লিচুতলায় চিরঘুমে হুমায়ূন by আশীষ-উর-রহমান ও মাসুদ রানা

লিচুবাগানে ত্রিপলের অস্থায়ী ছাউনি টানানো। তার তলায় সদ্য খোঁড়া কবর। সকাল থেকেই আকাশ থমথমে। গতকাল মঙ্গলবার দুপুর ১২টা নাগাদ শুরু হলো তুমুল বর্ষণ। সেই বৃষ্টি মাথায় নিয়েই বাদ জোহর নুহাশপল্লীর লিচুবাগানের সামনে জানাজায় দাঁড়িয়ে গেলেন হাজার হাজার লোক।


বেলা দুইটায় বৃষ্টির বেগ কিছুটা কমে এসেছিল। তবে একেবারে বন্ধ হয়নি। তার মধ্যেই প্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদের মরদেহ নিয়ে এগিয়ে গেলেন স্বজনেরা। একেবারে সামনে নীল পাঞ্জাবি পরা বড় ছেলে নুহাশ। পেছনে ভাই জাফর ইকবাল, আহসান হাবীব ও অন্যান্য স্বজন। তাঁকে শুইয়ে দেওয়া হলো অন্তিমশয্যায়। অগণিত জনের দেওয়া মুঠি মুঠি মাটিতে ঢেকে গেল কবর। তাঁরা হাত তুলে প্রার্থনা করলেন, ‘হে পরম করুণাময়, হুমায়ূন আহমেদের আত্মাকে চিরশান্তি দান করো।’
গাজীপুর সদর উপজেলার পিরুজালী এলাকার চারপাশে শালবন। মাঝখানে ১৯৯৭ সাল থেকে হুমায়ূন আহমেদ হরেক রকমের গাছপালার নিবিড় সন্নিবেশে গড়ে তুলেছিলেন তাঁর বাগানবাড়ি ‘নুহাশপল্লী’। প্রধান প্রবেশদ্বারের পরেই মাঠ ধরে খানিকটা সামনে এগোলেই হাতের বাঁয়ে শিউলিগাছের ছায়ায় নামাজের ঘর। নামাজের ঘরের পাশেই তিনটি পুরোনো লিচুগাছ নিয়ে একটি ছোট্ট বাগান। সকাল সোয়া আটটা থেকে এখানেই কবর খোঁড়া শুরু হয়। এর উত্তরে জামবাগান, আর দক্ষিণে আমবাগান। গতকাল দুপুরে এই লিচুগাছের ছায়াতেই চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন হুমায়ূন আহমেদ।
এর আগে সকাল নয়টার দিকে রাজধানীর বারডেম হাসপাতাল থেকে শববাহী গাড়িতে করে হুমায়ূন আহমেদের মরদেহ নিয়ে নুহাশপল্লীর দিকে যাত্রা শুরু হয়। সঙ্গে ছিলেন তাঁর আত্মীয়স্বজন, গণমাধ্যমকর্মীদের শতাধিক গাড়ির বহর। পুলিশের ভ্যান ছিল সঙ্গে। এ ছাড়া ঢাকা থেকে নুহাশপল্লী পর্যন্ত পথের বিভিন্ন স্থানেও পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল।
এই গাড়ির বহরের সঙ্গেই হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন, তাঁর দুই ছেলে নিষাদ ও নিনিত, শাওনের বাবা মোহাম্মদ আলী, মা তহুরা আলী নুহাশপল্লীতে আসেন। গাড়ির বহর এসে পৌঁছায় বেলা সাড়ে ১১টা নাগাদ। এর আগেই হুমায়ূনের মেজো ভাই মুহম্মদ জাফর ইকবাল ও তাঁর স্ত্রী ইয়াসমিন হক, ছোট ভাই আহসান হাবীব, বড় ছেলে নুহাশ, মেয়ে নোভা, শীলা এবং তাঁদের আত্মীয়স্বজন পৃথক গাড়িতে করে নুহাশপল্লীতে আসেন ।
প্রিয় লেখকের অন্তিমযাত্রা দেখার জন্য উত্তরা থেকে নুহাশপল্লী পর্যন্ত পথের বিভিন্ন স্থানে প্রচুর মানুষ দাঁড়িয়ে ছিলেন। বিশেষ করে, পিরুজালী বাজার থেকে নুহাশপল্লী পর্যন্ত প্রায় আট কিলোমিটার পথের দুই পাশে ছিল গায়ে গায়ে লাগানো নানা বয়সী মানুষের সারি। নুহাশপল্লীতে হুমায়ূন আহমেদকে দাফন করা হবে—এ সংবাদ পেয়ে ভোর থেকেই আশপাশের এলাকার মানুষ জড়ো হতে থাকেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লোকসমাগমও বেড়ে চলে। শববাহী গাড়িটি নুহাশপল্লীতে এলে মর্মস্পর্শী পরিবেশের সৃষ্টি হয়। তাঁকে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানাতে হাজার হাজার মানুষ প্রধান ফটক থেকে কবর পর্যন্ত সারিবদ্ধ কফিনের সামনে আসেন।
