‘গ্রেটার ইসরায়েলের’ স্বপ্ন যেভাবে ট্রাম্প–নেতানিয়াহুর জন্য বুমেরাং হলো by জেফ্রি ডি স্যাক্স ও সিবিল ফারেস

১৪ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধ শেষ করার লক্ষ্যে একটি কাঠামোগত সমঝোতায় পৌঁছায়। হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার কথা বলা হয়। লেবাননে বোমাবর্ষণ বন্ধের ঘোষণা আসে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—হত্যা, সহিংসতা থামানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।

শত দিনেরও বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। এর মধ্যে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বও রয়েছেন। বিশ্ব অর্থনীতিকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেওয়া এই সংঘাতের পর এমন একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিও যেন অন্ধকার শেষে ভোরের প্রথম আলো।

এই পরিস্থিতিকে স্বাগত জানানো জরুরি। কিন্তু একই সঙ্গে বোঝাও জরুরি—এই যুদ্ধ কেন হলো, এবং এর আগের একের পর এক যুদ্ধের পেছনে কী কারণ কাজ করেছে। এই সব সংঘাতের মূল উৎস হলো একটি ধারণা। সেই ধারণাটি হলো—‘গ্রেটার ইসরায়েল’।

এটি ইসরায়েল রাষ্ট্র নয়, বরং তার এক ভয়ংকর সম্প্রসারণবাদী কল্পনা। এই ধারণাই ইরাক, গাজা, লেবানন, সিরিয়া এবং ইরানে সংঘটিত যুদ্ধগুলোর পেছনে কাজ করেছে।

এই ধারণা অনুযায়ী, ইসরায়েলের বিস্তার হওয়া উচিত ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনের পুরো ভূখণ্ড জুড়ে। অর্থাৎ জর্ডান নদী থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত এবং তার বাইরেও প্রতিবেশী দেশগুলোর অংশবিশেষ পর্যন্ত।

ইসরায়েলে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবির (যাঁর দৃষ্টিভঙ্গি বহু শতাব্দীপুরোনো ধর্মীয় গ্রন্থ দ্বারা প্রভাবিত) বক্তব্য অনুযায়ী, এই ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ নীল নদ থেকে ইউফ্রেটিস নদী পর্যন্ত বিস্তৃত।

গত গ্রীষ্মে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও ‘গ্রেটার ইসরায়েল’-এর প্রতি নিজের গভীর অনুরাগের কথা জানিয়েছেন। তাঁর স্বপ্নের বৃহত্তর ইসরায়েল ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডসহ পার্শ্ববর্তী আরব অঞ্চলকেও অন্তর্ভুক্ত করে।

এই বিপজ্জনক ধারণার দুটি প্রধান উৎস রয়েছে। প্রথমত, নেতানিয়াহুর মতো ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ কট্টরপন্থীরা মনে করেন, নিরাপত্তার জন্য ইসরায়েলের জর্ডান নদী থেকে সাগর পর্যন্ত পুরো ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ থাকা জরুরি; তাতে সেখানে বসবাসকারী প্রায় ৮০ লাখ ফিলিস্তিনির ভবিষ্যৎ যাই হোক না কেন।

দ্বিতীয়ত, ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোৎরিচ এবং জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের মতো নেতাদের একধরনের ধর্মীয় আধিপত্যবাদী বিশ্বাস রয়েছে। সেই বিশ্বাস অনুযায়ী বলা হয়—এই ভূমি কেবল ইহুদিদের জন্যই ঈশ্বরপ্রদত্ত। স্মোৎরিচ তো সরাসরি বলেছেন, ‘ফিলিস্তিনি বলে কিছু নেই।’ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের ক্রমাবনতি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, পশ্চিম তীর, গাজা, লেবানন বা সিরিয়ার কোনো অংশ থেকে সামরিক নিয়ন্ত্রণ ছাড়বে না ইসরায়েল। তিনি বলেন—‘অন্যদের খুশি করতে আমরা আত্মহত্যা করব না।’

এই ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ ধারণা আসলে ভয়, অহংকার এবং ধর্মীয় উন্মাদনার মিশ্রণ। বহু আগেই এই মতবাদ প্রত্যাখ্যান করা উচিত ছিল। কিন্তু তিন দশক ধরে এটি ইসরায়েলের পররাষ্ট্র ও সামরিক নীতিকে প্রভাবিত করেছে—এবং এটি টিকে আছে মূলত নেতানিয়াহুর যুক্তরাষ্ট্রকে প্রভাবিত করার কৌশলের কারণে।

এই প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে নেতানিয়াহু দুটি শক্তিশালী মার্কিন গোষ্ঠীকে ব্যবহার করেছেন। একদিকে রয়েছেন ইহুদি জায়নবাদীরা, যাঁরা ইসরায়েলকে নিঃশর্তভাবে সমর্থন করেন। অন্যদিকে রয়েছেন খ্রিষ্টান জায়নবাদীরা, যাঁরা শেষ যুগের ভবিষ্যদ্বাণী ও যিশুর পুনরাগমনের বিশ্বাসকে বাস্তব মানুষের জীবন থেকেও বেশি গুরুত্ব দেন; অর্থাৎ ফিলিস্তিনি বা এমনকি ইসরায়েলি জীবনের চেয়েও।

এখানে একটি বিভ্রম আরেকটি বিভ্রমের জন্ম দিয়েছে। আর এই পথ ধরে একের পর এক যুদ্ধ হয়েছে। ৩০ বছর ধরে এই সংকট চলছেই।

ইরানের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক যুদ্ধ ছিল এই ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ ভাবনারই আরেকটি রূপ। এক দিনেই ৯ কোটি মানুষের একটি রাষ্ট্রের পতন ঘটানো যাবে—এমন কল্পনা করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। বরং ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের নেতৃত্ব নিহত হলেও কাঙ্ক্ষিত পতন ঘটেনি। তার বদলে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেছে এবং বিশ্বজুড়ে তেলের সংকট তৈরি হয়েছে।

এই দৃশ্য নতুন নয়। সিরিয়ায় প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করার পরিকল্পনাও দ্রুত সফল হবে বলে আশা করা হয়েছিল। কিন্তু তা ১২ বছরের দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে পরিণত হয়। সেই যুদ্ধে গোপন অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা অর্থ ও অস্ত্র সরবরাহ করেছে এবং ইসরায়েল তা সমর্থন করেছে। এর ফল হিসেবে সেখানকার একটি প্রাচীন সভ্যতা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। দ্রুত বিজয়ের প্রতিশ্রুতি শেষ পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি বিপর্যয়ে গড়িয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এই ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ ভাবনায় জড়িয়ে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং তিনি তা বুঝতে পেরেছেন। তিনি বুঝতে পারছেন, ইরানের সঙ্গে নতুন চুক্তি তাঁর জন্য একধরনের বেরিয়ে আসার পথ এবং একটি অর্থহীন যুদ্ধ থেকে মুক্তির সুযোগ।

এই কারণেই ইসরায়েলের ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ সমর্থক নেতারা এই চুক্তিকে নস্যাৎ করতে চাইছেন। কারণ, ইরানের সঙ্গে শান্তি মানেই এই ধারণাটির পরাজয়। চুক্তির পরেও ইসরায়েল লেবাননে হামলা চালিয়েছে। তারা এক দিনে ৪৭ জন এবং পরদিন আরও ৩২ জনকে হত্যা করেছে; অথচ সেখানে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার কথা ছিল।

বাস্তবতা হলো, ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ ইসরায়েলকে রক্ষা করছে না, বরং ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে যে টানাপোড়েন দেখা যাচ্ছে, তা কেবল ওপরের স্তর। ভেতরে-ভেতরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের গ্রহণযোগ্যতা দ্রুত কমছে। একটি সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে ইসরায়েলের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব প্রবল। এমনকি ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় মিত্র যুক্তরাষ্ট্রেও প্রতি ১০ জনে ৬ জন প্রাপ্তবয়স্ক এখন ইসরায়েলকে অপছন্দ করেন।

একটি রাষ্ট্র যদি নিজেকে বিশ্ববাসীর কাছে ঘৃণিত করে তোলে, এমনকি নিজের সবচেয়ে বড় সমর্থকের কাছেও, তবে তা নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে না, বরং নিজের অস্তিত্বকেই ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

তাই পশ্চিম এশিয়ায় শান্তির পথ একটাই—‘গ্রেটার ইসরায়েল’ ধারণার অবসান। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে, গাজায় গণহত্যা থামাতে হবে এবং পশ্চিম তীরে দমন-পীড়ন বন্ধ করতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জাতিসংঘের ১৯৪তম সদস্য হিসেবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সেই রাষ্ট্র হতে হবে ১৯৬৭ সালের সীমানা অনুযায়ী ইসরায়েলের পাশে একটি স্বাধীন ভূখণ্ড হিসেবে। এর অংশ হিসেবে ইসরায়েলকে লেবানন ও সিরিয়া থেকেও সরে আসতে হবে।

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি দেখিয়েছে—শান্তি যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, আলোচনার টেবিলে অর্জিত হয়। এটি সম্ভব হয়েছে তখনই, যখন ওয়াশিংটন যুদ্ধের চেয়ে শান্তিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।

ইসরায়েল টিকে থাকতে পারে, কিন্তু ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ হয়ে নয়। ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ ধারণাই ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে একের পর এক যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলেছে।

আজ যে আশার আলো দেখা যাচ্ছে, তা বাস্তব। কিন্তু সেটি পূর্ণ ভোর হবে কি না, তা নির্ভর করছে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ যুক্তরাষ্ট্র খুলে দেবে কি না তার ওপর। আরব বিশ্ব ও ইরানকে যৌথভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে বোঝাতে হবে—‘গ্রেটার ইসরায়েল’ ত্যাগ করাই দীর্ঘস্থায়ী শান্তির একমাত্র পথ।

* জেফ্রি ডি স্যাক্স, কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও * সিবিল ফারেস, জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন সমাধান নেটওয়ার্কের মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা–বিষয়ক উপদেষ্টা।
- আল–জাজিরা থেকে নেওয়া। অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

কথিত গ্রেটার ইসরায়েলের মানচিত্র হাতে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু
কথিত গ্রেটার ইসরায়েলের মানচিত্র হাতে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি: এএফপি

No comments

Powered by Blogger.