শিক্ষাঙ্গন-বুয়েট আন্দোলন এবং আমাদের প্রত্যাশা by মো. মাসুদ পারভেজ রানা

গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক চর্চায় জনসাধারণের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকা জরুরি। নির্বাচন ব্যতিরেকে উপাচার্য ও উপ-উপাচার্য নিয়োগ আওয়ামী লীগের জন্য মোটেও সুখকর কিছু হয়নি। বরং বিপুল ভোটে বিজয়ী একটি দল চরম সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছে।


অনেকে বলে থাকেন, গত নির্বাচনে নতুন ভোটাররাই নাকি আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় নিয়ে এসেছিল

বুয়েট ও অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে মন্তব্য করেছেন তা নিঃসন্দেহে অনেককে মর্মাহত ও হতাশ করেছে। বিশেষত বুয়েটে আন্দোলনরত ছাত্রছাত্রীরা এবং ওই আন্দোলনকে যারা নীরবে সমর্থন জুগিয়েছে তারাই মর্মাহত হয়েছেন বেশি। তার এই মন্তব্য রাজনৈতিকভাবে অনুকূলে যাবে না এটা শতভাগ সত্য। নিশ্চিত করে বলা যায়, তার কঠোরতম হওয়ার বাসনা আন্দোলনরত কোমলমতি ছাত্রছাত্রীদের হৃদয়ে আঘাত করেছে। এর প্রতিফলন আপাতদৃষ্টিতে প্রতীয়মান না হলেও নেতিবাচক কার্যকারিতা থাকবে অনেক দিন। মনে রাখা উচিত, এটি কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন ছিল না। এটি ছিল নেহাতই বাধ্য হয়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসা সাধারণ ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকদের আন্দোলন। আন্দোলনটিকে রাজনীতির রঙিন মোড়ক লাগিয়ে বাকপটু মানুষরা দারুণভাবে সমালোচনা করতে পারবেন বটে, কিন্তু তাতে জনসাধারণের দাবিকে অপমানিত করা হবে। ভেবে দেখা জরুরি, তেমন সমালোচনা বা মন্তব্য কতটুকু মঙ্গলজনক।
বুয়েট শিক্ষক সমিতির সাম্প্রতিক আন্দোলনকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী উপাচার্য ও উপ-উপাচার্য মহোদয়কে অপমান করার শামিল হিসেবে মন্তব্য করেছেন। ছাত্রছাত্রীদের ঐচ্ছিক রক্তপাতকে বিকৃত রুচির পরিচায়ক বলেছেন। এও বলেছেন, ভবিষ্যতে যে আন্দোলনকারীরাও অপমানের শিকার হবেন না, তা কে বলতে পারে। আমার দৃষ্টিতে তার এই পর্যবেক্ষণে একটু গলদ রয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি, বুয়েটের এই আন্দোলন সাম্প্রতিককালের যে কোনো ছাত্র আন্দোলনের মধ্যে সেরা। কতটা সুষ্ঠু ও শান্তভাবে আন্দোলন করা যায়, এটি তার নজির। বিপুল পুলিশের উপস্থিতি, সরকারপন্থি ছাত্র সংগঠনের যুদ্ধংদেহী অবস্থান এবং শিক্ষক-ছাত্রদের নামে মিথ্যা মামলা সত্ত্বেও আন্দোলনকারীরা বিনম্রচিত্তে তাদের দাবি জানিয়ে এসেছে। আরও উল্লেখ্য, সরকার যখনই তাদের ডেকেছে তখনই তারা সংলাপের জন্য ছুটে গেছে। কোনো রকম একগুঁয়েমি মনোভাব তাদের ছিল না। তারা হৃদয় দিয়ে চেয়েছে বুয়েট তার স্বমহিমায় প্রজ্বলিত থাকুক, অশুভ রাজনৈতিক থাবা যেন তাকে গ্রাস না করে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আন্দোলন প্রসঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক আন্দোলন ও সিনেট নির্বাচন নিয়ে যথার্থ উদাহরণ টেনেছেন। সিনেট নির্বাচন শিক্ষকদের মধ্যে কতটুকু স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে পারে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচন তার অনন্য দৃষ্টান্ত। অন্যদিকে একজন শিক্ষকপ্রিয় অনির্বাচিত উপাচার্য দায়িত্ব পালনে কতটা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির অবতারণা করতে পারে তারও নজির রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে রাজশাহী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিন ও সিন্ডিকেট নির্বাচনে সরকারপন্থিদের ভরাডুবি প্রমাণ করে যে, অনির্বাচিত উপাচার্য তার নিজ দলের মধ্যে কোন্দল সৃষ্টি ছাড়া আর কিছুই