পিরুজালী উত্তরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এসেছিল তাদের প্রিয় ‘হুমায়ূন স্যারকে’ শ্রদ্ধা জানাতে। ওই বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্রী লাকী আক্তার অবশ্য তাঁর কোনো বই পড়েনি। তবে নাটক দেখেছে। সে বলছিল, ‘তাঁর নাটক আমার খুব ভালো লাগে। আমরা স্কুলের সবাই এসেছি স্যারকে দেখতে।’
এই গ্রামের মাঝবয়সী নিলুফার খাতুন আরও কয়েকজনের সঙ্গে বসে ছিলেন খেজুরবাগানের পাশে। তিনিও হুমায়ূন আহমেদের কোনো বই পড়েননি। দু-একটি নাটক দেখেছেন। তবে ‘স্যারের জন্য’ তাঁর ভক্তি অন্য কারণে। প্রথম আলোকে জানালেন, তাঁর স্বামী শহীদুল্লাহ নুহাশপল্লীতে কাজ করতেন। খুব অসুখে পড়েছিলেন একবার। স্যার নিজের খরচে তাঁর চিকিৎসা করিয়েছেন। তাঁর স্বামী এখন অবশ্য নুহাশপল্লীতে কাজ করেন না। ‘আজ হ্যায় স্যারের কবর খুঁড়ছে’ বলতে বলতে কেঁদে ফেললেন নিলুফার।
ভক্ত পাঠক, নাটকের অনুরাগীরা তো ছিলেনই, এ ছাড়া গ্রামের অনেক মানুষই এসেছিলেন, যাঁরা হুমায়ূনের কাছ থেকে নানা উপকার বা সহূদয় আচরণ পেয়ে মুগ্ধ ছিলেন। তাঁরা এসেছিলেন প্রিয় মানুষটিকে শেষবারের মতো দেখতে।
দাফনের পর হুমায়ূন আহমেদের মেজো ভাই মুহম্মদ জাফর ইকবাল গাজীপুর জেলা প্রশাসন ও গাজীপুরবাসীর প্রতি তাদের প্রিয় লেখকের অন্তিম বিদায়ে সার্বিক সহায়তা করার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘হুমায়ূন আহমেদের একটা অধ্যায় আজ শেষ হলো। হুমায়ূন আহমেদ বৃষ্টি পছন্দ করতেন। নিউইয়র্কেও তাঁর জানাজায় বৃষ্টি হয়েছে, নুহাশপল্লীতে দাফনের সময়ও বৃষ্টি হলো। এটা তাঁর জন্য একটা সৌভাগ্যের ব্যাপার।’ হুমায়ূন আহমেদ নুহাশপল্লীতে টিনের ছাউনি দেওয়া একটি ছিমছাম বাড়ির নামও রেখেছেন ‘বৃষ্টি বিলাস’।
বৃহদন্ত্রে ক্যানসার ধরা পড়ার পর গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর হুমায়ূন আহমেদ চিকিৎসার জন্য নিউইয়র্কে যান। ১৯ জুলাই তিনি মারা যান। নিউইয়র্কেই তাঁর প্রথম জানাজা হয়। সোমবার তাঁকে ঢাকায় আনা হয়। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সর্বস্তরের জনসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের পর বেলা আড়াইটায় জাতীয় ঈদগাহে তাঁর দ্বিতীয় জানাজা হয়। তবে তাঁর দাফনের স্থান নির্ধারণ করা নিয়ে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দেয়। তাঁর বর্তমান স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন চেয়েছিলেন তাঁকে নুহাশপল্লীত দাফন করা হোক। এই সিদ্ধান্তে তিনি অটল থাকেন। হুমায়ূন আহমেদের বড় ছেলে নুহাশ হুমায়ূন ও তাঁর বোন নোভা আহমেদ, শীলা আহমেদ এবং পরিবারের অন্য সদস্যরা চেয়েছিলেন ঢাকার মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থান বা অন্য কোথাও তাঁকে দাফন করা হোক। সোমবার গভীর রাত পর্যন্ত এ নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ চলতে থাকে। অবশেষে স্থানীয় সরকার ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক এবং সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের নেতাদের মধ্যস্থতায় বিষয়টির সুরাহা হয়। রাত আড়াইটায় নুহাশপল্লীতেই দাফনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
গতকাল বেলা তিনটার দিকে বৃষ্টি ছেড়ে গেল। মেঘ কেটে গিয়ে আকাশ ভরে উঠল ঝলমলে রোদে। লিচুগাছের ভেজা পাতায় সেই রোদের দীপ্তি। তলায় ঘুমিয়ে আছেন এমন এক মানুষ, মৃত্যু যাঁকে অমরত্বের আসন দিয়ে গেছে বাঙালির হূদয়ে।

No comments

Powered by Blogger.