ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তির অন্তরালের নাটকীয় গল্প

সিএনএনের রিপোর্টঃ ফ্রান্সের ঐতিহাসিক ভার্সাই প্রাসাদে গত বুধবার রাতে নৈশভোজে বসার ঠিক আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প হঠাৎই একটি অপ্রত্যাশিত সিদ্ধান্ত নেন। তিনি ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এবং নিজের প্রশাসনের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তাকে বিস্মিত করে জানান, ইরানের সঙ্গে হওয়া চুক্তিতে তিনি সেদিন রাতেই স্বাক্ষর করতে চান।

মার্কিন শীর্ষ কূটনীতিক এরইমধ্যে প্রাসাদে যাওয়ার পথে খবর পেয়েছিলেন যে চুক্তির নথি চূড়ান্ত হয়েছে। পরিকল্পনা ছিল, দুই দিন পর সুইজারল্যান্ডের লেক লুসার্নের তীরে অবস্থিত একটি অভিজাত অবকাশকেন্দ্রে আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠান হবে। ওই অনুষ্ঠানে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, যিনি এই সমঝোতার প্রধান মার্কিন আলোচক ছিলেন, ইরানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করে পরবর্তী কারিগরি আলোচনা শুরু করার কথা ছিল।

কিন্তু ট্রাম্প তার সিদ্ধান্তে অনড় ছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন, চুক্তি অবিলম্বে কার্যকর হোক এবং সেদিন রাতেই তিনি এতে স্বাক্ষর করবেন। ম্যাক্রোঁ জানান, তিনি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা দ্রুত আয়োজন করতে পারবেন। ওই ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত কর্মকর্তারা এসব তথ্য জানিয়েছেন।

ভার্সাই প্রাসাদের বিখ্যাত ‘হল অব মিররস’-এ দুই প্রেসিডেন্ট যখন হাঁটছিলেন, তখন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে চুক্তির কপি ছাপানোর জন্য একটি প্রিন্টারের ব্যবস্থা করছিলেন।

শেষ পর্যন্ত শুক্রবার সুইজারল্যান্ডের লুসার্নে নির্ধারিত অনুষ্ঠানটি হয়নি। ইসরাইল ও লেবাননে হিজবুল্লাহর মধ্যে নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে ইরান বৈঠক থেকে সরে দাঁড়ায়। যদিও শুক্রবার সকালে নতুন যুদ্ধবিরতিতে সম্মতি হয়েছিল, তবুও ট্রাম্প চুক্তিতে স্বাক্ষর করার কয়েক দিনের মধ্যেই ইরান চুক্তির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
চুক্তির পরবর্তী ধাপে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি আদায়ের কাজ শুরু করার জন্য ট্রাম্প ও ভ্যান্স আগ্রহী। কিন্তু এই চুক্তি তাদের রাজনৈতিক সমর্থকদের একাংশের কঠোর সমালোচনার মুখে পড়েছে।
সমালোচকদের অভিযোগ, এতে তেহরানকে ছাড় দেয়া হয়েছে, অথচ বিনিময়ে খুব সামান্য অর্জন করা হয়েছে।

সিনেটের সশস্ত্র বাহিনী বিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান রজার উইকার বলেন, চুক্তির ষষ্ঠ অনুচ্ছেদে অন্তর্ভুক্ত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন তহবিলের বিষয়টি ওবামা আমলের পারমাণবিক চুক্তির অর্থায়নকে “অতি সামান্য” বলে মনে করায়।
তবে সমালোচনার জবাবে ট্রাম্প দাবি করেন, মার্কিন সামরিক শক্তির কারণেই ইরান আলোচনায় বসতে বাধ্য হয়েছে।
তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেন, আমরা হতাশ হয়ে আলোচনায় যাইনি, ইরান গেছে। তারা শেষ হয়ে গেছে। আমরা ৬০ দিনের সময় দেব। তারা কোনো অর্থ পাবে না, এক পয়সাও নয়।

তবে কয়েক মাসের যুদ্ধের পর ১৪ দফার এই সমঝোতা স্মারক ট্রাম্পের জন্য স্বস্তির বিষয় হয়ে ওঠে। তার উপদেষ্টারা সতর্ক করেছিলেন যে বৈশ্বিক তেলের মজুত কমে আসছে এবং আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রিপাবলিকানদের উদ্বেগ বাড়ছে।
ট্রাম্প নিজেও স্বীকার করেন, অর্থনৈতিক উদ্বেগই তাকে চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। তিনি বলেন, তিনি চাননি অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের জন্য তাকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হার্বার্ট হুভারের সঙ্গে তুলনা করা হোক।
জি-৭ সম্মেলন শেষে ফ্রান্সের এভিয়াঁ-লে-বাঁ শহরের একটি হোটেলে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, আমি অর্থনৈতিক বিপর্যয় দেখতে চাইনি।

