বাংলার বাম আন্দোলনের অতীত ও বর্তমান
ভূমিকাঃ
ভারতের প্রগতি আন্দোলনে বাংলা এক
উল্লেখযোগ্য নাম। স্বাধীনতা সংগ্রামে উজ্জ্বল ভূমিকার পাশাপাশি বামপন্থী
আন্দোলনের শুরু থেকেই পশ্চিমবঙ্গ এক অনন্য ভূমিকা নিয়ে উপস্থিত। বাংলাকে
এদেশের বাম আন্দোলনের সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় পীঠস্থান বললেও অত্যুক্তি করা হবে
না। ভারতে বামপন্থী আন্দোলন গড়ে ওঠা থেকে আজ পর্যন্ত বামপন্থী আন্দোলনের
প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে বাংলার বাম আন্দোলন, দেশে এক বিশেষ স্থান
অধিকার করে রেখেছে। সেই পশ্চিমবঙ্গের বাম আন্দোলন আজ এক গুরুত্বপূর্ণ
সন্ধিক্ষণে এসে পৌঁছেছে। বাংলা যে প্রগতির ঝাণ্ডা নিয়ে প্রায় দুই শতাব্দী
ধরে শিল্প-সাহিত্য-সঙ্গীত- রাজনৈতিক-সামাজিক ক্ষেত্রে অগ্রগতির পথ
দেখাচ্ছিল – একবিংশ শতকের শুরুতে তারা নিজেরাই যেন রাস্তা হারিয়ে ফেলেছে।
এক সার্বিক নিরাশা, বেদনাবোধ, দিশাহীনতা গ্রাস করছে নানান ধরনের বাম ও
প্রগতিশীল সংগঠন-নেতৃত্ব-সংগঠক-কর্মী-ব্যক্তি-সাংস্কৃতিক কর্মী-নাট্যকর্মী
সকলকে। এই নিরাশা আর দিশাহীনতারই অন্যতম প্রতিফলন হল সংগঠন ও গোষ্ঠীগুলির
মধ্যে অর্থহীন বিতর্ক ও বিবাদ, সম্পর্কের মারাত্মক অবনতি, সংগঠনগুলির
অভ্যন্তরের পরিবেশেও দমবন্ধ করা বাতাবরণ এবং সর্বোপরি মারাত্মক
জনবিচ্ছিন্নতা। বর্তমান প্রবন্ধে আমরা এই পরিস্থিতির সমাধান প্রসঙ্গে নয়,
আলোচনা করতে চাই এর সম্ভাব্য উৎসগুলি সম্পর্কে। আর তার থেকেই বুঝতে চাই
আগামীতে বাংলার প্রগতি-রাজনীতি তথা বাম আন্দোলনের সম্ভাব্য অভিমুখ ও পরিণতি
।
বাংলার বাম আন্দোলন বিকাশের প্রেক্ষাপট
বাংলার সংগ্রাম-বিদ্রোহের এক সুদীর্ঘ
ইতিহাস রয়েছে। ধর্মসংস্কার আন্দোলনে শ্রীচৈতন্যের লড়াই যেমন বাংলার এক
গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য, তেমনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আগ্রাসনের বিরুদ্ধে
কৃষক বিদ্রোহ বাংলার অপর ঐতিহ্য। একদিকে সন্ন্যাসী বা ফকির বিদ্রোহ, তাঁতী ও
মালঙ্গীদের সংগ্রাম, চুয়ার বিদ্রোহ, ময়মনসিংহের পাগলাপন্থী বিদ্রোহ,
তিতুমীরের ওয়াহাবী আন্দোলন, ফরিদপুরে দুদুমিঞার নেতৃত্বে শুরু হওয়া ফরাজী
আন্দোলন, সাঁওতাল বিদ্রোহ, সিপাহী বিদ্রোহ, নীল বিদ্রোহের মতো ঐতিহাসিক
সংগ্রাম এবং অন্যদিকে ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলার নবজাগরণ-উভয় ধারাই ভারতে
ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বাংলাকে এক অগ্রগণ্য স্থানে হাজির করেছিল।
বাংলার বুকে এই দুই ধারা পরিপূরক ও সহায়ক হয়ে উঠেছিল বলেই, ভারতের
জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের অভ্যন্তরে একটি বিপ্লবী ধারা গড়ে উঠতে তা সাহায্য
করেছিল। অন্যদিকে, ১৮৫৩ সালে ভারতে প্রথম রেলপথ চালু হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে
১৮৬২ সালের এপ্রিল-মে মাসে হাওড়া রেলওয়ে-তে ১২০০ রেলশ্রমিক ৮ ঘন্টা কাজের
দাবিতে ধর্মঘট বাংলার নব্য শ্রমিকশ্রেণীর লড়াকু মনোভাবকে প্রতিফলিত করে।
শিকাগোর হে মার্কেটের ঐতিহাসিক লড়াইয়ের ২৪ বছর আগেই বাংলার শ্রমিকরা এই
দাবিতে ধর্মঘট সংগঠিত করেছিলেন। ১৮৯৫ সালে বজবজ জুট মিলে ৬ সপ্তাহব্যাপী
ধর্মঘট চালান শ্রমিকরা এবং পরের বছর আবার ধর্মঘট করেন। ১৮৭১ সালে
মার্কস-এঙ্গেলস কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত প্রথম আন্তর্জাতিকের কাছে জনৈক
কলকাতাবাসী চিঠি পাঠান শাখা গঠনের অনুমতি চেয়ে। প্রথম আন্তর্জাতিকের সাধারণ
সভায় সে চিঠি নিয়ে আলোচনা হয়। আন্তর্জাতিকের সাধারণ পরিষদ ১৮৭১ সালের ১৫
আগষ্ট মার্কস ও এঙ্গেলস-এর উপস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেয় যে পত্রলেখককে শাখা
গঠনের পরামর্শ দেওয়া হোক; বলা হয় যে এই শাখা হবে স্বনির্ভর এবং এই সমিতিতে
স্থানীয় অধিবাসীদের অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছিল।
কমিউনিস্টদের নেতৃত্বে বাংলায় বাম আন্দোলন
ও শ্রমিকশ্রেণির আন্দোলন বিকাশের সমস্যা বুঝতে গেলে আগের পর্বে
শ্রেণি-আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি ও তাতে বাংলার সমাজে প্রগতির সূত্রটি বোঝা
দরকার। এর সূত্রটিকে শুধু শহুরে মধ্যবিত্ত সমাজের ব্রিটিশ-বিরোধী স্বাধীনতা
সংগ্রামের মধ্যে দেখলে এক বিরাট ভুলের মধ্যে পড়ে যেতে হয়। তাই এ প্রসঙ্গে
এক সংক্ষিপ্ত আলোচনা জরুরী।
দ্বাদশ শতাব্দীতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে
ভক্তি আন্দোলন বিস্তার লাভ করে। তার একটি অংশ চতুর্দশ শতাব্দীতে বাংলায়
নতুন রূপ পরিগ্রহ করে। যদিও চৈতন্যের আগে বাংলায় ঈশ্বরপুরী, কেশব ভারতী
প্রভৃতিরা ছিলেন, তবু চৈতন্যের নেতৃত্বেই বাংলার ধর্মসংস্কার আন্দোলন রূপ
পেল। তার প্রবর্তিত নতুন ভক্তি ধর্মে হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের সকল
অংশকে গ্রহণ করাতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি । কিন্তু সমাজের অভ্যন্তরে যে
জাতিভেদ প্রথার গভীর শিকড়, তাকে তিনি উপড়ে ফেলতে পারেন নি। মার্কস ভারত
সম্পর্কে তাঁর গভীর আগ্রহের পরিপ্রেক্ষিতে যে রসদ সংগ্রহ করেছিলেন, তার
ভিত্তিতে চৈতন্যের ভূমিকাকে অতি উচ্চ স্থান দিয়েছেন। মার্কসের মতে, “
চৈতন্য প্রচার করতেন শুদ্ধতা, তপস্যা এবং ঈশ্বরের চোখে জাতি-সম্প্রদায়
নির্বিশেষে সব মানুষের সাম্য। এই সম্প্রদায়ের মধ্যে এখনও জাতপাতের বন্ধন
থেকে কিছুটা স্বাধীনতা এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান সম্পর্কে অবজ্ঞা লক্ষ্য
করা যায়”। মার্কস তাঁর সময়ে দাঁড়িয়ে বিশ্লেষণ করেছিলেন, “বৈষ্ণবরা শাক্তদের
বিরুদ্ধে ‘প্রতিবাদী’(প্রটেস্ট্যান্ট)”। চৈতন্যের সংস্কার আন্দোলনে
জাতিভেদপ্রথার বিরুদ্ধে অবস্থান, ধর্মীয় উদারতা, সমসাময়িক কালে নারীদের
অধিকার সম্পর্কে মধ্যযুগীয় অচলায়তন ভাঙ্গার যে প্রচেষ্টা ছিল , তা
নিঃসন্দেহে বাংলার ভবিষ্যত সচেতন মনন নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন
করেছিল। এই শতাব্দীর শেষ দিক থেকে বাংলায় সুফি মতবাদ প্রবেশ করেছিল। এর
কিছু পরেই বাংলা ‘মুসলিম শাসক শক্তি’র করায়ত্ত হলে এই প্রভাব ব্যাপকতর হয়ে
ওঠে। বাংলায় প্রথম সুরাবর্দীয়াহ ও পরে চিশতিয়াহ সম্প্রদায়ভুক্ত সুফিরা
আত্মপ্রকাশ করেন। পরে কালক্রমে আরো বিভিন্ন শাখার সৃষ্টি হয়। সুফি মতবাদের
বিকাশের ধারায় পীর বাবাদের আবির্ভাবের মূলে বৌদ্ধধর্মত্যাগী মুসলমানদের
প্রচ্ছন্ন বৌদ্ধ ও হিন্দু মানসিকতা ক্রিয়াশীল ছিল বলে অনেক গবেষণাকারী মনে
করেছেন।
১৭৬০ সাল থেকে ১৭৯৭ সাল পর্যন্ত বাংলার
সন্ন্যাসী ও ফকিররা ইস্ট কোম্পানির সাথে এক তীব্র লড়াইয়ে লিপ্ত হয়েছিলেন,
যা ইতিহাসে সন্ন্যাসী বিদ্রোহ বা ফকির বিদ্রোহ নামে পরিচিত। ফকির ও
সন্ন্যাসীদের মধ্যে কিছু কিছু সংঘর্ষের কথা ইতিহাসে পাওয়া গেলেও কোম্পানির
বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তারা ক্রমশ একটি ঐক্যবদ্ধ শক্তি হিসেবেই উপস্থিত হতে সক্ষম
হয়েছিলেন। এই বিদ্রোহ ছিল খাজনা আদায়, লুন্ঠন, বাংলার কুটির শিল্প ও
বস্ত্রশিল্প ধ্বংসের বিরুদ্ধে। বুরহানপন্থী ফকির মজনু শাহ ছিলেন ফকির
বিদ্রোহীদের নেতা। মাদারিয়াপন্থী ফকিররাই এই লড়াইয়ের মূল শক্তি ছিলেন। মজনু
শাহ-এর অনুগামী হাজার হাজার সন্ন্যাসী ও ফকিরদের প্রধান কর্মক্ষেত্র ছিল
উত্তরবঙ্গ। মজনু শাহ-এর সঙ্গে দেবী চৌধুরানী, ভবানী পাঠক-দের যোগাযোগ ছিল
বলে কেউ কেউ মনে করেন। ক্রমাগত লোকক্ষয় ও সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে ঊনবিংশ
শতাব্দীর গোড়ায় এই আন্দোলন স্তিমিত হয়ে আসে।
সমসাময়িক কালের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ
বিদ্রোহ হল চুয়ার বিদ্রোহ। মেদিনীপুর, বাঁকুড়া ও ধলভূমের জঙ্গলমহলের
অধিবাসীরা, কৃষকরা ও অরণ্যবাসী সমাজের নিম্নবর্গ তথা বর্ণের মানুষদের
বিদ্রোহ ছিল এটি। অরণ্যের ওপর দীর্ঘদিন ও বংশ-পরম্পরায় ভোগদখলের অধিকার
কেড়ে নেওয়ার বিরুদ্ধে এবং উচ্চহারে খাজনা আদায় করার বিরুদ্ধে চুয়ার বিদ্রোহ
সংঘটিত হয়েছিল। চুয়ারদের এই বিদ্রোহের সাথে যোগ দিয়েছিল পাইকরা। এই সময়েই
গড়বেতায় শুরু হয়েছিল লায়েক বিদ্রোহ। ১৮১৬ সালে লায়েক বিদ্রোহ হয়। এখানে
লায়েক প্রজারা অচল সিং-এর নেতৃত্বে গেরিলা কায়দায় শালবনীর জঙ্গলে ইংরেজদের
বিরুদ্ধে লড়েছিল। ১৮১২ সালে ময়মনসিংহে গারো উপজাতির কৃষকরা জমিদারদের
বিরুদ্ধে পাগলাপন্থী টিপুর নেতৃত্বে বিদ্রোহ করেছিল। এমন কী গারো উপজাতির
মানুষরা ১৮২৫ সালে স্বাধীন গারো রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে।
বারাসাত, স্বরূপনগর, বাদুরিয়া, গোবরডাঙা
প্রভৃতি স্থানে তিতুমীরের নেতৃত্বে কৃষক বিদ্রোহ হয়েছিল কৃষকদের শোষণমুক্তি
ও ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে। নারকেলবেড়িয়া গ্রামে তিতুমীরের অনুগামীরা
বাঁশের কেল্লার দুর্গ তৈরী করে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ১৮৩১ সালে প্রবল লড়াই
চালায়। তিতুমীর ছিলেন ওয়াহাবী সম্প্রদায়ের নেতা। ওয়াহাবী ধর্মপ্রচারক সৈয়দ
আহমেদের শিষ্য, যার লক্ষ্য ছিল পুনরায় মুসলমান রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করা।
তিতুমীরের মূল লক্ষ্য ছিল প্রচলিত ইসলাম ধর্মের সংস্কারসাধন। কিন্তু
কৃষকেরা তাঁর নেতৃত্বে সংগঠিত হচ্ছিলেন বলে জমিদাররা তাদের অর্থনৈতিক
স্বার্থ বিপন্ন হবার ভয় করছিলেন। তাই তারা তাকে দমন করতে চেয়েছিলেন।
ঘটনাক্রমে কৃষকরা ছিলেন মুসলমান ও জমিদাররা প্রধানত হিন্দু। তিতুমীরের
নেতৃত্বে ২৪ পরগনা ও নদীয়ার লড়াইয়ের পাশাপাশি বর্তমান বাংলাদেশের ফরিদপুর
জেলায় হাজী শরিয়তউল্লার নেতৃত্বে সেখানকার মুসলমান কৃষকরা জমিদার ও
নীলকরদের বিরুদ্ধে এক তীব্র লড়াই গড়ে তোলে যা ইতিহাসে ফরাজী আন্দোলন নাম
বিখ্যাত। কৃষক ও কারিগর শ্রেণীর মুসলমানদের মধ্যে তিনি ইসলামের সংস্কার
আন্দোলনকে পরিচালনা করার উদ্যোগ নেন। অসাধারণ দ্রুত গতিতে তাঁর মতাবলম্বীর
সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। ফরিদপুর, বাখরগঞ্জ ও ময়মনসিংহের ছ’ভাগের এক ভাগ ও
ঢাকার এক তৃতীয়াংশ মুসলমান তার অনুসারী হয়ে পড়ে। এই আন্দোলন চলেছিল ১৮৩৮
সাল থেকে ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত। এই আন্দোলনেও ধর্মীয় প্রভাব একটা গুরুত্বপূর্ণ
বিষয় ছিল। তার মৃত্যুর পর পুত্র দুদুমিঞার নেতৃত্বে ফরাজী আন্দোলন আরো
বিকশিত হয়। শিষ্যদের মধ্যে তিনি সমতার আদর্শ প্রচার করতেন। জমিদারদের
অন্যায় খাজনার বিরুদ্ধে তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে সমস্ত জমির মালিক
আল্লা–সুতরাং এতে কারো খাজনা চাইবার অধিকার নেই। গরীব কৃষক যাদের
বেশিরভাগটাই ছিল মুসলমান, তারা ব্যাপকভাবে এই আন্দোলনে যোগ দেয়।
শ্রেণীস্বার্থের বিরোধ ধর্মীয় শত্রুতার রূপ নিয়ে সমাজে উপস্থিত হয়। জমিদার ও
নীলকর বনাম কৃষকদের দ্বন্দ্বে ব্রিটিশ সরকার জমিদার-নীলকরদের পক্ষেই
দাঁড়াত। কৃষকরা এই ঘটনাকে দেখল হিন্দু বাঙালীর সাথে খ্রিষ্টান ইংরেজদের
মৈত্রী হিসেবে। শ্রেণীদ্বন্দ্ব-জনিত লড়াই ‘ধর্মীয় প্রতিরোধ আন্দোলনে’ রূপ
পেয়েছিল।
নিজভূমি থেকে উচ্ছেদ, চড়াহারে সুদ,
নজরানা, সাঁওতাল রমনীদের ওপর নির্যাতন-এসবের বিরুদ্ধে সিধো-কানহুদের
নেতৃত্বে সাঁওতাল পরগনার সাঁওতাল আদিবাসীরা বিদ্রোহ করে। তা ছড়িয়ে পড়েছিল
মুর্শিদাবাদ-বীরভুম-বাঁকুড়া অঞ্চলে। চরিত্রের দিক থেকে এটিও একটি কৃষক
বিদ্রোহ ছিল। সাঁওতাল কৃষকদের সংগ্রামের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল কামার, কুমোর,
তাঁতী, তেলী, ডোম, চামার প্রভৃতি সম্প্রদায়।
বাংলার মধ্যযুগ থেকে আধুনিক যুগে
বিবর্তনের পর্বে সমাজে উপস্থিত শ্রেণী-সংঘাতের রূপগুলি নানাভাবে
ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক বিরোধের মধ্যে দিয়েও প্রকাশিত হয়েছে। বরং বহুক্ষেত্রে
ধর্মীয় উগ্রতা ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে , জাতপাতভিত্তিক শোষণের বিরুদ্ধে,
নারীদের ওপর চলতে থাকা শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে ছোট-বড় অসংখ্য লড়াই বাংলার
নিজস্ব পরিসরে নিজস্ব ধরনে বিকশিত হয়েছে। কালের গহ্বরে চাপা পড়ে থাকা
শ্রেণীদ্বন্দ্বের সেই স্বরূপকে, তার ধারাবাহিকতাকে খুঁজে বার করার
দায়দায়িত্ব ছিল সর্বহারার অগ্রণী অংশের ওপরেই। এই কাজ মূলত উপেক্ষিত থেকে
গেছে বলেই মনে হয়।
বাংলাদেশের শ্রমজীবী জনগণের প্রতি ইংরেজী
শিক্ষার আলোকপ্রাপ্ত মধ্যশ্রেণীর বুদ্ধিজীবীদের এক সহানুভুতির মনোভাব
ঊনবিংশ শতকেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বঙ্কিমচন্দ্র, শিবনাথ শাস্ত্রী, তরুণ
রবীন্দ্রনাথ এমনকী বিবেকানন্দ-এর লেখাতেও দেশের শোষিত-নিপীড়িত মানুষের
প্রতি ‘সহানুভূতির এক মনোভাব’ বিভিন্নভাবে প্রকাশিত হয়েছে। তাতে বহু
বিকৃতি-বিভ্রান্তি-অসম্পূর্ণতা সত্ত্বেও ওই সন্ধিক্ষণে ভারতের রাজনৈতিক
সংগ্রামের ধারাকে রূপ দিতে এই প্রেক্ষাপট এক গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে।
নব্যশিক্ষিত মধ্যশ্রেণীর প্রতিনিধিরা জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে যে রাস্তায়
হাঁটতে শুরু করেন, তা, কোনো অর্থেই, সমাজের বৈপ্লবিক রূপান্তরের পথ নয়।
বরং ইংরেজদের থেকে কিছু সুবিধা আদায়ের প্রচেষ্টার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।
বৃটিশ ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশন(১৮৫১), ইন্ডিয়ান লীগ(১৮৭৫), সুরেন্দ্রনাথ
বন্দোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ভারত সভা(১৮৭৬) ইত্যাদির মধ্যে দিয়ে যে প্রচেষ্টা
শুরু হয়েছিল, তা ১৮৮৫ সালে ফিরোজ শাহ মেহেতা, দাদাভাই নওরোজি প্রমুখ
ব্যক্তিদের সহযোগিতায় এবং তদানীন্তন বৃটিশ ভাইসরয় লর্ড ডাফরিনের কর্মচারী
হিউমের পৃষ্ঠপোষকতায় সর্বভারতীয় ভিত্তিতে জাতীয় কংগ্রেস গঠনের মধ্যে দিয়ে
পরিণতি পেল। বাংলার উমেশচন্দ্র ব্যানার্জি, রমেশ চন্দ্র দত্ত,
সুরেন্দ্রনাথরা এই ধারায় মিলিত হলেন। সংগঠনের নেতৃত্বে ছিল পুঁজিপতি,
জমিদার আর বিত্তবান মানুষেরা। এর বিপরীতে ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামে কংগ্রেসের
অভ্যন্তরে যেমন একটি ‘চরমপন্থী ধারা’র জন্ম হচ্ছিল, তেমনি কংগ্রেসের
বাইরেও বাংলার শ্রমিক-কৃষক, প্রগতিশীল মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীদের একটি
অসংগঠিত ও দুর্বল ধারা উপস্থিত ছিল।
বিংশ শতকের গোড়ার দিকে দুটি ঘটনা এদেশের
জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ওপর গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিল। ১৯০৪-০৫ সালে
জার-শাসিত রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে এশীয় দেশ হিসেবে জাপানের জয়লাভ। এই জয়
এশীয়দের বিজয় অর্জন—এই বোধ বাঙালী শিক্ষিত সম্প্রদায়কে উল্লসিত করে তোলে।
অন্য ঘটনাটি হল লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গের প্রচেষ্টা। এর বিরুদ্ধে লক্ষ লক্ষ
বাঙালী যেভাবে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে পথে নেমেছিল, তা বাংলার এক অভূতপূর্ব
ঐতিহ্য। একদিকে যেমন রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর আহ্বানে বাংলার ঘরে ঘরে
অরন্ধন পালিত হল, রবীন্দ্রনাথের আহ্বানে হিন্দু-মুসলিমদের রাখীবন্ধন, তেমনি
হাওড়ার বার্ন কোম্পানির শ্রমিকরা, রেল, চটকল ও ট্রামের শ্রমিকরা, প্রেসের
শ্রমিকরা বিক্ষোভে নামে। এই সময় থেকেই ব্রিটিশবিরোধী আরেকটি ধারা বাংলায়
জন্ম নেয়। ইতিহাসে এটিকে সন্ত্রাসবাদী ধারা বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। ১৯০১
সালে ব্যারিস্টার পি মিত্রের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ‘অনুশীলন সমিতি’।
পরে আরেকটি সংগঠন তৈরি হয় ‘যুগান্তর’ দল নামে। ১৯০৫ সাল থেকেই বঙ্গভঙ্গ
আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে এই আন্দোলন তীব্র আকারে ছড়িয়ে পড়ে। অরবিন্দ ঘোষ,
বারীন্দ্রনাথ ঘোষ, প্রফুল্ল চাকি, ক্ষুদিরাম বসুরা ছিলেন এর নেতৃত্ব বা
