যে ৭ কারণে ইরান যুদ্ধে জয়ের ঘোষণা দিতে পারছেন না ট্রাম্প
ট্রাম্প
এখনো তার পূর্বসূরি লিন্ডন জনসন বা জর্জ ডব্লিউ বুশের মতো সেই ভয়াবহ
পরিস্থিতির মুখোমুখি হননি, যারা পরাজয় নিশ্চিত জেনেও যুদ্ধ দীর্ঘায়িত
করেছিলেন। কিন্তু চারপাশের পরিস্থিতি দেখে বোঝা যাচ্ছে যে, সামনে তেমনই
কোনো বড় বিপদ আসছে।
সিএনএনের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক স্টিভেন কলিনসনের
বিশ্লেষণে উঠে এসেছে অন্তত সাতটি বড় কারণ, যার জন্য ট্রাম্প ইরানে যুদ্ধ
জয়ের দাবি করতে পারছেন না।
১. হরমুজ প্রণালির গোলকধাঁধা
হরমুজ
প্রণালি বিশ্বের তেল রপ্তানির প্রধান ধমনি, যা ইরান কার্যত বন্ধ করে
দিয়েছে। ট্রাম্পের বিশাল সামরিক আধিপত্য থাকা সত্ত্বেও স্রেফ শক্তি প্রয়োগ
করে এই পথ সচল করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
অবসরপ্রাপ্ত নেভি ক্যাপ্টেন
লরেন্স ব্রেনানের মতে, ‘হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করতে না পারলে আপনি বিজয়
দাবি করতে পারেন না। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য এটি পুনরায় খুলে দেওয়া
বর্তমান পরিস্থিতিতে অত্যন্ত কঠিন, যদি না অসম্ভব হয়।’
‘প্রেসিডেন্টের
আশাবাদকে আমি সম্মান জানাই... কিন্তু প্রথম এক বা দুই দিন পরই বিজয় ঘোষণা
করা মোটেও সঠিক কাজ নয়। এটি আমাদের ধারণার চেয়েও দীর্ঘ সময় ধরে চলবে’ বলেন
তিনি। সস্তা ড্রোন ও মিসাইল দিয়ে ইরান এই পথ বন্ধ রাখায় বিশ্ববাজারে তেলের
দাম আকাশচুম্বী হচ্ছে, যা ট্রাম্পের জন্য এক বড় সামরিক ও অর্থনৈতিক ধাঁধা
তৈরি করেছে।
২. ইরানি বর্তমান শাসনের স্থায়িত্ব
মার্কিন
হামলায় আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হলেও ট্রাম্পের প্রত্যাশা অনুযায়ী
ইরানি শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি। খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনি দায়িত্ব গ্রহণ
করায় শাসনের ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে। ডেমোক্র্যাটদের মতে, নতুন এই নেতৃত্ব
আগের চেয়েও বেশি কট্টরপন্থি হতে পারে, যা অপারেশন ‘এপিক ফিউরি’-র কৌশলগত
সাফল্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
৩. ইসরায়েলের ভিন্ন কৌশল
যুদ্ধ
কখন শেষ হবে, তা এখন আর এককভাবে ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণে নেই। ট্রাম্প যদি
রাজনৈতিক কারণে যুদ্ধ শেষ করতেও চান, ইসরায়েল তা মানবে কি না তার নিশ্চয়তা
নেই। ইসরায়েলের কৌশলগত লক্ষ্য আমেরিকার চেয়ে ভিন্ন। ইসরায়েল ইরানের তেল
অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের ইঙ্গিত দেয়। ট্রাম্প
যুদ্ধ শেষ করতে চাইলেও ইসরায়েল তাতে রাজি না-ও হতে পারে। যুদ্ধ বন্ধে
ট্রাম্পের ‘যৌথ সিদ্ধান্তের’ মন্তব্য অনেকের মনে এই উদ্বেগ জাগিয়েছে যে,
মার্কিন সামরিক সিদ্ধান্তে একটি বিদেশি রাষ্ট্রের অন্যায্য প্রভাব রয়েছে।
৪. যুদ্ধের স্পষ্ট লক্ষ্যের অভাব
এই
যুদ্ধের কোনো সুনির্দিষ্ট বিজয়গাথা নেই। হোয়াইট হাউস কখনো বলছে লক্ষ্য
পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা, কখনো ইঙ্গিত দিচ্ছে শাসনব্যবস্থা
পরিবর্তনের। লক্ষ্য স্থির না থাকায় ঠিক কোন পর্যায়ে পৌঁছালে একে ‘বিজয়’ বলা
যাবে, তা নিয়ে খোদ প্রশাসনের ভেতরেই অস্পষ্টতা ও বৈপরীত্য রয়েছে।
৫. পারমাণবিক কর্মসূচির অমীমাংসিত প্রশ্ন
ট্রাম্প
দাবি করেছেন, তিনি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ‘গুঁড়িয়ে’ দিয়েছেন। কিন্তু
জাতিসংঘের পরমাণু সংস্থার (আইএইএ) মতে, ইসফাহান কেন্দ্রে এখনো প্রায় ২০০
কেজি উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত থাকতে পারে। এই মজুত নির্মূল না
হওয়া পর্যন্ত ওয়াশিংটন কখনোই নিশ্চিত হতে পারবে না যে, ইরান ভবিষ্যতে আবার
পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জন করবে না।
৬. ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে স্থবিরতা
ট্রাম্প
আশা করেছিলেন যুদ্ধের ধাক্কায় ইরানি জনগণ বর্তমান শাসনের বিরুদ্ধে
গণঅভ্যুত্থান ঘটাবে। কিন্তু বাস্তবে তেমন কোনো বড় বিদ্রোহ দেখা যায়নি।
উল্টো অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, বিদেশি আগ্রাসনের মুখে সরকারের অবস্থান আরও
সংহত হতে পারে এবং যুদ্ধ শেষে ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর আরও কঠোর দমন-পীড়ন
নেমে আসতে পারে।
৭. যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপ
যুদ্ধের
প্রভাবে আমেরিকায় তেলের দাম বৃদ্ধি এবং সম্প্রতি ভার্জিনিয়া ও মিশিগানে
সহিংসতার ঘটনাগুলো অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা বাড়িয়ে তুলছে। মার্কিন সেনাদের
মৃত্যু এবং জীবনযাত্রার খরচ বেড়ে যাওয়ায় ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি
হচ্ছে। নির্বাচন ঘনিয়ে এলে এই পরিস্থিতি ট্রাম্পের জন্য বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি
হয়ে দাঁড়াবে।
পরিশেষে, ১৯৪৫ সালে নাৎসি জার্মানি বা জাপানের
বিরুদ্ধে জয়ের মতো পরিষ্কার বিজয় এখনকার যুদ্ধে বিরল। ট্রাম্প এখন নিজের
বেছে নেওয়া যুদ্ধের অনিবার্য পরিণতির মুখোমুখি। সামরিক শক্তি কমে যাওয়া এবং
দুর্বল প্রতিপক্ষ ধৈর্য ও সহনশীলতার পরীক্ষায় জয়ী হওয়ার আগেই তাকে একটি
‘জয়’ নিয়ে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজতে হবে।
![]() |
| ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় তেল ইসরায়েলের তেল আবিবসহ অন্তত ৩টি শহর কেঁপে উঠেছে। সংঘাতের ১৬তম দিন রোববার (১৫ মার্চ) ইহুদিবাদী ভূখণ্ডটি লক্ষ্য করে ব্যাপক হামলার দাবি করেছে ইরান। |

No comments