Saturday, June 16, 2012
প্রথম আলো গোলটেবিল বৈঠক-‘পার্বত্য শান্তিচুক্তি: দ্রুত বাস্তবায়ন জরুরি’
প্রথম আলো গোলটেবিল বৈঠক-‘পার্বত্য শান্তিচুক্তি: দ্রুত বাস্তবায়ন জরুরি’
গত ৩০ সেপ্টেম্বর প্রথম আলোর উদ্যোগে ‘পার্বত্য শান্তিচুক্তি: দ্রুত বাস্তবায়ন জরুরি’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা আলোচনায় অংশ নেন। তাঁদের বক্তব্য এখানে সংক্ষিপ্ত আকারে ছাপা হলো:
যাঁরা অংশ নিলেন
সুলতানা কামাল
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও নির্বাহী পরিচালক, আইন ও সালিশ কেন্দ্র
গৌতম দেওয়ান
সভাপতি, পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক কমিটি
স্বপন আদনান
সদস্য, পার্বত্য চট্টগ্রাম কমিশন
মণিস্বপন দেওয়ান
সাবেক উপমন্ত্রী
পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়
অধ্যাপক আমেনা মহসীন
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
শক্তিপদ ত্রিপুরা
সাংগঠনিক সম্পাদক, জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) ও সভাপতি, খাগড়াছড়ি হেডম্যান সমিতি এবং সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান
সুধাসিন্ধু খীসা
কো-চেয়ারম্যান
জনসংহতি সমিতি (এম এন লারমা)
সঞ্জীব দ্রং
সাধারণ সম্পাদক
বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম
মো. জাহাঙ্গীর কামাল
সাধারণ সম্পাদক
পাবর্ত্য চট্টগ্রাম সম-অধিকার আন্দোলন
বিনায়ক সেন
গবেষণা, পরিচালক, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস)
ইলিরা দেওয়ান
সাবেক সাধারণ সম্পাদক, হিল উইমেনস ফেডারেশন, বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রাম কমিশনে কর্মরত
মতিউর রহমান
সম্পাদক, প্রথম আলো
সঞ্চালক
আব্দুল কাইয়ুম
যুগ্ম সম্পাদক, প্রথম আলো
আলোচনা
মতিউর রহমান
পার্বত্য শান্তিচুক্তির বাস্তবায়ন—এটি একটি বড় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দেশের ভবিষ্যৎ গণতন্ত্রের অগ্রগতির জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এর বাস্তবায়ন জরুরি। এরই মধ্যে প্রথম আলো পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন-সম্পর্কিত চার দিনের ধারাবাহিক সংবাদ প্রকাশ করেছে। সরকার বারবার বলছে, তারা এ চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করতে চায়। তারা বিভিন্ন শক্তিশালী কমিটিও গঠন করেছে। কিন্তু পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের এক যুগ পার হয়ে যাওয়ার পরও চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তেমন কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। তাই জনমত গড়ে তোলার জন্য এবং সমাজের সব মহলের মধ্যে এই পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের গুরুত্ব তুলে ধরতে আজকের এই গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন। যেন সরকারকে এ বিষয়ে সজাগ করা যায়—বিশেষ করে পার্বত্য অঞ্চলের জনগণ, যারা এ সমস্যা থেকে পরিত্রাণ চায়, তাদের সহায়তা করা যায়। আমরা সবাইকে নিয়ে এই আলোচনা করতে চেয়েছি।
এই অনুষ্ঠানে পার্বত্যচট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী দীপঙ্কর তালুকদার এবংখাগড়াছড়ির সাংসদ ও শরণার্থী পুনর্বাসনবিষয়ক টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান যতীন্দ্র লাল ত্রিপুরা অংশ নিতে আগ্রহের সঙ্গে সম্মতি দিয়েছিলেন। কিন্তু বিশেষ ব্যস্ততার জন্য তাঁরা আসতে পারেননি।
১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য শান্তিচুক্তি সম্পাদনের পরের বছর রাঙামাটিতে বিশাল জনসমাবেশ হয়েছিল। সেখানে আমরা দেখেছিলাম, চুক্তি স্বাক্ষরের এক বছরের মাথায় সেখানকার জনগণের মধ্যে চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে হতাশার ছায়া। পরে তৎকালীন আওয়ামী লীগের আমলে চুক্তি বাস্তবায়নে কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছিল। কিন্তু বড়ো অগ্রগতি হয়নি। পরবর্তী সময়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর তারা চুক্তিটি বাতিল করে দেয়নি, কিন্তু তাদের সময় চুক্তি বাস্তবায়নে তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। পরবর্তী সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে কিছু কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছিল চুক্তি বাস্তবায়নে।
গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী অঙ্গীকারে পূর্ণাঙ্গরূপে চুক্তি বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছিল। সরকার গঠন করার পর তারা শক্তিশালী কমিটি গঠনও করেছে, চুক্তি বাস্তবায়নের কথা বলছে। যদিও এখন পর্যন্ত চুক্তি বাস্তবায়নে তেমন কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। বর্তমান সরকার টাস্কফোর্স গঠন, ভূমি কমিশন আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে, কিন্তু সেই আদিবাসী উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন সম্পূর্ণ হওয়ার জন্য তেমন কোনো বড় উদ্যোগ আমরা দেখিনি।
ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তির আগেই ভূমি জরিপের বিষয়ে কমিশনের অবস্থান ও বক্তব্য নিয়ে বর্তমানে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। সর্বশেষ সংসদীয় কমিটির বৈঠকে তাঁরা বলেছেন, পাবর্ত্য চুক্তি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। আমার মতে, এটি একটি ভালো উদ্যোগ। এর মাধ্যমে যদি ভবিষ্যতে অন্য কোনো সরকার আসে, তারা পাবর্ত্য চুক্তি বাতিল করতে পারবে না। অন্যদিকে ভূমি কমিশনকে কার্যকর করতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। আর এ বিষয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠকে মতৈক্যে পৌঁছানো গেছে।
এরই মধ্যে আন্তর্জাতিকভাবে পাবর্ত্য চুক্তি বাস্তবায়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইউএনডিপি; তাদের বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে পার্বত্য অঞ্চলে।
পরিশেষে বলব, পার্বত্য শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন ছাড়া আমাদের সামনে অন্য কোনো পথ খোলা নেই। আমাদের সবার আশা, একটি ঐতিহাসিক উদ্যোগ—আলোচনা, সমঝোতার মাধ্যমে চুক্তিটির বাস্তবায়ন এই পার্বত্য অঞ্চলে অতি জরুরি। বর্তমান সরকারের কাছে আমাদের আশা যে চুক্তিটি স্বাক্ষর করেছিল ১৯৯৭ সালে, তারা তা বাস্তবায়নে যথেষ্ট উদ্যোগী হবে। যেহেতু এটি মহাজোটের নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল, তাই তা বাস্তবায়নে এগিয়ে আসা উচিত। সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য চুক্তিটি যত দ্রুত সম্ভব বাস্তবায়ন করতে আমরা জোর দাবি জানাচ্ছি।
আলোচনার শুরুতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা সুলতানা কামালকে অনুরোধ করব চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাধাগুলো কী এবং তা সমাধানে কী উদ্যোগ নেওয়া উচিত, সে বিষয়ে বলার জন্য।
সুলতানা কামাল
আমরা জানি, প্রথম আলোয় প্রকাশিত ধারাবাহিক সংবাদটির বক্তব্য ছিল, পার্বত্য চট্টগ্রাম আবার অশান্ত হয়ে উঠেছে। এ বক্তব্যের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রাম খুব একটা স্বাভাবিক অবস্থায় নেই। আজকের বৈঠকের আলোচকদের আলোচনার মাধ্যমে বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামের সংকটগুলো কী কী এবং এসব সমাধানে কী উদ্যোগ নেওয়া জরুরি, সে বিষয়গুলো উঠে আসবে—পার্বত্য চট্টগ্রাম যে অশান্ত হয়ে উঠছে, তা কীভাবে প্রতিরোধ করা যায়।
পাশাপাশি শান্তির পথে কীভাবে এগিয়ে যাওয়া যাবে, সে বিষয়গুলো বিষদভাবে তুলে ধরা উচিত। আজকের আলোচনার মাধ্যমে পার্বত্য চুক্তির বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হবে। চুক্তি বিশ্লেষণের মাধ্যমে চুক্তি বাস্তবায়নে কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া দরকার কিংবা চুক্তির কিছু বিষয় সংশোধন করা বা বর্তমান প্রেক্ষাপটে চুক্তির কোন অংশগুলোর পরিবর্তন আনতে হবে, সেগুলো চিহ্নিত করতে হবে। শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকার ও সব শ্রেণীর মানুষের ইতিবাচক ভূমিকা পালন করা উচিত।
