খুলনার ভরাট হয়ে যাওয়া সব নদী দখল হয়ে গেছে- ভূমি দস্যুতা সমাচার ॥ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ৩ by অমল সাহা

খুলনায় নদী ও খাস জমি দখলের প্রতিযোগিতা চলছে। ভরাট নদী যে যেভাবে পারছে দখল করে নিচ্ছে। বহমান নদীর তীর ভরাট করে ভবন তৈরি করা হচ্ছে।
আবার পানি থাকতেই ভূয়া কাগজপত্র তৈরি করে নদী ভরাট দেখিয়ে দখল করা হচ্ছে। নদী ভরাটের প্রক্রিয়ায় প্রকৃতি পরিবর্তিত খাস জমিও লোপাট হচ্ছে। ভূমি অফিসের অসৎ কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশে শত শত একর খাস জমি নামে বেনামে দখল করে নিয়েছে ভূমিদস্যুরা। খুলনায় প্রায় সাড়ে ৪শ' একর খাস জমি অবৈধ দখলে এবং সহস্রাধিক একর খাস জমি নিয়ে মামলা মোকদ্দমা রয়েছে। জানা যায়, অপরিকল্পিতভাবে যত্রতত্র বাঁধ ও রাসত্মা নির্মাণ, নদীরপ্রবাহ পথ সঙ্কুচিত করে ব্রিজ তৈরি, নদীর তীর দখল প্রভৃতি কারণে জোয়ার ভাটার নদীতে স্বাভাবিক পানি প্রবাহ ব্যাহত হয়। উজানে পানি প্রবাহ ক্রমাগত হ্রাস পেতে থাকায় এবং আনত্মঃনদীগুলোর মধ্যে পানি প্রবাহ কমে যাওয়ায় প্রায় দুই যুগ পূর্ব থেকে খুলনাঞ্চলের বিভিন্ন নদ নদীতে পলি জমতে থাকে। পলি জমে ইতোমধ্যে কয়েকটি নদী ভরাট হয়ে মানচিত্র থেকে হারিয়ে গেছে। ভরাট প্রক্রিয়ায় আরও অনেক নদী মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন হয়েছে।
খুলনার ময়ূর নদী এখন মৃত। এ নদী অবৈধ দখলদারদের কবলে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা সংলগ্ন ময়ূর নদীর তীরের বেড়ি বাঁধের (রাসত্মার) কালভার্টের মুখ বন্ধ করে ভূমি গ্রাসীরা অবকাঠামো তৈরি করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপ বিষয়টি বার বার প্রশাসনকে অবহিত করার পরও কোন প্রতিকার পায়নি। রূপসা নদীর তীর ক্রমাগত দখল হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে খুলনা শহরের কাস্টমসঘাট থেকে রূপসা সেতু পর্যনত্ম রূপসার তীরে অসংখ্য কাঁচাপাকা স্থাপনা তৈরি হয়েছে। বেড়ি দিয়ে কৃত্রিমভাবে নদী ভরাট করে দখল নেয়া হচ্ছে। পলি জমেও এই নদীর তলদেশ উঁচু হয়ে যাচ্ছে। হামকুড়া নদী মানচিত্র থেকে হারিয়ে গেছে। ভদ্রা, নাইনখালি, শালতা, আঠারো বেকি ও চিত্রা নদী ভরাট হয়ে গেছে। নদী ভরাট প্রক্রিয়ায় কাজীবাছা, শোলমারী, পানখালি, ভৈরব, কপোতাসহ বিভিন্ন নদনদী এখন মারাত্মক হুমকির মুখে। অনুসন্ধানে জানা যায়, ডুমুরিয়া উপজেলার তেলিখালি গ্রাম থেকে শলুয়া বাজার পর্যনত্ম প্রায় ২০ কিলোমিটার এবং বটিয়াঘাটার সুরখালি ইউনিয়নের রায়পুর থেকে ভগবতীপুর ও পাইকগাছা উপজেলার দেলুটি ইউনিয়নের ফুলবাড়ী থেকে তেলিখালি পর্যনত্ম ভদ্রা নদী ভরাট হয়ে গেছে। বটিয়াঘাটা উপজেলার বুনোরাবাদ গ্রাম থেকে কল্যাণশ্রী গ্রাম পর্যনত্ম দীর্ঘ নাইনখালি নদী মরে গেছে। ডুমুরিয়া উপজেলার কাজিরহুলা থেকে বিলডাকাতিয়া পর্যনত্ম হামকুড়া নদীর কোন অসত্মিত্ব নেই। শালতা নদীতে কোন স্রোতধারা নেই। ভরাট এসব নদীর বুকে চাষাবাদ করা হচ্ছে। ডুমুরিয়া সদরে বিলুপ্ত ভদ্রা নদীর ওপর বহু বাড়ি ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। এলাকাবাসী জানায়, ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট মতায় এসে তাদের পছন্দের লোকদের মাঝে খাস জমি বিতরণ শুরম্ন করে। ডুমুরিয়ার একটি বিশেষ পরিবার বিত্তবানদের কাছে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ডুমুরিয়া সদর সংলগ্ন ভরাট হওয়া ভদ্রা নদীর চরের অর্ধশতাধিক বিঘা জমির দখল বিক্রি করে দেয়। তখন থেকেই ডুমুরিয়ায় প্রকৃত ভূমিহীনরা খাস জমি পাওয়ার দৌড় থেকে ছিটকে পড়ে। 'টাকার জোর যার খাস জমি তার'-এই কথা প্রথায় পরিণত হয়। খাস জমি লুটপাটে ভূমি অফিসের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা, কতিপয় দালাল ও অর্থলোভী কিছু জনপ্রতিনিধির সমন্বয়ে একটি চক্র গড়ে ওঠে। ওই চক্র এলাকার মানুষের কাছে ভূমিদসু্য নামে পরিচিত। ভূমি অফিস তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে একথা সকলের মুখে মুখে।