দুর্নীতির বিষবৃক্ষ

বিশ্বে দুর্নীতির শীর্ষস্থানে থাকার অপবাদ ঘুচলেও বাংলাদেশে দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়ার ক্ষেত্রে তেমন কোনো আশা-জাগানিয়া চিত্র নেই। এখনো যে মাত্রায় দুর্নীতি আমাদের সমাজে বিস্তৃত, তা মোটেই শুভ লক্ষণ নয়। সরকারি অফিস-আদালতে যে যেভাবে পারে, দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমগ্ন। যেন এটাই স্বাভাবিক।


সর্বস্তরে দুর্নীতির কারণে দেশের 'অগ্রগতির চাকা' পেছনে ঘুরছে বলে যে কথাটি চালু আছে, তা থেকেও যেন আমাদের মুক্তি নেই। এর ফলে শুধু অগ্রগতি ব্যাহত হওয়া নয়, মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণের ক্ষেত্রেও দুর্নীতি অন্যতম প্রতিবন্ধক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।
বাংলাদেশের দারিদ্র্য বিমোচনের ক্ষেত্রেও বড় রকমের বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে দুর্নীতি। বিশেষ করে দাতা সংস্থা ও দেশগুলো বাংলাদেশে অনুদান পাঠানোর সময় এই একটি প্রসঙ্গ উত্থাপন করে থাকে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের মাধ্যমে যে রেটিং হয়, সে ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অবস্থানকে তুলে ধরা হয়। দেশের ভাবমূর্তিও নির্ভর করে এই দুর্নীতির হ্রাস-বৃদ্ধির ওপর। বাংলাদেশ জাতিসংঘের দুর্নীতিবিরোধী কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে দুর্নীতির খতিয়ান, বিশেষ করে দুর্নীতি প্রতিরোধের ক্ষেত্রে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ ও সাফল্যের একটি খতিয়ান জাতিসংঘকে সরবরাহ করতে হবে। এ ব্যাপারে জাতিসংঘ বাংলাদেশকে একটি ফরমও পাঠিয়েছে। এই ফরম পূরণ করে পাঠানোর পর তা জাতিসংঘ পর্যালোচনা করবে। সেই অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেবে তারা। তবে দুর্নীতি প্রতিরোধে যদি বাংলাদেশ এগিয়ে গিয়ে না থাকে, তাহলে দেশের দুর্নামই শুধু বাড়বে না, বরং বিদেশি সাহায্য সংস্থা কিংবা দাতা দেশগুলো বাংলাদেশের সহায়তা প্রদানের পরিমাণ কমিয়ে দিতে পারে। কোনো কোনো সংস্থা হয়তো সহযোগিতার হাত গুটিয়েও ফেলবে। কিন্তু সরকারের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্নীতির খতিয়ান তারা নিজেরাই দেবে_এখানেই বিপত্তির কথা। দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কেউ কি নিজের দোষ প্রকাশ করবে? আর সেই প্রতিবেদন তৈরি হলেও তা যে যথাযথ হবে না, তাও অনুমান করা যায়।
অথচ বর্তমান মহাজোট ক্ষমতায় আসার আগে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, ক্ষমতায় এলে তারা দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) স্বাধীন এবং আরো শক্তিশালী করবে। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে এর বিপরীতটাই আমরা ঘটতে দেখেছি। সরকার এখন আইন করেছে, সরকারি কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে মামলা করতে হলে আগে অনুমতি নিতে হবে। এই অস্বাভাবিক আইনটির মাধ্যমে দুদকের স্বাধীনতা খর্ব করা হয়েছে। দুদক দুর্বল হয়েছে। আর এর মাধ্যমে দুর্নীতি সম্প্রসারণের পথই প্রশস্ত করা হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতি কমানোর আগে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলো যদি নিজেদের কর্মিবাহিনীকে দুর্নীতিগ্রস্ত করার চেষ্টা না করে, তাহলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও দুর্নীতির মাত্রা কমে যাবে। এ মুহূর্তে রাজনৈতিক সদিচ্ছার কোনো বিকল্প নেই। সরকার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিলে এবং তা বাস্তবায়ন করতে পারলে দুর্নীতি প্রতিরোধ হতে পারে। বাংলাদেশ থেকে দুর্নীতি রোধ করতে হলে জনসচেতনতাও বাড়াতে হবে। সেই কাজটিও সরকারিভাবেই করতে হবে।