আব্দুল কাইয়ুম
আজকের আলোচনার জাতীয় ও আন্তর্জাতিক—উভয় দিকেই গুরুত্ব রয়েছে। কারণ যখন কোনো সরকার এ ধরনের কোনো চুক্তি করে, তখন সেটি কোনো রাজনৈতিক দল বা রাজনৈতিক সরকারের একার বিষয় থাকে না। সে চুক্তি বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেশের সব সরকারের ওপর বর্তায়। সেই চুক্তি যদি বাস্তবায়িত না হয়, তখন সেটি দেশে ও আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্নের সৃষ্টি করে। আমরা চাই, পার্বত্য চুক্তিটি বাস্তবায়ন করা হোক।
অনেকে বলেন, চুক্তিটির মধ্যে অসামঞ্জস্য রয়েছে। কিংবা বর্তমান প্রেক্ষাপটে চুক্তিটির ত্রুটি রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে অতি দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। এই পর্যায়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক কমিটির সভাপতি গৌতম দেওয়ানকে অনুরোধ করব বলার জন্য।
গৌতম দেওয়ান
সম্প্রতি পার্বত্য অঞ্চলের সবার কাছে মনে হচ্ছিল, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বাস্তবায়ন সরকারের কর্মপরিকল্পনার অগ্রাধিকার তালিকার মধ্যে নেই। কিন্তু চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়টি দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ইস্যু। বিভিন্ন গণমাধ্যমের পেশাজীবী, শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবী, গবেষক, সুশীল সমাজ—সবার সহযোগিতা যদি আমরা পাই অর্থাৎ যদি একটি জনমত সৃষ্টি করতে পারি, তবে সরকারের কাছে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়টি অগ্রাধিকারের তালিকায় তুলে আনা সম্ভব। সেই লক্ষ্যে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আজকের এই গোলটেবিল বৈঠক সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে কাজ করবে।
পার্বত্য শান্তিচুক্তি বাস্তবায়িত হচ্ছে না। কিন্তু কেন হচ্ছে না, সে বিষয়গুলো আমরা গভীরভাবে চিন্তা করি না কিংবা প্রকৃত কারণ জানার স্বল্পতা রয়েছে। পার্বত্য শান্তিচুক্তির একটি প্রস্তাবনার মধ্যে চারটি খণ্ড রয়েছে। সেখানে মৌলিক যে বিষয়গুলো রয়েছে, সেখানে বলা হয়েছে যে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলকে একটি আদিবাসী-অধ্যুষিত অঞ্চল হিসেবে স্বীকার করা। এটির বৈশিষ্ট্য রক্ষার জন্য চুক্তির মধ্যে কিছু বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল—পার্বত্য চট্টগ্রামে বিশেষ অঞ্চল হিসেবে আঞ্চলিক পরিষদ গঠন করা হবে। তিনটি জেলা রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি নিয়ে বিশেষ শাসিত অঞ্চল গঠন করা হবে। পাশাপাশি সেখানে অভ্যন্তরীণ ও ভারত থেকে প্রত্যাবর্তন করা যেসব শরণার্থী আছে, তাদের পুনর্বাসন করা হবে—সেখানে যারা ভূমিহীন হয়েছে কিংবা ভূমি হারিয়েছে, যাতে তারা তাদের ভূমি ফিরে পায়। তাদের ভূমিবিরোধ-সমস্যা নিষ্পত্তির জন্য ভূমি কমিশন গঠন করা হবে। ভূমি কমিশন এসব সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নেবে।
আঞ্চলিক পরিষদ ওই সব জেলার মধ্যে যেসব বিভাগ রয়েছে, সেগুলোর সমন্বয়, তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ করবে। আঞ্চলিক পরিষদের কার্যপ্রণালি বিধি প্রণয়ন, জেলা পরিষদ আইন সংশোধন ও কার্যপ্রণালি বিধি প্রণয়ন, স্থানীয় ৩৩টি বিভাগের ৬৮টির কাজ জেলা পরিষদের হাতে হস্তান্তরের মতো সাধারণ বিষয়গুলো বছরের পর বছর ফেলে রাখা হয়েছে। সরকার চুক্তির পর এ অঞ্চলকে আদিবাসী-অধ্যুষিত অঞ্চল বললেও বাস্তবে এর কোনো প্রতিফলন ঘটছে না। আমরা আদিবাসী-অধ্যুষিত অঞ্চল বলতে বোঝাই, এখানে যেসব আদিবাসী আছে, তারা যেন তাদের ভাষা-সংস্কৃতি-স্বকীয়তা নিয়ে থাকতে পারে, সে ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ নেওয়া হবে। কিন্তু বাস্তবে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। পাশাপাশি বরং নিরাপত্তাহীনতা, সমতল থেকে বাঙালি প্রতিস্থাপন, ভূমি হারানো, ভূমি জবরদখল—এ বিষয়গুলো বন্ধ হয়নি।
