জাতীয় নির্বাচনের দেড় বছরের রোডম্যাপ চূড়ান্ত করেছে ইসি- আগামী বছর ২৬ অক্টোবর থেকে ’১৪ সালের ২৪ জানুয়ারির মধ্যে সম্পন্ন করার প্রস্তুতি শুরু

আগামী বছরের অক্টোবর থেকে ২০১৪ সালের জানুয়ারির মধ্যে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের লক্ষ্যমাত্রা ধরে দেড় বছরের ‘রোডম্যাপ’ (কর্মপরিকল্পনা) চূড়ান্ত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। রোডম্যাপ অনুযায়ী, ২০১৩ সালের ২৬ অক্টোবর থেকে ২০১৪ সালের ২৪ জানুয়ারির মধ্যেই সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন করার যাবতীয় প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে


ইসি। সংসদ নির্বাচনের আগে রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল ও সিলেট সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন করার প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। এছাড়া ৪৮১টি উপজেলা পরিষদের নির্বাচনের প্রস্তুতিও নেয়া হচ্ছে। ইসি জানিয়েছে, বর্তমান সংবিধানের আলোকেই জাতীয় নির্বাচন সম্পন্ন করা হবে। অর্থাৎ মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন হবে। তবে জাতীয় নির্বাচনে ইলেকট্রনিক্স ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার করবে না ইসি।
রোডম্যাপ অনুযায়ী আগামী অক্টোবর মাসে নির্বাচনী আইন সংস্কারের জন্য রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সংলাপ করবে নির্বাচন কমিশন। ঈদের পরই শুরু হবে নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণী কাজ। ডিসেম্বরের মধ্যেই সীমানা পুনর্নির্ধারণের কাজ শেষ হবে। সেপ্টেম্বরে নতুন রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের জন্য আবেদন আহ্বান ও ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে নতুন রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের জন্য প্রাপ্ত আবেদনসমূহ নিষ্পত্তি করা হবে। চলতি বছরের ডিসেম্বরে হালনাগাদ ভোটার তালিকার কাজ শেষ করা হবে। ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হবে। এছাড়া জাতীয় সংসদ, সিটি কর্পোরেশন ও উপজেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠানে সম্ভাব্য ভোটকেন্দ্র, ভোটকক্ষ, কী কী উপকরণ কী পরিমাণে প্রয়োজন, তার তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। কমিশন এসব উপকরণ চলতি অর্থবছরের মধ্যেই সংগ্রহের জন্য শীঘ্রই দরপত্র আহ্বানসহ অন্যান্য কাজ দ্রুত শেষ করবে। ২০১৩ সালের নবেম্বরের মধ্যেই আগামী জাতীয় নির্বাচনের সামগ্রিক বাজেট তৈরি করা হবে।
রোডম্যাপ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার শাহ নেওয়াজ সোমবার ইসি সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, নির্বাচন আইন ও বিধিমালা সংশোধনের খসড়া তৈরিসহ অক্টোবরের মধ্যেই রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সংলাপ করা হবে। তিনি জানান, ১৮ ডিসেম্বর খসড়া প্রকাশিত হওয়ার পর ২০১৩ সালের জানুয়ারির মধ্যে ভোটার তালিকা চূড়ান্ত করা হবে। শাহ নেওয়াজ বলেন, রোডম্যাপ বাস্তবায়নের বিষয়ে আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। কিন্তু সময়ের দাবি অনুযায়ী তা পরিবর্তিত হতে পারে। রোডম্যাপ বিষয়ে রবিবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দীন সাংবাদিকদের বলেন, সামনে আমাদের অনেক নির্বাচন করতে হবে। সামনে যেসব নির্বাচনের মেয়াদ পূর্ণ হবে সেসব নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু হচ্ছে। একইসঙ্গে দশম জাতীয় নির্বাচনের রোডম্যাপও চূড়ান্ত করা হয়েছে। রোডম্যাপ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় মালামাল