সবচেয়ে সক্রিয় অংশ। ১৯০৭ সাল থেকে ১৯১৭ সাল সময়পর্বে সারা ভারতে মোট ৩৮৫টি
বৈপ্লবিক অ্যাকশন সংঘটিত হয়েছিল যার বেশীরভাগটাই হয়েছিল বাংলায়।
এর সাথে সাথেই আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট
আন্দোলনের সাথে এক ধরনের যোগাযোগ, আদানপ্রদান ভারতের স্বাধীনতাকামী
রাজনৈতিক শক্তি বা ব্যক্তিবর্গের ছিল। এর প্রমাণ পাওয়া যায় ১৯০৪ সালে
আমস্টারডাম-এ অনুষ্ঠিত ২য় আন্তর্জাতিকের সম্মেলনে দাদাভাই নওরোজি যোগদান ও
বক্তৃতা করার ঘটনায়। ১৯০৭ সালের স্টুটগার্ট সম্মেলনে যোগদান করেন মাদাম
ভিকাজি কামা, বাংলার বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ। ক্ষুদিরাম বসু ও
প্রফুল্ল চাকির আত্মবলিদানকে মহান বর্ণনা করে প্রচার করায় ১৯০৮ সালে বাল
গঙ্গাধর তিলককে ব্রিটিশ সরকার ৬ বছরের জন্য কারাদন্ডে দন্ডিত করে। লেনিন
তাঁর এক প্রবন্ধে এই ঘটনার কথা উল্লেখ করেন। অন্যদিকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ
একের পর এক মামলা রুজু করে সন্ত্রাসবাদী স্বাধীনতা আন্দোলনকে দমনের চেষ্টা
করলে তা আরো তীব্র রূপ ধারণ করে। এই সময়েই বাংলায় স্বদেশী নেতাদের
নেতৃত্বে শ্রমিক আন্দোলনের এক বিকাশ ঘটতে দেখা যায়। অন্যদিকে ১৯১৭ সালে
মহান রুশ বিপ্লব গভীরভাবে প্রভাবিত করে ভারতের প্রগতিশীল ও বাম-মনোভাবাপন্ন
একটা অংশকে। অনুশীলন সমিতি ও যুগান্তর পার্টি উভয়ের সংগ্রামের মধ্যে থেকে
উঠে আসা যে অংশটি বাংলার বামপন্থী আন্দোলন গড়ে তোলার কাজে ক্রমশ অগ্রণী
ভুমিকা নিয়েছিলেন, তাদের মধ্যেকার একটি অংশ ক্রমশ দেশের প্রধান বামপন্থী
শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। বিশেষ উল্লেখ্য যে, অনুশীলন সমিতির মধ্যে
প্রথম থেকেই রুশ বিপ্লবীদের ( যারা ‘এনার্কিস্ট’ নামে পরিচিত ছিল ) বিপ্লব
প্রচেষ্টা ও তাদের সংগঠন পদ্ধতি গভীর অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করেছিল। বিশেষত
যারা সশস্ত্র উপায় ছাড়া ব্রিটিশ শক্তিকে পরাজিত করা সম্ভব নয় বলে মনে
করতেন, তাদের মধ্যে এই প্রভাব অত্যন্ত গভীর ছিল। অভীষ্ট লক্ষ্যপূরণের জন্য
প্রয়োজনীয় অর্থ ও অস্ত্রের ব্যবস্থাপনা করতে এরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে
যাতায়াত শুরু করেছিলেন। জার্মানিতে ভারতীয় বিপ্লবীদের নিয়ে গঠিত হয়েছিল
বার্লিন কমিটি। এই কমিটির প্রধান নেতা বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় ও
ভুপেন্দ্রনাথ দত্ত গভীরভাবে রুশ বিপ্লব ও বলশেভিকবাদের প্রতি আকৃষ্ট হন।
এদের উদ্যোগে ১৯১৫ সালে কাবুলে গঠিত হয় ‘অস্থায়ী এক স্বাধীন সরকার’। এই
সময়ের ‘বৈপ্লবিক উদ্যোগে’র সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা ছিলেন যতীন দাস বা বাঘা
যতীন। তার নেতৃত্বে অনুশীলন সমিতি সারা বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে
পড়েছিল। সেই বড় পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এম এন রায় সারা পৃথিবীর বিপ্লবীদের
সাথে যোগাযোগ করতে নামেন। ১৯১৫ সালে বাঘা যতীনের নির্দেশে তিনি অস্ত্রের
সন্ধানে ইন্দোনেশিয়া, মালয়, চীন, জাপান, জার্মানি হয়ে মার্কিন
যুক্তরাষ্ট্রে যান। সেখান থেকে মেক্সিকোতে গিয়ে ওখানকার সমাজতন্ত্রী দলে
যোগ দেন এবং তার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। বাংলার কমিউনিস্ট আন্দোলন
গড়ার পথে যে সমস্ত বাঙালী বিপ্লবীরা প্রথম যুগে ভুমিকা পালন করেছিলেন তাদের
মধ্যে অন্যতম হলেন বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়, ভুপেন্দ্রনাথ দত্ত, এম এন
রায় প্রমুখ। প্রবাসেই প্রথম ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলেন এম এন
রায়-রা। ১৯২০ সালে তৃতীয় আন্তর্জাতিকের ২য় কংগ্রেসের পর ১৭ অক্টোবর
তাসখন্দে ৭ জন মিলে প্রতিষ্ঠা করলেন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি নামক
সংগঠনটির। যদিও এই পার্টির দেশের ভেতর চলমান শ্রেণী আন্দোলন বা স্বাধীনতা
সংগ্রাম-কোনো ব্যাপারেই কোনো কার্যকরী প্রতিনিধিত্ব ছিল না। অন্যদিকে রুশ
বিপ্লবের প্রভাবে অনুশীলন সমিতি ও যুগান্তর পার্টির বহু সদস্য, যাদের মধ্যে
একটা বড় অংশ দীর্ঘকাল কারারুদ্ধ ছিলেন, কমিউনিস্ট ভাবধারার প্রতি গভীরভাবে
আকৃষ্ট হন এবং কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ গ্রহণ করেন। দেশের ভেতর কলকাতা,
মুম্বই, চেন্নাই ও লাহোরে চারটি আলাদা আলাদা কমিউনিস্ট উদ্যোগ গড়ে ওঠে,
যেগুলো প্রবাসের কমিউনিস্ট পার্টির থেকে স্বতন্ত্র ছিল। পরবর্তীকালে এই
উদ্যোগগুলিকে কেন্দ্রীভূত করার উদ্যোগ শুরু হয়। ১৯২৫ সালের ডিসেন্বর মাসে
কানপুর শহরে এক সর্বভারতীয় সম্মেলনে এই শক্তিগুলি ঐক্যবদ্ধভাবে ভারতের
কমিউনিস্ট পার্টি গঠনের কথা আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করে। প্রসঙ্গত পরবর্তীকালে
সিপিআই –সিপিআই(এম) ভাঙ্গনের পরে দুই পার্টির মধ্যে প্রবল বিতর্ক হয় ভারতের
কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠা দিবস নিয়ে। ১৯২০ সালের ১৭ অক্টোবর না ১৯২৫
সালের ২৬ ডিসেম্বর ? এই পর্বের কোনো বিস্তারিত মূল্যায়ন এই প্রবন্ধের
লক্ষ্য নয়। কিন্তু কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখানে উঠে আসছে ।
১৯২৫ সালে যখন ভারতের কমিউনিস্ট
মনোভাবাপন্ন শক্তিগুলি ঐক্যবদ্ধ হয়ে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি গঠনের কথা
ঘোষণা করলেন, তখন কী তাতে দেশের সমস্ত কমিউনিস্ট মনোভাবাপন্ন শক্তি বা
ব্যক্তিবর্গ যোগ দিলেন? ইতিহাসে আমরা পাচ্ছি যে গুপ্ত বিপ্লবী অনুশীলন
সমিতির বহু বিপ্লবী এই প্রক্রিয়াটির সম্পর্কে সন্দিহান ছিলেন। জেলের ভেতরে
বন্দী থাকা বিপ্লবীরা তা নিয়ে নিজেদের মধ্যে তীব্র বিতর্ক চালিয়েছেন।
মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদের প্রতি প্রবল আস্থা গড়ে উঠলেও তৃতীয় আন্তর্জাতিকের
হস্তক্ষেপ নিয়ে তারা সংশয়ী ছিলেন অনেকেই। অন্যদিকে অপর গুরুত্বপূর্ণ ধারাটি
হলো ভগৎ সিং-এর নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী আন্দোলন যারা রুশ বিপ্লব,
সমাজতন্ত্রের প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট হলেও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির ধারাটির
থেকে নিজেদের স্বতন্ত্রতা বজায় রেখেই বৈপ্লবিক কার্যকলাপ চালিয়েছেন। জেল
থেকে ভগৎ সিং লিখেছিলেন যে এক গদর পার্টি ছাড়া অন্যদের দেখে (তিনি দেশের
কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের সম্পর্কে বলতে চেয়েছিলেন) মনে হয় না যে তারা
তাদের নিজেদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট বোঝাপড়া নিয়ে কাজ
করছেন। এছাড়া ছিল গদর পার্টির ধারা। ১৯২৬-১৯৩০ সাল পর্যন্ত সময়পর্বে একদিকে
যেমন মীরাট ষড়যন্ত্র মামলার পরিপ্রেক্ষিতে কমিউনিস্টদের কার্যকলাপের
গুরুত্ব ও প্রচার দেশের গন্ডী পেরিয়ে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়ে, তেমনি কাকোরি ও
লাহোর ষড়যন্ত্র মামলার মধ্যে দিয়ে ভগৎ সিং-দের কর্মকান্ড ও আত্মত্যাগ গোটা
দেশে আলোড়ন সৃষ্টি করে।
অপরদিকে সশস্ত্র জাতীয় বিপ্লবীরা সশস্ত্র
অভ্যুত্থানের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। ১৯২৯ সালে রংপুরে বঙ্গীয় প্রাদেশিক
বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স বিপ্লবী দলের রাষ্ট্রীয় সম্মেলনে বিপ্লবীরা ঠিক করেন
যে, চট্টগ্রাম,ময়মনসিংহ ও বরিশাল–এই তিনটে জেলায় একসঙ্গে অস্ত্রাগার আক্রমণ
করে একই দিনে সশস্ত্র অভ্যুত্থান ঘটানো হবে। যতীন দাস প্রমুখরা ছিলেন এই
আন্দোলনের নেতৃত্বে। ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল চট্টগ্রামের অস্ত্রাগার
অভ্যুত্থান ঘটে। এই অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতিতে কংগ্রেসের আর রাস্তায় না নেমে
উপায় ছিল না। ১৯৩০ সালের ১২ মার্চ গান্ধীজির নেতৃত্বে যে অসহযোগ ও আইন
অমান্য আন্দোলন শুরু হয়, তা আর নিছক অসহযোগ বা আইন অমান্য আন্দোলন ছিল না।
সারা দেশে তা গণ অভ্যুত্থানের চেহারা নিল। অন্যদিকে বিপ্লবী সন্ত্রাসবাদী
আন্দোলন আরো ছড়িয়ে পড়ল ডালহৌসি স্কোয়ার ষড়যন্ত্র মামলা, কলকাতা রাইটার্স
বিল্ডিং অলিন্দ যুদ্ধ, চট্টগ্রাম ইউরোপিয়ান ক্লাবের ওপর আক্রমণ ইত্যাদির
মধ্যে দিয়ে। বিপ্লবী সন্ত্রাসবাদীরা দমনের মুখে পড়ে শহীদ হলেন বা কারারুদ্ধ
হলেন। গোটা পরিস্থিতির রাশ ক্রমশ কংগ্রেসের হাতেই সমর্পিত হল। ভারতের
কমিউনিস্ট আন্দোলনের এ এক দুর্ভাগ্যময় অতীত যে তৃতীয় আন্তর্জাতিকের অবস্থান
দ্বারা যারা প্রভাবিত ও অনুপ্রাণিত হলেন তারা এই গণজাগরণ থেকে নিজেদের
সম্পূর্ণ সরিয়ে রাখলেন। তারা পরবর্তীতে ভুল স্বীকার করলেও এই ঘটনার ফলে
আদিপর্বেই বাংলার প্রগতি আন্দোলনের স্রোত থেকে নিজেদের এক মৌলিক বিচ্ছেদ
ঘটিয়ে ফেলেছিলেন। ভারতে কমিউনিস্ট আন্দোলনের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া কী হবে তা
নিয়েও যথেষ্ট পরিমানে দিশাহীনতা ছিল। কংগ্রেস পরিচালিত কংগ্রেস সোশালিস্ট
পার্টির মধ্যে ঢুকে কাজ করাই হোক বা কমিউনিস্ট পার্টির পাশাপাশি
শ্রমিক-কৃষক পার্টির মধ্যে দিয়ে কাজ চালাবার যে রণকৌশল সিপিআই গ্রহণ
করেছিল, বহুসময়েই তার কোনো সামগ্রিক রূপরেখা ছিল না। তাই এক চূড়ান্ত ধরনের
আন্তর্জাতিক-নির্ভরতার কারণে জাতীয় কংগ্রেসের মধ্যেকার বামপন্থী অংশটিকে
কীভাবে ঘনিষ্ঠ করে তোলা যাবে তার কোনো রূপরেখা কোনোভাবেই কমিউনিস্ট পার্টির
নেতৃত্বের কাছে ছিল না। ১৯৩০ সালের ভুল ১৯৩৪ সালে স্বীকার করার পর আবার
তাদের একই ভুল করতে দেখা যায় ১৯৩৯-এর ত্রিপুরি কংগ্রেস অধিবেশনে ‘নিরপেক্ষ’
অবস্থান গ্রহণে অথবা ১৯৪২-এর ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলনে ‘মিত্রশক্তিকে সাহায্য
করার’ অজুহাতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের অনুগ্রহ লাভে। বিপ্লবী সমাজবাদের
প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেও অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের একাংশ ভারতের কমিউনিস্ট
পার্টিতে যোগদান না করে বিকল্প সমাজতান্ত্রিক দল হিসেবে আরএসপি-র জন্ম
দিয়েছিলেন ১৯৪০ সালে। যদিও আরএসপি কখনই একটি কমিউনিস্ট শক্তি হিসেবে গড়ে
ওঠার কোন কার্যকরী প্রক্রিয়া গ্রহণ করতে পারে নি। বাংলার স্বাধীনতা
সংগ্রামের এই অগ্রণী অংশটির এহেন পরিণতির দায় মূলত বর্তায় তৃতীয়
আন্তর্জাতিক-পন্থী কমিউনিস্ট নেতৃত্বের ওপরেই।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ভারতের
বৃহৎ বুর্জোয়া শ্রেণী ও সামন্তপ্রভুদের হাতে যে রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্পণ
করতে বাধ্য হয়, ভারতীয় সমাজে তা যে কোনো বৈপ্লবিক রূপান্তর ঘটায় নি, সেকথা
বলাই বাহুল্য। কিন্তু যে সম্ভাবনাটি ভারতের কমিউনিস্টদের সামনে উপস্থিত
হয়েছিল, তাকে বিকশিত করার মতো চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারেন নি তারা। তৃতীয়
আন্তর্জাতিকের ওপর অতি-নির্ভরতা, কমিউনিজমের শিক্ষাগ্রহণের ক্ষেত্রে জোরালো
ঔপনিবেশিকতার ছাপ থেকে যাওয়ায় তারা ভারতীয় সমাজে প্রগতির প্রবাহটিকে বুঝতে
মূলত ব্যর্থ হন। পাশাপাশি কোনো নতুন সমাজ-সভ্যতার গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে,
বিশেষ করে শ্রমিকশ্রেণির এবং সাধারণভাবে আপামর শ্রমিক-কৃষক-মেহনতিদের যে এক
সার্বিক সৃজনশীল, চালক ও নিয়ন্ত্রণকারীর ভূমিকা থাকে তা খারিজ করে দেওয়ায়
(যার পরিবর্তে স্থান করে নেয় পার্টির সর্বময় আধিপত্য ও অস্তিত্ব) ভারতীয়
বিপ্লবের সঠিক রণনীতি ও রণকৌশল নির্ধারণ ও অনুশীলন এক গুরুতর ব্যর্থতা এবং
ভ্রান্তির মধ্যে পড়ল। সিপিআই, আরএসপি বা তাদের থেকে আলাদা হওয়া ক্ষুদ্র
বামপন্থী দলগুলোর কেউই চীন বিপ্লবের সমসাময়িক সময়ে ভারতীয় সমাজে প্রবহমান
প্রগতিশীলতার ধারাটিতে, বিপ্লবী রাজনীতি ও শ্রেণীসংগ্রামের সবচেয়ে
গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলিতে সঠিকভাবে অগ্রগতির দিশা হাজির করতে পারে নি। অথচ
এই বামপন্থীরাই ফ্যাসিবাদবিরোধী সাংস্কৃতিক আন্দোলনে, দাঙ্গা প্রতিরোধে,
নৌবিদ্রোহে, সোলাপুর কমিউনের লড়াইয়ে, তেভাগায়, তেলেঙ্গানায় নিজেদের উজাড়
করে দিয়েছে শ্রেণীসংগ্রামের ময়দানে–সেই গৌরবময় অতীতকে কেউ অস্বীকার করতে
পারবে না। এই ঐতিহ্য আর দুর্বলতা নিয়ে ১৯৪৭-পরবর্তী ভারতের তথা বাংলার বাম
আন্দোলনের যাত্রা।
১৯৪৭-পরবর্তী পর্বে বাংলার বাম আন্দোলন
আন্তর্জাতিক বাম রাজনীতিতে তখন এক ভয়ানক
টালমাটাল পরিস্থিতি। স্তালিনের মৃত্যুর পর রুশ পার্টির বিংশতিতম পার্টি
কংগ্রেসে পার্টি নেতা নিকিতা ক্রুশ্চভ-এর নেতৃত্বে সিপিএসইউ বিপ্লবী
সংগ্রামের প্রয়োজনীয়তাকেই অস্বীকার করে বসল। পুঁজিবাদের সাথে শান্তিপূর্ণ
প্রতিযোগিতা, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান আর শান্তিপূর্ণ পথে সমাজতন্ত্রে
উত্তরণের কথা বলে শ্রমিকশ্রেণীর মুক্তির প্রশ্নটিকে তারা নস্যাৎ করল। ১৯৫৭
সালে কম: মাও-এর নেতৃত্বাধীন সিপিসি তার বিরুদ্ধে মতাদর্শগত মহাবিতর্ক শুরু
করে। যদিও ১৯৫৭-১৯৬১ সাল পর্যন্ত সিপিসি বিতর্কের তুলনায় আন্তর্জাতিক
কমিউনিস্ট আন্দোলনে ঐক্যস্থাপনের প্রবল প্রচেষ্টা চালিয়েছে। ১৯৬০ সালে ৮১
টি কমিউনিস্ট পার্টির মস্কো সম্মেলনে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় বিপ্লবের
প্রয়োজনীয়তাকে যখন সম্পূর্ণ অস্বীকার করা হল, তখন সিপিসি বিপ্লবের
প্রয়োজনীয়তার সপক্ষে তীব্র বিতর্ক চালায়। ক্রুশ্চেভের শান্তিপূর্ণ
সহাবস্থানের তত্ত্ব যে সংশোধনবাদের ‘পুরনো বোতলে নতুন মদ’ ছাড়া আর কিছুই
নয়–তা সিপিসি বিতর্কের ছত্রেছত্রে প্রতিষ্ঠা করে। এই মহাবিতর্কের পরিণামে
আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলন প্রধানত দুটি শিবিরে বিভক্ত হয়ে গেছিল।
ফলস্বরূপ, ক্রুশ্চভের সোভিয়েত রাশিয়া সমাজতান্ত্রিক চীন থেকে কারিগরী ও
অন্যান্য সাহায্য সরিয়ে নিল আর মাও-এর নেতৃত্বাধীন সিপিসি মতাদর্শের
প্রশ্নে আপস না করে সমাজতন্ত্রের বিপ্লবী পতাকাকে অমলিন রাখার লড়াই চালিয়ে
গেল।
এদিকে ভারতে স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই
কমিউনিস্ট পার্টির তত্কালীন প্রধান নেতা রনদিভের শহরভিত্তিক অভ্যুত্থানের
যে লাইন পার্টিতে গৃহীত হয়, তা প্রয়োগ করতে গিয়ে কঠোর রাষ্ট্রীয় দমনের মুখে
পড়েছিল পার্টি। এর ফলে পার্টি যে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়, তা সি পি
আই-এর মধ্যে ভারতীয় বিপ্লবের রণনীতি ও রণকৌশলগত প্রশ্নগুলিকে আবারো সামনে
নিয়ে আসে। বাংলা এই বিতর্কের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল। বাংলার ১৯৫৯ সালের
খাদ্য আন্দোলন আবারো বামপন্থীদের লড়াকু ঐতিহ্যকে সামনে নিয়ে আসে। একইসঙ্গে
ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির(সিপিআই) মধ্যে মতাদর্শগত ও রাজনৈতিক প্রশ্নে
বিতর্ক-মতপার্থক্য গুরুতর রূপ পেতে থাকে। তৃতীয় আন্তর্জাতিক ভেঙ্গে দেওয়ার
পরবর্তীতে সোভিয়েত রাশিয়ার ওপর অতি-নির্ভরতার যে চিত্রটি জনসমক্ষে উঠে আসে,
তা প্রতিফলিত হয় তত্কালীন কেন্দ্রের শাসক দল নেহেরু পরিচালিত কংগ্রেসকে
প্রগতিশীল বুর্জোয়া হিসেবে সমর্থন করার মধ্যে দিয়ে। সিপিআই-এর পালঘাট
কংগ্রেসে সিপিএসইউ-এর বিংশতি কংগ্রেসকে সমর্থন দিয়ে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল,
১৯৫৮-এর অমৃতসর কংগ্রেস ও ১৯৬১-এর বিজয়ওয়াড়া কংগ্রেস তার সেই দক্ষিণপন্থী
যাত্রাকে অব্যাহত রাখল। শান্তিপূর্ণ উপায়ে পার্লামেন্টারী পথে সমাজতন্ত্র
প্রতিষ্ঠার লাইন পার্টির অভ্যন্তরে ক্রমশ সংহত হল। ১৯৫৭ সালে কেরলে
নাম্বুদ্রিপাদের নেতৃত্বে সরকার গড়ার অভিজ্ঞতাকে সারসংকলন করে ভারতীয়
বিপ্লবের রণকৌশলকে প্রধানত সরকার গড়ার রাজনীতিতে পরিণত করার প্রচেষ্টা শুরু
হল। এর মধ্যে দিয়ে পার্টির একাংশ বিপ্লবের পথের বিপরীতে সংশোধনবাদের
রাস্তায়, সরকার-সর্বস্বতার রাস্তায় সেদিন হাঁটতে শুরু করেছিল।
এমনি এক আন্তর্জাতিক ও সর্বভারতীয়
প্রেক্ষাপটে এদেশের বিপ্লবকামী বামপন্থীরা সি পি আই-এর ক্রুশ্চভপন্থী
সংশোধনবাদী অবস্থানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল। চীন-ভারত যুদ্ধের
