক্তাক্ত বলকানে শান্তির সন্ধানে by মোশাররফ হোসেন ভূঞা
-
▼
Aug 15
(12)
-
▼
August
(269)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...
Recent Comments
Cox's Bazar Us Categories
Cox's Bazar Us Categories
Cox's Bazar Us Categories
প্রথম আলো
আন্তর্জাতিক
মানবজমিন
আলোচনা
কালের কণ্ঠ
উপ-সম্পাদকীয়
যুগান্তর
প্রথম পাতা
মতামত
জাতীয়
সমকাল
নয়া দিগন্ত
রাজনীতি
জনকণ্ঠ
সুশীল কথন
ভারত
অর্থনীতি
শেষের পাতা
বিনোদন
ক্রিকেট খেলা
দেশে দেশে
যুক্তরাষ্ট্র
মধ্যপ্রাচ্য
স্পেশাল প্রতিবেদন
নির্বাচন
প্রথম আলো
খেলা
খোলা কলম
আইন আদালত ও বিচার
ফুটবল খেলা
আমার দেশ
ইসরায়েল
বাংলানিউজ
মুক্তধারা
স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা
Lead
ফিলিস্তিন
রাজধানী
অপরাধ
আন্দোলন
এক্সক্লুসিভ
আইন ও মানবাধিকার
নারী
শিক্ষা
বিএনপি
সারা বিশ্ব
ক্রিকেট
ইরান
সাহিত্য
পাকিস্তান
মুক্তমঞ্চ
আওয়ামী লীগ
বাংলা ট্রিবিউন
দুর্নীতি
শিশু
সারা দেশ
বিশাল বাংলা
চট্টগ্রাম
ব্রেকিং নিউজ
সাউথ এশিয়ান মনিটর
সিলেট
ক্রীড়া
পার্সটুডে
অর্থ
খালেদা জিয়া
অর্থ ও বাণিজ্য
কালবেলা
শিল্প বাণিজ্য
চীন
বিবিসি বাংলা
কাশ্মীর
চতুরঙ্গ
খবরাখবর
প্রধানমন্ত্রী
বিশ্ব
নতুন বার্তা
হত্যা
ধর্ম
স্মরণ
গল্প
যুক্তরাজ্য
শিক্ষাঙ্গন
শেখ হাসিনা
ফুটবল
বার্তা২৪ ডটনেট
রস+আলো
সাক্ষাৎকার
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
মুসলিম
জাতিসংঘ
মুক্তিযুদ্ধ
রাশিয়া
মিডিয়া
হরতাল-অবরোধ
খেলা ধুলা
ছাত্রলীগ
প্রতিবেদন
ইতিহাস
ইউরোপ
সোহরাব হাসান
জামায়াতে ইসলামী
অমানবিক
সৌদি আরব
আলোকিত চট্টগ্রাম
পশ্চিমবঙ্গ
আইন
চাষাবাদ- কৃষি ও কৃষক
ফিচার
ভ্রমণ
মিজানুর রহমান খান
ওয়েছ খছরু
খোলা চোখে
বাংলাদেশ-ভারত
ইসলাম ও সমাজ
সিরিয়া
যৌন নির্যাতন
নারায়ণগঞ্জ
নারী ধর্ষণ
জাতীয় সংসদ
আনন্দ
খেলাধুলা
ব্যাংকিং ও বিনিয়োগ
বিজ্ঞান ও গবেষণা
মাদক
আফ্রিকা
সন্ত্রাস
আনিসুল হক
যৌন আবেদনময়ী
প্রবাস
মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান
ছুটির দিনে
সৈয়দ আবুল মকসুদ
সংখ্যালঘু
নকশা
বিজ্ঞান প্রজন্ম ও কম্পিউটার
গোল্লাছুট
তুরস্ক
আফগানিস্তান
বইপত্র
ড. মুহাম্মদ ইউনূস
অন্য আলো
প্রতারণা
ছবি
টাইমস্ আই বেঙ্গলী
প্রকৃতি
ব্যবসা বাণিজ্য
অপহরণ
দুর্ঘটনা
সাহিত্যালোচনা
গার্মেন্টস শিল্প শ্রমিক
ইউক্রেন
জাতীয় পার্টি
রাজশাহী
স্টেডিয়াম
দীন ইসলাম
তরুণ প্রজন্ম
মানবাধিকার
ফূটবল খেলা
রোহিঙ্গা
মিজানুর রহমান
মশিউল আলম
আলী যাকের
আইন ও বিচার
রুদ্র মিজান
হিন্দু
মানবকণ্ঠ
খুলনা
হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ
আব্দুল কাইয়ুম
তারেক শামসুর রেহমান
আসিফ নজরুল
নেপাল
মালয়েশিয়া
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
সাজেদুল হক
ফারুক ওয়াসিফ
কাফি কামাল
মৌলভীবাজার
হাসান ফেরদৌস
আনন্দ কণ্ঠ
তৃতীয় পাতা
যাপিত জীবন
স্বাস্থ্য
