বিচারের রাজনৈতিক প্রয়োজন আ.লীগের জন্য ফুরিয়ে আসছে -ইকোনমিস্ট

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি জাগিয়ে রাখতে প্রাণপণ চেষ্টায় রত আওয়ামী লীগ। বাংলাদেশিদের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে রক্তাক্ত অভিযানের মূল হোতাই ছিল পাকিস্তানি সেনারা। কিন্তু পাকিস্তানের এই হোতারা সব সময়ই বিচারের ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে। তাদের দোসর জামায়াতের নেতা গোলাম আযম, মতিউর রহমান নিজামীসহ অন্যরা এখন বিচারের সম্মুখীন।
যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী পত্রিকা দি ইকোনমিস্ট-এর আজ ১ নভেম্বরের সংখ্যায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে এই মন্তব্য করা হয়েছে। ‘রাজনীতি ও বাংলাদেশের অতীত: পড়ছে থিতিয়ে’ শিরোনামের নিবন্ধে জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামীর দুবার মৃত্যুদণ্ডাদেশ পাওয়ার ঘটনাকেও ‘বিরল’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিবন্ধে বলা হয়, গত ২৯ অক্টোবর বাংলাদেশের ‘নিজস্ব ধাঁচের’ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ৭১ বছর বয়সী নিজামীর বিরুদ্ধে ফাঁসির রায় ঘোষণা করেন। এর আগে অস্ত্রের এক বড় চালান আটকের মামলায় গত জানুয়ারিতে পৃথক একটি আদালতও তাঁকে দিয়েছেন মৃত্যুদণ্ড। ৯২ বছর বয়সে কারা হেফাজতে গোলাম আযমের মৃত্যুর পর নিজামীর বিরুদ্ধে সাম্প্রতিকতম রায়টি দেওয়া হলো।
২০০৮ সালের নির্বাচনে বিপুলভাবে বিজয়ী হওয়ার আগে আওয়ামী লীগ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার। তখন থেকে এ বছরের নির্বাচন পর্যন্ত বেশ কয়েকজন নেতৃস্থানীয় সন্দেহভাজন যুদ্ধাপরাধীকে দণ্ডিত করা হয়েছে। কার্যকর করা হয়েছে তাঁদের একজনের ফাঁসি। যদিও ট্রাইব্যুনাল যেভাবে পরিচালিত হচ্ছে, তা নিয়ে রয়েছে গভীর সংশয়; স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ। এখন সুপ্রিম কোর্ট করছেন বিভিন্ন আপিলের নিষ্পত্তি।
কিন্তু আওয়ামী লীগের জন্য এসব বিচারের রাজনৈতিক উপযোগিতা আসছে নিঃশেষ হয়ে—এমনকি এসব রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণ হয়ে উঠতে পারে। এরই মধ্যে বিচারকে কেন্দ্র করে সহিংসতার ঘটনায় শতাধিক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। শেখ হাসিনা এখন ‘ত্রুটিযুক্ত ওই ট্রাইব্যুনাল’কে খুব ধীরগতিতে এগিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে নিজেকে একজন বিজ্ঞ, বৈধ ও মধ্যপন্থী নেতা হিসেবে তাঁর পরিচিতি তুলে ধরার পথ বেছে নিতে পারেন। সর্বোপরি, তিনি চান আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের সুনামকে জোরালো করতে। চলতি মাসে বাংলাদেশ জাতিসংঘের হিউম্যান রাইটস কাউন্সিলে একটি আসন জিতেছে।
ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন এমন কিছু বয়স্ক কারাবন্দী রয়েছেন, যাঁরা দীর্ঘ আপিল প্রক্রিয়ার মুখে তাঁদের দণ্ড কার্যকর হওয়ার সময় পর্যন্ত না-ও বাঁচতে পারেন। ইতিমধ্যে তিনজন কারা হেফাজতে মারা গেছেন। গত সেপ্টেম্বরে মৃত্যুদণ্ড থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়া সাঈদী সম্ভবত আর কখনোই বেরোতে পারবেন না কারাগার থেকে। ওদিকে রায় ও তা কার্যকর করার সময়কাল রাজনৈতিক স্পর্শকাতরতার জন্য দৃশ্যত বেশ গুরুত্বপূর্ণ। গুরুত্বপূর্ণ বিদেশি অতিথিদের সফরকালে শীর্ষস্থানীয় অভিযুক্তদের কাউকে ফাঁসি দেওয়া হবে না বলেও দৃশ্যত মনে হয়। তা ছাড়া শাস্তি হ্রাসের মতো আরও ঘটনা ঘটতে পারে।
এ সপ্তাহে সংযুক্ত আরব আমিরাত সফরে শেখ হাসিনা উপসাগরীয় দেশগুলো কীভাবে এই যুদ্ধাপরাধের বিচারকে দেখছে, তা মূল্যায়ন করেছেন। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সৌদি আরব। দেশটির শাসকেরা নিজামী বা অন্য অভিযুক্ত ব্যক্তিদের নেতিবাচক পরিস্থিতি কখনোই দেখতে আগ্রহী নয়। তাই শেখ হাসিনার জন্য এ রকম ধারণা দেখানো মানানসই যে এই আইনি প্রক্রিয়া চলছে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ছাড়াই। অন্য কথায়, ভবিষ্যতে যুদ্ধাপরাধের বিচারের প্রক্রিয়ায় ঢিলেঢালা ভাব দেখা যেতে পারে।