বীর মুক্তিযোদ্ধা-তোমাদের এ ঋণ শোধ হবে না

৪১৫ স্বাধীনতার চার দশক উপলক্ষে খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে ধারাবাহিক এই আয়োজন। জাফর ইমাম, বীর বিক্রম তুমুল যুদ্ধের দলনেতা ফেনী জেলার অন্তর্গত বিলোনিয়া। ১৬ মাইল লম্বা এবং ছয় মাইল প্রস্থ সরু এক ভূখণ্ড। এলাকাটি অনেকটা উপদ্বীপের মতো।


প্রায় গোটা এলাকাই ভারতের মধ্যে প্রবেশ করেছে। এর তিন দিকেই ভারত সীমান্ত।
১৯৭১ সালের জুন মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত বিলোনিয়া মুক্ত ছিল। এরপর এই এলাকা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দখল করে। বিভিন্ন স্থানে ছিল তাদের প্রতিরক্ষা অবস্থান।
মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে নভেম্বর মাসের প্রথমার্ধে মুক্তিযোদ্ধারা কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে বিলোনিয়ায় পাকিস্তানি সেনাদের অবরোধ করেন। তখন ভয়াবহ যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর পক্ষে নেতৃত্ব দেন জাফর ইমাম।
এ ঘটনা শোনা যাক জাফর ইমামের জবানীতে। ‘অবরোধের কাজ শুরু হলো রাতে। সেদিন টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছিল। তখন শীতকাল। হিমেল হাওয়ায় গাছের পাতায় যেন একটি অশরীরী শব্দ সৃষ্টি করছিল। মুহুরী নদী ও চিলনীয়া নদীর কোথাও বুকপানি, কোথাও কোমরপানি। কোথাও বা পিচ্ছিল রাস্তার বাধা পেরিয়ে এগিয়ে চলেছি সবাই। সে এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা।
ভোর হওয়ার আগেই আমরা সবাই আমাদের নির্ধারিত স্থানে হাজির হলাম। শত্রুদের পরশুরাম ও চিথলিয়া ঘাঁটি পুরোপুরি আমাদের অবরোধের মধ্যে আটকা পড়ল। চিথলিয়া ঘাঁটি থেকে যাতে কোনো প্রকার আক্রমণ না আসতে পারে তার জন্য প্রতিরোধ গড়ে তুললাম।
৯ নভেম্বর। সকাল থেকে তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। শত্রুরা সারা দিন আমাদের বিভিন্ন পজিশনের ওপর তুমুলভাবে আক্রমণ চালাল। আমরাও আক্রমণের দাঁতভাঙা জবাব দিলাম। বৃষ্টির মতো আর্টিলারি আর মর্টার শেলিংয়ের শব্দে আশপাশের নীরব এলাকা কেঁপে উঠতে থাকল। ক্রমে রাত হয়ে এল।
শত্রুরা এবার পরশুরাম ঘাঁটি থেকে আমাদের ওপর প্রচণ্ড আক্রমণ শুরু করল। এই আক্রমণ ছিল অতি ভয়ংকর। আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা তার পাল্টা জবাব দিতে থাকল। শত্রুরা এমনভাবে আমাদের জালে আটকা পড়েছে যে তাদের বের হওয়ার কোনো পথই নেই।
তারপর ভোর হলো। সারা দিন যুদ্ধ চলল। বেলা চারটার দিকে শত্রুরা আমাদের ওপর বিমান হামলা শুরু করল। কিন্তু আমাদের কোনো ক্ষতি করতে পারল না। এদিন গেল। পরের দিনও আগের দিনের মতো ফায়ারিং, শেলিং, আক্রমণ ও প্রতি-আক্রমণ চলল। এদিনও তারা বিমান থেকে বোম্বিং শুরু করল। আমাদের কাছে বিমান বিধ্বংসী অস্ত্র নেই।
পাকিস্তানি পাইলটরা হয়তো জেনেছিল, আমাদের কাছে বিমান বিধ্বংসী অস্ত্র নেই। তাই তারা নিশ্চিন্ত হয়ে নিচ দিয়ে বিমান চালাছিল। শেষ রক্ষা হিসেবে আমরা আমাদের এলএমজি এ কাজে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিলাম। আওতায় আসামাত্র আমাদের সব এলএমজি একযোগে গর্জে উঠল। দুটি বিমান উড়ে গেল। একটি যেতে পারল না। শূন্যে ঘুরপাক খেয়ে ছিটকে পড়ল মাটিতে। কোনো যুদ্ধের ইতিহাসে এলএমজি দিয়ে এর আগে বিমান ভূপাতিত করা হয়নি। আমরা তা-ই করতে পেয়েছি।’
জাফর ইমাম পাকিস্তানি সেনাবাহিনীতে চাকরি করতেন। তখন তাঁর পদবি ছিল ক্যাপ্টেন। ১৯৭১ সালে ঢাকায় ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি ঢাকা থেকে পালিয়ে যুদ্ধে যোগ দেন। পরে দুই নম্বর সেক্টরের রাজনগর সাব-সেক্টরের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে তাঁকে নিয়মিত মুক্তিবাহিনীর কে ফোর্সের অধীন পুনর্গঠিত ১০ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়কের দায়িত্বও দেওয়া হয়।
মুক্তিযুদ্ধে সাহস ও বীরত্বের জন্য জাফর ইমামকে বীর বিক্রম খেতাবে ভূষিত করা হয়। ১৯৭৩ সালের সরকারি গেজেট অনুযায়ী তাঁর বীরত্বভূষণ নম্বর ১২।
জাফর ইমামকে ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে বাধ্যতামূলক অবসর প্রদান করা হয়। তখন তাঁর পদবি ছিল লেফটেন্যান্ট কর্নেল। তাঁর পৈতৃক বাড়ি ফেনী জেলার ফেনী পৌর এলাকার মিজান রোডে। বাবার নাম শেখ ওয়াহিদুল্লাহ চৌধুরী। মা আজমেরি বেগম। স্ত্রী নূরমহল বেগম। তাঁদের কোনো সন্তান নেই।
সূত্র: রাফিয়া চৌধুরী ও বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ দলিলপত্র। দশম খণ্ড।
গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান
trrashed@gmail.com