শেয়ারবাজার-প্রণোদনা এলেও নেই জোগান বৃদ্ধির চেষ্টা by তৌহিদুল ইসলাম মিন্টু

বাজারে শেয়ারের ঘাটতি আছে। যা_ও বা আছে, সেগুলোর গুণ-মান নিয়ে প্রশ্ন আছে। এই সুযোগে ভুঁইফোঁড় কম্পানির শেয়ারও অতিমূল্যায়িত হয়ে পড়ে, বাড়ে বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি। তবে বাজারে শেয়ারের সরবরাহ বাড়ানোর কোনো উদ্যোগের কথা বলা নেই এই সরকারের ঘোষিত গুচ্ছ প্রণোদনায়। বিশ্লেষকরা বলছেন, ঘোষিত উদ্যোগের ফলে শেয়ারের চাহিদা বাড়তে পারে। তাই দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য জোগান অবশ্যই বাড়াতে হবে।


সরকারি কম্পানির শেয়ারসহ বেসরকারি দেশি-বিদেশি বহুজাতিক কম্পানিগুলোর শেয়ার বাজারে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইন সংশোধন করে কম্পানিগুলোকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হতে বাধ্য করারও দাবি তুলেছেন কেউ কেউ।
সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এঙ্চেঞ্জ কমিশনকে (এসইসি) দেশি-বিদেশি যেকোনো কম্পানির ওপর শর্তারোপ করার ক্ষমতা দেওয়া থাকলেও এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ তারা নেয়নি। ফলে এ কম্পানিগুলো বাজারে আসার আগ্রহ দেখাচ্ছে না। সূত্র মতে, বিদেশি ও বহুজাতিক কম্পানিগুলোক লাইসেন্স দেওয়ার আগে পুঁজিবাজারে আসার কোনো জোরালো শর্ত বেঁধে দেওয়া হয়নি। বেশির ভাগ বিদেশি কম্পানি শাখা অফিস খুলে এ দেশে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে যেসব বিদেশি কম্পানি এ দেশে ব্যবসা করছে, তাদের শাখার পরিবর্তে সাবসিডিয়ারি কম্পানি হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা করতে বাধ্য করতে হবে। নইলে আয়কর বাড়িয়ে দিতে হবে। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হলে সেই বর্ধিত আয়কর থেকে রেয়াত দিতে হবে।
জানা যায়, দেশীয় কম্পানিগুলোর লাইসেন্স প্রাপ্তির ক্ষেত্রে শর্ত থাকে যে প্রাইভেট লিমিটেড হওয়ার তিন বছরের মধ্যে পুঁজিবাজারে আসতে হবে। অন্যথায় জরিমানার আওতায় পড়বে। অথচ বহুজাতিক কম্পানিগুলোকে ব্যবসার জন্য লাইসেন্স দেওয়ার সময় এ ধরনের শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়নি। এ সুযোগ নিয়ে বড় বড় বিদেশি ও বহুজাতিক কম্পানি হাজার হাজার কোটি টাকার ব্যবসা করছে। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণ এর অংশীদারি পাচ্ছে না। মোবাইল ফোন কম্পানি বাংলালিংক, রবিসহ বিভিন্ন কম্পানিকে শেয়ারবাজারে আসতে চাপ দেওয়া হয়েছে। তবে তারাও লোকসানের অজুহাত দেখাচ্ছে বলে জানা যায়।
গত এক বছরে এসইসিতে প্রায় ৪০টি কম্পানি ৫০ কোটির ওপর মূলধন বাড়িয়ে নিয়েছে। এসব কম্পানির ক্ষেত্রেও বাজারে তালিকভুক্তি বাধ্যতামূলক। উৎপাদনে থাকলে এক বছরের মধ্যে এবং না থাকলে তিন বছর মধ্যে বাজারে আসতে হবে। অন্যথায় জরিমানা দিতে হবে নিম্নে এক লাখ টাকা এবং ঊর্ধ্বসীমা নেই। কিন্তু এখন পর্যন্ত এ আইনের আওতায় থাকা একটি কম্পানিকেও জরিমানা করেনি এসইসি। অন্যদিকে বাড়তি চাপে রয়েছে দেশীয় দুর্বল কম্পানিগুলো।
এ দেশে বিদেশি ব্যাংকগুলো শাখা খুলে কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছে। বিদেশি ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্যাংক আল ফালাহ লিমিটেড, সিটি ব্যাংক এনএ, কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলন, হাবিব ব্যাংক লিমিটেড, হংকং সাংহাই ব্যাংকিং করপোরেশন (এইচএসবিসি), ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক ও স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া। বিদেশি ব্যাংকগুলো এ দেশে শাখা অফিস খুলে আইনের আওতামুক্ত রয়েছে। অথচ লোকাল সাবসিডি কম্পানি হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ দিয়ে এসব ব্যাংককে তালিকাভুক্ত করতে বাধ্য করা সম্ভব।