সড়ক দুর্ঘটনা
ক্রিখেট খেলা
ফুটবল খলা
বদরুদ্দীন উমর
মরিয়ম চম্পা
আলী রীয়াজ
রংপুর
জ্যোতির্বিজ্ঞান
টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া
নতুনের জানালা
বৃষ্টি ও বন্যা
মোস্তফা কামাল
এ এম এম শওকত আলী
কক্সবাজার
বন্ধুসভা
শিল্প ও সাহিত্য
সংবিধান ও রাষ্ট্র
বগুড়া
মিয়ানমার
ঢাকা
ঈদ বিশেষ সংখ্যা
বাংলাদেশ
অবৈধ-অনিয়ম-কারচুপি
এ কে এম জাকারিয়া
নির্বাচনী কূটনীতি
বদিউল আলম মজুমদার
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি
গবেষণা
মিসর
এম আবদুল হাফিজ
পরিবেশ
শোক
সংস্কৃতি
খবর
বাংলাদেশে
ব্রাহ্মণবাড়িয়া
অজয় দাশগুপ্ত
প্রজন্ম ডট কম
শুভ্র দেব
আবুল কাশেম
আমদানি ও রপ্তানি
ফ্রান্স
কিশোরগঞ্জ
আবদুল মান্নান
রঙের মেলা
ঐতিহ্য
জাপান
কুমিল্লা
মুক্তমত
রাজনৈতিক আলোচনা
শরিফুল হাসান
শিল্প
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল
মাহমুদুর রহমান
ময়মনসিংহ
লেবানন
সংবাদ২৪.নেট
পার্বত্য চট্টগ্রাম
সীমান্ত সন্ত্রাস
আহমদ রফিক
ইফতেখার মাহমুদ
কাজের খবর
ইরাক
স্বপ্ন নিয়ে
টাঙ্গাইল
HotTopic
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর
যশোর
জীবনযাপন
অমর সাহা
আনোয়ার হোসেন
আলী ইমাম মজুমদার
গাজীপুর
রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন
আবুল মোমেন
থাইল্যান্ড
মুফতি এনায়েতুল্লাহ
শ্রীলঙ্কা
চিকিৎসা
মেহেদী হাসান
সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়
রসালোচনা
কামরুজ্জামান মিলু
পরিবেশ-জীববৈচিত্র্য
বরগুনা
কাজী সোহাগ
স্মৃতিচারণ
আনু মুহাম্মদ
কলকাতা
কুলদীপ নায়ার
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
সারাবেলা
অস্ট্রেলিয়া
তথ্য প্রযুক্তি
মারুফ কিবরিয়া
ব্রাজিল
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম
অন্য দিগন্ত
মহিউদ্দীন জুয়েল
মুনতাসীর মামুন
শিরোনাম
শেখ রোকন
আবু সাঈদ খান
জেল থেকে জেলে
ফেসবুক
মহিউদ্দিন আহমদ
মানসুরা হোসাইন
সংবাদ
কবিতা
বিশ্বজিৎ চৌধুরী
আলী হাবিব
প্রকৃতি ও পরিবেশ
শিল্প ও বাণিজ্য
শেষ পাতা
আবু আহমেদ
এম সাখাওয়াত হোসেন
নুরুজ্জামান লাবু
নূর মোহাম্মদ
সুভাষ সাহা
আতাউস সামাদ
আলোচনা মতামত
অর্থনীতি ও বানিজ্য
এবিএম মূসা
আতাউর রহমান
কামাল আহমেদ
পিয়াস সরকার
আসাম
রংবেরং
রাহীদ এজাজ
শ্রদ্ধাঞ্জলি
আশরাফুল ইসলাম
ফেনী
বরিশাল
মসজিদ
রণজিৎ বিশ্বাস
রোকনুজ্জামান পিয়াস
অরুণ কর্মকার
প্রকৃতি ও বিজ্ঞান
মোস্তফা হোসেইন
ইয়েমেন
একরামুল হক
আশীষ-উর-রহমান
একরামুল হক শামীম
Exclusive
ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ
তুহিন ওয়াদুদ
অপরাজিতা
ইন্দোনেশিয়া
উত্তর কোরিয়া
কালি ও কলম
জলবায়ু ও পরিবেশ
জাগোনিউজ২৪.কম
মইনুল ইসলাম
মানিকগঞ্জ
মুহম্মদ জাফর ইকবাল
মোশতাক আহমেদ
আশরাফুল হক রাজীব
ফরহাদ মাহমুদ
প্রণব বল
শংকর কুমার দে
সেলিম জাহিদ
আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ
