কিডনি প্রতিস্থাপন বন্ধ রোগীরা ভয়ানক কষ্টে by শফিকুল ইসলাম জুয়েল

র শ্বাস নিতে পারছি না। খুব কষ্ট হচ্ছে। এভাবে আর বাঁচা যায় না। আমাকে মেরে ফেলো, মুক্তি দাও।' গত মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৪টায় ঢাকার কিডনি ফাউন্ডেশনের ১১ নম্বর রুমের বেডে ডায়ালিসিস চলা অবস্থায় কাঁদতে কাঁদতে কথাগুলো বলছিলেন কিডনি রোগে আক্রান্ত কৃষিবিদ জাহিদুর রহমান কামরুল। তাঁর পাশে বসে অঝোরে কাঁদছিলেন স্ত্রী, বোন ও দুই শিশুসন্তান।জানা গেল, ৩/ক পশ্চিম তেজতুরী বাজারের বাসিন্দা ৩৯ বছর বয়সী জাহিদুর রহমান কামরুলের দুটি কিডনিরই ৯৫ শতাংশ অকেজো হয়ে গেছে। সপ্তাহে দুই দিন কিডনি ফাউন্ডেশনে ডায়ালিসিস করে কোনো রকমে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে তাঁকে।


ডায়ালিসিস করতে করতে হাতের মাংসগুলো ফুলে খসে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। প্রাণবন্ত ভাইয়ের এই করুণ পরিস্থিতি সহ্য করতে না পেরে বড় বোন স্বেচ্ছায় কিডনি দান করতে চান। এরপর চিকিৎসকের পরামর্শে প্রায় ৮০ হাজার টাকা খরচ করে ডিএনএ, টিস্যু টাইপিং, ক্রস ম্যাচিংসহ সব পরীক্ষা সম্পন্ন করেন। কিন্তু চূড়ান্ত পর্বে এসে চিকিৎসকরা আর কিডনি প্রতিস্থাপন করতে চাইছেন না। সম্প্রতি কিডনির অবৈধ বাণিজ্য নিয়ে সংবাদমাধ্যমে যে তুমুল হৈচৈ হয়, তাতে চিকিৎসকরা আর ঝুঁকি নিতে চাইছেন না। কামরুলের চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, 'বলা যায় না আবার কোন বিপদে পড়ি!'
অনুসন্ধানে জানা যায়, 'আবার কোন বিপদে পড়ি'- এই ভয়ে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা এখন হাত গুটিয়ে বসে আছেন। কেউ কিডনি প্রতিস্থাপন করছেন না। আর মাঝখান দিয়ে চরম বেকায়দায় পড়ে গেছেন কিডনি রোগীরা। বৈধ ডোনার থাকা সত্ত্বেও কিডনি প্রতিস্থাপন করতে না পারায় তাঁরা রয়েছেন অমানুষিক কষ্টে। কামরুল বললেন, 'শরীরের করুণ এ অবস্থায় কিডনি প্রতিস্থাপন জরুরি হলেও তা না করে ডাক্তার বারবারই ডায়ালিসিস করে দিচ্ছেন। এমন অবস্থায় আমার বেঁচে থাকা অসহনীয় হয়ে উঠেছে। বিদেশ যাওয়াটাও সময়সাপেক্ষ।'
কামরুলের বোন টাঙ্গাইলে কর্মরত সহকারী পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা রাফিয়া সুলতানা বললেন, 'আদরের ভাইয়ের করুণ মৃত্যু দেখার আগে আল্লাহ যেন আমার মরণ দেন।' তিনি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, 'সরকারের সিদ্ধান্তহীনতায় চোখের সামনে মা ছেলেকে, বোন ভাইকে, স্ত্রী স্বামীকে হারাবে-এটা অকল্পনীয়।'
সরেজমিন অনুসন্ধানে কামরুলের মতো আরো অনেক রোগীর সন্ধান পাওয়া গেছে, যাঁরা বৈধভাবেও কিডনি প্রতিস্থাপন করতে না পেরে চরম কষ্টের মধ্যে দিনাতিপাত করছেন। একই দিন কিডনি ফাউন্ডেশনের ৫ নম্বর রুমে ডায়ালিসিস করছিলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাট উপজেলার শিবনগর গ্রামের ২৮ বছর বয়সী যুবক শীষ মোহাম্মদ। বললেন, 'নিম্নবিত্ত পরিবারে জন্ম আমার। গ্রামেই একটি ওষুধের দোকান করে কোনো রকমে চলছি। কিন্তু বছর দেড়েক আগে ধরা পড়ে কিডনি রোগ। পরে পরীক্ষায় মেলে, দুটি কিডনিই অকেজো হয়ে গেছে। চিকিৎসকরা বলেছেন, দ্রুত কিডনি প্রতিস্থাপন করতে না পারলে মৃত্যু অবধারিত।' এ অবস্থায় মা সেলিনা বেগম ছেলেকে কিডনি দেওয়ার লক্ষ্যে সব পরীক্ষা সম্পন্ন করে বসে আছেন। কিন্তু চিকিৎসকরা এখন আর তা প্রতিস্থাপন করতে চাইছেন না। মা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, সংসারের শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করে ছেলের চিকিৎসার খরচ চালাচ্ছি। মিরপুরে বাসা ভাড়া করে থেকে তা আর সম্ভব হচ্ছে না। চোখের সামনে ছেলের ধুঁকে ধুঁকে মরা দেখতে পারব না। এর আগে নিজেই আত্মহত্যা করব।'
কিডনি ফাউন্ডেশনে গত বুধবার কথা হয় ভোলা সদরের কলেজ রোড মুন্সীবাড়ির বাসিন্দা জহিরুল ইসলাম জহিরের সঙ্গে। জানালেন, তাঁর দুটি কিডনিই নষ্ট হওয়ায় প্রতি শনি ও বুধবার ডায়ালিসিস করাতে হয়। শরীরের অবস্থা এতটাই অবনতির দিকে যে এখনই কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট ছাড়া তাঁর বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। তাঁর স্ত্রী কিডনি দিতে ইচ্ছুক। সব ধরনের পরীক্ষা হয়েছে। এখন চিকিৎসকরা তা করাতে চাইছেন না।
জহিরের স্ত্রী বললেন, 'আমার সর্বস্ব দিয়ে হলেও স্বামীকে বাঁচাতে চাই। এই মূহূর্তে স্বামীর কিছু হয়ে গেলে নাবালক দুই ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে কোথায় দাঁড়াব আমি?'
