Thursday, November 8, 2012
কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ by শওকত আলী
কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ by শওকত আলী
বাতাস উঠলে এখন টাঙনের পানিতে কাঁপন লাগে না। পানি এখন অনেক নিচে। বালি কেটে কেটে ভারি ধীরে স্রোতে এখন শীতের টাঙন বয়ে যায়। পানির তলায় বালি চিকমিক করে, কোথাও কোথাও সবুজ গুল্ম স্রোতের ভেতরে ভাটির দিকে মাথা রেখে এপাশ ওপাশ ফেরে।
চতুর দু-একটা মাছ তিরতির করে উজানে ছুটে গেলেও আবার ভাটিতে ফিরে আসে। কিন্তু কাঁপে না পানির স্রোত। এমনকি সাঁকোর ওপর দিয়ে চিনিকলের ভারী আখ-বওয়া ট্রাকগুলো যাবার সময়ও না। সাঁকোর থামগুলো গুমগুম শব্দ করে ওঠে, কিন্তু পানির স্রোত তেমনি ধীরে, তেমনি শান্ত। আসমান কান্দর আর দিগন্তজুড়ে যে শীতের একটা শান্তভাব থাকবার কথা, সেই ভাবটা টাঙনের স্রোতে আজকাল সব সময় ধরা থাকে।
আজ ঐ শান্ত নদীর ধারে বসে থাকবার জন্যেই কিনা কে জানে। কপিলদাস ভারি আরামে রোদের দিকে পিঠ মেলে দিয়ে ঝিমোতে পারে। তার চারদিকে নানা শব্দ কিন্তু সেসব তার কানে ঢোকে কি না বোঝা মুশকিল। ধরো, কী রকম গাঁ গাঁ চিৎকার করতে করতে চিনিকলের ট্রাকগুলো ছুটছে, ফার্মের ভেতরে বিনোদ মিস্তিরি খান-দুই ট্রাক্টর ট্রায়ালের জন্য চালু করে রেখেছে_তার ধক ধক ধক ধক শব্দ একটানা সকাল দুপুর রাত ধরে ক্রমাগত হয়ে চলেছে, নদীর ওপারে আবার কোথায় এক রাখাল সারা দিন ধরে একটানা বুনো সুর বাঁশিতে বাজিয়ে যাচ্ছে_এসবই তার কানে ঢুকবার কথা। কিন্তু কপিলদাস চুপচাপ। মাথাটা ডাইনে-বাঁয়ে অল্পস্বল্প দুলছে, আর সে বসে রয়েছে তো বসেই রয়েছে।
ওদিকে ছাগল ঢুকে যদি সবজিক্ষেত তছনছ করে, কি বিন্দা মাঝির বউ সোনামুখী নগেন হোরোর বোন সিলভীর সঙ্গে ঝগড়া বাধায় কিম্বা নদীর ওপারে খোলা কান্দরে খরগোশ তাড়িয়ে নিয়ে আসে কোনো ভিন গাঁয়ের কুকুর এবং সে জন্যে যদি এপারের বাচ্চারা লে লে হৈ হৈ করেও ওঠে_কপিলদাস নড়বে না, হেলবে না, কান পাতবে না_কাউকে একটা কথা জিজ্ঞেসও করবে না।
আসলে কপিলদাস বুড়োর কাছে সবই একটার সঙ্গে আরেকটা মেলানো বলে মনে হয়, এ রকমই হয়ে আসছে দুনিয়ায়। ঝগড়া বলো, ঝাঁটি বলো, জন্ম বলো, মরণ বলো_সবই একটার সঙ্গে আরেকটা মেলানো। কত দেখল সে জীবনে। সব কিছুই শেষ পর্যন্ত একটা জায়গায় গিয়ে মিলে যায়। রাগ বলো, ক্ষোভ বলো, আবার হাসিখুশি মনের ভাব বলো, কিম্বা সামনে প্রকাণ্ড কান্দর, কি কান্দরের ওপরকার আসমান আবার তার নিচে টাঙনের স্রোত_সব কিছু, যা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে, যা শোনা যাচ্ছে_সবই একটার সঙ্গে আরেকটা শেষ পর্যন্ত মেলানো। আসলে, তার মনে হয়, সংসারের অনেক ভেতরে শান্ত ধীর এবং নিরবচ্ছিন্ন একটা স্রোত আছে। সব কিছুর ওপর দিয়ে ঐ স্রোত বয়ে যায়। সেখানে কাঁপন নেই, উত্তেজনা নেই, চিৎকার নেই। সব কিছু সেখানে ক্রমাগত একটার সঙ্গে আরেকটা মেলানো।
ঠিক এ ধরনের একটা গা-ছাড়া পরিতৃপ্ত ভাব আজকাল তাকে প্রায়ই পেয়ে বসে। আর সে জন্যেই শীতের রোদে পিঠ দিয়ে ভারি আরামে সে ঝিমোতে পারে। বয়স বেড়ে গেলে সম্ভবত মানুষের এ রকম একটা অবস্থা এসে যায়।
তবে সব সময় ঐ ভাবটা থাকে না।
মাঝে মাঝে ঐ রকম ঝিমোতে ঝিমোতে সে হঠাৎ আবার জেগেও ওঠে। তখন নগেন হোরোর বোন সিলভীর চিৎকার, মহিন্দরের ছেলের খরগোশ শিকার, কি ম্যানেজার মহাজনের দুর্ব্যবহার_এইসব ঘটনা তার চোখে পড়ে যায় এবং একটু একটু উত্তেজনাও বোধ করে। আর আশ্চর্য লাগে তার। চারদিকে এত কাণ্ড ঘটছে অথচ সে কোনো জায়গাতেই নেই_কোনো কিছুতেই সে জড়াচ্ছে না। ভাবো তো কী কাণ্ড! কপিলদাস কি এই রকম ছিল? নিজেকেই জিজ্ঞেস করে : কপিলদাস, এই রকম ছিলি তুই?
আর তখনই পুরনো ঘটনা ছবির পর ছবি সাজিয়ে নিয়ে আসে চোখের সামনে। পুশনা পরবে কী, তুমুল নাচ জুড়েছে দেখো কপিলদাস। তার গলায় বাঁধা মান্দল কী রকম শূন্যে ঘুরপাক খাচ্ছে, মেয়েদের গলায় কেমন শানানো স্বর। কপিলদাস দেখতে দেখতে নিজের যৌবনকালে চলে যায়। একের পর এক ঘটনা মনে পড়তে থাকে তার। আর ঐ রকমভাবে স্মৃতি তার সামনে পুরনো পসরা খুলে বসলে সে ভারি সুখে ঐসব পুরনো ঘটনার মধ্যে বিচরণ করে ফেরে।
একবার সেই যে কী হলো, মহাজনের ধান খামারবাড়ি থেকেই কিষানদের হাতে বিলিয়ে দিলি_মনে আছে সে কথা?
আর মানুষের পাদ্রিকে টাঙনের পানিতে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছিলি? মনে নাই?
চকিতে সে দেখতে পায় বর্ষায় ভরা টাঙনের পানিতে পাদ্রি তলিয়ে গেল। ঘোলাটে পানির মধ্যে কালো জুতোসুদ্ধ তার পা দুখানি ওপরে উৎক্ষিপ্ত হতে দেখা গেল স্পষ্ট করে। একটু পরই মানুয়েল পাদ্রি আবার ভেসে উঠেছিল। আর সে কী গাল! সাঁতরাতে সাঁতরাতে শাসাচ্ছিল : দেখিস তোর বাপকে বলব, দেখব বিচার হয় কি না।
সেই ছেলেবেলার কথা। হাপন ছিল যখন সে। তোর তীর কী রকম নিখুঁত নিশানায় গিয়ে বিঁধত, কপিলদাস, মনে নাই সে কথা?
হ্যাঁ, মনে আছে। কপিলদাস মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে নিজেকে শোনায়_সব মনে আছে।
কেন মনে থাকবে না। সান্তালের বাচ্চা না সে? দেখো তো খরগোশের পেছনে কে ছুটছে অমন? শুকদেবের ব্যাটা চতুর মাঝি, নাকি দিবোদাসের ব্যাটা কপিলদাস? আর ঐ দেখো, কপিলদাসের শিকারি কুকুর কী রকম ছুটে যাচ্ছে তীর-খাওয়া শিকারের পেছনে। কপিলদাস মনের ভেতরে স্পষ্ট দেখতে পায় তার কালো রঙের কুকুরটাকে_যেটা তার কিশোরকালের সঙ্গী ছিল সর্বক্ষণ। কুকুরটাকে শেষ পর্যন্ত বাঘে খেল।
কপিলদাসের মনে কুকুরের শোক উথলে ওঠে। টুঁটিছেঁড়া রক্তাক্ত কুকুরটাকে সে মনের ভেতরে দেখে আর কাঁদে।
একেক সময় আবার হাসেও কপিলদাস। ভারি প্রসন্ন হাসিতে চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে একেবারে। কেউ দেখে না, কিন্তু তবু বুড়ো হাসে। আহা কী দিন সেসব! সিনথিয়ার সঙ্গে দেখা হয় না, কপিলদাসের সদ্য যৌবনের রক্তে তখন ধিমি ধিমি তাত। বড় কষ্ট তখন মনের ভেতরে_কিছুই ভালো লাগে না। ঐ সময় নসীপুরের হাটে দেখা হল। কামারহাটির পেছনে, ধাঁই ধাঁই শব্দে লাল লোহার ওপরে হাতুড়ি পড়ছে আর পাশে ভাঁটের ঝাড়_সেখানে ভাঁটফুলের বুনো গন্ধ, সন্ধ্যারাতের চাঁদ পূর্ব-আকাশে। সাঁওতাল মেয়ের দুবাহু ময়াল সাপের মতো পেঁচিয়ে ধরল গলা। কালো চোখের পানিতে জোছনার আলো চিকচিক করে উঠেছিল। তবু হাসছিল সিনথিয়া। তার হাসি দেখে মন ভরে যাচ্ছিল কপিলদাসের। সেই মন-ভরানো সুখের হাসিও বুকের ভেতর থেকে একেক সময় উঠে আসে।
কপিলদাস একেক দিন আবার নিজের কাছে গল্প ফাঁদে। দূর থেকে দেখা যায় বুড়ো থেকে থেকে মাথা নাড়াচ্ছে আর ঝুঁকে ঝুঁকে দুলছে। কোন্ গল্পটা আরম্ভ করবে সে? বাহ্! গল্পের কি আর শেষ আছে_নিজেকেই শোনায় বুড়ো। ধরো, মেলার সেই ঘটনাটা_
মেলার গল্পটাই হঠাৎ মাঝখান থেকে শুরু হয়ে যায়। কেন যে বেছে বেছে মেলার গল্পটাই শুরু হয়_সে এক আশ্চর্য ব্যাপার। গল্প আরম্ভ করলেই সে মেলার ঘটনায় চলে আসে।
ছাড়, ছেড়ে দে! বাহুর ভাঁজে চেপে ধরা গলার ভেতর থেকে আওয়াজ বেরুচ্ছে। লোকটার খোঁচা খোঁচা দাড়ি, ঘামের গন্ধ এবং ঐ রকম দমবন্ধ হয়ে আসা আওয়াজ_ভারি কৌতুকের বিষয় হয়ে ওঠে। কপিলদাস ঐ অবস্থাতেই মজা পেয়ে হেসে ওঠে এবং গলা চেপে ধরা বাম বাহুর হাতের মুঠো ডান হাতে ধরে একটু জোরে চাপ দেয়। আর ঐ রকম চাপ দিতেই লোকটা আ-হ্ শব্দ করে আর্তনাদ করে ওঠে। তার দু চোখে ভয়ানক বিভ্রান্ত ঘোলাটে দৃষ্টি। ঐ আর্তনাদের সঙ্গে সঙ্গে মনে হয় লোকটার গলাটা বোধ হয় মটাৎ করে ভেঙে গেল। অত বড় শরীর, কিন্তু পা দুখানা কেমন শ্লথ হয়ে মাটি থেকে আলগা হয়ে যায়। আর তাতে উল্টো বিপদ হয়। ঐ রকম বিশাল শরীরের পুরো ভারটা এসে পড়ে নিজের ওপর। কী মুশকিল, কপিলদাস কী করবে তখন বুঝতে পারে না। লোকটার জোরে জোরে নিশ্বাস নেবার শব্দে ভারি খারাপ লাগতে আরম্ভ করে একসময়। ওদিকে একটা নাগরদোলা লোকসুদ্ধ ভয়ানক বনবন করে ঘুরছে দেখতে পায়। শুনতে পায় কলের গান বাজছে_ফান্দেহ্ পড়িয়া বগা কান্দেহ্ রে-এ-এ-এ_নিজেকে তখন অনেক দূরের মানুষ বলে মনে হয়। মনে হয় সে বোধ হয় মেলার মাঝখানে নেই। ঐ রকম অবস্থায় চারিদিকের লোকজন তাকে ছাড়িয়ে দূরে সরিয়ে নিয়ে যায়। কপিলদাস দূর থেকে পেছনে তাকালে দেখতে পায়, লোকটা মাথা নিচু করে দু হাতে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করছে।
কেন যে ঐ রকম মারামারি কাণ্ডটা ঘটেছিল, ঠিক মনে করতে পারে না। শুধু লোকটার মুখ মনের ভেতরে দেখতে পায়। লোকটার নাম কী, বাড়ি কোথায়, কোন প্রসঙ্গে ঐ রকম ঘটনা ঘটে গিয়েছিল, কিছু মনে আসে না।
কিম্বা ঐ ধানকাটার ব্যাপারটাই ধরো না কেন। আধিয়ার জোতদারের মাঝখানে পড়ে গেল সাঁওতাল বস্তিটা। গুপীনাথ হুঁ হুঁ করে না, ডাইনে-বাঁয়ে তাকায় না। ওদিকে কে একজন আগুনের কুণ্ডলীর ওপরে আরেক বোঝা নাড়া চাপিয়ে দিয়ে গেল। দাউদাউ করে জ্বলে উঠল আগুন। আর ঐ আগুনের আলোয় গুপীনাথের কপাল চকচক করতে লাগল। কিন্তু সে শাদা চুলভর্তি মাথাটা ঝুঁকিয়ে বসে আছে তো বসেই আছে।
কপিলদাসের ঘাড়ের কাছে শীতের বাতাস শিরশির করে এসে লাগছিল। আগুন দেখতে পেলে শীতের কামড়টা বোধ হয় বেশি লাগে। নইলে হঠাৎ ঐ সময়ই বা কেন কানের কাছে দিয়ে, ঘাড়ের কাছ দিয়ে, শিরশির শিরশির করে শীত তার শরীরে ঢুকে ক্রমাগত ছড়িয়ে যেতে থাকবে। কিন্তু বুড়োর কাণ্ডখানা দেখো, হুঁ হুঁ করে না। বলে দেয় না, ডাইনে যেতে হবে, না বাঁয়ে। একদিকে জোতদার মহাজন আর অন্যদিকে আধিয়ার কিষান। ওদিকে আবার কুয়াশার নিচে পাকা ধান শুয়ে আছে যুবতী মেয়ের মতো। কুন দিক যাবে মানুষ_হাঁ মড়ল, কহে দে, কুন দিক যাবে।
কিন্তু গুপীনাথ সাড়া দেয় না_যেন ঘুমিয়ে পড়েছে। নিশ্বাস নিচ্ছে কি না বোঝা দায়।
সাঁওতালদের তখন কী মুশকিল ভাবো দেখি। মহাজন বসত করবার জায়গা দেয়, আবাদের জমি দেয়, গিরস্তির কাজ দেয়_সেই মহাজনের বিপক্ষে কেমন করে যায়। মহাজন যে সব দেয়। হাঁ, সব দেয়_কিন্তুক পেটের ভাতটা কি সারা বছর দেয়, আঁ? কহ মড়ল, কহে দে, দেয় পেটের ভাতটা? এই রকমের সব বাদানুবাদ। কিন্তুক যদি ভিটেমাটি থেকে তুলে দেয় তাহলে? এই রকমের সব তর্কাতর্কি। ওদিকে গুপীনাথ কিছুই বলে না। মড়ল হলে বোধ হয় ঐ অবস্থায় কিছু বলা যায় না।
কিন্তুক তখন ভারি জাড় হে মহড়। দেহ দলদল করে কাঁপছে। দূরে দূরে যারা দাঁড়িয়ে ছিল তাদের মধ্যে থেকে কে যেন চেঁচিয়ে বলে উঠেছিল_হামরা মহাজনের সঙ্গে নাই, আধিয়ার কিষানের সঙ্গে হামরা।
কে বলেছিল কথাটা? মনে নেই এখন। সে নিজে হতে পারে, মোহন কিন্তু হতে পারে_কিম্বা চতুর মাঝিও হতে পারে। লোকটা যে কে, ঠিক মনে নেই। কিন্তু কথাটা ঠিক মনে আছে।
তারপর?
কপিলদাস আর খেই ধরতে পারে না। বিচারসভার শেষদৃশটা স্মরণে আসে না। বরং হঠাৎ ধানকাটার দৃশ্যটা মনের ভেতর দেখতে পায় সে। কপিলদাস মাঠে নেমেছে, পাশের ক্ষেতে মোহন কিস্কুর বউ টুরি_সারা কান্দরে আর একটা মানুষ দেখা যায় না। ধান গাছের নোয়ানো পাতায়, শিষের গায়ে, তখনো রাতের হিম ফোঁটায় ফোঁটায় জমে আছে। রোদের তাপ গায়ে লাগে কি লাগে না, এমনি কুয়াশা।
হঠাৎ পাশে অস্ফুট আর্তনাদ শুনে ফিরে তাকাল সে। দেখল, টুরি মাঝি হাতের কাঁচিয়া ফেলে তার বিশাল পেট দু'হাতে চেপে ধরে বসে পড়েছে। কপিলদাস চিৎকার করে লোকজন ডাকাডাকি করল। কাছাকাছি একটি মানুষ নাই হে তখন_ভালো তো, কী বিপদ! সে নিজে এগিয়ে গেলে সে কি গালাগাল টুরির। ঐ গালাগাল শুনে বোকার মতো দাঁড়িয়ে পড়তে হলো। আর ঐ রকম দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল টুরি একটু পরই উঠে দাঁড়াচ্ছে। মেয়েটা তারপর টলমল পায়ে হেঁটে হেঁটে একটা ঝোপের আড়ালে চলে গেল।
পুরুষ মানুষ আসলে নিষ্কর্মা। কপিলদাস মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে নিজেকেই শুধোয়, বল নিষ্কর্মা নয়? জন্মের সময়টাতে তার কিছু নেই। সে শুধু বেকুবের মতো তাকিয়ে থাকতে পারে।
ঐ দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই সে টুরির কাতরানি শুনেছিল। মেয়ে মানুষের ঐ চাপা অথচ মর্মভেদী আর্তনাদের সঙ্গে বোধ হয় আর কিছুর তুলনা হয় না। ওহ্ সে কী কষ্টকর ঐ রকম আর্তনাদ শোনা। তার একটু পরই সদ্যোজাত বাচ্চার কান্না শুনতে পেয়ে তার সমস্ত শরীরে ঝাঁকুনি দিয়ে খুশি জেগে উঠেছিল। ছুটে গিয়েছিল তখন ঝোপটার দিকে। হ্যাঁ, ঝোপটাকে সে মনের ভেতরে স্পষ্ট দেখতে পায়। বাঁশঝাড় ছিল, একটা নাটার গাছ ছিল। আবার কয়েকটা আঁশশ্যাওড়ার গাছও দেখা যাচ্ছিল। সেখানে আবার একটা সাপের খোলসও ছিল। আঁশশ্যাওড়ার ডাল থেকে নাটাগাছের কাঁটাভর্তি ডাল পর্যন্ত লম্বা করে টানানো। সেই খোলসটার ওপর আবার রোদ এসে পড়েছিল তখন। আর ঐসব দেখতে দেখতে, হ্যাঁ ভারি মনোযোগের সঙ্গে দেখতে দেখতে, মাথা উঁচু করে সে তাকিয়েছিল।
ভারি আশ্চর্য সেই দৃশ্য। সদ্যোজাত শিশুর নাড়ি দাঁত দিয়ে কাটছে মা। বাচ্চাটা থেকে থেকেই চিৎকার করে উঠছিল। সদ্যোজাত বাচ্চার কান্না কিন্তু অদ্ভুত। অদ্ভুত নয়? কেমন আঁ আঁ করে শরীরের সমস্ত নিশ্বাস বার করে দেয় গলা দিয়ে, তারপর নিশ্বাস নিয়ে হিক্কা তোলার মতো দেহ কাঁপিয়ে দমকে দমকে কাঁদতে থাকে। ঐ রকম কান্না শুনেও মা কিন্তু কিছু বলছিল না। কে জানে ঐ রকম সময়ে মায়েরা বাচ্চার কান্না শুনতে পায় কি পায় না। হ্যাঁ, মা কিছুই বলছিল না। কোনো সোহাগের কথা মায়ের মুখে ফুটছিল না। তাই দেখে সে মনে মনে কিছুটা উত্তেজনা বোধ করছিল। কিন্তু তখন মা ভয়ানক ব্যস্ত না? তার তখন বাচ্চার কান্না শোনার মতো সময় কোথায়? বলো, অতদিকে তখন নজর দিতে পারে?