ক্রয়সহ যাবতীয় প্রস্তুতি নেয়া হবে। সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে অনেক সময়ের প্রয়োজন। যাতে সমস্যা না হয় সেজন্য আগে থেকেই প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। এ সময় তিনি জানান, আগামী জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের জন্য নির্বাচন কমিশন প্রস্তুত নয়। একইদিন নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মোবারক বলেন, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী জাতি মেনে নিয়েছে। সুতরাং সেই অনুযায়ী নির্বাচন হবে। সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের জন্য নতুন আইনের কোন প্রয়োজন নেই। তিনি বলেন, সংশোধিত সংবিধান জনগণ না মেনে নিলে এতদিন আদালতে অনেক মামলা হতো। কিন্তু আজ পর্যন্ত এ নিয়ে কোন মামলা হয়নি। আমরা ধরে নিচ্ছি, জাতি এটা মেনে নিয়েছে।
সংবিধানের ১২৩ (৩) অনুচ্ছেদ অনুসারে মেয়াদ শেষ হওয়ার কারণে সংসদ ভেঙ্গে যাওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে সংসদের সাধারণ নির্বাচন হতে হবে। সর্বশেষ নবম সংসদ নির্বাচন হয়েছিল ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর। প্রথম অধিবেশন বসে ২০০৯ সালের ২৫ জানুয়ারি। সেই অনুযায়ী ২০১৩ সালের ২৬ অক্টোবর থেকে ২০১৪ সালের ২৪ জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ লক্ষ্যে প্রস্তুতিও শুরু করেছে ইসি। চলতি আগস্ট মাসে জাতীয় সংসদ নির্বাচন সংশ্লিষ্ট আইন-বিধি সংশোধনী আনয়ন, সেপ্টেম্বরে প্রস্তাবিত আইন ও বিধির খসড়া প্রণয়ন ও খসড়া আলোচনার জন্য চূড়ান্তকরণ, অক্টোবরে নির্বাচনী আইন সংস্কারের জন্য সুশীল সমাজ ও রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ অনুষ্ঠিত হবে। আগামী বছর মার্চে সংসদ নির্বাচন সংশ্লিষ্ট আইন-বিধি সংশোধন সম্পন্ন করে চূড়ান্ত করবে ইসি।
চলতি বছরের ১৮ ডিসেম্বরের মধ্যে হালনাগাদ ভোটার তালিকার কাজ শেষ করা হবে। ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হবে। ফেব্রুয়ারিতে ৩শ’ নির্বাচনী এলাকার সীমানার ভিত্তিতে ভোটার তালিকার সিডি প্রস্তুত ও মাঠ পর্যায়ে প্রেরণ, জুলাই মাসে মাঠ পর্যায়ে যাচাইয়ের পর ভোটার তালিকা মুদ্রণ ও মাঠ পর্যায়ে প্রেরণ, আগস্ট মাসে প্রার্থীদের জন্য নির্বাচনী এলাকাভিত্তিক ভোটার তালিকার সিডি প্রস্তুত ও মাঠ পর্যায়ে প্রেরণ করবে ইসি।
ইসি সংসদ নির্বাচনের আগেই চারটি সিটি কর্পোরেশন ও ৪৮১টি উপজেলা পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করেছে। স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন ২০০৯-এর ৩৪- ধারার ১ (খ) উপধারা অনুসারে সিটি কর্পোরেশনের মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্ববর্তী ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন হতে হবে। রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল ও সিলেট সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন হয়েছে ২০০৮ সালের ৪ আগস্ট। সেই মোতাবেক ২০১৩ সালের মার্চ থেকে অক্টোবরের মধ্যে এসব নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে।
উপজেলা পরিষদ আইন ১৯৯৮-এর ১৭ ধারার (গ) উপধারা অনুসারে পরিষদের মেয়াদ শেষ হওয়ার ক্ষেত্রে মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্ববর্তী ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করার বিধান রয়েছে। সর্বশেষ উপজেলা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০০৯ সালের ২৫ জানুয়ারি। সেই মোতাবেক ২০১৩ সালের ২৫ জুলাই থেকে ২০১৪ সালের ২১ জানুয়ারির মধ্যে উপজেলা পরিষদ নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে।