যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং ব্রিটেনে প্রগতির আন্দোলন by ফারুক যোশী

বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবি যতই জোরালো হচ্ছে, ততই যেন সেই মৌলবাদী ফ্যাসিস্টরা আরো শক্ত হয়ে চালিয়ে যাচ্ছে তাদের বাঁচানোর সংগ্রাম। প্রতিবাদ চলছে তাদের। তারাও যেন শেষ দেখে নিতে চায়। বাংলাদেশের সঙ্গে তাল মিলিয়েই যেন শুরু হয়েছে একটি প্রতিবাদ-প্রতিরোধ জোরেশোরে এই ব্রিটেনে। সরাসরি যুদ্ধাপরাধী বাঁচানোর তাগিদ দিচ্ছে তারা এই যুক্তরাজ্যে। তারা মনে করছে, বাংলাদেশের যেসব শ্মশ্রুমণ্ডিত বকধার্মিক


হত্যা-লুণ্ঠন-ধর্ষণ প্রভৃতিতে অভিযুক্ত, তারাই যেন বাংলাদেশ। তারাই আলিম (জ্ঞানী!), তাদের বাঁচাতে হবে, তবেই বাঁচবে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ বাঁচাতে তারা ডাক দিচ্ছে ব্রিটেনের বিভিন্ন শহরে। ব্রিটেনে বাংলাদেশের মৌলবাদী দলগুলোর বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা চালাচ্ছে এ আন্দোলন। বাংলাদেশের মতোই এর সঙ্গে যুক্ত আছে বিএনপি। যেহেতু এটা সরকারবিরোধী আন্দোলনেরই একটি অংশ, সেহেতু সব জনসভায়ই বিএনপির নেতাদের ভারী ভারী বক্তৃতা শোনা যাচ্ছে। কিন্তু সবচেয়ে বিস্ময়ের ব্যাপার, যারা এই আন্দোলনের ডাক দিচ্ছে, তাদের অনেকেই হয়তো চিনে, কিন্তু তারা তাদের পরিচয়টা অভিবাসী জনগণের কাছে তুলে ধরছে না। তারা আড়াল করছে তাদের পরিচয়। সে জন্যই তারা 'সেইভ বাংলাদেশ' নাম নিয়ে গড়ে তুলতে চাইছে একটি সামাজিক আন্দোলন। বলতেই হয়, অপরাধী বাঁচানোর এ আন্দোলন কোনোভাবেই সামাজিক আন্দোলন হতে পারে না।
এই যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতেই তারা চাপ সৃষ্টি করতে চাইছে বিভিন্নভাবে। সে লক্ষ্যেই চলছে তাদের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ। দেশীয় চাপের পাশাপাশি তারা আন্তর্জাতিক চাপও যেন প্রয়োগ করতে চাইছে। ব্রিটেনের বিভিন্ন শহরে সেইভ বাংলাদেশের ব্যানারে বিভিন্ন সময় হয়েছে সভা-সমাবেশ। পশ্চিমের দেশগুলো থেকেই শত শত কোটি টাকার (খবর বেরিয়েছে ১৯২ কোটি টাকা) বাজেট করা হয়েছে আন্তর্জাতিক লবিস্ট করার প্রয়োজনে। এই অর্থের কারণেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দূত যুক্তরাষ্ট্রের স্টিফেন র‌্যাপ কিংবা ব্রিটেনের আইনজীবী স্টিভেন এবং টবি ক্যাডম্যান আমাদের বাংলাদেশের প্রাণের এই দাবি যুদ্ধাপরাধ ইস্যুটাকেই প্রশ্নবোধক করতে চাইছেন। সবচেয়ে বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে লংমার্চ শুরু করেছে। ব্রিটেনেও আছে তাদের অপতৎপরতা। জামাতিদের সামাজিক সংগঠন সেইভ বাংলাদেশ ব্যানারের নিচে জমায়েত হয়ে ব্রিটেনের বিভিন্ন শহরে চালিয়ে যাচ্ছে অপতৎপরতা। বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করা গেছে, সেইভ বাংলাদেশ নামে তারা প্রধান যুদ্ধাপরাধী সাঈদীসহ অন্যদের মুক্তির জন্য ব্রিটেনের সাধারণ মানুষকে তাদের পক্ষে নেওয়ার তাগিদে মসজিদে মসজিদে এমনকি দোয়া মাহফিল করছে। তারা ওইসব মসজিদে, এমনকি বাংলাদেশের শিক্ষানীতি, নারীবাদ কিংবা নারীনীতি প্রভৃতি নিয়েও প্রশ্ন তুলছে। সরকারবিরোধী একধরনের জাগরণ সৃষ্টি করতে চাইছে অভিবাসী জনগণের কাছে। এর আগে তারা ডাউনিং স্ট্রিট-পার্লামেন্ট ভবনসহ বিভিন্ন জায়গায় ডেমোনস্ট্রেশনও করেছে। এই গোষ্ঠীরই অন্য শাখা এ দেশের বিভিন্ন জায়গায় এমনকি ওল্ডহ্যামে র‌্যালি করার মতো ধৃষ্টতা দেখিয়েছে।
কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার, এখানে প্রগতিশীল বলে চিল্লাচিলি্ল করেন যাঁরা, তাঁদের বড় অংশই নীরব। ক্ষমতার স্বাদ পাওয়া দলটির প্রতিটি শহরে তাঁরা নিজ নিজ অবস্থান ঠিক রাখার প্রয়োজনে নিজের ভেতরেই কোন্দলে লিপ্ত। যুদ্ধাপরাধী ইস্যু নিয়ে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্তদের বিচার যে একটা ন্যায্য চাওয়া_এ ব্যাপারটা জানছে না অভিবাসী সাধারণ মানুষ। যেভাবে জামায়াত কিংবা বিএনপি সভা-সমাবেশ, এমনকি সেমিনার-সিম্পোজিয়াম করছে, সে রকম কিছুই এখানে দৃষ্টিগোচর নয়। তাদের বক্তৃতার মঞ্চে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাক্যটি তারা জোরেশোরে উচ্চারণ করে ঠিকই, কিন্তু সাধারণ প্রবাসীদের কাছে তারা তা নিয়ে যেতে পারছে না। মানবাধিকার নিয়ে দু-একটি আলাপ-আলোচনা ব্রিটিশ দু-একজন এমপি-মন্ত্রী কিংবা লর্ডের সঙ্গে হলেও ক্ষমতাসীন দলের ব্রিটেনের সংগঠনসহ স্বাধীনতার পক্ষের কোনো শক্তির ওই ইস্যুতে প্রয়োজনীয় ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস লক্ষণীয় নয়। তা ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে এখানে প্রতিষ্ঠা পাওয়া সংগঠনগুলোর উদ্যোগও যেন বক্তৃতার মধ্যে সীমাবদ্ধ। এখানে বাঙালিদের একটা বিশাল অংশ মসজিদে যায়। এই মসজিদকেই তারা টার্গেট করেছে। এই মসজিদেই তারা বয়ান করে এবং তারা প্রচারণা চালায় বাংলাদেশের আলেমদের (?) জেলে পুরছে এই সরকার। অনেক মুসলি্ল তা বিশ্বাসও করছে। কিন্তু এমনকি তার বিপরীতে গণজাগরণ কিংবা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সুনিশ্চিত করতে জনসমর্থন আদায়ে লিফলেটও যেন মসজিদে মসজিদে বিতরণ করতে পারছে না ওই প্রগতিশীল গ্রুপ। অথচ ওই গ্রুপও নিয়মিত মসজিদে যায়। গল্প-গুজবে সময় কাটায়। মসজিদের চেয়ারম্যান-সেক্রেটারি হওয়ার জন্য হাজার হাজার পাউন্ড খরচও করে।
বুদ্ধিজীবী দিবস গেল গত ১৪ ডিসেম্বর। এই দিনে উচ্চারিত হওয়ার কথা সেই রাজাকারদের প্রতি ঘৃণিত উচ্চারণ। কিন্তু ব্রিটেনের কয়েকটি শহরে পালিত হয়েছে এই দিবসটি। এমনকি লন্ডনেই হয়েছে কয়টি সভা কিংবা সমাবেশ? ব্রিটেনে বাংলায় প্রচারিত অন্তত ছয়টি টিভি চ্যানেল আছে। কিন্তু কোনোটাতেই দেখিনি আমরা বুদ্ধিজীবী দিবসকে কেন্দ্র করে ব্রিটেন-অভিবাসী স্বাধীনতার পক্ষের শক্তির দৃপ্তকঠিন শপথের উচ্চারণ। ম্যানচেস্টার তথা নর্থ-ওয়েস্ট ইংল্যান্ডে এই প্রথমবারের মতো বুদ্ধিজীবী দিবসের একটি অনুষ্ঠান করেছে চেতনা নামের সংগঠন। স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী ধ্বংসযজ্ঞে লিপ্ত এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ত্বরান্বিত করার দাবিতে সারা নর্থওয়েস্ট ইংল্যান্ডে তারা ব্যাপক কর্মসূচি দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এমনকি ম্যানচেস্টার হাইকমিশনে বিক্ষোভ প্রদর্শন ও স্মারকলিপিও দেবে এই সংগঠন। এভাবেই চেতনায় শাণিত হয়ে স্বাধীনতার পক্ষের সব শক্তিকে এগিয়ে আসতে হবে। লন্ডনসহ সারা ব্রিটেনে মতামত সৃষ্টি করতে হবে। অস্বীকার করার উপায় নেই, বিজয় দিবস পালিত হয়েছে ঘটা করে এই ব্রিটেনে। অনেকেই বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানকে নিয়ে গেছেন ক্রিসমাস ডে-তে একসঙ্গে ফুর্তির দিন হিসেবে পালন করতে। কিন্তু ফুর্তির পাশাপাশি বিজয় দিবসকে নিয়ে রাজনৈতিক এবং সামাজিক অঙ্গীকারের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে প্রয়োজনের তুলনায় নিতান্তই কম। তাহলে সচেতনতা বাড়াবে কে? গ্রুপকেন্দ্রিক সভা-সমাবেশে নুতন প্রজন্মের প্রতি শুধু চেতনার আহ্বান করলে স্বপ্নও সার্থক হবে না। বরং অগোচরে কিংবা জানা-অজানার মধ্য দিয়েই এভাবেই এগিয়ে যাবে অপশক্তি। তখন আর চিৎকার করেও শেষ রক্ষাটি হবে না।
লেখক : লন্ডনপ্রবাসী সাংবাদিক
faruk.joshi@gmail.com