তোমাদের নেতা কে? by আসিফ আহমেদ

ম্যাডাম, আপনার জন্য সিকিউরিটি আছে। কিন্তু আমার কী আছে? আমি কী করে নিরাপদে বাড়ি ফিরে যাব? ভারতের ক্ষমতাসীন দল কংগ্রেসের সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধীর কাছে এ প্রশ্ন রেখেছিলেন দিলি্লর এক ছাত্রী। তারা দলবেঁধে এসেছিলেন ১০ জনপথ রোডে কংগ্রেস নেত্রীর সঙ্গে দেখা করতে।
কয়েক দিন আগে দিলি্লতে এক তরুণী ধর্ষিতা হয়েছেন এক যাত্রীবাহী বাসে। ওই বাসটিতে বন্ধুর সঙ্গে সিনেমা দেখে ঘরে ফিরছিলেন তিনি। ধর্ষকরা বাসেরই ড্রাইভার-হেলপার। তারা ইতিমধ্যে আটক হয়েছে। সরকারের দিক থেকে কঠিন শাস্তির অঙ্গীকার করা হয়েছে। পার্লামেন্টে তোলপাড় হয়েছে। কিন্তু বিক্ষোভ থামছে না। প্রতিদিন মোমের আলোয় উজ্জ্বল হচ্ছে কনকনে শীতের রাতের দিলি্ল। পুলিশ জল-কামান ছেড়ে বিক্ষোভকারীদের দূরে সরিয়ে দিতে চাইছে। শীতের মধ্যেও ছাত্রছাত্রীরা ঠাণ্ডা পানিতে ভিজছে, কিন্তু রাজপথ ছাড়ছে না। এ শক্তির উৎস কী?
সোনিয়া গান্ধীর বাসভবনে দলবেঁধে যেসব শিক্ষার্থী এসেছেন তাদের মধ্যে কয়েকজনের সঙ্গে তিনি আলোচনা করতে চেয়েছেন। একজন পুলিশ অফিসার এসে জানতে চাইলেন, 'তোমাদের নেতা কে? কার সঙ্গে নেত্রী কথা বলবেন?'
উত্তর এলো : কোনো নেতা নেই আমাদের। কোনো রাজনীতিক নেই আমাদের মধ্যে। পুলিশ অফিসারের প্রশ্ন : তোমরা কী চাও?
এক নারী এগিয়ে উত্তর দিলেন : আমার মেয়ের নিরাপত্তা চাই।
তার মেয়েও বিক্ষোভকারীদের দলে।
আরেকজন ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশ করে বললেন, আরও মোমবাতি নিয়ে আস। দরকার হলে সারারাত এখানে থাকব। প্রকৃতই, এ বিক্ষোভ স্বতঃস্ফূর্ত। কোনো নেতা নেই। সোনিয়া গান্ধীর নিরাপত্তা অফিসার যখন নাম চাইলেন কয়েকজন নেতার_ তারা পরস্পরের মুখের দিকে তাকাচ্ছিলেন। তাদের বেশিরভাগ পরস্পরকে চেনেন না। কোনোদিন তাদের দেখা হয়নি। যে মেয়েটির লাঞ্ছনার প্রতিবাদে তারা পথে নেমেছেন তাকেও কেউ দেখেননি। কিন্তু তাতে কী হয়েছে? অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে তারা জমায়েত হয়েছেন। কেবল প্রতিবাদ নয়, সমাধানও চাইছেন। রাজনীতিকরা লোকসভায় আলোচনা করেছেন এ ইস্যু নিয়ে। গণবিক্ষোভের মুখে সরকার বেকায়দায়। বিরোধীরা তাতে মজা দেখছে। তাদের আমলেও এমন ঘটনা ঘটেছে। অপরাধীর কোনো দল নেই। এটা সবাই বলছে। কিন্তু এ জন্য কঠোর আইন প্রণয়ন এবং সে আইনের যথাযথ প্রয়োগে তেমন আগ্রহ নেই তাদের। আর এটাই ক্ষুব্ধ করছে তরুণ প্রজন্মকে।
ছাত্রীরা আরেকটি প্রশ্ন উত্থাপন করছে_ ভিআইপিদের নিরাপত্তার জন্য পুলিশের ব্যবহার নিয়ে। দিলি্লতে অনেক ভিআইপি। রাজ্যে রাজ্যেও ভিআইপি। তাদের জন্য পুলিশ দিতে গিয়ে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করায় পুলিশের টান পড়ছে। আর এ থেকেই প্রশ্ন_ সরকারের অগ্রাধিকার কী? যে নেতাদের নিরাপত্তার কারণে বিপুলসংখ্যক পুলিশকে ব্যস্ত থাকতে হয় তাদের কারও কারও কারণেও বিঘি্নত হয় আমজনতার নিরাপত্তা। অপরাধীরা প্রশ্রয় পায় রাজনৈতিক নেতাদের, এটা দিলি্লতে যেমন, তেমনি ভারতের আরও অনেক রাজ্যে। আর এ কারণেই ধর্ষণের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রণয়নের উদ্যোগ শিকেয় ঝুলে আছে। জনতার আদালতে যে অপরাধী, সে হয়তো আশ্রয়-প্রশ্রয় পায় বড় দলগুলোর নেতাদের কাছে।
বাংলাদেশে ধর্ষণের ঘটনা প্রতিদিন কমবেশি ঘটছে। কিন্তু শাস্তি হয় ক'জনের? নারীর প্রতি সহিংসতা মোকাবেলায় কঠোর আইন রয়েছে। আবার আইনের ফাঁকফোকরও কম নেই। কবে তা দূর হবে, কেউ বলতে পারে না। কারণ যারা আইন প্রণয়ন করেন তাদের কাছে অপরাধীদের কদর আছে। নির্বাচনে সন্ত্রাসীদের কাজে লাগে। এ মনোভাব দুর্ভাগ্যজনক। নাগরিক সমাজের প্রতিবাদ কি পরিস্থিতি বদলাতে পারবে? দিলি্লর মতো সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা কি রাজপথে নেমে আসবে অন্যায়ের প্রতিবাদে? এ প্রত্যাশা অবশ্যই থাকছে এবং দ্রুত তা পূরণ হোক।