হ্যাঁ, দেখছিল সে, মায়ের নিজের শরীর একদিকে, আরেক দিকে সন্তান। নিজের ঊর্ধ্বাঙ্গের কাপড় সন্তানের গায়ে জড়িয়ে দিচ্ছিল তখন। আহা, হাত দুখানি কী শান্ত, কী কোমল_কবজির ভাঁজটুকু কিম্বা আঙুলের নড়াচড়াটুকু টাঙনের মোলায়েম ঢেউয়ের মতো মনে হচ্ছিল। নিজের অনাবৃত বক্ষদেশ নিয়ে তার কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। কপিলদাস এখনো স্পষ্ট দেখতে পায়, দুধে স্ফীত সাঁওতাল মায়ের বুক কি রকম নিঃসঙ্কোচ হতে পারে। বোঁটা দুটি, বোঁটা দুটির চারপাশে কালো ঘেরটুকু পর্যন্ত ভারি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। শুধু মায়ের বক্ষদেশ নয়_নিম্নাঙ্গের কাপড়ও কি রকম রক্তাপ্লুত, তাও সে দেখতে পাচ্ছিল। কালো শরীরে সাদা কাপড় এবং সাদা কাপড়ের ওপর আবার ঐ রকম ডগডগে লাল রক্ত_সেও সবুজ ঘাসের মাঝখানে। সকালবেলার রোদে গোটা দৃশ্য ভয়ানক জ্বলজ্বল করছিল তার চোখের সামনে। তারপর যখন সে বাচ্চাটাকে কোলে তুলে নিল_আহা_সে যে কি রকম একটা ভাব, সে বলে বোঝাতে পারবে না। বাতাসে পাকা ধানের গন্ধ, তার নিচে ভেজা মাটির গন্ধ এবং তারো নিচ থেকে যেন নবজাত শিশুর গন্ধ উঠে আসছিল। আর ওই সময় তার দু'হাতের মধ্যে ধরা ঐ রকম রক্তাক্ত কোমল একটি লাল ফুল।
বাচ্চাটা লাল মুখ মেলে চিৎকার করে উঠছিল। তার মাড়ি, জিভ, কুঁচকানো নাক, পিটপিটে চোখ দুটি এখনো সে মনের ভেতরে স্পষ্ট দেখতে পায়। আর হ্যাঁ, হাঁটতে হাঁটতে ঐ সময় সে দুহাতে বাচ্চাটাকে দোলাচ্ছিল।
কপিলদাস বুড়ো বসে বসেই হাত দুখানা তুলে শূন্যে দোলাতে আরম্ভ করে।
ঐ রকম গল্প বলতে বলতে বেলা ফুরিয়ে যায় একসময়। রোদের তাপ কমে আসে। ঝাপসা চোখ দুটি মেলে সে তখন আসমানের ধূসর রঙ দেখে। এবার নদীর ভাটি থেকে উঠে আসা শঙ্খচিলের ডাকটাও শুনতে পায়। বাতাসে তখন শীতের কামড়। তার দু'হাতের আঙুল ছেঁড়া কোটের বোতাম দুটি খুঁজতে থাকে।
আর ঐ সময়ই তার চোখে পড়ে যায়। দেখে কজন লোক টাঙনের উঁচু পাড়ে দাঁড়িয়ে বস্তির দিকে হাত তুলে কী যেন দেখাচ্ছে। লোকগুলোকে সে চিনতে চেষ্টা করে। ওখানে এই সময়ে কারা? অমন পরিষ্কার জামা-কাপড় পরা_কে লোকটা? অনেক ক্ষণ ধরে লোকটার নড়াচড়ার ভঙ্গি লক্ষ করে। লক্ষ করতে করতেই মনে পড়ে_কদিন আগেও বোধ হয় ওদের এইভাবেই দেখেছে সে। ঠিক এইভাবেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বস্তির দিকে হাত তুলে কী যেন বলাবলি করছিল। সে একসময় চিনতে পারে। পরিষ্কার জামা-কাপড় পরা লোকটা ম্যানেজার মহাজন ছাড়া আর অন্য কেউ হতে পারে না। কিন্তু এমন সময় ওখানে দাঁড়িয়ে ওদের কী কাজ? একবার মনে হয়, জরিপ হচ্ছে বোধ হয়। একেক সময় ঐ রকম জমিজমার মাপামাপি চলে। ওরা কি জমিজমা মাপতে এসেছে? কই এ রকম কোনো খবর তো তার কানে আসেনি।
একটু পর আর দেখা যায় না কাউকে। দেখতে না পাওয়ায় কৌতূহলটা আর থাকে না। কপিলদাস তখন গরুর পালের ঘরে ফেরা ঘুণ্টির আওয়াজ কান পেতে শোনে। ফার্মের গরুগুলোর গলায় নতুন ঘুণ্টি বাঁধা হয়েছে নিশ্চয়ই। আজকাল বোধ হয় জয়হরির ছোট ছেলেটা ফার্মের গরু চরায়। জয়হরির কী যেন হয়েছিল? জয়হরির কথা স্মরণ করতে চেষ্টা করে সে। আর ঠিক ঐ সময়ে কাছে এসে দাঁড়ায় সলিমউদ্দিন। এসেই ডাকে : বুঢ়া দাদা, বাড়িত যাবো নাই?
হ্যাঁ যামু, সে জয়হরির কথা স্মরণ করতে না পেরে সলিমউদ্দিনের দিকে মনোযোগ দেয়। ছোঁড়া কোত্থেকে আসছে, সেই কথা জিজ্ঞেস করতে করতে উঠে দাঁড়ায়।
সলিমউদ্দিন তখন কুশিয়ার ক্ষেতে আজ কী কাণ্ডটা ঘটেছে, সেই ঘটনার বর্ণনা আরম্ভ করে। এবং ঐ আরম্ভের মুখেই সে জানিয়ে দেয়_বুঢ়া দাদা, তুমার বস্তিটা আর এইঠে থাকবে নাই, ইবছর এইঠে ধানের আবাদ হবে। কথাটা কেন যে বলে ছোঁড়া, বুড়ো ঠিক ধরতে পারে না। কিম্বা এমনও হতে পারে যে তার বর্ণনাতেই বোধ হয় প্রসঙ্গটা থাকে না। সিলভী আজ বিন্দা মাঝির বউয়ের সঙ্গে ঝগড়া বাধিয়েছে। কিভাবে, সেই ব্যাপারটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সে বর্ণনা করে। তারপর হঠাৎ বিন্দা মাঝি এসে গেলে কী হলো সেই পরিস্থিতিটাও সে ব্যাখ্যা করতে উৎসাহী হয়ে ওঠে। কপিলদাস হাঁটতে হাঁটতে দাঁড়ায় আরেকবার। সিলভীর বাপের কথা স্মরণ করে ফিরেও এসেছিল, শেষে কী যে হয়ে গেল লোকটার? কবিরাজের হাট থেকে ফিরছিল সেবার_হ্যাঁ, এই রকম জায়গাতেই বোধ হয় ঘটেছিল ব্যাপারটা। সে মাটির দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে খোঁজে। বর্ষাকালের ব্যাপার, মাটিতে ফাটল ধরেছিল_ওদিকে টাঙন তখন পাগল। মাটি ধসে পড়েছিল হঠাৎ। তখন সন্ধ্যা, শিবনাথ বোষ্টম পুলের ওপর দাঁড়িয়ে গান গাইছিল। ঠিক ঐ সময়ে ঘটনাটা ঘটে। কপিলদাস পুরনো কালের এইসব খুঁটিনাটি ঘটনার কথা ভাবতে শুরু করে দেয়।
ওদিকে কিন্তু কানের কাছে গুনগুন করে সলিমউদ্দিন বলেই চলেছে_সিলভী তারপর কী কহিল জানিস বুঢ়া দাদা? বিন্দা মাঝিক কহিল, তুই ম্যানেজার মাহাজনের কুকুর। কুকুর কহা কি ঠিক_তুই কহ বুঢ়া দাদা?
কুকুর বলেছে? কলিদাস আবার দাঁড়িয়ে যায়। হরগোবিনের মেয়ে, নগেন হোরোর বোন, সিলভী, কুকুর বলেছে। অ, সলিমউদ্দিনের দিকে তার চিন্তা ফিরে আসে, কুকুর কহে দিলে, ক্যানে?
আহ্ হা। সলিমউদ্দিনকে আবার পুরনো কথার খেই ধরতে হয়। বলে, আরে ঐ যে কহিনু বিন্দা মাঝি ম্যানেজার মাহাজনের ঘরের ভিতর থে বাহার হয়ে আসিল আর আসে ধমকালে, মারিবা চাহিল।
ম্যানেজার মহাজনের সঙ্গে কি তখন বিন্দা ছিল? একটু আগে অস্পষ্ট দেখা লোকজনের মধ্যে বিন্দা মাঝি ছিল কি না, সেই কথাটা স্মরণ করতে চাইল বুড়ো।
সলিমউদ্দিনের বর্ণনা তখনো ফুরোয়নি। বলল, সিলভীর কী তেজ, বাপ, মায়ামানুষ না ডাইন_এক্কেবারে দাও উঠালে মারবার তানে!
কপিলদাসকে এবার মনোযোগী হতে হয়_কী কহিল? দাও উঠালে মারবার তানে_কা'ক মারবার তানে?
বিন্দা মাঝিক বাহে, বিন্দা মাঝিক।
অ, কপিলদাস মাথা নাড়িয়ে নাড়িয়ে আবার হাঁটতে শুরু করে। হরগোবিনের মেয়ে সিলভীকে মনের ভেতরে স্পষ্ট দেখতে পায়। খুঁটি উপড়ে গিয়ে ও মেয়ে ছাগলের পালটাকে যখন আলোর উপর দিয়ে হৈ হৈ হুস হুস করে তাড়াতে থাকে আর ছুটতে থাকে তখন তার শরীরের দিকে তাকিয়ে দেখো। যদি পুরুষমানুষ হও তো নজর ফেরাতে পারবে না। সিনথিয়া ছিল ঐ রকম। কপিলদাস মুর্মু নজর ফেরাতে পারত না। দেখো, ঐ রকম মেয়ে সিলভী, সে-ই কিনা দা তুলে তেড়ে গিয়েছে বিন্দা মাঝির দিকে। কী হইল, তারপর কী হইল?
প্রশ্নটা মুখ দিয়ে উচ্চারিত হলো, কিন্তু কৌতূহলটা আর থাকে না। দূরে দেখতে পায় ম্যানেজার মহাজন সম্ভবত আবার এসে দাঁড়িয়েছে উঁচু পাড়ের ওপর। বস্তির দিকে হাত তুলে তুলে কী যেন দেখাচ্ছে। আর ঠিক ঐ সময় দেখো বাচ্চারা আবার শিকার করে ফিরছে_ঐ সামনেরটি বোধ হয় তার নাতি। তার কুকুরটাকে স্পষ্ট চেনা যায়।
সলিমউদ্দিন তখনো সিলভীর প্রসঙ্গ পাল্টায় না। কী কী সব বলতেই থাকে। সিলভীর ভাই নগেন হোরোর নাম করে। কেন যে_খেই ধরা মুশকিল। নাকি সলিমউদ্দিন সিলভীর সঙ্গে ইদিক-সেদিক কিছু একটা করছে? কপিলদাসের হঠাৎ সন্দেহ হয়। তবে সলিমউদ্দিনের খিটখিটে হাড়সর্বস্ব শুকনো চেহারাটা দেখে আবার মায়াও হয়। কিন্তু সান্তাল মেয়ের তো শুধু পুরুষমানুষ হলে চলে না। তার মরদ পুরুষ দরকার। সে ফস করে জিজ্ঞেস করে, হাঁ বাহে, পচই খাইছি কুনোদিন?
সলিমউদ্দিন বুড়োর কথায় হকচকিয়ে যায়। ঐ কী রকম বিদঘুটে প্রশ্ন। জবাব দেয়, না বুঢ়া দাদা, নিশা মোর সহ্য হয় না।
কপিলদাসের হঠাৎ খেয়াল হলো লোকগুলোকে আর দেখা যাচ্ছে না। এখুনি না দেখল! মুহূর্তের মধ্যে কোথায় উবে গেল অতগুলো মানুষ।
নাকি সে দেখেনি! তার কেবলি মতিভ্রম হতে থাকে। এদিকে সলিমউদ্দিনের সেই খামারবাড়ির ঘটনাটার বর্ণনা তখনো ফুরোয়নি। এখন অবশ্যি সিলভীর কথা বলছে না। কিন্তু ম্যানেজার মহাজনের কথাটা বলেই চলেছে। ম্যানেজার মহাজন, বিন্দা মাঝি, বিন্দা মাঝির বউও আবার ইতিমধ্যে ঢুকে পড়েছে তার বর্ণনায়।
বিন্দা মাঝির মাউগটা বুঢ়া দাদা_হাঁ, বুঝল নি, এক্কেবারে বেহায়া বাহে। হাসে কেমন, দেখলে তোর শরীল জ্বলে যাবে।
নাও বোঝো! এবার কপিলদাসের হাসি পায়। কোন্ কথা থেকে কোন্ কথায় এসে পড়ল। এরও তাহলে মাথায় দোষ আছে।
কিন্তু ম্যানেজার মাহাজন কী কহিল্ শুনবো? কহিল্, আর নহে, তুমার বস্তিটা ইবার উঠায় দিবে, দু-চার দিনের ভিতর এইঠে টাকটর চলিবে।
কপিলদাস দাঁড়িয়ে পড়ে কথাটা কানে ঢুকতেই। দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করে, আ, কী কহিল?
সলিমউদ্দিন কথাটা আবার বলে। বিন্দা মাঝির বউ সোনামুখী ম্যানেজার মহাজনের ঘর থেকে বেরিয়ে আসার পর ঝগড়া হলো আর তার পরই ম্যানেজার মহাজন কথাটা জানিয়ে দিয়েছে। কথাটা কিভাবে বলেছিল সেইটাই সে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বর্ণনা করতে চেষ্টা করে।
সলিমউদ্দিনের কথা শুনতে শুনতে সে চারদিকের অন্ধকারের দিকে নজর ফেরায়। শীতকালের অন্ধকার ভারি দ্রুত নামছে। নদীর ওপারে কান্দরের দিকে রাখালের ডাকাডাকি শব্দ মিইয়ে এসেছে অনেক ক্ষণ। ধোঁয়া ধোঁয়া মলিন কুয়াশা কালো হয়ে ক্রমে ক্রমে নিচের দিকে নেমে এসে একেবারে ঢেকে দিয়েছে ক্ষেত, গোহাল, মানুষ এবং বস্তিতে। চারদিকের ছড়ানো মানুষ এখন কাছাকাছি হচ্ছে, ঘরে ফিরছে সবাই। মানুষের যত কথা সব এখন একে একে উঠোনে উঠোনে গিয়ে জড়ো হচ্ছে! এখন কিছুক্ষণ আগুনের কুণ্ডলীর চারপাশে কথাগুলো বিনবিন স্বরে ঘোরাঘুরি করবে। তারপর সেটাও যাবে চুপ হয়ে। মানুষজন তখন যার যার ঘরে গিয়ে ঢুকবে। অন্ধকার আর শীত কী রকম অদ্ভুত জিনিস দেখো, মানুষকে তাড়িয়ে ঘরের ভেতরে নিয়ে যায়। অন্ধকার দেখে মন ভয় পায় আর শীত দেখে শরীর! কাণ্ডটা দেখো!
অন্ধকারের দৃশ্য দেখতে দেখতে একটুখানি দার্শনিক ভাবনা এসে যায় বুড়োর মনে। সলিমউদ্দিনের কথা প্রায় ভুলে যায় ঐ সময়। অত যে খুঁটিনাটি বর্ণনা তার কিছুই কানে ঢোকে না। বিন্দা মাঝির বউ ম্যানেজারের ঘরে ঢুকেছিল সেই দুপুরবেলা, সবাই যখন কুশিয়ার ক্ষেতে। তারপর কুশিয়ার ওজনের সময় বিকেলবেলা সবাই যখন খামারবাড়ি এলো, তখন দুজনকে একসঙ্গে ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়াতে দেখা গেল। ঐ সময় হেসে হেসে মশকরা করে কী যেন বলছিল বিন্দা মাঝির বউ, ম্যানেজারও তখন খুশি ছিল, সিলভীর দিকে তাকিয়ে সেও সম্ভবত কিছু বলছিল। ওদের ঐ রকম কাণ্ড দেখেই কিনা কে জানে, তীব্র চিৎকার করে গালাগাল দিয়ে উঠেছিল সিলভী। ম্যানেজার মহাজন ঐ গালাগাল শুনে বারান্দা থেকে উঠোনে নেমে এসেছিল। উঠোনের মাঝখানে ওজনের কাঁটা পোঁতা ছিল। নবীন বর্মণ আর আকালু পরামাণিক কুশিয়ার মাপতে শুরু করে দিয়েছে তখন। বিন্দা মাঝিও কেন যে কথাটা বলতে গেল ঐ সময়। তার নেশা ছিল তখনো। সে সিলভীকে ছিনাল বলে গাল দিয়ে উঠল। আর ঐতে বিপদ হয়ে গেল। সিলভী কুশিয়ার কাটা দা নিয়ে সাঁ করে ছুটে গেল বিন্দা মাঝির দিকে। সিলভী অবশ্যি কিছু করতে পারেনি। তাই নাকি পারে। অত লোকজন চারদিকে। ঐ কাণ্ডটা ঘটে যাবার পরে ম্যানেজার মহাজনের কী রাগ_এই মারে তো এই মারে! শেষে, মানে রাগটাগ যা দেখাবার দেখানো হয়ে গেলে, তার আসল কথাটা জানিয়ে দিল সবাইকে।
সলিমউদ্দিন সম্ভবত যথেষ্ট আকর্ষণ সৃষ্টি করতে পারে না। কপিলদাস কিছুক্ষণ শুনেও ঠিক ধরতে পারে না কথাটা। তার কেবলি তখন মনে হচ্ছে ম্যানেজার মহাজন এই সন্ধেবেলা নদীর পাড়ে এসে দাঁড়ালেই বা কেন, আর কেনই বা ঐভাবে হঠাৎ অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেল। বিন্দা মাঝির বউ ম্যানেজারের সঙ্গে মশকরা করে কথা বলছিল_এইটুকু শুধু তার মনের মধ্যে ধরা পড়ছিল। দৃশ্যটা সে মনের মধ্যে দেখতেও পাচ্ছিল। ঐ সঙ্গে থেকে থেকে আবার সিলভিয়ার সঙ্গে সলিমউদ্দিনের ফষ্টিনষ্টির কথা, অন্ধকারের কথা, ঠাণ্ডার কথা সব একসঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছিল। এমনকি টুরির সদ্যোজাত বাচ্চাটাকে দু'হাতে দোলাচ্ছিল পর্যন্ত সে মনে মনে। হ্যাঁ, তারপর কী যেন? সে হঠাৎ শুধোল : হাঁ, কী কহছিল ম্যানেজার মাহাজনের কথা, টাকটর কুনঠে চলিবে?
এত কথার পর এই প্রশ্ন। সলিমউদ্দিন রীতিমতো ক্ষুব্ধ হয়। বলে, না বুঢ়া দাদা, তোরঠে কুনো কথা কহা যায় না, কুনো কথা তোর ফম থাকে না।
সলিমউদ্দিনকে ক্ষুব্ধ হতে দেখে কপিলদাস বুড়ো ছোঁড়ার ঘাড়ে হাত রাখে। কী কপাল ছেলেটার দেখো, এই বয়সে মা-বাপ-ভাই-বোন চৌদ্দগুষ্টি খেয়ে বসে আছে। একটা চাকরি ছিল ফার্মে, ম্যানেজারের বউয়ের হুকুমে সেটিও গেছে। ছেলেটার রোগা দুর্বল শরীরে হাত রাখলে তার একেক সময় মায়া হয়। এখনো তাই হলো, বেচারা! সেই কখন থেকে ঘটনাটা বলে যাচ্ছে। কপিলদাস এবারে আন্তরিক আর মনোযোগী হয়। প্রায় মিনতি করে বলে, হাঁ বাপু, তারপর কী হইল কহ তো? ম্যানেজার শালা কী কহিল?
আবার কথাটা নতুন করে বলতে হলো সলিমউদ্দিনকে। বলল, তুমার বসতটা ইবার উঠায় দিবে, এইঠে ইবছর টাকটর চলিবে।
কপিলদাস এবারও বুঝতে পারে না। তার নিজের হিসাব মেলে না। ট্রাকটর জমিতে চলবে, তাই চলে এসেছে এতকাল। মানুষের বসতের উপর দিয়ে ট্রাকটর চলতে যাবে কেন? ই কেমন কথা? সে অন্ধকারেই ডাইনে-বাঁয়ে তাকায়। বলে, ঠিক শুনিছিস তুই, কহ ঠিক শুনিছিস?
সলিমউদ্দিন এবার সত্যিই বিরক্ত হয়। বলে, মোর কথা বিশ্বাস না হয় আর কাহাকো পুছে দেখ। মুই ইবার যাঁউ, তুই বুঢ়া মানুষ, তোর কিছু ফম থাকে না।
কথাটা বলেই হঠাৎ ছোঁড়া চলে গেল।
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কপিলদাস বুড়োর ঠাণ্ডা লাগছিল। কিন্তু সচল হবার কথা তার মনে আসছিল না। কথাটা কি ঠিক? কী কাণ্ড বলো দেখি, কথা নেই বার্তা নেই, বসতের ওপর দিয়ে ট্রাকটর চলবে। কপিলদাস চিৎকার করে ডাকে তখন; সলিমউদ্দিন, এ সলিমউদ্দিন।
তার ডাক সলিমউদ্দিনের কানে পেঁৗছোয় কি না, বোঝা যায় না। অন্ধকারের ভেতর থেকে কোনো সাড়া আসে না। চারদিকে তার মেলানো সংসার। টাঙনের স্রোত, দক্ষিণের কান্দর, মানুষজন, আসমান, ধানক্ষেত, এমনকি নিজের সুখ-দুঃখ কি সাফল্য-ব্যর্থতা পর্যন্ত সে আজকাল একটার সঙ্গে আরেকটাকে মেলানো দেখতে পায়। আর সে জন্য নিজের ছোট্ট দুনিয়ায় সে ভারি নিশ্চিন্ত ছিল। কেমন ধারণা হয়েছিল, জীবন এ রকমই বয়ে যায়। একটুখানি ঝগড়া বিবাদ, হৈচৈ, কিছু দুঃখ, খানিক সুখ, জনম-মরণ সব মিলিয়েই জীবন। সে ভেবে নিয়েছিল এইভাবেই দুনিয়া তার নিয়ম পালন করে। কিন্তু সলিমউদ্দিন এ কোন কথা বলল? কথাটা তার মনের মধ্যে খচখচ করতে লাগল।
তবে হলে কী হবে, আসলেই সে বুড়ো মানুষ তো। মন একদিক থেকে আরেকদিকে চলে যায়। কয়েক পা এগোতে না এগোতে ওপরের দিকে নজর তুললে আসমানের তারা দেখতে পায় সে, আর তাই দেখতে পেয়ে সে আসমানের শোভা দেখে কিছুক্ষণ। চোখ ঝাপসা, কিন্তু দেখতে পায় ঠিকই_শীতের আসমানে ঝকঝক করছে নীল নীল তারা। তারা কি আসলেই নীল? নাকি তার অমনি হঠাৎ মনে হলো। সে ঠিক ধরতে পারে না। একটা তারা তার খুব চেনা মনে হলো। ঐ তারাটাই না?
ঐ রকম দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই সে পুরনো কথার মধ্যে চলে যায়। নরম কোলের ওপর ছিল কথাটা। মুখের ওপর সিনথিয়ার স্তনভার। সিনথিয়া সোজা হয়ে বসায় বুকের আড়াল সরে যায় আর তখন তারাটা চোখে পড়েছিল। একটা ঘোরের মধ্যে থেকে জেগে উঠেছিল সে। সিনথিয়া কানের কাছে ফিসফিস করছিল, চলো পালাই।
পালাব, সিনথিয়া মুখের দিকে তাকিয়ে দেখেছিল কিছুক্ষণ। তারপর বলেছিল, না। পষ্ট করে জোরের সঙ্গে বলেছিল, না।
রাস্তায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কপিলদাস মাথা নাড়ায়। আর নিজেকে শোনায়_না, ক্যানে পালাব। তার পা আপনা থেকে বাড়ির পথ ধরে। কোথায় পালাবে সে। একসময় আবার হাসি পায় বুড়োর, পালাবার কথাটা এলো কোত্থেকে? তুই বুঢ়া মানুষ হে মড়ল_নিজেকে শুনিয়ে শুনিয়ে তখন সে বলে, তোর কিছু ফম থাকে না। আর ঐ সময় ট্রাকটরের আওয়াজটা তার কানে এসে ধাক্কা মারে। কী কারণে যে হঠাৎ ধকধক শব্দ করে জেগে উঠল ঘুমন্ত ট্রাকটরটা, আন্দাজ করা মুশকিল। বিনোদ মিস্ত্রি একেক দিন এই রকম হঠাৎ ট্রাকটরের এঞ্জিন চালিয়ে দেয়। ট্রাকটরটা সে চোখের সামনে দেখতে পায় যেন। বিশাল বিশাল দুই চাকা ঘুরতে ঘুরতে মাঠের বুকের ওপর দিয়ে চলেছে। পেছনের ধারালো চাকতিগুলো মাটি ফালা ফালা করে দিচ্ছে, গন্ধ বেরুচ্ছে কাটা মাটির ভেতর থেকে। ঐভাবে ট্রাকটরটা চলে আসে একেবারে দীনেশ কিস্কুর বাড়ির সীমানা পর্যন্ত। তার পরই বেশ দিব্যি ঘুরে যায়। বসতই হলো ট্রাকটর চলাফেরা করার শেষ সীমানা। হ্যাঁ, কলের জিনিস ঐ পর্যন্ত আসে। সংসারের সীমানা পর্যন্তই তার আসবার ক্ষমতা, তারপর আর পারে না, এতকাল অন্তত পারেনি। আর এখন সেই কলের জিনিস হুড়মুড় করে ঢুকে পড়বে দীনেশ কিস্কুর উঠোনে। ঘরের দেয়ালে ভোঁতা নাক ঢুকিয়ে উল্টোদিকের দেয়াল ফুঁড়ে বেরুবে। দৃশ্যটাকে সে মনের ভেতর দেখতে পায়। আর তাই দেখে সে ভয়ানক অস্থিরতা বোধ করে। ই কী কথা আঁ? ট্রাকটর চলে আসবে সংসারের বুকের ওপর? সংসারে কাচ্চাবাচ্চা, গাইগরু, সবজিক্ষেত, সুখ আহ্লাদ_সব কিছুর ওপর দিয়ে গড়গড় করে চলে বেড়াবে_ই কেমন কথা, ম্যানেজার মহাজন ও রকম হুকুম কেমন করে দেয়?