প্রেক্ষাপটে তা পরিণতি পেয়েছিল সিপিআই ভেঙ্গে সিপিআই(এম) গড়ে তোলার ঘোষণার
মধ্যে দিয়ে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বিপ্লবকামী বামপন্থী কর্মীরা সিপিআই
ছেড়ে বেরিয়ে এসে সেদিন সি পি আই(এম)-এ যোগ দিয়েছিলেন। যদিও সিপিআই(এম)
কখনোই ক্রুশ্চভপন্থী সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে জোরালো অবস্থান নিতে পারেনি।
বরারবই সে সংশোধনবাদের বীজ বয়ে বেড়িয়েছে। যাই হোক, সে সময়ে সিপিআই-এর
সুস্পষ্ট সংশোধনবাদী আপসকামী চরিত্রের বিরুদ্ধে বাম-আন্দোলনের কর্মীদের
মধ্যেকার প্রতিবাদী ও বিদ্রোহী চেতনাটি গোটা দেশে শুধুমাত্র বিচ্ছেদ
ঘোষণাতেই থেমে থাকে নি। তা নির্দিষ্ট করতে চেয়েছে নতুন যাত্রাপথকেও। সারা
দেশ জুড়ে এই ঘটনা ঘটলেও পশ্চিমবঙ্গ ছিল এই লড়াইয়ের অন্যতম প্রধান
কেন্দ্রস্থল। দেশের বাম রাজনীতির পীঠস্থান বাংলায় এই ঘটনার সুদূরপ্রসারী
প্রভাব পড়েছিল, যা অতি দ্রুতই সিপিআই(এম)-এর আপসকামী চরিত্রের বিরুদ্ধেও
পার্টির ভেতরেই বিক্ষোভের রূপ নেয়।
এই সময়েই পশ্চিমবঙ্গের জনজীবনে নানাদিক
থেকে সঙ্কট ক্রমশ তীব্র হয়ে উঠছিল। বেকারিত্ব-দারিদ্র্য-মূল্যবৃদ্ধির বোঝা
ক্রমশ গরীব–নিম্নবিত্ত জনগণের ঘাড়ে চেপে বসছিল। এরই মধ্যে চীন-ভারত যুদ্ধের
পরিপ্রেক্ষিতে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়ে উঠল। এই সময়ের এক গুরুত্বপূর্ণ
আন্তর্জাতিক ঘটনা ভিয়েতনামের মুক্তিযুদ্ধ। এই লড়াই বাংলার ছাত্র-যুব সমাজের
তীব্র সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধিতার ঐতিহ্যকে আবার সামনে নিয়ে এসেছিল। এই পর্বেই
চীনে সংঘটিত হচ্ছে সর্বহারার সাংস্কৃতিক বিপ্লব, যা বাংলার
প্রগতিশীল-বিপ্লবকামী অংশের মধ্যে এক আলোড়ন সৃষ্টি করছে। কমিউনিস্ট
আন্দোলনের বিতর্কগুলোতে আলোড়িত হচ্ছে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসগুলো।
খাদ্যের দাবিতে বুভুক্ষু কৃষকরা দখল নিচ্ছে রাজপথের। শ্রমিকদের
বিক্ষোভ-হরতালে মালিকরা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে উঠেছিল। বাংলা উত্তাল হয়ে উঠছিল
সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে; মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে, যুদ্ধের
বিরুদ্ধে, খাদ্যের দাবিতে এ রাজ্যের লক্ষ লক্ষ মেহনতী মানুষ-ছাত্র-যুবদের
লড়াই এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণের দিকে বাংলাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল।
১৯৬৬ সালের খাদ্য আন্দোলন বামপন্থীদের
নেতৃত্বে এক ব্যাপক জনজোয়ার সৃষ্টি করল। কিন্তু এই প্রতিবাদী জাগরণকে
দেশব্যাপী বিপ্লবী আন্দোলনের ধারায় এক উন্নত স্তরে বিকশিত করার কোনো সচেতন
রণকৌশল তত্কালীন সিপিআই(এম) নেতৃত্বের ভাবনায় উপস্থিত ছিল না। ফলে সমাজের
নিপীড়িত শ্রমজীবীদের মধ্যে প্রতিবাদী গণজাগরণের সুনির্দিষ্ট বাস্তবতাটি কোন
রণকৌশল গ্রহণের মাধ্যমে এক বিপ্লবী গণজাগরণের স্তরে বিকশিত হবে তা নির্ণয়
করার জন্য কোনো সচেতন উদ্যোগ বা বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া গ্রহণ করতেও দেখা যায়
নি। শোষিত-নিপীড়িতদের একটি প্রতিবাদী গণ-জাগরণকে বৈপ্লবিক অভিমুখে বিকশিত
করতে শ্রমিকশ্রেণির নিজস্ব জাগরণ ও তার নেতৃত্ব কী ভূমিকা রাখে–সে বিষয়েও
কমিউনিস্ট বোঝপড়াটিকে সুস্পষ্ট করে তোলা যায় নি। এই সমস্যাগুলি থাকা
সত্ত্বেও তত্কালীন আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পরিস্থিতির প্রভাবে এবং বাংলার
নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের কারণে গণ-আলোড়নের পর্বটি দীর্ঘায়িত হতে থাকে।
শ্রমিক-কৃষকের আন্দোলন, ছাত্র-যুবদের আন্দোলন এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য নিয়ে
বাংলায় উপস্থিত থাকে।
১৯৬৭ সালের শুরুর দিকে পশ্চিমবঙ্গের
বিধানসভা নির্বাচনে প্রথমবারের জন্য জাতীয় কংগ্রেস পরাজিত হয়। তৈরি হয়
প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকার যার অন্যতম শরিক ছিল সিপিআই(এম)। রাজ্যের বামপন্থী
রাজনীতির ইতিহাসে এ ছিল আরেক যুগসন্ধিক্ষণ। একদিকে আন্তর্জাতিক স্তরে
কমিউনিস্ট আন্দোলনে সংশোধনবাদী ও বৈপ্লবিক অবস্থানে মেরুকরণ ও তার প্রভাবে
এদেশের কমিউনিস্ট পার্টিতে বিভাজন, অন্যদিকে দেশ তথা রাজ্যে
শ্রমিক-কৃষক-ছাত্র-যুবদের গণআন্দোলনের এক অভূতপূর্ব জোয়ার-এমন এক
সন্ধিক্ষণে প্রচলিত সংসদীয় কাঠামোয় সরকারী ক্ষমতায় আসীন হলে বিপ্লবী শক্তির
ভুমিকা কী হবে-এ প্রশ্নটি জীবন্ত হয়ে উঠল। নকশালবাড়ির কৃষক অভ্যুত্থানকে
ঘিরে এই প্রশ্নটি ভীষণভাবে সামনে চলে এল। সিপিআই(এম) ভারতীয় বিপ্লবের যে
রণনীতি ও রণকৌশল গ্রহণ করেছিল, তাতে অঙ্গরাজ্যে সরকার গড়ার কর্মসূচী
অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু সিপিআই(এম) নেতৃত্ব গণ- আন্দোলনের স্বতঃস্ফূর্ত
জোয়ারকে সরকার গড়ার পরিণতিতে পৌঁছে দিলেও গণ আন্দোলনের জোয়ার তখনও স্তিমিত
হয় নি। নকশালবাড়ি কৃষক অভ্যুত্থান তার সবথেকে বড় প্রমাণ। কিন্তু সিপিএম
নেতৃত্ব যে আর কোনোভাবেই চলমান সংগ্রামের কোনো বৈপ্লবিক বিকাশ চাইছিলেন না,
তা নকশালবাড়ি আন্দোলন নিয়ে তাদের অবস্থানের মধ্যে দিয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এখানে নেতৃত্বের আপসকামিতা, সংস্কারমুখীনতার দিকটি একটি পরিণতিতে পৌঁছে
গেল।
চলমান গণআন্দোলনগুলির মধ্যে যে বৈপ্লবিক
সম্ভাবনা সুপ্ত থাকে, তাকে বিকশিত করাটাই তো কমিউনিস্টদের সামনে আশু
কর্তব্য হয়ে ওঠে। বিশেষ করে তা যখন ছাত্র-যুব-শ্রমিক-কৃষক-সহ সমাজের
বিভিন্ন অংশের প্রতিবাদের মধ্যে দিয়ে একইসাথে ধ্বনিত হয়, এই বৈপ্লবিক
রণকৌশলের প্রশ্নটি তখন অনেক বেশী প্রাধান্যের জায়গায় চলে আসে। প্রশ্ন ছিল,
একটি অঙ্গরাজ্যের ক্ষেত্রে কোন রণকৌশলের সাহায্যে আন্দোলনকে আরও বিকশিত
স্তরে নিয়ে যাওয়া সম্ভব? এই প্রশ্নটি যে কোনো দেশের বৈপ্লবিক আন্দোলনেরই এক
অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। অনেক বড় দেশেই এমন পরিস্থিতি বহু সময়ই দেখা গেছে
যে দেশের একটি প্রান্তে যখন বিপ্লবী আন্দোলন ও মানুষের বৈপ্লবিক চেতনা বেশ
কিছুটা এগিয়ে যায়, দেখা যায় দেশটির বিস্তীর্ণ অঞ্চল তখনও ততটা জেগে ওঠেনি।
এর জন্য মার্ক্স–এঙ্গেলস-লেনিন বা কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিককে কখনও এমন
সমাধান দিতে দেখা যায় নি যে–কী আর করা যাবে, একটা রাজ্যে তো আর বিপ্লব করে
ফেলা যায় না, সুতরাং সরকারে যাও আর জনগণকে রিলিফ দিতে থাকো! এমন সমাধান যে
আসেনি তার কারণটাও খুব স্পষ্ট–রাষ্ট্রটা যদি শ্রমজীবী জনগণের শত্রু শ্রেণির
হাতে থাকে, তবে একটি অঙ্গরাজ্যে সেই জনগণের ‘বন্ধুদের’কে(কমিউনিস্টদের কথা
বলা হচ্ছে) ‘রিলিফ দেওয়া’র কাজ কোনোমতেই শাসকশ্রেণির রাষ্ট্র চালাতে দেবে
না। প্রথম বা দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট সরকারের আমলে বিশেষত বাংলার গ্রামাঞ্চলের
সংগ্রামী কৃষকদের রিলিফ দেওয়ার লক্ষ্যে যে পুঁজিবাদী ভূমিসংস্কারের কাজ
আংশিক রূপে সরকারের পক্ষ থেকে শুরু করা হয়েছিল, তাতেই শাসকশ্রেণী সন্ত্রস্ত
হয়ে পড়ে। কেন্দ্রীয় সরকার দু’বারই যুক্তফ্রন্ট সরকারকে ভেঙ্গে দেয়। এখন
যদি এই সত্যিটাকে জনগণের সামনে তুলে ধরার জন্যই শুধু সরকারে যেতে হয়, তবে
তো অতি দ্রুতই সেই সত্য জনগণের সামনে চলে আসবে। সেক্ষেত্রে দীর্ঘদিন সরকারে
বসে থাকার কোনো সুযোগই থাকবে না। অন্য যে রাস্তাটি পড়ে ছিল—বিপ্লবের
সম্ভাবনা যেহেতু নেই, তাই এই শোষণকারী ব্যবস্থাতেও সরকারে গিয়ে জনগণকে যতটা
রিলিফ দেওয়া যায়, তা করার জন্যই দীর্ঘমেয়াদীভাবে সরকারে টিকে থাকার
ব্যবস্থাপনা। বাম রাজনীতির মর্মবস্তু যদি এখানে এসে দাঁড়ায়, তবে তাকে
শাসকশ্রেণীকে ক্রমাগত এটাই বোঝাতে হবে যে নামে ‘বাম’ হলেও তারা এই
ব্যবস্থাটিকেই টিকিয়ে রাখতে চায়, বিপ্লব করার প্রস্তুতি বা পরিকল্পনা
কোনোটাই তাদের নেই। সিপিআই এবং সিপিআই(এম) এই দ্বিতীয় রাস্তাটি গ্রহণ করল।
যে কোন দেশেই বিপ্লবী রণকৌশল দেশটির
রাষ্ট্রচরিত্র, পুঁজিবাদী বিকাশের স্তর, যোগাযোগ ব্যবস্থার অগ্রগতি
ইত্যাদির ওপর বহুলাংশে নির্ভর করবে। কিন্তু, তৃতীয় আন্তর্জাতিকের ধারায়
দেশে দেশে গড়ে ওঠা কমিউনিস্ট বা সোশ্যালিস্ট পার্টিগুলির মধ্যে
সিপিআই(এম)-ই সম্ভবত প্রথম পার্টি, যারা একটি অঙ্গরাজ্যে সরকার গঠন করে
জনগণকে রিলিফ দেওয়ার ‘বিনম্র কর্মসূচী’টিকে রণকৌশলগত লাইন হিসেবে গ্রহণ করে
এবং তা প্রবলভাবে অনুশীলন করে। আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে যাদের
‘সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট’ বলা হয়, বিভিন্ন দেশে তারা এমন সরকার তৈরি
করেছেন—যাদেরকে কমঃ লেনিন ও তাঁর-পরবর্তী আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলন
শ্রমিক-আন্দোলনে পুঁজিপতিদের এজেন্ট বলেই চিহ্নিত করেছে। দেশের ক্ষমতাদখলের
জন্য অভ্যুত্থানের ডাক দেওয়ার মত পরিস্থিতি না থাকলে যে গণআন্দোলন ও
সশস্ত্র আন্দোলনের দীর্ঘকালীন আঁকাবাঁকা পথেই বিপ্লবী আন্দোলনের বিকাশ
ঘটাতে হবে–এ হল মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী রণকৌশলের অ-আ-ক-খ। সারা ভারতে বাম
আন্দোলন অনেক পিছিয়ে রয়েছে–সমস্যার প্রাণকেন্দ্র যদি এটা হয়, তবে বাংলাসহ
যেসব রাজ্যে বাম আন্দোলন এগিয়ে গিয়েছিল সেইসময়, সেখান থেকে পিছিয়ে থাকা
রাজ্যগুলিতে দ্রুত বিকাশ ঘটানোর লক্ষ্যে বড় সংখ্যায় সংগঠকদের নিয়োগ করাটাই
তো প্রথম জরুরী পদক্ষেপ ছিল। স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়েও বাংলা ও পাঞ্জাবে
এমন অজস্র উদাহরণ দেখা গেছে। অন্য যে প্রশ্নটি তোলা হয়েছিল, সেটি হল কোনো
একটি অঙ্গরাজ্যে জনগণ যদি কমিউনিস্টদের ভোট দিয়ে জিতিয়ে দেয়, তবে
কমিউনিস্টরা কী করবে? এই প্রশ্নটিকে নানান দিক থেকে দেখার আছে, এই আলোচনায়
তা করার সুযোগ নেই। কিন্তু নিশ্চয়ই একথা বলা দরকার যে, পাকাপাকিভাবে এই
শোষণমূলক ব্যবস্থার অংশ হয়ে না যেতে চাইলে, ব্যতিক্রমমূলক কোন পরিস্থিতিতে
কমিউনিস্টরা সরকারে অংশগ্রহণ করলেও তাদের মৌলিক কর্মসূচিগুলিকেই তারা দ্রুত
লাগু করতে উদ্যোগী হবে; অর্থনৈতিক নীতি, আইন-আদালতের মৌলিক সংস্কার করতে
উদ্যোগী হবে–যাতে সারা দেশের শ্রমজীবী মানুষ বুঝতে পারে কমিউনিস্টরা কী
চায়। এমনকী কোনো ব্যতিক্রমমূলক পরিস্থিতিতে কমিউনিস্টরা কোনো অঙ্গরাজ্যে
সরকার গঠন করার মতো পরিস্থিতির সম্মুখীন হলেও জনগণকে রিলিফ দেওয়ার কথা বলে
বা সেই চেষ্টা করে জনগণকে সংসদীয় ব্যবস্থার প্রতি মোহগ্রস্ত করে তুলবে না।
১৯০৫-পূর্ববর্তী রাশিয়ায় শ্রমিক আন্দোলনের
যে অভূতপূর্ব বিকাশ ঘটেছিল, তাকে শ্রমিক-কৃষকের বৈপ্লবিক একনায়কত্ব অবধি
বিকশিত করার যে আশু কর্তব্যটি লেনিন দেখতে পেয়েছিলেন, তার মধ্যেই ছিল
বলশেভিকবাদের বীজ। সেই বিকাশের সম্ভাবনাকে রূপ দিতে গিয়ে লেনিন একদিকে
কমিউনিস্ট সংগঠনের সাংগঠনিক নীতি নির্মাণ করলেন, অন্যদিকে চূড়ান্ত রূপ
দিয়েছিলেন রুশ বিপ্লবের রণনীতি ও রণকৌশলের। বিপ্লবী আন্দোলনের ইতিহাসে এরকম
উদাহরণ আরো আছে। সিপিআই তো আগেই ঘটিয়েছে, সিপিআই(এম) নেতৃত্বও ভারতের বাম
আন্দোলনের বিপ্লবী দিশায় এগোনোর প্রশ্নে এক মৌলিক বিচ্ছেদ ১৯৬৭-তেই ঘটিয়ে
ফেলল। সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা বা প্রতারণা, যাই বলা হোক, তা এখানেই যে, তারা
ভারতের বিপ্লবী আন্দোলনের বিকাশের সবথেকে সম্ভাবনাপূর্ণ অধ্যায়টিকে প্রধানত
সরকার গড়ার কর্মসূচীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে দিলেন। ভারতের জনগণতান্ত্রিক
বিপ্লব সম্পন্ন করতে কমিউনিস্টদের সামনে যে কৃষিবিপ্লবী কর্তব্যটি দায়িত্ব
এসে উপস্থিত হয়েছিল, দেশের কোনো একটি-দুটি অঙ্গরাজ্যে জনগণকে রিলিফ দেওয়ার
নামে সরকার গঠন করে আংশিক পুঁজিবাদী ভূমি-সংস্কারের প্রচেষ্টাকে কোনোভাবেই
তার অনুশীলন হিসেবে দেখা উচিত হবে না। আর কর্মসূচীতে সংসদ-বহির্ভূত
সংগ্রামের কথা লিখলেই তা যে বাস্তবে অনুশীলিত হবে এমন কোনো কথা নেই।
ইতিহাসে এর ভুরি ভুরি উদাহরণ আছে। এটা অত্যন্ত স্পষ্ট ব্যাপার যে সিপিএম
নেতৃত্ব এই সরকার গড়ার মধ্যেই সেই সময়ের সমস্ত বিকাশের সম্ভাবনাকে আটকে
রাখতে চেয়েছিলেন, এবং তা সচেতনভাবেই। সরকারের সাফল্য হিসেবে যে
ভূমিসংস্কারের পরিসংখ্যান তারা দেন, তা যে কোনোভাবেই শ্রেণী সংগ্রামের
বিকাশে, বিপ্লবী আন্দোলনের অগ্রগতিতে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে নি বাস্তব
ইতিহাসই তার প্রমাণ। মহাবিতর্কে সোভিয়েত পার্টি-চীন পার্টির থেকে
সমদুরত্বের লাইন নিলেও রুশ পার্টির সঙ্গে সখ্যে সিপিআই-এর কাছে
প্রতিযোগিতায় হেরে যাওয়ার আশঙ্কাতেই হোক আর সিপিসি-র অভ্যন্তরে দুই লাইনের
লড়াইয়ে ক্রমশ সংশোধনবাদীদের শক্তিশালী হয়ে পড়াকে মেনে নেওয়ার কারণেই হোক,
‘বাস্তববোধসম্পন্ন’ সিপিএম নেতারা বিপ্লব বা বৈপ্লবিক কর্মসূচীর তাত্পর্য
সম্পর্কেই নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করতে শুরু করেছিলেন। বিপ্লবের প্রতি আগ্রহ ও
আস্থা দুটোই সিপিআই(এম) নেতৃত্বের নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। এই পরিস্থিতিতে
নকশালবাড়ি অভ্যুত্থান ও তাকে কেন্দ্র করে সমাজে যে বৈপ্লবিক আলোড়ন সৃষ্টি
হয়েছিল, তা তত্কালীন সিপিএম নেতৃত্বের পক্ষে ধারণ করা সম্ভব ছিল না।
বিপরীতে নকশালবাড়ির অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র
করে যে সামাজিক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল, তা ভারতে বৈপ্লবিক সংগ্রামের বিকাশের
সম্ভাবনা ও সমস্যা, উভয়কেই সামনে এনে দিয়েছিল। একটি আধা-সামন্ততান্ত্রিক ও
আধা ঔপনিবেশিক (১৯৪৭-পরবর্তী ভারত আদৌ আধা-ঔপনিবেশিক ছিল কিনা তা ভিন্ন
প্রশ্ন) দেশে কৃষিবিপ্লবকে অক্ষ করে নয়া গণতান্ত্রিক বা জনগণতান্ত্রিক
বিপ্লব সফল করার যে চালু মডেল চীন থেকে ভারতের কমিউনিস্টদের একাংশ
শিখেছিলেন, তা কীভাবে ভারতের বুকে প্রয়োগ করা সম্ভব, তা জীবন্ত করে তুলেছিল
নকশালবাড়ি অভ্যুত্থান। সশস্ত্র উপায়ে ঘাঁটি এলাকা গঠন করে দীর্ঘস্থায়ী
জনযুদ্ধের মাধ্যমে ভারতীয় বিপ্লবকে সাফল্যের পথে নিয়ে যাওয়ার যে চিত্র
উপস্থিত হয়েছিল সেদিন দেশের বিপ্লবকামী কমিউনিস্টদের সামনে, তেলেঙ্গানার
লড়াইয়ের পরবর্তীতে তেমন কোনো সুনির্দিষ্ট বিপ্লবকামী প্রচেষ্টা ভারতের
কমিউনিস্ট আন্দোলনে ছিল না। সিপিএম-নেতৃত্বের সংস্কারবাদী-সংশোধনবাদী
পরিণতির কারণেই তারা এই বিপুল জাগরণকে ‘হঠকারী’ চিহ্নিত করে পশ্চাদপসারণ
করলেও দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পোড়খাওয়া লড়াকু কমিউনিস্টরা দেশজোড়া বিপ্লবী
কৃষক আন্দোলনের সম্ভাবনাকে অনুভব করে সিপিআই(এম) থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন। এই
ঘটনার অভিঘাতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে শ্রমিক-কৃষক-ছাত্র-যুবদের মধ্যে যে
আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল, তাকে ধারণ করার কোনো উপযোগী আধার সেদিন তৈরী ছিল না।
আধারের আশু প্রয়োজনীয়তা থেকে ১৯৬৮ সালে জন্ম নিল কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের সারা
ভারত কো-অর্ডিনেশন কমিটি বা এ আই সি সি সি আর ।
এই আন্দোলনকে প্রাথমিকভাবে যে পুলিশী
দমনপীড়নের মুখে ফেলা হল, সেই পুলিশের মন্ত্রী ছিলেন সিপিআই(এম)-এর
কেন্দ্রীয় নেতা জ্যোতি বসু। নকশালবাড়ি আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সরকারের
ভূমিকায় তত্কালীন সিপিআই(এম) কর্মসূচীর ১১২ নং ধারার ভিত্তিতে অঙ্গরাজ্যে
সরকার গড়ার লাইন নিয়ে দলের অভ্যন্তরে বিতর্ক শুরু হল। এই বিতর্কে এরাজ্যের
সিপিআই(এম)–এর প্রধান মুখ প্রমোদ দাশগুপ্ত-জ্যোতি বসু-হরেকৃষ্ণ কোঙাররা
নকশালবাড়িতে সরকারের গুলিচালনার পক্ষে দাঁড়ালেন। পার্টির দার্জিলিং জেলা
কমিটির নেতৃত্বে এই অভ্যুত্থান পরিচালিত হলেও রাজ্য নেতৃত্ব সেই আন্দোলনকে
‘হঠকারী’ বলে ঘোষণা করলেন। সিপিআই(এম) নেতৃত্বের এই শোধনবাদী অবস্থানের
বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের কমিউনিস্ট কর্মীরা দলত্যাগ করতে থাকেন।