করতে পারে না। উল্লেখ্য, এই দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মহোদয়রা পূর্বে সাধারণ শিক্ষকদের সমর্থনে বিপুল ভোটে বিভিন্ন পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন। বর্তমানে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের একমাত্র কারণ হলো, উপাচার্য মহোদয়রা কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক নেতাদের কথায় বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করেন, অন্যায়ভাবে শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীর নিয়োগ দেন এবং ইচ্ছাকৃতভাবে শিক্ষকদের প্রমোশন নিয়ে সময়ক্ষেপণ করেন। অনেকক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষক, এমনকি তার নিজ দলীয় গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের তোয়াক্কা করেন না। ফলাফলে দাঁড়ায় নির্বাচনে ভরাডুবি আর কোন্দল। আর এই ভরাডুবির ভয়েই ক্ষমতায় আসীন উপাচার্যরা নির্বাচনের কথা ভুলে যান এবং যেভাবেই হোক না কেন ক্ষমতা আঁকড়ে থাকতে চান।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যখন বুঝতেই পেরেছেন, সিনেট নির্বাচন একটি ভালো প্রক্রিয়া; তখন আর দেরি কেন? অচিরেই বাকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সিনেট নির্বাচনের ব্যবস্থা করা যায় না? আপনি সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকদের মধ্যে জরিপ করেও দেখা যেতে পারে, তারা কী চায়। হ্যাঁ, বর্তমান দায়িত্বরত উপাচার্যরাই থাকুক, কিন্তু তাদের আসতে হবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচনের মাধ্যমে। একজন উপাচার্য যদি সারাদিন দলীয় কোন্দল আর ছাত্রনেতাদের ঠাণ্ডা রাখতে ব্যস্ত থাকেন, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন এবং শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে চিন্তা করবেন কখন? আমরা সবাই চাই শিক্ষকদের ভোটে উপাচার্য নিয়োগ হোক, রাজনৈতিকভাবে নয়।
আমরা জানি, গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক চর্চায় জনসাধারণের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকা জরুরি। নির্বাচন ব্যতিরেকে উপাচার্য ও উপ-উপাচার্য নিয়োগ আওয়ামী লীগের জন্য মোটেও সুখকর কিছু হয়নি। বরং বিপুল ভোটে বিজয়ী একটি দল চরম সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছে। অনেকে বলে থাকেন, গত নির্বাচনে নতুন ভোটাররাই নাকি আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় নিয়ে এসেছিল। কিন্তু শিক্ষাঙ্গনের সাম্প্রতিক এসব ঘটনা ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের অনাকাঙ্ক্ষিত মন্তব্য আগামী নির্বাচনে উল্টো ফলাফল নিয়ে আসতে পারে। উচিত হবে, এখনই বাকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নির্বাচনের মাধ্যমে উপাচার্য নিয়োগে মনোযোগী হওয়া এবং সরকারের প্রতি ছাত্রছাত্রীদের আস্থা ফিরিয়ে নিয়ে আসা। এতে করে বিশ্ববিদ্যালয়ের অচলাবস্থা নিরসনের পাশাপাশি সরকারের অন্যান্য ব্যর্থতার দায়ভার কিছুটা হলেও লাঘব হবে। আমরা চাই, সরকার সুষ্ঠুভাবে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার পরিবেশ সৃষ্টি করুক। অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো ঘটনা বা মন্তব্য আমাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করুক এটা কারোরই কাম্য নয়। আশা করি, এই সরকার কয়েকজন উপদেষ্টা, মন্ত্রী, উপাচার্য ও ছাত্রলীগের সরকার না হয়ে জনগণের সরকাররূপে আবির্ভূত হবে। আসুন আমরা সবাই প্রত্যাশা করি, শিক্ষাঙ্গন থেকে অশুভ রাজনীতি চিরকালের মতো দূর হোক।

মো. মাসুদ পারভেজ রানা : সহযোগী অধ্যাপক, ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়