কামরুল হাসান
পার্থ প্রতীম ভট্টাচার্য্য
রাজীব আহমেদ
শিল্পী
সাময়িকী ফ্যাশন
দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু
বিদ্যুৎ
মোরসালিন মিজান
রবার্ট ফিস্ক
অভিজিৎ ভট্টাচার্য্য
ঈদ
কাজী সুমন
ঝিলিমিলি
মুস্তাফা জামান আব্বাসী
কুষ্টিয়া
জাতীয় নাগরিক পার্টি
মনজুরুল হক
মহসীন হাবিব
মাহবুব মোর্শেদ
রফিকুল ইসলাম
শিলালিপি
শুভ রহমান
চৌধুরী মুমতাজ আহমদ
ছিটমহল
নিবন্ধ
jugantor
নোবেল পুরস্কার
পাঠকের মতামত
পাবনা
মোশাররফ বাবলু
তানভীর সোহেল
মামুন রশীদ
আনন্দ প্রতিদিন
উৎপল রায়
এনামুল হক
কাজল ঘোষ
নদী দূষণ
নাটোর
নিত্যপণ্য
ফাহিমা আক্তার সুমি
বাংলা নববর্ষ
চারু শিল্প
ভেনেজুয়েলা
শওকত হোসেন
উচ্চশিক্ষা
নজরুল ইসলাম
নিউজিল্যান্ড
পার্থ সারথি দাস
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান
গোলাম মর্তুজা
ফরহাদ মজহার
শারমিন নাহার
principalsanaullah
আদিবাসী
কালের খেয়া
দিল্লি
ফখরুল ইসলাম
বাংলাদেশ প্রতিদিন
বিজ্ঞান
মুখোমুখি প্রতিদিন
মোহীত উল আলম
রাহাত খান
অমিতোষ পাল
গল্পালোচনা
পানি আগ্রাসন
প্রযুক্তি
বিশ্বজিৎ পাল বাবু
মাহবুব তালুকদার
আব্দুল কুদ্দুস
কানাডা
বিদেশ
WikiOpinion
তোফায়েল আহমেদ
তৌহিদা শিরোপা
কাতার
জনস্বাস্থ্য
আলোকিত বাংলাদেশ
কাদের সিদ্দিকী
ড. আবু এন এম ওয়াহিদ
ফারুক মঈনউদ্দীন
মোছাব্বের হোসেন
উৎপল শুভ্র
দিনাজপুর
নোমান মোহাম্মদ
সুদীপ অধিকারী
অরূপ দত্ত
পাভেল পার্থ
ফিরোজ মান্না
মাসুদ পারভেজ
রোজিনা ইসলাম
শরিফুজ্জামান
হামিদ-উজ-জামান মামুন
আকমল হোসেন
আজিজুর রহমান
আলম শাইন
ঝড় ও দুর্যোগ
তারেক মাহমুদ
দীপংকর চন্দ
পাভেল হায়দার চৌধুরী
ফখরে আলম
ফরিদপুর
মাসুদ রানা
শহিদুল ইসলাম
আবুল হাসনাত
আসিফ আহমেদ
ইশতিয়াক পারভেজ
জিয়া চৌধুরী
শিশির মোড়ল
হারুন হাবীব
হুমায়ূন আহমেদ
অমিত বসু
আল আমিন
ওমর ফারুক
ফজলুল বারী
ফারুক চৌধুরী
মাসুদ মিলাদ
শর্মিলা সিনড্রেলা
শাহাদুজ্জামান
হায়দার আকবর খান রনো
জাবেদ রহিম বিজন
জাহাঙ্গীর আলম
ট্রানজিট
নন্দন
যতীন সরকার
যুবলীগ
আরিফুজ্জামান তুহিন
কাজী আনিছ
খাবার
গাজীউল হাসান খান
তারেক রহমান
বাংলার দিগন্ত
মোহাম্মদ কায়কোবাদ
শেখ হাফিজুর রহমান
শৈলী
সাতকানিয়া
সুদান
কাজী হাফিজ
জার্মানি
জোবাইদা নাসরীন
নিয়ামত হোসেন
মাহফুজুর রহমান মানিক
লাতিন আমেরিকা
লুৎফর রহমান রনো
ইমরান আলী
এস এম আজাদ
জাহাঙ্গীর শাহ
মাহমুদুর রহমান মান্না
মুশফিকুর রহমান
সাতক্ষীরা
ইকতেদার আহমেদ
উৎসব
ঝিনাইদহ
মাসুদা ভাট্টি
মোকারম হোসেন
শেখ সাবিহা আলম
সিরাজগঞ্জ
সৈয়দ মাহবুবুর রশিদ
হারুন আল রশীদ
WikiEducation
উজ্জ্বল মেহেদী
কনকচাঁপা
ড. মাহফুজ পারভেজ
পরিতোষ পাল
মিঠুন চৌধুরী
শাহদীন মালিক
হায়দার আলী
আহমেদ জামাল
ইমদাদুল হক মিলন
নওগাঁ
পোশাকশিল্প
বাতায়ন
ব্যবসা
আবু সালেহ আকন
এমাজউদ্দীন আহমদ
টিপু সুলতান
ড. মাহবুব উল্লাহ্
ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী
শোকাবহ ১৫ ও ২১ আগস্ট
WikiInternational
এবনে গোলাম সামাদ
পারভেজ খান
ফজলুল আলম
ফরিদা আখতার
বিভাষ বাড়ৈ
মাহমুদুজ্জামান বাবু
মুনির হাসান
মোশতাক আহমদ
সুনামগঞ্জ
আপেল মাহমুদ
আরব আমিরাত বা দুবাই
জহির উদ্দিন বাবর
নোয়াখালী
রিপন আনসারী
শরীফুল ইসলাম
সুব্রত আচার্য্য
উপন্যাস
কাল স্রোত
ক্রীড়া দিগন্ত
খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ
গাজীউল হক
জাহীদ রেজা নূর
শাহনেওয়াজ বিপ্লব
সাইদুজ্জামান
সাময়িকী
অধ্যাপক শুভাগত চৌধুরী
অনন্যা আশরাফ
অনিকা ফারজানা
আদিত্য আরাফাত
ইফতেখার আহমেদ টিপু
কামাল লোহানী
ড. সা'দত হুসাইন
তামান্না ইসলাম অলি
দক্ষিণ কোরিয়া
ফারজানা লাবনী
ফারুক যোশী
মনজুর আহমেদ
রিয়েল-টাইম নিউজ
লিবিয়া
আসজাদুল কিবরিয়া
জলবায়ু
বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য বাপন
মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী
রশিদ মামুন
লক্ষ্মীপুর
সম্পাদকীয়
সাইফুদ্দীন চৌধুরী
সুমন বর্মণ
BBC
ইমরান রহমান
ইলিরা দেওয়ান
এম শাহজাহান
কাক ছোট গল্প
ছিনতাই
নওশাদ জামিল
নুরুন্নবী চৌধুরী
প্রতীক ওমর
বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম
বিকাশ দত্ত
মনিরুজ্জামান
মহিউদ্দিন আহমেদ
উইঘুর মুসলিম
দৈনিক ইত্তেফাক
পিটার কাস্টার্স
পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রিয় চট্রগ্রাম
বাজেট
বাণিজ্য
মোবাশ্বির আলম মজুমদার
সঞ্জয় সাহা পিয়াল
হবিগঞ্জ
খুন
টাকা আনা পাই
মাহবুবুর রহমান
শুভজ্যোতি ঘোষ
হাছান কুতুবী
Hot Topic
অমর একুশে বিশেষ সংখ্যা ২০১২
অমর একুশে বিশেষ সংখ্যা ২০১২
আবিষ্কার
ড. কামাল
দৈনিক ইনকিলাব
ফিলিপাইন
ভুটান
সাভার
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ
নিয়ন আলোয়
শফিক রহমান
শামীমুল হক
শেয়ারবাজার
আইন আদালত
ইতালি
গ্রিনল্যান্ড
নারী নির্যাতন
পটুয়াখালী
ফরিদ উদ্দিন আহমেদ
মণিপুর
মাগুরা
মেক্সিকো
অনিম আরাফাত
ইসলাম
কিরণ শেখ
জাভেদ ইকবাল
দুদক
রাঙ্গামাটি
Art Mag
আরিফুল ইসলাম
প্রতিবাদ
প্রবাসী বাঙালি
বান্দরবান
মহাকাশচারী
মালদ্বীপ
শফিকুল ইসলাম
শিক্ষানীতি
সংবিধান
ডিডাব্লিউ
শরিফ রুবেল
কূটনীতি
গাইবান্ধা
ঝালকাঠি
নরসিংদী
নাইজেরিয়া
বায়ুদূষণ
শাহনাজ পারভীন
স্বাধীনতা
WikiCity
WikiPolitics
বৌদ্ধ
মতিউর রহমান চৌধুরী
যৌন অপরাধ
WikiInterview
আকবর হোসেন
কিশোর আলো
জলবায়ু পরিবর্তন
দৈনিক সংগ্রাম
Exclusive Articles
WikiEconomy
WikiLaw
ইসলামী ছাত্রশিবির
ঘূর্ণিঝড়-হারিকেন
বাগেরহাট
ভূমিকম্প
রাজনৈতিক
সমিতির খবর
সানজানা চৌধুরী
সায়েদুল ইসলাম
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল
আমাদের সময় ডট কম
কুতুবদিয়া স্পেশাল
খাগড়াছড়ি
চুয়াডাঙ্গা
ধর্মঘট
আইন ও আদালত
কাদির কল্লোল
জোহরান মামদানি
তাইওয়ান
দুর্গোৎসব ও পূজা
দৈনিক আমার সংবাদ
নববর্ষ বিশেষ সংখ্যা 2013.