সলিমউদ্দিনের কথাগুলো এবার একের পর এক মনের ভেতর স্পষ্ট হতে থাকে। সিলভীর দা নিয়ে বিন্দা মাঝির দিকে তেড়ে যাবার ঘটনা, সোনামুখী আর মহাজনের ঢলাঢলি_ওদিকে নগেন দাস কী একটা চিঠি লিখেছিল না কোথায়? ব্যাপারটা নিয়ে না কিছুদিন ধরেই টানাহেঁচড়া চলে আসছে?
কপিলদাস বুড়োর এখন মনে পড়তে থাকে। এই বস্তি উঠে যাবার ব্যাপারটা আকস্মিক নয় একেবারে_তাহলেও, এই কি শেষ পর্যন্ত পরিণতি? বস্তিটস্তি উঠে যাবে আর ট্রাকটর চলতে থাকবে ঘরবাড়ি-ভিটেমাটির ওপর দিয়ে। কোথায় একটা মেয়েমানুষের মাথা গরম করে মাতালের দিকে দা উঁচিয়ে তেড়ে যাবার ঘটনা আর কোথায় বাড়িঘর সংসারসুদ্ধ লোপাট করে দেওয়া! কিসের সঙ্গে কিসের জড়ানো। কিন্তু ভাবো তো, বসতটা কত পুরনো? মনে আছে তোর? হাঁ বাহে, মড়লের ব্যাটা, তোর কি ফম আছে?
হাঁ হাঁ, ফম আছে। বিচার বসেছিল ফার্মের অফিসঘরে। কে একজন সাহেব মানুষ শুধোচ্ছিল। আর সে উত্তর দিচ্ছিল। কবে কোন প্রাচীনকালে এসেছিল একদল মানুষ। সেই দলের মড়ল ছিল শিবোনাথ। শিবোনাথ আবার গুণিন ছিল। কিন্তুক গুণিন হলেই কি সব হয়, আ? হয় কখনো? হয় না।
ঐ পর্যন্ত বলার পর আর বলতে পারেনি সে_মহিন্দর ধমকে উঠেছিল। পরে জানিয়েছিল, তুই আর হামার সঙ্গে আসিস না বাপ_তোর কথার কুনো ঠিক নাই। কুন কথাত তুই কুন কথা কহিস বুঝিস না।
হাঁ মড়ল, তুই বুঢ়া মানুষ_তুই কিছু করিবা পারিস না। ঐদিনই কে যেন বলেছিল কথাটা। কপিলদাস কথাটা নিজেকে শোনাল আরেকবার_তুই বুঢ়া মানুষ হে মড়ল, তোর কিছু করার নাই। একবার নয়, ঘুরে ঘুরে কথাটা সে বলেই চলল। আর থেকে থেকে ভারী গভীর দীর্ঘশ্বাস পড়ল কয়টা। আর ঐ দীর্ঘশ্বাস তাকে বার্ধক্যের অক্ষমতা স্মরণ করিয়ে দিতে লাগল।
বাড়ি ফিরতে ফিরতে তার দেরি হয়ে যায়। ততক্ষণে ঠাণ্ডায় পা দুখানি অসাড় হয়ে উঠেছে। উঠোনের আগুনের কাছে বসে বসে সে হাত-পা সেঁকে কিছুক্ষণ। মহিন্দর আর দীনদাসের ছেলে একসঙ্গে বসে পাথরে ঘষে ঘষে তীরের ফলায় শান দিচ্ছে দেখতে পায়। বোধহয় আগামীকালের আয়োজন। ওদিকে বিন্দা মাঝির মায়ের গলা শোনা যাচ্ছে। কাকে যেন গালাগাল করে চলেছে বুড়ি। বয়স্ক পুরুষদের কাউকে দেখছে না সে_গেল কোথায় সব? কথাটা একবার জিজ্ঞেসও করে সে। কিন্তু কেউ জবাব দেয় না। মহিন্দারের বউ বিন্নী থালায় করে ভাত দিয়ে যায়। আগুনের তাতে ততক্ষণে আরাম লাগছে কপিলদাসের।
ভাতের পাশে এক টুকরো পোড়া মাংস দেখতে পেয়ে সে খুশি হয়। নাতিদের শুধোয়, কী শিকার পেয়েছিল তারা। মহিন্দরের ছেলে শিকারের গল্পটা আরম্ভ করে বোধ হয়_কিন্তু তার গল্পের দিকে বুড়ো আর মনোযোগ দিতে পারে না। মাড়ি দিয়ে ধরে মাংস ছিঁড়তে ছিঁড়তে স্বাদ এবং গন্ধে আন্দাজ করে নেয় ডাহুকের মাংস চিবোচ্ছে সে। নাতিদের দিকে তাকিয়ে অনুমান করতে চেষ্টা করে কার কাজ এটা, শিকারে কার হাত ভালো। কিন্তু ঐ অনুমানের চেষ্টাও থাকে না একটু পর। বিন্নীকে ডেকে মহিন্দরের খোঁজ করে। কিন্তু উত্তর আসে না। রাগ হবার কথা_কিন্তু রাগে না সে। এসব তার নিত্যিকার অভ্যেসের মধ্যেই পড়ে। বরং সে খাওয়ার দিকে মনোযোগ দেয়। মাংসটা চিবুনো শেষ হলে আরেকবার থালার ভাত নাড়াচাড়া করে। খোঁজে, যদি আরেকটু মাংস পাওয়া যায়, মাংস না-পেয়ে মনটা তার খারাপ হয়ে যায়। শুধু শুধু ভাত মুঠে উঠতে চায় না।
দাদা, বড় জঙ্গলত নাকি বাঘ থাকে?
নাতির প্রশ্ন শুনে একটু সজাগ হতে হয় বুড়োকে। ঠিক মনে করতে পারে না। প্রাণনগরের জঙ্গলে কি বাঘ আছে? কিছুক্ষণ চিন্তা করে সে। তারপর মাথা নাড়ায়, নাই রে শুকদাস, ঐঠে বাঘটাগ নাই। কিন্তুক ছিল একসময়।
নাতিরা ঘন হয়ে বসে। কপিলদাস ভাত খাওয়ার কথা ভুলে যায় তখন। সে গল্প আরম্ভ করে।
গল্প মানে তো নিজের কথা। সাঁওতাল কিশোর ছেলের যে-ব্যাপার সবচাইতে আকর্ষণ, সেটাই সে ধীরস্বরে বর্ণনা করতে থাকে। তার কালো রঙের কুকুরটার কথা আসে। তার ঘরে খুঁজলে তীরের চোঙা দুটো এখনো পাওয়া যাবে_সেই চোঙার ভেতরে বাছা বাছা তীর জমানো থাকত। একবার তীর দিয়ে একটা বাঘ গেঁথে ফেলেছিল। ভাগ্যিস সে তখনো বাঘ কী জিনিস জানত না। বনবিড়াল ভেবে নিশানা করে তীর ছেড়ে দিয়েছে আর অম্নি কী ডাক! ভয় পেয়ে পড়িমরি করে কী রকম দৌড়েছিল! সেই ঘটনাটা সে বলে এবং বলবার সময় দৌড়ের বর্ণনাটাই প্রধান হয়ে উঠতে থাকে। বুড়ো মানুষের গুনগুন গুনগুন ধীরস্বরের একঘেয়েমিতে বিরক্তি লাগে বাচ্চাদের। শুকদাস অস্থির হয়ে ডাকে, দাদার বাঘটার কী হইল?
ও, হাঁ, বাঘটা। কপিলদাসকে একটু ভেবে নিতে হয়। তীর খেয়ে বিকট চিৎকার করে উঠবার পর বাঘটার যে কী হয়েছিল, কোনোভাবেই মনে পড়তে চায় না। তখন গল্পটা সে বানাতে আরম্ভ করে। তার বর্ণনায় তখন কৌতুক আসে। বাঘের ল্যাজ ধরে টানতে টানতে নিয়ে আসবার ব্যাপারটা সে রঙ চড়িয়ে বলতে চায়। কিন্তু বাঘটা টেনে নিয়ে আসবার সময় কী রকম কষ্ট হচ্ছিল, সে কথাটাই ঘুরেফিরে বলতে থাকে সে।
শীতের রাত, ততক্ষণে সবারই ঘরে গিয়ে শোবার কথা। কিন্তু কেউ শুতে যাচ্ছে না, সেটা সে লক্ষ করে। দেখে, ইতিমধ্যে মহিন্দর, দীনদাস এবং তাদের সঙ্গে সঙ্গে আরো কয়েকজন উঠোনে এসে দাঁড়িয়েছে। বোঝা যাচ্ছে, কোনো সলাপরামর্শ হচ্ছে। কিন্তু বিষয়টা যে কী, কিছুই অনুমান করা যায় না।
ও হ্যাঁ, বাঘটার যেন কী হয়েছিল? কপিলদাস কিশোর দুটির মুখের দিকে তাকিয়ে আবার ল্যাজ ধরে টানবার প্রসঙ্গে ফিরে আসে। ঐ রকম যখন টেনে আসছিল তখনো কিন্তু বাঘটা বেঁচে ছিল_হ্যাঁ। ঘা খাওয়া বাঘ কিন্তু ভয়ংকর জিনিস।
এই পর্যন্ত বলে থামতে হয়। ঘা খাওয়া বাঘের ভয়ংকরতা কিভাবে বোঝাবে, সে জন্যে তাকে ভাবতে হয়। আর ঐ সময় মহিন্দরদের কাছে একটি লোককে আসতে দেখে সে গল্পের কথা ভুলে যায়। উঠে গিয়ে দাঁড়ায় মহিন্দর আর দীনদাসের কাছে।
ম্যানেজার মহাজনের কথা হচ্ছে তখন সেখানে। ভায়া মাঝি ম্যানেজারের কাছে গিয়েছিল, কী রকম ধমক খেয়েছে, সেই কথা বর্ণনা করছে সে। বলছে ম্যানেজার মহাজন চিনিকল এলাকা থেকে লোক জোটানোর জন্যে বিন্দা মাঝিকে টাকা দিয়েছে। যাতে গোলমাল না হয়, সে জন্যে থানায় পর্যন্ত লোক চলে গিয়েছে।
তাহলে? চাপা, ক্ষুব্ধ ও আতঙ্কগ্রস্ত স্বর বার হয় সবার মুখ দিয়ে। তাহলে কী হবে এখন। দুশ্চিন্তাটা সবার মনের ওপর ভারি হয়ে ওঠে। কথা সরে না কারো মুখে।
এতগুলো লোক দাঁড়িয়ে, কিন্তু কথা বলছে না কেউ? কপিলদাস কেমন অস্থির বোধ করে। চারদিকে অন্ধকার, ঠাণ্ডা বাতাস বইছে আর মানুষ ক'জনা দাঁড়িয়ে আছে চুপচাপ। কী যে কাণ্ড ঘটে সব। কপিলদাসের খারাপ লাগতে আরম্ভ করে। সে উশখুশ করতে থাকে। শেষে একসময় বলেই ফেলে_মাহাজন বসত উঠায় দিব। চাহিলেই কি হোবে, ক্যানে হামার কমরত্ জোর নাই?
উত্তেজনায় কথাটা তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে যায়। কিন্তু ঐ পর্যন্তই, তাকে থামতে হয়। থেমে অপেক্ষা করতে হয়, কথাটার কোনো প্রতিক্রিয়া হচ্ছে কি না দেখার জন্য। ওদিকে মানুষ ক'জনা নড়ে না, চড়ে না, আন্দোলিত হয় না। মূর্তির মতোন চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। কপিলদাসের রাগ হয় তখন। বেশ গলা চড়িয়ে বলতে থাকে আবার; ক্যানে, হামার কমরত্ জোর নাই_আঁ? এ মহিন্দর, হামার কমরত্ জোর নাই? দীনদাস তুই কহ, জোর নাই হামার কমরত্?
মানুষ ক'জনা অন্য কথা ভাবছিল তখন। ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হয়ে যাওয়া কী রকম ভয়ানক ব্যাপার, সেই দুশ্চিন্তা মনের মধ্যে পাক খাচ্ছিল সবার। কী উপায়ে ম্যানেজার মহাজনকে শান্ত করবে, সেই কথা ভাবছিল তারা। আর ঠিক ঐ সময়ে কপিলদাসের ঐ রকম পাগলামির কথা শুনে কে একজন রেগে ওঠে। বলে : তুই যা তো বাবা, বুঢ়া মানুষের ইসবের ভিতর থাকবার দরকার নাই।
কপিলদাস ঠিক করতে পারে না কথাটা কে বলল। অন্ধকারে কারো মুখ দেখা যায় না। তবে কথাটা তাকে রাগিয়ে দিল। সে গাল দিয়ে উঠতে চাইল। বলল, ক্যানে, বুঢ়া হইলে কি মোর কুনো দাম নাই, আঁ? বুঢ়া হইলে কি মানুষের দাম থাকে না, কহ?
নিজের ছেলে মহিন্দরও বিরক্ত হয়_বলে, তুই এখন যা তো বাবা, বুঢ়া মানুষ, তুই ইসবের কী বুঝিস!
কপিলদাস বুড়ো এবার সত্যিই দমে যায়। নিজের জন্ম দেয়া ছেলে যদি এই রকম করে বলে তো সে কী করবে। তাকে পিছিয়ে আসতে হয়। হাঁ মড়ল, তুই তো বুঢ়া মানুষ, তুই কিছু করিবা পারিস না। কথাটা ঘুরেফিরে কেউ যেন তার কানের কাছে বারবার করে বলতে থাকে। সে কিছুই করতে পারে না, তাকিয়ে দেখা ছাড়া আর কিছুই করার নেই তার। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সে মানুষের জটলাটা দেখে। ততক্ষণে জায়গাটা বেশ একটুখানি সমাবেশ মতো হয়ে উঠেছে। দেখে, দীনদাস হাত নেড়ে নেড়ে কী বলে চলেছে। তারপর আবার মহিন্দর আরম্ভ করল। তার কথা শেষ হতে-না হতেই ওদিক থেকে আবার ভায়া মাঝি আরম্ভ করে দেয়।
ভারি ধীর নোয়ানো স্বর। শান্তভাবে পরামর্শ হচ্ছে যেন। রাগ নেই। জ্বালা নেই। কারো দু চোখ ধকধক করে জ্বলে উঠছে না, কেউ চিৎকার করে গালাগাল দিচ্ছে না। কপিলদাসের ভারি অবাক লাগে গোটা ব্যাপারটা দেখে। অবাক লাগে, কিন্তু কিছু বলে না সে। বরং নিজেকে সরিয়ে আনে। কয়েক পা পিছিয়ে আসে সে। কিন্তু ঐ কয়েক পা সরে আসতে অনেকটা সময় লেগে যায় তার। কানের কাছে তখনো সে শুনছে_তুই বুঢ়া মানুষ হে মড়ল, তোর কিছুই করার নাই। যেখান থেকে উঠে এসেছিল, সেইখানে সে ফিরে যায়। শুধুই যথাস্থানে ফিরে যাওয়া, শুধুই মেনে নেওয়া_তার কেবলই মনে হতে থাকে।
বাচ্চারা লোকসমাগম দেখেই সম্ভবত উঠে এসেছে বিছানা ছেড়ে। মেয়ে বউরা এখানে-সেখানে ইতস্তত দাঁড়িয়ে। বাচ্চারা একত্র হলে যা হয়_ততক্ষণে খুনসুটি, দাপাদাপি এবং হাসাহাসি এইসব আরম্ভ হয়ে গিয়েছে। পাথরের ওপর ঘষে ঘষে তীরে শান দেওয়া তখনো হচ্ছে। মহিন্দরের ছেলে ডাকল, দাদা, তারপর বাঘটার কী হইল?
ও, সেই গল্প। কপিলদাসের মনে পড়ে একটু আগে শিকারের গল্প বলতে বলতে সে উঠে গিয়েছিল। তখন আগুনের আল্ কিশোর মুখের ওপর চমকাচ্ছে, কে একজন কঞ্চি দিয়ে আগুনটা আরেকটুখানি উসকে দিল। আর ঐ ঘটনার কারণেই কি না কে জানে, কপিলদাস গল্পটা আবার আরম্ভ করে দিল। হ্যাঁ, বাঘটার ল্যাজ ধরে টানতে টানতে আসছিল সে। ভারী ওজন হয় বাঘের। আর বাঘটা ওদিক তখনো কিন্তু মরেনি। নাহ্, বাঘটা বোধ হয় মরেই গিয়েছিল। হঠাৎ তার মনে পড়ে।
কপিলদাস সৎ হয়ে উঠতে চায় বাচ্চাদের কাছে। গল্প বানানো বাদ দেয়। তার স্পষ্ট মনে পড়ে তখন। বাঘটার গায়ে বিকট গন্ধ ছিল, তীরটা ঠিক বুকের মাঝখানে গিয়ে গেঁথেছিল, একেবারে এদিক থেকে ওদিক বেরিয়ে গিয়েছিল। রক্ত তখনো বেরুচ্ছিল গলগল করে। আর ঐ সময়, বিকেলবেলায়, প্রাণনগরের জঙ্গলের ধারে একটা লোক ছিল না চারদিকে কোথাও। সে চিৎকার করে বাবাকে ডাকছিল, বন্ধুদের ডাকছিল। আর ঠিক তখন হঠাৎ তার পাশের ঝোপ থেকে কী একটা জানোয়ার লাফ দিয়ে বেরিয়েই বাঁয়ে ছুটতে শুরু করে দিল। ঐ জানোয়ারটা দেখেই সে_
এ পর্যন্ত বলেই সে থামে। নিজের দুর্বলতা প্রকাশ হয়ে যাবে বলে ইতস্তত করে। আহা কেমন করে বলবে যে শেয়াল দেখে সে ভয়ানক ভয় পেয়ে পালিয়েছিল।
তারপর, তারপর কী হইল? বাচ্চারা সমস্বরে জিজ্ঞেস করলে সে হঠাৎ হেসে ওঠে। হো হো করে হেসে ওঠে। বলে, কিসের বাঘ, চেৎ বাঘ? উতো গিধর কানা। শেয়াল, নেহাতই শেয়াল। বাচ্চারাও হাততালি দিয়ে হেসে ওঠে। সম্ভবত কপিলদাসের বলার ভঙ্গিতে আকর্ষণ সৃষ্টি হয়। বাচ্চারা মহা উৎসাহে কথা বলতে আরম্ভ করে, তুই বাজপাখি মারিছিস দাদা, বাজপাখি? ভালুক মারিছিস তুই, এ দাদা, হরিয়াল মারিস নাই, হরিয়াল? সম্মিলিত উপর্যুপরি প্রশ্ন হতে থাকে। আর কপিলদাসেরও যে কী হয়, সেও ভারি হালকা হয়ে ওঠে_মজার মজার কথা বেরুতে থাকে তার মুখ দিয়ে। আরে তুই কে রে_তুই না ভায়া মাঝির ব্যাটা। হাঁ, তুই হলা চিলহা, বুঝল। আর তুই? তুই হলা বাগদোর, তুই কে জানিস? তোর নাম গত্রুম। অহো তুই ঐঠে ক্যানে_তুই তো ভাল্লুক মামা।
ছোট বাচ্চারা হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে। কপিলদাস তখন নিজের আলাদা অস্তিত্ব অনুভব করতে পারে না। তীরে শান দেবার সময় কী রকম করে পাথরের ওপর ঘষতে হয়_তাই দেখায়। একজনের হাত থেকে বাঁশিটা টেনে নিয়ে ফুঁ দেয়, ফুঁ দিয়ে একটা বহু পুরনো সুর বাজায়। কী বাজাল আঁ, কী বাজাল দাদা? প্রশ্ন হলে সে ভাঙা ভাঙা গলায় গানটা গায়_
ফকির বুলে ঢুলুক বাজে
ভালুক নাচে ঝাম,
হাইয়ারে হালমাল কই গেলু রে_এ_এ।
গানটি শুনে বাচ্চারাও গাইতে শুরু করে দেয়।
বুড়োর ভীমরতি হয়েছে ভেবে মেয়েরা কেউ কেউ মনোযোগ দেয় বাচ্চাদের জটলার দিকে। বড়রা যেখানে সভা বসিয়েছিল সেখান থেকেও কে একজন চিৎকার করে গোলমাল বন্ধ করতে বলে। কিন্তু বাচ্চাদের থামাবে কে? মহিন্দরের ছেলে ধনুকের জন্যে বাঁশের ছিলা তৈরিতে ব্যস্ত ছিল। কপিলদাস তার হাত থেকে কেড়ে নিল ধনুকটা। বলল, দ্যাঁখ্, কেমন করে ছিলা পরাতে হয় ধনুকে।
বাচ্চারা তখন ঘিরে দাঁড়ায় বুড়োর চারদিকে। কপিলদাস হাঁটু ভেঙে ধনুকের এক মাথা ধরে ঝুলে পড়ে ধনুকটা নোয়ায়। তারপর বাঁ হাত ছিলার ফাঁসটা ধনুকের মাথায় ঢোকাতে চায়। কিন্তু প্রথমবারেই পারে না। ডান হাতটা তার ভীষণভাবে কাঁপতে থাকে। বাচ্চারা বুড়োর কাণ্ড দেখে সমস্বরে বলে, পারবো নাই দাদা_তুই পারবো নাই। কিন্তু পারে সে। ঐ কাঁপা কাঁপা হাতেই সে ছিলা পরিয়ে দেয় ধনুকের। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে ছিলা টেনে ধনুকের একটা টংকার তোলে। ভারি সুন্দর টানটান আওয়াজ হয় তাতে। এর পরও বুড়ো থামে না। একটা শানানো তীর নেয় হাতে এবং তীরটা ধনুকের ছিলায় বসিয়ে তাক করে। সামনের দিকে একবার, একবার ডাইনে, একবার বাঁয়ে। বুড়ো ভয় দেখিয়ে মশকরা করে যেন। বাচ্চারা তাতে হৈ হৈ করে ওঠে। আর ঐরকম হৈ চৈ শুনেই সম্ভবত কপিলদাস তীরটা দু আঙুলের ফাঁকে চেপে ছিলা ধরে টানে। টেনে ধনুকের নিশানা করে অন্ধকারের দিকে। মহিন্দরের ছেলে বলে ওঠে, দাদা তীরটা ছুটে যাবে, দাদা মোর তীরটা ছুটে যাবে। কিন্তু কপিলদাস নাতির মিনতি শুনতে পায় কি না বোঝা যায় না। সে সত্যি সত্যি তীরটা ছেড়ে দেয়। আর বাতাস-কাটা শব্দ করে তীরটা অন্ধকারের দিকে ছুটে যায়।
চারদিকে মানুষের বসত। মেয়েরা বুড়োর কাণ্ড লক্ষ করে হাঁ হাঁ করে ওঠে। সভার মানুষের মধ্য থেকেও কয়েকজন এগিয়ে আসে। কিন্তু ততক্ষণে বুড়ো কপিলদাস আর একটা তীর হাতে তুলে নিয়েছে। সবাই যখন নিষেধ করছে তখন সে দ্বিতীয় তীরটাও সামনের অন্ধকারের দিকে নিশানা করে ছুড়ে দিয়েছে। এবং ঐ কাণ্ড ঘটে যাওয়ায় ব্যাপারটা আর ছেলেমানুষি তামাশার পর্যায়ে থাকে না। দূর থেকে মহিন্দর চিৎকার করে ওঠে : বিন্নী গালাগাল করতে আরম্ভ করে। কিন্তু বুড়ো তখন হাসছে কেমন দেখো, যেন সে কিশোরকালে ফিরে গিয়েছে। জীবনে প্রথম নিশানা ভেদ করায় যে খুশি_সেই খুশি পেয়ে বসেছে তাকে। সে শান দেয়া আরো একখানা তীর হাতে তুলে নিয়েছে তখন। ওদিকে পেছন থেকে দীনদাস চিৎকার করে বলছে_ধর বুঢ়াটাকে, ধরে কাঢ়ে লে ধেনুকখানা। সেই চিৎকার বুড়োর কানে আদৌ পেঁৗছায় না। কেউ পেছনে তাকে ধরতে আসছে কি না, সেদিকে ভ্রূক্ষেপ না করে কপিলদাস বুড়ো দু'হাতে তীর-ধনুক নিয়ে সামনের অন্ধকারের দিকে চলতে থাকে। বিমূঢ় মানুষজনের চোখের সামনে দিয়েই সে অনায়াসে অন্ধকার, গাছপালা কৈশোর এবং আদিম উল্লাসের মধ্যে চলে যায়। আর সেখান থেকে সে তার তৃতীয় তীরটা সঠিক নিশানায় ছুড়বার জন্যে তৈরি হতে থাকে।
আজ ঐ শান্ত নদীর ধারে বসে থাকবার জন্যেই কিনা কে জানে। কপিলদাস ভারি আরামে রোদের দিকে পিঠ মেলে দিয়ে ঝিমোতে পারে। তার চারদিকে নানা শব্দ কিন্তু সেসব তার কানে ঢোকে কি না বোঝা মুশকিল। ধরো, কী রকম গাঁ গাঁ চিৎকার করতে করতে চিনিকলের ট্রাকগুলো ছুটছে, ফার্মের ভেতরে বিনোদ মিস্তিরি খান-দুই ট্রাক্টর ট্রায়ালের জন্য চালু করে রেখেছে_তার ধক ধক ধক ধক শব্দ একটানা সকাল দুপুর রাত ধরে ক্রমাগত হয়ে চলেছে, নদীর ওপারে আবার কোথায় এক রাখাল সারা দিন ধরে একটানা বুনো সুর বাঁশিতে বাজিয়ে যাচ্ছে_এসবই তার কানে ঢুকবার কথা। কিন্তু কপিলদাস চুপচাপ। মাথাটা ডাইনে-বাঁয়ে অল্পস্বল্প দুলছে, আর সে বসে রয়েছে তো বসেই রয়েছে।
ওদিকে ছাগল ঢুকে যদি সবজিক্ষেত তছনছ করে, কি বিন্দা মাঝির বউ সোনামুখী নগেন হোরোর বোন সিলভীর সঙ্গে ঝগড়া বাধায় কিম্বা নদীর ওপারে খোলা কান্দরে খরগোশ তাড়িয়ে নিয়ে আসে কোনো ভিন গাঁয়ের কুকুর এবং সে জন্যে যদি এপারের বাচ্চারা লে লে হৈ হৈ করেও ওঠে_কপিলদাস নড়বে না, হেলবে না, কান পাতবে না_কাউকে একটা কথা জিজ্ঞেসও করবে না।
আসলে কপিলদাস বুড়োর কাছে সবই একটার সঙ্গে আরেকটা মেলানো বলে মনে হয়, এ রকমই হয়ে আসছে দুনিয়ায়। ঝগড়া বলো, ঝাঁটি বলো, জন্ম বলো, মরণ বলো_সবই একটার সঙ্গে আরেকটা মেলানো। কত দেখল সে জীবনে। সব কিছুই শেষ পর্যন্ত একটা জায়গায় গিয়ে মিলে যায়। রাগ বলো, ক্ষোভ বলো, আবার হাসিখুশি মনের ভাব বলো, কিম্বা সামনে প্রকাণ্ড কান্দর, কি কান্দরের ওপরকার আসমান আবার তার নিচে টাঙনের স্রোত_সব কিছু, যা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে, যা শোনা যাচ্ছে_সবই একটার সঙ্গে আরেকটা শেষ পর্যন্ত মেলানো। আসলে, তার মনে হয়, সংসারের অনেক ভেতরে শান্ত ধীর এবং নিরবচ্ছিন্ন একটা স্রোত আছে। সব কিছুর ওপর দিয়ে ঐ স্রোত বয়ে যায়। সেখানে কাঁপন নেই, উত্তেজনা নেই, চিৎকার নেই। সব কিছু সেখানে ক্রমাগত একটার সঙ্গে আরেকটা মেলানো।
ঠিক এ ধরনের একটা গা-ছাড়া পরিতৃপ্ত ভাব আজকাল তাকে প্রায়ই পেয়ে বসে। আর সে জন্যেই শীতের রোদে পিঠ দিয়ে ভারি আরামে সে ঝিমোতে পারে। বয়স বেড়ে গেলে সম্ভবত মানুষের এ রকম একটা অবস্থা এসে যায়।
তবে সব সময় ঐ ভাবটা থাকে না।
মাঝে মাঝে ঐ রকম ঝিমোতে ঝিমোতে সে হঠাৎ আবার জেগেও ওঠে। তখন নগেন হোরোর বোন সিলভীর চিৎকার, মহিন্দরের ছেলের খরগোশ শিকার, কি ম্যানেজার মহাজনের দুর্ব্যবহার_এইসব ঘটনা তার চোখে পড়ে যায় এবং একটু একটু উত্তেজনাও বোধ করে। আর আশ্চর্য লাগে তার। চারদিকে এত কাণ্ড ঘটছে অথচ সে কোনো জায়গাতেই নেই_কোনো কিছুতেই সে জড়াচ্ছে না। ভাবো তো কী কাণ্ড! কপিলদাস কি এই রকম ছিল? নিজেকেই জিজ্ঞেস করে : কপিলদাস, এই রকম ছিলি তুই?
