দাম্পত্য- নতুন মা-বাবা হওয়ার আগে by রয়া মুনতাসীর

তিন মাসের শিশু রায়হান। কেঁদেই চলেছে। পাশে বসে আছেন বাবা কবীর ইকবাল (ছদ্মনাম)। বিরক্তি হয়ে তাকিয়ে আছেন, কিন্তু কোলে তুলে নিচ্ছেন না। বিয়ের ছয় মাসের মাথায় তুমি বাবা হতে যাচ্ছ—সংবাদটিতে চমকে ওঠেন কবীর। কারণ, আর্থিকভাবে এখনো স্বাবলম্বী হয়ে উঠতে পারেননি।
তাই সন্তানকে ঘিরে এখন দুশ্চিন্তার শেষ নেই। কবীর ও তাঁর স্ত্রী মুনিয়া ছোট্ট শিশুকে নিয়ে উপভোগ করতে পারছেন না সময়টা। এই দম্পতির মতো অনেকেই আছেন, যাঁরা পরিকল্পনা করার আগেই সন্তান আগমনের খবর পেয়ে যান। কিন্তু নতুন অতিথির জন্য দরকার যথার্থ পদক্ষেপ ও সুন্দর পরিবেশ। এ কারণে নতুন মা-বাবা হওয়ার আগে থেকেই নিতে হবে শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতি।

সন্তান কি ক্যারিয়ারের অন্তরায়?
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পেশার কারণে এখন অনেক দম্পতি সন্তান নিতে চান দেরিতে। কিন্তু যখন হঠাৎ সন্তান এসে যায়, তার জন্য প্রস্তুত থাকেন না তাঁরা। ফলে মানসিক ও শারীরিক নেতিবাচক প্রভাব মা ও সন্তান দুজনের ওপরই পড়তে পারে। উইমেন অ্যান্ড চিলড্রেনস হাসপাতালের স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ (কনসালট্যান্ট গাইনোকোলজিস্ট) জাকিউর রহমান বলেন, দম্পতির সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা তাঁদের আর্থিক অবস্থা, দৈনন্দিন জীবনের রুটিন, বয়স, যৌথ পরিবারে থাকে কি না ইত্যাদি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। পড়াশোনা ও পেশা চক্রের মতো। এর মধ্যে থেকে কখনোই বের হয়ে আসা যায় না। বাসায় বয়স্ক ব্যক্তিরা যত দিন সুস্থ আছেন, পরিবারের নতুন অতিথির দেখাশোনা করতে পারবেন তাঁরা। প্রথম তিন মাস মা কিংবা শাশুড়ির সহযোগিতা খুব দরকার। সুতরাং, জীবনের এই গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের জন্য স্বামী-স্ত্রীকে সময় বের করে নিতে হবে।

সন্তান নেওয়ার যথার্থ সময়
সন্তান নেওয়ার যথার্থ কোনো সময় আছে কি? আমার সময় অনুযায়ী নিলেই তো হবে। অধিকাংশ নারীর এই চিন্তা কিছুটা পর্যন্ত ঠিক আছে। তবে ২৫ থেকে ৩০ বছর বয়স সন্তান নেওয়ার জন্য উপযুক্ত বলে জানান জাকিউর রহমান। ৩০ বছরের পর থেকে মেয়েদের প্রজননক্ষমতা কমতে শুরু করে। এ সময় শারীরিক ফিটনেস ও নমনীয়তা কমে যায়। সন্তান জন্ম নেওয়ার পরবর্তী সময় সমস্যা হতে পারে।

দুজনে মিলে করি সব কাজ
সন্তান নেওয়ার বিষয়টি অনেককেই আতঙ্কিত করে তোলে। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বামী-স্ত্রীর মিলিত উদ্যোগ, একে অপরের প্রতি সহযোগিতামূলক আচরণ এবং মানসিকভাবে প্রস্তুত হওয়ার বিষয়গুলো ধীরে ধীরে গড়ে তুলতে হবে। চেকআপের সময় স্ত্রীর সঙ্গে যাওয়া, শারীরিক সমস্যার সময় পাশে বসে থাকার মতো বিষয়গুলো খুবই দরকার। স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ এবং মিটফোর্ড হাসপাতালের স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মুনা সালিমা জাহান বলেন, সন্তান জন্ম দেওয়া একটি বিশাল পদক্ষেপ। এটি বিনা পরিকল্পনায় করা উচিত নয়। পরিকল্পনার পর থেকে দম্পতিকে যতটা সম্ভব স্ট্রেস কমিয়ে ফেলতে হবে। একসঙ্গে ভালো ও আনন্দময় সময় কাটাতে হবে।
আমাদের অনেক ধরনের শারীরিক সমস্যা থাকে আছে, যেগুলোর চিকিৎসা করা প্রয়োজন। যেমন: থ্যালাসেমিয়া, রক্তস্বল্পতা, উচ্চ রক্তচাপ, বংশগত শারীরিক ত্রুটি কিংবা অসুখ, ফিটনেস, কৃমি ইত্যাদি বিষয়। এ ছাড়া এমন কোনো ওষুধ, যেটাকে বদলানো প্রয়োজন। পরিকল্পনা করার মুহূর্ত থেকেই ফলিক অ্যাসিড খাওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ ভিটামিন খাওয়ার মধ্য দিয়ে বাচ্চার মাথার খুলি তৈরি না হওয়া, স্পাইনগুলো একসঙ্গে জোড়া না লাগানো থাকা ইত্যাদি সমস্যা এড়ানো যায়। খালি চোখে এগুলোকে কোনো ঝামেলাই মনে হবে না। কিন্তু প্রতিটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ বলে জানান মুনা সালিমা জাহান।