ত্রাণকর্তা থেকে পতিত শাসক

তাকে বলা হতো যুদ্ধজয়ী বীর। দেশের ত্রাণকর্তা। উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার প্রতীক। কিন্তু ৮৪ বছর বয়সে জনতার দাবিতে আদালতের মাধ্যমে পেলেন যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ। গত বছরের প্রথম দিকে আরব বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল (লোকসংখ্যা ৮ কোটি) এ দেশটিতে প্রবল গণঅভ্যুত্থানে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন।


হোসনি মোবারককে ক্ষমতায় থাকার সময়ে ছয়বার প্রাণে মারার চেষ্টা হয়েছিল। ক্ষমতায় বসার ঠিক আগ মুহূর্তেও তার জীবন যেতে পারত। ১৯৮১ সালে কায়রোর যে সামরিক প্যারেডে মিসরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদতকে গুলিতে ঝাঁঝরা করে দেওয়া হয়, তিনি ছিলেন সেই মঞ্চেই ঠিক পাশে দাঁড়ানো। তিনি শপথ নিয়ে পূর্বসূরির আমলে আটক দেড় হাজার রাজনৈতিক নেতাকর্মীকে মুক্ত করে দেন।
তবে সে সময়ে কেউ ভাবেনি যে, মোবারকের শাসন এত দীর্ঘস্থায়ী হবে। তিনি জনগণের প্রতিবাদ দানা বাঁধতে দেননি। বিরোধী দল গঠন করতে দেননি। টানা তিন দশক তিনি ক্ষমতায় ছিলেন। আর এ পুরো সময়েই দেশে ছিল জরুরি অবস্থা। যে কাউকে যে কোনো সময় গ্রেফতারের আদেশ দিতে পারতেন তিনি। জনগণকে সম্পূর্ণভাবে মৌলিক অধিকারবঞ্চিত রাখা হয়েছিল এ সময়ে। তার যুক্তি ছিল ইসলামী জঙ্গিদের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করতে হলে এর বিকল্প নেই। যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্রদের ভয় ছিল, সত্তরের দশকের শেষ দিকে ইরানে যে ইসলামী বিপ্লব শুরু হয় তার ঢেউ মিসরেও আছড়ে পড়বে। কিন্তু হোসনি মোবারক সেটা ঘটতে দেননি। তিনি একদিকে মুসলিম ব্রাদারহুডকে দমন করেন, পাশাপাশি ইসরায়েলের সঙ্গেও সম্পর্ক গড়ে তোলেন। তবে তার শাসনামলেই আরব বিশ্বের নেতৃত্বের অবস্থান থেকে মিসরকে হটে যেতে হয়। তেলসমৃদ্ধ সৌদি আরব এবং আরও কয়েকটি দেশ সামনের কাতারে চলে আসে।
হোসনি মোবারকের জন্ম ১৯২৮ সালে। ১৯৫০ সালে তিনি বিমানবাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৭৩ সালে ইসরায়েলের সঙ্গে মিসরের যুদ্ধে তিনি বিমানবাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন। মিসরবাসীর বিশ্বাস, এ যুদ্ধে তাদেরই জয় হয়েছে এবং এর কৃতিত্বের অন্যতম দাবিদার হোসনি মোবারক। তার স্ত্রী সুজানে ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত। জীবনে মোবারক ধূমপান করেননি, মদ ছুঁয়ে দেখেননি। সুস্থ-সবল জীবন ছিল তার। প্রতিদিন সকাল ৬টায় ব্যস্ত জীবন শুরু হতো তার। জিমনেশিয়ামে যেতেন রুটিন করে। এক রক্তাক্ত প্রেক্ষাপটে ক্ষমতায় আসার পর রুটিন করেই তিনি দেশে প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচনের ব্যবস্থা করতেন। এ নির্বাচনে তার কেউ প্রতিদ্বন্দ্বী থাকত না। একটি মাত্র নাম থাকত ব্যালট পেপারে এবং 'সব ভোটার তাকে ভোট দিত'। তবে চতুর্থবারের নির্বাচনে (২০০৫) তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা মেনে নেন। ৮৮ শতাংশ ভোট পেয়ে তার জয়ী হতে কোনো সমস্যা হয়নি। তিনি সব ক্ষমতা কুক্ষিগত রেখেছিলেন। তিন দশক আগে দায়িত্ব গ্রহণের সময় তিনি ছিলেন দেশের ভাইস প্রেসিডেন্ট। কিন্তু নিজের শাসনামলে কাউকে এ পদে নিয়োগ দেননি। তার শাসনের শেষের দিকে জনমনে ধারণা হয়, পুত্র জামাল মোবারককে পররর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব অর্পণ করা হবে। জামাল ক্রমে দলের সর্বময় কর্তৃত্ব হাতে নেওয়ায় এ ধারণা জোরালো হতে থাকে। হোসনি মোবারক বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, আজীবন তিনি দেশের সেবা করে যেতে চান। জনসাধারণ এটাকে আমৃত্যু প্রেসিডেন্ট থাকার অভিলাষ হিসেবেই দেখত। তিনি ১০০ ভাগ ভোটে বারবার নির্বাচিত হয়েছেন। কিন্তু তার প্রতি জনগণের সমর্থন যে আদৌ ছিল না, তার প্রমাণ ছিল গত বছর মিসরজুড়ে বিক্ষোভের ঘটনা। তিনি মিসর ও ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখেছেন। কিন্তু এ সম্পর্ক তাকে বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারেনি।
তিনি ব্যাপক উন্নয়নের দাবি করেন। আবাসন খাতের চিত্র দেখে অনেকের কাছে তা বিশ্বাসযোগ্য মনে হতে পারে। কিন্তু ব্যাপক বেকারত্বের চিত্র ভিন্ন মিসরের কথা বলে। দেশটিতে বেকারের সংখ্যা ২৫ লাখ। তার শাসনামলে মুষ্টিমেয় লোকের হাতে দেশের সম্পদ পুঞ্জীভূত হয়েছে। গ্গ্নোবাল কোয়ালিশন অ্যাগেইনস্ট করাপশনের রিপোর্টে মিসরকে বিশ্বের শীর্ষ দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় রাখা হয়েছে।
সংবাদপত্র, থিয়েটার ও সিনেমায় যাতে কোনোভাবেই ভিন্ন মতের প্রতিফলন না ঘটে, সে বিষয়ে তিনি ছিলেন সদাসতর্ক। জনস্বার্থের ক্ষতিকর কাজে লিপ্ত থাকার জন্য সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন চালানো হতো নিয়মিত। সরকারের সমালোচনা করার অধিকার কারও ছিল না। আল দুস্তোর সংবাদপত্রের সম্পাদক ইব্রাহিম ইশা বলেন, মিসরে সাংবাদিকরা থাকেন কারাগারে আর ব্যবসায়ীরা মুক্ত জীবনে।
হোসনি মোবারকের স্বাস্থ্য ভেঙে পড়েছে। আদালতে হাজিরা দিতেন স্ট্রেচারে করে। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সময়কাল তার জন্য কতটা দীর্ঘায়িত হয়, সেটাই দেখার বিষয়।

স সূত্র : বিবিসি ও নিউইয়র্ক টাইমস
 

No comments

Powered by Blogger.