সীমান্তে হচ্ছে যৌথ তদারকির ব্যবস্থা : আফগান সশস্ত্র বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেবে পাকিস্তান

পাকিস্তানের সেনাবাহিনী আফগানিস্তানের পুলিশ ও সশস্ত্র বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেবে। তুরস্কের ইস্তাম্বুল শহরে ত্রিপক্ষীয় সম্মেলনে স্বাক্ষরিত চুক্তির আওতায় পাকিস্তান এ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পরিচালনা করবে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহমিনা জানজুয়ার উদ্ধৃতি দিয়ে দেশটির ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য নিউজ’ এ খবর দিয়েছে। ইস্তাম্বুল সম্মেলনের সময় এ বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারকে সই করেছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আশফাক পারভেজ কিয়ানি, তুরস্কের সেনাপ্রধান নেকদেত ওজাল এবং আফগানিস্তানের পক্ষে জেনারেল শাহ মুহাম্মাদ কারিমি।


এ সম্পর্কে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহমিনা জানজুয়া বলেছেন, আফগানিস্তানে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা এবং দেশটির সার্বিক উন্নয়ন কামনা করে ইসলামাবাদ। তিনি বলেন, প্রকৃতপক্ষে এ অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার জন্য এগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পাকিস্তান ত্রিপক্ষীয় এ চুক্তিকে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরাও মনে করছেন, এ ধরনের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি শুরু হলে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যকার চলমান উত্তেজনা কমে আসবে।
পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রেহমান মালিক বলেছেন, এ মাসের শেষ নাগাদ কাবুল ও ইসলামাবাদ দু’দেশের সীমান্তে যৌথ তদারকির ব্যবস্থা করবে। পাকিস্তানের ভেতর থেকে সন্ত্রাসীরা আফগানিস্তানে গিয়ে হামলা চালায় বলে কাবুল একাধিকবার এই অভিযোগ করার পর রেহমান মালিক এ কথা জানালেন। তিনি ইসলামাবাদে সাংবাদিকদের বলেছেন, সীমান্তবর্তী চামান এলাকায় গিয়ে তিনি সবার জন্য সীমান্ত উন্মুক্ত দেখতে পেয়েছেন।
পাকিস্তানের বেলুিচিস্তান প্রদেশের চামান সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকানোর জন্য ২০০৭ সালে ইসলামাবাদ ওই সীমান্তে পরীক্ষামূলকভাবে ডিজিটাল বায়োমেট্রিক ব্যবস্থা স্থাপন করে। দ্য ডন অনলাইন জানিয়েছে, ওই ব্যবস্থা চালু করার পর আফগান উপজাতীয় লোকেরা তা বন্ধের দাবিতে সীমান্তে হামলা চালায় এবং এর জের ধরে ব্যবস্থাটি তুলে নিতে বাধ্য হয় ইসলামাবাদ।
তবে গত মাসে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, চামান সীমান্তে তার দেশ পুনরায় ওই ব্যবস্থা মোতায়েন করবে। তিনি আজ জানিয়েছেন, আফগানিস্তানও সীমান্তের অপর প্রান্তে একই ধরনের ব্যবস্থা স্থাপন করতে যাচ্ছে। রেহমান মালিক আরও বলেছেন, যৌথ তদারকির পরও সীমান্তে অবৈধ অনুপ্রবেশ হচ্ছে কি না সে ব্যাপারে তিনি তার আফগান সমকক্ষের সঙ্গে এখন থেকে প্রতিমাসে বৈঠক করবেন।
এদিকে আফগানিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট বুরহান উদ্দিন রাব্বানিকে হত্যার সঙ্গে ইসলামাবাদ জড়িত নয় বলে রেহমান মালিকের সর্ব সামপ্রতিক বক্তব্যই প্রমাণ করছে, ওই ইস্যুতে দু’দেশের সম্পর্কে এখনও টানাপড়েন চলছে। তবে পাকিস্তান ওই হত্যাকাণ্ডের তদন্তের ক্ষেত্রে আফগানিস্তানকে সব ধরনের সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত আছে বলে তিনি আবারও ঘোষণা করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে কাবুলে নিজ বাসভবনে আত্মঘাতী বোমা হামলায় বুরহান উদ্দিন রাব্বানি নিহত হন। তালেবানের সঙ্গে শান্তি আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য আফগান সরকার রাব্বানিকে প্রধান আলোচক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন।
পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, কাবুল-ইসলামাবাদ সম্পর্কে ফাটল ধরাতেই শত্রুরা রাব্বানিকে হত্যা করেছে। পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে দুই হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ অভিন্ন সীমান্ত রয়েছে। অভিন্ন সীমান্ত সংলগ্ন বেশ কিছু এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে সন্ত্রাসীরা। এ কারণে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের উচিত দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে সব প্রতিবন্ধকতা দূর করা, যাতে সন্ত্রাসীরা দু’দেশের সম্পর্কের টানাপড়েনকে কাজে লাগাতে না পারে। অভিন্ন সীমান্তে নিরাপত্তা বিধান করাই এখন দু’দেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ সীমান্ত পেরিয়ে সন্ত্রাসীরা যে কোনো সময় দুই দেশের অভ্যন্তরে হামলা চালাতে পারছে এবং তা নিয়ে দুই দেশের সম্পর্কে টানাপড়েন বজায় থাকছে।
এ অবস্থায় রাব্বানি হত্যাকাণ্ডের তদন্তে পাকিস্তানের সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়ন ও প্রকৃত হত্যাকারীদের খুঁজে বের করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। বিশ্লেষকরা বলছেন, রাব্বানি হত্যাকাণ্ডের দায় পাকিস্তানের ওপর চাপিয়ে আফগান নেতারা মাঝেমধ্যেই যেসব বক্তব্য দিচ্ছেন তা প্রকৃত দোষীকে খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে নেতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে আরও তিক্ততা সৃষ্টি করতে পারে।
মনে রাখতে হবে, আফগানিস্তানে দখলদার বিদেশি সেনারা দীর্ঘ মেয়াদে থাকার জন্য নানা টালবাহানা করছে। এরই মধ্যে একটি হলো পাকিস্তানের সঙ্গে আফগানিস্তানের সম্পর্ককে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যাতে কোনো দিন দুই মুসলিম প্রতিবেশী দেশের মধ্যে সদ্ভাব তৈরি না হয়। কাজেই পাকিস্তান ও আফগানিস্তানকে ঐক্যবদ্ধভাবে ওইসব ষড়যন্ত্র নস্যাত্ করে আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট হতে হবে।