ইরানে সরকার পরিবর্তন হলে কী ঘটতে পারে
ইরানে একটি সংকটময় মুহূর্ত আসন্ন বলে মনে হচ্ছে। এর প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে পড়তে পারে। তেহরানে কোনো বিপ্লব বা সরকার পরিবর্তনের সম্ভাব্য পরিণতি কেমন হতে পারে, ১৯৭৯ সালের বিপ্লব থেকে তার কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সেই বিপ্লবের মধ্যে ইসলামপন্থীরা ক্ষমতায় এসেছিলেন।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ও তাঁর দল ওমানে এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনা শুরু করেছেন। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, দুই পক্ষের মধ্যে ফাঁক এত বড় যে তা পূরণ করা কঠিন এবং সংঘাত অনিবার্য।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এরই মধ্যে একাধিকবার ইরানে হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছেন। গত সপ্তাহান্তে তিনি আবার বলেছেন, ইরানে সরকার পরিবর্তনই ‘সবচেয়ে ভালো ঘটনা হতে পারে’। পরিস্থিতি ক্রমে উত্তপ্ত হচ্ছে এবং ঝুঁকি বাড়ছে।
১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর যারা ক্ষমতায় এসেছে, এখন ইরানের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ ঝুঁকিতে। সরকার পরিবর্তনই যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য বলে মনে হচ্ছে। বাস্তবে এটি ইতিমধ্যে শুরু হয়ে থাকতে পারে।
ইরানে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বড় ধরনের বিক্ষোভ হয়েছে, যা দেশটিতে ১৯৮০-এর দশকের পর সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ। এবারের বিক্ষোভে দেশটির মাশহাদ থেকে আবাদান পর্যন্ত নানা শহরের রাস্তায় হাজার হাজার মানুষ নেমে আসেন।
এমন দৃশ্য অনেককে ইরানের শাহর শেষ দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। তখন লাখ লাখ মানুষ সড়কে নেমে এসেছিলেন। আমরা যখন চলতি ঘটনাগুলোর সাক্ষী হচ্ছি, তখন বর্তমান ও অতীতের পরিস্থিতির মধ্যে তীব্র সাদৃশ্য দেখা যাচ্ছে, যা আমাদের ভবিষ্যতে কী হতে পারে এবং আশা-ভয় নিয়ে আলোচনা করতে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিচ্ছে।
একটি স্পষ্ট মিল হলো, উভয় বিক্ষোভে অর্থনীতি কেন্দ্রীয় ভূমিকায়। সাম্প্রতিক প্রতিবাদের মূল বিষয় ছিল ক্রমে ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতি। প্রায় ৫০ বছর আগে পরিস্থিতি আজকের মতো প্রায় একই ছিল। ১৯৭৭ সালে নিত্যপণ্যের দাম ২৭ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছিল।
এবারের মতো তখনো তেহরানের বাজারের দোকানদার ও ব্যবসায়ীরাই প্রথমে বিক্ষোভ শুরু করেছিলেন। কারণ, এবারের মতো তখনো তাঁদের জীবিকা হুমকির মুখে পড়েছিল।
দ্বিতীয় একটি মিল ধীরে ধীরে সামনে আসছে। তা হলো নিপীড়ন, শোক ও প্রতিবাদ চক্রের মধ্যকার মিল। এই চক্রই শাহকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল। ১৯৭৮ সালে ইরানের রক্ষণশীল একটি সংবাদপত্রে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনিকে নিয়ে একটি কুৎসামূলক প্রতিবেদন প্রকাশের জেরে বিক্ষোভ শুরু হয়। খোমেনির অনুগামীরা ব্যাপকভাবে বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন।
পবিত্র শহর কোমে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের শত শত শিক্ষার্থী রাস্তায় নেমে আসেন। তাঁরা শাহর চাপিয়ে দেওয়া আধুনিকীকরণ প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছিলেন। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরাসরি গুলি চালান এবং ছয়জন শিক্ষার্থী নিহত হন। এতে রাজধানী তেহরান আরও অশান্ত হয়ে ওঠে।