আর তখনই পুরনো ঘটনা ছবির পর ছবি সাজিয়ে নিয়ে আসে চোখের সামনে। পুশনা পরবে কী, তুমুল নাচ জুড়েছে দেখো কপিলদাস। তার গলায় বাঁধা মান্দল কী রকম শূন্যে ঘুরপাক খাচ্ছে, মেয়েদের গলায় কেমন শানানো স্বর। কপিলদাস দেখতে দেখতে নিজের যৌবনকালে চলে যায়। একের পর এক ঘটনা মনে পড়তে থাকে তার। আর ঐ রকমভাবে স্মৃতি তার সামনে পুরনো পসরা খুলে বসলে সে ভারি সুখে ঐসব পুরনো ঘটনার মধ্যে বিচরণ করে ফেরে।
একবার সেই যে কী হলো, মহাজনের ধান খামারবাড়ি থেকেই কিষানদের হাতে বিলিয়ে দিলি_মনে আছে সে কথা?
আর মানুষের পাদ্রিকে টাঙনের পানিতে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছিলি? মনে নাই?
চকিতে সে দেখতে পায় বর্ষায় ভরা টাঙনের পানিতে পাদ্রি তলিয়ে গেল। ঘোলাটে পানির মধ্যে কালো জুতোসুদ্ধ তার পা দুখানি ওপরে উৎক্ষিপ্ত হতে দেখা গেল স্পষ্ট করে। একটু পরই মানুয়েল পাদ্রি আবার ভেসে উঠেছিল। আর সে কী গাল! সাঁতরাতে সাঁতরাতে শাসাচ্ছিল : দেখিস তোর বাপকে বলব, দেখব বিচার হয় কি না।
সেই ছেলেবেলার কথা। হাপন ছিল যখন সে। তোর তীর কী রকম নিখুঁত নিশানায় গিয়ে বিঁধত, কপিলদাস, মনে নাই সে কথা?
হ্যাঁ, মনে আছে। কপিলদাস মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে নিজেকে শোনায়_সব মনে আছে।
কেন মনে থাকবে না। সান্তালের বাচ্চা না সে? দেখো তো খরগোশের পেছনে কে ছুটছে অমন? শুকদেবের ব্যাটা চতুর মাঝি, নাকি দিবোদাসের ব্যাটা কপিলদাস? আর ঐ দেখো, কপিলদাসের শিকারি কুকুর কী রকম ছুটে যাচ্ছে তীর-খাওয়া শিকারের পেছনে। কপিলদাস মনের ভেতরে স্পষ্ট দেখতে পায় তার কালো রঙের কুকুরটাকে_যেটা তার কিশোরকালের সঙ্গী ছিল সর্বক্ষণ। কুকুরটাকে শেষ পর্যন্ত বাঘে খেল।
কপিলদাসের মনে কুকুরের শোক উথলে ওঠে। টুঁটিছেঁড়া রক্তাক্ত কুকুরটাকে সে মনের ভেতরে দেখে আর কাঁদে।
একেক সময় আবার হাসেও কপিলদাস। ভারি প্রসন্ন হাসিতে চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে একেবারে। কেউ দেখে না, কিন্তু তবু বুড়ো হাসে। আহা কী দিন সেসব! সিনথিয়ার সঙ্গে দেখা হয় না, কপিলদাসের সদ্য যৌবনের রক্তে তখন ধিমি ধিমি তাত। বড় কষ্ট তখন মনের ভেতরে_কিছুই ভালো লাগে না। ঐ সময় নসীপুরের হাটে দেখা হল। কামারহাটির পেছনে, ধাঁই ধাঁই শব্দে লাল লোহার ওপরে হাতুড়ি পড়ছে আর পাশে ভাঁটের ঝাড়_সেখানে ভাঁটফুলের বুনো গন্ধ, সন্ধ্যারাতের চাঁদ পূর্ব-আকাশে। সাঁওতাল মেয়ের দুবাহু ময়াল সাপের মতো পেঁচিয়ে ধরল গলা। কালো চোখের পানিতে জোছনার আলো চিকচিক করে উঠেছিল। তবু হাসছিল সিনথিয়া। তার হাসি দেখে মন ভরে যাচ্ছিল কপিলদাসের। সেই মন-ভরানো সুখের হাসিও বুকের ভেতর থেকে একেক সময় উঠে আসে।
কপিলদাস একেক দিন আবার নিজের কাছে গল্প ফাঁদে। দূর থেকে দেখা যায় বুড়ো থেকে থেকে মাথা নাড়াচ্ছে আর ঝুঁকে ঝুঁকে দুলছে। কোন্ গল্পটা আরম্ভ করবে সে? বাহ্! গল্পের কি আর শেষ আছে_নিজেকেই শোনায় বুড়ো। ধরো, মেলার সেই ঘটনাটা_
মেলার গল্পটাই হঠাৎ মাঝখান থেকে শুরু হয়ে যায়। কেন যে বেছে বেছে মেলার গল্পটাই শুরু হয়_সে এক আশ্চর্য ব্যাপার। গল্প আরম্ভ করলেই সে মেলার ঘটনায় চলে আসে।
ছাড়, ছেড়ে দে! বাহুর ভাঁজে চেপে ধরা গলার ভেতর থেকে আওয়াজ বেরুচ্ছে। লোকটার খোঁচা খোঁচা দাড়ি, ঘামের গন্ধ এবং ঐ রকম দমবন্ধ হয়ে আসা আওয়াজ_ভারি কৌতুকের বিষয় হয়ে ওঠে। কপিলদাস ঐ অবস্থাতেই মজা পেয়ে হেসে ওঠে এবং গলা চেপে ধরা বাম বাহুর হাতের মুঠো ডান হাতে ধরে একটু জোরে চাপ দেয়। আর ঐ রকম চাপ দিতেই লোকটা আ-হ্ শব্দ করে আর্তনাদ করে ওঠে। তার দু চোখে ভয়ানক বিভ্রান্ত ঘোলাটে দৃষ্টি। ঐ আর্তনাদের সঙ্গে সঙ্গে মনে হয় লোকটার গলাটা বোধ হয় মটাৎ করে ভেঙে গেল। অত বড় শরীর, কিন্তু পা দুখানা কেমন শ্লথ হয়ে মাটি থেকে আলগা হয়ে যায়। আর তাতে উল্টো বিপদ হয়। ঐ রকম বিশাল শরীরের পুরো ভারটা এসে পড়ে নিজের ওপর। কী মুশকিল, কপিলদাস কী করবে তখন বুঝতে পারে না। লোকটার জোরে জোরে নিশ্বাস নেবার শব্দে ভারি খারাপ লাগতে আরম্ভ করে একসময়। ওদিকে একটা নাগরদোলা লোকসুদ্ধ ভয়ানক বনবন করে ঘুরছে দেখতে পায়। শুনতে পায় কলের গান বাজছে_ফান্দেহ্ পড়িয়া বগা কান্দেহ্ রে-এ-এ-এ_নিজেকে তখন অনেক দূরের মানুষ বলে মনে হয়। মনে হয় সে বোধ হয় মেলার মাঝখানে নেই। ঐ রকম অবস্থায় চারিদিকের লোকজন তাকে ছাড়িয়ে দূরে সরিয়ে নিয়ে যায়। কপিলদাস দূর থেকে পেছনে তাকালে দেখতে পায়, লোকটা মাথা নিচু করে দু হাতে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করছে।
কেন যে ঐ রকম মারামারি কাণ্ডটা ঘটেছিল, ঠিক মনে করতে পারে না। শুধু লোকটার মুখ মনের ভেতরে দেখতে পায়। লোকটার নাম কী, বাড়ি কোথায়, কোন প্রসঙ্গে ঐ রকম ঘটনা ঘটে গিয়েছিল, কিছু মনে আসে না।
কিম্বা ঐ ধানকাটার ব্যাপারটাই ধরো না কেন। আধিয়ার জোতদারের মাঝখানে পড়ে গেল সাঁওতাল বস্তিটা। গুপীনাথ হুঁ হুঁ করে না, ডাইনে-বাঁয়ে তাকায় না। ওদিকে কে একজন আগুনের কুণ্ডলীর ওপরে আরেক বোঝা নাড়া চাপিয়ে দিয়ে গেল। দাউদাউ করে জ্বলে উঠল আগুন। আর ঐ আগুনের আলোয় গুপীনাথের কপাল চকচক করতে লাগল। কিন্তু সে শাদা চুলভর্তি মাথাটা ঝুঁকিয়ে বসে আছে তো বসেই আছে।
কপিলদাসের ঘাড়ের কাছে শীতের বাতাস শিরশির করে এসে লাগছিল। আগুন দেখতে পেলে শীতের কামড়টা বোধ হয় বেশি লাগে। নইলে হঠাৎ ঐ সময়ই বা কেন কানের কাছে দিয়ে, ঘাড়ের কাছ দিয়ে, শিরশির শিরশির করে শীত তার শরীরে ঢুকে ক্রমাগত ছড়িয়ে যেতে থাকবে। কিন্তু বুড়োর কাণ্ডখানা দেখো, হুঁ হুঁ করে না। বলে দেয় না, ডাইনে যেতে হবে, না বাঁয়ে। একদিকে জোতদার মহাজন আর অন্যদিকে আধিয়ার কিষান। ওদিকে আবার কুয়াশার নিচে পাকা ধান শুয়ে আছে যুবতী মেয়ের মতো। কুন দিক যাবে মানুষ_হাঁ মড়ল, কহে দে, কুন দিক যাবে।
কিন্তু গুপীনাথ সাড়া দেয় না_যেন ঘুমিয়ে পড়েছে। নিশ্বাস নিচ্ছে কি না বোঝা দায়।
সাঁওতালদের তখন কী মুশকিল ভাবো দেখি। মহাজন বসত করবার জায়গা দেয়, আবাদের জমি দেয়, গিরস্তির কাজ দেয়_সেই মহাজনের বিপক্ষে কেমন করে যায়। মহাজন যে সব দেয়। হাঁ, সব দেয়_কিন্তুক পেটের ভাতটা কি সারা বছর দেয়, আঁ? কহ মড়ল, কহে দে, দেয় পেটের ভাতটা? এই রকমের সব বাদানুবাদ। কিন্তুক যদি ভিটেমাটি থেকে তুলে দেয় তাহলে? এই রকমের সব তর্কাতর্কি। ওদিকে গুপীনাথ কিছুই বলে না। মড়ল হলে বোধ হয় ঐ অবস্থায় কিছু বলা যায় না।
কিন্তুক তখন ভারি জাড় হে মহড়। দেহ দলদল করে কাঁপছে। দূরে দূরে যারা দাঁড়িয়ে ছিল তাদের মধ্যে থেকে কে যেন চেঁচিয়ে বলে উঠেছিল_হামরা মহাজনের সঙ্গে নাই, আধিয়ার কিষানের সঙ্গে হামরা।
কে বলেছিল কথাটা? মনে নেই এখন। সে নিজে হতে পারে, মোহন কিন্তু হতে পারে_কিম্বা চতুর মাঝিও হতে পারে। লোকটা যে কে, ঠিক মনে নেই। কিন্তু কথাটা ঠিক মনে আছে।
তারপর?
কপিলদাস আর খেই ধরতে পারে না। বিচারসভার শেষদৃশটা স্মরণে আসে না। বরং হঠাৎ ধানকাটার দৃশ্যটা মনের ভেতর দেখতে পায় সে। কপিলদাস মাঠে নেমেছে, পাশের ক্ষেতে মোহন কিস্কুর বউ টুরি_সারা কান্দরে আর একটা মানুষ দেখা যায় না। ধান গাছের নোয়ানো পাতায়, শিষের গায়ে, তখনো রাতের হিম ফোঁটায় ফোঁটায় জমে আছে। রোদের তাপ গায়ে লাগে কি লাগে না, এমনি কুয়াশা।
হঠাৎ পাশে অস্ফুট আর্তনাদ শুনে ফিরে তাকাল সে। দেখল, টুরি মাঝি হাতের কাঁচিয়া ফেলে তার বিশাল পেট দু'হাতে চেপে ধরে বসে পড়েছে। কপিলদাস চিৎকার করে লোকজন ডাকাডাকি করল। কাছাকাছি একটি মানুষ নাই হে তখন_ভালো তো, কী বিপদ! সে নিজে এগিয়ে গেলে সে কি গালাগাল টুরির। ঐ গালাগাল শুনে বোকার মতো দাঁড়িয়ে পড়তে হলো। আর ঐ রকম দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল টুরি একটু পরই উঠে দাঁড়াচ্ছে। মেয়েটা তারপর টলমল পায়ে হেঁটে হেঁটে একটা ঝোপের আড়ালে চলে গেল।
পুরুষ মানুষ আসলে নিষ্কর্মা। কপিলদাস মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে নিজেকেই শুধোয়, বল নিষ্কর্মা নয়? জন্মের সময়টাতে তার কিছু নেই। সে শুধু বেকুবের মতো তাকিয়ে থাকতে পারে।
ঐ দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই সে টুরির কাতরানি শুনেছিল। মেয়ে মানুষের ঐ চাপা অথচ মর্মভেদী আর্তনাদের সঙ্গে বোধ হয় আর কিছুর তুলনা হয় না। ওহ্ সে কী কষ্টকর ঐ রকম আর্তনাদ শোনা। তার একটু পরই সদ্যোজাত বাচ্চার কান্না শুনতে পেয়ে তার সমস্ত শরীরে ঝাঁকুনি দিয়ে খুশি জেগে উঠেছিল। ছুটে গিয়েছিল তখন ঝোপটার দিকে। হ্যাঁ, ঝোপটাকে সে মনের ভেতরে স্পষ্ট দেখতে পায়। বাঁশঝাড় ছিল, একটা নাটার গাছ ছিল। আবার কয়েকটা আঁশশ্যাওড়ার গাছও দেখা যাচ্ছিল। সেখানে আবার একটা সাপের খোলসও ছিল। আঁশশ্যাওড়ার ডাল থেকে নাটাগাছের কাঁটাভর্তি ডাল পর্যন্ত লম্বা করে টানানো। সেই খোলসটার ওপর আবার রোদ এসে পড়েছিল তখন। আর ঐসব দেখতে দেখতে, হ্যাঁ ভারি মনোযোগের সঙ্গে দেখতে দেখতে, মাথা উঁচু করে সে তাকিয়েছিল।
ভারি আশ্চর্য সেই দৃশ্য। সদ্যোজাত শিশুর নাড়ি দাঁত দিয়ে কাটছে মা। বাচ্চাটা থেকে থেকেই চিৎকার করে উঠছিল। সদ্যোজাত বাচ্চার কান্না কিন্তু অদ্ভুত। অদ্ভুত নয়? কেমন আঁ আঁ করে শরীরের সমস্ত নিশ্বাস বার করে দেয় গলা দিয়ে, তারপর নিশ্বাস নিয়ে হিক্কা তোলার মতো দেহ কাঁপিয়ে দমকে দমকে কাঁদতে থাকে। ঐ রকম কান্না শুনেও মা কিন্তু কিছু বলছিল না। কে জানে ঐ রকম সময়ে মায়েরা বাচ্চার কান্না শুনতে পায় কি পায় না। হ্যাঁ, মা কিছুই বলছিল না। কোনো সোহাগের কথা মায়ের মুখে ফুটছিল না। তাই দেখে সে মনে মনে কিছুটা উত্তেজনা বোধ করছিল। কিন্তু তখন মা ভয়ানক ব্যস্ত না? তার তখন বাচ্চার কান্না শোনার মতো সময় কোথায়? বলো, অতদিকে তখন নজর দিতে পারে?
