কথ্য ভাষা-ভাষার মাস আসার আগে by উম্মে মুসলিমা

প্রমিত বাংলা, কথ্য ভাষা, চলিত রীতি ইত্যাদি নিয়ে ভাষার মাস ফেব্রুয়ারিতেই লেখালেখি, আলাপ-আলোচনা, বাগিবতণ্ডা চলতে থাকে। মাস শেষ হলে ভাষা নিয়ে আলাপ-আলোচনায় ভাটা পড়ে, যেন যত দায় ফেব্রুয়ারির। রবিঠাকুরের সেই গানে ‘একতারাটি একটি তারে, গানের বেদন বইতে নারে’-এর মতো ফেব্রুয়ারির একটা মাস কি


বাংলা ভাষার বেদন ধারণ করতে পারে? তাই একটু আগেভাগে শুরু করার জন্যই আজকের এ অবতারণা। কথাবার্তায় আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার কিছু দোষের নয়। চাটগাঁ বা সিলেটের দুজন মানুষ একে অন্যের সঙ্গে কথা বলার সময় অন্য অঞ্চলের মানুষ তার বিন্দু-বিসর্গ বুঝতে পারে না। না বুঝলেও ক্ষতি নেই। কিন্তু যখন একজন সিলেটি একজন খুলনা বা রাজশাহীর মানুষের সঙ্গে আলাপ করতে গিয়ে তার নিজস্ব আঞ্চলিক ভাষায় কিছু জিজ্ঞাসা করেন, সেটা সুসংস্কৃতির পরিচয় বহন করে না।
একবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া এক ছেলে ছুটিতে তার ক্লাসমেট বান্ধবীকে নিয়ে বগুড়ায় গ্রামের বাড়িতে গেল। বাবা খুব শিক্ষিত নন। গ্রামের মা-বাবা এখনো ছেলেমেয়েদের বিপরীত লিঙ্গের বন্ধু-বান্ধবীদের সহজে মেনে নেন না। ছেলেটি তার বান্ধবীকে নিয়ে রিকশা থেকে বাড়ির সামনে নামতেই বাবা জিজ্ঞাসু চোখে মেয়েটির দিকে তাকালেন। ছেলেটি বলল, ‘আব্বা, ও আমার সাথে পড়ে। আমার বন্ধু।’ বাবা মেয়েটির মুখের ওপরেই ছেলেকে বলে বসলেন, ‘আলু আলু অখেখ লে আলু?’ ভাগ্যিস মেয়েটির বাড়ি ছিল কুমিল্লা। সে কিছুই বোঝেনি, বুঝতে পেরে ছেলেটি খানিক স্বস্তিবোধ করে বান্ধবীকে তাড়াতাড়ি বাড়ির মধ্যে নিয়ে গেল। মেয়েটি যদি বুঝতে পারত ছেলেটির বাবা বলেছেন, ‘আসিল আসিল ওকে কেন নিয়ে আসিল?’ তখন কী কেলেঙ্কারিটাই না হতো! এসব ছেলেমেয়েরও বলিহারি! আগে মা-বাবার ভেতর গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করে তবেই না এসব করবি!
যা বলছিলাম। আমরা উচ্চশিক্ষিতরাও উচ্চারণে মারাত্মক ভুল করি মাঝেমধ্যে। একটি শব্দ বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের অনেকে প্রায়ই ভুলভাবে উচ্চারণ করে থাকেন। সেটা হচ্ছে, ‘সম্মান’। সম্মানের উচ্চারণ করা হয়, ‘সন্মান’। কোনো জনসমাবেশ, মিডিয়া বা সাধারণ আলাপচারিতায় এসব ভুল উচ্চারণ তাঁরা খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে করে থাকেন। সম্মানের সন্ধিবিচ্ছেদ করলে দাঁড়ায় সম+মান। তাবড় তাবড় শিক্ষিতরাও এবং-এর উচ্চারণ করেন ‘এ্যাবং’। আবার ব্যক্তির শুদ্ধ উচ্চারণ যে ‘বেক্তি’ তা কিন্তু আমরা অনেকেই ভুলে যাই। কিছু ইংরেজি শব্দ আমরা হরহামেশাই ব্যবহার করি, যেমন ইমপর্টেন্ট। কিন্তু উচ্চারণের সময় বলি ‘ইনপটের্ন্ট’। কবি রফিক আজাদের একটি কবিতায় আছে তার প্রেমিকা কৈশোরে জনৈককে বলতেন ‘জৈনেক’ আর প্রমথ চৌধুরীকে ‘প্রথম চৌধুরী’। এ ভুল শুধু রফিক আজাদের প্রেমিকাই নন, আরও অনেকের প্রেমিকাও সগৌরবে করেন। শিল্পীরা টক শোতে ‘আমি অমুক নাটকে বা অনুষ্ঠানে ভালো পারফরম্যান্স করেছি’ বলে দেন। আসলে তো হবে পারফরম করেছি, ‘আমার পারফরম্যান্স ভালো ছিল’। একদিন এক শপিং মলে একজন ভদ্রমহিলা তাঁর গৃহসহকারীকে নিয়ে কেনাকাটা করছেন। গৃহসহকারী বিক্রেতার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ট্যাক্সিক্যাব আছে?’ দোকানি তো হাঁ। ভদ্রমহিলা দ্রুত শুধরে দিলেন, ‘আসলে ক্যাপসিকাম আছে কি না জানতে চাইছে।’ বুঝুন। রিকশাওয়ালা আর গাড়ির চালকদের কাছে সিগন্যাল সব সময় ‘সিঙ্গেল’ হয়েই ধরা দেয়। যাঁরা লেখাপড়া কম জানেন, তাঁদের ভুল উচ্চারণ না হয় মার্জনীয় কিন্তু অফিসে একজন কর্মকর্তাগোছের কেউ যদি আপনাকে এসে বলেন, ‘আপনার স্টার প্লাসটা একটু দেবেন?’ তখন আপনি কী বুঝবেন? বুঝতে হবে ওটা স্ট্যাপলার। জরুরি-এর উচ্চারণ অনেকেই করেন ‘জরুলি’। অনেকে হকচকিয়ে না উঠে ‘হচকচিয়ে’ ওঠেন। উদ্যোগ বলতে গিয়ে বলেন ‘উদ্যেগ’। নিম্ন বলতে পারেন না, বলেন ‘নিন্ম’। যুগ্মকে ‘যুগ্ন’। ত্রুটিকে ‘ক্রুটি’। কিন্তু হতভম্ব হলাম ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে একটু সামনে চানখাঁরপুলের একটা রাস্তার নামকরণ দেখে। একটা নামফলকে লেখা ‘ঊনসত্তর, শহীদ আসাদ স্মরণী’। নামফলকটি উদ্বোধন করেছেন উপাচার্য এস এম এ ফায়েজ। কান্না পেল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সরণিকে কীভাবে ‘স্মরণী’ বলে মেনে নিলেন? আবার ‘শহীদ’ বানানটিও শুদ্ধ নয়।
যে ভাষাটির বদৌলতে বিশ্ব পেল একটি বিশেষ দিন, সে ভাষার মানুষ শুদ্ধ ও সুন্দর উচ্চারণে কথা বলবে, লিখবে—এ প্রত্যাশা আমাদের অতিশয়োক্তি নয়। এক সরকারি অফিসের চৌকস অফিসারকে তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ গত মাসে রাজশাহী গিয়েছিলেন কি না জানতে চাইলে তিনি বললেন, ‘জ্বি না স্যার, আমি গেছি না।’ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ শুদ্ধ ভাষার মানুষ। তিনি একটু বিরক্ত হয়েই বললেন, ‘গেছি না?’ প্রত্যুৎপন্নমতির চৌকস অফিসার নিজের ভুল বুঝতে পেরে সঙ্গে সঙ্গে শুধরে নিয়ে বললেন, ‘সরি স্যার, আসলে আমি গিয়েছি না।’ এরপর বস্-এর আর কী বলার আছে! বাংলা বিশ্বের সেরা মিষ্টভাষার অন্যতম হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। শিক্ষিত মা-বাবা যদি ছোট থেকেই বাচ্চাদের সামনে শুদ্ধ উচ্চারণে কথা বলতে থাকেন, তাহলে কেবল একটা গৌরবান্বিত ভাষার উত্তরাধিকারীই তৈরি হবে না, সুন্দর ভাষার জাতি হিসেবেও আমরা পরিচিত হব।
বাংলা ব্যাকরণে ‘ধ্বনি-বিপর্যয়’ বলে একটা অধ্যায় আছে। সেখানে বাতাস—বাসাত, রিকশা—রিশকা, লাফ—ফাল, ক্রিমি—কিমরি ইত্যাদির উদাহরণ দেওয়া আছে। একদিন এক জাদুকর খুব অভিজাত এক সমাবেশে জাদু দেখাতে গিয়ে বারবার বলতে লাগলেন, ‘জাদু হচ্ছে একধরনের শিল্পিত চুরিবিদ্যা। যাঁদের মাথায় “মজগ” আছে, তাঁরা ঠিকই বুঝে ফেলবেন।’ এসব ধ্বনি-বিপর্যয় হয়তো অনেকে একটু সচেতন হলেই এড়াতে পারেন। আজকাল ফেরিওয়ালারা শাড়ি ছাড়াও তৈরি কাপড়ের পোঁটলা মাথায় নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ফেরি করার সময় হাঁকেন, ‘আছে -এ-এ-এ শায়া-বেলাউজ-মেসিক’। আর মুঠোফোনে টাকা ভরার জন্য অনেকেই ‘ফ্লেসকি’ করে যাচ্ছেন। কুষ্টিয়ার গ্রামীণ অঞ্চলে দাওয়াতে গেলে আপনি খুব চিকন করে কাটা আলু বা পটোলের ভাজি দেখতে পাবেন। খেতে খুবই সুস্বাদু। খেতে খেতে কিন্তু ভুলেও জিজ্ঞেস করবেন না—এটা কী? কারণ জিজ্ঞেস করলে তাঁরা যখন নির্দ্বিধায় বলে দেবেন, ‘সেকিস’, তখন কিন্তু ধ্বনি-বিপর্যয়ের ‘ছেঁচিক’ আপনার গলায় হেঁচকি হয়ে আটকে যেতে পারে।
উম্মে মুসলিমা: কথাসাহিত্যিক।
lima_umme@yahoo.com