প্রখ্যাত সাংবাদিক কে. জি. মুস্তাফা আর নেই

ভাষাসৈনিক, খ্যাতিমান সাংবাদিক ও কূটনীতিক কে. জি. মুস্তাফা আর নেই। ল্যাবএইড হাসপাতালে শুক্রবার রাত দেড়টায় (শনিবার প্রথম প্রহরে) শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্নালিল্লাহি...রাজিউন)।
মৃতু্যকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। কিডনি ও হৃদরোগ ছাড়াও বার্ধক্যজনিত নানা সমস্যায় ভুগছিলেন তিনি। তাঁর মৃত্যু সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাংবাদিক অঙ্গনসহ রাজনৈতিক অঙ্গনেও নেমে আসে শোকের ছায়া। অনেকেই তাঁকে এক নজর দেখতে ছুটে যান হাসপাতালে। তাঁর মৃতু্যতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা, দল ও সংগঠন শোক প্রকাশ করে। তাঁর পুত্র বিবিসি বাংলা বিভাগের প্রধান সাবির মুসত্মাফা লন্ডন থেকে না আসা পর্যনত্ম তাঁর মরদেহ ল্যাবএইডের মরচু্যয়ারিতে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাঁর পরিবার। উল্লেখ্য, সাবির মুস্তাফা আজ রবিবার ঢাকায় আসবেন। আজই তাঁর দাফনের সম্ভাবনা রয়েছে। বিকেল তিনটায় জাতীয় প্রেসকাবে এই প্রথিতযশা সাংবাদিকের নামাজে জানাজার আয়োজন করা হয়েছে।
ল্যাবএইড হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, কে. জি. মুস্তাফা গত ৮ ফেব্রুয়ারি ভর্তি হন। ১৬ ফেব্রুয়ারি তাঁকে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে নেয়া হয়। তিনি ডা. সোহরাবুজ্জামানের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাঁর চিকিৎসার জন্য ৭ সদস্যের একটি মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হয়েছিল। নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের ডাক্তার সূত্রে জানা গেছে, কে. জি. মুস্তাফা শুক্রবার দিবাগত রাত দেড়টার (শনিবার প্রথম প্রহরে) তাঁর পালস আর পাওয়া যায়নি।
কে. জি. মুস্তাফা ১৯২৮ সালে সিরাজগঞ্জের কুড়িপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ব্রিটিশ আমল থেকে তিনি অবিভক্ত বাংলার কলকাতায় সাংবাদিকতা শুরম্ন করেন। পরে দৈনিক আজাদ, ইত্তেহাদ, ইনসাফ, ইত্তেফাক, বাংলাদেশ অবজারভার ও সংবাদে কাজ করেন। এ ছাড়া সাপ্তাহিক ইরাক টুডে ও দৈনিক বাগদাদ পত্রিকাতেও কাজ করতেন। শেষে বিলুপ্ত মুক্তকণ্ঠের সম্পাদকও ছিলেন তিনি। দেশের সাংবাদিকতার উন্নয়নে তিনি দিকনির্দেশনামূলক ভূমিকা পালন করেন। তৎকালীন পাকিসত্মান ফেডারেল ইউনিয়নের সভাপতি এবং স্বাধীনতাউত্তর বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি । স্বাধীনতার পরে লেবানন ও ইরাকে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্বও পালন করেন তিনি ।
তিনি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠজন ছিলেন। তাঁরা দু'জনে একই সঙ্গে কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে পড়তেন। '৫২-এর ভাষা আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী ছিলেন তিনি। এক সময় কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গেও যুক্ত হয়েছিলেন। বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবনের জন্য তিনি একুশে পদকসহ বিভিন্ন সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর শোকবাণীতে বলেন, কে. জি. মুসত্মাফা জাতির জনকের ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন। সারা জীবন বাঙালী জাতির সার্বিক কল্যাণে নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের সময় তিনি ইরাকের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। এই নির্মম হত্যাকা-ের প্রতিবাদে তিনি দীর্ঘদিন স্বেচ্ছানির্বাসনে ছিলেন। অন্যায়ের কাছে তিনি কখনও মাথা নত করেননি। সাংবাদিকদের রম্নটি-রম্নজির আন্দোলনে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করে গেছেন। তাঁর মৃতু্যতে দেশ একজন অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক ও প্রথিতযশা সাংবাদিক ব্যক্তিত্বকে হারাল। প্রধানমন্ত্রী মরহুমের রম্নহের মাগফেরাত কামনা করেন ও শোকসনত্মপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত ও সাংবাদিক কে. জি. মুসত্মাফার মৃতু্যতে গভীর শোক ও তাঁর পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, তাঁর মতো মুক্তমনের মানুষকে হারিয়ে অপূরণীয় ৰতির সম্মুখীন হয়েছি আমরা।
তাঁর মৃতু্যতে আরও শোক প্রকাশ করেন তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মঞ্জুরম্নল আহসান খান ও সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, জাতীয় প্রেসকাবের সভাপতি শওকত মাহমুদ ও সাধারণ সম্পাদক কামাল উদ্দিন সবুজ, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ইকবাল সোবহান চৌধুরী ও মহাসচিব আলতাফ মাহমুদ, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শাহ আলমগীর ও সাধারণ সম্পাদক আবু জাফর সূর্য। তাঁর মৃতু্যতে আরও শোক জানায় জাতীয় গীতিকবি পরিষদ, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, প্রবাস ফাউন্ডেশন, নওল কিশোর সমাজকল্যাণ কেন্দ্র, বাংলাদেশ অনলাইন রিপোর্টার্স সোসাইটি, পিপলস এইড ফর এ্যান্ড রম্নরাল এ্যাসোসিয়েশন, আমরা মুক্তিযোদ্ধার সনত্মানসহ আরও অনেক সংগঠন।