নূরে আলম সিদ্দিকী
প্রতিক্রিয়া
বিডিআর বিদ্রোহ
ব্যাংক
মুন্সীগঞ্জ
শিশুসাহিত্য
খ্রিষ্টধর্ম
গদ্যকার্টুন
প্রতিদিনের সংবাদ
ভোরের কাগজ
রুমিন ফারহানা
Hit
আর্জেন্টিনা
ইহুদি
পিরোজপুর
বন্যা
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
সরল গরল
Asia
গণমাধ্যম
ডেনমার্ক
পরামর্শ
প্রকৃত্
ভাষা
ভোলা
MERIT
Soikot
WikiWoman
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ
উন্নয়ন
জর্ডান
জ্বালানি
পিলখানা হত্যাকাণ্ড
ফ্যাশন
রঞ্জন বসু
সাংসদ
স্পেন
হরতাল
WikiCrime
উইকিলিকস
ক্রিকেট ও রাজনীতি
গণতন্ত্র
গোপালগঞ্জ
চাঁদপুর
চিত্রকর্ম
ছাত্ররাজনীতি
জঙ্গিবাদ
জন্মদিন
তেল-গ্যাস
দক্ষিণ ধুরুং
দূর পরবাস
নাকিবুল আহসান নিশাদ
নারী অধিকার
নোবেল শান্তি পুরস্কার
পঞ্চগড়
পরীক্ষা
বিজয় দিবস
মেঘালয়
রাঙামাটি
সুশাসনের জন্য নাগরিক
হামলা
আন্দালিব রাশদী
ঈদুল আজহা
এনটিভি
কক্সবাজার নিউজ ডটকম
কুতুবদিয়া নিউজ
চট্টগ্রাম বন্দর
ছাত্র রাজনীতি
ঠাকুরগাঁও
ডিজিটাল বাংলাদেশ
তথ্য অধিকার
দ্বিজেন শর্মা
নির্যাতন
নড়াইল
প্রবাসী শ্রমিক
ভারতের প্রধানমন্ত্রী
মৃত্যু
শারদীয় দুর্গোত্সব
শিশুমৃত্যু
শিশুহত্যা
সালমান রাফি শেখ
সুবীর ভৌমিক
সুশাসন
স্মৃতি
Africa
My Art
অধিকার
আন্তর্জাতিক নারী দিবস
একুশে টেলিভিশন
কলম্বিয়া
কুয়েত
চিঠিপত্র
চুক্তি
তিউনিসিয়া
দুর্যোগ
নির্বাচন ও রাজনীতি
নেত্রকোণা
পরিবহন
পর্যটন কেন্দ্র
প্রশাসন
ফ্রান্সিস বুলাতসিঙ্ঘালা
বেলজিয়াম
বড়ঘোপ
ভি এস নাইপল
ভৈরব
মরক্কো
মাওবাদী
মামলা
যানজট
লেমশীখালী
সংসদ
সন্ত্রাসী
সমাজ
সামাজ
সুন্দরবন
সৈয়দ দিদার বখত
সোমালিয়া
হংকং
Middle East
Principal Sanaullah
Special Day
অগ্নিসংযোগ
অমৃতবাজার পত্রিকা
অরবিন্দ কেজরিওয়াল
আইন ও অধিকার
আগুন ও মৃত্যু
আজকের কাগজ
আল মাহমুদ
আহসান কবির
এম.এ মান্নান
এল সালভাদোর
কমল জোহা খান
কিউবা
খাদ্যসমস্যা
চাঁপাইনবাবগঞ্জ
জঙ্গি
তথ্য অধিকার আইন
দ্য ডেইলি স্টার বাংলা
পানামা
পূর্বপশ্চিম
প্রাণি ও উদ্ভিদ
বঙ্গবন্ধু হত্যা বিচার
বন্য প্রাণী
বেলুচিস্তান
ভিয়েতনাম
ভোরের ঈদ ১৯
ভয়েস অফ আমেরিকা
যায়যায়দিন
লালমনিরহাট
শিক্ষা অধিকার
শিক্ষা ও সমাজব্যবস্থা
শিশুশিক্ষা
শ্রমিক
সন্ত্রাসবাদ
সুইডেন
সুজন সুপান্থ
NEWS
Palestine
fd
অরণ্যে রোদন
অরুণাচল
অর্থনৈতিক
অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক
ইকরাম সেহগাল
উত্তর ধুরুং
উমর মনজুর শাহ
একুশে ফেব্রুয়ারি
ঐতিহাসিক
কিশোরকণ্ঠ
কুড়িগ্রাম
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
কোরবান
ঘূর্ণিঝড়
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন
জর্দান
জাইমা রহমান
জাদুঘর
জামালপুর
জীবন