জনসংখ্যার অনুপাতের জরিপে ১৯৪৭ সালে পার্বত্য এলাকায় পাহাড়ি ছিল ৯৭ দশমিক ৫ শতাংশ আর বাঙালি ছিল আড়াই শতাংশ। ১৯৯৭ সালে চুক্তির সময় পাহাড়ি ছিল ৫৫ শতাংশ ও বাঙালি ছিল ৪৫ শতাংশ। কিন্তু বর্তমানে জনসংখ্যার অনুপাত হচ্ছে পাহাড়ি ৫১ শতাংশ আর বাঙালি ৪৯ শতাংশ। পাহাড়ি অঞ্চলে দিন দিন বাঙালি অনুপাতিক হারে বাড়ছে। ফলে আদিবাসীদের নিজস্ব সংস্কৃতি, ভাষা ও স্বকীয়তা হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে।
চুক্তিমতে, ১৯৯৮ সালে আঞ্চলিক পরিষদ গঠন করা হলেও আঞ্চলিক পরিষদের কার্যপ্রণালি বিধি চুক্তির এক যুগ পার হলেও এখনো গঠন করা হয়নি। ২০০০ সালে অঞ্চলিক পরিষদ থেকে সরকারের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল যে কার্যপ্রণালি বিধি কী হবে? কথা ছিল সরকার এ-সম্পর্কিত পরামর্শ প্রদানের মাধ্যমে ফেরত পাঠাবে, কিন্তু এখনো তা করা হয়নি। ফলে আঞ্চলিক পরিষদ যে উদ্দেশ্যে গঠন করা হয়েছিল, তা কোনো ধরনের ভূমিকাই পালন করতে পারছে না।
স্থানীয় সরকার পরিষদ, যেটি ১৯৮৯ সালে তৈরি করা হয়েছিল, সেটির সংশোধনী আনা হয়েছে। কিন্তু জেলা পরিষদ দাবি করছে, আইনে আঞ্চলিক পরিষদের কথা উল্লেখ নেই। তাই আঞ্চলিক পরিষদের সমন্বয়ের দায়বদ্ধতা তাদের নেই। ১৯৯৮ সালে আইনের ১৬(ক) ধারা সংযোজন করে জেলা পরিষদের যে মূল কাঠামো ছিল, তাতে পরিবর্তন এনে অন্তর্বর্তীকালীন পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট আঞ্চলিক পরিষদ গঠন করা হয়েছিল। দেখা গেছে, যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে, তাদের নির্বাচিত ব্যক্তিরাই সেই পরিষদের সদস্য হচ্ছেন। দলের মনোনীত হন বলে তাঁরা পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের অধিকার আদায়ে সচেষ্ট ভূমিকা পালন করতে পারছেন না। ফলে জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদের মধ্যে কোনো সমন্বয় হচ্ছে না। আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান বারবার বৈঠক ডাকার পরও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানরা সেসব বৈঠকে উপস্থিত হননি।
সরকারের পক্ষ থেকে যেহেতু কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা এখনো পাওয়া যায়নি, তাই আঞ্চলিক ও জেলা পরিষদের মধ্যে সমঝোতা হচ্ছে না। জেলা পরিষদগুলোতে পাঁচ বছর অন্তর নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও প্রায় ২০ বছর হয়ে গেছে পরিষদগুলোতে কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। জেলা পরিষদগুলো গঠনের মূল উদ্দেশ্য ছিল, পার্বত্য অঞ্চলে যে ১১টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী আছে, তাদের নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা, তাও সম্ভব হচ্ছে না।
যারা অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু ও ভারত-প্রত্যাগত শরণার্থী আছেন, তাঁদের ভূমি-সমস্যা সমাধানের জন্য সম্প্রতি চতুর্থবারের মতো টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। কিন্তু তাঁদের কার্যপরিচালনার বিধি এখনো তৈরি করা হয়নি। টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান নিয়োগ সবই হয়েছে, কিন্তু কোনো অগ্রগতি হচ্ছে না। পাশাপাশি ভূমি কমিশন গঠন করে ২০০১ সালে ভূমি নিষ্পত্তি কমিশন আইন করা হয়েছে। চুক্তিমতে, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে যেকোনো আইন করতে হলে আঞ্চলিক পরিষদগুলোর সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। কিন্তু কোনো আলোচনা ছাড়াই তাড়াহুড়া করে যে আইনটি করা হয়, তা চুক্তির সঙ্গে ১৯টি বিষয়ে সাংঘর্ষিক।
সম্প্রতি গণমাধ্যমে বিষয়গুলো উঠে আসায় ২২ তারিখে এক বৈঠকে আলোচনায় মূল যে বিষয়গুলো চুক্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক, সেগুলো পরিবর্তন করার কথা বলা হয়েছে। এটি একটি ইতিবাচক দিক। আর যতক্ষণ পর্যন্ত চুক্তির সব বিষয় বাস্তবায়ন করা না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত আশঙ্কা রয়েই যাচ্ছে।
