দেখে শুনে লেখা-গোপনীয়তা-প্রবণ একটি হাসপাতাল by মশিউল আলম

অর্থোপেডিক বিভাগের একটি ওয়ার্ডে রোগীরা কাতরাচ্ছে। সব সিস্টার সার ধরে ডেস্কে বসে গল্পগুজবে মশগুল। ইলেকট্রিকের তারে যেন সারি বেঁধে বসে কলকাকলি করছে পাঁচ-সাতটি পাখি। ব্যাগ থেকে ক্যামেরা বের করে ছবি তুলতে লাগলাম।


ফ্ল্যাশলাইটের আলো ঝলকে উঠলে সিস্টারদের মধ্যে এমন শোরগোল পড়ে গেল, যেন মহা সর্বনাশ হয়ে যাচ্ছে: ‘আরে, আরে, ছবি তুলতেছে!’ সিস্টারদের আর্তনাদে ছুটে এলেন এক দশাসই ব্রাদার। আমাদের ক্যামেরাসুদ্ধ গ্রেপ্তার করে নিয়ে চললেন, কারণ ছবি তোলা নিষেধ আছে। ছবি তোলাই শুধু নয়, সাংবাদিকদের এই হাসপাতালে ঢোকাও নিষেধ; ঢুকতে হলে ‘পারমিশন’ নিতে হয়; আমরা কার পারমিশন নিয়ে ঢুকেছি...।
এ হলো রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। ঘাড়ে-গর্দানে দশাসই ব্রাদার, পরে যাঁর নাম জানতে পারব ব্রাদার মামুন, যিনি মারপিট করতে ওস্তাদ, আমাকে ও প্রথম আলোর রাজশাহী প্রতিনিধি আবুল কালাম আজাদকে পাকড়াও করে ডানে ও বাঁয়ে কয়েকটি করিডর হাঁটিয়ে নিয়ে এসে ঢুকলেন একটি কক্ষে। সেখানে কয়েকজন তরুণ চিকিৎসক কিছু নিয়ে ব্যস্ত। ব্রাদার নালিশ করলেন, আমরা সাংবাদিক, হাসপাতালে ঢুকে ছবি তুলেছি।
নালিশ শুনে ভীষণ খেপে উঠলেন এক তরুণ চিকিৎসক। তিনি আমাদের এসব কথা বললেন: ‘আপনারা কার পারমিশন নিয়ে ঢুকেছেন? আমি যদি আপনাদের প্রতিষ্ঠানে যাই, তাহলে কি আপনাদের পারমিশন ছাড়া ঢুকব? কার্টিসি জ্ঞান নাই? সাংবাদিক হয়েছেন, লেখাপড়া শেখেননি?’ আমরা তাঁর নাম জানতে চাইলাম। তিনি বললেন, তাঁর নাম ঘরের বাইরে দরজায় সাইনবোর্ডে লেখা আছে। আমরা বললাম, ঢুকে পড়েছি, পারমিশন ছাড়া ছবি তুলেছি—এখন আমাদের কী হবে?
‘আসেন আমার সাথে’ বলে রাগী তরুণ চিকিৎসক আমাদের নিয়ে গেলেন পাশের একটি কক্ষে। সেটি অর্থোপেডিক বিভাগের প্রধানের কক্ষ। অধ্যাপক বি কে দাম নিজের চেয়ারে উপবিষ্ট। তাঁর কাছে আমাদের বিরুদ্ধে নালিশ করা হলো। তিনি আমাদের পরিচয় পেয়ে তরুণ চিকিৎসক ও ব্রাদারকে চলে যেতে বললেন। তাঁরা বেরিয়ে গেলেন। হাসপাতালটির সিস্টার, ব্রাদার ও মেডিকেল অফিসারদের মধ্যে গোপনীয়তার প্রবণতা ও সাংবাদিক-বিদ্বেষের কারণ জানতে চাইলাম অধ্যাপক বি কে দামের কাছে। তিনি ওই তরুণ চিকিৎসকের দুর্ব্যবহারের জন্য দুঃখ প্রকাশ করলেন এবং তাঁর নাম বলে জানালেন, ওই সহকারী রেজিস্ট্রার পদধারী তরুণটি একটু বদমেজাজি। এর আগেও তিনি একাধিকবার ‘গন্ডগোল’ করেছেন।
কিন্তু একজন ডাক্তারের ব্যক্তিগত আচরণের সমস্যা নয়, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এক অস্বাভাবিক গোপনীয়তা-প্রবণ সরকারি চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান। হাসপাতালটির উপপরিচালকসহ একাধিক চিকিৎসকের সঙ্গে আলাপ করতে গিয়ে প্রসঙ্গক্রমে জানা গেল, ব্রিগেডিয়ার বজলে কাদের নামে একজন ভূতপূর্ব পরিচালক এই মর্মে একটা ‘আইন’ করেছিলেন যে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কোনো সাংবাদিক ঢুকতে পারবেন না। কিসের বলে তিনি এহেন ‘আইন’ করেছিলেন তা কেউ বলতে পারেন না। সেই পরিচালক অনেক আগেই চলে গেছেন, বর্তমান পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল লতিফ এসে ওই হাস্যকর আইনটি তুলে দিয়েছেন। তিনি অত্যন্ত খোলা মনে সংবাদকর্মীদের সঙ্গে কথা বলেন, আমাদের সঙ্গেও বললেন। কিন্তু সাধারণ চিকিৎসক, সিস্টার, ব্রাদারসহ প্রায় সব কর্মচারীর মধ্যে গোপনীয়তার ওই মনোভাবটা এখনো প্রবলভাবে রয়ে গেছে। এখনও মাঝে মাঝেই ব্রাদার-সিস্টাররা সাংবাদিকদের এই বলে ধমকান: ‘বজলে কাদের স্যার থাকলে দেখে নিতাম!’