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলেন, কিডনি অকেজো হয়ে যাওয়া রোগীদের বারবার ডায়ালিসিস করা হলে তাদের শরীর ধীরে ধীরে স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা হারাতে থাকে। অসাবধানতা কিংবা কোনোভাবে ডায়ালিসিসের সময় রক্তের সঙ্গে হেপাটাইসিস 'বি' ও 'সি' ভাইরাস শরীরে ঢুকলে আর বেঁচে থাকা সম্ভব হয় না। তাঁরা জানান, বেশ কিছুদিন ধরে কিডনি প্রতিস্থাপন বন্ধ থাকায় সামর্থ্যবান অনেক রোগীই এখন প্রতিবেশী দেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে গিয়ে কিডনি প্রতিস্থাপন করাতে বাধ্য হচ্ছেন। প্রায় একই মানের সেবা নিতে খরচ করছেন বিপুল অঙ্কের টাকা। আর এসবই হচ্ছে সরকারের সময়োপযোগী পদক্ষেপের অভাব এবং চিকিৎসকদের ভয়ের কারণে।
'কিডনি নিয়ে অবৈধ বাণিজ্যের সঙ্গে নামিদামি হাসপাতাল ও চিকিৎসকরাও জড়িত'_এমন অভিযোগের কারণে গত প্রায় দেড় মাস ধরে দেশের হাসপাতালগুলোতে কিডনি সংযোজন বন্ধ করে দিয়েছেন চিকিৎসকরা। এ থেকে রোগীদের রক্ষায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো কোনো বাস্তবমুখী উদ্যোগ নিচ্ছে না। 'মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন-১৯৯৯'-এ উল্লেখ আছে, 'পুত্র-কন্যা, পিতা-মাতা, ভাই-বোন ও রক্ত সম্পর্কিত আপন চাচা, ফুফু, মামা, খালা ও স্বামী-স্ত্রী কিডনি দান করতে পারবেন। তবে এর বাইরে কারো নিকট থেকে কিডনি নেওয়া যাবে না।' অথচ বর্তমান পরিস্থিতিতে কিডনি রোগীরা সরকারের এ আইনের কোনো সুযোগই কাজে লাগাতে পারছে না।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল) ডা. মমতাজ উদ্দিন ভুঁইয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, সরকার কিডনি সংযোজন বন্ধ করতে বলেনি। প্রচলিত আইন অনুযায়ী আগে যেভাবে কিডনি সংযোজন হয়ে আসছিল, এখনো সেভাবেই সংযোজন করার সুযোগ আছে। তবে 'মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন-১৯৯৯' আরো বাস্তবমুখী করতে কিডনি ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও স্বনামধন্য কিডনি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. হারুন অর রশীদকে প্রধান করে গঠিত পাঁচ সদস্যের কমিটি কাজ করছে। তাদের সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়ন করা শুরু হলে আর কোনো সমস্যা থাকবে না।
এ কমিটির অন্যতম সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, 'মানবদেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন-১৯৯৯' বাস্তবায়নে নানা সমস্যা রয়েছে। আইনটি যুগোপযোগী করে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে নতুন করে প্রবিধান সংযোজনের মাধ্যমে বাস্তবমুখী করা হচ্ছে। আইনটি বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে রক্তের সম্পর্কের নিকটাত্মীয়দের কিডনি দানে আর বাধা থাকবে না।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, বর্তমানে দেশেই আন্তর্জাতিকমানের কিডনি চিকিৎসা সম্ভব হচ্ছে। এ দেশে কিডনি সংযোজনে সফলতা বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর প্রায় সমান। এ কারণে কিডনি রোগীদের বিদেশ যাওয়ার প্রবণতাও অনেক কমেছে। তাঁদের দাবি, কিডনি বেচাকেনায় অবৈধ বাণিজ্যের সঙ্গে কোনো চিকিৎসক কিংবা প্রতিষ্ঠান জড়িত থাকলে নিরপেক্ষ তদন্ত করে সুষ্ঠু ব্যবস্থা নেওয়া হোক। কিন্তু এ জন্য ঢালাওভাবে চিকিৎসক সমাজকে দায়ী করে হেয় করা ঠিক নয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. খন্দকার মো. সিফায়েত উল্লাহ বলেন, রোগীদের সুবিধার্থে আগের মতোই কিডনি সংযোজন ও জরুরি চিকিৎসা চালু রাখা প্রয়োজন। আর এ জন্য সব ধরনের সহযোগিতা করছে সরকার। তিনি বলেন, অজুহাত তুলে কিডনি সংযোজন ব্যাহত করা ঠিক হবে না। মনে রাখতে হবে, এটা আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রও হতে পারে। এটাকে কোনো অবস্থায় গুরুত্ব দেওয়া যাবে না।
