বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা by ড. হাসান মাহমুদ রেজা

সাম্প্রতিক সময়ের কিছু লেখালেখিতে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের বর্তমান, ভবিষ্যৎ এবং পেটেন্ট বিষয়টি বিভিন্ন আঙ্গিকে বর্ণিত হয়েছে। ফার্মেসির শিক্ষক হওয়ার সুবাদে বিষয়টি আমাকে একটু বেশিই আকৃষ্ট করেছে। তাই নিজের চিন্তাভাবনাগুলো পাঠকের সামনে খোলামেলাভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করছি।


যে শিল্পগুলো বাংলাদেশে দ্রুততার সঙ্গে বিকাশ লাভ করেছে, ওষুধ শিল্প এগুলোর মধ্যে অন্যতম। বর্তমানে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদার ৯৭ শতাংশ ওষুধ সরবরাহ করছে দেশীয় ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। দেশের বাইরে অন্তত ৮৩টি দেশে রপ্তানি করা হচ্ছে আমাদের তৈরি বেশ কিছু ওষুধ। ২০০৯ সালে আনুমানিক ৩০০ কোটি টাকার ওষুধ বিদেশে রপ্তানি করা হয়েছে। ২০১১ সালে এর পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় প্রায় ৪০০ কোটিতে। যদিও এ অর্থ অর্জিত হয়েছে বাংলাদেশে উৎপাদিত ওষুধের ৪ শতাংশেরও কম রপ্তানির মাধ্যমে, তবুও উৎসাহব্যঞ্জক। কেননা বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পরিচিতি একটি স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে। এ দেশ থেকে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ওষুধের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি পণ্য রপ্তানি হচ্ছে- এটিই বড় ব্যাপার।
ওষুধ শিল্পের এ সাফল্যের সঙ্গে সঙ্গে উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো যথেষ্ট বিষয় জড়িত রয়েছে, যা রুদ্ধ করতে পারে এ শিল্পের অগ্রযাত্রাকে। উৎপাদিত ওষুধের গুণগতমান নিশ্চিতকরণ অতিপ্রয়োজনীয় একটি বিষয়। ওষুধ প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে দেশে ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১৬৮টি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রতিষ্ঠান গুণগতমানের ওষুধ প্রস্তুত করে না; কিংবা ওষুধের মান নিয়ন্ত্রণ বা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি তাদের নেই। তার চেয়েও ভয়াবহ বিষয় এসব কম্পানিতে দক্ষ ফার্মাসিস্টের বদলে কাজ করছে কেবল টেকনিশিয়ান, যাদের ওষুধ প্রস্তুতকরণের তাত্ত্বিবক জ্ঞান একেবারেই শূন্য। ফলে নিম্নমানের ভেজাল ওষুধ উৎপাদিত হচ্ছে যথেষ্ট পরিমাণে। এ ওষুধগুলোর কার্যকারিতা একদিকে যেমন কম অন্যদিকে এগুলো সেবনে শরীরে মারাত্মক প্রতিক্রিয়াও সৃষ্টি হতে পারে। ভেজাল প্যারাসিটামল সেবনে ২০০৯ সালে ২৬ শিশু মৃত্যুবরণ করে বাংলাদেশে। এর আগেও এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে।
সম্প্রতি সংসদীয় কমিটির এক প্রতিবেদনে জানা যায়, দেশের ১৬৮টি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের ৬২টি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নীতি মানছে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ওয়াসার সরবরাহকৃত পানি সরাসরি ব্যবহৃত হচ্ছে ওষুধে। বিষয়টি সত্যিই ভয়াবহ। পানি ওষুধ শিল্পে অধিক ব্যবহৃত একটি উপকরণ। নির্দিষ্ট ধরনের ওষুধ তৈরির জন্য নির্দিষ্ট গ্রেডের পানি ব্যবহারের বিকল্প নেই। ওয়াসার পানি ব্যবহারে শুধু নিম্নমানের ওষুধই তৈরি হচ্ছে না, এগুলো সেবনে জনস্বাস্থ্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে। এর বিরুদ্ধে কঠিন পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