হ্যাঁ, দেখছিল সে, মায়ের নিজের শরীর একদিকে, আরেক দিকে সন্তান। নিজের ঊর্ধ্বাঙ্গের কাপড় সন্তানের গায়ে জড়িয়ে দিচ্ছিল তখন। আহা, হাত দুখানি কী শান্ত, কী কোমল_কবজির ভাঁজটুকু কিম্বা আঙুলের নড়াচড়াটুকু টাঙনের মোলায়েম ঢেউয়ের মতো মনে হচ্ছিল। নিজের অনাবৃত বক্ষদেশ নিয়ে তার কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। কপিলদাস এখনো স্পষ্ট দেখতে পায়, দুধে স্ফীত সাঁওতাল মায়ের বুক কি রকম নিঃসঙ্কোচ হতে পারে। বোঁটা দুটি, বোঁটা দুটির চারপাশে কালো ঘেরটুকু পর্যন্ত ভারি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। শুধু মায়ের বক্ষদেশ নয়_নিম্নাঙ্গের কাপড়ও কি রকম রক্তাপ্লুত, তাও সে দেখতে পাচ্ছিল। কালো শরীরে সাদা কাপড় এবং সাদা কাপড়ের ওপর আবার ঐ রকম ডগডগে লাল রক্ত_সেও সবুজ ঘাসের মাঝখানে। সকালবেলার রোদে গোটা দৃশ্য ভয়ানক জ্বলজ্বল করছিল তার চোখের সামনে। তারপর যখন সে বাচ্চাটাকে কোলে তুলে নিল_আহা_সে যে কি রকম একটা ভাব, সে বলে বোঝাতে পারবে না। বাতাসে পাকা ধানের গন্ধ, তার নিচে ভেজা মাটির গন্ধ এবং তারো নিচ থেকে যেন নবজাত শিশুর গন্ধ উঠে আসছিল। আর ওই সময় তার দু'হাতের মধ্যে ধরা ঐ রকম রক্তাক্ত কোমল একটি লাল ফুল।
বাচ্চাটা লাল মুখ মেলে চিৎকার করে উঠছিল। তার মাড়ি, জিভ, কুঁচকানো নাক, পিটপিটে চোখ দুটি এখনো সে মনের ভেতরে স্পষ্ট দেখতে পায়। আর হ্যাঁ, হাঁটতে হাঁটতে ঐ সময় সে দুহাতে বাচ্চাটাকে দোলাচ্ছিল।
কপিলদাস বুড়ো বসে বসেই হাত দুখানা তুলে শূন্যে দোলাতে আরম্ভ করে।
ঐ রকম গল্প বলতে বলতে বেলা ফুরিয়ে যায় একসময়। রোদের তাপ কমে আসে। ঝাপসা চোখ দুটি মেলে সে তখন আসমানের ধূসর রঙ দেখে। এবার নদীর ভাটি থেকে উঠে আসা শঙ্খচিলের ডাকটাও শুনতে পায়। বাতাসে তখন শীতের কামড়। তার দু'হাতের আঙুল ছেঁড়া কোটের বোতাম দুটি খুঁজতে থাকে।
আর ঐ সময়ই তার চোখে পড়ে যায়। দেখে কজন লোক টাঙনের উঁচু পাড়ে দাঁড়িয়ে বস্তির দিকে হাত তুলে কী যেন দেখাচ্ছে। লোকগুলোকে সে চিনতে চেষ্টা করে। ওখানে এই সময়ে কারা? অমন পরিষ্কার জামা-কাপড় পরা_কে লোকটা? অনেক ক্ষণ ধরে লোকটার নড়াচড়ার ভঙ্গি লক্ষ করে। লক্ষ করতে করতেই মনে পড়ে_কদিন আগেও বোধ হয় ওদের এইভাবেই দেখেছে সে। ঠিক এইভাবেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বস্তির দিকে হাত তুলে কী যেন বলাবলি করছিল। সে একসময় চিনতে পারে। পরিষ্কার জামা-কাপড় পরা লোকটা ম্যানেজার মহাজন ছাড়া আর অন্য কেউ হতে পারে না। কিন্তু এমন সময় ওখানে দাঁড়িয়ে ওদের কী কাজ? একবার মনে হয়, জরিপ হচ্ছে বোধ হয়। একেক সময় ঐ রকম জমিজমার মাপামাপি চলে। ওরা কি জমিজমা মাপতে এসেছে? কই এ রকম কোনো খবর তো তার কানে আসেনি।
একটু পর আর দেখা যায় না কাউকে। দেখতে না পাওয়ায় কৌতূহলটা আর থাকে না। কপিলদাস তখন গরুর পালের ঘরে ফেরা ঘুণ্টির আওয়াজ কান পেতে শোনে। ফার্মের গরুগুলোর গলায় নতুন ঘুণ্টি বাঁধা হয়েছে নিশ্চয়ই। আজকাল বোধ হয় জয়হরির ছোট ছেলেটা ফার্মের গরু চরায়। জয়হরির কী যেন হয়েছিল? জয়হরির কথা স্মরণ করতে চেষ্টা করে সে। আর ঠিক ঐ সময়ে কাছে এসে দাঁড়ায় সলিমউদ্দিন। এসেই ডাকে : বুঢ়া দাদা, বাড়িত যাবো নাই?
হ্যাঁ যামু, সে জয়হরির কথা স্মরণ করতে না পেরে সলিমউদ্দিনের দিকে মনোযোগ দেয়। ছোঁড়া কোত্থেকে আসছে, সেই কথা জিজ্ঞেস করতে করতে উঠে দাঁড়ায়।
সলিমউদ্দিন তখন কুশিয়ার ক্ষেতে আজ কী কাণ্ডটা ঘটেছে, সেই ঘটনার বর্ণনা আরম্ভ করে। এবং ঐ আরম্ভের মুখেই সে জানিয়ে দেয়_বুঢ়া দাদা, তুমার বস্তিটা আর এইঠে থাকবে নাই, ইবছর এইঠে ধানের আবাদ হবে। কথাটা কেন যে বলে ছোঁড়া, বুড়ো ঠিক ধরতে পারে না। কিম্বা এমনও হতে পারে যে তার বর্ণনাতেই বোধ হয় প্রসঙ্গটা থাকে না। সিলভী আজ বিন্দা মাঝির বউয়ের সঙ্গে ঝগড়া বাধিয়েছে। কিভাবে, সেই ব্যাপারটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সে বর্ণনা করে। তারপর হঠাৎ বিন্দা মাঝি এসে গেলে কী হলো সেই পরিস্থিতিটাও সে ব্যাখ্যা করতে উৎসাহী হয়ে ওঠে। কপিলদাস হাঁটতে হাঁটতে দাঁড়ায় আরেকবার। সিলভীর বাপের কথা স্মরণ করে ফিরেও এসেছিল, শেষে কী যে হয়ে গেল লোকটার? কবিরাজের হাট থেকে ফিরছিল সেবার_হ্যাঁ, এই রকম জায়গাতেই বোধ হয় ঘটেছিল ব্যাপারটা। সে মাটির দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে খোঁজে। বর্ষাকালের ব্যাপার, মাটিতে ফাটল ধরেছিল_ওদিকে টাঙন তখন পাগল। মাটি ধসে পড়েছিল হঠাৎ। তখন সন্ধ্যা, শিবনাথ বোষ্টম পুলের ওপর দাঁড়িয়ে গান গাইছিল। ঠিক ঐ সময়ে ঘটনাটা ঘটে। কপিলদাস পুরনো কালের এইসব খুঁটিনাটি ঘটনার কথা ভাবতে শুরু করে দেয়।
ওদিকে কিন্তু কানের কাছে গুনগুন করে সলিমউদ্দিন বলেই চলেছে_সিলভী তারপর কী কহিল জানিস বুঢ়া দাদা? বিন্দা মাঝিক কহিল, তুই ম্যানেজার মাহাজনের কুকুর। কুকুর কহা কি ঠিক_তুই কহ বুঢ়া দাদা?
কুকুর বলেছে? কলিদাস আবার দাঁড়িয়ে যায়। হরগোবিনের মেয়ে, নগেন হোরোর বোন, সিলভী, কুকুর বলেছে। অ, সলিমউদ্দিনের দিকে তার চিন্তা ফিরে আসে, কুকুর কহে দিলে, ক্যানে?
আহ্ হা। সলিমউদ্দিনকে আবার পুরনো কথার খেই ধরতে হয়। বলে, আরে ঐ যে কহিনু বিন্দা মাঝি ম্যানেজার মাহাজনের ঘরের ভিতর থে বাহার হয়ে আসিল আর আসে ধমকালে, মারিবা চাহিল।
ম্যানেজার মহাজনের সঙ্গে কি তখন বিন্দা ছিল? একটু আগে অস্পষ্ট দেখা লোকজনের মধ্যে বিন্দা মাঝি ছিল কি না, সেই কথাটা স্মরণ করতে চাইল বুড়ো।
সলিমউদ্দিনের বর্ণনা তখনো ফুরোয়নি। বলল, সিলভীর কী তেজ, বাপ, মায়ামানুষ না ডাইন_এক্কেবারে দাও উঠালে মারবার তানে!
কপিলদাসকে এবার মনোযোগী হতে হয়_কী কহিল? দাও উঠালে মারবার তানে_কা'ক মারবার তানে?
বিন্দা মাঝিক বাহে, বিন্দা মাঝিক।
অ, কপিলদাস মাথা নাড়িয়ে নাড়িয়ে আবার হাঁটতে শুরু করে। হরগোবিনের মেয়ে সিলভীকে মনের ভেতরে স্পষ্ট দেখতে পায়। খুঁটি উপড়ে গিয়ে ও মেয়ে ছাগলের পালটাকে যখন আলোর উপর দিয়ে হৈ হৈ হুস হুস করে তাড়াতে থাকে আর ছুটতে থাকে তখন তার শরীরের দিকে তাকিয়ে দেখো। যদি পুরুষমানুষ হও তো নজর ফেরাতে পারবে না। সিনথিয়া ছিল ঐ রকম। কপিলদাস মুর্মু নজর ফেরাতে পারত না। দেখো, ঐ রকম মেয়ে সিলভী, সে-ই কিনা দা তুলে তেড়ে গিয়েছে বিন্দা মাঝির দিকে। কী হইল, তারপর কী হইল?
প্রশ্নটা মুখ দিয়ে উচ্চারিত হলো, কিন্তু কৌতূহলটা আর থাকে না। দূরে দেখতে পায় ম্যানেজার মহাজন সম্ভবত আবার এসে দাঁড়িয়েছে উঁচু পাড়ের ওপর। বস্তির দিকে হাত তুলে তুলে কী যেন দেখাচ্ছে। আর ঠিক ঐ সময় দেখো বাচ্চারা আবার শিকার করে ফিরছে_ঐ সামনেরটি বোধ হয় তার নাতি। তার কুকুরটাকে স্পষ্ট চেনা যায়।
সলিমউদ্দিন তখনো সিলভীর প্রসঙ্গ পাল্টায় না। কী কী সব বলতেই থাকে। সিলভীর ভাই নগেন হোরোর নাম করে। কেন যে_খেই ধরা মুশকিল। নাকি সলিমউদ্দিন সিলভীর সঙ্গে ইদিক-সেদিক কিছু একটা করছে? কপিলদাসের হঠাৎ সন্দেহ হয়। তবে সলিমউদ্দিনের খিটখিটে হাড়সর্বস্ব শুকনো চেহারাটা দেখে আবার মায়াও হয়। কিন্তু সান্তাল মেয়ের তো শুধু পুরুষমানুষ হলে চলে না। তার মরদ পুরুষ দরকার। সে ফস করে জিজ্ঞেস করে, হাঁ বাহে, পচই খাইছি কুনোদিন?
সলিমউদ্দিন বুড়োর কথায় হকচকিয়ে যায়। ঐ কী রকম বিদঘুটে প্রশ্ন। জবাব দেয়, না বুঢ়া দাদা, নিশা মোর সহ্য হয় না।
কপিলদাসের হঠাৎ খেয়াল হলো লোকগুলোকে আর দেখা যাচ্ছে না। এখুনি না দেখল! মুহূর্তের মধ্যে কোথায় উবে গেল অতগুলো মানুষ।
নাকি সে দেখেনি! তার কেবলি মতিভ্রম হতে থাকে। এদিকে সলিমউদ্দিনের সেই খামারবাড়ির ঘটনাটার বর্ণনা তখনো ফুরোয়নি। এখন অবশ্যি সিলভীর কথা বলছে না। কিন্তু ম্যানেজার মহাজনের কথাটা বলেই চলেছে। ম্যানেজার মহাজন, বিন্দা মাঝি, বিন্দা মাঝির বউও আবার ইতিমধ্যে ঢুকে পড়েছে তার বর্ণনায়।
বিন্দা মাঝির মাউগটা বুঢ়া দাদা_হাঁ, বুঝল নি, এক্কেবারে বেহায়া বাহে। হাসে কেমন, দেখলে তোর শরীল জ্বলে যাবে।
নাও বোঝো! এবার কপিলদাসের হাসি পায়। কোন্ কথা থেকে কোন্ কথায় এসে পড়ল। এরও তাহলে মাথায় দোষ আছে।
কিন্তু ম্যানেজার মাহাজন কী কহিল্ শুনবো? কহিল্, আর নহে, তুমার বস্তিটা ইবার উঠায় দিবে, দু-চার দিনের ভিতর এইঠে টাকটর চলিবে।
কপিলদাস দাঁড়িয়ে পড়ে কথাটা কানে ঢুকতেই। দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করে, আ, কী কহিল?
সলিমউদ্দিন কথাটা আবার বলে। বিন্দা মাঝির বউ সোনামুখী ম্যানেজার মহাজনের ঘর থেকে বেরিয়ে আসার পর ঝগড়া হলো আর তার পরই ম্যানেজার মহাজন কথাটা জানিয়ে দিয়েছে। কথাটা কিভাবে বলেছিল সেইটাই সে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বর্ণনা করতে চেষ্টা করে।
সলিমউদ্দিনের কথা শুনতে শুনতে সে চারদিকের অন্ধকারের দিকে নজর ফেরায়। শীতকালের অন্ধকার ভারি দ্রুত নামছে। নদীর ওপারে কান্দরের দিকে রাখালের ডাকাডাকি শব্দ মিইয়ে এসেছে অনেক ক্ষণ। ধোঁয়া ধোঁয়া মলিন কুয়াশা কালো হয়ে ক্রমে ক্রমে নিচের দিকে নেমে এসে একেবারে ঢেকে দিয়েছে ক্ষেত, গোহাল, মানুষ এবং বস্তিতে। চারদিকের ছড়ানো মানুষ এখন কাছাকাছি হচ্ছে, ঘরে ফিরছে সবাই। মানুষের যত কথা সব এখন একে একে উঠোনে উঠোনে গিয়ে জড়ো হচ্ছে! এখন কিছুক্ষণ আগুনের কুণ্ডলীর চারপাশে কথাগুলো বিনবিন স্বরে ঘোরাঘুরি করবে। তারপর সেটাও যাবে চুপ হয়ে। মানুষজন তখন যার যার ঘরে গিয়ে ঢুকবে। অন্ধকার আর শীত কী রকম অদ্ভুত জিনিস দেখো, মানুষকে তাড়িয়ে ঘরের ভেতরে নিয়ে যায়। অন্ধকার দেখে মন ভয় পায় আর শীত দেখে শরীর! কাণ্ডটা দেখো!
অন্ধকারের দৃশ্য দেখতে দেখতে একটুখানি দার্শনিক ভাবনা এসে যায় বুড়োর মনে। সলিমউদ্দিনের কথা প্রায় ভুলে যায় ঐ সময়। অত যে খুঁটিনাটি বর্ণনা তার কিছুই কানে ঢোকে না। বিন্দা মাঝির বউ ম্যানেজারের ঘরে ঢুকেছিল সেই দুপুরবেলা, সবাই যখন কুশিয়ার ক্ষেতে। তারপর কুশিয়ার ওজনের সময় বিকেলবেলা সবাই যখন খামারবাড়ি এলো, তখন দুজনকে একসঙ্গে ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়াতে দেখা গেল। ঐ সময় হেসে হেসে মশকরা করে কী যেন বলছিল বিন্দা মাঝির বউ, ম্যানেজারও তখন খুশি ছিল, সিলভীর দিকে তাকিয়ে সেও সম্ভবত কিছু বলছিল। ওদের ঐ রকম কাণ্ড দেখেই কিনা কে জানে, তীব্র চিৎকার করে গালাগাল দিয়ে উঠেছিল সিলভী। ম্যানেজার মহাজন ঐ গালাগাল শুনে বারান্দা থেকে উঠোনে নেমে এসেছিল। উঠোনের মাঝখানে ওজনের কাঁটা পোঁতা ছিল। নবীন বর্মণ আর আকালু পরামাণিক কুশিয়ার মাপতে শুরু করে দিয়েছে তখন। বিন্দা মাঝিও কেন যে কথাটা বলতে গেল ঐ সময়। তার নেশা ছিল তখনো। সে সিলভীকে ছিনাল বলে গাল দিয়ে উঠল। আর ঐতে বিপদ হয়ে গেল। সিলভী কুশিয়ার কাটা দা নিয়ে সাঁ করে ছুটে গেল বিন্দা মাঝির দিকে। সিলভী অবশ্যি কিছু করতে পারেনি। তাই নাকি পারে। অত লোকজন চারদিকে। ঐ কাণ্ডটা ঘটে যাবার পরে ম্যানেজার মহাজনের কী রাগ_এই মারে তো এই মারে! শেষে, মানে রাগটাগ যা দেখাবার দেখানো হয়ে গেলে, তার আসল কথাটা জানিয়ে দিল সবাইকে।
সলিমউদ্দিন সম্ভবত যথেষ্ট আকর্ষণ সৃষ্টি করতে পারে না। কপিলদাস কিছুক্ষণ শুনেও ঠিক ধরতে পারে না কথাটা। তার কেবলি তখন মনে হচ্ছে ম্যানেজার মহাজন এই সন্ধেবেলা নদীর পাড়ে এসে দাঁড়ালেই বা কেন, আর কেনই বা ঐভাবে হঠাৎ অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেল। বিন্দা মাঝির বউ ম্যানেজারের সঙ্গে মশকরা করে কথা বলছিল_এইটুকু শুধু তার মনের মধ্যে ধরা পড়ছিল। দৃশ্যটা সে মনের মধ্যে দেখতেও পাচ্ছিল। ঐ সঙ্গে থেকে থেকে আবার সিলভিয়ার সঙ্গে সলিমউদ্দিনের ফষ্টিনষ্টির কথা, অন্ধকারের কথা, ঠাণ্ডার কথা সব একসঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছিল। এমনকি টুরির সদ্যোজাত বাচ্চাটাকে দু'হাতে দোলাচ্ছিল পর্যন্ত সে মনে মনে। হ্যাঁ, তারপর কী যেন? সে হঠাৎ শুধোল : হাঁ, কী কহছিল ম্যানেজার মাহাজনের কথা, টাকটর কুনঠে চলিবে?
এত কথার পর এই প্রশ্ন। সলিমউদ্দিন রীতিমতো ক্ষুব্ধ হয়। বলে, না বুঢ়া দাদা, তোরঠে কুনো কথা কহা যায় না, কুনো কথা তোর ফম থাকে না।
সলিমউদ্দিনকে ক্ষুব্ধ হতে দেখে কপিলদাস বুড়ো ছোঁড়ার ঘাড়ে হাত রাখে। কী কপাল ছেলেটার দেখো, এই বয়সে মা-বাপ-ভাই-বোন চৌদ্দগুষ্টি খেয়ে বসে আছে। একটা চাকরি ছিল ফার্মে, ম্যানেজারের বউয়ের হুকুমে সেটিও গেছে। ছেলেটার রোগা দুর্বল শরীরে হাত রাখলে তার একেক সময় মায়া হয়। এখনো তাই হলো, বেচারা! সেই কখন থেকে ঘটনাটা বলে যাচ্ছে। কপিলদাস এবারে আন্তরিক আর মনোযোগী হয়। প্রায় মিনতি করে বলে, হাঁ বাপু, তারপর কী হইল কহ তো? ম্যানেজার শালা কী কহিল?
আবার কথাটা নতুন করে বলতে হলো সলিমউদ্দিনকে। বলল, তুমার বসতটা ইবার উঠায় দিবে, এইঠে ইবছর টাকটর চলিবে।
কপিলদাস এবারও বুঝতে পারে না। তার নিজের হিসাব মেলে না। ট্রাকটর জমিতে চলবে, তাই চলে এসেছে এতকাল। মানুষের বসতের উপর দিয়ে ট্রাকটর চলতে যাবে কেন? ই কেমন কথা? সে অন্ধকারেই ডাইনে-বাঁয়ে তাকায়। বলে, ঠিক শুনিছিস তুই, কহ ঠিক শুনিছিস?
সলিমউদ্দিন এবার সত্যিই বিরক্ত হয়। বলে, মোর কথা বিশ্বাস না হয় আর কাহাকো পুছে দেখ। মুই ইবার যাঁউ, তুই বুঢ়া মানুষ, তোর কিছু ফম থাকে না।
কথাটা বলেই হঠাৎ ছোঁড়া চলে গেল।
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কপিলদাস বুড়োর ঠাণ্ডা লাগছিল। কিন্তু সচল হবার কথা তার মনে আসছিল না। কথাটা কি ঠিক? কী কাণ্ড বলো দেখি, কথা নেই বার্তা নেই, বসতের ওপর দিয়ে ট্রাকটর চলবে। কপিলদাস চিৎকার করে ডাকে তখন; সলিমউদ্দিন, এ সলিমউদ্দিন।
তার ডাক সলিমউদ্দিনের কানে পেঁৗছোয় কি না, বোঝা যায় না। অন্ধকারের ভেতর থেকে কোনো সাড়া আসে না। চারদিকে তার মেলানো সংসার। টাঙনের স্রোত, দক্ষিণের কান্দর, মানুষজন, আসমান, ধানক্ষেত, এমনকি নিজের সুখ-দুঃখ কি সাফল্য-ব্যর্থতা পর্যন্ত সে আজকাল একটার সঙ্গে আরেকটাকে মেলানো দেখতে পায়। আর সে জন্য নিজের ছোট্ট দুনিয়ায় সে ভারি নিশ্চিন্ত ছিল। কেমন ধারণা হয়েছিল, জীবন এ রকমই বয়ে যায়। একটুখানি ঝগড়া বিবাদ, হৈচৈ, কিছু দুঃখ, খানিক সুখ, জনম-মরণ সব মিলিয়েই জীবন। সে ভেবে নিয়েছিল এইভাবেই দুনিয়া তার নিয়ম পালন করে। কিন্তু সলিমউদ্দিন এ কোন কথা বলল? কথাটা তার মনের মধ্যে খচখচ করতে লাগল।
তবে হলে কী হবে, আসলেই সে বুড়ো মানুষ তো। মন একদিক থেকে আরেকদিকে চলে যায়। কয়েক পা এগোতে না এগোতে ওপরের দিকে নজর তুললে আসমানের তারা দেখতে পায় সে, আর তাই দেখতে পেয়ে সে আসমানের শোভা দেখে কিছুক্ষণ। চোখ ঝাপসা, কিন্তু দেখতে পায় ঠিকই_শীতের আসমানে ঝকঝক করছে নীল নীল তারা। তারা কি আসলেই নীল? নাকি তার অমনি হঠাৎ মনে হলো। সে ঠিক ধরতে পারে না। একটা তারা তার খুব চেনা মনে হলো। ঐ তারাটাই না?
ঐ রকম দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই সে পুরনো কথার মধ্যে চলে যায়। নরম কোলের ওপর ছিল কথাটা। মুখের ওপর সিনথিয়ার স্তনভার। সিনথিয়া সোজা হয়ে বসায় বুকের আড়াল সরে যায় আর তখন তারাটা চোখে পড়েছিল। একটা ঘোরের মধ্যে থেকে জেগে উঠেছিল সে। সিনথিয়া কানের কাছে ফিসফিস করছিল, চলো পালাই।
পালাব, সিনথিয়া মুখের দিকে তাকিয়ে দেখেছিল কিছুক্ষণ। তারপর বলেছিল, না। পষ্ট করে জোরের সঙ্গে বলেছিল, না।
রাস্তায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কপিলদাস মাথা নাড়ায়। আর নিজেকে শোনায়_না, ক্যানে পালাব। তার পা আপনা থেকে বাড়ির পথ ধরে। কোথায় পালাবে সে। একসময় আবার হাসি পায় বুড়োর, পালাবার কথাটা এলো কোত্থেকে? তুই বুঢ়া মানুষ হে মড়ল_নিজেকে শুনিয়ে শুনিয়ে তখন সে বলে, তোর কিছু ফম থাকে না। আর ঐ সময় ট্রাকটরের আওয়াজটা তার কানে এসে ধাক্কা মারে। কী কারণে যে হঠাৎ ধকধক শব্দ করে জেগে উঠল ঘুমন্ত ট্রাকটরটা, আন্দাজ করা মুশকিল। বিনোদ মিস্ত্রি একেক দিন এই রকম হঠাৎ ট্রাকটরের এঞ্জিন চালিয়ে দেয়। ট্রাকটরটা সে চোখের সামনে দেখতে পায় যেন। বিশাল বিশাল দুই চাকা ঘুরতে ঘুরতে মাঠের বুকের ওপর দিয়ে চলেছে। পেছনের ধারালো চাকতিগুলো মাটি ফালা ফালা করে দিচ্ছে, গন্ধ বেরুচ্ছে কাটা মাটির ভেতর থেকে। ঐভাবে ট্রাকটরটা চলে আসে একেবারে দীনেশ কিস্কুর বাড়ির সীমানা পর্যন্ত। তার পরই বেশ দিব্যি ঘুরে যায়। বসতই হলো ট্রাকটর চলাফেরা করার শেষ সীমানা। হ্যাঁ, কলের জিনিস ঐ পর্যন্ত আসে। সংসারের সীমানা পর্যন্তই তার আসবার ক্ষমতা, তারপর আর পারে না, এতকাল অন্তত পারেনি। আর এখন সেই কলের জিনিস হুড়মুড় করে ঢুকে পড়বে দীনেশ কিস্কুর উঠোনে। ঘরের দেয়ালে ভোঁতা নাক ঢুকিয়ে উল্টোদিকের দেয়াল ফুঁড়ে বেরুবে। দৃশ্যটাকে সে মনের ভেতর দেখতে পায়। আর তাই দেখে সে ভয়ানক অস্থিরতা বোধ করে। ই কী কথা আঁ? ট্রাকটর চলে আসবে সংসারের বুকের ওপর? সংসারে কাচ্চাবাচ্চা, গাইগরু, সবজিক্ষেত, সুখ আহ্লাদ_সব কিছুর ওপর দিয়ে গড়গড় করে চলে বেড়াবে_ই কেমন কথা, ম্যানেজার মহাজন ও রকম হুকুম কেমন করে দেয়?