কিডনি রোগ নির্ণয় হাসপাতাল, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও বিভিন্ন সোসাইটির হিসাবে, দেশে ক্রমেই কিডনি রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। বর্তমানে এ সংখ্যা দুই কোটি ছাড়িয়ে গেছে। এদের মধ্যে ৮০ শতাংশই দরিদ্র ও অসহায়। কিডনি রোগীদের চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। নিম্নবিত্তরা তো বটেই, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারের পক্ষেও এর ব্যয়ভার বহন কষ্টসাধ্য। ব্যয়ভার বহন করতে গিয়ে অনেকেই সর্বস্বান্ত হয়েছেন।
বাংলাদেশ রেনাল অ্যাসোসিয়েশন ও ইউরোলজিক্যাল সোসাইটি সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশের ৯৫০ জন রোগীর শরীরে কিডনি প্রতিস্থাপিত হয়েছে। এর মধ্যে দেশে ৬০০ আর বিদেশে ৩৫০ জনের কিডনি প্রতিস্থাপিত হয়। বিদেশে যাদের কিডনি সংযোজিত হয়েছে, তাদের মধ্যে অধিকাংশই ডোনার সম্পর্কবহির্ভূত অর্থাৎ তারা কেউ দূর-সম্পর্কের আত্মীয়ও নয়। অনেক দামে কিডনি কিনে তারা সংযোজন করেছে।
কিডনি ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও বিশিষ্ট কিডনি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. হারুন অর রশীদ বলেন, দেশে প্রতিবছর অসংখ্য মানুষ কিডনি নষ্ট হওয়ায় মারা যাচ্ছে। অথচ কিডনি প্রতিস্থাপন করে একজন রোগী ১৫ থেকে ২০ বছর স্বাভাবিক জীবনে বেঁচে থাকতে পারে। ট্রান্সপ্লান্টের দুই বছর পর বিয়েও করতে পারে। মহিলারা সক্ষম হন সন্তান জন্ম দিতেও। আর ডায়ালিসিস করে কিডনি রোগী পাঁচ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। তিনি জানান, দেশে কিডনি সংযোজনে ৮০ শতাংশ রোগীই উপকৃত হয়েছে, যা বিদেশি হাসপাতাল ও একটি চক্রের গাত্রদাহের কারণ।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কিডনি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. শহীদুল ইসলাম সেলিম বলেন, এ পর্যন্ত এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪৩২টি কিডনি সফলভাবে প্রতিস্থাপিত হয়েছে।
কিডনি রোগী ও ডোনারের সম্পর্ক নির্ধারণে আলাদা বডি গঠনের পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। তাঁরা বলছেন, চিকিৎসকরা যখন রোগীর জীবন বাঁচাতে ট্রান্সপ্লান্ট যেন দ্রুত করা সম্ভব হয় তা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন; ঠিক সেই মুহূর্তে আসে ডোনারের সম্পর্ক নির্ধারণের তাগাদা। এর পরও ডাক্তাররা ডোনারের ডিএনএ টেস্ট, রক্তের গ্রুপিং, টিস্যু টাইপিংসহ নানা পরীক্ষার মিল আছে কি না তা খতিয়ে দেখেন। এ ছাড়া ডোনার রোগীর প্রকৃত রক্তের সম্পর্কের কেউ কি না, তা নিশ্চিত হতে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের সনদপত্র, নোটারি পাবলিকের সত্যায়িত কিংবা ম্যাজিস্ট্রেটের সনদপত্র দেখে থাকেন। এত কিছুর পরও কিডনি বাণিজ্য ও পাচারের সঙ্গে জড়িয়ে চিকিৎসকদের নামে অভিযোগ ওঠায় এখন বিশেষ করে 'সম্পর্ক নির্ধারণে' অপারগতা প্রকাশের কারণেই কিডনি সংযোজন বন্ধ হয়ে গেছে।

No comments

Powered by Blogger.