এসব প্রতিবাদ হয়তো দ্রুত থেমে যেত, কিন্তু তা হয়নি। কারণ হিসেবে ইরানের সংখ্যাগরিষ্ঠ শিয়া মুসলিমদের মধ্যে প্রচলিত একটি রীতির কথা বলা হয়ে থাকে। শিয়া মুসলিমরা কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে চূড়ান্তভাবে স্মরণ করার আগে সাধারণত ৪০ দিনের শোক পালন করেন।
প্রয়াত প্রখ্যাত পোলিশ সাংবাদিক রিশার্ড কাপুশিনস্কি ইরানের ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পূর্ববর্তী সহিংসতার গভীর বর্ণনা দিয়েছেন। ইরানে মৃত ব্যক্তির বাড়ির দৃশ্যের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি লিখেছিলেন, প্রয়াত ব্যক্তির ঘরে পরিবারের সদস্য, বন্ধু, প্রতিবেশী এবং পরিচিতদের পাশাপাশি ‘পুরো রাস্তা, পুরো গ্রাম এবং মানুষের ভিড়’ জমে যায়।
কাপুশিনস্কি লিখেছেন, ‘কারও মৃত্যু যদি স্বাভাবিক হয়...তবে এই জমায়েত প্রথমে কয়েক ঘণ্টার তীব্র আবেগ ও করুণ আর্তনাদের মধ্য দিয়ে কাটে। এরপর ধীরে ধীরে মানুষের মন একধরনের নিস্তেজ, বিষণ্ন ও শান্ত অবস্থায় চলে যায়।’ কিন্তু ‘কোনো ব্যক্তির মৃত্যু যদি সহিংস উপায়ে হয়, তাহলে মানুষের মনে প্রতিশোধের নেশা চেপে বসে। তখন তাঁরা যাকে তাঁদের এ শোকের মূল হোতা বলে মনে করেন, সেই খুনির নাম উচ্চারণ করেন। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, সেই খুনি যদি অনেক দূরেও থাকে, তারপরও মানুষের এই নাম উচ্চারণের মুহূর্তে সে শিউরে উঠবে। কারণ তার আয়ু ফুরিয়ে এসেছে।’
১৯৭৮ সালের জানুয়ারিতে কোম শহরে বিক্ষোভের ঠিক ৪০ দিন পর নতুন করে বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল। এতে নতুন করে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছিল। এর ফলে শোকসভা ও শোকমিছিলের যে ধারা তৈরি হয়েছিল, তা অনিবার্যভাবে নতুন গণবিক্ষোভে রূপ নিয়েছিল।
জবাবে সরকার আরও বেশি প্রাণঘাতী দমন-পীড়ন চালাতে থাকে। শোক আর প্রতিবাদের চক্রটি ক্রমে তীব্রতর হতে থাকে। অবশেষে ১৯৭৯ সালের জানুয়ারিতে জনগণের ‘সব শোকের হোতা’ সেই শাহ ইরান ছেড়ে পালিয়ে যান। বলা হয়েছিল, তিনি ছুটিতে যাচ্ছেন, কিন্তু এরপর তিনি আর কোনো দিন ফিরে আসেননি।
প্রতিবাদের সেই চক্র আবারও ফিরে আসতে পারে। গত বৃহস্পতিবার ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারের ব্যবসায়ীরা জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে ৪০ দিনের শোক পালন শেষে দেশজুড়ে তাঁদের সহকর্মীদের রাজপথে নামার আহ্বান জানিয়েছেন।
বাজারকর্মীদের একটি বাণিজ্য সংগঠনের টেলিগ্রাম চ্যানেলের বরাতে প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, ‘একই সঙ্গে সব শহরে নিহত ব্যক্তিদের স্মৃতি অম্লান রাখা এবং জাতীয় গণ-অভ্যুত্থান অব্যাহত রাখা’ এই বিক্ষোভের লক্ষ্য। দেশটির ‘সমসাময়িক রাজপথে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নেওয়াই’ তাদের বিক্ষোভের উদ্দেশ্য।
আলোচনা ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলার হুমকির চেয়েও এই পরিস্থিতি (ব্যাপক বিক্ষোভের শঙ্কা) বর্তমান শাসকদের জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিতে পারে। ইরানের প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ আলী আনসারি মতে, ১৯৭৮ সালে শাহবিরোধী আন্দোলনে প্রায় ২ হাজার ৮০০ জন নিহত হয়েছিলেন।
অথচ অনেকের ধারণা, কেবল গত জানুয়ারিতেই প্রায় ৩০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। এর অর্থ হলো, সামনের সপ্তাহগুলোতে শোকাতুর মানুষের বিশাল জমায়েত এবং একের পর এক ‘চল্লিশা’ বা ৪০ দিনের শোক পালনের দীর্ঘ মিছিল দেখা যাবে।
১৯৭৮ সালে রিশার্ড কাপুশিনস্কিসহ কয়েক শ আন্তর্জাতিক সংবাদকর্মী ও আলোকচিত্রী ইরানে সশরীর উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তেমন কোনো উপস্থিতি নেই। উপরন্তু দেশটির সরকার ইন্টারনেটের ওপর বিধিনিষেধ অব্যাহত রেখেছে। ফলে গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে ইরানের রাজপথে ঠিক কারা নেমেছিলেন, তা সুনির্দিষ্টভাবে বলা কঠিন হয়ে পড়েছে।
