১১ বাংলাদেশির মর্মান্তিক মৃত্যু-নিহতদের পরিবারকে উপযুক্ত সহায়তা দেওয়া হোক

বাহরাইনের রাজধানী মানামায় এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে মারা গেছেন কমপক্ষে ১৩ জন। তাঁদের মধ্যে ১১ জনই বাংলাদেশি। বাকিদের পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। আগুনে পুড়ে মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন বেশ কয়েকজন। তাঁরা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
দুর্ঘটনার শিকার আরো বাংলাদেশি থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। এদিকে নিহতদের পরিবারগুলোতে চলছে শোকের মাতম। শোকবিহ্বল এই পরিবারগুলোকে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো কোনো ভাষা আমাদের জানা নেই। অনেকেই জমিজমা বিক্রি করে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যটিকে পাঠিয়েছিলেন। স্বজন হারানোর পাশাপাশি অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দুর্ভাবনাও তাঁদের ঘিরে ধরেছে।
বাহরাইনে অগ্নিকাণ্ডে বাংলাদেশিদের পুড়ে মারা যাওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম নয়। গত বছরও অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছিল। এর আগে ২০০৬ সালেও অনুরূপভাবে মারা গিয়েছিলেন ১৬ জন বাংলাদেশি। বাহরাইন কর্তৃপক্ষ বলেছে, ভবনটি অবৈধভাবে তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু এ ব্যাপারে কেন এর আগে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হলো না, তা আমাদের বোধগম্য নয়। জানা যায়, নিহতদের কারো কারো কোনো স্থায়ী চাকরি ছিল না। তাঁরা যখন যেখানে সুযোগ পেতেন সেখানেই কাজ করতেন। কাজেই তাঁরা যে নিয়োগকারী কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বড় ধরনের ক্ষতিপূরণ বা সহযোগিতা পাবেন, তাও নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তাহলে নিহতদের পরিবারগুলো এখন কী করবে? নিহত ব্যক্তির সঙ্গে সঙ্গে পরিবারগুলোও কি ধ্বংস হয়ে যাবে? আমরা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিংবা রেমিট্যান্স নিয়ে কত না তৃপ্তি অনুভব করি! কিন্তু আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি, এই রেমিট্যান্স পাঠাতে গিয়ে কত বাংলাদেশিকে বিদেশের মাটিতে কত রকমের ঝুঁকি নিয়ে কি অমানুষিক পরিশ্রম করতে হয়? ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে কিংবা মরুভূমিতে আটকা পড়ে কতজনকে অনাহারে ধুঁকে ধুঁকে মারা যেতে হয়? না, আমরা ভাবি না। ভাবলে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের জন্য দেশে বিশেষ বীমা, ঝুঁকি মোকাবিলায় বিশেষ তহবিল তৈরি করা যেত কিংবা বিদেশে বাংলাদেশের মিশনগুলো তাদের স্বার্থ রক্ষায় আরো তৎপর হতো। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী জানিয়েছেন, নিহত শ্রমিকদের প্রতি পরিবারকে দুই লাখ টাকা ও দাফন-কাফনের জন্য আরো ৩৫ হাজার করে টাকা দেওয়া হবে। কিন্তু চার লাখ টাকা খরচ করে যে পরিবারগুলো তাঁদের বিদেশে পাঠিয়েছিল, সেই তুলনায় এই অর্থ যে কিছুই নয়, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আর এভাবে পরিবারগুলোকে দয়াদাক্ষিণ্যই বা প্রদর্শন করা হবে কেন? যাঁরা এত রকম ঝুঁকি নিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন, তাঁদের বিপদ-আপদে যৌক্তিক সহায়তা প্রদানের জন্য কোনো বিধিবদ্ধ রাষ্ট্রীয় তহবিল কেন এত বছরেও গড়ে উঠল না? অবিলম্বে সেই তহবিল গঠন করা হোক। শুধু নিহতদের পরিবার নয়, দুর্ঘটনায় যাঁরা আহত হয়েছেন তাঁদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা ও তাঁদের পরিবারগুলোকে সহায়তা প্রদান করাটাও অত্যন্ত জরুরি। কারণ তাঁদের আয়ের ওপরই পরিবারগুলো নির্ভরশীল। পাশাপাশি নিহতদের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে আত্মীয়-স্বজনের কাছে হস্তান্তর করাটাও অত্যন্ত জরুরি।
আমরা চাই, জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আরো সুচিন্তিত নীতিমালা গ্রহণ করুক। বিদেশে বাংলাদেশিদের অধিকার রক্ষা, ক্ষেত্রবিশেষে আইনি সহায়তা দেওয়া, বিপদ-আপদে উপযুক্ত আর্থিক ও কূটনৈতিক সহায়তা প্রদানসহ নানা ব্যাপারে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে- এমনটাই আমাদের প্রত্যাশা।