নকশালবাড়ির কৃষকদের লড়াইয়ের প্রতি সমর্থন রাজ্যের অগণিত
শ্রমিক-কৃষক-ছাত্র-যুবদের মধ্যে বিপ্লবী আদর্শের বোধকে ছড়িয়ে দিয়েছিল। সেই
উত্তাল সময়েই এদেশের বিপ্লবী বামপন্থীরা জন্ম দিয়েছিলেন কমিউনিস্ট
বিপ্লবীদের সারা ভারত কো-অর্ডিনেশন কমিটি(AICCCR)-এর।
বিপ্লবী পার্টি গড়ার সংগ্রাম
সিপিআই-সিপিআই(এম)-এর শোধনবাদী অবস্থানের
বিপরীতে নতুন করে দেশের বুকে একটি বিপ্লবী পার্টি গঠনের উদ্যোগ শুরু হয়েছিল
সেদিন। কিন্তু অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের বিষয় হল, অচিরেই এই উদ্যোগটিতে ভাঙ্গন
এসে উপস্থিত হয়েছিল। নিজেদের মধ্যেকার বিতর্কের কোনো ধৈর্যশীল মীমাংসা
উপস্থিত না করেই চারু মজুমদারের নেতৃত্বাধীন অংশটি সি পি আই(এম-এল) পার্টি
গঠনের ঘোষণা করে দিলেন। বিপরীতে নাগি রেড্ডি-ডি ভি রাও-দের নেতৃত্বাধীন
অংশটি সি পি আই (এম এল) পার্টি গঠনের প্রক্রিয়াটিকে বিরোধ করে তা থেকে সরে
দাঁড়ালেন। সি পি আই (এম এল)-এর কর্মকান্ডের প্রধান কেন্দ্র যেহেতু বাংলা
ছিল, ফলে তাদের সমস্ত অনুশীলনের গভীরতম প্রভাব বাংলার বামপন্থী আন্দোলনে
পড়েছে। এই বিপ্লবী শক্তিটির মধ্যে ভারতীয় বিপ্লবে সর্বহারাশ্রেণীর
নেতৃত্বের স্তরে বিকশিত হওয়ার প্রশ্নটিকে কার্যত অস্বীকার করা, ভারতের
কৃষিবিপ্লবের নিজস্ব বৈশিষ্ট্যগুলিকে আয়ত্ত করে তদুপযোগী অনুশীলনের
পরিবর্তে চীনা মডেলের অন্ধ অনুকরণ করার প্রচেষ্টা, গণ সংগঠন–গণআন্দোলন
বয়কট, খতম-লাইন ও তার বিকৃততম অনুশীলন, কর্তৃত্ববাদের চরম আধিপত্য,
পরিস্থিতিকে বাড়িয়ে দেখা, পার্টির অভ্যন্তরে উপদলীয় চক্রান্তের মধ্যে ডুবে
যাওয়া প্রভৃতি সমস্যাগুলি প্রকট হয়ে উঠলো প্রধানত এক গভীর মতাদর্শজনিত
সমস্যার কারণে। এরই সাথে শাসকশ্রেণীর নির্মমতম দমনের কারণে অতি অল্পসময়ের
মধ্যেই সি পি আই(এম এল) ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। কয়েক হাজার বিপ্লবীর
আত্মবলিদানের বিনিময়ে যে পার্টি (আমাদের মতে, একে কমিউনিস্ট পার্টি বলা চলে
না–কিন্তু এটি একটি বিপ্লবী পার্টি ছিল) ভারতের বুকে প্রথমবারের জন্য
বিপ্লব প্রচেষ্টায় অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে ব্রতী হয়েছিল, সে শক্তির নির্মমভাবে
দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া-টা অসংখ্য বিপ্লবকামী জনতার কাছে স্বপ্নের অপমৃত্যুর মতো
মনে হয়েছিল। একথা অনস্বীকার্য যে, সিপিআই(এম)-এর শোধনবাদী রাজনীতির
বিপরীতে সমাজের বুকে তারা বৈপ্লবিক অবস্থানকে অত্যন্ত সজোরেই উত্থাপন
করেছিলেন। কিন্তু বাংলা তথা ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনে যতধরনের মতাদর্শগত
পশ্চাদপদতা, ভ্রান্তি, বিকৃতি ও মৌলিকত্বের অভাব জমা হয়েছিল, নতুনভাবে
বিপ্লবী পার্টি গঠন ও চরমতম আত্মত্যাগের মাধ্যমে বিপ্লবপ্রচেষ্টার এই
কালপর্বটিতে, তার সাথে মৌলিকভাবে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে এগোনোর ইঙ্গিত উপস্থিত করতে
ব্যর্থ হয়েছিলেন। চীনা পার্টির থেকে তারা একভাবে বিপ্লবী অনুপ্রেরণা
নিয়েছিলেন। দেশের বিপ্লবকামী কমিউনিস্টদের মধ্যে তা সঞ্চারিত করতেও সক্ষম
হয়েছিলেন একটা দূর পর্যন্ত। কিন্তু তৎকালীন বিশ্ব-পরিস্থিতি বুঝতে, ভারতীয়
সমাজ-সভ্যতাকে বুঝতে, ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের সমস্যা ও জটিলতাকে বুঝতে
এই আন্দোলন অগ্রণী কমিউনিস্ট বিচক্ষণতা দেখাতে পারেনি। কমিউনিস্ট পার্টি যে
শ্রমিক শ্রেণির অগ্রণী অংশের পার্টি–এই মৌলিক ধারণাটিকেই নানান দিক থেকে
খারিজ করে দেওয়া হয়েছিল। তত্ত্বগত চর্চাকেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। কোন রকম
প্রশ্ন তোলাকেই বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।
বাম-সঙ্কীর্ণতাবাদী রাজনীতির করাল গ্রাসে আক্রান্ত হয়েছিল সেদিনের সেই মহান
উদ্যোগ ও উজ্জ্বল সম্ভাবনাটি।
স্বপ্নভঙ্গের পরেও…
কিন্তু শাসকশ্রেণীর দিবাস্বপ্নকে পদদলিত
করে শহীদদের স্মৃতিকে সামনে রেখে, অনিচ্ছাকৃত ভুলের থেকে শিক্ষা নিয়েই ভারত
তথা বাংলার বাম আন্দোলন নিজেকে পুনঃসংগঠিত করার নানা চেষ্টা চালিয়ে গেছে।
জরুরি অবস্থার কালো দিনগুলোকে পেরিয়ে ভারতের বাম আন্দোলনের বিপ্লবী ধারাকে
এগিয়ে নিয়ে যাবার চেষ্টা করেছে আপ্রাণভাবে। এই সময়ে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের
বিপর্যয়, ১৯৭৬-এ কম: মাও-এর মৃত্যু এবং চীনা পার্টির ভেতরে কার্যকরী
বিপ্লবী নেতৃত্বের অভাব পার্টির অভ্যন্তরে দেং জিয়াও পিং-দের নেতৃত্বাধীন
সংশোধনবাদী নেতৃত্বের ক্ষমতাদখলকে ত্বরান্বিত করল। দেং-রা প্রচার করতে শুরু
করলো ‘বেড়াল সাদা হোক বা কালো, ইঁদুর ধরতে পারলেই হোলো’। পুঁজিবাদী পথে
ফেরার লক্ষ্যে সংস্কারের রাস্তায় চীনা পার্টি এক ‘বিরাট বিপরীত যাত্রা’
শুরু করল। আন্তর্জাতিক স্তরে আর কোনো বিপ্লবী কেন্দ্র রইল না। ভারতের বুকে
তথাকথিত “সমাজতান্ত্রিক” রাশিয়া দ্বারা সমর্থিত ইন্দিরা স্বৈরতন্ত্র
নির্বাচনে পরাজিত হল। জরুরি অবস্থার অবসানে এরাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে
পশ্চিমবঙ্গের মানুষ কংগ্রেসের অপশাসনের বিরুদ্ধে নির্বাচনে
সিপিআই–সিপিআই(এম)-এর মতো সরকারসর্বস্ব সংস্কারবাদী বামেদের প্রতিই তাদের
সমর্থন জানালো। অঙ্গরাজ্যের ক্ষমতা নিয়ে সি পিআই(এম) সর্বভারতীয় রাজনীতিতে
নিজেদের প্রাসঙ্গিক করে তুলতে এমনকী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দেশের প্রধান
শাসক দল কংগ্রেসকে সমর্থন করার লাইন নিল, অন্যদিকে তারা রাজ্যের প্রধান
শাসক দল হিসেবে সরকারী ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে সরকারী বামপন্থাকেই একমাত্র
বামপন্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠার কাজে লাগলো। ১৯৭৭-পরবর্তী পশ্চিমবঙ্গের
বামপন্থী আন্দোলনের ক্ষেত্রে একদিকে বিপ্লবী শক্তির চরম বিপর্যয় ও
জনবিচ্ছিন্নতা এবং অন্যদিকে সিপিআই(এম)-এর নেতৃত্বে সংশোধনবাদী শক্তির
বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সরকারী ক্ষমতালাভ এক নতুন যাত্রাপথের সূচনা
করল। বিপ্লবী বামপন্থার প্রতি নানানস্তরে জনসমর্থন উপস্থিত থাকলেও
সিপিআই(এম)-এর বিপরীতে তার কোনো সংগঠিত উপস্থিতি পরিলক্ষিত হয় নি।
সংশোধনবাদের পরিনতি
অন্যদিকে সিপিআই(এম) সরকার পরিচালনার
প্রশ্নে রাজ্যের প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের বঞ্চনার বিষয়টিকে জনসমর্থন ধরে
রাখার প্রাথমিক কেন্দ্রবিন্দু করল। ‘বামফ্রন্ট সরকার সংগ্রামের
হাতিয়ার’-ধরনের প্রচার কেন্দ্রীয় সরকারের বঞ্চনার প্রতি বিরোধিতার মধ্যেই
আটকে রইল। পাশাপাশি তত্কালীন কৃষিনির্ভর পশ্চিমবাংলায় তারা গ্রামাঞ্চলে
কোনো মৌলিক ধরনের ভূমি সংস্কার কর্মসূচীকে সংগ্রামের নতুন রূপ হিসেবে সামনে
নিয়ে আসার পরিবর্তে ‘অপারেশন বর্গা’ জাতীয় আংশিক কর্মসূচীকে সামনে রেখে
দরিদ্র কৃষিজীবী জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা অর্জনেই অনেক বেশি
মনোযোগী হয়েছিল। এরাজ্যের শ্রমিকশ্রেণীর লড়াকু ঐতিহ্যকে সচেতনভাবে বদলে
দেওয়ার ভাবনায় কারখানায় অথবা শিল্পে শ্রমিক-মালিক বিরোধে সমঝোতাকারীর
ভূমিকা নিল পার্টি। শ্রমিকশ্রেণীর স্বাধীন উদ্যোগ, লড়াইয়ের আগ্রহ ক্রমশ
কমতে শুরু করল। সি পি আই (এম)-এর উদ্যোগে শ্রেণী-সমঝোতার তত্ত্বায়ন করা হল।
তদুপযোগী বাতাবরণ সৃষ্টি করার জন্য পার্টির উদ্যোগকে ব্যাপকভাবে
কেন্দ্রীভূত করা হল।
১৯৭৭-পরবর্তী বাংলায় ছাত্র আন্দোলনের এক
নতুন অগ্রগতি শুরু হয়েছিল। সি পি আই(এম) ক্ষমতায় বসলেও শুরুতেই
পার্টিতন্ত্র ততটা জাঁকিয়েবসতে পারে নি। ছাত্র আন্দোলনের ওই বিকাশটি তাদের
ক্ষমতার বৃত্তের বাইরে দাঁড়িয়ে ঘটেছিল, চরিত্রের দিক থেকে যা ছিল সংগ্রামী,
স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক। পশ্চিমবঙ্গে কর্মরত কমিউনিস্ট বিপ্লবী শক্তিগুলি
এই বিকাশের সাথে তুলনামূলক বেশি সম্পৃক্ত থাকলেও এটিকে বিকশিত করা ও স্থায়ী
রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে তারা অনেকটাই সীমাবদ্ধ ছিল। ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি
সময় থেকে এই বিকাশ ক্রমশ স্তিমিত হতে থাকে। বিপরীতে কলেজে-বিশ্ববিদ্যালয়ে
পার্টিতন্ত্র সরকারী ক্ষমতার জোরে সংহত হতে থাকে। ছাত্রছাত্রী আন্দোলনের যে
লড়াকু অতীত বাংলার এক নিজস্ব বৈশিষ্ট্য হিসেবে গড়ে উঠেছিল, তা সরকারী
ক্ষমতার ঘেরাটোপে পড়ে ‘পাইয়ে দেওয়া-মানিয়ে চলা’র এক আপসকামী মতাদর্শের আবহে
হারিয়ে যেতে থাকে। সিপিআই(এম) বামফ্রন্ট সরকারকে ‘সংগ্রামের হাতিয়ার’ থেকে
বদলে দিয়ে ‘নয়নের মণির মতো রক্ষা করার’ কথা বলে ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করে
তোলার দিকে আরো জোরালোভাবে ঝুঁকে পড়তে থাকে। সরকারী ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে
বাংলার বামপন্থার সংগ্রামী ও বিপ্লবী ঐতিহ্যের বিপরীতে জনগণকে ‘পাইয়ে দেবার
রাজনীতি’তে নিষ্ক্রিয় সমর্থক করে তোলার কাজে সমগ্র সিপিআই(এম) পার্টি
আত্মনিয়োগ করে। ফলে বাংলার শোষিত–বঞ্চিত কৃষকরা বা গ্রামীণ মেহনতী জনগণ
সিপিএম-জমানার প্রথম পঁচিশ বছরে গ্রামাঞ্চলে ‘অপারেশন বর্গা’-ধরনের
পুঁজিবাদী ভুমি-সংস্কার আইনের কিছুটা উৎসাহী প্রয়োগ দেখে আস্বস্ত হলেন –
যাক পার্টি তাহলে ঠিক রাস্তাতেই আছে! আদতে চীনবিপ্লবের তাড়িয়ে বেড়ানো আতঙ্ক
এবং বাংলায় পাঁচ ও ছয়ের দশকের উত্তাল কৃষক আন্দোলনের উত্তাপে বাংলায়
পুঁজিবাদী ভুমিসংস্কার কর্মসূচী লাগু করা কোনো কঠিন কাজ ছিল না। কারণ ভারত
রাষ্ট্রের শাসনক্ষমতায় বৃহৎ পুঁজিপতিশ্রেণির ক্ষমতা ছিল সামন্তশ্রেণির
তুলনায় অনেক বেশী। তাই অপারেশন বর্গা কখনই রাষ্ট্রের প্রতিরোধের মুখে পড়ে
নি। মাথায় রাখতে হবে তার এক দশক আগেই মার্কিন সহায়তায় ভারত সরকার ‘সবুজ
বিপ্লব’ কর্মসূচী গ্রহণ করেছিল। এই উদ্যোগ ভুমিসংস্কারের কাজে
সিপিআই(এম)-কে কয়েক দশকের জন্য এক বিশেষ সুবিধা করে দিল। মেহনতি মানুষ
ভাবতে থাকল যে বামফ্রন্ট যেভাবেই হোক, খেটেখাওয়া মানুষের সমস্যার সমাধান
করবে! আর বাম আন্দোলনের পুরোনো পোড়খাওয়া কর্মীদেরও পার্টিতে অপ্রয়োজনীয় হয়ে
যেতে বা অধঃপতিত হতে সময় লেগেছে ঐ দু-দশক। কংগ্রেস জমানাতেই ওপর থেকে শুরু
হওয়া খর্বিত ধরনের ভূমি-সংস্কার ও পরবর্তীতে বামফ্রন্ট সরকারের ‘অপারেশন
বর্গা’ গ্রাম বাংলায় শ্রমজীবী জনগণের লড়াকু মেজাজকে অনেকটাই নষ্ট করে দিতে
সক্ষম হল। বামপন্থার মানে দাঁড়ালো–নির্বাচনে বামফ্রন্টকে বিপুল ভোটে জয়ী
করা। বাকী কাজ পার্টির নেতারাই করে দেবেন- জনগণের কাজ হল সেগুলিকেই মহান
কাজ বলে মেনে নেওয়া।
এমনিতেই সিপিএম-এর সংগঠন এরাজ্যে বেশ বড়
ছিল। নকশালপন্থীদের সঙ্গে লড়াইয়ে হোক বা কংগ্রেসের শ্বেতসন্ত্রাসের মধ্যেও
মোটামুটি সংগঠনকে টিকিয়ে রাখতে পারায় ১৯৭৭ সালের নির্বাচনী সুযোগটাকে তারাই
সবথেকে কাজে লাগাতে সক্ষম হল। পরবর্তীতে সরকারী ক্ষমতাকে ভালোরকম ব্যবহার
করে রাজ্যের প্রায় সর্বত্র পার্টিকে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে
প্রতিষ্ঠা করা হল। পরবর্তীকালে এই ব্যাপারটাই দলতন্ত্র হিসেবে পরিচিতি পেল।
অন্যদিকে আগের পর্বের লড়াই-সংঘাতের মধ্যে দিয়ে যাওয়া পোড়খাওয়া অংশটির
ক্লান্ত হয়ে পড়ার একটা দিকও এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছিল। ফলে শ্রেণী-সমঝোতার
লাইনটি আরো শক্তিশালীভাবে সিপিআই(এম) পার্টির মধ্যে গেড়ে বসল। কোনোমতেই
যাতে আর সরকারী ক্ষমতা হারাতে না হয়, তা রাজনৈতিক লাইন নির্ধারণের প্রশ্নে
নির্ণায়ক হয়ে উঠল। পুরো বাতাবরণটিই সমস্ত দিক থেকে সিপিআই(এম)-এর এক
বুর্জোয়া পার্টিতে রূপান্তরের পক্ষে অনুকূল হয়ে উঠল। ১৯৯৪ সালে এরাজ্যে বাম
সরকারের নয়া শিল্পনীতি, নয়া কৃষিনীতি, নয়া বাণিজ্যনীতি পরবর্তী ১০ বছরে
পার্টি তথা সরকারকে নয়া উদারনীতির পথে হাঁটার সীলমোহর দিল। এমন ভাবার কোনো
কারণ নেই যে ব্যাপারটা সিপিএম-এর মধ্যেকার কয়েকজন স্বার্থন্বেষীর অভিলাষ
ছিল, এটা ছিল সিপিআই(এম)-এর কেন্দ্রীয় কমিটি দ্বারা গৃহীত পার্টির
কেন্দ্রীয় লাইন। ফলে তারাই যে দেশে ‘নব-উদারবাদ’ লাগু করার পক্ষে সবচেয়ে
সক্ষম রাজনৈতিক দল–তা প্রমাণ করতে সিপিআই(এম) উঠে পড়ে লাগল! পুঁজিপতি
শ্রেণীকে আশ্বাস দেওয়া হলো যে তাদের প্রয়োজনীয় সবই করা হবে, কিন্তু তা করা
হবে মানুষকে সঙ্গে নিয়ে। অর্থাৎ, মানুষকে সাথে নিয়ে ‘নব-উদারবাদ’! ২০০৩
সালে পশ্চিমবঙ্গে দেশের মধ্যে প্রথম এস ই জেড বিল পাশ করালেন বুদ্ধবাবুরা।
পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি ও রাজ্য কমিটির পূর্ণ সম্মতিতে দেশের মধ্যে প্রথম
একটি অঙ্গরাজ্যে ‘বিশেষ আর্থিক অঞ্চল’ বানিয়ে বুদ্ধবাবুরা যে যে কোনো রঙের
বেড়াল ধরতে নেমেছেন, তা বুঝিয়ে দিতে কসুর করেন নি। চুক্তিচাষ, কর্পোরেট
চাষ, লাভজনক কৃষি এসব দেশী-বিদেশী বৃহৎ পুঁজিপতিদের স্বার্থবাহী কৃষিনীতিকে
সিপিএম ‘সৃজনশীল’ভাবে প্রয়োগ করা শুরু করেবাংলায়! ‘নব-উদারবাদ’ এগুলো ছাড়া
পশ্চিমবঙ্গে পল্লবিত হতে পারত না। এই ‘ভিত্তি’র ওপর দাঁড়িয়েই তারা
টাটা-সালিমদের শিল্পীয় ‘ভবিষ্যত’ গড়ে তুলছিলেন। বামপন্থার এই ‘সৃজনশীল
সংস্করণ’টিই সিপিআই(এম)-সৃষ্ট ও পরিচালিত বামপন্থা!
আশির দশকে কেন্দ্রের বঞ্চনার বিরুদ্ধে
আন্দোলন-আন্দোলন খেলা, পুঁজিবাদী ভূমিসংস্কার কর্মসূচিকে লাগু করার নিরাপদ
প্রচেষ্টার আড়ালে যে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষমতার লালসা ক্রমশ তার ডালপালা ছড়িয়েছিল
বাংলার কোণে কোণে, সিপিআই(এম) সেই পথের অবধারিত পরিণতিতে পৌঁছেছিল
নব্বইয়ের দশকে। নয়া-উদারবাদের পথে যাত্রায় ভারতের শাসকশ্রেণীর পরিকল্পনাকে
বাম মোড়কে উপস্থিত করার অভিমুখ ঐ দশকের গোড়াতেই যে স্পষ্ট হয়ে উঠছিল, একথা
আগেই আলোচনা করা হয়েছে। সিপিএম-এর ক্ষমতায় থাকার শেষদশক-টা এই বুর্জোয়া
রূপান্তরের নির্মম অনুশীলনের দশক ছিল। কিন্তু যে পরিমাণে এই অনুশীলনটির
জনবিরোধী চরিত্রটি সমাজে ব্যাপকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাচ্ছিল, তাতে
শাসকশ্রেণীর কাছে বিকল্প খোঁজাটাও জরুরী হয়ে উঠেছিল। শাসকশ্রেণী যে ‘বাম’
নামটাকেও যে কোনো মূল্যে পরিহার করতে চায়, তা বুঝতে পেরে বুদ্ধদেবরা যে
কোনো মূল্যে দেশী-বিদেশী বৃহৎ পুঁজিপতিদের মরিয়া আস্থা অর্জনে নেমেছিলেন।
কিন্তু শেষরক্ষা হয় নি। সিপিআই(এম) ২০১১-য় রাজ্যের শাসনক্ষমতা হারানোর পর
তিন বছর অতিক্রান্ত। সিপিএম গত তিনবছরে কী কোনোভাবে তাদের বুর্জোয়া
রূপান্তর থেকে বেরোনোর প্রচেষ্টায় আছে ? একেবারেই না।
রাষ্ট্রপতি পদে কংগ্রেসকে সমর্থন করা,
কুড়ানকুলামে পারমানবিক চুল্লী স্থাপনের পক্ষে দাঁড়ানো, এসইজেড লাগু করা
থেকে পুঁজিপতি শ্রেণীর নয়া শোষণ-প্রকল্প দেশজোড়া ‘ইন্ড্রাস্ট্রিয়াল
করিডোর’-এর সপক্ষে অবস্থান নেওয়া, কৃষিতে দ্বিতীয় সবুজ বিপ্লবের সপক্ষে
দাঁড়ানো, আফস্পা, ইউএপিএ, এনআইএ-মতো কুখ্যাত কালা আইন ও সংস্থার পক্ষে
নির্লজ্জ সমর্থন জুগিয়ে তারা যেমন প্রমাণ করেছে যে কেন্দ্রীয়ভাবেই সিপিএম
বদলায় নি, তেমনি বাংলার সিপিএম নেতারা সারদাসহ চিটফান্ড দুর্নীতির কালিমা
থেকে নিজেদের মুক্ত রাখতে পারে নি। ক্ষমতায় থাকাকালীন পশ্চিমবঙ্গের
শ্রমজীবী মানুষের জীবনে যে অপরিসীম দুর্দশা তারা চাপিয়ে দিয়েছিল–কী
কারখানায়, কী ক্ষেতেখামারে, সর্বত্রই আজও তারা সেই দুর্দশার মধ্যেই জনতাকে
ডুবিয়ে রাখতে চায়। মালিকদের প্রতি আনুগত্যে কার্পণ্য ধরে নি একফোঁটাও। তাই
মূল্যবৃদ্ধি থেকে কর্মহীনতার বিরুদ্ধে কোনো কার্যকরী লড়াই গড়ে তোলার তাদের
চিন্তার-ও অতীত। বড়জোর কিছু লোকদেখানো কর্মসূচী তারা নিতে পারে। নারীদের
ওপর ভয়াবহ নির্যাতনে তারা কার্যত নিশ্চুপ। নিজেদের জমানাতে
দলিত-আদিবাসী-নিপীড়িত জাতিসত্তাদের ওপর নিপীড়নের যে কু-ঐতিহ্য তারা
মরিচঝাঁপি থেকে লালগড় পর্যন্ত তৈরী করেছে, আজ সেইসব বঞ্চনার বিরুদ্ধে লড়তে
গেলে যে সিপিএম-কে খোলনলচে বদলাতে হবে। রাজ্যের মুসলিম জনগণের যে ভয়াবহ
পশ্চাদপদতাকে তারা বছরের পর বছর ধরে কাজে লাগিয়েছে নিছক ভোটব্যাঙ্কের
স্বার্থে, আজকে তারা কোন মুখে সেই পশ্চাদপদতার বিরুদ্ধে লড়াই করবে ?
