কক্সবাজারেও ভূমিদস্যুদের দৌরাত্ম্য-সৈকতের শোভা বাঁচান, দখলদারদের ঠেকান

গ্রিক পৌরাণিক রাজা মিডাস দেবতার বরে যা ছুঁতেন, তা-ই সোনা হয়ে যেত। বাংলাদেশে অনেকেই আছেন, যাঁদের স্পর্শে সোনা মাটি হয়ে যায়। জাতীয় গর্ব কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের বেলায় সেটাই ঘটেছে। বাণিজ্য আর দখলের কবলে এর সৌন্দর্য, প্রতিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য এখন বিপন্ন।


অতি লোভে রাজা মিডাসের সর্বনাশ ঘটেছিল। খাবার হাতে নিলে তা সোনা হয়ে যেত, কন্যাকে আদর করতে গেলে সে হয়ে যায় সোনার মূর্তি। কিন্তু সোনা খাওয়া যায় না, সোনার কন্যাকে বাঁচানো যায় না। আমাদের বন, নদী, পাহাড়, সমুদ্র—সবই যেন কোনো অভিশপ্ত মিডাসের স্পর্শে জীবন হারাচ্ছে। প্রকৃতি ও নিসর্গের এ ক্ষতি অপূরণীয়।
সরকার কি দেখে না, শোনে না, বোঝে না? বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষিত। গত বছরের ৩ এপ্রিল প্রথম আলো জানায়, সৈকতের আশপাশের পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই কয়েকটি হোটেল-মোটেল তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যম, নাগরিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলো বিশ্বের দীর্ঘতম এই সমুদ্রসৈকতকে রক্ষার জন্য আবেদন-নিবেদন-প্রতিবাদ করে এসেছে; কিন্তু কাজ হয়নি। সরকার অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং ইজারা বাতিলের নির্দেশ দিলেও তা কার্যকর হয়নি। অবশেষে গত সোমবার উচ্চ আদালত সমুদ্রসৈকতে স্থাপিত স্থায়ী-অস্থায়ী সব অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এ রকম নির্দেশ অতীতেও কার্যকর হয়নি, ভবিষ্যতেও হবে কি না, সেটাই দেখার বিষয়।
একশ্রেণীর বিত্তবান ভূমিদস্যু ও ডেভেলপার সংস্থা স্থানীয় প্রশাসনকে হাত করে, উচ্চপর্যায়ে কলকাঠি নেড়ে কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সমুদ্রতীর অজস্র অবৈধ স্থাপনায় ভরে ফেলেছে। তারা গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়েও সৈকতের প্লট এবং হোটেল-মোটেলের কক্ষ ও অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রি করে চলেছে। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় সৈকতপারের অনেক জমি দলীয় লোকজনের মধ্যে ভাগাভাগি হয়। বর্তমান আমলে ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে শর্ত ভঙ্গের অভিযোগে অনেকের ইজারা বাতিল করা হলেও ওই সব জমি ভরাট ও তাতে ভবন নির্মাণ চলছে। এসবের দাপটে সৈকতের মনমোহন ঝাউবন বিলুপ্ত হচ্ছে, ভবনের ভিড়ে সমুদ্র চোখের আড়াল হচ্ছে, কক্সবাজার তার মনোরম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য হারাচ্ছে। অথচ পৃথিবীর দীর্ঘতম এই সমুদ্রসৈকতকে করা যেত বিশ্বের অন্যতম নৈসর্গিক কেন্দ্র। আসন্ন ক্রিকেট বিশ্বকাপে যখন বহু বিদেশি সাংবাদিক ও ক্রিকেটামোদী দর্শক এ দেশে আসবেন, তাঁদের সামনেও কক্সবাজারকে বাংলাদেশের আকর্ষণ হিসেবে উপস্থাপন করা যেত! অথচ কী হতে পারত আর কী হচ্ছে!
কক্সবাজারের ভূমি প্রশাসনসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো কি জবাবদিহির ঊর্ধ্বে? সরকার কি কাগুজে বাঘ, আদালত কি ক্ষমতাহীন বিবেক—এসব প্রশ্নও তাই উঠছে। বাণিজ্যিক স্বার্থের কাছে এই জাতীয় সম্পদের বিনষ্টি ঠেকানোর ব্যবস্থা জানতে আদালত সাত দিন সময় দিয়েছেন। আদেশটি অক্ষরে অক্ষরে পালিত হোক এবং যারা দায়ী, তাদের শাস্তি হোক। সর্বোপরি কক্সবাজারকে দখল ও দূষণমুক্ত রাখা হোক।