সলিমউদ্দিনের কথাগুলো এবার একের পর এক মনের ভেতর স্পষ্ট হতে থাকে। সিলভীর দা নিয়ে বিন্দা মাঝির দিকে তেড়ে যাবার ঘটনা, সোনামুখী আর মহাজনের ঢলাঢলি_ওদিকে নগেন দাস কী একটা চিঠি লিখেছিল না কোথায়? ব্যাপারটা নিয়ে না কিছুদিন ধরেই টানাহেঁচড়া চলে আসছে?
কপিলদাস বুড়োর এখন মনে পড়তে থাকে। এই বস্তি উঠে যাবার ব্যাপারটা আকস্মিক নয় একেবারে_তাহলেও, এই কি শেষ পর্যন্ত পরিণতি? বস্তিটস্তি উঠে যাবে আর ট্রাকটর চলতে থাকবে ঘরবাড়ি-ভিটেমাটির ওপর দিয়ে। কোথায় একটা মেয়েমানুষের মাথা গরম করে মাতালের দিকে দা উঁচিয়ে তেড়ে যাবার ঘটনা আর কোথায় বাড়িঘর সংসারসুদ্ধ লোপাট করে দেওয়া! কিসের সঙ্গে কিসের জড়ানো। কিন্তু ভাবো তো, বসতটা কত পুরনো? মনে আছে তোর? হাঁ বাহে, মড়লের ব্যাটা, তোর কি ফম আছে?
হাঁ হাঁ, ফম আছে। বিচার বসেছিল ফার্মের অফিসঘরে। কে একজন সাহেব মানুষ শুধোচ্ছিল। আর সে উত্তর দিচ্ছিল। কবে কোন প্রাচীনকালে এসেছিল একদল মানুষ। সেই দলের মড়ল ছিল শিবোনাথ। শিবোনাথ আবার গুণিন ছিল। কিন্তুক গুণিন হলেই কি সব হয়, আ? হয় কখনো? হয় না।
ঐ পর্যন্ত বলার পর আর বলতে পারেনি সে_মহিন্দর ধমকে উঠেছিল। পরে জানিয়েছিল, তুই আর হামার সঙ্গে আসিস না বাপ_তোর কথার কুনো ঠিক নাই। কুন কথাত তুই কুন কথা কহিস বুঝিস না।
হাঁ মড়ল, তুই বুঢ়া মানুষ_তুই কিছু করিবা পারিস না। ঐদিনই কে যেন বলেছিল কথাটা। কপিলদাস কথাটা নিজেকে শোনাল আরেকবার_তুই বুঢ়া মানুষ হে মড়ল, তোর কিছু করার নাই। একবার নয়, ঘুরে ঘুরে কথাটা সে বলেই চলল। আর থেকে থেকে ভারী গভীর দীর্ঘশ্বাস পড়ল কয়টা। আর ঐ দীর্ঘশ্বাস তাকে বার্ধক্যের অক্ষমতা স্মরণ করিয়ে দিতে লাগল।
বাড়ি ফিরতে ফিরতে তার দেরি হয়ে যায়। ততক্ষণে ঠাণ্ডায় পা দুখানি অসাড় হয়ে উঠেছে। উঠোনের আগুনের কাছে বসে বসে সে হাত-পা সেঁকে কিছুক্ষণ। মহিন্দর আর দীনদাসের ছেলে একসঙ্গে বসে পাথরে ঘষে ঘষে তীরের ফলায় শান দিচ্ছে দেখতে পায়। বোধহয় আগামীকালের আয়োজন। ওদিকে বিন্দা মাঝির মায়ের গলা শোনা যাচ্ছে। কাকে যেন গালাগাল করে চলেছে বুড়ি। বয়স্ক পুরুষদের কাউকে দেখছে না সে_গেল কোথায় সব? কথাটা একবার জিজ্ঞেসও করে সে। কিন্তু কেউ জবাব দেয় না। মহিন্দারের বউ বিন্নী থালায় করে ভাত দিয়ে যায়। আগুনের তাতে ততক্ষণে আরাম লাগছে কপিলদাসের।
ভাতের পাশে এক টুকরো পোড়া মাংস দেখতে পেয়ে সে খুশি হয়। নাতিদের শুধোয়, কী শিকার পেয়েছিল তারা। মহিন্দরের ছেলে শিকারের গল্পটা আরম্ভ করে বোধ হয়_কিন্তু তার গল্পের দিকে বুড়ো আর মনোযোগ দিতে পারে না। মাড়ি দিয়ে ধরে মাংস ছিঁড়তে ছিঁড়তে স্বাদ এবং গন্ধে আন্দাজ করে নেয় ডাহুকের মাংস চিবোচ্ছে সে। নাতিদের দিকে তাকিয়ে অনুমান করতে চেষ্টা করে কার কাজ এটা, শিকারে কার হাত ভালো। কিন্তু ঐ অনুমানের চেষ্টাও থাকে না একটু পর। বিন্নীকে ডেকে মহিন্দরের খোঁজ করে। কিন্তু উত্তর আসে না। রাগ হবার কথা_কিন্তু রাগে না সে। এসব তার নিত্যিকার অভ্যেসের মধ্যেই পড়ে। বরং সে খাওয়ার দিকে মনোযোগ দেয়। মাংসটা চিবুনো শেষ হলে আরেকবার থালার ভাত নাড়াচাড়া করে। খোঁজে, যদি আরেকটু মাংস পাওয়া যায়, মাংস না-পেয়ে মনটা তার খারাপ হয়ে যায়। শুধু শুধু ভাত মুঠে উঠতে চায় না।
দাদা, বড় জঙ্গলত নাকি বাঘ থাকে?
নাতির প্রশ্ন শুনে একটু সজাগ হতে হয় বুড়োকে। ঠিক মনে করতে পারে না। প্রাণনগরের জঙ্গলে কি বাঘ আছে? কিছুক্ষণ চিন্তা করে সে। তারপর মাথা নাড়ায়, নাই রে শুকদাস, ঐঠে বাঘটাগ নাই। কিন্তুক ছিল একসময়।
নাতিরা ঘন হয়ে বসে। কপিলদাস ভাত খাওয়ার কথা ভুলে যায় তখন। সে গল্প আরম্ভ করে।
গল্প মানে তো নিজের কথা। সাঁওতাল কিশোর ছেলের যে-ব্যাপার সবচাইতে আকর্ষণ, সেটাই সে ধীরস্বরে বর্ণনা করতে থাকে। তার কালো রঙের কুকুরটার কথা আসে। তার ঘরে খুঁজলে তীরের চোঙা দুটো এখনো পাওয়া যাবে_সেই চোঙার ভেতরে বাছা বাছা তীর জমানো থাকত। একবার তীর দিয়ে একটা বাঘ গেঁথে ফেলেছিল। ভাগ্যিস সে তখনো বাঘ কী জিনিস জানত না। বনবিড়াল ভেবে নিশানা করে তীর ছেড়ে দিয়েছে আর অম্নি কী ডাক! ভয় পেয়ে পড়িমরি করে কী রকম দৌড়েছিল! সেই ঘটনাটা সে বলে এবং বলবার সময় দৌড়ের বর্ণনাটাই প্রধান হয়ে উঠতে থাকে। বুড়ো মানুষের গুনগুন গুনগুন ধীরস্বরের একঘেয়েমিতে বিরক্তি লাগে বাচ্চাদের। শুকদাস অস্থির হয়ে ডাকে, দাদার বাঘটার কী হইল?
ও, হাঁ, বাঘটা। কপিলদাসকে একটু ভেবে নিতে হয়। তীর খেয়ে বিকট চিৎকার করে উঠবার পর বাঘটার যে কী হয়েছিল, কোনোভাবেই মনে পড়তে চায় না। তখন গল্পটা সে বানাতে আরম্ভ করে। তার বর্ণনায় তখন কৌতুক আসে। বাঘের ল্যাজ ধরে টানতে টানতে নিয়ে আসবার ব্যাপারটা সে রঙ চড়িয়ে বলতে চায়। কিন্তু বাঘটা টেনে নিয়ে আসবার সময় কী রকম কষ্ট হচ্ছিল, সে কথাটাই ঘুরেফিরে বলতে থাকে সে।
শীতের রাত, ততক্ষণে সবারই ঘরে গিয়ে শোবার কথা। কিন্তু কেউ শুতে যাচ্ছে না, সেটা সে লক্ষ করে। দেখে, ইতিমধ্যে মহিন্দর, দীনদাস এবং তাদের সঙ্গে সঙ্গে আরো কয়েকজন উঠোনে এসে দাঁড়িয়েছে। বোঝা যাচ্ছে, কোনো সলাপরামর্শ হচ্ছে। কিন্তু বিষয়টা যে কী, কিছুই অনুমান করা যায় না।
ও হ্যাঁ, বাঘটার যেন কী হয়েছিল? কপিলদাস কিশোর দুটির মুখের দিকে তাকিয়ে আবার ল্যাজ ধরে টানবার প্রসঙ্গে ফিরে আসে। ঐ রকম যখন টেনে আসছিল তখনো কিন্তু বাঘটা বেঁচে ছিল_হ্যাঁ। ঘা খাওয়া বাঘ কিন্তু ভয়ংকর জিনিস।
এই পর্যন্ত বলে থামতে হয়। ঘা খাওয়া বাঘের ভয়ংকরতা কিভাবে বোঝাবে, সে জন্যে তাকে ভাবতে হয়। আর ঐ সময় মহিন্দরদের কাছে একটি লোককে আসতে দেখে সে গল্পের কথা ভুলে যায়। উঠে গিয়ে দাঁড়ায় মহিন্দর আর দীনদাসের কাছে।
ম্যানেজার মহাজনের কথা হচ্ছে তখন সেখানে। ভায়া মাঝি ম্যানেজারের কাছে গিয়েছিল, কী রকম ধমক খেয়েছে, সেই কথা বর্ণনা করছে সে। বলছে ম্যানেজার মহাজন চিনিকল এলাকা থেকে লোক জোটানোর জন্যে বিন্দা মাঝিকে টাকা দিয়েছে। যাতে গোলমাল না হয়, সে জন্যে থানায় পর্যন্ত লোক চলে গিয়েছে।
তাহলে? চাপা, ক্ষুব্ধ ও আতঙ্কগ্রস্ত স্বর বার হয় সবার মুখ দিয়ে। তাহলে কী হবে এখন। দুশ্চিন্তাটা সবার মনের ওপর ভারি হয়ে ওঠে। কথা সরে না কারো মুখে।
এতগুলো লোক দাঁড়িয়ে, কিন্তু কথা বলছে না কেউ? কপিলদাস কেমন অস্থির বোধ করে। চারদিকে অন্ধকার, ঠাণ্ডা বাতাস বইছে আর মানুষ ক'জনা দাঁড়িয়ে আছে চুপচাপ। কী যে কাণ্ড ঘটে সব। কপিলদাসের খারাপ লাগতে আরম্ভ করে। সে উশখুশ করতে থাকে। শেষে একসময় বলেই ফেলে_মাহাজন বসত উঠায় দিব। চাহিলেই কি হোবে, ক্যানে হামার কমরত্ জোর নাই?
উত্তেজনায় কথাটা তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে যায়। কিন্তু ঐ পর্যন্তই, তাকে থামতে হয়। থেমে অপেক্ষা করতে হয়, কথাটার কোনো প্রতিক্রিয়া হচ্ছে কি না দেখার জন্য। ওদিকে মানুষ ক'জনা নড়ে না, চড়ে না, আন্দোলিত হয় না। মূর্তির মতোন চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। কপিলদাসের রাগ হয় তখন। বেশ গলা চড়িয়ে বলতে থাকে আবার; ক্যানে, হামার কমরত্ জোর নাই_আঁ? এ মহিন্দর, হামার কমরত্ জোর নাই? দীনদাস তুই কহ, জোর নাই হামার কমরত্?
মানুষ ক'জনা অন্য কথা ভাবছিল তখন। ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হয়ে যাওয়া কী রকম ভয়ানক ব্যাপার, সেই দুশ্চিন্তা মনের মধ্যে পাক খাচ্ছিল সবার। কী উপায়ে ম্যানেজার মহাজনকে শান্ত করবে, সেই কথা ভাবছিল তারা। আর ঠিক ঐ সময়ে কপিলদাসের ঐ রকম পাগলামির কথা শুনে কে একজন রেগে ওঠে। বলে : তুই যা তো বাবা, বুঢ়া মানুষের ইসবের ভিতর থাকবার দরকার নাই।
কপিলদাস ঠিক করতে পারে না কথাটা কে বলল। অন্ধকারে কারো মুখ দেখা যায় না। তবে কথাটা তাকে রাগিয়ে দিল। সে গাল দিয়ে উঠতে চাইল। বলল, ক্যানে, বুঢ়া হইলে কি মোর কুনো দাম নাই, আঁ? বুঢ়া হইলে কি মানুষের দাম থাকে না, কহ?
নিজের ছেলে মহিন্দরও বিরক্ত হয়_বলে, তুই এখন যা তো বাবা, বুঢ়া মানুষ, তুই ইসবের কী বুঝিস!
কপিলদাস বুড়ো এবার সত্যিই দমে যায়। নিজের জন্ম দেয়া ছেলে যদি এই রকম করে বলে তো সে কী করবে। তাকে পিছিয়ে আসতে হয়। হাঁ মড়ল, তুই তো বুঢ়া মানুষ, তুই কিছু করিবা পারিস না। কথাটা ঘুরেফিরে কেউ যেন তার কানের কাছে বারবার করে বলতে থাকে। সে কিছুই করতে পারে না, তাকিয়ে দেখা ছাড়া আর কিছুই করার নেই তার। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সে মানুষের জটলাটা দেখে। ততক্ষণে জায়গাটা বেশ একটুখানি সমাবেশ মতো হয়ে উঠেছে। দেখে, দীনদাস হাত নেড়ে নেড়ে কী বলে চলেছে। তারপর আবার মহিন্দর আরম্ভ করল। তার কথা শেষ হতে-না হতেই ওদিক থেকে আবার ভায়া মাঝি আরম্ভ করে দেয়।
ভারি ধীর নোয়ানো স্বর। শান্তভাবে পরামর্শ হচ্ছে যেন। রাগ নেই। জ্বালা নেই। কারো দু চোখ ধকধক করে জ্বলে উঠছে না, কেউ চিৎকার করে গালাগাল দিচ্ছে না। কপিলদাসের ভারি অবাক লাগে গোটা ব্যাপারটা দেখে। অবাক লাগে, কিন্তু কিছু বলে না সে। বরং নিজেকে সরিয়ে আনে। কয়েক পা পিছিয়ে আসে সে। কিন্তু ঐ কয়েক পা সরে আসতে অনেকটা সময় লেগে যায় তার। কানের কাছে তখনো সে শুনছে_তুই বুঢ়া মানুষ হে মড়ল, তোর কিছুই করার নাই। যেখান থেকে উঠে এসেছিল, সেইখানে সে ফিরে যায়। শুধুই যথাস্থানে ফিরে যাওয়া, শুধুই মেনে নেওয়া_তার কেবলই মনে হতে থাকে।
বাচ্চারা লোকসমাগম দেখেই সম্ভবত উঠে এসেছে বিছানা ছেড়ে। মেয়ে বউরা এখানে-সেখানে ইতস্তত দাঁড়িয়ে। বাচ্চারা একত্র হলে যা হয়_ততক্ষণে খুনসুটি, দাপাদাপি এবং হাসাহাসি এইসব আরম্ভ হয়ে গিয়েছে। পাথরের ওপর ঘষে ঘষে তীরে শান দেওয়া তখনো হচ্ছে। মহিন্দরের ছেলে ডাকল, দাদা, তারপর বাঘটার কী হইল?
ও, সেই গল্প। কপিলদাসের মনে পড়ে একটু আগে শিকারের গল্প বলতে বলতে সে উঠে গিয়েছিল। তখন আগুনের আল্ কিশোর মুখের ওপর চমকাচ্ছে, কে একজন কঞ্চি দিয়ে আগুনটা আরেকটুখানি উসকে দিল। আর ঐ ঘটনার কারণেই কি না কে জানে, কপিলদাস গল্পটা আবার আরম্ভ করে দিল। হ্যাঁ, বাঘটার ল্যাজ ধরে টানতে টানতে আসছিল সে। ভারী ওজন হয় বাঘের। আর বাঘটা ওদিক তখনো কিন্তু মরেনি। নাহ্, বাঘটা বোধ হয় মরেই গিয়েছিল। হঠাৎ তার মনে পড়ে।
কপিলদাস সৎ হয়ে উঠতে চায় বাচ্চাদের কাছে। গল্প বানানো বাদ দেয়। তার স্পষ্ট মনে পড়ে তখন। বাঘটার গায়ে বিকট গন্ধ ছিল, তীরটা ঠিক বুকের মাঝখানে গিয়ে গেঁথেছিল, একেবারে এদিক থেকে ওদিক বেরিয়ে গিয়েছিল। রক্ত তখনো বেরুচ্ছিল গলগল করে। আর ঐ সময়, বিকেলবেলায়, প্রাণনগরের জঙ্গলের ধারে একটা লোক ছিল না চারদিকে কোথাও। সে চিৎকার করে বাবাকে ডাকছিল, বন্ধুদের ডাকছিল। আর ঠিক তখন হঠাৎ তার পাশের ঝোপ থেকে কী একটা জানোয়ার লাফ দিয়ে বেরিয়েই বাঁয়ে ছুটতে শুরু করে দিল। ঐ জানোয়ারটা দেখেই সে_
এ পর্যন্ত বলেই সে থামে। নিজের দুর্বলতা প্রকাশ হয়ে যাবে বলে ইতস্তত করে। আহা কেমন করে বলবে যে শেয়াল দেখে সে ভয়ানক ভয় পেয়ে পালিয়েছিল।
তারপর, তারপর কী হইল? বাচ্চারা সমস্বরে জিজ্ঞেস করলে সে হঠাৎ হেসে ওঠে। হো হো করে হেসে ওঠে। বলে, কিসের বাঘ, চেৎ বাঘ? উতো গিধর কানা। শেয়াল, নেহাতই শেয়াল। বাচ্চারাও হাততালি দিয়ে হেসে ওঠে। সম্ভবত কপিলদাসের বলার ভঙ্গিতে আকর্ষণ সৃষ্টি হয়। বাচ্চারা মহা উৎসাহে কথা বলতে আরম্ভ করে, তুই বাজপাখি মারিছিস দাদা, বাজপাখি? ভালুক মারিছিস তুই, এ দাদা, হরিয়াল মারিস নাই, হরিয়াল? সম্মিলিত উপর্যুপরি প্রশ্ন হতে থাকে। আর কপিলদাসেরও যে কী হয়, সেও ভারি হালকা হয়ে ওঠে_মজার মজার কথা বেরুতে থাকে তার মুখ দিয়ে। আরে তুই কে রে_তুই না ভায়া মাঝির ব্যাটা। হাঁ, তুই হলা চিলহা, বুঝল। আর তুই? তুই হলা বাগদোর, তুই কে জানিস? তোর নাম গত্রুম। অহো তুই ঐঠে ক্যানে_তুই তো ভাল্লুক মামা।
ছোট বাচ্চারা হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে। কপিলদাস তখন নিজের আলাদা অস্তিত্ব অনুভব করতে পারে না। তীরে শান দেবার সময় কী রকম করে পাথরের ওপর ঘষতে হয়_তাই দেখায়। একজনের হাত থেকে বাঁশিটা টেনে নিয়ে ফুঁ দেয়, ফুঁ দিয়ে একটা বহু পুরনো সুর বাজায়। কী বাজাল আঁ, কী বাজাল দাদা? প্রশ্ন হলে সে ভাঙা ভাঙা গলায় গানটা গায়_
ফকির বুলে ঢুলুক বাজে
ভালুক নাচে ঝাম,
হাইয়ারে হালমাল কই গেলু রে_এ_এ।
গানটি শুনে বাচ্চারাও গাইতে শুরু করে দেয়।
বুড়োর ভীমরতি হয়েছে ভেবে মেয়েরা কেউ কেউ মনোযোগ দেয় বাচ্চাদের জটলার দিকে। বড়রা যেখানে সভা বসিয়েছিল সেখান থেকেও কে একজন চিৎকার করে গোলমাল বন্ধ করতে বলে। কিন্তু বাচ্চাদের থামাবে কে? মহিন্দরের ছেলে ধনুকের জন্যে বাঁশের ছিলা তৈরিতে ব্যস্ত ছিল। কপিলদাস তার হাত থেকে কেড়ে নিল ধনুকটা। বলল, দ্যাঁখ্, কেমন করে ছিলা পরাতে হয় ধনুকে।
বাচ্চারা তখন ঘিরে দাঁড়ায় বুড়োর চারদিকে। কপিলদাস হাঁটু ভেঙে ধনুকের এক মাথা ধরে ঝুলে পড়ে ধনুকটা নোয়ায়। তারপর বাঁ হাত ছিলার ফাঁসটা ধনুকের মাথায় ঢোকাতে চায়। কিন্তু প্রথমবারেই পারে না। ডান হাতটা তার ভীষণভাবে কাঁপতে থাকে। বাচ্চারা বুড়োর কাণ্ড দেখে সমস্বরে বলে, পারবো নাই দাদা_তুই পারবো নাই। কিন্তু পারে সে। ঐ কাঁপা কাঁপা হাতেই সে ছিলা পরিয়ে দেয় ধনুকের। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে ছিলা টেনে ধনুকের একটা টংকার তোলে। ভারি সুন্দর টানটান আওয়াজ হয় তাতে। এর পরও বুড়ো থামে না। একটা শানানো তীর নেয় হাতে এবং তীরটা ধনুকের ছিলায় বসিয়ে তাক করে। সামনের দিকে একবার, একবার ডাইনে, একবার বাঁয়ে। বুড়ো ভয় দেখিয়ে মশকরা করে যেন। বাচ্চারা তাতে হৈ হৈ করে ওঠে। আর ঐরকম হৈ চৈ শুনেই সম্ভবত কপিলদাস তীরটা দু আঙুলের ফাঁকে চেপে ছিলা ধরে টানে। টেনে ধনুকের নিশানা করে অন্ধকারের দিকে। মহিন্দরের ছেলে বলে ওঠে, দাদা তীরটা ছুটে যাবে, দাদা মোর তীরটা ছুটে যাবে। কিন্তু কপিলদাস নাতির মিনতি শুনতে পায় কি না বোঝা যায় না। সে সত্যি সত্যি তীরটা ছেড়ে দেয়। আর বাতাস-কাটা শব্দ করে তীরটা অন্ধকারের দিকে ছুটে যায়।
চারদিকে মানুষের বসত। মেয়েরা বুড়োর কাণ্ড লক্ষ করে হাঁ হাঁ করে ওঠে। সভার মানুষের মধ্য থেকেও কয়েকজন এগিয়ে আসে। কিন্তু ততক্ষণে বুড়ো কপিলদাস আর একটা তীর হাতে তুলে নিয়েছে। সবাই যখন নিষেধ করছে তখন সে দ্বিতীয় তীরটাও সামনের অন্ধকারের দিকে নিশানা করে ছুড়ে দিয়েছে। এবং ঐ কাণ্ড ঘটে যাওয়ায় ব্যাপারটা আর ছেলেমানুষি তামাশার পর্যায়ে থাকে না। দূর থেকে মহিন্দর চিৎকার করে ওঠে : বিন্নী গালাগাল করতে আরম্ভ করে। কিন্তু বুড়ো তখন হাসছে কেমন দেখো, যেন সে কিশোরকালে ফিরে গিয়েছে। জীবনে প্রথম নিশানা ভেদ করায় যে খুশি_সেই খুশি পেয়ে বসেছে তাকে। সে শান দেয়া আরো একখানা তীর হাতে তুলে নিয়েছে তখন। ওদিকে পেছন থেকে দীনদাস চিৎকার করে বলছে_ধর বুঢ়াটাকে, ধরে কাঢ়ে লে ধেনুকখানা। সেই চিৎকার বুড়োর কানে আদৌ পেঁৗছায় না। কেউ পেছনে তাকে ধরতে আসছে কি না, সেদিকে ভ্রূক্ষেপ না করে কপিলদাস বুড়ো দু'হাতে তীর-ধনুক নিয়ে সামনের অন্ধকারের দিকে চলতে থাকে। বিমূঢ় মানুষজনের চোখের সামনে দিয়েই সে অনায়াসে অন্ধকার, গাছপালা কৈশোর এবং আদিম উল্লাসের মধ্যে চলে যায়। আর সেখান থেকে সে তার তৃতীয় তীরটা সঠিক নিশানায় ছুড়বার জন্যে তৈরি হতে থাকে।
About: Anonymous
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
eCoxs Special
BNM Archive
- ► 2026 (1338)
- ► 2025 (3280)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
-
▼
2012
(33842)
-
▼
November
(2002)
-
▼
Nov 08
(126)
- ব্যাংক নোটে ম্যান্ডেলা
- চীনে কমিউনিস্ট পার্টির কংগ্রেস শুরু আজ
- জারদারির মামলা চালু করতে সুইস কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ
- কেমন হবে ওবামার বৈশ্বিক নীতি?