এ ব্যাপারে এসইসির একজন নির্বাহী পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দেশি ও বিদেশি সব কম্পানিই এসইসির আইনের আওতায় পড়বে। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, রেজিস্টার অব জয়েন্ট স্টক কম্পানিজ ও ফার্মের তালিকা অনুসারে দেশে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির বাইরে রয়েছে_এমন ৫০ কোটি টাকার মূলধনী কম্পানির সংখ্যা ৫০টি।
শেয়ারবাজার বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক আবু আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, বিদেশি ব্যাংকসহ বহুজাতিক কম্পানিকে তালিকাভুক্ত করতে হবে। এ জন্য প্রয়োজনে আইনের সংশোধন করতে হবে। তিনি বলেন, বিদেশি ব্যাংকগুলো এ দেশে ব্রাঞ্চ অফিস করে আইনের আওতামুক্ত থাকার চেষ্টা করছে। অথচ লোকাল সাবসিডি কম্পানি হিসেবে এসব ব্যাংককে তালিকাভুক্ত করতে বাধ্য করা সম্ভব। তিনি বলেন, 'ইউনিলিভারের ৪০ শতাংশ সরকারের মালিকাধীন। সরকারের কর্মকর্তাদের মাসিক মাসোয়ারা দিয়ে কম্পানিটি তালিকাভুক্ত করার আওতাবহির্ভূত থেকে যাচ্ছে।'
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার তানজিমুল আলম বলেন, 'কম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তিতে বাধ্য করতে এসইসির সীমাহীন ক্ষমতা রয়েছে। তবে সেটা প্রয়োগ করা হয় না।' তিনি বলেন, অনেক সময় কম্পানিগুলো তালিকাভুক্তি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদনে লোকসান দেখায়। কেননা এসইসির আইনে লোকসানি কম্পানির তালিকাভুক্তির সুযোগ নেই।
অধ্যাপক সালাউদ্দিন আহমেদ খান কালের কণ্ঠকে বলেন, গত ডিসেম্বরের আগে বাজার যখন অতিমূল্যায়িত হয়ে উঠেছিল, তখন সরকারি কম্পানির শেয়ার ছেড়ে সরবরাহ বাড়ালে বিপর্যয় এত মারাত্মক হতো না। মূলত চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাজারের পতন এত তীব্র হয়েছে। তিনি আরো বলেন, এবারের এসইসির ঘোষণায় সরবরাহ বাড়ানোর কোনো দিকনির্দেশনা নেই। পরিচালকদের হাতে ৩০ শতাংশ শেয়ার রাখার বাধ্যবাধকতা জারি করা হয়েছে। পরিচালকরা এই হারে শেয়ার কিনে নিলে শেয়ারের পরিমাণ কমে যাবে। এ কারণে প্রস্তুতি হিসেবে নতুন আইপিও এনে এবং সরকারি শেয়ার ছেড়ে সরবরাহ বাড়ানো জরুরি বলে তিনি মনে করেন।
এদিকে সরকারি ২১টি কম্পানিকে দীর্ঘদিনেও তালিকাভুক্ত করা সম্ভব হয়নি। মন্দা পরিস্থিতির কারণে স্থগিত ছিল সরকারি কম্পানির শেয়ার ছাড়ার প্রক্রিয়া। গত ১০ ফেব্রুয়ারি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত আটটি কম্পানির শেয়ার ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সরকার। কিন্তু পরে তা স্থগিত করা হয়। এর পেছনে যুক্তি ছিল_পড়তি বাজারে নতুন শেয়ার ছাড়লে দাম আরো কমবে, এতে বিনিয়োগকারীদের লোকসানের পরিমাণ যেমন আরো বাড়বে, উপযুক্ত দাম থেকে বঞ্চিত হবে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো। পরে অবশ্য সরকারি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান আইসিবিকে সরকারি কম্পাসির শেয়ার ছাড়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর পরও কোনো অগ্রগতি হয়নি এ ব্যাপারে।
অবশ্য প্রণোদনা ঘোষণাবিষয়ক সংবাদ সম্মেলনে এসইসির চেয়ারম্যান বলেছেন, চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে পার্থক্য যাতে না হয় এ জন্য এসইসি ইতিমধ্যে উদ্যোগ নিয়েছে।