ইরানে হামলা: কংগ্রেসকে এড়িয়ে ইসরায়েলকে ২৭ হাজার বোমা দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

ইরান যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই ইসরায়েলের কাছে ২৭ হাজারের বেশি বোমা বিক্রির তোড়জোড় শুরু করেছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর। বর্তমান ও সাবেক তিনজন মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে এ তথ্য জানা গেছে। এসব বোমার বাজারমূল্য প্রায় ৬৬ কোটি ডলার।

ইরানের নেতৃত্বকে নির্মূল এবং দেশটির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করতে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিলে দেশটিতে আগ্রাসন শুরু করে ইসরায়েল। অথচ গত জুনে মার্কিন হামলায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস হয়ে গেছে বলে দাবি করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর গত শুক্রবার রাতে এক বিবৃতিতে জানায়, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইসরায়েলের কাছে এক হাজার পাউন্ড ওজনের ১২ হাজার বিশাল বোমাসহ অন্যান্য সরঞ্জাম ‘জরুরি ভিত্তিতে বিক্রির’ প্রয়োজনীয়তা দেখছেন। তবে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য ট্রাম্প প্রশাসন এখন পর্যন্ত কংগ্রেসের কোনো অনুমোদন পায়নি।

ইসরায়েলের কাছে যেসব অস্ত্র বিক্রি করা হচ্ছে, তার মধ্যে আরও রয়েছে ৫০০ পাউন্ড ওজনের ১০ হাজার বোমা ও ৫ হাজার ছোট আকারের বোমা। এসব অস্ত্র এবং এর আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম ও পরিষেবার বাজারমূল্য ৫০ কোটি ডলারের বেশি। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর অবশ্য তাদের ঘোষণায় এ বিস্তারিত তথ্য উল্লেখ করেনি।

তবে পররাষ্ট্র দপ্তরের অস্ত্র হস্তান্তর বিভাগে কর্মরত সাবেক কর্মকর্তা জশ পল ও বর্তমান দুজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এগুলো জরুরি অস্ত্র বিক্রির অংশ। স্পর্শকাতর এ অস্ত্র লেনদেনের বিষয়ে কথা বলতে বর্তমান কর্মকর্তারা নিজেদের নাম প্রকাশ করতে চাননি।

ইসরায়েলের কাছে অস্ত্র বিক্রিতে কংগ্রেসকে এড়াতে ‘আর্মস এক্সপোর্ট কন্ট্রোল অ্যাক্ট’-এর অধীন ট্রাম্পের প্রশাসন প্রথমবার আনুষ্ঠানিকভাবে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করল। এর আগে ইসরায়েলে অস্ত্র বা সামরিক সহায়তা পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রশাসন তিনবার কংগ্রেসের অনানুষ্ঠানিক অনুমোদনপ্রক্রিয়া এড়িয়ে গেলেও সে সময় কোনো জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়নি।

এর আগে গত জানুয়ারিতেও কংগ্রেসকে এড়িয়ে ইসরায়েলে মোট ৬৫০ কোটি ডলার মূল্যের চারটি অস্ত্রব্যবস্থা পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছিল পররাষ্ট্র দপ্তর। সেই প্যাকেজে অ্যাপাচি অ্যাটাক হেলিকপ্টার ও যুদ্ধযান অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ অস্ত্র বিক্রির বিষয়টি মাসের পর মাস ধরে কংগ্রেসের দুটি কমিটিতে অনানুষ্ঠানিক পর্যালোচনাধীন থাকলেও শেষ পর্যন্ত রপ্তানির প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় পররাষ্ট্র দপ্তর।

যুক্তরাষ্ট্র প্রতিবছর ইসরায়েলকে ৩৮০ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা দেয়, যা দিয়ে ইসরায়েল অস্ত্র কেনে। এসব সমরাস্ত্র সাধারণত মার্কিন কোম্পানিগুলোর তৈরি হলেও সব সময় তা হয় না। অনেক সময় ইসরায়েল সরাসরি মার্কিন কোম্পানিগুলো থেকে নিজস্ব অর্থায়নেও অস্ত্র কিনে থাকে।

২০২৩ সালে বাইডেন প্রশাসনও ইসরায়েলে অস্ত্র পাঠাতে দুবার জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছিল। এর মধ্যে একটি প্যাকেজে ১৩ হাজার রাউন্ড ট্যাঙ্কের গোলাবারুদ ও অন্যটিতে আর্টিলারি সরঞ্জাম ছিল। এ ছাড়া ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার অভিযান শুরুর পর দেশটিতে দ্রুত অস্ত্র পাঠাতেও দুবার এ জরুরি বিধান ব্যবহার করেছিল বাইডেন প্রশাসন।

ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ২০১৯ সালে ইরানের হুমকি দেখিয়ে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাছে ৮১০ কোটি ডলারের গোলাবারুদ বিক্রি করতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছিল পররাষ্ট্র দপ্তর। ইসরায়েলে এখন যেসব বোমা পাঠানো হচ্ছে, সেগুলো বিক্রির দুটি প্রস্তাবিত প্যাকেজ কংগ্রেসের অনানুষ্ঠানিক পর্যালোচনায় ছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্ট দুটি কমিটি এখন পর্যন্ত সেগুলোর অনুমোদন দেয়নি। অস্ত্র চুক্তির ক্ষেত্রে এভাবে কংগ্রেসকে এড়িয়ে যাওয়ার সমালোচনা করেছেন বেশ কয়েকজন আইনপ্রণেতা।

হাউস ফরেন রিলেশনস কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্য গ্রেগরি ডব্লিউ মিকস বলেন, ইসরায়েলের কাছে গোলাবারুদ পাঠানোর দুটি ক্ষেত্রে কংগ্রেসের পর্যালোচনা এড়াতে যেভাবে আর্মস এক্সপোর্ট কন্ট্রোল অ্যাক্টের জরুরি ক্ষমতা ব্যবহার করা হয়েছে, তা এই প্রশাসনের যুদ্ধসংক্রান্ত যুক্তির মূলে থাকা চরম বৈপরীত্যকেই প্রকাশ করে।

যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের হামলায় নিহত শিশু জয়নাব সাহেবির (২) মরদেহের সামনে এক স্বজনের শোক। গতকাল ইরানের রাজধানী তেহরানে
যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের হামলায় নিহত শিশু জয়নাব সাহেবির (২) মরদেহের সামনে এক স্বজনের শোক। গতকাল ইরানের রাজধানী তেহরানে। ছবি: রয়টার্স

No comments

Powered by Blogger.