সেই রাতেই স্থানীয় সময় রাত ১১টার পর ভার্সাই প্রাসাদের একটি গ্যালারিতে দীর্ঘ ভোজের টেবিলে বসে ট্রাম্প কালো মার্কার কলম দিয়ে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।
উপস্থিত অতিথিদের উদ্দেশে তিনি বলেন, এটি সহজ ছিল না, আমি বলতে পারি। তিনি স্বাক্ষরিত নথি তুলে ধরলে ম্যাক্রোঁ বলেন, “ব্রাভো।” এরপর নথির ছবি তুলে ইরানে পাঠানো হয়।

বিশৃঙ্খল প্রক্রিয়া
এই আকস্মিক স্বাক্ষর ছিল দীর্ঘ ও জটিল আলোচনার চূড়ান্ত অধ্যায়। পুরো প্রক্রিয়াটি নানা টানাপোড়েন, অচলাবস্থা এবং অনিশ্চয়তায় ভরা ছিল।
ট্রাম্প কখনও চুক্তি আসন্ন বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন, আবার কখনও ইরান তার শর্ত না মানলে সামরিক অভিযান পুনরায় শুরু করার হুমকি দিয়েছেন। চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পরও এর পূর্ণাঙ্গ পাঠ কয়েক দিন গোপন রাখা হয়।
মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীরা জানিয়েছিলেন, ইরান অভ্যন্তরীণ কারণে প্রকাশ বিলম্ব করতে চায়।

অবশেষে এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা সাংবাদিকদের সামনে চুক্তিটি পড়ে শোনান। কর্মকর্তারা আরও জানান, আনুষ্ঠানিক নথির বাইরে কিছু ‘জেন্টলম্যানস অ্যাগ্রিমেন্ট’ বা অনানুষ্ঠানিক সমঝোতাও রয়েছে।
জেডি ভ্যান্স সাংবাদিকদের বলেন, সমঝোতা স্মারক, অনানুষ্ঠানিক সমঝোতা, চূড়ান্ত চুক্তি-শব্দগুলো গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো যাচাই-বাছাই।

যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার তাগিদ
হোয়াইট হাউসের অভ্যন্তরে বহুদিন ধরেই যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার উপায় খোঁজা হচ্ছিল। ট্রাম্পের রাজনৈতিক উপদেষ্টারা মনে করছিলেন, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত রিপাবলিকানদের নির্বাচনী সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট বিশ্ব জ্বালানি বাজারের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন।
এক কর্মকর্তা বলেন, সবার মধ্যে একটি উপলব্ধি তৈরি হয়েছিল- যদি পরিস্থিতি এভাবেই চলতে থাকে, তাহলে তা আরও খারাপ হবে। জুনের শুরুতে হোয়াইট হাউসের এক বৈঠকে ট্রাম্প ও তার উপদেষ্টারা ইরানের সঙ্গে একটি প্রাথমিক সমঝোতায় পৌঁছানোর সিদ্ধান্ত নেন, যার লক্ষ্য ছিল হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেয়া এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংসের জন্য একটি বিস্তৃত কাঠামো নির্ধারণ করা।

ইসরাইলের সঙ্গে উত্তেজনা
চুক্তি চূড়ান্ত করার পথে আরেকটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় ইসরাইল-হিজবুল্লাহ উত্তেজনা। বৈরুতের উপকণ্ঠে ইসরাইলি হামলার পর ট্রাম্প ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। তিনি মনে করেন, ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু চুক্তি বানচাল করার চেষ্টা করছেন।
এক উত্তপ্ত ফোনালাপে ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে তীব্র ভাষায় ভর্ৎসনা করেন বলে সূত্র জানিয়েছে।

একই সময়ে কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা তেহরানে ম্যারাথন বৈঠক চালিয়ে যান। ১৭ ঘণ্টার আলোচনার পর ইরান ইসরাইলের দিকে নিক্ষেপের জন্য প্রস্তুত রাখা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সরিয়ে নিতে সম্মত হয়।
তবে ইরান একটি বিষয়ে অনড় ছিল- তারা চায়নি ট্রাম্পের জন্মদিনে চুক্তির ঘোষণা দেয়া হোক। শেষ পর্যন্ত মধ্যস্থতাকারীরা একটি সমঝোতা বের করেন। তেহরানের স্থানীয় সময় মধ্যরাত পেরোনোর পর চুক্তি ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, যা ওয়াশিংটনের সময়ের প্রায় সাড়ে সাত ঘণ্টা আগে।

এর ফলে ট্রাম্প যখন হোয়াইট হাউসের দক্ষিণ লনে জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখনই বিশ্বের সামনে ইরানের সঙ্গে তার প্রশাসনের বহুল আলোচিত সমঝোতার ঘোষণা আসে।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তির অন্তরালের নাটকীয় গল্প

No comments

Powered by Blogger.