গোপনীয়তার প্রবণতা কাজ করে সেখানে, যেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা ঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করেন না। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দায়িত্ব পালন না করা একটা রীতি বা সংস্কৃতির রূপ পেয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অধ্যাপক বললেন, হাসপাতালটির চিকিৎসকেরা কখন হাসপাতালে থাকেন, কখন থাকেন না, তার কোনো নিয়মকানুন নেই। হাসপাতালটির সব বিভাগের নিয়মিত অস্ত্রোপচার বন্ধ আছে জুন মাসের ২৮ তারিখ থেকে, কারণ অ্যানেসথেটিস্ট-সংকট। পুরো হাসপাতালে অ্যানেসথেটিস্টের পদ মাত্র ছয়টি। অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপকেরাও অ্যানেসথেসিয়া জানেন, কিন্তু তাঁরা হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের সময় তাঁদের সে বিদ্যা ব্যবহার করেন না, করেন হাসপাতালের বাইরে, বেসরকারি ক্লিনিকগুলোতে অস্ত্রোপচারের সময়। অ্যানেসথেসিয়া বিভাগের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক এম আর খানের কক্ষে গিয়ে দেখা গেল, কক্ষের দরজা খোলা, ভেতরে সিলিং ফ্যান ঘুরছে, কিন্তু তাঁর চেয়ারটি খালি। পাশের ডিউটি রুমেরও একই চিত্র, কেউ নেই। আশপাশে জিজ্ঞেস করে উত্তর পাওয়া গেল, ‘আজকে উনাকে দেখি নাই।’ হাসপাতালের উপপরিচালকের দপ্তরে জিজ্ঞেস করে জানা গেল, অ্যানেসথেসিয়া বিভাগের প্রধান ডা. এম আর খান ছুটিতে আছেন। অ্যানেসথেসিয়া-সংকটে পুরো হাসপাতালের নিয়মিত অস্ত্রোপচার বন্ধ—এই অবস্থায় বিভাগীয় প্রধান ছুটি নেন কোন বিবেচনায়? এ প্রশ্নের সদুত্তর পাওয়া গেল না। ডা. এম আর খান সম্পর্কে একাধিকজন বললেন, তিনি সপ্তাহে অন্তত চার দিন ঢাকায় থাকেন। অর্থোপেডিক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হারুনুর রশীদ গত জানুয়ারি মাস থেকে বিনা নোটিশে অনুপস্থিত—জানালেন তাঁর বিভাগের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা। এটা একজন বা দুজন চিকিৎসকের বিষয় নয়, রাজশাহী মেডিকেল কলেজের সাধারণ সংস্কৃতিই এই।
কেউ কোনো দায়িত্ব পালন না করলে তার কোনো প্রতিকার নেই। এটা বোঝা গেল উপপরিচালকের দপ্তরে বসে কথা বলতে বলতে। সিস্টারদের কাউকে একটু কিছু বললেই তাঁরা ধর্মঘট ডেকে পুরো হাসপাতাল অচল করে দেবেন। তাহলে চিকিৎসকেরা কী করতে পারেন তা বলাই বাহুল্য। কোনো একজন পরিচালক বা উপপরিচালকের পক্ষে এ পরিস্থিতি বদলানো সম্ভব নয়, কারণ এটা এখানকার সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে।
পুরো উত্তরবঙ্গ থেকে রোগীরা চিকিৎসা নিতে আসে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। ৫৪০ শয্যাবিশিষ্ট এ হাসপাতালে নিজস্ব মেডিকেল অফিসার, ইন্টার্ন চিকিৎসক ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক প্রভৃতি পদের চিকিৎসক মিলিয়ে মোট চিকিৎসকের সংখ্যা প্রায় ৫০০। অবশ্য হাসপাতালটিতে সার্বক্ষণিকভাবে রোগী থাকে গড়ে প্রায় দেড় হাজার। দেড় হাজার রোগীর বিপরীতে ৫০০ ডাক্তার নেহাত কম নয়। কিন্তু ডাক্তার, সিস্টার ও ব্রাদারদের দায়িত্ব পালনের সংস্কৃতি এমন যে এ হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা পাওয়া যায়—এ রকম দাবি করা খুব কঠিন। অবশ্য দরিদ্র, অসহায় রোগীরা জানে না চিকিৎসাসেবা কাকে বলে, তা পাওয়ার অধিকার তাদের আছে কি না। তারা যেটুকু পায়, হয়তো ভাবে, সেটুকুই তাদের প্রাপ্য। রোগীদের ‘অ্যাটেনডেন্ট পাস’-এর বিনিময়ে মাথাপিছু কুড়ি টাকা করে নেওয়া হয়, উপপরিচালকের দপ্তর থেকে বলা হলো, কোনো দিন কোনো রোগীর কোনো আত্মীয় এ নিয়ে আপত্তি তোলেননি। রোগীরা হাসপাতালের মেঝেতে (ভাগ্যবান হলে খাটে) পড়ে থাকবে, সিস্টাররা দেখবেন না, ব্রাদাররা দেখবেন না, ডাক্তারদের কথা তো বলাই বাহুল্য। সেই রোগীর শয্যাপাশে থেকে তার দেখভাল করবেন তার কোনো স্বজন—এ জন্য হাসপাতালকে টাকা দিয়ে ‘পাস’ নিতে হবে—এ যে অবিচার, তাও হয়তো বোঝেন না তাঁরা। বা বুঝলেও জানেন, করার কিছু নেই: নিরূপায় দশা!
হাসপাতালটির পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল লতিফ কথায় কথায় বললেন, রোগীর চাপ অনেক বেড়েছে, হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা বাড়িয়ে অন্তত এক হাজার করা প্রয়োজন, আরও অনেক লোকবল নিয়োগ করা প্রয়োজন। নিশ্চয়ই প্রয়োজন; কিন্তু হাসপাতালটির চিকিৎসা-সংস্কৃতি না বদলালে শয্যাসংখ্যা ও লোকবল যতই বাড়ানো হোক, চিকিৎসাসেবার মান বাড়বে না। কিন্তু সে সংস্কৃতি বদলানো কোনো একজন পরিচালকের পক্ষে সম্ভব নয়, হাসপাতাল প্রশাসনের পক্ষেও খুব কঠিন।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল যেন বড় একটা জালের মতো। রোগীরা প্রথমে ওই জালে আটকা পড়ে, কিন্তু সুস্থ হওয়ার বদলে যখন মৃত্যুর দিকে ধাবিত হয়, তখন তারা সেখান থেকে বেরিয়ে বেসরকারি ক্লিনিকগুলোতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। সরকারি হাসপাতালটিতে চাকরিরত যে শল্যচিকিৎসকের পাত্তা মেলে না, তিনিই অস্ত্রোপচার করেন বাইরের বেসরকারি কোনো ক্লিনিকে। রাজশাহী শহরে বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকের সংখ্যা ৯০। সেগুলো চলে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চিকিৎসক ও শল্যচিকিৎসকদের দিয়ে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই যদি রোগীরা ভালো চিকিৎসা পেত, সেখানেই যদি তাদের অস্ত্রোপচার ঠিকঠাকমতো হতো, তাহলে শহরের নব্বইটি বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতাল চলত কী করে?
এটা কায়েমি স্বার্থের ব্যাপার। রাজশাহী শহরে নব্বইটি বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক গড়ে উঠেছে, বেড়ে উঠেছে, এবং ব্যবসা করছে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অদক্ষতা, অব্যবস্থাপনা ও দায়িত্বহীনতাকে পুঁজি করে।
সে-কারণেই কি হাসপাতালটিতে গোপনীয়তার প্রবণতা এমন প্রবল?
রাজশাহী থেকে ফিরে
মশিউল আলম: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।
mashiul.alam@gmail.com