শিক্ষা-স্বাস্থ্যক্ষেত্রকে যারা বছরের পর বছর ধরে দলীয় সুবিধাভোগীদের আর
নব-উদারবাদের ফর্মুলা মেনে দেশী-বিদেশী একচেটিয়া পুঁজির লুণ্ঠনের
মৃগয়াক্ষেত্র বানিয়ে দিয়েছে, তারা কী করে জনশিক্ষা বা জনস্বাস্থ্যের লড়াই
গড়ে তুলবে ? তাদেরই শেখানো দলীয় সন্ত্রাস যখন তৃণমূল তাদের ওপরই কায়েম
করেছে, তখন নিজেদের কর্মীদের পাশে গিয়ে পর্যন্ত দাঁড়াবার দম নেই
‘নব-উদারবাদী বামেদের’! আর পারবেই বা কী করে? বিগত ৩৪ বছরের শাসনে পার্টির
নেতা থেকে ক্যাডারবাহিনীর একটা সিংহভাগ অংশ হয়ে উঠেছে সম্পূর্ণ আদর্শহীন,
স্বার্থপর, লোভী, অলস আর ভীরু। তাদের পক্ষে কী আর লাঠি-গুলির সামনে গিয়ে
দাঁড়ানো সম্ভব? এসব নিয়ে কোনো কার্যকরী আত্মসমালোচনা (যা এমনকী অনেক
বুর্জোয়া পার্টিও করে থাকে) তো তারা করেই নি, উল্টে তারাপীঠে পুজো দেওয়া,
পাড়ায় পাড়ায় পুজোর কর্মকর্তা হওয়া, ভোটভিক্ষায় ধর্মীয় মোড়ক নিয়ে কখনো
বিজেপির তালে তাল দিয়ে, তারা হিন্দু সাম্প্রদায়িকতাকে প্রশ্রয় দিয়ে হিন্দু
ভোট পাবার অক্ষম প্রচেষ্টায় মাতছে, কখনো বা ডুবন্ত কংগ্রেসের হাত ধরে
বাঁচতে চাইছে, এমন কী ক্ষমতালোভী ছোট ছোট বাম দলগুলোকেও নানাভাবে প্রলুব্ধ
করার চেষ্টা করছে। এসব কিছুর পরেও তাদের মধ্যে কেউ যদি ভাবেন যে নতুন করে
আদর্শবাদী বামপন্থাকে ফিরিয়ে আনতে হবে, মনে করেন যে নয়া-উদারবাদের বিরুদ্ধে
কার্যকরী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হলে প্রকৃত বামপন্থী শক্তির সংহত হওয়া-টা
আজকের সময়ের চাহিদা—তবে তাদের প্রথম কর্তব্য হওয়া উচিত অবিলম্বে এই
‘নব-উদারবাদী’ সিপিআই(এম) ছেড়ে বেরিয়ে আসা। সংবাদে প্রকাশ, পশ্চিমবঙ্গে
বুদ্ধদেবদের ‘নব-উদারবাদী লাইন’ অর্থাৎ কংগ্রেসের সঙ্গে যাওয়ার লাইন নাকি
সংখ্যাগুরু! বৃহত্তর বামঐক্যের লাইন নাকি এখানে সংখ্যালঘু! যেটা বোঝা
প্রয়োজন, সিপিএম-এর অভ্যন্তরের এই সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু বিতর্কের ‘গল্প’টি
কখনোই সংসদীয় ক্ষমতার ‘আগ্রহ’ থেকে বেরোতে পারে নি। আজ তো ওদের পরিস্থিতি
বড়ই খারাপ। এখন তো আর এসব কিছু ভাবার মতো অবস্থাতেই ওরা নেই। তাই এবারের
পার্টি কংগ্রেস থেকে তথাকথিত ‘বৃহত্তর বাম ঐক্যের লাইন’ আর ‘কংগ্রেসসহ
ধর্মনিরপেক্ষ-গণতান্ত্রিক শক্তির সঙ্গে যাওয়ার লাইন’ গলা জড়াজড়ি করেই
বেরোবে-একথা বলাই বাহুল্য।
বাংলার গণ আন্দোলনের নিজস্বতা – শক্তি ও সীমাবদ্ধতা
লিঙ্গ-সাম্যের জন্য আন্দোলন বা নারীর
প্রতি বৈষম্যের বিরুদ্ধে ও তাদের অধিকারের দাবিতে নারীদের
স্বাধীন-স্বতন্ত্র চরিত্রের আন্দোলন গড়ে তোলার উদ্যোগ কোনোদিনই বাংলার বাম
আন্দোলনে জায়গা পায় নি। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধ থেকেই বৈষম্যের বিরুদ্ধে
প্রতিবাদী নারীদের কন্ঠস্বর বাংলার নানান প্রান্তে ধ্বনিত হতে থাকে। কেউ
কেউ নারীর অধিকার নিয়ে সরাসরি বক্তব্য উপস্থিত করেন, অনেকে স্বাধীনতা
সংগ্রামে অংশ নিতে গিয়ে পুরুষ-কেন্দ্রিক সাংগঠনিক নীতির বিরুদ্ধে জোরালো
বক্তব্য উপস্থিত করেন। কিন্তু নারী নেত্রীদের এই যুক্তিপূর্ণ ও ধারালো
বক্তব্য যে পরবর্তীকালের বাম আন্দোলনে বিশেষ কোনো প্রভাব তৈরি করতে
পেরেছিল—তা বলা চলে না। কমিউনিস্ট সংগঠনগুলির ভেতরে নারীকর্মীদের
মানোন্নয়নে বিশেষ জোর ও অগ্রগতি, বা গণসংগঠনগুলিতে নারীকর্মীদের নেতৃত্বের
স্তরে উঠে আসা, বামকর্মীদের পরিবারগুলিতে উন্নত লিঙ্গ-সাম্যের অনুশীলন বা
সমাজের নানা ক্ষেত্রে ও স্তরে লিঙ্গ-সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ–এগুলির কোনোটির
ক্ষেত্রেই বাংলার বাম আন্দোলন লিঙ্গ-সচেতনতার গড়পড়তা মানটিও পেরোতে
পারেনি। কোন সমাজেই প্রগতির ঝান্ডা যে শুধু পুরুষরা বয়ে নিয়ে যেতে পারে
না—এই সরল সত্যটি অনুধাবন করতে, যে কোন কারণেই হোক, বাংলার সমস্ত ধরনের বাম
ও বিপ্লবী নেতৃত্ব ব্যর্থ হয়েছেন। এর প্রধান ভিত অবশ্যই অতীতের
আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের নারীপ্রশ্নে মতাদর্শগত দুর্বলতা ও ক্রমাগত
সময়ের থেকে পিছিয়ে পড়ার মধ্যে রয়েছে। কিন্তু বিগত ৬০-৭০ বছরে সারা
পৃথিবীতে লিঙ্গ-সাম্যের প্রশ্নটি যেভাবে প্রগতিশীলতার এক প্রাথমিক শর্ত হয়ে
উঠে এসেছে, তার প্রতি যথাযথ মনোযোগ ও গুরুত্ব দেওয়ার অক্ষমতা বাংলার বাম
আন্দোনের নিজস্ব সমস্যা হিসেবেও উপস্থিত রয়েছে।
১৯৮০-র দশকে দার্জিলিং জেলায়
গোর্খাল্যান্ড আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে জাতিসত্তার আন্দোলন নতুন করে এরাজ্যে
এক গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনের ধারা হিসেবে উপস্থিত হয়। ঝাড়খন্ড আন্দোলনও
সমসাময়িক সময়ে বাংলায় কিছু প্রভাব তৈরী করেছিল। পরবর্তীতে উত্তরবঙ্গের
কামতাপুরী-সহ আরো অন্যান্য নিপীড়িত জাতিসত্তার লড়াই নানাভাবে এরাজ্যে
উপস্থিত হয়েছে। কিন্তু এই লড়াইগুলি রাজ্যের গণ-আন্দোলনের অন্যতম ধারা হয়ে
উঠতে পারে নি। এটা বাংলায় বাম আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতাকেই সামনে
নিয়ে আসে। সিপিআই-সিপিআই(এম)-এর মতো সংশোধনবাদী দলগুলি জাতিসত্তার
আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের পক্ষে বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে শুরু করেছে অনেক আগে
থেকেই—যখন থেকে তারা বামপন্থার মূল কর্মকাণ্ডকে সংসদীয় রাজনীতির অক্ষে
নিয়ে এসে ফেলেছে। অন্যদিকে কমিউনিস্ট বিপ্লবী শক্তিগুলি, সাধারণভাবে,
জাতিসত্তার আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রশ্নে সমাজে সঠিক অবস্থান উপস্থিত
করলেও কাশ্মীর, গোর্খাল্যান্ড, ঝাড়খন্ড বা অন্য কোনো রাজ্যের জাতিসত্তার
অধিকারের লড়াইগুলির ক্ষেত্রে বাংলার সাধারণ জনগণের মধ্যে কোনো সমর্থনমূলক
অবস্থান গড়ে ওঠে নি। জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রশ্নটি যে
আন্তর্জাতিকভাবেই কমিউনিস্টদের একটি সর্বজনগ্রাহ্য অনুসিদ্ধান্ত,
মার্ক্সবাদী পাঠের এই অ আ ক খ–টি আশির দশকেই বাংলার বাম-মনোভাবাপন্ন
মানুষের চেতনা থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছিল। এতেই বোঝা যায় বাংলার ‘বামমার্গীতা’
কত অগভীর আর ঠুনকো – কত আগে থেকেই তা রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েছিল!
বাংলার গণআন্দোলনের গত এক দশক : নতুন কিছুর পদধ্বনি?
বাংলার গণ-আন্দোলনের স্তিমিতপ্রায় ঐতিহ্য
গত একদশকে আবার নতুনভাবে নতুন রূপে জেগে উঠেছে। সিপিআই(এম) নেতা-কর্মীদের
দ্বারা চরমভাবে নিয়ন্ত্রিত রাজ্য গণবন্টন ব্যবস্থার দূর্নীতি-স্বজনপোষণের
বিরুদ্ধে ২০০৪ সালে রাজ্যের গ্রামীণ গরীব জনগণের মধ্যে যে স্বতঃস্ফূর্ত
বিক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছিল এবং বিস্তৃতিলাভ করছিল, তা বাংলার গত এক দশকের
গণআন্দোলনের বিকাশে খুব-ই গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রেখে গেছে। এই আন্দোলনের
অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল, প্রায় ৩০ বছর ধরে চলা সিপিআই(এম)-এর
প্রায় নিরঙ্কুশ স্বৈরতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে গ্রামবাংলার প্রান্তিক
শ্রমজীবীদের এক স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহ। এই লড়াইয়ে একজন শহীদ হন পুলিশী
আক্রমণে। ‘বাম’জমানায় বর্ধমান, বীরভুম, নদীয়া, মুর্শিদাবাদের বিভিন্ন
গ্রামাঞ্চলে রেশন ডিলার-পুলিশ-সিপিএম নেতাদের মিলিত পরিচালনায় যে
দূর্নীতি–স্বজনপোষণের ঘুঘুর বাসা তৈরি হয়েছিল, তার বিরুদ্ধে বাংলার গ্রামীণ
মেহনতীরা প্রথম বড়সড় ধাক্কা দেন রেশন বিদ্রোহে। কিন্তু এই আন্দোলন
পরিচালনায় কোনোধরনের সংগঠিত রাজনৈতিক উদ্যোগ অনুপস্থিত ছিল। অচিরেই এই
স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ পার্টি ও প্রশাসনের দমনের মুখে পড়ে স্তব্ধ হয়ে যায়
বটে, কিন্তু ভবিষ্যতের জন্য রেখে যায় গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।
এরপর ঘটে রিজওয়ানুর কান্ড। একটি সাধারণ
নিম্নবিত্ত ঘরের মুসলিম ছেলের সঙ্গে হিন্দু শিল্পপতির মেয়ের প্রেম-বিবাহকে
কেন্দ্র করে পুলিশী হস্তক্ষেপের ফলে রিজওয়ানুর আত্মহত্যা করেন। ‘ইনসাফ’-এর
আওয়াজ তুলে, পুলিশী হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে জনমানসে যে স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ
সেদিন শহরাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল, তার দুটি দিক ছিল। এক, বাম শাসনে দলতন্ত্র ও
পুলিশ প্রশাসনের মাত্রাতিরিক্ত হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে জনমানসে ক্রমশ ক্ষোভ
সঞ্চারিত হচ্ছিল। তার এক স্বতঃস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল রিজওয়ানুর কান্ডে।
দ্বিতীয়ত, পশ্চিমবঙ্গে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মনোজগতে যে দীর্ঘ বঞ্চনার
অনুভূতি জমা হয়েছিল, সেই ক্ষোভেরও এক জোরালো বহিঃপ্রকাশ ঘটে এই
স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদে। পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের মধ্যে
পুলিশী বাড়াবাড়ি ও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতাদের উচ্চবিত্ত ক্ষমতাশালীদের
প্রতি পক্ষপাতিত্বের বিরুদ্ধে তীব্র জনমত প্রকাশিত হয়।
এই দুটি ঘটনার পরম্পরায় আমরা
সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম-লালগড়ের লড়াইয়ের দিকে দৃষ্টি দিতে পারি। ‘নব-উদারবাদী’
সিপিআই(এম) সপ্তমবার বিধানসভায় জেতবার দাম্ভিকতায় শপথগ্রহণের সাথে সাথেই
টাটা-র গাড়ি কারখানা বানানোর জন্য জোর করে জমি অধিগ্রহণ করতে নামে। ‘বাম’
সরকারের এই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সিঙ্গুরের কৃষক-ক্ষেতমজুরদের স্বতঃস্ফূর্ত
ক্ষোভ ক্রমশ প্রকাশ পেতে থাকে। প্রাথমিকভাবে এই আন্দোলন কোনো রাজনৈতিক দলের
দ্বারা পরিচালিত ছিল না। বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির সমর্থনে গড়ে উঠেছিল
লড়াইয়ের মঞ্চ ‘সিঙ্গুর কৃষিজমি রক্ষা কমিটি’। ২০০৬ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর চেক
বিলির প্রতিবাদে কৃষক ও তাদের পরিবারের সদস্যদের স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভের
ওপর বামফ্রন্ট সরকারের পুলিশ যে ভয়াবহ নিপীড়ন নামিয়ে আনে, তা পশ্চিমবঙ্গের
জনমানসে এক গভীর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। গণ-আন্দোলনের নিজস্ব প্রক্রিয়ার
দিক থেকেও সিঙ্গুর আন্দোলনের এই নির্দিষ্ট দিনটির ঘটনাবলী খুবই
গুরুত্বপূর্ণ। এখান থেকেই তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের হস্তক্ষেপ
সিঙ্গুরে জমি অধিগ্রহণের বিরোধী আন্দোলনে প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে। রাজ্য
রাজনীতিতে এই আন্দোলন একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে। ১
ডিসেম্বর,২০০৬ থেকে সিপিএম-এর পরিকল্পনায় রাজ্য প্রশাসন বিশাল পুলিশবাহিনী
নিয়ে জোর করে জমি অধিগ্রহণ করতে নামলে প্রতিরোধ শুরু হয়। ২ ডিসেম্বর
আন্দোলনকারী কৃষক-ক্ষেতমজুর ও সহযোগীরা এই বলপূর্বক অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে
প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করলে সিপিএম-জমানার ভয়াবহ রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের
অন্যতম রূপটি প্রত্যক্ষ করে রাজ্য তথা দেশের জনগণ। আন্দোলনের বার্তা
বিশ্বের বিভিন্নপ্রান্তেও ছড়িয়ে পড়ে। সিঙ্গুরের কৃষক, ক্ষেতমজুরসহ কৃষির
ওপর নির্ভরশীল অন্যান্য খেটেখাওয়া মানুষের এক স্বতঃস্ফূর্ত গণ আন্দোলনের
চেহারায় সিঙ্গুর আন্দোলন নতুন পর্বে প্রবেশ করে যায়। এমন কী কলকাতায় মমতা
ব্যানার্জীর অনশন-আন্দোলন চলাকালীনও আমরা দেখেছি যে লড়াকু কৃষক-ক্ষেতমজুর ও
তাদের পরিবারের সদস্যরা গ্রামে গ্রামে নিজেরাই আলাদাভাবে অনশন শুরু
করেছিলেন। বারবার ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে,
অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে আন্দোলনকে জারি রেখেছিলেন। তাপসী মালিকের খুনের
বিরুদ্ধে বিক্ষোভে ফেটে পড়েছিলেন সিঙ্গুর থানায়। সহস্রাধিক কৃষক প্রবল
স্বতঃস্ফূর্ততায় চন্দননগর আদালতে অনিচ্ছুক কৃষকের হলফনামা করতে নিজেরাই
উদ্যোগী হয়েছিলেন। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, ক্রমশই সেই আন্দোলন সিঙ্গুরের
লড়াকু কৃষিজীবীদের হাতের বাইরে চলে গেল। নব-উদারবাদী সিপিআই(এম)-এর
বল্গাহীন মালিকতোষণ আর সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যে জনমত গড়ে উঠছিল, কর্পোরেট
মিডিয়ার পরিকল্পিত প্রচারে এবং তৃনমূল কংগ্রেসের পরিকল্পিত
রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে সিঙ্গুর আন্দোলন ক্রমশ মমতা
ব্যানার্জীর আন্দোলনে রূপান্তরিত হল। আরো একবার পশ্চিমবঙ্গের গণ-আন্দোলনে
‘রাজনৈতিক রঙ’ তার প্রবল গুরুত্বে উপস্থিত হয়েছিল।
শুরুর দিকে রাজ্যের বিপ্লবী সংগঠনগুলি এই
আন্দোলনে যাতায়াত শুরু করলেও সে সময়ে আন্দোলনের গতিপথ নির্ধারণে তাদের তেমন
কোনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল না। পরবর্তীতে অনশন আন্দোলন, বেড়াভাঙ্গার
লড়াই, দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে অবরোধ প্রভৃতি কর্মসূচীর মধ্যে দিয়ে সিঙ্গুর
আন্দোলন গেছে। একাধিক বিপ্লবী সংগঠন (বিশেষত ‘মজদুর ক্রান্তি পরিষদ’ ও
‘সিপিআইএমএল-নিউ ডেমোক্রেসি) এসময়ে এই আন্দোলনে নেতৃত্বের অংশ হিসেবেও
ভূমিকা পালন করেছে, কর্মীরা পুলিশি তান্ডবের শিকার হয়েছে। এর সাথে
সিপিআই(এম)-এর নেতা ও কর্মীরা সংগঠিত উদ্যোগে আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী তাপসী
মালিক-কে খুন করে (সম্ভবত খুন করার আগে তাকে ধর্ষণও করা হয়েছিল) জ্বালিয়ে
দেওয়ার ভয়াবহ নৃশংসতাটি ‘মানবিক কায়দায়’ ‘নয়া উদারনীতি’ লাগু করার
ভাবমূর্তিকে সারা দেশের বাম-মনোভাবাপন্ন মানুষের কাছে তছনছ করে দেয়।
সিঙ্গুর আন্দোলন সর্বত্র ‘মমতার আন্দোলন’ হিসেবেও পরিচয় পেয়েছে এটা যেমন
সত্যি, তেমনি এমন একটা পর্বও গেছে যখন সিঙ্গুরের গ্রামে গ্রামে বিপ্লবী
কর্মীরাই মাটি কামড়ে পড়ে থেকেছে, কৃষক-ক্ষেতমজুরদের ঘরে ঘরে লড়াইয়ের বার্তা
নিয়ে পৌঁছেছে ( তৃণমূল নেতারা তখন পুলিশি নির্যাতনের ভয়ে গ্রামে ঢুকছিলেন
না), পুলিশি জুলুমকে মোকাবিলা করেছে। ১৪৪ ধারা অমান্য করা থেকে বেড়া ভেঙ্গে
দেওয়ার মতো লড়াইগুলিতে সিঙ্গুরের কৃষক আর যুবক-যুবতীদের সাথে সামনের
সারিতে বিপ্লবী কর্মীরাই (সিঙ্গুরের মাটিতে তৃণমূল কংগ্রেসের সাথে বিরোধ
প্রকট করে তুলে) পুলিশী অত্যাচারের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছে। অনশন
আন্দোলনের পর্বে নয়া-উদারবাদ বিরোধী অবস্থানটিকে শক্তিশালীভাবে উপস্থিত করা
গেলেও আন্দোলনটির কোনো সংগ্রামী বাম-চরিত্রায়ন ঘটানো সম্ভব হয় নি।
গণ-আন্দোলনের নিরিখে, নব-উদারবাদের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সিঙ্গুর আন্দোলন যে
সফলতার দিকটিকে সমাজে উপস্থিত করেছিল, বিপ্লবী বা সংগ্রামী বাম চরিত্রের
রাজনীতি তার সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে পারে নি। এর অন্যতম কারণ হলো
আন্দোলনের একটি একক শক্তি হিসেবে বাংলার বিপ্লবী/সংগ্রামী সংগঠনগুলি
ঐক্যবদ্ধভাবে এই লড়াইয়ে উপস্থিত হতে পারে নি। সিপিআই(এমএল) লিবারেশন থেকে
সিপিআই(মাওবাদী) অথবা এসইউসি থেকে অন্যান্য শক্তি প্রায় সকলেই নিজ নিজ
সামর্থ্যে এই আন্দোলনকে নিজেদের প্রভাবাধীন করতে অনেক বেশি সচেষ্ট ছিল। এই
সময় কয়েকটি বিপ্লবী সংগঠনগুলি নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া বাড়ানোর প্রচেষ্টা
শুরু করলেও সেই অর্জিত বোঝাপড়ার স্তর এতই নিচু ছিল যে বাস্তব আন্দোলনে একটা
শক্তিশালী পক্ষ হিসেবে তা নিজেকে উপস্থিত করার উপযোগী হয়ে ওঠে নি।
স্বতঃস্ফূর্ত গণ-আন্দোলনের মধ্যে থেকে যে লড়াইয়ের মঞ্চ জন্ম নিয়েছিল, তাকে
সর্বোচ্চ রূপে বিকশিত করার দায়িত্ব অবশ্যই বিপ্লবী শক্তির ওপর বর্তায়।
সর্বহারাশ্রেণী ছত্রভঙ্গ অবস্থায় থাকলে যে একাজে সর্বোচ্চ সাফল্য আসতে পারে
না-একথা ঠিক। কিন্তু সর্বহারাদের এই কর্তব্যটিকে শ্রেণী তথা সমাজের
প্রগতিশীল অংশের সামনে তুলে ধরার দায় অগ্রণীরা কখনোই এড়াতে পারে না।
প্রাথমিকভাবে বিপ্লবীরা সেই কাজে সঠিকভাবেই মনোনিবেশ করেছিলেন। কিন্তু মমতা
ব্যানার্জি তথা তৃণমূল কগ্রেসের সচেতন পরিকল্পনায় লড়াইয়ের মঞ্চটি যখন
ক্রমশ ভোটে জেতার হাতিয়ারে পরিণত হতে শুরু করল, তখন বিপ্লবী সংগঠনগুলির তা
থেকে বেরিয়ে আসাটা অনিবার্য হয়ে দাঁড়াল। এ সময়ে বিপ্লবী আন্দোলনের সাথে
যুক্ত কিছু ব্যক্তি বুর্জোয়া রাজনীতিতে জায়গা করে নিতে এবং মন্ত্রীত্বের
লোভে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দিলেও তাদের অধঃপতন অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছিল।
বিপ্লবী সংগঠনগুলিতে এর কোন প্রভাব পড়েনি।
নন্দীগ্রাম আন্দোলন গণ-আন্দোলনের নানান
নিরিখে যে এক বিশেষ উচ্চতা অর্জন করেছিল–একথা বলাই বাহুল্য। সিঙ্গুরের গায়ে
গায়েই নয়া-উদারবাদী সিপিআই(এম)-এর পক্ষ থেকে উদ্যোগ ছিল বিদেশী বহুজাতিকের
সাথে হাত মিলিয়ে নন্দীগ্রামে কেমিক্যাল-হাব এসইজেড বানানো। এসইজেড-বিরোধী
আন্দোলন হিসেবে পরিচিতি লাভ করলেও এই আন্দোলনে কৃষিজমি বা ভিটেমাটি থেকে