জেসমিন আখতার
জ্বালানি তেল
টেলিভিশন
তথ্যপ্র্রযুক্তি
তুষার আবদুল্লাহ
দেশপ্রেম
দৈনিক কক্সবাজার
নাগরিক সংবাদ
নারীঅধিকার
নিরাপত্তা
নির্বাচিত
নেদারল্যান্ডস
পাহাড়
পয়লা বৈশাখ
বঙ্গবন্ধু
বন্দর
বিশ্ব অর্থনীতি
বিশ্বকাপ ফুটবল
ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা
মহান বিজয় দিবস
মা
মাদারীপুর
মানবতা
মানববন্ধন
মিজোরাম
মিডিয়া ভাবনা
মে দিবস
শরীয়তপুর
শিক্ষা দিবস
শিক্ষা-প্রশাসন
শুভ বড়দিন
শেরপুর
সজীব ওয়াজেদ জয়
সময়চিত্র
সরেজমিন প্রতিবেদন
সাতকানিয়া পৌরসভা
সিঙ্গাপুর
সুইজ়ারল্যান্ড
সুশান্ত মজুমদার
স্মরণ সভা
স্মর্রণ
হাসান আজিজুল হক
America
Burma
Child
China
Hot Video
Huw Cordey
Latin America
Marwan Barghouti
Tom Geoghegan
Tom Heap
Washington
kolkata24x7
অ্যান্টার্কটিকা
আহমদ ছফা
আহমেদ মুনির
উখিয়া
উত্সব
উদ্যোগ
এসিড-সন্ত্রাস
ওমান
ওয়াসি আহমেদ
কর্মসূচি
কেনিয়া
ঘড়ি
চট্টগ্রাম বন্দর
চাকরি
চারদিক
চীন ও জাপান
জনসংখ্যা
জাকির তালুকদার
জাহাজ
জায়গা
জায়মা জারনাজ রহমান
জীবনী
জেলহত্যা দিবস
জ্বালানী সম্পদ
ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন
ড. সাজিদ হক
ডিজিটাল
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন
তিব্বত
ত্রিপুরা
নগরজীবন
নরওয়ে
নিবন্ধন
নীলফামারী
পবিত্র আশুরা
পবিত্র ঈদুল ফিতর
পরিকল্পনা
পানিসম্পদ
পুলিশ
পেরু
প্যারিস
প্রান্তকথা
প্রিয়.কম
প্রেক্ষিত
বর্নাঢ্য র্যালী
বলিভিয়া
বাংলাভিশন
বাজারসুবিধা
বাস্তবসম্মত
বিচার
বিশ্ব খাদ্য দিবস
বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস
বিশ্ব নদী দিবস
বিশ্ব প্রতিবন্ধী দিবস
বিশ্ব শিক্ষক দিবস
বিশ্ববিদ্যালয়
ব্যবস্থাপনা
ব্যাংক ব্যবস্থা
ব্রিটিশ
ভাষাসৈনিক
মাহমুদ আহমাদ
মুস্তাফিজ মামুন
মোস্তফা সরয়ার ফারুকী
যুদ্ধ ও শান্তি
যুদ্ধাপরাধ
যুদ্ধাপরাধের বিচার
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রাজবাড়ী
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
লবন চাষ
শহীদের স্মৃতি
শান্তি
শিল্প ও পরিবেশ
শিশুশ্রম
সন্ত্রাস ও রাজনীতি
সহজিয়া কড়চা
সিগন্যাল
সেলিনা হোসেন
স্বাধীন
স্বাস্থ্যনীতি
স্মরণ মুক্তিযুদ্ধ
স্মৃতিঘর
হাসপাতাল
Afghanistan
Bangladesh
Brazil
CNN
California
Comments
Croatia
Delhi
Denise Winterman
Dome of the Rock
God Mag
Google
Hugh Schofield
India
Indonesia
Jane O'Brien
Japan
Jeremy Bowen
Jerusalem
Jon Kelly
Kareem Khadder
Kate Dailey
Kim Ghattas
Lead News
Libya
Mahfuz Anam
Michal Zippori
New York
Nigeria
Pakistan
Paris
Paul Colsey
Qamrul Islam
Rosie Goldsmith
Rupert Wingfield-Hayes