সম্প্রতি কমিশনের ভূমি জরিপ নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। ভূমি কমিশন গঠনের ছয় মাসের মধ্যে কমিশনের বিধিমালা প্রস্তুত করার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত তা করা হয়নি। ভূমি জরিপ আগে হবে, না পরে হবে, সে বিষয়ে ভূমি কমিশনার তাঁর একক মন্তব্য পেশ করছেন, যা পাহাড়ি জনগণের মধ্যে আশঙ্কা ও উৎকণ্ঠার সৃষ্টি করছে।
আব্দুল কাইয়ুম
পার্বত্য অঞ্চলে লক্ষাধিক পরিবার এখনো উদ্বাস্তু। নিজ দেশে পরবাসী হয়ে আছে পাহাড়িরা। তাদের সমস্যা সমাধানে সরকারের উদ্যোগী ভূমিকা প্রয়োজন। আলোচনার এ পর্যায়ে জনসংহতি সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক ও খাগড়াছড়ি হেডম্যান সমিতির সভাপতি শক্তিপদ ত্রিপুরাকে অনুরোধ করছি বলার জন্য।
শক্তিপদ ত্রিপুরা
পাবর্ত্য চট্টগ্রামের যে রাজনৈতিক সমস্যা, তা সমাধানের লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চুক্তি করা হয়েছিল। চুক্তি সম্পাদনের জন্য তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। পাশাপাশি চুক্তির মৌলিক বিষয়গুলো বাস্তবায়ন না হওয়ায় দুঃখ প্রকাশ করছি। বর্তমান সরকার তার নির্বাচনী অঙ্গীকারে চুক্তি সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়নের কথা বলেছিল। সরকার গঠনের পর তারা বারবার বলেছে, চুক্তি সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন করবে। বর্তমান সরকারের মেয়াদ দুই বছরের কাছাকাছি। চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিছু উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। যেমন—টাস্কফোর্স গঠন, ভূমি কমিশন গঠন, কিছু সেনাক্যাম্প প্রত্যাহার করলেও চুক্তির মৌলিক বিষয়গুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের উল্লেখযোগ্য কোনো ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না।
আজকের আলোচনায় দুটি বিষয় উঠে এসেছে। প্রথমত, চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাধাগুলো কী কী এবং দ্বিতীয়ত কীভাবে চুক্তিটি দ্রুত বাস্তবায়ন করা যায়। চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় বাধা হচ্ছে, বর্তমান সময়ে সরকারের কর্মকাণ্ডের যে অগ্রাধিকার তালিকা রয়েছে, এর মধ্যে চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়টি নেই। যেকোনো সমস্যা সমাধানের জন্য সরকারের দৃঢ়প্রতিজ্ঞার প্রয়োজন। এ মুহূর্তে পাবর্ত্য চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ নয়। যেমন—যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়টি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকার উদ্যোগী ভূমিকা পালন করছে, তেমনি পার্বত্য শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের উদ্যোগের অভাব রয়েছে। সরকারের বিশেষ অংশ বা আমলারা চাইছেন না, পাবর্ত্য চুক্তি বাস্তবায়ন হোক অতিদ্রুত। তাঁরা সরকারকে বাধাগ্রস্ত করছেন চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে।
সরকারের চুক্তি বাস্তবায়নে অনীহার পাশাপাশি চুক্তিবিরোধার্থক কিছু কার্যক্রম আমরা দেখতে পাচ্ছি। যেমন—ভূমি কমিশনের বিতর্কিত ভূমিকা পালন। চুক্তিতে স্পষ্ট করে উল্লেখ আছে, ভূমি জরিপ কীভাবে করা হবে। অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু, শরণার্থী ও অন্যান্য যে ভূমিবিরোধ রয়েছে, সেগুলো নিষ্পত্তি করার পরই সরকারের আঞ্চলিক পরিষদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে ভূমি জরিপ করার কথা। কিন্তু ভূমি কমিশনের চেয়ারম্যান দায়িত্ব নেওয়ার পরই ভূমি জরিপের ঘোষণা দিলেন। এ ধরনের কমিশনের কর্মকর্তা ও আমলাদের চুক্তিবিরোধী কার্যক্রম পরিলক্ষিত হচ্ছে।
পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠিত হয়েছিল। এই চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করার কথা মন্ত্রণালয়ের। কিন্তু বারবার আমরা দেখছি, মন্ত্রণালয় চুক্তিবিরোধী কার্যক্রম পরিচালনা করছে। চুক্তিমতে, আদিবাসীদের ও অগ্রজ বাসিন্দাদের সার্টিফিকেট দেওয়ার ক্ষেত্রেও চূড়ান্তভাবে স্থানীয় সরকারপ্রধানদের থাকার কথা। কিন্তু মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, জেলা প্রশাসকের (ডিসি) পাশাপাশি স্থানীয় সরকারপ্রধান এই সার্টিফিকেট দেবেন। সম্প্রতি মন্ত্রণালয় থেকে এও বলা হচ্ছে, আদিবাসী শব্দ ব্যবহার করা যাবে না, উপজাতি শব্দ ব্যবহার করতে হবে। পাবর্ত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এ ধরনের চুক্তিবিরোধী কার্যক্রম আমরা দেখতে পাই।
কীভাবে চুক্তি দ্রুত বাস্তবায়ন করা যায়, সে বিষয়ে কিছু প্রস্তাব দিতে চাই। প্রথমেই সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রয়োজন চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য। সরকারের কার্যক্রমের তালিকায় চুক্তির বিষয়টি নিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে চুক্তি বাস্তবায়নে অগ্রণী বা মূল ভূমিকা পালন করতে হবে।
আমাদের দেশে কোনো সমস্যারই সমাধান প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ ছাড়া হয় না। তাই প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ ও বলিষ্ঠ ভূমিকা কামনা করছি পাবর্ত্য চুক্তি দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য। চুক্তিমতে, ভূমি কমিশনের আইন সংশোধন করতে হবে, পরবর্তীকালে ভূমি জরিপ করতে হবে। আঞ্চলিক পরিষদ ও পার্বত্য আঞ্চলিক কাউন্সিল করতে হবে। আঞ্চলিক পরিষদ ও পার্বত্য আঞ্চলিক কাউন্সিলকে তাদের ক্ষমতা বুঝিয়ে দিতে হবে। পার্বত্য অঞ্চলের ৩৩টি বিভাগের দায়িত্ব তাদের হাতে হস্তান্তর করতে হবে।
আঞ্চলিক পরিষদের বিধিমালা প্রণয়ন করা দরকার। অস্থায়ী সেনাক্যাম্পাসগুলো প্রত্যাহার করতে হবে। এসব কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে সরকারকে পার্বত্য শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আন্তরিক ভূমিকা পালন করতে হবে। আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিতে সরকারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। হিল ট্র্যাক্টস ম্যানুয়ালকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিতে হবে। আদিবাসীদের ভূমি অধিকার, নিজস্ব সংস্কৃতি ও ভাষাগত অধিকারের যে দাবি উঠেছে, তা বাস্তবায়নে সরকারের হস্তক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি।
আব্দুল কাইয়ুম
আদিবাসীদের জীবন ও তাদের সমস্যা সমাধানে সাংবিধানিক স্বীকৃতির বিষয়ে এখন বলবেন বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং।
সঞ্জীব দ্রং
সময় আসলে বয়ে যায়। আমরা অপেক্ষা করছি, কখন পার্বত্য শান্তিচুক্তি সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন করা হবে। আদিবাসী পাহাড়ি মানুষের দুঃখ, কষ্ট, বঞ্চনা চির অবসান করার অঙ্গীকার করেছিলেন বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাঁর নির্বাচনী ইশতেহারে। প্রশ্ন, সময় চলে যাচ্ছে, সরকারের পক্ষ থেকে কিন্তু চুক্তি বাস্তবায়নের তেমন কোনো উদ্যোগ আমরা দেখছি না। সরকার যদি চিন্তা করে, শুধু মুখে বাস্তবায়নের কথা বলে কালক্ষেপণ করবে, সময় পার করবে; বোকা আদিবাসী পাহাড়ি মানুষ শুধু তাদের অধিকারের কথা বলেই যাবে, আর তাদের আশা দিয়ে যাবে। সরকার সময় অতিবাহিত করবে। আবার আদিবাসীদের মধ্যে যেমন পাহাড়ি আদিবাসী ও সমতলের মধ্যে নতুন কিছু সমস্যা ঢুকিয়ে দিয়ে তাদের নিজেদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি করবে। নির্দিষ্ট একটা সময় পার হওয়ার পর চুক্তি বাস্তবায়ন করার আর প্রয়োজন হবে না। এ রকম মনোভাব যদি সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলো চিন্তা করে থাকে, তবে এর চেয়ে বড় ভুল আর হবে না।
