শ্রমিক ও পাচারের শিকার নারীদের জন্য সত্বর কিছু করুন-প্রবাসী নারীকর্মীদের দুর্দশা

প্রবাসে কাজের হাতছানিতে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও দলে দলে বিদেশে গিয়েছেন। তাঁদের প্রেরিত অর্থ জাতীয় অর্থনীতিতে উজ্জ্বল অবদান রাখছে। পুরুষদের মতো নারীশ্রমিকেরাও কর্মস্থলে অন্যায় ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। অনেকেই প্রতারিত হয়ে দেশে ফিরে এসেছেন; কেউ কেউ ফিরেছেন লাশ হয়ে।


প্রবাসের সহায়-স্বজনহীন বৈরী পরিবেশে যাঁরা রক্ত পানি করে অর্থনীতিতে প্রাণ সঞ্জীবন করছেন, তাঁদের অধিকার ও নিরাপত্তার দেখভাল করা সরকারের জরুরি করণীয় হওয়া উচিত।
গত সোমবারের প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০০৯ সাল পর্যন্ত মোট এক লাখ ২৪ হাজার ২৭৩ জন নারীশ্রমিক বিদেশে গেছেন; কেবল ২০০৯ সালেই গেছেন ২২ হাজার ২২৪ জন। সবচেয়ে বেশি নারীশ্রমিক গেছেন দুবাই, সৌদি আরব ও লেবাননে। মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে তাঁদের নিপীড়নের যে চিত্র ওই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, তা এক কথায় হতাশাজনক। লেবাননে তাঁদের অবস্থা শোচনীয়। তাঁদের সইতে হচ্ছে বেতন-বৈষম্য, প্রহার, এমনকি যৌন নিপীড়ন। সইতে না পারা এমন কয়েকজন লাশ হয়েও ফিরেছেন।
প্রথমত, তাঁরা বাংলাদেশের নাগরিক; দ্বিতীয়ত, তাঁরা অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। রিক্রুটিং এজেন্সির প্রতারণা আর নিয়োগদাতাদের বৈরী আচরণ থেকে তাঁদের বাঁচানোর দায়িত্ব একমাত্র সরকারের। লেবানন ছাড়া শ্রমিক গ্রহণকারী মধ্যপ্রাচ্যের সব দেশেই বাংলাদেশের দূতাবাস রয়েছে। এসব ঘটনায় বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তো বটেই, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন রাষ্ট্রদূতদেরও অনেক কিছু করার ছিল। অথচ সরকারি তত্পরতা সমস্যার মরুতে এক আঁজলা জল ছাড়া আর কিছু নয়।
অভিবাসী শ্রমিকদের দুর্দশার পাশাপাশি আরও ভয়াবহ শিকার হন পাচার হয়ে যাওয়া নারীরা। সম্মানজনক কর্মসংস্থানের কথা বলে ফাঁদে ফেলে অনেককেই যৌনদাসত্বে বাধ্য করা হয়। গত ৩০ বছরে পাচার হওয়া এমন নারীর সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ। ইউনিসেফ বলছে, প্রতি মাসে ৪০০ জন নারী পাচারের শিকার হন এবং বছরে এক লাখ ২০ হাজার শিশুকে বিক্রি করে দেওয়া হয়। আরেকটি সমীক্ষা বলছে, গত ১০ বছরে ১২ থেকে ৩০ বছর বয়সী প্রায় তিন লাখ শিশু ও নারী ভারতে বিক্রি হয়ে পাচার হয়েছেন। পাকিস্তানেও বিক্রি হয়ে গেছে প্রায় দুই লাখ নারী ও শিশু।
বঞ্চিত অভিবাসী শ্রমিকদের পাশাপাশি পাচার হয়ে যাওয়া নারীদের দুর্বিষহ জীবন থেকে উদ্ধারে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের টনক নড়া উচিত। বিষয়টিকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, দূতাবাস, আইনশৃঙ্খলা সংস্থা ও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা জরুরি। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহযোগিতাও দরকার। সরকারের লোকবল যেখানে কম, সেখানে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলোকেও জড়িত করা যায়। পরিস্থিতি যেহেতু গুরুতর, সেহেতু দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার কোনো অজুহাত থাকতে পারে না।