Sanjoy Majumder
Source
South Sudan
The Daily Star
The Telegraph
Thomas Fessy
Tours
Vietventures
Wall Street
World's Last Chance
Young
a excellent photo in Kutubdia Island
bdnews24
google search
image
অদিতি ফাল্গুনী
অমানবিকতা
অযোগ্যদে
অসারপনা
আইনকানুন
আজারবাইজান
আদিবাসী দিবস
আনোয়ারা সৈয়দ হক
আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস
আফসার আমেদ
আবদুল লতিফ মাসুম
আবু আজাদ
আশান উজ জামান
আহমদ ফাহমি
ইথিওপিয়া
ইভ টিজিং
ইমরান খান
ইমাম খাইর
ইসলাম ও জীবন
ঈদের খুশি ও আনন্দ
ঈদের বেতন
উজবেকিস্তান
উপনির্বাচ
উপনির্বাচন
উর্দুভাষী
এ পি জে আবদুল কালাম
একুশে ফেব্রুয়ারি:
ঐতিহাস
ওবামা
কক্সবাজার নিউজ
কমিল্লা
কম্বোডিয়া
কলকাতার চিঠি
কাকন রেজা
কাজাখস্তান
কাটরা
কানাই কুণ্ডূ
কালের পুরাণ
কুতুবদিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়
কৈয়ারবিল
ক্রসফায়ার
ক্ষত
ক্ষমাপ্রার্থনা
ক্ষুদ্রঋণ
কয়লানীতি
খায়ের মাহমুদ
খোন্দকার শওকত হোসেন
গাম্বিয়া
গোধূলি
গোড়ার
গৌড়
গ্রামীণ অর্থনীতি
গ্রেপ্তার
ঘূর্ণিঝড় সম্পাদকীয়
ঘোড়া
চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচন
চরমোনাই পীর
চলতি পথে
চাঁদ
চাদ
চিনি
চিরকুট
চিলি
চেয়ারম্যান
ছাত্র-রাজনীতি
ছাড়পত্র
ছুটিদন
জজ হত্যা দিবস
জনদুর্ভোগ
জনস্বাস্থ্যের
জবাবদিহি
জম্মদিন
জলদস্যু
জাতিগত সহিংসতা
জারদারি
জি. মুনীর
জীবনযুদ্ধ
জীবিকা
জুমকন্যার
জ্বালানি রাজনীতি
জ্বালানি সম্পদ
জ্বালানিসম্পদ
জয়পুরহাট
ঝুঁকি
ঝুঁকি হ্রাস দিবস
টিপাইমুখ
টিপাইমুখ বাঁধ
টিপাইমুখে বাঁধ
টিভি চ্যানেল
টোঙ্গা
ঢাকা টাইমস
তানজির আহমেদ রাসেল
তুর্কমেনিস্তান
তেঁতুল
তেলকূপ দুর্ঘটনা
তেলিরকাটা
দক্ষিণ মগডেইল
দারিদ্র্য বিমোচন
দায়গুলো
দায়িত্ব
দুই দু’গুণে পাঁচ
দুর্গ
দূর পরবাসে
দেবনারায়ণ চক্রবর্তী
দৈনিক আজাদী
নগরদর্পণ
নদীকৃত্য দিবস
নববধূ
নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচন
নারীর ক্ষমতায়ন
নাসরীন জাহান
নাসিমা আনিস
নাসির উদ্দিনের স্বাভাবিক মৃত্যু
নিজাম কুতুবী
নিপীড়ন
নিরাপতা
নির্বাসনে
নিষেধাজ্ঞা’
নূরে আলম জিকু
নেতা ইমরান খান
নেতৃত্বে
নোযাখালী
পণ্যবাজার
পদক
পবিত্র হজ
পররাষ্ট্রনীতি
পরিস্থিতি
পর্তুগাল
পাঠকের মন্তব্
পাপুয়া নিউগিনি
পাপড়ি রহমান
পাসপোর্ট
পাহাড়ধস
পিলখানা হত্যা
পোল্যান্ড
পোশাক
প্রশ্নবিদ্ধ
প্রস্তাবিত
প্রাণীজী
প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ
প্রয়াণ
ফাঁসি
ফিনল্যান্ড
ফেরি ও পন্টুন
বঙ্গবন্ধু হত্যা
বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তন
বঞ্চনা
বনসম্পদ
বরিশাল ছাত্রলীগ
বর্ণবৈষম্যবিলোপ দিবস