তবে অস্থিরতা যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং তা যে গভীর ক্ষোভ ও বিচ্ছিন্নতাবোধের এক স্বতঃস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশ ছিল, তা স্পষ্ট। কিন্তু এখন পর্যন্ত নিহতের যে বিয়োগান্ত জীবনকাহিনি উঠে এসেছে, তা থেকে স্বাধীনতার জন্য জীবন বা অঙ্গহানির ঝুঁকি নেওয়া সেই ব্যক্তিদের প্রকৃত পরিচয়ের মাত্র একটি খণ্ডিতচিত্র পাওয়া যাচ্ছে।
আমরা জানি, ইরানের ১৯৭৮ সালের বিপ্লবী আন্দোলনটি একটি বৃহৎ মোর্চা আকারে হয়েছিল। এতে খোমেনির অনুসারী ইসলামপন্থীরা যেমন ছিলেন, তেমনি ছিলেন লাখ লাখ দরিদ্র ও স্বল্পশিক্ষিত ইরানি, যাঁরা নির্বাসিত আয়াতুল্লাহকে (কখনো কখনো আক্ষরিক অর্থেই) তাঁদের যাবতীয় প্রার্থনার জবাব বলে ধরে নিয়েছিলেন।
তবে ওই আন্দোলনে আরও অনেকে ছিলেন, যাঁরা শাহর পতন নিশ্চিত করার লড়াইয়ে সমপরিমাণ কঠোর পরিশ্রম করেছিলেন এবং চরম আত্মত্যাগ স্বীকার করেছিলেন।
১৯৭৮ ও ১৯৭৯ সালে ইরানের রাজপথে সম্ভাব্য সব আদর্শের উদারপন্থী ও জাতীয়তাবাদীরা ছিলেন। সমাজতান্ত্রিক ও নারীবাদী, মধ্যপন্থী আলেম ও তাঁদের শিক্ষার্থী—এমনকি পুরোনো ঘরানার কিছু কমিউনিস্ট শাহবিরোধী আন্দোলনে ছিলেন। দেশটির জাতিগত, ভাষাগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিরাও এ আন্দোলনে শামিল ছিলেন। এই বৈচিত্র্যের সুবিধার পাশাপাশি কিছু অসুবিধাও ছিল। কাপুশিনস্কি যেমনটি লিখেছিলেন, ‘প্রত্যেকে শাহর বিরোধিতা করেছিলেন এবং তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ভবিষ্যৎ সম্পর্কে প্রত্যেকের কল্পনা ছিল ভিন্ন ভিন্ন।’
বর্তমান শাসনব্যবস্থার পতন হলে নতুন দিকনির্দেশনা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট না–ও হতে পারে। কারণ, মনে রাখা প্রয়োজন, খোমেনি দেশে ফেরার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষমতা দখল করেননি। ইরাকের সঙ্গে যুদ্ধ, নতুন প্রতিষ্ঠান, নতুন সংবিধান এবং ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) ও বাসিজের মতো নতুন নিরাপত্তা বাহিনী গড়ে তোলার মাধ্যমে তাঁর শাসনকে পুরোপুরি সুরক্ষিত করতে বেশ কয়েক বছর সময় লেগেছিল।
ইরানের প্রতিটি সম্ভাব্য প্রতিপক্ষকে পদ্ধতিগতভাবে ধ্বংস করতে ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৮ সালের মধ্যে এই বাহিনীগুলোকে ব্যবহার করা হয়েছিল। এমনকি সাম্প্রতিক বিক্ষোভ দমনেও এই বাহিনীগুলো ছিল শাসকদের প্রধান অস্ত্র।
আজকের ইরানে যাঁরা তাঁদের শাসকদের পতন চাইছেন, সেই সব সাহসী নারী-পুরুষের জন্য এখানে একটি শিক্ষা রয়েছে। তখনকার মতো এখনো তাঁদের বিজয় কেবল কোটি মানুষের গণ–অভ্যুত্থান এবং একটি বৃহৎ মোর্চা গঠনের মাধ্যমে সম্ভব হতে পারে।
তবে সবার লক্ষ্য এক হলেও ১৯৭৯ সালে শাহর পতন ঘটানো সেই আন্দোলনকারীদের মতো আজও ইরানের ভবিষ্যৎ নিয়ে একেকজনের স্বপ্ন একেক রকম হবে। সে সময় জনগণের এই চরম বৈচিত্র্যই শেষ পর্যন্ত দুর্বলতায় পরিণত হয়েছিল। যার সুযোগ নিয়ে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী অন্যদের ওপর নিজেদের একনায়কতন্ত্র ও কট্টরপন্থী আদর্শ চাপিয়ে দিয়েছিল।
তাই বলতে হয়, বর্তমান শাসনের পতন হতে পারে ঠিকই; কিন্তু তেমনটা ঘটলে এর ভবিষ্যৎ কী হবে, তা ৪৭ বছর আগের সেই টালমাটাল সময়ের মতো অনিশ্চিত। জনগণ হয়তো জয়ী হবে; কিন্তু তখন তারা দেখবে, মুক্তি, সমৃদ্ধি আর নিরাপত্তার আসল লড়াইটা আসলে কেবল শুরু হয়েছে।
![]() |
| ইসলামি বিপ্লবের ৪৭তম বার্ষিকী উপলক্ষে প্রদর্শনীতে রাখা একটি ক্ষেপণাস্ত্রের পাশে সাধারণ মানুষের ভিড়। ইরানের রাজধানী তেহরানে, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ছবি: রয়টার্স |

No comments