উচ্ছেদ হয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধেই প্রাথমিকভাবে জনজাগরণ ঘটেছিল। হিন্দু ও
মুসলমান উভয় ধর্মীয় সম্প্রদায়ের এক বড়সংখ্যক কৃষিজীবী জনগণ উচ্ছেদের
বিরুদ্ধে প্রবল স্বতঃস্ফূর্ততায় আন্দোলনে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। তারা সিপিএম-এর
সশস্ত্রবাহিনী ও রাষ্ট্রীয়বাহিনীর মোকাবিলা করতে নামে জনগণের পাল্টা
সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলে। ফলত এই সংগ্রাম শুরু থেকেই তীব্র
সংঘর্ষ-রক্তাক্ত লড়াই-শহীদের মৃত্যুবরণের মধ্যে দিয়ে এগোতে থাকে। শুরু
থেকেই এই আন্দোলনে নানা রাজনৈতিক শক্তি, ধর্মীয় সংখ্যালঘু সংগঠন প্রভৃতির
অংশগ্রহণ ছিল। সিঙ্গুর আন্দোলন ঘটে যাওয়ার কারণে আন্দোলনে ‘বহিরাগত’-দের
অংশগ্রহণের বিষয়টি সমাজে বহুল পরিমাণে আলোচিত-ও বটে। অনেক দক্ষিণপন্থী
দল-সহ বিভিন্ন কমিউনিস্ট বিপ্লবী গোষ্ঠী এবং তৃনমূল কংগ্রেস এই আন্দোলনের
সক্রিয় শক্তি ছিল। নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সশস্ত্র গণপ্রতিরোধের বিষয়টি
সিপিআই(মাওবাদী) দ্বারা পরিচালিত হয়েছে বলে অনেক মহলেই দাবি করা হয়। সেদিক
থেকে মাওবাদীদেরও সক্রিয় অংশগ্রহণকারী হিসেবে গণ্য করা যায়। এখানে প্রথম যে
বিষয়টি আলোচনায় করার দরকার, তা হলো সিঙ্গুর আন্দোলনের প্রত্যক্ষ
অনুপ্রেরণা নন্দীগ্রামের মানুষকে লড়াইয়ে অনুপ্রাণিত করেছিল। উচ্ছেদ-বিরোধী
আন্দোলন এদেশে বহুবারই হয়েছে। সাধারনভাবে বহুক্ষেত্রে উচ্ছেদ-বিরোধী
আন্দোলনের একটা বড় মীমাংসাসূত্র থাকে ক্ষতিপূরণ বা পুনর্বাসন অথবা দুটোই।
সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম উভয় আন্দোলনেই আন্দোলনকারী জনতা ক্ষতিপূরণের পরিমাণ
নিয়ে দরকষাকষিতে কোনোভাবেই রাজী ছিল না। আন্দোলনের শক্তিগুলির মধ্যে
একমাত্র মেধা পাটেকর-সহ কিছু এনজিও এবং পরে সিপিআই(এম)-এর বন্ধু হয়েছেন এমন
একটি বাম সংগঠন এস ই জেড বাতিলের দাবি, কৃষকদেরকে জমি ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি
ছেড়ে দিয়ে ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নিয়ে দরকষাকষি করার পক্ষে লাগাতার সওয়াল করে
গেছেন। সিঙ্গুরের আন্দোলনে কৃষকদের জমিকেন্দ্রীক জীবিকার প্রতি মমত্ব এক
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছিল। কৃষকরা নিজেরাই বারবার বহুফসলি
জমিকে রক্ষা করার প্রশ্নটিকে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার সমার্থক করে উপস্থিত
করেছেন। এমনকী কৃষক পরিবারের কর্মহীন তরুণ-তরুণীদের কাছেও টাটার কারখানায়
চাকরি পাওয়ার কোনো তীব্র তাড়না এই আন্দোলনের বিপরীতে লক্ষ্য করা যায় নি।
ফলে টাটা-র কারখানার সপক্ষে জমিদাতাদের নিয়ে সিপিআই(এম)-এর আন্দোলনের
পরিকল্পিত প্রচেষ্টাটিও মাঠে মারা যায়। সরকার জোর করে কৃষকদের থেকে বহুফসলি
জমি কেড়ে নিচ্ছে–এটাই আন্দোলনের মূল আবেগ হিসেবে একটা স্বতঃস্ফূর্ত
বিক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। অন্যদিকে নন্দীগ্রামে কেমিক্যাল হাব হলে তাদের কী
কী উন্নতি হবে—আন্দোলনকারীরা তা নিয়ে আলোচনা করতেই প্রস্তুত ছিলেন না।
সিঙ্গুরে বহুফসলি জমির ওপর জীবিকা-কেন্দ্রীক নির্ভরশীলতার বিষয়টি আন্দোলনের
বস্তুগত ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছিল, নন্দীগ্রামে তেমন কোনো যুক্তির তুলনায়
বিদেশি বহুজাতিকের স্বার্থে সিপিআই(এম)-এর উচ্চ্ছেদ-প্রকল্পের বিরুদ্ধে
জনরোষ অনেকটাই উচ্চগ্রামে বাঁধা ছিল। এলাকার বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এই
উচ্ছেদকে প্রতিরোধ করার প্রশ্নে এতটাই আবেগতাড়িত ছিলেন যে তা অচিরেই এক
স্বতঃস্ফূর্ত সশস্ত্র আন্দোলনের রূপ নিয়েছিল, যাকে নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস বা
মাওবাদী বা ধর্মীয় সংখ্যালঘু সংগঠন নিজ নিজ রাজনৈতিক লক্ষ্যপূরণের রাস্তায়
এগোবার চেষ্টা করতে থাকে। আন্দোলনের তীব্রতায় যে রাজ্য সরকার এসইজেড
প্রকল্প নন্দীগ্রাম থেকে বাতিল করতে বাধ্য হল–তা এরাজ্যের গ্রামীণ গরীব
মেহনতীদের মধ্যে গভীর প্রভাব সৃষ্টি করল।
সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রাম আন্দোলনের প্রভাবকে
ভোটের বাক্সে গুছিয়ে তুলতে মমতা ব্যাণার্জী সফল হলেও একই সাথে এটাও প্রমাণ
হল যে পশ্চিমবঙ্গে বিপ্লবীরা খুব দুর্বল হলেও বাংলার গণ-আন্দোলনে এই শক্তি
নিয়েও তারা যে কোনো মুহূর্তে নির্ধারক শক্তি হয়ে উঠতে পারে। দুটি আন্দোলনেই
বিপ্লবী শক্তির এমন ভূমিকা থাকা সত্ত্বেও সামাজিক-রাজনৈতিক প্রভাবের দিক
থেকে বিপ্লবীদের তেমন কোন শক্তিবৃদ্ধি হল না। এর কারণ একদিকে যেমন
শ্রমিকশ্রেণির আন্দোলনের অতি-দুর্বল অবস্থা, তেমনি অন্য এক অতি
গুরুত্বপূর্ণ কারণ হল, সিপিআই(এম)-এর প্রতারণাময় ও নব-উদারবাদী ‘বামপন্থা’র
কল্যাণে বাম রাজনীতির সাধারণ গ্রহণযোগ্যতা পশ্চিমবাংলার মেহনতী মানুষের
কাছে অনেকখানি কমে যাওয়া। পশ্চিমবাংলার বিশেষ পরিস্থিতিতে কীভাবে নতুন করে
বিপ্লবী বামপন্থাকে আজকের সময়ের মেহনতি মানুষের একমাত্র বিকল্প হিসেবে
হাজির করতে হবে, তাও বিপ্লবী শক্তিগুলির কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি। অন্যদিকে,
শ্রমিকশ্রেণি বা ছাত্রসমাজ–যারা বারবার বাংলার প্রগতির পথে যাত্রায় বারবার
প্রভাবশালী ভূমিকা রেখেছে, তারা এই গোটা পর্বটিতে ছিলেন নীরব দর্শক। অন্য
যে বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ–সিপিআই(এম)-এর ৩৪ বছরের শাসনের দমবন্ধ করা
পরিবেশ থেকে মুক্তি পেতে রাজ্যের এক বড় অংশের শিল্পী-বুদ্ধিজীবী এমনকী
প্রগতিশীল ও বাম-মনোভাবাপন্ন অগণিত মানুষ এতটাই আকুল হয়ে উঠেছিলেন যে
প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের বিকাশের তুলনাতেও যে কোনো মূল্যে
সিপিআই(এম)-এর অপসারণ তাদের কাছে অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।
তৃণমূল কংগ্রেসকে শক্তিশালী করতে এমন হাজার হাজার মানুষ সারা রাজ্যে সক্রিয়
হয়ে উঠছিল যারা কোনোদিন লালঝাণ্ডা ছাড়া অন্য কোনোদিকে ফিরে তাকান নি।
পঞ্চাশোর্ধ বয়সের এমন অনেককে পাওয়া গেছে যারা জীবনে প্রথমবার ভোট দিতে
এসেছেন–শুধু সিপিআই(এম)-কে হারাতে হবে বলে। এমনকী প্রতিবাদ-প্রতিরোধের সাথে
নিবিড়ভাবে যুক্ত মানুষেরাও ‘দ্রুত স্বস্তি পাওয়ার’ আশায় সিপিআই(এম)-কেও
গদিচ্যুত করার প্রশ্নটিকেই একমাত্র প্রশ্ন করে তোলে। সংসদীয় ব্যবস্থার এই
‘খেলাটা’ এতই শক্তিশালী যে শাসকশ্রেণির অর্থবল, মিডিয়া সমর্থন ইত্যাদির
দ্বারা পুষ্ট হয়ে শাসকশ্রেণির আশীর্বাদধন্য এক দলের জায়গায় আরেক দল
নির্বাচন জিতে শাসনভার সামলাতে আসে। ৫ বছর পর আবারও তাদেরই কেউ ফিরে আসে
নতুন প্রতিশ্রুতির সাথে ও নতুন মোড়কে। এই খেলায় ‘টান’ এতটাই তীব্র যে একটা
প্রতিষ্ঠিত প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিকেও নির্বাচনে জিতিয়ে নিয়ে আসার জন্য
তখনকার মতো সর্বশক্তি নিয়োগ করতেও মানুষ পিছপা হয় না। সংসদীয় গণতন্ত্রের এই
চক্রটিকে অতিক্রম করে বিপ্লবী দিশায় গণ-আন্দোলন কীভাবে বিকশিত হবে সেটা
গোটা দেশেই আজকের বাম-আন্দোলনের এক বড় চ্যালেঞ্জ।
আমরা যদি এই পর্বের তৃতীয় গণজাগরণটিকে
নিয়ে আলোচনায় ঢুকি, তা হলে সমসাময়িক বাংলার লড়াই-আন্দোলনের ধরন বা
বৈশিষ্ট্যগুলির বৈচিত্র্যকে আরো গভীরতায় অনুধাবন করতে সক্ষম হব। লালগড়
আন্দোলন সাধারণভাবে আগের দুটি আন্দোলনের মতো কোনো উচ্ছেদবিরোধী লড়াইয়ের
স্বতঃস্ফূর্ততায় জন্ম নেওয়া আন্দোলন নয়। এ আন্দোলনের উৎস হল পুলিশী
সন্ত্রাস। আদিবাসী জনতার ভেতর জমতে থাকা বঞ্চনার বিস্ফোরণ ছিল এটা। পুলিশী
সন্ত্রাস-বিরোধী জনসাধারণের কমিটির মধ্যে শুরু থেকে মাওবাদীরা থাকতে পারেন,
আর ছিল আদিবাসী সমাজের সামাজিক–সাংস্কৃতিক সংগঠন। আরো অন্য কোনো রাজনৈতিক
শক্তিও এই লড়াইয়ে সামিল হতে পারে। কিন্তু একটা বড় অঞ্চল জুড়ে আদিবাসী সমাজ ও
তাদের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকা অন্যান্য গ্রামীণ শ্রমজীবী জনতা পুলিশী
সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যে স্বতঃস্ফূর্ততায় ফেটে পড়লেন, তার তুলনা শুধু লালগড়
গণজাগরণই হতে পারে। কিন্তু এই আন্দোলনের প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে
মাওবাদীরা তাদের লাইন অনুশীলন করার মনোগত আকাঙ্ক্ষায় এই গণজাগরণকে যে
পর্যন্ত নিয়ে যাবার চেষ্টা করলেন, তা আন্দোলনটির স্বাভাবিক বিকাশের পথে
অন্তরায় হয়ে দাঁড়াল। পরিণামে মাওবাদী পার্টিও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হল।
কিন্তু রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস বিরোধী জনজাগরণ, বিশেষত তা যখন একদিকে
শ্রেণীচরিত্রের বিচারে গ্রামীণ সর্বহারা-আধা সর্বহারাদের লড়াই, অন্যদিকে
আবার দীর্ঘকাল ধরে বঞ্চিত সমাজের পশ্চাদপদ অংশের নিজস্ব লড়াইয়ের রূপ নেয়,
তখন তার সম্ভাবনা ও সমস্যা দুটোই কিছু বিশেষত্ব নিয়ে হাজির হয়। সম্ভাবনার
দিক থেকে দেখলে, এই আন্দোলন পুলিশী সন্ত্রাস বিরোধিতার গন্ডী থেকে বেরিয়ে
রাজ্যের পশ্চাদপদ সামাজিক অংশের সামাজিক-অর্থনৈতিক অধিকার সম্প্রসারণের
লড়াইয়ের দিকে যেতে পারত কী না সে প্রশ্নটি তো গভীরভাবে উপস্থিত থেকেই
যাচ্ছে। দুটি সম্ভাবনা এই আন্দোলন থেকে বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। এক, যুগ
যুগ ধরে বঞ্চিত আদিবাসী বা তপশিলী জাতিভুক্ত সামাজিক পশ্চাদপদ অংশটির
প্রকৃত দাবিগুলিকে সামনে নিয়ে আসা, তা নিয়ে আরো বড় ধরনের সামাজিক আলোড়ন
সৃষ্টির প্রচেষ্টা নেওয়া, যার বস্তুগত ভিত্তি সমাজে উপস্থিত রয়েছে। দুই,
গ্রামীণ শ্রমজীবী জনতার জীবনযন্ত্রণার যে সার্বিক ছবিটি সমাজে উপস্হিত, তার
বিরুদ্ধে এক বৃহত্তর লড়াই গড়ে ওঠার সম্ভাবনা। এই আন্দোলনের সমস্যাগুলিকে
দেখা প্রয়োজন দু’দিক থেকেই। আদিবাসী সমাজের নিজস্ব আকাঙ্ক্ষা হিসেবে
পুলিশের ‘নাকখত’ দেওয়ার দাবিতে এক অনড় প্রকৃতির লড়াই যে ব্যাপ্তিতে
অন্যত্রও ছড়িয়ে পড়েছিল, তা এই গণজাগরণটির স্বকীয় বৈশিষ্ট্য ছিল। কিন্তু
আদিবাসী সমাজের সামাজিক সংগঠনগুলি যখন এই সম্ভাবনাকে কোনোভাবে একটা সমঝোতা
করে মিটিয়ে নিতে নিতে চেয়েছে, তখন মাওবাদীরা এই গণজাগরণকে তাদের রাষ্ট্রের
বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধের অংশ করে নিতে চেয়েছেন। এই আন্দোলনের প্রধান বা কোনো
কোনো ক্ষেত্রে একমাত্র সাবজেক্টিভ শক্তি হিসেবে তাদের উপস্থিতির কারণে এই
আন্দোলনের অন্য কোনো অভিমুখ সৃষ্টি হওয়া যথেষ্টই কঠিন ছিল। এই পর্বে আগে
উল্লেখিত আন্দোলনগুলি ছাড়াও আরো বেশ কিছু আন্দোলন সংগঠিত হয়েছে। সেগুলি
মাত্রায় এবং গভীরতায় তুলনামূলকভাবে কম শক্তিশালী। কিন্তু এই পর্বের অত্যন্ত
মনোযোগ আকর্ষণকারী বিষয় হল, এই গণআন্দোলনগুলির রূপ ও বৈশিষ্ট্যগুলি।
অতীতের কিছু জরুরি পর্যালোচনা
১৯৮০-র দশকে সার-বীজ-বিদ্যুতের দাবিতে,
ফসলের ন্যায্য দামের দাবিতে কিছু কিছু বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্ত বিক্ষোভ আন্দোলন
হয়ে থাকলেও তা রাজ্যে কোনো বড়মাপের কৃষক আন্দোলনের চেহারা নেয় নি।
ক্ষেতমজুরদের মজুরিবৃদ্ধির আন্দোলন রাজ্যস্তরে কোনো সংগঠিত রূপ পায় নি।
ক্রমশ একদিকে প্রায় বিরোধীহীন গ্রামাঞ্চলে পার্টির নিরঙ্কুশ ক্ষমতার কাছে
আত্মসমর্পণ অন্যদিকে সরকারী নেতাদের অনুগ্রহলাভ—বাংলার গ্রামীণ মেহনতী জনগণ
একটা বড় সময় জুড়ে এতেই অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। সাধারণভাবে কৃষক আন্দোলনের যে
স্বতঃস্ফূর্ততা এর আগের দশকগুলোতে বাংলার একটা নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ছিল, তা
পরিবর্তিত হতে শুরু করল। সরকারী ক্ষমতায় বসার আগে যে কৃষক আন্দোলন ছিল
বামপন্থীদের সামাজিক পরিচিতির এক প্রধান জায়গা, সেখানে যে আর্থ–সামাজিক
পরিবর্তনগুলি এসে উপস্থিত হল, তাতে বাংলার গ্রামাঞ্চলে শ্রেণীদ্বন্দ্বের
রূপটি কোথাও পরিবর্তিত হল কী না তা নিয়ে সরকারী ও একাডেমিক মহলে নানা চর্চা
বা গবেষণা হলেও বিপ্লবী বামেদের মধ্যে তা নিয়ে চর্চা হয় নি। অথচ বাস্তবে
পুরোনো ধরনের কৃষক আন্দোলনগুলি অবলুপ্ত হতে শুরু করল।
শ্রমিক আন্দোলন হল বাম আন্দোলনের প্রকৃত
প্রাণশক্তি। বর্তমান প্রবন্ধটিতে এ রাজ্যের শ্রমিক আন্দোলনের একটি
পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনার সুযোগ নেই। কিন্তু শ্রমিক আন্দোলনের গতি, তার
বন্ধ্যাত্ব বা বিকাশ বাম আন্দোলনের চরিত্রকে সবচেয়ে মৌলিকভাবে প্রভাবিত
করে। বর্তমান আলোচনায় এতক্ষণ পর্যন্ত শ্রমিক আন্দোলন ব্যতীত পশ্চিমবঙ্গের
সামাজিক জীবনের আরও নানান ক্ষেত্রের প্রতিক্রিয়া ও প্রগতির প্রবণতার
দ্বান্দ্বিকতাকে আমরা বুঝতে চেয়েছি। ওইসব ক্ষেত্রগুলিতে পরিবর্তনের ধারাটি
অবশ্যই শ্রমিক আন্দোলনের বিকাশের দ্বারা জোরালোভাবে প্রভাবিত হয়। কিন্তু এই
পরিবর্তনগুলিও যে শ্রমিক আন্দোলনকে একটা দূর পর্যন্ত প্রভাবিত করার ক্ষমতা
রাখে তা আমরা প্রায়শই ভুলে যাই। শ্রমের সাথে পুঁজির দ্বন্দ্ব অনিবার্যভাবে
যে সংঘাত, প্রতিবাদ বা বিদ্রোহের জন্ম দেয়, তা কোনো একটি দেশে বা সমাজে
কীভাবে প্রকাশিত হবে, বিকশিত হবে বা শুকিয়ে যাবে তা সমাজটির গণতান্ত্রিকতার
মাত্রা ও প্রকৃতির ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল। আর এই গণতান্ত্রিকতা প্রধানত
নির্ধারিত হয় সেই সমাজটির বিকাশের ইতিহাস দিয়ে–ছাত্র-যুবদের লড়াই, বৈষম্যের
বিরুদ্ধে নারীর প্রতিবাদ, সামন্তবাদের বিরুদ্ধে কৃষক ও মেহনতি জনতার
সংগ্রাম, শ্রমিক আন্দোলন, সাংস্কৃতিক আন্দোলন, শিক্ষাব্যবস্থার প্রকৃতি ও
জনসাধারণের ওপর তার প্রভাব, দেশীয় ও বিদেশী পুঁজির হস্তক্ষেপ ও বিকাশ
ইত্যাদি আরও অনেক কিছুর দ্বারা। বাংলার বাম আন্দোলনের ইতিহাস তাই শুধুই
বাংলার শ্রমিক আন্দোলন বা শ্রমিক-কৃষক আন্দোলনের ইতিহাস হতে পারে না।
বৃটিশ আমল ও স্বাধীনতা-পরবর্তী শিল্পায়নের
ফলে এরাজ্যে নব্য শিল্পশ্রমিকদের যে জমায়েত সৃষ্টি হয়েছিল, তা শ্রমিক
আন্দোলনের একটা নিজস্ব ধারাও তৈরি করেছিল। ১৯৬০-এর দশকে পোর্ট ও ডক
শ্রমিকদের লড়াই, হিন্দুস্তান মোটর্স, জয় ইঞ্জিনিয়ারিং বা জেসপ-এর লড়াই ,
১৯৭০-এর দশকে গেস্টকীনের লড়াই, রেল শ্রমিকদের লড়াই, দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলে
হিন্দুস্তান স্টিলের লড়াই, ১৯৮০-দশকে হিন্দুস্তান লিভারের লড়াই, ১৯৯০-এর
দশকে ভিক্টোরিয়া-কানোরিয়া সহ জুট শ্রমিকদের লড়াইগুলি রাজ্যের শ্রমিক
আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ মাইলস্টোন। পশ্চিমবঙ্গের জুট, কটন, ইঞ্জিনিয়ারিং,
কয়লা, পোর্ট ও ডকের শ্রমিকদের লড়াই স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়পর্বে বারবার
সামনে এসেছে। রাজ্যের শ্রমিক আন্দোলনগুলির একটা গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল
কারখানাভিত্তিক বা শিল্পভিত্তিক অর্থনৈতিক দাবিদাওয়ার লড়াই। কমিউনিস্ট
পার্টি গড়ে ওঠার সময় থেকেই আমাদের দেশে শ্রমিকশ্রেণির রাজনৈতিক লড়াই হিসেবে
পার্টির লড়াইকেই দেখে আসা হয়েছে। ভারতীয় বিপ্লবের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে
এদেশের শ্রমিকশ্রেণির ভূমিকার কথা তাত্ত্বিকভাবে স্বীকৃত হলেও
শ্রমিকশ্রেণির রাজনৈতিক সংগ্রামে পরিচালক হয়ে ওঠার প্রশ্নটি সর্বদাই এখানে
অবহেলিত থেকেছে।
১৯৬০-এর দশকের গৌরবোজ্জ্বল সংগ্রামী
অতীতের দিকে চোখ ফেরালে আমরা খেয়াল করতে পারি, ঐতিহাসিক শ্রমিক আন্দোলনের
গুরুত্বপূর্ণ সফলতাগুলো ক্রমশ আটকে পড়েছিল নির্বাচনী সংগ্রামের ঘেরাটোপে।
সাধারণভাবে এই ট্রেড ইউনিয়ন সংগ্রামগুলি শ্রমিকদের ইউনিয়ন করার অধিকার,
বেতনবৃদ্ধি, ওভারটাইম, বোনাস, দেশের অন্যান্য শ্রমআইন লাগু করার আইনী
গন্ডীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এই অধিকারগুলি বহু সময়েই যেহেতু মালিক বা
সরকার বা উভয়েই দিতে প্রস্তুত ছিল না, তাই তা আদায়ের জন্য সংগ্রাম করতে হত।
বহুক্ষেত্রেই তা জঙ্গী সংগ্রামে পরিণত হত। কিন্তু আমাদের দেশে কৃষক
আন্দোলনের অর্থনৈতিক সংগ্রামের সাথে সাথে যেভাবে জমিদখল ও পুনর্বন্টনের
শ্লোগান উঠে এসেছিল ‘লাঙ্গল যার জমি তার’ ইত্যাদির মাধ্যমে, শ্রমিক
আন্দোলনের সামনে নির্বাচনী সংগ্রাম ছাড়া অন্য কোনো রাজনৈতিক সংগ্রাম বা
সামাজিক প্রশ্নে তেমন সুস্পষ্ট শ্রেণীগত সক্রিয়তার প্রশ্ন উপস্থিত হয় নি।
ফলে শ্রমিকরা যখন নিজেদের সর্বোচ্চ উদ্যোগ ও সক্রিয়তা দেখিয়েছেন
পুঁজিপতিদের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে, তখন উপযুক্ত অগ্রণী প্রক্রিয়ার অভাবে তা
জঙ্গী ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। নকশালবাড়ি আন্দোলনের
পরিপ্রেক্ষিতে শ্রমিকদের বিপ্লবী কর্তব্য সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে কমরেড
চারু মজুমদার অগ্রণী শ্রমিকদের কৃষি বিপ্লবের কর্মসূচী নিয়ে গ্রামের যাবার
আহ্বান রেখেছেন। ‘শ্রেণীশত্রু খতমের অভিযানে’ অংশ নিতে বলেছেন। কিন্তু
কৃষিবিপ্লবের নেতা হিসেবে, ভারতীয় বিপ্লবের চালিকাশক্তি হিসেবে কীভাবে
ভারতের বা পশ্চিমবঙ্গের শ্রমিকশ্রেণি নিজেকে সংগঠিত করবে বা সমাজে বৈপ্লবিক
আলোড়নের প্রক্রিয়া চালাবে তা নিয়ে তত্কালীন সিপিআই(এমএল) নেতৃত্ব কোনো
দিকনির্দেশ করেন নি। ব্যক্তিগতভাবে গ্রামে চলে যাওয়া বা শহরে থেকে গেলে