বাঁকখালী
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি
বাংলাদেশের পতাকা
বার্লিন দেয়াল
বাল্যবিয়ে
বাস্তবা
বাস্তবায়
বিচার বিভাগ
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড
বিজ্ঞানচিন্তা
বিজ্ঞাপন
বিজয়
বিদ্যুত
বিদ্যুৎ-সংকট
বিদ্যুৎকেন্দ্রে
বিপ্রদাশ বড়ুয়া
বিলবোর্ড দুর্ঘটনা
বিলেতের স্ন্যাপশট
বিশ্ব কুষ্ঠ দিবস
বিশ্ব পরিবেশ দিবস
বিসিবি
বুলবন ওসমান
বুড়িগঙ্গা
বৃক্ষরোপণ
বৈশ্বিক উষ্ণায়ন
বৈষম্য
বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর
ব্যারিস্টার নাজির আহমদ
ব্রুনাই
বড়পুকুরিয়া
ভাজিরালংকর্ন
ভালোবাসা
ভাষণ
ভেজাল
ভোজ্যতেল
মংলা থেকে
মঈনুল হাসান
মঙ্গোলিয়া
মঞ্জু সরকার
মনযূরুল হক
মনি হায়দার
মন্ত্রিসভা
মাওবাদী সহিংসতা
মাতৃভাষা ও পরভাষা
মানচিত্র নিউজ
মানব
মানসিক স্বাস্থ্য দিব্স
মানসিকতা
মালি
মাল্টা
মাহবুব রেজা
মাহামুদা খাতুন
মিথিলেশ ভট্টাচার্য
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম
মুরগি জমা
মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন
মূল্যস্ফীতি
মৃত্যু ও কিছু ভাবনা
মোহাম্মদ কামরুজ্জামান
মোহাম্মদ মোশাররফ হুসাইন
ম্যাডোনা
ম্যান্ডেলা দিবস
যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল
যুদ্ধাপরাধ-বিচার
রক্ত
রদ্ধাঞ্জলি
রবাণিজ্যে
রাগবি
রাজনৈতিক সংস্কৃতি
রাজপথ
রাষ্ট্রীয়
রাস্তার
রিয়াল মাদ্রিদ
রুবেল হোসেনের
রেলওয়ের
রোমাঞ্চিত
রোমানিয়া
র্বিজ্ঞান
শক্তিশালী
শঙ্কা
শরীরের
শশী থারুর
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস
শাকিরা
শাহ্নাজ মুন্নী
শায়খ আহমাদুল্লাহ
শিক্ষক খুন
শিক্ষক-রাজনীতি
শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস
শিক্ষাচিত্রে
শিক্ষাবিদের
শিবের গীত
শুঁটকি উৎপাদন
শেরাটনীয়
শোনা
শ্রদ্ধাঞ্জল
শ্রমবাজার
শ্রমশক্তি
ষড়যন্ত্র
সংকট
সংঘাত
সংশোধন
সঙ্গী
সততা
সন্দেশ
সমন্বয়সাধন
সমাজ ও নারী
সমুদ্রস্নান
সময়
সময় নিউজ টিভি
সময়ের প্রতিবিম্ব
সরকার
সাংবাদ
সাইক্লোন শেল্টার
সাইপ্রাস
সাজিদ গ্রেফতার
সাদাসিধে কথা
সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম
সামন্ততন্ত্র
সামরিক শাসন
সামাজি
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম
সাহসী
সিডনি
সিয়াম
সুপ্রভাত
সূর্যে
সেচসুবিধা
সোনার বাংলা
স্কাইপি
স্বকৃত নোমান
স্বচ্ছতা
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
স্বাধীনত
স্বাধীনতাযুদ্ধ
স্বামী
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
স্বীকৃতি
স্মৃত-নিদর্শন
স্মৃতিসৌধ
স্মৃতিসৌধে
স্লোভাকিয়া
হত্যা ও হরতাল
হাইতি
হুগজিল্ট

No comments:
Post a Comment