শিল্পীর ভুবন-বহুবর্ণিল জটিলতার সরল স্বীকারোক্তি by জাফরিন গুলশান

বাংলাদেশের ছাপচিত্রচর্চায় কাঠখোদাই মাধ্যমে নান্দনিক ও কৌশলগত অভিনবত্ব এনেছেন শিল্পী আনিসুজ্জামান। বলা যায় তাঁর এ অবস্থানে তিনি এসেছেন পর্যায়ক্রমিক প্রচেষ্টাতেই, অর্থাৎ এর সঙ্গে ছিল তাঁর নিরলস পরিশ্রম ও নতুনত্বের অনুসন্ধান। তাঁর ভাষায়, ‘আমার কাছে মূলত পরিবর্তনটা এসেছে জাপান যাওয়ার পর।


আমি যেভাবে কাঠ খোদাই করি, এর মূল কৌশলটা হলো কাঠের আঁশ নিয়ে খেলা। আর যেহেতু আমার কাজ হলো আর্কিটেকচারাল বিল্ডিং ফর্ম নিয়ে, তাই এ কাজের মূল হলো কনসেপ্টকে পূর্ণাঙ্গ প্রকাশ করা।’
শিল্পী আনিসুজ্জামানের ছেলেবেলা থেকেই ছবি আঁকার প্রতি ছিল প্রবল ঝোঁক। স্কুলের দেয়াল পত্রিকায় প্রচুর অলংকরণ করতে করতে অনেক শুভানুধ্যায়ী স্বপ্ন দেখান কিংবা উৎসাহিত করেন চারুকলায় পড়ার জন্য। ১৯৮৮ সালে এসএসসি পাস করে চারুকলায় ভর্তি হন।
পড়ার প্রথম ভাগেই শিল্পগুরু সফিউদ্দীন আহমেদ আনিসুজ্জামানের কাঠখোদাইয়ের একটি স্টাডিধর্মী কাজ দেখে প্রশংসা করেছিলেন। পরে প্রিয় শিক্ষকের সেই প্রশংসা ও উৎসাহে শিল্পী আনিসুজ্জামান ছাপচিত্রের প্রতি আগ্রহী হন এবং মাধ্যম হিসেবে বেছে নেন।
চারুকলার দিনগুলো স্মরণ করতে গিয়ে আনিসুজ্জামান বলেন, ‘আমরা যখন বিএফএ করেছি, তখন কাঠ খোদাই করার জন্য এখনকার মতো যন্ত্রপাতি পাওয়া যেত না। অ্যান্টিকাটার দিয়ে নানা রকমের খোদাই কাজ করতাম। অনেক কষ্টে হাতে ঘষে ঘষে প্রিন্ট নিতাম আমরা। সেই কাজের অভ্যাস এখনো রয়ে গেছে। এখনো হাতে ঘষেই প্রিন্ট নিই আমি। রাশিয়ান ওল্ড মাস্টারদের কাজ আমার দারুণ পছন্দ ছিল। তাঁদের করা বইয়ের বিভিন্ন অলংকরণ, ব্যবহূত রং নিজের ছাপচিত্রে আনার চেষ্টা করেছি একসময়। ওঁদের মতো রং বানানোর চেষ্টা করতে গিয়ে একসময় নিজের মতো আলাদা করে রং তৈরি করতে শিখে গেলাম। যে কারণে আমার শিক্ষকেরা অনেকেই আমার বানানো রঙের কাজে দারুণভাবে পছন্দ করলেন।’ এভাবেই শিক্ষকদের উৎসাহ, ভালো লাগা আর নিজের চেষ্টায় শিল্পপথে আনিসুজ্জামানের যাত্রা শুরুর অভিজ্ঞতা। আনিসুজ্জামানের বড় একটা ফ্ল্যাটের পুরোটা জুড়ে ছাপচিত্র স্টুডিও। খুব পরিপাটি, গোছানো। এখানে কাঠখোদাই ছাপচিত্র করার জন্য প্রয়োজনীয় সব জিনিস যথাযথভাবে সংগ্রহ ও সংরক্ষরণ করা হয়েছে। দুটো বিশাল বড় টেবিল, তার একটি ব্যবহূত হয় রং লাগানোর কাজে, অন্যটি প্রিন্ট নেওয়ার জন্য। রঙের কৌটা রাখার জায়গা আলাদা, রোলার রাখার তাকও আলাদা। এই সাজানো-গোছানো পরিমার্জিত ও পরিপাটি অবস্থা একজন ছাপচিত্রশিল্পীর প্রধানতম গুণ, তিনি মনে করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ছাপচিত্র বিভাগে শিক্ষকতার সঙ্গে জড়িত তিনি। এর সঙ্গে সংসারের দায়িত্ব পালন করেও প্রতিদিন নিয়ম করে স্টুডিওতে হাজির হন তিনি। এখানেই নতুন কাজ করার পরিকল্পনা করেন। নতুন নতুন সৃজনে মেতে ওঠেন। একজন শিল্পীর অবশ্যই আলাদা, নিজস্ব স্টুডিও থাকা উচিত বলে মনে করেন আনিসুজ্জামান।
আনিসুজ্জামান একজন সমাজ-সচেতন মানুষ হিসেবে নিজের কাজের মধ্যেও নানাভাবে, সমাজের অসংগতি তুলে ধরার চেষ্টা করেন। দীর্ঘদিন যাবৎ কাজ করছেন ‘ক্যালিডোস্কোপিক কমপ্লেক্সসিটি’ শিরোনামের একটি সিরিজ নিয়ে। এই সিরিজের কাজ শুরু হয়েছিল ২০০০ সালে। মেগাসিটির উন্নয়ন জরুরি এবং গুরুত্বপূর্ণ। বড় বড় অট্টালিকা গড়ে ওঠবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে এসব অট্টালিকার নির্মাণ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ আসলে সমাজ-জীবনে যে কী পরিমাণ জটিলতা বাড়াচ্ছে দিনে দিনে—এসবই তাঁর সিরিজের বিষয়।
বাংলাদেশের বর্তমান ছাপচিত্র চর্চা নিয়ে খুব আশাবাদী শিল্পী আনিসুজ্জামান। তিনি বিভিন্ন দেশ ঘুরে দেখেছেন, ধারণা নেওয়ার চেষ্টা করেছেন অন্য দেশের ছাপচিত্রের হালহকিকতের, কোন অবস্থায় আছে ওসব দেশের ছাপচিত্র—কী পর্যায়ে আছে এর চর্চা। সব দেখেশুনে আনিসুজ্জামানের ধারণা, আমাদের দেশে অনেক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও এ সময়ের ছাপচিত্র আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন।
এই পরিশ্রমী শিল্পীর ভবিষ্যৎ-পরিকল্পনা রাশি রাশি। ‘আমি চাই এমন একটি ছাপচিত্র স্টুডিও করতে, যেখানে শুধু উড ব্লকপ্রিন্ট (কাঠ খোদাই) হবে এবং সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে এই স্টুডিও।

শিল্পী পরিচিতি: জন্ম ১৯৭২, পাবনা। ১৯৯৩ সালে বিএফএ ছাপচিত্র বিভাগ, চারুকলা অনুষদ, ঢাবি। ১৯৯৭ সালে এমএফএ রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, ভারত। ২০০৮ সালে জাপানের তামা আর্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর। প্রায় ১২টির মতো একক প্রদর্শনী করেছেন। শিল্পী বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ছাপচিত্র বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত।