পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান?

ইরানে পুনরায় শুরু হওয়া সামরিক অভিযানে শুক্রবার (১৭ জুলাই) আরও একধাপ এগিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এদিন ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে সেতু ও বিমানবন্দর লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। এর জবাবে ইরানও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পরিমাণ বাড়িয়েছে।

এদিকে পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের সংযোগস্থল হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ এই প্রণালিতে একটি তেলবাহী জাহাজে মার্কিন মেরিন সদস্যরা অভিযান চালিয়ে জাহাজে উঠেছে। একই সময়ে ওমান উপকূলের কাছে আরেকটি ট্যাংকারে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে বলে খবর পাওয়া গেছে।

গত সপ্তাহে যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় পক্ষই সীমিত মাত্রায় হামলা চালিয়ে সংঘাতের পরিধি পরীক্ষা করছে। এতে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ পুনরায় শুরু হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। তবে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি হামলার তীব্রতা ক্রমেই বাড়ছে।

ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর ব্যাপক বিমান হামলার হুমকি দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি ইরানের উপকূল বা দ্বীপাঞ্চলে স্থল অভিযান চালানোর সম্ভাবনাও নাকচ করেননি।
মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দক্ষিণ ইরানে চলমান হামলার একটি উদ্দেশ্য হলো প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সামনে বিভিন্ন সামরিক বিকল্প খোলা রাখা।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এমন পদক্ষেপ ইরানকে আরও বড় ধরনের পাল্টা হামলায় উৎসাহিত করতে পারে। এর মধ্যে প্রতিবেশী দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলা কিংবা ইয়েমেনে ইরান সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের মাধ্যমে লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করার আশঙ্কাও রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) সর্বশেষ অভিযানে ইরানের “সামরিক লজিস্টিক অবকাঠামো” লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার কথা জানিয়েছে। গত এক সপ্তাহেরও বেশি সময়ের মধ্যে এই প্রথম তারা ইরানের অবকাঠামোকে হামলার লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করল।

প্রাথমিকভাবে হামলাগুলো ইরানের দক্ষিণ উপকূলীয় এলাকায় সীমাবদ্ধ ছিল, যেখানে গত কয়েক দিন ধরেই ব্যাপক বিমান হামলা চলছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, দক্ষিণাঞ্চলে অন্তত পাঁচটি সেতুতে হামলা হয়েছে। দক্ষিণের বন্দরনগরী বান্দার খামিরে সেতুতে হামলায় সাতজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। একই হামলায় শহরের রেলস্টেশনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এছাড়া পাকিস্তান সীমান্তসংলগ্ন ইরানশাহর শহরের একটি বিমানবন্দরেও হামলার খবর প্রকাশ করেছে ইরানি গণমাধ্যম। পাশাপাশি ইরানের বান্দার আব্বাস বন্দরে পৃথক হামলায় এক নারী নিহত এবং তার শিশু আহত হওয়ার খবরও পাওয়া গেছে।

কুয়েত, বাহরাইন ও ওমানে হামলা
ইরান দাবি করেছে, তারা কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং ওমানে একটি মার্কিন রাডার স্টেশনে হামলা চালিয়েছে।
কাতারের রাজধানী দোহাতেও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিস্ফোরণে ছিটকে আসা ধাতব টুকরায় (শ্র্যাপনেল) এক শিশু আহত হয়েছে।
ইরান আরও দাবি করেছে, যুদ্ধ শুরুর পর এই প্রথম তারা সিরিয়ার আল-তানফ এলাকায় হামলা চালিয়েছে, যেখানে তাদের ভাষ্য অনুযায়ী একটি মার্কিন বিশেষ বাহিনীর ঘাঁটি ছিল।
তবে সিরিয়া জানিয়েছে, চলতি বছরের শুরুতেই যুক্তরাষ্ট্র ওই ঘাঁটি খালি করে দিয়েছে। সিরিয়ার এক সামরিক সূত্র জানায়, হামলাটি ঘাঁটির কাছাকাছি আঘাত হানলেও কোনো ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।

হরমুজ প্রণালি নিয়ে নতুন সংঘাত
গত ৭ জুলাই ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলা চালানোর পর যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা বিমান হামলা শুরু করে। এর ফলে যুদ্ধবিরতির অন্তর্বর্তী চুক্তি কার্যত ভেঙে পড়ে।
এরপর থেকে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে। এর প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৮৫ ডলারে পৌঁছেছে।
ইতিমধ্যে ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নিজেদের অবরোধ পুনর্বহাল করেছে।
সর্বশেষ মার্কিন সামরিক বাহিনী জানায়, অবরোধ কার্যকর করতে তারা ‘ওয়েন ইয়াও’ নামের একটি তেলবাহী জাহাজে অভিযান চালিয়ে নিয়ন্ত্রণ নেয়।

এ সময় প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, মার্কিন মেরিন সদস্যরা হেলিকপ্টার থেকে দড়ি বেয়ে জাহাজে নামছেন এবং একজন সেনা ইরানের পতাকার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন।
অন্যদিকে বৃটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও জানিয়েছে, ওমান উপকূলের কাছে বৃহস্পতিবার (১৭ জুলাই) একটি ট্যাংকার হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বড় সংঘাতের শঙ্কা
যদিও উভয় পক্ষ প্রতিদিন পাল্টাপাল্টি হামলা চালাচ্ছে, তবুও এখন পর্যন্ত তারা এমন মাত্রায় সংঘাত বাড়ায়নি। কারণ, উভয় পক্ষই বড় ধরনের প্রতিশোধমূলক হামলার ঝুঁকি বিবেচনায় রাখছে।
ইরান আগেই সতর্ক করে দিয়েছে, ট্রাম্প যদি ইরানের অবকাঠামোতে ব্যাপক হামলার হুমকি বাস্তবায়ন করেন, তাহলে তারা মধ্যপ্রাচজুড়ে বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালাবে।
দেশটি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, অবকাঠামোতে হামলা হলে মধ্যপ্রাচ্যের সব গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেয়া হবে।
তবে এরই মধ্যে ইরানের অবকাঠামোতে হামলা শুরু করেছে মার্কিন বাহিনী। এখন দেখার বিষয়, ইরান কি পদক্ষেপ নিচ্ছে।
এছাড়া তেহরান ইঙ্গিত দিয়েছে, তারা ইয়েমেনের মিত্র হুতি গোষ্ঠীকে বাব আল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ করার নির্দেশ দিতে পারে।
লোহিত সাগরের এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথও বন্ধ হয়ে গেলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ আরও বড় সংকটে পড়তে পারে। এদিকে বৃহস্পতিবার রাতে টেলিভিশনে দেয়া এক ভাষণে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন,
ইরানে আমরা বড় ধরনের সাফল্য অর্জন করছি। খুব শিগগিরই আপনারা সেই প্রচেষ্টার ফল দেখতে পাবেন। 

ইরানের দক্ষিণাঞ্চল বিচ্ছিন্নে প্রস্তুতি, স্থল অভিযানের ইঙ্গিত যুক্তরাষ্ট্রের