- ‘আরও চারটি বছর’
- আওয়ামী লীগ নেতার কাণ্ড- ঠিকাদার ভেবে কিল-ঘুষি, পরে...
- রংপুর সিটি নির্বাচন: মশিউরকে এরশাদের সমর্থন- অন্য ...
- মাদক বিক্রির প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় রিকশাচালককে হ...
- মাদকবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্বে প্রথম আলো
- অর্থ ও আসবাব আত্মসাতের মামলা- সাবেক স্পিকার জমির উ...
- রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানাতে কাল ঢাকায় আসছেন হিনা
- সামাজিক ব্যবসা সম্মেলন শুরু হচ্ছে আজ by আসজাদুল ...
- ৭ নভেম্বরে বিএনপির আশাবাদ- ‘গণবিরোধী’ সরকারের বিরু...
- শিক্ষা বিভাগ- এসিআর ব্যবস্থাপনায় আধুনিকায়ন জরুরি b...
- মূল্যায়ন- ওবামা: আশার সংগ্রাম এখনো চলছে by বার্ন...
- সরেজমিন- ওবামার এই স্বপ্ন পূরণ হোক by মিজানুর রহ...
- কী শিক্ষা দিয়ে গেল আমাদের?- মুঠোফোনের গান ও ট্রেনে...
- বিশ্বময় শান্তি ও উন্নয়ন সাধিত হোক- অভিনন্দন, বারাক...
- চারদিক- ফিরে যাই শৈশবে by ফারুখ আহমেদ
- কৃষি- সোনালি ফসলের পাশে কৃষকের মুখ by তুহিন ওয়াদুদ
- ফিরে দেখা পঁচাত্তর- আগস্ট থেকে নভেম্বরের রক্তাক্ত ...
- জাতিসংঘ পার্কে বসাই দায় by ফারজানা আকতার
- আনোয়ারা আওয়ামী লীগের কী হবে by মোহাম্মদ মোরশেদ হ...
- শোক- সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মুহাম্মদ শামসুল হক
- ছাতিম ফুলের সুবাস by আহামেদ মুনির
- কালুরঘাট সেতু- ফেরির কষ্ট আরও এক মাস by মিঠুন চৌ...
- প্রথম সমকামী সিনেটর ট্যামি
- 'ফোর মোর ইয়ারস' by রাজীবুল হক
- কয়েক রাজ্যে ভোট নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ by তানজিমুল নয়ন
- ওবামার কাছে জনগণ চায় অর্থনৈতিক নিরাপত্তা by যিশু ম...
- ওবামার দিকে তাকিয়ে বিশ্ব by শামসুন নাহার
- 'আমি ভোট দিয়েছি' by শরীফুল ইসলাম শরীফ
- সবিশেষ-সর্বাধিক নারী সিনেটর
- অজানা
- জয়োৎসবের আগে ঝড়ের সতর্কবার্তা
- জো বাইডেন ২০১৬-তেও থাকবেন!
- সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ by রিয়াজ মিলটন
- ড্যান ডাব্লিউ মজিনা বললেন-যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশ ...
- ওবামাকে ভোট দিলেন ১০৬ বছরের হিন্টন
- নাতির বিজয়ে আপ্লুত দাদি by সোহানা তুলি
- ঢাকায়ও জয়ী ওবামা
- সেই ওহাইয়োতে জিতেই ওবামা প্রেসিডেন্ট
- এবার তরুণ ভোটার বেশি by মোস্তফা রাসেল
- প্রতিক্রিয়া-গওহর রিজভীর মন্তব্য-ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্প...
- প্রতীকী ভোট দেখতে গিয়ে দুই নেতার তর্ক
- অল্প স্বল্প গল্প
- হলিউড- হলিউডে নির্বাচনী উত্তাপ
- জয়তী ও তাঁর গান by মেহেদী মাসুদ
- বলিউডআলিয়া, বরুণ, সিদ্ধার্থ- ত্রয়ীর জয়
- এটি একটি ব্যতিক্রমী উৎসব by আবুল খায়ের
- হোয়াইট হাউসের পুতুল হয়ে থাকবেন না তো?
- পরিবর্তন প্রয়োজন রিপাবলিকানদের
- গণভোটে সমলিঙ্গ বিয়ে মারিজুয়ানার অনুমোদন by ফৌজিয়া...
- তবুও আমাদের নীতি টিকে থাকবে : রমনি by হাসান ইমাম বাবু
- এত কিছুর পরও কেন হারলেন by খন্দকার মোজাম্মেল হক
- ড. ইউনূস ইস্যুতে মতদ্বৈধ কমবে by ড. দেলোয়ার হোসেন
- সাক্ষাৎকার-অর্থনীতিকে টেনে তুলেছেন ওবামা by সি এম ...
- কংগ্রেস ও গভর্নর নির্বাচন-পাল্টাল না সমীকরণ by তাম...
- সেরাটা এখনো বাকি-জয়ের পর শিকাগোয় নির্বাচনী সদর দপ্...
- যেভাবে বিজয় by আসাদুর রহমান
- আস্থায় প্রত্যাশায় ওবামা by সফেদ ফরাজী
- চোখ by হুমায়ূন আহমেদ
- আত্মজা ও একটি করবী গাছ by হাসান আজিজুল হক
- কবি by সৈয়দ শামসুল হক
- রানীরঘাটের বৃত্তান্ত by সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
- পাদটীকা by সৈয়দ মুজতবা আলী
- ডিডেলাসের ঘুড়ি by সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম
- সুখের পিঠে সুখ by সেলিনা হোসেন
- রাজা আসেনি বাদ্য বাজাও by সুশান্ত মজুমদার
- অযান্ত্রিক by সুবোধ ঘোষ
- বীর মুক্তিযোদ্ধা- তোমাদের এ ঋণ শোধ হবে না
- আদালত অবমাননার অভিযোগ- সাজেদা ও মতিয়ার বিষয়ে আদেশ ...
- সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যাত্রা- আবারও সাগরে ট্রলারডুবি...
- নদীতীরে by সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
- নয়ান ঢুলি by সরদার জয়েনউদ্দীন
- সরেজমিন- স্কুল চলছে, ভোটও চলছে by মিজানুর রহমান খান
- ওবামা কেন জিতলেন, কীভাবে জিতলেন by আলী রীয়াজ
- নকুলার এক বছরের কারাদণ্ড
- ৫০০ বিঘা জমির জাল দলিল by রোজিনা ইসলাম ও মাসুদ রানা
- হোয়াইট হাউসে ফিরেছেন ওবামা
- আত্মজ by সুচিত্রা ভট্টাচার্য
- বড় পাপ হে by সমরেশ মজুমদার
- কে নেবে মোরে by সমরেশ বসু
- ক্লাস ফ্রেন্ড by সত্যজিৎ রায়
- ক্লাস ফ্রেন্ড by সত্যজিৎ রায়
- গণনায়ক by সতীনাথ ভাদুড়ী
- শ্বেতপাথরের টেবিল by সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
- চন্দনেশ্বরের মাচানতলায় by শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়
- মুনিয়ার চারদিক by শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
- কালান্তক লাল ফিতা by শিবরাম চক্রবর্তী
- শান্তিকামী মানুষের স্বস্তি by জাহিদুল ইসলাম সরকার
- এ নির্বাচন একটি মডেল by বেলাল হোসাইন রাহাত
- বিশ্বের মন জয় করবেন ওবামা by মাসুদ ফরহান অভি
- দ্বিতীয়বার সুযোগ পেলেন বারাক ওবামা by তানিম ইশতিয়াক
- বৃহতের সাধনা by সুভাষ সাহা
- জীবন-সার্থকতা মৃত্যুর সৌন্দর্যে by রণজিৎ বিশ্বাস
- সমকালীন চিন্তা-'কে সেই তৃতীয়, যে চলে তোমাদের সাথে?...
- বাঘহত্যা-নির্মমতার পুনরাবৃত্তি বন্ধ হোক
- অভিনন্দন ওবামা-ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্ক নিবিড় হোক
- জিব্রাইলের ডানা by শাহেদ আলী
- কোথায় পাব তারে by শহীদুল জহির
- মহেশ by শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
- ঈশ্বরের প্রতিদ্বন্দ্বী by শওকত ওসমান
- কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ by শওকত আলী
- ইজ্জত by রিজিয়া রহমান
- চুড়ি by রাহাত খান
- সূর্য ওঠার আগে by রাবেয়া খাতুন
- আবারও চিনির দাম বৃদ্ধি-চিনি শিল্পের উন্নয়নে পদক্ষে...
- অভিনন্দন বারাক ওবামা-দৃঢ় হোক বাংলাদেশ-মার্কিন সম্পর্ক
- পবিত্র কোরআনের আলো-ফিরআউন সময় থাকতে সত্যকে স্বীকার...
- চার দশকের পরিবর্তিত মানসিকতা by ওয়াহিদ নবি
- প্রতিক্রিয়া : হুমায়ুন কবির-ওবামার সংস্কার কর্মসূচি...
- চরাচর-সিলেটের সাতকড়া by ইয়াহইয়া ফজল
- কয়লানীতি, বিশেষজ্ঞ কমিটি ও বাস্তবতা by হাসান কামরুল
- ফতোয়া ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা by ড. নিয়াজ আহম্মেদ
- বহে কাল নিরবধি-অবরোধ কি ইরানকে কোনো 'পরিবর্তনে' বা...
- ‘বাংলাদেশ ইমম্যাচিওরড, যুক্তরাষ্ট্র ম্যাচিওরড’ by ...
- মেহজাবিনের বিজ্ঞাপনী চমক by সাইফ চন্দন
- এবার সিডিতে ‘এক জীবন-২’ এর মিউজিক ভিডিও
- কারা থাকছেন আর্থিক খাত সংস্কার কমিশনে by সাইদ আরমান
- প্রেম-প্রতারণা- ‘মরে গেলাম ভাল থেকো’
- কাটরিনার ইচ্ছা
- তারা আসছেন তবে... by মোহাম্মদ আওলাদ হোসেন
- মেগা নিয়ে ফিরছেন বাঁধন by কামরুজ্জামান মিলু
- ক্যামেরুন ডায়াসের সৌন্দর্যের রহস্য!
- বারাক ওবামার বিজয়ে মার্কিন তারকাদের উচ্ছ্বাস
-
▼
Nov 08
(126)
-
▼
November
(2002)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...
Recent Comments
Cox's Bazar Us Categories
Cox's Bazar Us Categories
Cox's Bazar Us Categories
প্রথম আলো
আন্তর্জাতিক
মানবজমিন
আলোচনা
কালের কণ্ঠ
উপ-সম্পাদকীয়
যুগান্তর
প্রথম পাতা
মতামত
জাতীয়
সমকাল
নয়া দিগন্ত
রাজনীতি
জনকণ্ঠ
সুশীল কথন
ভারত
অর্থনীতি
শেষের পাতা
বিনোদন
ক্রিকেট খেলা
দেশে দেশে
যুক্তরাষ্ট্র
মধ্যপ্রাচ্য
স্পেশাল প্রতিবেদন
নির্বাচন
প্রথম আলো
খেলা
খোলা কলম
আইন আদালত ও বিচার
ফুটবল খেলা
আমার দেশ
ইসরায়েল
বাংলানিউজ
মুক্তধারা
স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা
Lead
ফিলিস্তিন
রাজধানী
অপরাধ
আন্দোলন
এক্সক্লুসিভ
আইন ও মানবাধিকার
নারী
শিক্ষা
বিএনপি
সারা বিশ্ব
ক্রিকেট
ইরান
সাহিত্য
পাকিস্তান
মুক্তমঞ্চ
আওয়ামী লীগ
বাংলা ট্রিবিউন
শিশু
দুর্নীতি
সারা দেশ
বিশাল বাংলা
চট্টগ্রাম
ব্রেকিং নিউজ
সাউথ এশিয়ান মনিটর
সিলেট
ক্রীড়া
পার্সটুডে
অর্থ
খালেদা জিয়া
অর্থ ও বাণিজ্য
কালবেলা
শিল্প বাণিজ্য
চীন
বিবিসি বাংলা
কাশ্মীর
চতুরঙ্গ
খবরাখবর
প্রধানমন্ত্রী
বিশ্ব
নতুন বার্তা
হত্যা
ধর্ম
স্মরণ
গল্প
যুক্তরাজ্য
শিক্ষাঙ্গন
শেখ হাসিনা
ফুটবল
বার্তা২৪ ডটনেট
রস+আলো
সাক্ষাৎকার
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
মুসলিম
জাতিসংঘ
মুক্তিযুদ্ধ
রাশিয়া
মিডিয়া
হরতাল-অবরোধ
খেলা ধুলা
ছাত্রলীগ
প্রতিবেদন
ইতিহাস
ইউরোপ
সোহরাব হাসান
জামায়াতে ইসলামী
অমানবিক
সৌদি আরব
আলোকিত চট্টগ্রাম
পশ্চিমবঙ্গ
আইন
চাষাবাদ- কৃষি ও কৃষক
ফিচার
ভ্রমণ
মিজানুর রহমান খান
ওয়েছ খছরু
খোলা চোখে
বাংলাদেশ-ভারত
ইসলাম ও সমাজ
সিরিয়া
যৌন নির্যাতন
নারায়ণগঞ্জ
নারী ধর্ষণ
জাতীয় সংসদ
আনন্দ
খেলাধুলা
ব্যাংকিং ও বিনিয়োগ
বিজ্ঞান ও গবেষণা
মাদক
আফ্রিকা
সন্ত্রাস
আনিসুল হক
যৌন আবেদনময়ী
প্রবাস
মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান
ছুটির দিনে
সৈয়দ আবুল মকসুদ
সংখ্যালঘু
নকশা
বিজ্ঞান প্রজন্ম ও কম্পিউটার
গোল্লাছুট
তুরস্ক
আফগানিস্তান
বইপত্র
ড. মুহাম্মদ ইউনূস
অন্য আলো
প্রতারণা
ছবি
টাইমস্ আই বেঙ্গলী
প্রকৃতি
ব্যবসা বাণিজ্য
অপহরণ
দুর্ঘটনা
সাহিত্যালোচনা
গার্মেন্টস শিল্প শ্রমিক
ইউক্রেন
জাতীয় পার্টি
রাজশাহী
স্টেডিয়াম
দীন ইসলাম
তরুণ প্রজন্ম
মানবাধিকার
ফূটবল খেলা
রোহিঙ্গা
মিজানুর রহমান
মশিউল আলম
আলী যাকের
আইন ও বিচার
রুদ্র মিজান
হিন্দু
মানবকণ্ঠ
খুলনা
হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ
আব্দুল কাইয়ুম
তারেক শামসুর রেহমান
মালয়েশিয়া
আসিফ নজরুল
নেপাল
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
সাজেদুল হক
ফারুক ওয়াসিফ
কাফি কামাল
মৌলভীবাজার
হাসান ফেরদৌস
স্বাস্থ্য
আনন্দ কণ্ঠ
তৃতীয় পাতা
যাপিত জীবন
সড়ক দুর্ঘটনা
ক্রিখেট খেলা
ফুটবল খলা
বদরুদ্দীন উমর
মরিয়ম চম্পা
আলী রীয়াজ
রংপুর
জ্যোতির্বিজ্ঞান
টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া
নতুনের জানালা
বৃষ্টি ও বন্যা
মোস্তফা কামাল
এ এম এম শওকত আলী
কক্সবাজার
বন্ধুসভা
শিল্প ও সাহিত্য
সংবিধান ও রাষ্ট্র
বগুড়া
মিয়ানমার
ঢাকা
ঈদ বিশেষ সংখ্যা
বাংলাদেশ
অবৈধ-অনিয়ম-কারচুপি
এ কে এম জাকারিয়া
নির্বাচনী কূটনীতি
বদিউল আলম মজুমদার
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি
গবেষণা
মিসর
এম আবদুল হাফিজ
পরিবেশ
শোক
সংস্কৃতি
খবর
বাংলাদেশে
ব্রাহ্মণবাড়িয়া
অজয় দাশগুপ্ত
প্রজন্ম ডট কম
শুভ্র দেব
আবুল কাশেম
আমদানি ও রপ্তানি
ফ্রান্স
কিশোরগঞ্জ
আবদুল মান্নান
রঙের মেলা
ঐতিহ্য
জাপান
কুমিল্লা
মুক্তমত
রাজনৈতিক আলোচনা
শরিফুল হাসান
শিল্প
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল
মাহমুদুর রহমান
ময়মনসিংহ
লেবানন
সংবাদ২৪.নেট
পার্বত্য চট্টগ্রাম
সীমান্ত সন্ত্রাস
আহমদ রফিক
ইফতেখার মাহমুদ
কাজের খবর
ইরাক
স্বপ্ন নিয়ে
টাঙ্গাইল
HotTopic
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর
যশোর
জীবনযাপন
অমর সাহা
আনোয়ার হোসেন
আলী ইমাম মজুমদার
গাজীপুর
রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন
আবুল মোমেন
থাইল্যান্ড
মুফতি এনায়েতুল্লাহ
শ্রীলঙ্কা
চিকিৎসা
মেহেদী হাসান
সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়
রসালোচনা
কামরুজ্জামান মিলু
পরিবেশ-জীববৈচিত্র্য
বরগুনা
কাজী সোহাগ
স্মৃতিচারণ
আনু মুহাম্মদ
কলকাতা
কুলদীপ নায়ার
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
সারাবেলা
অস্ট্রেলিয়া
তথ্য প্রযুক্তি
মারুফ কিবরিয়া
ব্রাজিল
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম
অন্য দিগন্ত
মহিউদ্দীন জুয়েল
মুনতাসীর মামুন
শিরোনাম
শেখ রোকন
আবু সাঈদ খান
জেল থেকে জেলে
ফেসবুক
মহিউদ্দিন আহমদ
মানসুরা হোসাইন
সংবাদ
কবিতা
বিশ্বজিৎ চৌধুরী
আলী হাবিব
প্রকৃতি ও পরিবেশ
শিল্প ও বাণিজ্য
শেষ পাতা
আবু আহমেদ
এম সাখাওয়াত হোসেন
নুরুজ্জামান লাবু
নূর মোহাম্মদ
সুভাষ সাহা
আতাউস সামাদ
আলোচনা মতামত
অর্থনীতি ও বানিজ্য
এবিএম মূসা
আতাউর রহমান
কামাল আহমেদ
পিয়াস সরকার
আসাম
রংবেরং
রাহীদ এজাজ
শ্রদ্ধাঞ্জলি
আশরাফুল ইসলাম
ফেনী
বরিশাল
মসজিদ
রণজিৎ বিশ্বাস
রোকনুজ্জামান পিয়াস
অরুণ কর্মকার
প্রকৃতি ও বিজ্ঞান
মোস্তফা হোসেইন
ইয়েমেন
একরামুল হক
আশীষ-উর-রহমান
একরামুল হক শামীম
Exclusive
ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ
তুহিন ওয়াদুদ
অপরাজিতা
ইন্দোনেশিয়া
উত্তর কোরিয়া
কালি ও কলম
জলবায়ু ও পরিবেশ
জাগোনিউজ২৪.কম
মইনুল ইসলাম
মানিকগঞ্জ
মুহম্মদ জাফর ইকবাল
মোশতাক আহমেদ
আশরাফুল হক রাজীব
ফরহাদ মাহমুদ
প্রণব বল
শংকর কুমার দে
সেলিম জাহিদ
আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ
কামরুল হাসান
পার্থ প্রতীম ভট্টাচার্য্য
রাজীব আহমেদ
শিল্পী
সাময়িকী ফ্যাশন
দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু
বিদ্যুৎ
মোরসালিন মিজান
রবার্ট ফিস্ক
অভিজিৎ ভট্টাচার্য্য
ঈদ
কাজী সুমন
ঝিলিমিলি
মুস্তাফা জামান আব্বাসী
কুষ্টিয়া
জাতীয় নাগরিক পার্টি
মনজুরুল হক
মহসীন হাবিব
মাহবুব মোর্শেদ
রফিকুল ইসলাম
শিলালিপি
শুভ রহমান
চৌধুরী মুমতাজ আহমদ
ছিটমহল
নিবন্ধ
jugantor
নোবেল পুরস্কার
পাঠকের মতামত
পাবনা
মোশাররফ বাবলু
তানভীর সোহেল
মামুন রশীদ
আনন্দ প্রতিদিন
উৎপল রায়
এনামুল হক
কাজল ঘোষ
নদী দূষণ
নাটোর
নিত্যপণ্য
ফাহিমা আক্তার সুমি
বাংলা নববর্ষ
চারু শিল্প
ভেনেজুয়েলা
শওকত হোসেন
উচ্চশিক্ষা
নজরুল ইসলাম
নিউজিল্যান্ড
পার্থ সারথি দাস
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান
গোলাম মর্তুজা
ফরহাদ মজহার
শারমিন নাহার
principalsanaullah
আদিবাসী
কালের খেয়া
দিল্লি
ফখরুল ইসলাম
বাংলাদেশ প্রতিদিন
বিজ্ঞান
মুখোমুখি প্রতিদিন
মোহীত উল আলম
রাহাত খান
অমিতোষ পাল
গল্পালোচনা
পানি আগ্রাসন
প্রযুক্তি
বিশ্বজিৎ পাল বাবু
মাহবুব তালুকদার
আব্দুল কুদ্দুস
কানাডা
বিদেশ
WikiOpinion
তোফায়েল আহমেদ
তৌহিদা শিরোপা
কাতার
জনস্বাস্থ্য
আলোকিত বাংলাদেশ
কাদের সিদ্দিকী
ড. আবু এন এম ওয়াহিদ
ফারুক মঈনউদ্দীন
মোছাব্বের হোসেন
উৎপল শুভ্র
দিনাজপুর
নোমান মোহাম্মদ
সুদীপ অধিকারী
অরূপ দত্ত
পাভেল পার্থ
ফিরোজ মান্না
মাসুদ পারভেজ
রোজিনা ইসলাম
শরিফুজ্জামান
হামিদ-উজ-জামান মামুন
আকমল হোসেন
আজিজুর রহমান
আলম শাইন
ঝড় ও দুর্যোগ
তারেক মাহমুদ
দীপংকর চন্দ
পাভেল হায়দার চৌধুরী
ফখরে আলম
ফরিদপুর
মাসুদ রানা
শহিদুল ইসলাম
আবুল হাসনাত
আসিফ আহমেদ
ইশতিয়াক পারভেজ
জিয়া চৌধুরী
শিশির মোড়ল
হারুন হাবীব
হুমায়ূন আহমেদ
অমিত বসু
আল আমিন
ওমর ফারুক
ফজলুল বারী
ফারুক চৌধুরী
মাসুদ মিলাদ
শর্মিলা সিনড্রেলা
শাহাদুজ্জামান
হায়দার আকবর খান রনো
জাবেদ রহিম বিজন
জাহাঙ্গীর আলম
ট্রানজিট
নন্দন
যতীন সরকার
যুবলীগ
আরিফুজ্জামান তুহিন
কাজী আনিছ
খাবার
গাজীউল হাসান খান
তারেক রহমান
বাংলার দিগন্ত
মোহাম্মদ কায়কোবাদ
শেখ হাফিজুর রহমান
শৈলী
সাতকানিয়া
সুদান
কাজী হাফিজ
জার্মানি
জোবাইদা নাসরীন
নিয়ামত হোসেন
মাহফুজুর রহমান মানিক
লাতিন আমেরিকা
লুৎফর রহমান রনো
ইমরান আলী
এস এম আজাদ
জাহাঙ্গীর শাহ
মাহমুদুর রহমান মান্না
মুশফিকুর রহমান
সাতক্ষীরা
ইকতেদার আহমেদ
উৎসব
ঝিনাইদহ
মাসুদা ভাট্টি
মোকারম হোসেন
শেখ সাবিহা আলম
সিরাজগঞ্জ
সৈয়দ মাহবুবুর রশিদ
হারুন আল রশীদ
WikiEducation
উজ্জ্বল মেহেদী
কনকচাঁপা
ড. মাহফুজ পারভেজ
পরিতোষ পাল
মিঠুন চৌধুরী
শাহদীন মালিক
হায়দার আলী
আহমেদ জামাল
ইমদাদুল হক মিলন
নওগাঁ
পোশাকশিল্প
বাতায়ন
ব্যবসা
আবু সালেহ আকন
এমাজউদ্দীন আহমদ
টিপু সুলতান
ড. মাহবুব উল্লাহ্
ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী
শোকাবহ ১৫ ও ২১ আগস্ট
WikiInternational
এবনে গোলাম সামাদ
পারভেজ খান
ফজলুল আলম
ফরিদা আখতার
বিভাষ বাড়ৈ
মাহমুদুজ্জামান বাবু
মুনির হাসান
মোশতাক আহমদ
সুনামগঞ্জ
আপেল মাহমুদ
আরব আমিরাত বা দুবাই
জহির উদ্দিন বাবর
নোয়াখালী
রিপন আনসারী
শরীফুল ইসলাম
সুব্রত আচার্য্য
উপন্যাস
কাল স্রোত
ক্রীড়া দিগন্ত
খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ
গাজীউল হক
জাহীদ রেজা নূর
শাহনেওয়াজ বিপ্লব
সাইদুজ্জামান
সাময়িকী
অধ্যাপক শুভাগত চৌধুরী
অনন্যা আশরাফ
অনিকা ফারজানা
আদিত্য আরাফাত
ইফতেখার আহমেদ টিপু
কামাল লোহানী
ড. সা'দত হুসাইন
তামান্না ইসলাম অলি
দক্ষিণ কোরিয়া
ফারজানা লাবনী
ফারুক যোশী
মনজুর আহমেদ
রিয়েল-টাইম নিউজ
লিবিয়া
আসজাদুল কিবরিয়া
জলবায়ু
বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য বাপন
মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী
রশিদ মামুন
লক্ষ্মীপুর
সম্পাদকীয়
সাইফুদ্দীন চৌধুরী
সুমন বর্মণ
BBC
ইমরান রহমান
ইলিরা দেওয়ান
এম শাহজাহান
কাক ছোট গল্প
ছিনতাই
নওশাদ জামিল
নুরুন্নবী চৌধুরী
প্রতীক ওমর
বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম
বিকাশ দত্ত
মনিরুজ্জামান
মহিউদ্দিন আহমেদ
উইঘুর মুসলিম
দৈনিক ইত্তেফাক
পিটার কাস্টার্স
পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রিয় চট্রগ্রাম
বাজেট
বাণিজ্য
মোবাশ্বির আলম মজুমদার
সঞ্জয় সাহা পিয়াল
হবিগঞ্জ
খুন
টাকা আনা পাই
মাহবুবুর রহমান
শুভজ্যোতি ঘোষ
হাছান কুতুবী
Hot Topic
অমর একুশে বিশেষ সংখ্যা ২০১২
অমর একুশে বিশেষ সংখ্যা ২০১২
আবিষ্কার
ড. কামাল
দৈনিক ইনকিলাব
ফিলিপাইন
ভুটান
সাভার
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ
নিয়ন আলোয়
শফিক রহমান
শামীমুল হক
শেয়ারবাজার
আইন আদালত
ইতালি
গ্রিনল্যান্ড
নারী নির্যাতন
পটুয়াখালী
ফরিদ উদ্দিন আহমেদ
মণিপুর
মাগুরা
মেক্সিকো
অনিম আরাফাত
ইসলাম
কিরণ শেখ
জাভেদ ইকবাল
দুদক
রাঙ্গামাটি
Art Mag
আরিফুল ইসলাম
প্রতিবাদ
প্রবাসী বাঙালি
বান্দরবান
মহাকাশচারী
মালদ্বীপ
শফিকুল ইসলাম
শিক্ষানীতি
সংবিধান
ডিডাব্লিউ
শরিফ রুবেল
কূটনীতি
গাইবান্ধা
ঝালকাঠি
নরসিংদী
নাইজেরিয়া
বায়ুদূষণ
শাহনাজ পারভীন
স্বাধীনতা
WikiCity
WikiPolitics
বৌদ্ধ
মতিউর রহমান চৌধুরী
যৌন অপরাধ
WikiInterview
আকবর হোসেন
কিশোর আলো
জলবায়ু পরিবর্তন
দৈনিক সংগ্রাম
Exclusive Articles
WikiEconomy
WikiLaw
ইসলামী ছাত্রশিবির
ঘূর্ণিঝড়-হারিকেন
বাগেরহাট
ভূমিকম্প
রাজনৈতিক
সমিতির খবর
সানজানা চৌধুরী
সায়েদুল ইসলাম
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল
আমাদের সময় ডট কম
কুতুবদিয়া স্পেশাল
খাগড়াছড়ি
চুয়াডাঙ্গা
ধর্মঘট
আইন ও আদালত
কাদির কল্লোল
জোহরান মামদানি
তাইওয়ান
দুর্গোৎসব ও পূজা
দৈনিক আমার সংবাদ
নববর্ষ বিশেষ সংখ্যা 2013.