মুক্তবাজার অর্থনীতিতে বিশ্ব প্রতিযোগিতায় আমাদের ওষুধ শিল্প ভালো করছে, এটি বোধহয় বলাটা যুক্তিসংগত হবে না। রপ্তানি আয়ের হিসাব থেকে বিষয়টি প্রতীয়মান। মূলত TRIPS (Trade-Related Aspects of Intellectual Property Rights) চুক্তির বাইরে থাকার সুবাদে বাংলাদেশ রপ্তানির ক্ষেত্রে একটি সুযোগ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। এ চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ অন্য স্বল্পোন্নত দেশগুলোয় তুলনামূলক স্বল্পমূল্যে পেটেন্ট ওষুধ এবং যেকোনো দেশে জেনেরিক ওষুধ রপ্তানির সুবিধা ভোগ করছে। এ সুবিধা ২০১৫ সাল পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। পরবর্তী সময়ে TRIPS চুক্তির আওতায় ২০১৬ সাল থেকে বাংলাদেশকে বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে সমান প্রতিযোগিতায় নামতে হবে। সে ক্ষেত্রে রপ্তানি বৃদ্ধি করা সত্যিই একটি দুরূহ ব্যাপার হবে। তারও আগে আমাদের গরিব জনগোষ্ঠীকে কিনতে হবে অনেক বেশি দাম দিয়ে পেটেন্ট ওষুধ, যা হবে সত্যিই কষ্টসাধ্য। আর তাই এ মুহূর্তে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর বিশাল জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য রক্ষার ক্ষেত্রে অন্তত রোগের প্রাদুর্ভাব ভেদে অতি প্রয়োজনীয় জীবন রক্ষাকারী নির্দিষ্ট সংখ্যক ওষুধ পেটেন্ট আইনের বাইরে রাখার ব্যাপারে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সঙ্গে সমঝোতা করা প্রয়োজন। তাতে এসব দেশের গরিব মানুষ অন্তত ওষুধ কিনে খাওয়ার সুযোগ পাবে।
আশার সংবাদ এই, এরই মধ্যে অনেক জীবন রক্ষাকারী ওষুধ জেনেরিক হওয়ার কারণে বাংলাদেশ সেগুলোর উৎপাদন করার সুযোগ পাবে এবং এ ওষুধগুলো একদিকে যেমন বাংলাদেশের মানুষের কাছে কম মূল্যে বিক্রয় করা যাবে, অন্যদিকে এগুলোর রপ্তানির ক্ষেত্রেও প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব হবে। এ জন্য যেটি প্রয়োজন তা হচ্ছে ২০১৫ সালের মধ্যে আমাদের দেশে এ জাতীয় ওষুধগুলোর কাঁচামাল তৈরি এবং বিদেশে যথেষ্ট রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি করা, যা পরবর্তীকালে আরো গতি লাভ করবে। বর্তমানে ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত কাঁচামালের ৭০ শতাংশেরও বেশি বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। ওষুধ রপ্তানির ক্ষেত্রে Bioequivalence Test একটি অত্যাবশ্যকীয় বিষয়। আমাদের দেশে এখনো Bioequivalence ল্যাব প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সরকার এবং ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর একযোগে এ ব্যাপারে কাজ করা প্রয়োজন। দেশে এ ধরনের ল্যাব প্রতিষ্ঠিত হলে রপ্তানি খরচ এবং জটিলতা অনেক কমবে। ফলে দেশীয় আরো অনেক কম্পানি রপ্তানিতে উৎসাহী হবে এবং এতে রপ্তানির পরিমাণ বাড়বে বলে আশা করি।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, গবেষক ও শিক্ষক,
ফার্মেসি বিভাগ, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি
reza@northsouth.edu