সময়ের চেয়ে এগিয়ে by প্রিয়তোষ গুপ্ত

সন্তোষ গুপ্ত ছিলেন আমাদের দেশের একজন ব্যতিক্রমী সাংবাদিক-সাহিত্যিক। স্রোতের গড্ডলিকায় গা না ভাসিয়ে তিনি আমৃত্যু দেশ ও জাতির কল্যাণে নিজেকে নিবেদিত রেখেছিলেন। যাঁর অবদান আমাদের সাংবাদিকতা, সাহিত্য-সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে। যিনি ছিলেন আমাদের সকলের ঊধর্ে্ব। যাঁর মাথা ও কাঁধ ছিল আমাদের সকলের উপরে।


কোনো সৃষ্টিরই সংক্ষিপ্ত কোনো রূপ বা পথ নেই। খ্যাতি বা জনপ্রিয়তা বড় কথা নয়। মৃত্যুর পর বেঁচে থাকাটাই বড় কথা। মৃত্যুর পর সময় উত্তীর্ণ হয়ে সবাই কিন্তু বাঁচে না। যাদের কাজ সময় ও কালকে অতিক্রম করতে পারে, তারাই কেবল বেঁচে থাকেন মৃত্যুর পর প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম। সন্তোষ গুপ্ত বেঁচে থাকবেন তাঁর কাজ ও সৃষ্টির মধ্যে। সাংবাদিকতায় খুব অল্পসংখ্যক মানুষই আছেন, যাদের কাঁধ ও মাথা সকলের থেকে উঁচুতে। সন্তোষ গুপ্ত তাদেরই একজন। এই মানুষগুলো এত বছর পরও সেই উঁচু রয়ে গেছেন। হয়তো উঠে গেছেন আরও উচ্চতায়, যাদের কাছে উচ্চাকাঙ্ক্ষা, ক্ষমতা অথবা অর্থ, অথবা বিবেকহীন রাজনীতির পাকচক্র কোনোটাই তাদের স্পর্শ করতে পারেনি। আমাদের পায়ের নিচে যে শক্ত মাটি আমরা খুঁজি তার নির্মাতা তারাই, যা তারা আমাদের জন্য তৈরি করে গেছেন। মুক্তবুদ্ধি ও স্বাধীন চিন্তার ব্যাপারে সন্তোষ গুপ্ত ছিলেন অনমনীয়। কুসংস্কার, গোঁড়ামি, ধর্মান্ধতার মৌলবাদ, সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে কলম চালিয়েছেন জীবনভর। এসব মনুষ্যত্বকে শৃঙ্খলিত করার উপসর্গগুলোর বিরুদ্ধে যারা সংগ্রাম করছেন বিভিন্ন অবস্থান থেকে তাদের কাছে সন্তোষ গুপ্ত এক নিরন্তর প্রেরণার উৎস। দুঃসময়ের বিহ্বলতা তাঁদের বিভ্রান্ত করতে পারেনি। সন্তোষ গুপ্তের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের পথ হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতা, তাঁর আদর্শ, কর্ম, চেতনা-বিশ্বাস-মূল্যবোধকে নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রতি বিশ্বস্ত থাকার অঙ্গীকার। আজকের বাস্তবতা যাই হোক না কেন, মানব প্রগতির বিকাশই ঘটাতে পারে মানুষের মুক্তি। প্রযুক্তিকে মানবিক কল্যাণে ব্যবহারের জন্য চাই মানবতাবাদী সমাজ। আর এই সমাজ বিনির্মাণে চাই সন্তোষ গুপ্তদের মতো আত্মত্যাগী, প্রবাদতুল্য মানুষ, যাদের জীবনাচার এই করপোরেট যুগে আমাদের উদ্বুদ্ধ করবে মানবসেবায়, প্রগতিশীল মুক্তবুদ্ধির সমাজ নির্মাণে। ব্যতিক্রমী চিন্তাধারার আলোকবর্তিকা নিয়ে সমাজ ও জাতিকে পথ দেখিয়েছেন সন্তোষ গুপ্তরা।
সন্তোষ গুপ্ত_ অসংখ্য প্রবন্ধ-নিবন্ধ-কলাম ও কবিতার জনক। সময়ের চেয়ে অগ্রসর। চিন্তারও অধিক, সম্প্রতি আগামী প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর কালজয়ী কলাম 'অনিরুদ্ধের কলাম'। সন্তোষ গুপ্তের তীক্ষষ্ট ইতিহাসবোধের ছায়ায় অনিরুদ্ধের কলাম স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সিকি শতাব্দীর চলন্ত ইতিহাস।
সন্তোষ গুপ্তের পড়াশোনার জগৎটা ছিল বিশাল। এ কারণেই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও তিনি ধর্ম, রাজনীতি, দর্শন, শিল্পকলার বিভিন্ন জটিল বিষয়ও অবলীলায় বিশ্লেষণ করতে পারতেন। দেশের যে কোনো গণসংগ্রামে সন্তোষ গুপ্ত পিছিয়ে ছিলেন না। এই মনীষী আমৃত্যু জীবনের বাঁকে বাঁকে নতুনের সন্ধান করে গেছেন।
সন্তোষ গুপ্ত সাংবাদিকতা জগতে একটি প্রতিষ্ঠানের নাম। তাঁর জীবন বীক্ষা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে দিতে পারলে এই দুঃসময়ে একজন দেশপ্রেমিক তৈরি করতে খুব কষ্ট হবে না।