সক্রিয় সমর্থকের ভূমিকা পালন করার বেশি শ্রেণি-সচেতন শ্রমিকদের কোন
শ্রেণীগত সক্রিয়তার ক্ষেত্র ছিল না।
ষাট ও সত্তরের দশক জুড়ে কমিউনিস্ট
আন্দোলনের যে দ্বিমুখী প্রবণতা আমরা দেখতে পাই, তার প্রতিফলন তীব্রভাবে
পড়েছে শ্রমিক আন্দোলনে। একপক্ষ তাকে বানাতে চেয়েছে বছর বছর নির্বাচনী
বৈতরণী পার করা আর ‘নয়নের মণি’ সরকারকে অন্ধের মতো রক্ষা করে যাওয়ার গোঁড়া
সমর্থক। অন্যপক্ষ তার শ্রেণীগত রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তোলার প্রচেষ্টা ও তার
শ্রেণীগত ভূমিকার জায়গায় ব্যক্তিগতভাবে শ্রমিককে ‘খতম অভিযানে’ সামিল
করেছে। এমনও নয় যে এই ‘খতম অভিযানে’র বেঠিক লাইনটি তারা শ্রেণীর একটি
সুসংগঠিত অংশ হিসেবে প্রয়োগ করতে যাচ্ছে। সংশোধনবাদ-বিরোধী মেরুকরণের
ফলশ্রুতিতে কারখানায় কারখানায় শ্রমিকদের মধ্যে যে স্বাভাবিক মেরুকরণ শুরু
হয়েছিল, ‘খতম অভিযান’ তাকে শ্রেণীগত সক্রিয়তায় রূপ দেওয়ার সমস্ত সম্ভাবনাকে
সচেতনভাবে খারিজ করে দিয়েছিল। কারণ রাজনৈতিক লাইনটি-ই ছিল এই যে কারখানার
স্তরে শ্রমিকদের সংগঠিত করার বা সক্রিয় করার যে কোন প্রয়াসই সংশোধনবাদের
জন্ম দিতে বাধ্য। বৈপ্লবিক সংগ্রামে শ্রমিকশ্রেণির যোগদানের সমস্ত রাস্তা
কার্যত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।
১৯৭৭-পরবর্তী বাংলায় বামফ্রন্ট সরকার
ক্ষমতায় থাকার ফলে শ্রমিক আন্দোলনের রসায়নে বেশ কিছু পরিবর্তন ঘটল।
কারখানায় কারখানায় সিটুর ক্ষমতাকে নতুন জমানায় প্রতিষ্ঠা করার জন্য
মালিকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করার প্রয়োজন ছিল। শ্রমিকদের একমাত্র প্রতিনিধি
হিসেবে নিজেদের ক্ষমতাকে নিশ্চিত করার জন্য শ্রমিকদের সমস্ত উদ্যোগকে
শ্রমিক নেতা ও পার্টির হাতে কুক্ষিগত করার প্রচেষ্টা করা হল। সময়ের সাথে
সাথে পরিস্থিতি বদলাল । এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি হল যে লড়াকু শ্রমিকের কাছে
তিনটি ভীতি একসাথে উপস্থিত হল। কারখানায় মালিকপক্ষ, ইউনিয়ন নেতা(প্রধানত
সিটু) আর পুলিশ প্রশাসনের ভয়। এলাকায় গেলে সিপিআই(এম) লোকাল কমিটির
নজরদারি। আর উল্টোদিকে মালিকরা দেখল শ্রমিক নেতাদের হাতে উত্পাদনের
দায়দায়িত্ব ছেড়ে দিলে লাভের পরিমাণ বাড়তে পারে। পার্টি নেতারা মালিকদের
আশ্বস্ত করল। মালিকরাও দেখল যে স্বতঃস্ফূর্ত শ্রমিক-বিক্ষোভ দমন করার নতুন
পন্থাটি তাদের পক্ষে লাভজনক। শ্রমিকরা বড় সংখ্যায় লড়াইয়ের রাস্তা থেকে পিছু
হঠতে শুরু করল। আপস, শ্রমিকদের ন্যায্যপাওনা থেকে বঞ্চিত করা, নেতাদের
সহায়তায় কাজে ফাঁকি দেওয়া থেকে শুরু করে নানাধরনের বেআইনী সুবিধাঅর্জন
প্রলুব্ধ করে তুলল শ্রমিকদের মধ্যেকার ক্ষুদ্র একটা অংশকে। সাধারণ
শ্রমিকদের বেশিরভাগ অংশটার মধ্যে নিষ্ক্রিয়তা এবং মেনে চলা-মানিয়ে চলার
অভ্যস্ততা শুরু হল। এই নতুন ব্যবস্থাপনা একদশক ধরে নিজেকে ক্রমশ শক্তিশালী
করে তুলেছে। সমস্ত শ্রেণীদ্বন্দ্বকে সিপিআ(এম) পরিচালিত পার্টিতন্ত্র দিয়ে
লাগাতার নিস্তেজ করে দেওয়ার কাজ করা হয়েছে। কিন্তু শেষরক্ষা করতে পারে নি
আর তা সম্ভবও ছিল না। গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকের গোড়ায় ভারতের অর্থনীতিতে
নয়া উদারীকরণের দৌড় এমনভাবেই শুরু হল যে পুরোনো সমস্ত পন্থা-রেওয়াজ-অভ্যাস
এবং কৌশল ও চালাকি—সবকিছুই প্রবল ঝড়ের মুখে পড়ে কুটোর মতো উড়ে গেল। সরকারী
ক্ষমতার শিখরে বসে, মালিকদের চাপে রেখে আর শ্রমিকদের ফুটোকড়ি পাইয়ে দিয়ে,
শ্রমিক আন্দোলন নিয়ন্ত্রণ করার দিন শেষ হতে শুরু করল।
সিপিআই(এম)-এর বৃত্তের বাইরে শ্রমিক
আন্দোলনের স্বাধীন উদ্যোগ বিকাশের নানা প্রচেষ্টা ১৯৭৭-পরবর্তী পর্বে
এরাজ্যে নানান মাত্রায় চলেছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের সামগ্রিক রাজনৈতিক
বাতাবরণটি ছিল শ্রমিক আন্দোলন বিকাশের পক্ষে সম্পূর্ণ প্রতিকূল। পশ্চিমবঙ্গ
তার আগের তিন-চার দশকে দেশের শ্রমিক আন্দোলনের প্রধান প্রাণকেন্দ্র ছিল।
কিন্তু আশির দশকের মাঝামাঝি চিত্রটা ছিল অনেকটা এরকম–কারখানায় কারখানায় ২
থেকে ৩০টি ইউনিয়ন শ্রমিকদের কাছে কোনো বিস্ময়কর ব্যাপার ছিল না। শ্রমিকরা
দু’দশক জুড়ে নিজের কারখানায় বা আশপাশের কারখানায় দেখেছে কী করে লড়াকু
শ্রমিক নেতা মালিকের দালালে পরিণত হয়। পুলিশ এবং ট্রেড ইউনিয়ন নেতা, উভয়েই
সমাজের সবচেয়ে বড় ঘুষখোর হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল ক্রমশ। আর মালিকপক্ষও
ক্রমশ দক্ষ হয়ে উঠেছিল লড়াকু নেতাদের ‘বশে’ আনতে। তাই শ্রমিকনেতাদের ওপর
ভরসা বা তাদের থেকে আশা-আকাঙ্ক্ষা, উভয়ই, কমে গেছিল অনেকটা। শ্রমিকরা যখন
শ্রমিকরাজ বা কমিউনিস্ট নীতি-নৈতিকতা বা উন্নত জীবনশৈলীর কথা শুনত (তা যেই
প্রচার করুক না কেন), তাদের কাছে নিজেদের পারিবারিক অভিজ্ঞতা বা বয়স্কদের
থেকে জানতে পারা তিন দশকের আত্মসমর্পণ-আপস-প্রতারণার ইতিহাস প্রবলভাবে ফিরে
ফিরে আসত। পুঁজিপতিদের শোষণ–জুলুমের বিরুদ্ধে সংগঠিত হওয়ার প্রয়োজনীয়তা
উপলব্ধি করলেও লড়াইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় স্বতঃস্ফূর্ত আবেগগত দিকটির ওপর এইসব
প্রতিকূল উপাদানগুলি সর্বদা জোরালো বিপরীত প্রভাব জারি রাখত। দেশের বাম
আন্দোলনের প্রধান কেন্দ্র বাংলায় শ্রমিক আন্দোলনের বিকাশের সম্পূর্ণ
প্রতিকূল এই পরিস্থিতিটি বিচারের মধ্যে না রাখলে ৮০-র দশক বা তার পরবর্তীতে
হওয়া এ রাজ্যের শ্রমিক আন্দোলনকে সঠিকভাবে বোঝা সম্ভব নয়। এর সঙ্গে অবশ্যই
রয়েছে দুনিয়া জুড়ে বিপ্লবী আন্দোলন ও শ্রমিক আন্দোলনের হার ও ছত্রভঙ্গ হয়ে
যাওয়ার সর্বগ্রাসী প্রভাব।
পশ্চিমবঙ্গে কর্মরত বিভিন্ন কমিউনিস্ট
বিপ্লবী শক্তি এমনই এক পরিস্থিতির মধ্যে শ্রমিকদের সংগঠিত করার কঠিন
কাজটিতে নিজেদের নিয়োজিত করেছিল। ৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে গার্ডেনরীচে
হিন্দুস্তান লিভারের ঠিকা শ্রমিকদের বীরত্বপূর্ণ লড়াই, পাহাড়পুর কুলিং
টাওয়ারের শ্রমিকদের লড়াই, নব্বইয়ের গোড়ায় ভিক্টোরিয়া জুট-কানোরিয়া জুট
মিলের লড়াই, শেষের দিকে হিন্দুস্তান মোটর্স-এর লড়াই-সহ অসংখ্য ছোট-বড়
শ্রমিক আন্দোলন বিগত তিন দশকে এরাজ্যে ঘটেছে। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগবে যে
কমিউনিস্ট বিপ্লবী শিবিরের শক্তিগুলির ভূমিকা স্বাধীন শ্রমিক আন্দোলনকে কোন
দিশায় আন্দোলিত করতে চাইল আর তার ফলাফলই বা কী দাঁড়াল?
১৯৮০-এর দশকে পশ্চিমবঙ্গের কারখানায়
কারখানায় বা শিল্পে স্থায়ী শ্রমিকদের জন্য বেতনবৃদ্ধি, স্থায়িত্ব, বেশি
বোনাস, ওভারটাইম ইত্যাদি বিষয়ে সিটু এবং সরকারকে দিয়ে সিপিআই(এম) মালিকদের
সঙ্গে যে দরকষাকষির প্রক্রিয়া শুরু করে, সাধারণভাবে এ রাজ্যের শ্রমিকরা
তাকে বিরোধিতা করেন নি। সুবিধাপ্রাপ্ত একটা ক্ষুদ্র অংশের অতি-সক্রিয়তা ও
বেশিরভাগ শ্রমিকের আপাত-নিষ্ক্রিয় মনোভাব শ্রমিক আন্দোলনের সুবিধাবাদী
ধারাটিকে ক্রমশ প্রকট ও শক্তিশালী করে তুলেছিল। এই পরিস্থিতিতে হিন্দুস্তান
লিভারের ঠিকা শ্রমিকদের সিটুর পতাকা ছেড়ে বেরিয়ে এসে স্বাধীন লড়াই গড়ে
তোলার ঘটনাটি গভীর মনোযোগের দাবি করে। শ্রমিকদের স্বাধীন স্বতন্ত্র ধারায়
সংগঠিত হতে হবে-এই বক্তব্যে কেন্দ্রীভূত হয়ে একটি কমিউনিস্ট বিপ্লবী শক্তি
পশ্চিমবঙ্গে শ্রমিকশ্রেণীর মধ্যে কাজকে সংহত করে। সে কাজের ফসল হিসেবে কিছু
কিছু কারখানার শ্রমিকরা জমায়েত হতে শুরু করেন। আবার হিন্দুস্তান লিভারের
ঠিকা শ্রমিকদের অসম লড়াইয়ের সাফল্য গোটা শ্রমিকশ্রেণীর মধ্যে এমন কোনো গভীর
আলোড়ন সৃষ্টি করতে পারে নি যাতে শ্রমিক আন্দোলনের সরকারসর্বস্ব আপসকামী
ধারাটির বিপরীতে শ্রেণীসংগ্রাম বিকাশের লক্ষ্যে একটি স্বাধীন-স্বতন্ত্র
ধারার প্রতি তাদের স্বাভাবিক আকর্ষণ জন্মায়। শ্রমিকদের মধ্যে লড়াই করার
স্বতঃস্ফূর্ততা সেই উচ্চতায় ওঠেনি কখনই। তারফলে বহুক্ষেত্রেই স্বাধীনভাবে
সংগঠিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও সিপিআই(এম) অচিরেই তাকে বাগে নিয়ে আসতে সক্ষম
হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, পশ্চিমবঙ্গের শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে
পার্টিভিত্তিক ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের যে গভীর প্রভাব দেখতে পাওয়া যায়, তা
ভারতের যে কোনো রাজ্যের থেকেই যথেষ্ট স্বতন্ত্র। এটাকে সিপিআই(এম)-এর অবদান
হিসেবে দেখাটা অতি-সরলীকরণ হয়ে যাবে। যে কমিউনিস্ট বিপ্লবী গোষ্ঠীটি
স্বাধীন স্বতন্ত্র শ্রমিক আন্দোলনের বিকাশের প্রক্রিয়ার ওপর সঠিকভাবে জোর
রাখছিলেন, তারা সেই সময় স্বাধীন রেড ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে তোলার আন্তর্জাতিক
অবস্থানটির সমর্থক ছিলেন। পার্টি বা কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে তোলার
প্রয়োজনীয়তাকে স্বীকৃতি দিলেও তার বস্তুগত পরিস্থিতি হাজির নেই বলেই তাদের
বোঝাপড়া ছিল। এই বোঝাপড়াটি মূলগতভাবে সঠিক ছিল বলি আমরা মনে করি। কিন্তু যে
বিষয়টি আলোচনার বাইরে থেকে গিয়েছিল, তা হল এই পর্যায়ে সমাজে শ্রমিকশ্রেণির
রাজনৈতিক আলোড়নের প্রক্রিয়াটি কেমনভাবে চলবে? শ্রমিকশ্রেণি সমাজে তার
শ্রেণীগত আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করার কাজটি কীভাবে করবে? সেটা কি শুধুমাত্র
কমিউনিস্ট বিপ্লবী স্তরের আজকের অবস্থান দিয়ে মিটিয়ে ফেলা যাবে ? না কী এই
অন্তর্বর্তীকালীন মুহূর্তে এমন একটি সমান্তরাল রাজনৈতিক প্রক্রিয়া অগ্রণী
অংশের পক্ষ থেকে উপস্থিত করা প্রয়োজন যাতে অন্তত শ্রেণীর আগুয়ান বাহিনীটি
একটি বিকল্প রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে স্বাধীনভাবে অনুধাবন করে উঠতে পারে। একটা
পরিমানে নিজেদের জীবনে এবং অন্য লড়াকু শ্রমিকদের কাছে এক বিকল্প হিসেবে
উপস্থিত করতে পারে। নারীর প্রতি বৈষম্যের প্রশ্নে, জাতপাতের বৈষম্যের
প্রশ্নে বা জাতিসত্ত্বার আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে কমিউনিস্ট পার্টির নিজস্ব
প্রচার-কর্মসূচীর বাইরে শ্রমিকরা এক ক্ষুদ্র শক্তি হিসেবেও তাদের মতামতকে
সমাজে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছেন – এমন উদ্যোগ নেই বললেই চলে। শ্রমিকদের
মধ্যে কাজ বলতে মূলত শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন দাবীদাওয়ার লড়াইকে
দেখা-বোঝা-সহায়তা বা নেতৃত্ব দেওয়া হিসেবে দেখা হয়েছে। অন্যান্য মেহনতি
শ্রেণিগুলির প্রতিবাদ, বিদ্রোহ বা লড়াইয়ের সাথে একাত্মতার প্রশ্নটি বরাবরই
উপেক্ষিত থেকে গেছে। কমিউনিস্ট বিপ্লবীরাও শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন লড়াইকে
অনেকবেশি গুরুত্ব দিতে গিয়ে আশপাশের বাতাবরণটির গণতান্ত্রিকতার বিকাশের
প্রশ্নটিকে, তাকে সর্বহারার অনুকূলে প্রভাবিত করার প্রশ্নটিতে শুধু
শ্রমিকদের একান্ত নিজস্ব দাবী-দাওয়ার আন্দোলনের তীব্রতার অভিঘাত সৃষ্টির
দ্বারাই ঘটার ভাবনার ওপর মাত্রাতিরিক্ত জোর দিয়ে ফেলেছেন। জনতার অন্যান্য
নিপীড়িত অংশের আন্দোলনের সাথে লড়াকু শ্রমিকদের আদানপ্রদান ও একাত্ম হওয়ার
প্রশ্নটিকে মারাত্মকভাবে উপেক্ষা করেছেন।
পশ্চিমবঙ্গের শ্রমিক আন্দোলনের সংগ্রামী
ধারায় গার্ডেনরীচ শিপবিল্ডার্স, হিন্দুস্তান লিভার, হিন্দুস্তান
ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন-এর ট্রেড ইউনিয়ন নির্বাচনে জয়লাভ নিঃসন্দেহেই এক
অগগ্রতি বলে বিবেচিত হবে। সাথে সাথে এই সময়ের শ্রমিক আন্দোলন কেন একটা
পর্যায়ের পর আরও বিকশিত হতে পারল না তা নিশ্চয়ই গভীর বিশ্লেষণ দাবী করে।
হাওড়া জেলায় কানোরিয়া, বাউড়িয়া, লাডলো, ন্যাশানাল জুটমিল, ফুলেশ্বর কটন মিল
বা হুগলী জেলায় হিন্দুস্তান মোটর্স-এর আন্দোলন একটা দূর পর্যন্ত এগোনোর
পরে কেন ও কোথায় আটকে পড়ল–একটা সময়ের পর কী কারণে অন্যান্য নতুন ক্ষেত্রে
শ্রমিকদের নতুন ইউনিয়ন গঠন বা লড়াই করার প্রবণতা কমতে থাকল তার বিস্তারিত
বিশ্লেষণ হওয়া দরকার। ১৯৭৭-পরবর্তী পশ্চিমবঙ্গের শ্রমিক আন্দোলনে যে
স্বতঃস্ফূর্ত বিকাশের সম্ভাবনা সৃষ্টি হচ্ছিল, তা পরবর্তী সময়ে আর কেন
বিকশিত হতে পারল না– আজকের বাম আন্দোলনের সঙ্কটের স্বরূপ নির্ণয়ে তা এক
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
সারা দেশেই ‘নব-উদারবাদ’-এর যুগে, ১৯৯০-এর
পরবর্তী সময়ে, অসংগঠিত ক্ষেত্রে শ্রমিকদের আনুপাতিক হার (সংগঠিত ক্ষেত্রের
তুলনায়) ব্যাপকভাবে বাড়তে লাগল। এর বড় অংশটাই একচেটিয়া পুঁজির প্রত্যক্ষ
শোষণের বাইরে। কিন্তু এই শ্রমিকদের জীবনের দুর্দশা দেশে কর্মে-নিযুক্ত
মানুষদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। এই দুর্দশার কারণ এ দেশে দেশি-বিদেশি একচেটিয়া
পুঁজির লুঠ ও শোষণ। দেশের এই বিশালসংখ্যক শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়নে সংগঠিত
করা এবং রাজনৈতিক আন্দোলনের শরিক করে তোলা হল এই পর্বে এক গুরুত্বপূর্ণ
রাজনৈতিক কর্তব্য। অথচ, সারা দেশের মতো পশ্চিমবঙ্গেও এদের সংগঠিত করার কাজ
করেন সাম্রাজ্যবাদীদের আর্থিক-মদতপুষ্ট এনজিওগুলি এবং প্রতিষ্ঠিত কেন্দ্রীয়
ট্রেড ইউনিয়নগুলি। এ কাজে বিপ্লবী বামেদের উপস্থিতি নামমাত্র। এই অংশের
মানুষদের সাথে সমস্তধরনের বামেদের সম্পর্কই বিগত দুই দশকে ক্রমশ দুর্বল
হয়েছে।
সমাজে যখন বিপ্লবী পরিস্থিতি থাকে না, তখন
শ্রমিকশ্রেণিকে রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত করার প্রক্রিয়াটি ট্রেড ইউনিয়ন
আন্দোলনের বাইরে কীভাবে হবে তা নিয়ে ৮০ বা ৯০-এর দশকেও কমিউনিস্ট বিপ্লবী
নেতৃত্বের বোঝাপড়া সুস্পষ্টভাবে উপস্থিত হয় নি। বিশেষ করে কমিউনিস্ট
পার্টিকে যখন মূলত গোপন সাংগঠনিক কাঠামোয় কাজ করতে হয়, তখন এমনকি পার্টির
সাথে যুক্ত হয়ে গেলেও শ্রমিকরা তাদের প্রকাশ্য শ্রেণীগত রাজনৈতিক সক্রিয়তা
কীভাবে প্রকাশ করবে সে ব্যাপারে কোন সুস্পষ্ট দিশা উপস্থিত ছিল না।
১৯৯৩ সালের কানোরিয়া আন্দোলন
শ্রমিকশ্রেণির আন্দোলনের কোনো সুনির্দিষ্ট সূত্রায়নের ওপর দাঁড়িয়ে শুরু না
হলেও যে কমিউনিস্ট বিপ্লবী শক্তিটি এই আন্দোলনে নির্ণায়ক ভূমিকা পালন
করেছেন, তারা শ্রমিকদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও লড়াই করার আকাঙ্ক্ষাকে
সঠিকভাবেই চিন্হিত করেছিলেন। এই আন্দোলনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল আক্রান্ত
শ্রমিক, তার পরিবার ও সংলগ্ন এলাকার শ্রমজীবী মানুষের ঐক্যবদ্ধ শক্তির
বহিঃপ্রকাশ। কারখানা সংলগ্ন গ্রামগুলিতে এই আন্দোলনের স্বতঃস্ফূর্ততা
এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল যে গ্রামে গ্রামে ‘যৌথ রান্নাঘর’ পরিচালনায় আঞ্চলিক
জনগণের অংশগ্রহণ ছিল অভাবিত। এই আন্দোলনে ব্যক্তি নেতার গুরুত্বপূর্ণ
ভূমিকা থাকলেও শ্রমিকদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল প্রশ্নাতীত। সমগ্র
আন্দোলনে কমিউনিস্ট নেতৃত্বের দক্ষ ভূমিকা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে
নির্ধারক লড়াইকে বিস্তৃত করার প্রশ্নে ও আন্দোলনের সাথে একাত্মতা ও
অংশগ্রহণের প্রশ্নে শ্রমিকদের চিন্তার স্বকীয়তা, উদ্যোগ ও কার্যকরী ভূমিকা
নেওয়া এই আন্দোলনের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। একটি জুট মিলের
কাটৌতি-বিরোধী সংগ্রাম যে মাত্রায় ব্যাপ্তিলাভ করেছিল, তার মধ্যে
বস্তুগতভাবে শ্রমিকদের মধ্যে স্বাধীনভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর নিজস্ব উপাদান না
থাকলে বিকাশের ওই স্তরে পৌঁছনো সম্ভব হত না। কিন্তু এই স্বতঃস্ফূর্ততার
অন্তর্বস্তু কি শুধু এক কারখানার শ্রমিকদের কাটৌতি বিরোধিতা? রাজ্যের জুট
মিলগুলোতে মালিকদের মধ্যযুগীয় অত্যাচার-নিপীড়ন আর সিপিএম-সহ প্রতিষ্ঠিত
নেতাদের দালালির বিরুদ্ধে জুট শ্রমিকদের যে গভীর ক্ষোভ তলে তলে বাসা
বাঁধছিল, তা আক্রোশের রূপ নিয়ে ফেটে পড়েছিল ভিক্টোরিয়ায়, আর তার সংগঠিত
বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল কানোরিয়া আন্দোলনে। তার তীব্রতা এতটাই যে কারখানা দখল
করে পুনরায় উত্পাদন চালু করার মতো উচ্চগ্রামের আহ্বান বড় সংখ্যক শ্রমিককে
আকৃষ্ট করেছে। আন্দোলনের প্রথম পর্বে শ্রমিকরা নেতৃত্বের প্রতি সম্পূর্ণ
আস্থা রেখেও এই আন্দোলন যে তাদেরই নিজেদের গড়ে তোলা ও নিজেদের পরিচালিত
আন্দোলন, একটা দূর পর্যন্ত তা অনুভব করেছিলেন। স্বতঃস্ফুর্ততার এই মাত্রাটি
কানোরিয়া আন্দোলনে একটা ঐতিহাসিক মাত্রা সংযোজন করেছিল। যে কোনো একটি
গণ-আন্দোলনেই স্বতঃস্ফূর্ততার এই মাত্রাটি উপস্থিত থাকে না। এখানেও
গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল এই আন্দোলনের সামাজিক-রাজনৈতিক সমর্থনের দিকটি
নিয়ে। প্রথম পর্বের তীব্রতা আন্দোলনটির সামাজিক সমর্থনের ভিত গড়ে দিয়েছিল।
কিন্তু রাজনৈতিক শক্তির প্রশ্নটির মীমাংসা হয় নি। এই ধরনের আন্দোলনগুলির
মধ্যে কমিউনিস্ট বিপ্লবী শিবিরের সক্রিয়তার কথা আলোচিত হলেও সেই শক্তিগুলি
শ্রমিকশ্রেণির এক শক্তি হিসেবে সংসদীয় অক্ষের ভেতরে বা বাইরে,
কোনোক্ষেত্রেই, একটি রাজনৈতিক শক্তির স্বীকৃতি কখনোই অর্জন করতে পারে নি।
যে পরিমাণে আন্দোলনের স্বতঃস্ফূর্ততা কমতে শুরু করেছে, সাধারণভাবে এই বিশেষ
আন্দোলনগুলি সমাজের বুকে গভীর ছাপ রেখেই ক্রমশ সাধারণে রূপান্তরিত হয়েছে।
বাংলার গণসংগ্রামের আলোকে রাজনৈতিক বিকল্পের খোঁজে…..