নূরে আলম সিদ্দিকী
প্রতিক্রিয়া
বিডিআর বিদ্রোহ
ব্যাংক
মুন্সীগঞ্জ
শিশুসাহিত্য
খ্রিষ্টধর্ম
গদ্যকার্টুন
প্রতিদিনের সংবাদ
ভোরের কাগজ
রুমিন ফারহানা
Hit
আর্জেন্টিনা
ইহুদি
পিরোজপুর
বন্যা
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
সরল গরল
Asia
গণমাধ্যম
ডেনমার্ক
পরামর্শ
প্রকৃত্
ভাষা
ভোলা
MERIT
Soikot
WikiWoman
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ
উন্নয়ন
জর্ডান
জ্বালানি
পিলখানা হত্যাকাণ্ড
ফ্যাশন
রঞ্জন বসু
সাংসদ
স্পেন
হরতাল
WikiCrime
উইকিলিকস
ক্রিকেট ও রাজনীতি
গণতন্ত্র
গোপালগঞ্জ
চাঁদপুর
চিত্রকর্ম
ছাত্ররাজনীতি
জঙ্গিবাদ
জন্মদিন
তেল-গ্যাস
দক্ষিণ ধুরুং
দূর পরবাস
নাকিবুল আহসান নিশাদ
নারী অধিকার
নোবেল শান্তি পুরস্কার
পঞ্চগড়
পরীক্ষা
বিজয় দিবস
মেঘালয়
রাঙামাটি
সুশাসনের জন্য নাগরিক
হামলা
আন্দালিব রাশদী
ঈদুল আজহা
এনটিভি
কক্সবাজার নিউজ ডটকম
কুতুবদিয়া নিউজ
চট্টগ্রাম বন্দর
ছাত্র রাজনীতি
ঠাকুরগাঁও
ডিজিটাল বাংলাদেশ
তথ্য অধিকার
দ্বিজেন শর্মা
নির্যাতন
নড়াইল
প্রবাসী শ্রমিক
ভারতের প্রধানমন্ত্রী
মৃত্যু
শারদীয় দুর্গোত্সব
শিশুমৃত্যু
শিশুহত্যা
সালমান রাফি শেখ
সুবীর ভৌমিক
সুশাসন
স্মৃতি
Africa
My Art
অধিকার
আন্তর্জাতিক নারী দিবস
একুশে টেলিভিশন
কলম্বিয়া
কুয়েত
চিঠিপত্র
চুক্তি
তিউনিসিয়া
দুর্যোগ
নির্বাচন ও রাজনীতি
নেত্রকোণা
পরিবহন
পর্যটন কেন্দ্র
প্রশাসন
ফ্রান্সিস বুলাতসিঙ্ঘালা
বেলজিয়াম
বড়ঘোপ
ভি এস নাইপল
ভৈরব
মরক্কো
মাওবাদী
মামলা
যানজট
লেমশীখালী
সংসদ
সন্ত্রাসী
সমাজ
সামাজ
সুন্দরবন
সৈয়দ দিদার বখত
সোমালিয়া
হংকং
Middle East
Principal Sanaullah
Special Day
অগ্নিসংযোগ
অমৃতবাজার পত্রিকা
অরবিন্দ কেজরিওয়াল
আইন ও অধিকার
আগুন ও মৃত্যু
আজকের কাগজ
আল মাহমুদ
আহসান কবির
এম.এ মান্নান
এল সালভাদোর
কমল জোহা খান
কিউবা
খাদ্যসমস্যা
চাঁপাইনবাবগঞ্জ
জঙ্গি
তথ্য অধিকার আইন
দ্য ডেইলি স্টার বাংলা
পানামা
পূর্বপশ্চিম
প্রাণি ও উদ্ভিদ
বঙ্গবন্ধু হত্যা বিচার
বন্য প্রাণী
বেলুচিস্তান
ভিয়েতনাম
ভোরের ঈদ ১৯
ভয়েস অফ আমেরিকা
যায়যায়দিন
লালমনিরহাট
শিক্ষা অধিকার
শিক্ষা ও সমাজব্যবস্থা
শিশুশিক্ষা
শ্রমিক
সন্ত্রাসবাদ
সুইডেন
সুজন সুপান্থ
NEWS
Palestine
fd
অরণ্যে রোদন
অরুণাচল
অর্থনৈতিক
অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক
ইকরাম সেহগাল
উত্তর ধুরুং
উমর মনজুর শাহ
একুশে ফেব্রুয়ারি
ঐতিহাসিক
কিশোরকণ্ঠ
কুড়িগ্রাম
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
কোরবান
ঘূর্ণিঝড়
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন
জর্দান
জাইমা রহমান
জাদুঘর
জামালপুর
জীবন
জেসমিন আখতার
জ্বালানি তেল
টেলিভিশন
তথ্যপ্র্রযুক্তি
তুষার আবদুল্লাহ
দেশপ্রেম
দৈনিক কক্সবাজার
নাগরিক সংবাদ
নারীঅধিকার
নিরাপত্তা
নির্বাচিত
নেদারল্যান্ডস
পাহাড়
পয়লা বৈশাখ
বঙ্গবন্ধু
বন্দর
বিশ্ব অর্থনীতি
বিশ্বকাপ ফুটবল
ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা
মহান বিজয় দিবস
মা
মাদারীপুর
মানবতা
মানববন্ধন
মিজোরাম
মিডিয়া ভাবনা
মে দিবস
শরীয়তপুর
শিক্ষা দিবস
শিক্ষা-প্রশাসন
শুভ বড়দিন
শেরপুর
সজীব ওয়াজেদ জয়
সময়চিত্র
সরেজমিন প্রতিবেদন
সাতকানিয়া পৌরসভা
সিঙ্গাপুর
সুইজ়ারল্যান্ড
সুশান্ত মজুমদার
স্মরণ সভা
স্মর্রণ
হাসান আজিজুল হক
America
Burma
Child
China
Hot Video
Huw Cordey
Latin America
Marwan Barghouti
Tom Geoghegan
Tom Heap
Washington
kolkata24x7
অ্যান্টার্কটিকা
আহমদ ছফা
আহমেদ মুনির
উখিয়া
উত্সব
উদ্যোগ
এসিড-সন্ত্রাস
ওমান
ওয়াসি আহমেদ
কর্মসূচি
কেনিয়া
ঘড়ি
চট্টগ্রাম বন্দর
চাকরি
চারদিক
চীন ও জাপান
জনসংখ্যা
জাকির তালুকদার
জাহাজ
জায়গা
জায়মা জারনাজ রহমান
জীবনী
জেলহত্যা দিবস
জ্বালানী সম্পদ
ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন
ড. সাজিদ হক
ডিজিটাল
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন
তিব্বত
ত্রিপুরা
নগরজীবন
নরওয়ে
নিবন্ধন
নীলফামারী
পবিত্র আশুরা
পবিত্র ঈদুল ফিতর
পরিকল্পনা
পানিসম্পদ
পুলিশ
পেরু
প্যারিস
প্রান্তকথা
প্রিয়.কম
প্রেক্ষিত
বর্নাঢ্য র্যালী
বলিভিয়া
বাংলাভিশন
বাজারসুবিধা
বাস্তবসম্মত
বিচার
বিশ্ব খাদ্য দিবস
বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস
বিশ্ব নদী দিবস
বিশ্ব প্রতিবন্ধী দিবস
বিশ্ব শিক্ষক দিবস
বিশ্ববিদ্যালয়
ব্যবস্থাপনা
ব্যাংক ব্যবস্থা
ব্রিটিশ
ভাষাসৈনিক
মাহমুদ আহমাদ
মুস্তাফিজ মামুন
মোস্তফা সরয়ার ফারুকী
যুদ্ধ ও শান্তি
যুদ্ধাপরাধ
যুদ্ধাপরাধের বিচার
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রাজবাড়ী
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
লবন চাষ
শহীদের স্মৃতি
শান্তি
শিল্প ও পরিবেশ
শিশুশ্রম
সন্ত্রাস ও রাজনীতি
সহজিয়া কড়চা
সিগন্যাল
সেলিনা হোসেন
স্বাধীন
স্বাস্থ্যনীতি
স্মরণ মুক্তিযুদ্ধ
স্মৃতিঘর
হাসপাতাল
Afghanistan
Bangladesh
Brazil
CNN
California
Comments
Croatia
Delhi
Denise Winterman
Dome of the Rock
God Mag
Google
Hugh Schofield
India
Indonesia
Jane O'Brien
Japan
Jeremy Bowen
Jerusalem
Jon Kelly
Kareem Khadder
Kate Dailey
Kim Ghattas
Lead News
Libya
Mahfuz Anam
Michal Zippori
New York
Nigeria
Pakistan
Paris
Paul Colsey
Qamrul Islam
Rosie Goldsmith
Rupert Wingfield-Hayes
Sanjoy Majumder
Source
South Sudan
The Daily Star
The Telegraph
Thomas Fessy
Tours
Vietventures
Wall Street
World's Last Chance
Young
a excellent photo in Kutubdia Island
bdnews24
google search
image
অদিতি ফাল্গুনী
অমানবিকতা
অযোগ্যদে
অসারপনা
আইনকানুন
আজারবাইজান
আদিবাসী দিবস
আনোয়ারা সৈয়দ হক
আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস
আফসার আমেদ
আবদুল লতিফ মাসুম
আবু আজাদ
আশান উজ জামান
আহমদ ফাহমি
ইথিওপিয়া
ইভ টিজিং
ইমরান খান
ইমাম খাইর
ইসলাম ও জীবন
ঈদের খুশি ও আনন্দ
ঈদের বেতন
উজবেকিস্তান
উপনির্বাচ
উপনির্বাচন
উর্দুভাষী
এ পি জে আবদুল কালাম
একুশে ফেব্রুয়ারি:
ঐতিহাস
ওবামা
কক্সবাজার নিউজ
কমিল্লা
কম্বোডিয়া
কলকাতার চিঠি
কাকন রেজা
কাজাখস্তান
কাটরা
কানাই কুণ্ডূ
কালের পুরাণ
কুতুবদিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়
কৈয়ারবিল
ক্রসফায়ার
ক্ষত
ক্ষমাপ্রার্থনা
ক্ষুদ্রঋণ
কয়লানীতি
খায়ের মাহমুদ
খোন্দকার শওকত হোসেন
গাম্বিয়া
গোধূলি
গোড়ার
গৌড়
গ্রামীণ অর্থনীতি
গ্রেপ্তার
ঘূর্ণিঝড় সম্পাদকীয়
ঘোড়া
চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচন
চরমোনাই পীর
চলতি পথে
চাঁদ
চাদ
চিনি
চিরকুট
চিলি
চেয়ারম্যান
ছাত্র-রাজনীতি
ছাড়পত্র
ছুটিদন
জজ হত্যা দিবস
জনদুর্ভোগ
জনস্বাস্থ্যের
জবাবদিহি
জম্মদিন
জলদস্যু
জাতিগত সহিংসতা
জারদারি
জি. মুনীর
জীবনযুদ্ধ
জীবিকা
জুমকন্যার
জ্বালানি রাজনীতি
জ্বালানি সম্পদ
জ্বালানিসম্পদ
জয়পুরহাট
ঝুঁকি
ঝুঁকি হ্রাস দিবস
টিপাইমুখ
টিপাইমুখ বাঁধ
টিপাইমুখে বাঁধ
টিভি চ্যানেল
টোঙ্গা
ঢাকা টাইমস
তানজির আহমেদ রাসেল
তুর্কমেনিস্তান
তেঁতুল
তেলকূপ দুর্ঘটনা
তেলিরকাটা
দক্ষিণ মগডেইল
দারিদ্র্য বিমোচন
দায়গুলো
দায়িত্ব
দুই দু’গুণে পাঁচ
দুর্গ
দূর পরবাসে
দেবনারায়ণ চক্রবর্তী
দৈনিক আজাদী
নগরদর্পণ
নদীকৃত্য দিবস
নববধূ
নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচন
নারীর ক্ষমতায়ন
নাসরীন জাহান
নাসিমা আনিস
নাসির উদ্দিনের স্বাভাবিক মৃত্যু
নিজাম কুতুবী
নিপীড়ন
নিরাপতা
নির্বাসনে
নিষেধাজ্ঞা’
নূরে আলম জিকু
নেতা ইমরান খান
নেতৃত্বে
নোযাখালী
পণ্যবাজার
পদক
পবিত্র হজ
পররাষ্ট্রনীতি
পরিস্থিতি
পর্তুগাল
পাঠকের মন্তব্
পাপুয়া নিউগিনি
পাপড়ি রহমান
পাসপোর্ট
পাহাড়ধস
পিলখানা হত্যা
পোল্যান্ড
পোশাক
প্রশ্নবিদ্ধ
প্রস্তাবিত
প্রাণীজী
প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ
প্রয়াণ
ফাঁসি
ফিনল্যান্ড
ফেরি ও পন্টুন
বঙ্গবন্ধু হত্যা
বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তন
বঞ্চনা
বনসম্পদ
বরিশাল ছাত্রলীগ
বর্ণবৈষম্যবিলোপ দিবস
বাঁকখালী
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি
বাংলাদেশের পতাকা
বার্লিন দেয়াল
বাল্যবিয়ে
বাস্তবা
বাস্তবায়
বিচার বিভাগ
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড
বিজ্ঞানচিন্তা
বিজ্ঞাপন
বিজয়
বিদ্যুত
বিদ্যুৎ-সংকট
বিদ্যুৎকেন্দ্রে
বিপ্রদাশ বড়ুয়া
বিলবোর্ড দুর্ঘটনা
বিলেতের স্ন্যাপশট
বিশ্ব কুষ্ঠ দিবস
বিশ্ব পরিবেশ দিবস
বিসিবি
বুলবন ওসমান
বুড়িগঙ্গা
বৃক্ষরোপণ
বৈশ্বিক উষ্ণায়ন
বৈষম্য
বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর
ব্যারিস্টার নাজির আহমদ
ব্রুনাই
বড়পুকুরিয়া
ভাজিরালংকর্ন
ভালোবাসা
ভাষণ
ভেজাল
ভোজ্যতেল
মংলা থেকে
মঈনুল হাসান
মঙ্গোলিয়া
মঞ্জু সরকার
মনযূরুল হক
মনি হায়দার
মন্ত্রিসভা
মাওবাদী সহিংসতা
মাতৃভাষা ও পরভাষা
মানচিত্র নিউজ
মানব
মানসিক স্বাস্থ্য দিব্স
মানসিকতা
মালি
মাল্টা
মাহবুব রেজা
মাহামুদা খাতুন
মিথিলেশ ভট্টাচার্য
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম
মুরগি জমা
মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন
মূল্যস্ফীতি
মৃত্যু ও কিছু ভাবনা
মোহাম্মদ কামরুজ্জামান
মোহাম্মদ মোশাররফ হুসাইন
ম্যাডোনা
ম্যান্ডেলা দিবস
যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল
যুদ্ধাপরাধ-বিচার
রক্ত
রদ্ধাঞ্জলি
রবাণিজ্যে
রাগবি
রাজনৈতিক সংস্কৃতি
রাজপথ
রাষ্ট্রীয়
রাস্তার
রিয়াল মাদ্রিদ
রুবেল হোসেনের
রেলওয়ের
রোমাঞ্চিত
রোমানিয়া
র্বিজ্ঞান
শক্তিশালী
শঙ্কা
শরীরের
শশী থারুর
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস
শাকিরা
শাহ্নাজ মুন্নী
শায়খ আহমাদুল্লাহ
শিক্ষক খুন
শিক্ষক-রাজনীতি
শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস
শিক্ষাচিত্রে
শিক্ষাবিদের
শিবের গীত
শুঁটকি উৎপাদন
শেরাটনীয়
শোনা
শ্রদ্ধাঞ্জল
শ্রমবাজার
শ্রমশক্তি
ষড়যন্ত্র
সংকট
সংঘাত
সংশোধন
সঙ্গী
সততা
সন্দেশ
সমন্বয়সাধন
সমাজ ও নারী
সমুদ্রস্নান
সময়
সময় নিউজ টিভি
সময়ের প্রতিবিম্ব
সরকার
সাংবাদ
সাইক্লোন শেল্টার
সাইপ্রাস
সাজিদ গ্রেফতার
সাদাসিধে কথা
সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম
সামন্ততন্ত্র
সামরিক শাসন
সামাজি
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম
সাহসী
সিডনি
সিয়াম
সুপ্রভাত
সূর্যে
সেচসুবিধা
সোনার বাংলা
স্কাইপি
স্বকৃত নোমান
স্বচ্ছতা
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
স্বাধীনত
স্বাধীনতাযুদ্ধ
স্বামী
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
স্বীকৃতি
স্মৃত-নিদর্শন
স্মৃতিসৌধ
স্মৃতিসৌধে
স্লোভাকিয়া
হত্যা ও হরতাল
হাইতি
হুগজিল্ট
No comments:
Post a Comment