হরমুজ থেকে লেবানন: সংকট নিরসনে যে রোডম্যাপে এগোবে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র
গত ১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা কমানোর লক্ষ্যে ১৪ দফা সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের পর এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় ১৮ ঘণ্টাব্যাপী বৈঠকে দুই দেশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা অংশ নেন।
এ আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তার সঙ্গে ছিলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার ও বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। ইরানের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। দলে ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিও।
উচ্চপর্যায়ের কমিটি ও নতুন যোগাযোগ ব্যবস্থা
কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় গঠিত উচ্চপর্যায়ের কমিটি রাজনৈতিক তদারকির দায়িত্ব পালন করবে। আগামী দুই মাসে পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা, পর্যবেক্ষণ ও বিরোধ নিষ্পত্তি সংক্রান্ত কারিগরি আলোচনাও চলবে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক সমঝোতার তুলনায় কারিগরি বিষয়গুলোর সমাধান আরও কঠিন হতে পারে। বিশেষ করে ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ চালিয়ে যেতে পারবে কি না, উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুতের ভবিষ্যৎ কী হবে, আন্তর্জাতিক পরিদর্শনের পরিধি এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সময়সূচি এসব প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত।
অ্যাটলান্টিক কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ ফেলো থমাস ওয়ারিক বলেন, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত অপসারণ বা এর মাত্রা কমানোর প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল। এতে হাজারো বিশেষজ্ঞের অংশগ্রহণ প্রয়োজন হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র এ বিষয়ে সরাসরি ভূমিকা রাখতে চাইছে, যা ইরানের কাছে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে।
হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা কমানোর উদ্যোগ
দুই দেশ হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে ভুল বোঝাবুঝি ও সংঘাত এড়াতে একটি বিশেষ যোগাযোগ লাইন স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর লক্ষ্য বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখা।
বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে যায়। সাম্প্রতিক অস্থিরতার কারণে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ইরানের কার্যত অবরোধের ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও সংকট দেখা দেয়।
ভ্যান্স জানান, লেবাননে যুদ্ধবিরতি তদারকি এবং হরমুজ প্রণালিতে মাইন অপসারণের জন্য পৃথক ব্যবস্থাও গড়ে তোলা হবে।
লেবাননের জন্য ‘ডি-কনফ্লিকশন সেল’
চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো লেবাননে সামরিক অভিযান বন্ধের প্রচেষ্টা জোরদার করতে ‘ডি-কনফ্লিকশন সেল’ গঠন।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি লেবাননের যুদ্ধ বন্ধের ক্ষেত্রে ‘বড় ধরনের অগ্রগতির’ কথা উল্লেখ করলেও তিনি বলেন, এই ব্যবস্থার কার্যকারিতাই হবে চুক্তির প্রথম বড় পরীক্ষা।
অন্যদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, প্রয়োজন মনে করা পর্যন্ত দক্ষিণ লেবাননের নিরাপত্তা অঞ্চলে ইসরায়েলি বাহিনী অবস্থান করবে। বর্তমানে ইসরায়েল নিয়ন্ত্রিত বাফার জোন লেবাননের প্রায় ৬ শতাংশ ভূখণ্ডজুড়ে বিস্তৃত।
এদিকে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের কুদস ফোর্সের প্রধান ইসরায়েলকে দক্ষিণ লেবানন ত্যাগের আহ্বান জানিয়ে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন, আগ্রাসন ও দখলদারিত্ব অব্যাহত থাকলে ইসরায়েলকে ‘অপমানজনক পরাজয়ের’ মুখে সরে যেতে হবে।
তবে বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, লেবানন ও ইসরায়েল সরাসরি আলোচনায় অংশ না নেওয়ায় এই নতুন ব্যবস্থার বাস্তব প্রয়োগ জটিল হতে পারে। সাবেক মার্কিন কূটনীতিক জোয়ি হুডের মতে, এতে লেবানন ইস্যুতে ইরানের প্রভাব আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা ও অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল মার্ক কিমিট বলেন, বৃহত্তর যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনায় লেবাননকে অন্তর্ভুক্ত করায় বিষয়টি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
তবে দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়াহ শহর থেকে পাওয়া প্রাথমিক তথ্য বলছে, সেখানে আপাতত সতর্ক শান্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং যুদ্ধবিরতির প্রভাব দেখা যাচ্ছে।
নিষেধাজ্ঞা শিথিল ও জব্দ সম্পদ মুক্তির ইঙ্গিত
আব্বাস আরাঘচি দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল পণ্যের ওপর আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে। পাশাপাশি অবরোধ প্রত্যাহার, জব্দ সম্পদের একটি অংশ মুক্ত করা এবং ইরানের পুনর্গঠন ও উন্নয়ন কর্মসূচি শুরু করার বিষয়েও সমঝোতা হয়েছে বলে তিনি জানান।
থমাস ওয়ারিকের মতে, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের সমর্থন পাওয়া কঠিন হতে পারে। কারণ কংগ্রেসের অনেক সদস্য বর্তমান চুক্তি নিয়ে সন্তুষ্ট নন।
ভ্যান্স বলেন, ইরানের অবমুক্ত সম্পদের অর্থ যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্য কেনায় ব্যবহার করা হলে তা মার্কিন কৃষকদের উপকারে আসবে এবং একই সঙ্গে ইরানের জনগণের খাদ্যচাহিদা পূরণে সহায়তা করবে।
পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে অগ্রগতি
ভ্যান্স জানিয়েছেন, ইরান আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) পরিদর্শকদের আবারও দেশে প্রবেশের অনুমতি দিতে সম্মত হয়েছে। তিনি এটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করেন।
তার মতে, এটি ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি স্থায়ীভাবে বন্ধ করার পথে প্রথম ধাপ হতে পারে।
২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির আওতায় আইএইএ ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি তদারকি করত। তবে ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র ওই চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। গত বছর ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের পর ইরান আইএইএ পরিদর্শকদের প্রবেশও সীমিত করে দেয়।
ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি দীর্ঘদিন ধরেই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রধান বিরোধের বিষয়। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত নিজেদের কাছে হস্তান্তরের দাবি জানালেও ইরান বারবার তা প্রত্যাখ্যান করেছে। তবে তৃতীয় কোনো দেশের কাছে হস্তান্তর বা ইরানের ভেতরেই এর মাত্রা কমিয়ে আনার বিকল্প নিয়ে আলোচনা চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
![]() |
| ইরান যুক্তরাষ্ট্রে আলোচনায় মধ্যস্থতা করে পাকিস্তান। ছবি : সংগৃহীত |

No comments