১৯৯০ সালে পশ্চিমবঙ্গে ভাড়াবৃদ্ধি ও
মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে ১৩ টি সংগ্রামী বাম সংগঠন মিলিতভাবে গণআন্দোলন
পরিচালনায় সচেষ্ট হয়। লাগাতারভাবে দীর্ঘস্থায়ী ধরনের আন্দোলনের তুলনায়
ভাড়াবৃদ্ধির বিরুদ্ধে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভের ওপর এই আন্দোলনের
সামাজিক প্রভাব তৈরী হয়েছিল। বিশাল প্রতিবাদী মিছিলের ওপর জ্যোতি বসু
সরকারের গুলিচালনা, মৃত্যু ও সর্বোপরি সিপিআই(এম)-এর ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের
বিরুদ্ধে ১৯৯০ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ১৩ পার্টির ডাকা একদিনের বাংলা বনধ
অভূতপূর্ব সাফল্য পেয়েছিল। কিন্তু ওই সাফল্যবিন্দু থেকেই আন্দোলনের শুকিয়ে
যাওয়া শুরু হল। ১৩ পার্টি রাজ্য-রাজনীতিতে কোনো সংগঠিত শক্তি হিসেবে
উপস্থিত হতে পারে নি। বিপ্লবী বামপন্থা সেদিনও কোনো পথনির্দেশকারী ভুমিকা
রাখতে পারে নি। তাদের মধ্যে থেকে আন্দোলনের কেন্দ্রশক্তি হিসেবে কোনো
স্বাভাবিক নেতৃত্ব সৃষ্টি হয় নি। সংগ্রামী বামপন্থার যে ভাষ্যটিকে ন্যুনতম
রূপে হলেও সমাজে উপস্থিত করার বস্তুগত ভিত্তি এসে উপস্থিত হয়েছিল, তাকে রূপ
দেওয়ার ক্ষেত্রে বিষয়ীগত যোগ্যতার অভাব-ই প্রকট ছিল। মনে রাখা
প্রয়োজন,বাংলার শ্রমিকশ্রেণীর তখনও এক ধরনের নড়াচড়ার মধ্যে ছিল। কিন্তু
রাজনৈতিক পরিসরে তার প্রতিফলন ঘটানোর যে দায় অগ্রণী শক্তির থাকে, তা
নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে একটা অক্ষমতা কাজ করেছিল।
২০০৬ সালে সিঙ্গুর, ২০০৭-এ নন্দীগ্রাম,
২০০৯-এ লালগড়–বাংলার গণ-আন্দোলনের ইতিহাসে আবারো এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ
হিসেবে উপস্থিত হয়েছিল। এই লড়াইগুলির ব্যাপ্তি, গভীরতা, পরিসর–সবকিছুই
পূর্ববর্তী ৩০ বছরের যে কোনো সময়ের তুলনায় গুণগতভাবে আলাদা। কিন্তু এর
কোনোটিই রাজনৈতিক পরিসরে শ্রমিকশ্রেণীসহ বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মেহনতী জনগণের
মধ্যে প্রচলিত সংসদীয় ব্যবস্থাকে অতিক্রম করে যাওয়ার মতো কোনো উপাদান
সৃষ্টি করে নি। ফলে শেষপর্যন্ত এই আলোড়নগুলির পরিণতি ঘটেছে গণতান্ত্রিক
পরিসরকে পুনঃসম্প্রসারিত করার তাড়নার মধ্যেই। প্রধানত তার প্রতিফলন ঘটেছে
সংসদীয় ব্যবস্থার মধ্যে পরিবর্তনের প্রতি নানানমাত্রায় সমর্থন জানানোর
মাধ্যমে। এই পরিবর্তনে তৃণমূল কংগ্রেসের বিকল্প রাজনৈতিক কর্মসূচী বলে কোনো
কিছু ছিলই না–তো তাতে জনগণের আকর্ষিত হওয়ার কোনো প্রশ্নই থাকে না! যে
প্রশ্নটা উঠে আসে আমাদের সামনে–১৯৬৭ সালে প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকার যে
ন্যুনতম রাজনৈতিক কর্মসূচীর ভিত্তিতে গড়ে উঠেছিল, তাও কী গণআন্দোলনের
ধারাবাহিকতায় কোনো সংসদীয় বিকল্পকে খুঁজে নেওয়ার তাড়নাই ছিল না ? পরবর্তী
সংসদীয় প্রক্রিয়া কী তারই প্রতিফলন রেখে যায় নি ইতিহাসে ? বাংলার বামপন্থী
আন্দোলনের গৌরবময় অতীতকে সংসদীয় রাজনৈতিক ক্ষমতাঅর্জনের কাজে সবচেয়ে
সুচারুভাবে ব্যবহার করেছে সিপিআই(এম) দলটি। ১৯৭৭ সালে তাদের নেতৃত্বে
বামফ্রন্ট গঠন তুলনামূলক একটি স্থায়ীধরনের সংসদীয় রাজনৈতিক ঐক্যকে জনগণের
সামনে উপস্থিত করতে সক্ষম হয়েছিল। যদিও তা দাঁড়িয়েছিল অত্যন্ত দৃঢ়
সংশোধনবাদী ভিত্তির ওপর। দীর্ঘকালীন শাসক হিসেবে কংগ্রেস দলের যে
প্রাতিষ্ঠানিকতা অর্জিত হয়েছিল, তার বিপরীতে আগের বাম আন্দোলনের সমস্ত
সুফলগুলিকে এই অবস্থানটির মধ্যে দিয়ে সংহত করার এক সচেতন প্রচেষ্টা নিয়েছিল
সিপিআই(এম)। তার ফলে এই রাজনৈতিক প্রক্রিয়াটির একটি সামাজিক ভিত্তি তৈরী
হয়েছিল। সত্তরের ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময় পেরিয়ে কমিউনিস্ট বিপ্লবী শিবিরের
ব্যর্থতার ইতিহাস বাংলার বাম-মেরুকরণে যে গভীর প্রভাব ফেলেছিল, তা
বামপন্থার সপক্ষে দাঁড়ানো বাংলার অগণিত মানুষকে সমালোচনা-সহই সিপিআই(এম)-এর
পক্ষ নিতে বাধ্য করেছিল। সিপিআই(এম)-ও অত্যন্ত সুকৌশলে বন্দীমুক্তির মতো
স্পর্শকাতর বিষয়গুলিতে সদর্থক সিদ্ধান্ত নিয়ে এই পরিসরে সমর্থন আদায় করে
নিতে সক্ষম হয়েছিল।
বাংলার বামপন্থী আন্দোলনকে সংসদীয়
ক্ষমতাঅর্জনের কাজে ব্যবহার করা ও তার পরিণতিতে একটি শাসকশ্রেণীর দলে
রূপান্তরিত হওয়ার যে ইতিহাস সিপিআই(এম) সৃষ্টি করেছে, তার বিপরীতে বাংলার
কমিউনিস্ট বিপ্লবী শক্তি বিগত তিন-চার দশক জুড়ে এ রাজ্যে উপস্থিত থাকলেও
বৈপ্লবিক ধারার কোনো কার্যকরী বিকাশ-প্রক্রিয়ার জন্ম দিতে পারে নি। ১৩
পার্টির আন্দোলনের ক্ষুদ্র পরিসরের কথা আমরা আগে আলোচনা করেছি। সিঙ্গুর
আন্দোলনে যে সমস্ত কমিউনিস্ট বিপ্লবী শক্তিগুলি নানানমাত্রায় অংশ নিলেন,
তারা নিজেদের মধ্যে এই আন্দোলনের দাবি, লড়াইয়ের রূপ ও করণীয় নিয়ে ন্যুনতম
স্তরের ঐক্য অর্জন করতেও ব্যর্থ হলেন। আন্দোলনের গভীরতার নিরিখে নিজেদের
উদ্যোগের মাত্রাটি অনেকটাই শিথিল ছিল। নন্দীগ্রাম আন্দোলনের ক্ষেত্রেও
বিষয়টা একই রকমভাবে সত্যি। সিঙ্গুর আন্দোলনের সময় থেকে বিপ্লবীদের যে যৌথ
প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছিল, তাতে ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠলো যে পশ্চিমবঙ্গে
বিপ্লবী বামপন্থার মধ্যেকার বিভিন্ন শক্তির ক্ষয় ও দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি
মতাদর্শগত বিভ্রান্তি ও পারস্পরিক মতপার্থক্য ক্রমাগত বেড়েছে। গণ-আন্দোলনে
সম্মিলিত হস্তক্ষেপের ফলে সেটির অগ্রগতি এবং বিপ্লবীদের সাংগঠনিক
শক্তিবৃদ্ধির যে দ্বিবিধ লক্ষ্য সাধারণভাবে থাকে, তা কোনো কার্যকরী ঐক্যের
রূপ নিয়ে উপস্থিতই হতে পারল না। বাস্তবে যে কোনো যৌথ প্রয়াসই শেষপর্যন্ত
নিজস্ব শক্তিকে জাহির করার এবং অন্তহীন বিতর্ক-বিবাদের এক আবর্তে প্রবেশ
করে যাচ্ছে।
২০০৬ সালে সিঙ্গুর আন্দোলনের
পরিপ্রেক্ষিতে বিপ্লবী সংগঠনগুলির ঐক্যবদ্ধ কার্যক্রমের প্রয়াস অসফল হওয়ার
পর ২০০৭ সালে আরও সুনির্দিষ্ট ভিত্তিতে রাজ্যস্তরে বৃহত্তররূপে ‘সংগ্রামী
বামপন্থী’দের ঐক্যবদ্ধ করার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়, ২০০৮ পর্যন্ত লাগাতার
প্রচেষ্টার পর তা কেবলমাত্র ২০০৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে ৪টি সংগ্রামী
বাম সংগঠনের যৌথ বিবৃতিদানের মধ্যে সীমায়িত থাকে। এরপরেও পশ্চিমবঙ্গে লালগড়
আন্দোলনের সমর্থনে, বন্দীমুক্তির প্রশ্নে, ইউএপিএ বিরোধিতার প্রশ্নে এবং
ইস্যুভিত্তিক অগণিত প্রশ্নে যুক্ত-আন্দোলন হয়েছে বা যুক্তমঞ্চ গড়ে উঠেছে।
আজ অবধি এই প্রচেষ্টা জারি আছে। কিন্তু বিগত বছরগুলির অভিজ্ঞতা এই সত্যকে
সামনে এনে দিয়েছে যে বিপ্লবী শক্তিগুলির মধ্যে বহু বিষয়ে মতৈক্য থাকলেও
বর্তমান বাস্তবতাকে বোঝা ও গণআন্দোলন বিকাশের নীতি ও কৌশল নিরূপণের
ব্যাপারে এমন গভীর দৃষ্টিভঙ্গীগত ভিন্নতা রয়েছে যা গুরুতর প্রতিবন্ধকতা
সৃষ্টি করেছে। পশ্চিমবাংলার বিশেষ পরিস্থিতিতে স্থায়ীরূপের কার্যকরী ধরনের
যুক্তমঞ্চ গড়তে গেলে গণ-আন্দোলন বিকাশের বর্তমান গতিপথ নিয়ে এক দৃঢ় ঐক্যের
ভিত্তি চাই। ধীরে ধীরে এই সত্য আজ ক্রমশ প্রকট হয়ে উঠেছে যে আজকের
পরিস্থিতিতে সকল বিপ্লবী বামেদের যৌথ প্রক্রিয়া নয়, বরং যারা পশ্চিমবাংলার
রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির স্বরূপ ও এ রাজ্যে গণ-আন্দোলন বিকাশের আশু
পদক্ষেপগুলির বিষয়ে এক ন্যূনতম মতৈক্য অর্জন করতে পারবে তাদের মধ্যে
সংগ্রামী বামঐক্য গড়ে তোলাই সময়ের দাবি।
অতএব
আজ শ্রমজীবী জনগণ যদি সত্যি সত্যিই এই
নয়া-উদারবাদের প্রতি, এমনকী গোটা পুঁজিবাদী ব্যবস্থা-টার প্রতি বিরূপ হয়ে
ওঠেন(যার বস্তুগত সম্ভাবনা জথথেষ্ট পরিমাণে সমাজে উপস্থিত রয়েছে), তাহলে
তাদের সামনে বিকল্প-টা কী ? আমরা অবশ্যই বলব-সমাজতন্ত্র। কিন্তু অগণিত
উত্থানপতনের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার পর আজ রুশবিপ্লব ঘটে যাওয়ার ১০০ বছর বাদে
বর্তমান প্রজন্মের শ্রমজীবীরা অবশ্যই ভেবে দেখতে চাইবেন যে তা আদৌ সম্ভব কি
না। ‘রাশিয়া ও চীনে যে প্রমাণ হয়ে গেছে সমাজতন্ত্র সম্ভব
নয়’–সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাস শ্রমজীবী জনতার কাছে এইভাবেই পৌঁছেছে।
আজ যদি আমরা তাকে বোঝাতেও সক্ষম হই যে রাশিয়া আর চীনের অভিজ্ঞতায় তেমন
কিছুই প্রমাণ হয় নি, তখন পরের প্রশ্ন-টা আসবে। আচ্ছা সত্যিই কি আগের থেকেও
ভালো কিছু, উন্নত কিছু সম্ভব ? এর উত্তরে আমরা আবারও যুক্তি-তথ্য দিয়ে
বোঝাব-হ্যাঁ, সম্ভব। কিন্তু তারও পরের প্রশ্ন হলো–আজ সেটা কীভাবে সম্ভব আর
কারাই বা তা সম্ভব করে তুলতে পারে ? কারাই বা নেতৃত্ব দেবে আগামী এই
পরিবর্তনে আর কীভাবে ? এখানে এসে ব্যাপারটা থমকে দাঁড়াচ্ছে। দেশে দেশে
মানুষের সংগ্রাম থেকেই যে অগ্রণীরা তৈরি হয়, শেখে এবং শেখায়, এগোয় এবং
এগিয়ে নিয়ে যায়–এই সত্যটা শ্রমজীবীরা তো বটেই, এমনকী অনেক সময় বিপ্লবীরাও
ভুলে যান। পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে খারিজ করে দেওয়ার প্রধান প্রবণতাটি সেই
সমাজের চলার পথে আপন নিয়মে তৈরি হয়। কমিউনিস্টদের কাজ হল সেই যাত্রাপথকে
সুগম করা। আজ সারা দুনিয়া জুড়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পর্বের সবচেয়ে
জোরালো বিক্ষোভ-প্রতিবাদ ধ্বনিত হচ্ছে। কিন্তু কোথাও কমিউনিস্টদের কন্ঠস্বর
শোনা যাচ্ছে না। কমিউনিস্টরা শক্তিশালী হয়ে উঠছেন তেমনও শোনা যাচ্ছে না।
কেন? রাস্তা সুগম করার দায়িত্ব যারা স্বেচ্ছায় কাঁধে নেন, প্রতিবাদী মানুষ
তাদের চাইছে না কেন? আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের এক গভীরতম
পর্যালোচনার মধ্যে দিয়ে এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা আজ বড় জরুরি হয়ে উঠেছে।
আরো জরুরি হয়ে উঠেছে সেই উত্তরের নির্যাস নিয়ে কমিউনিস্ট বিপ্লবী
মর্মবস্তুর অনুশীলনকে সময়োপযোগী করে তোলা। সময় যখন আসছে তখন যদি আন্দোলনের
স্লোগান বা পদ্ধতি কমিউনিস্টদের সব অচেনা লাগে, এগোবার রাস্তাটাই খুঁজে
পাওয়া মুশকিল হবে। এই জটিল ধাঁধার জবাব খুঁজতে না পারলে আজকের সময়ের কোনো
অঙ্কই যে মিলবে না।
বাংলার গণ-আন্দোলন আজ এক নতুন আরম্ভের
ইঙ্গিত অবশ্যই দিচ্ছে। হয়ত সারা দুনিয়ার প্রতিবাদের সাথে তাল মিলিয়ে তা আরও
সোচ্চারও হয়ে উঠবে। যাদবপুরের সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে
ছাত্রসমাজের যে কলরব ধ্বনিত হল কলকাতার রাজপথে, তার মধ্যে বাংলার নতুন বাম
আন্দোলনের কন্ঠস্বর আছে। সিঙ্গুর থেকে যাদবপুর, রেশন বিদ্রোহ থেকে
কামদুনি—গণআন্দোলনের যে বহুমাত্রিকতা নিয়ে গত এক দশকের বাংলা নতুন করে
আলোড়িত হচ্ছে ছোট-বড় নানান মাত্রায়, তার পদধ্বনি তো অগ্রণীদের আগাম শুনতে
পেতেই হবে। কিন্তু সাচ্চা কমিউনিস্টরাও যদি ভাবেন যে তাদের ‘তৈরি করে দেওয়া
পথে চলার’ জন্য বাংলার নতুন প্রজন্মের ছাত্রছাত্রীরা অথবা শ্রমজীবী জনতা
ঘরে ঘরে তৈরি হচ্ছে, তবে তা মারাত্মক ভুল হবে। তারা যদি ভাবেন যে আগের
শতাব্দীর কমিউনিস্ট আন্দোলনগুলি থেকে তাদের তৈরি হওয়া উপলব্ধিগুলোর সাথে
এবার নতুন প্রজন্মের শ্রমিকশ্রেণী একাত্ম হতে শুরু করে দেবে, তবে সম্ভবত
শুধু নিরাশাই জুটবে। শুধু আগের শতাব্দীর পাঠ নেওয়ায় নয়, আজকের সময়ের
পুঙ্খানুপুঙ্খ পাঠ নিতেও আজ কমিউনিস্টদের মনযোগী ছাত্র হতে হবে।
No comments