চুক্তির ১২ বছর পার হয়ে গেছে। এভাবে আরও অনেক দিন পার হবে চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য। সরকার যদি ভাবে যে আদিবাসীদের ঠকাবে, প্রকৃত অর্থে সরকার নিজেই ঠকবে, নিজের সঙ্গে নিজেই প্রতারণা করবে। সরকারের উচ্চপর্যায়ের সঙ্গে জনসংহতি সমিতিসহ আরও যেসব পাহাড়ি সংগঠন রয়েছে, তাদের নিয়ে আলোচনার আয়োজন করা জরুরি। চুক্তি স্বাক্ষরের আগে যুদ্ধাবস্থায় পাহাড়িদের হেলিকপ্টারে করে শহরে নিয়ে এসে ১৯-২০ বার বৈঠক করেছিল সরকার। তাহলে বর্তমানে চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আলোচনার উদ্যোগ নিতে কেন সরকার বিলম্ব করছে। জনগণ ও নাগরিক সমাজকে সচেতন হতে হবে তাদের অধিকার আদায়ের জন্য।
পার্বত্য অঞ্চলের পাঁচজন সাংসদের মধ্যে যে তিনজন নির্বাচিত সাংসদ আছেন, তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে সরকারকে আলোচনার টেবিলে আনার জন্য। আদিবাসীদের অধিকার তুলে ধরতে হবে সরকারের কাছে। সাংসদদের সুশীল সমাজ ও জনগণকে সঙ্গে নিয়ে মতৈক্য গড়ে তুলতে হবে।
পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন হচ্ছে না, কিন্তু নতুন নতুন প্রকল্প সেখানে দেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি রাঙামাটিতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় করার প্রস্তাব রয়েছে। আমরা পাহাড়িরা নিশ্চয়ই সেটি চাই। কিন্তু এখন নয়। কারণ, পাহাড়ির মানুষ এখনো তৈরি হয়নি এ ধরনের বড় প্রকল্প গ্রহণের জন্য। আমরা জানি উন্নয়ন ভালো, কিন্তু এতে অনেক সময় মানুষের ক্ষতিও হয়। আপনাদের উন্নয়নের নামে আরেক অংশ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। কাপ্তাই বাঁধের ক্ষেত্রে আমরা তা দেখেছি। পাহাড়ি মানুষের ও আঞ্চলিক পরিষদের সঙ্গে আলোচনা না করেই নতুন নতুন প্রকল্প দেওয়া হচ্ছে। তা উদ্বোধন করতে যাচ্ছেন। এতে পাহাড়িরা বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সরকার একদিকে চুক্তি বাস্তবায়ন করছে না, অন্যদিকে সরকারের ক্ষমতা প্রদর্শন করছে। ব্রিটিশ আমল থেকে ঔপনিবেশিক সরকারের মতো যদি বর্তমান সরকারগুলো আচরণ করে, আমি মনে করি, সরকারের সাংঘাতিক ভুল হবে। আমার মতামত হচ্ছে, সরকারের মধ্যে একটি আত্মতুষ্টি ও আত্মঅহংকার চলে এসেছে, ভবিষ্যতে এই সরকারের মনোভাব হয়তো পরিবর্তন হবে না। বর্তমান সরকারের দুই বছর পার হয়ে যাওয়ার পরও এখন পর্যন্ত জনসংহতি সমিতির সভাপতির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর কোনো বৈঠক হয়নি। চুক্তি করার সময় দুই পক্ষের চমৎকার যে সম্পর্ক ছিল, তা অনেকটা ম্লান হয়েছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, যেহেতু তিনি পার্বত্য শান্তিচুক্তি করেছেন, এর বাস্তবায়নও করবেন। আমরা তাঁর কথায় বিশ্বাস রাখতে চাই। আশা করি, তিনি তাঁর কথার প্রতিফলন ঘটাবেন দ্রুত চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে।
আব্দুল কাইয়ুম
সরকারের উচ্চপর্যায়ের সঙ্গে পার্বত্য অঞ্চলের নেতাদের বৈঠক অত্যন্ত জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আলোচনার মাধ্যমে চুক্তি বাস্তবায়নের সমস্যাগুলো কী, তা চিহ্নিত করে সমাধানে দুই পক্ষের সমঝোতার মাধ্যমে দ্রুত উদ্যোগ নিতে হবে পার্বত্য শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের জন্য। চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাস্তবিক সমস্যাগুলো কী কী, সে বিষয়ে বলবেন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপমন্ত্রী মণিস্বপন দেওয়ান।
মণিস্বপন দেওয়ান
আমি বর্তমানে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত নই। তাই আমার মতামত সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত। আমি যখন উপমন্ত্রী ছিলাম, তখন পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে আমি কী করতে পেরেছি, তা আপনারা জানেন। বাংলাদেশে বর্তমানে যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি চলছে, সেখানে যেহেতু পার্বত্য চুক্তিটি আওয়ামী লীগ করেছিল, তাই পরবর্তী সময়ে বিএনপি তার বিরোধিতা করেছিল। আমি তখন পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলাম এবং পার্বত্য শান্তিচুক্তিকে টিকিয়ে রেখেছিলাম।
পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা শুধু পার্বত্য অঞ্চলের পাহাড়িদের সমস্যা নয়, এটি গোটা বাংলাদেশের সমস্যা। এ সমস্যা যদি এখনই দ্রুত সমাধান করা না হয়, তবে যতটা না পাহাড়িরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তার চেয়ে বেশি গ্রতিগ্রস্ত হবে জাতি হিসেবে বাংলাদেশের সব মানুষ। বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে সবকিছুই খুব দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে।
জলবায়ুগত পরিবর্তনের ফলে গোটা বিশ্বের অর্থনীতির একটি আমূল পরিবর্তন হচ্ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি, বন্যা, ঝড় ইত্যাদির কারণে অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক পরিবর্তন হচ্ছে, যার দরুন বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর মধ্যে একটি প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হয়েছে। ফলাফল হিসেবে ইরাকে হামলা, আফগানিস্তানে যুদ্ধ ইত্যাদি বিষয় আমরা দেখেছি। তবে আজকে চীন, আমেরিকা ও ভারতের মধ্যে যে প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হয়েছে, সেখানে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে অত্যন্ত হুমকির মধ্যে রয়েছে। প্রাকৃতিক সম্পদগুলো কিন্তু সমতলে ফুরিয়ে যাচ্ছে। এখন প্রাকৃতিক সম্পদগুলো চলে আসছে গভীর সমুদ্র ও পাহাড়ি অঞ্চলে। সুতরাং এই আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর দেশগুলো বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর গভীর সমুদ্র ও পাহাড়ি অঞ্চল লক্ষ করে এশিয়ান হাইওয়ের মতো বিভিন্ন প্রস্তাব নিয়ে আসছে।
অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের মতো বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলে বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানি প্রবেশ করবে প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের জন্য। সরকারের এসব বিষয়ে সতর্ক হওয়া উচিত। পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা যদি এখনই সমাধান করা না হয়, এ সমস্যাগুলো রেখে দেওয়া হয়, তবে পরাশক্তিগুলোর ‘লুক ইস্ট’ পলিসির অংশ হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা ভবিষ্যতে আরও বৃহৎ আকারে দেখা দেবে। বিশ্বের অন্যান্য দেশ কিন্তু অতি দ্রুত এসব ভূমিজনিত আদিবাসী সমস্যাগুলো সমাধান করছে। বাংলাদেশে পার্বত্য অঞ্চলে অনারোহিত প্রাকৃতিক সম্পদকে আমাদের অর্থনীতির সঙ্গে যোগ করতে চাই, তবে যত দ্রুত সম্ভব পার্বত্য অঞ্চলের সমস্যা সমাধানে সরকারকে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করতে হবে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে। সময় যত দীর্ঘায়িত হবে, তত বেশি ক্ষতিগ্রস্তদের সংখ্যা বাড়তে থাকবে।
বর্তমানে জনসংহতি সমিতি কয়েকটি ভাগে বিভক্ত। যত সময় যাবে, তত দলগুলোর বিভক্তির পরিমাণ বাড়বে এবং আলোচনার টেবিলে সমঝোতার জন্য তাদের আনা কঠিন হয়ে যাবে। পার্বত্য অঞ্চলের সমস্যা জিইয়ে রেখে বাঙালি কিংবা পাহাড়িরা কেউই লাভবান হচ্ছে না। ১৯৭৯-৮০ সালে বাঙালিদের নিয়ে পাহাড়ে স্থায়ী বসবাসের ব্যবস্থা করা হয়েছিল, তার উদ্দেশ্য ছিল পাহাড়িদের দুর্বল করা এবং তাদের আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসা। বিশেষ করে নাইন-ইলেভেনের পর বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে মুসলমান-অধ্যুষিত অঞ্চলের যে দ্বন্দ্ব চলছে, তাতে সন্দেহ থেকে যায় সন্ত্রাসী দল জাগ্রত হওয়ার। যদি ধরা যাক, পার্বত্য অঞ্চলে পাহাড়ি দলগুলো দুর্বল হয়ে গেলে এবং মুসলিম বাঙালির সংখ্যা যদি অত্যধিক বেড়ে যায় এবং পাহাড়ি জীবনযাপনে তারা অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, তাহলে ভবিষ্যতে পাহাড়ি দুর্গম অঞ্চলে জঙ্গিবাদের ঘাঁটি ও প্রশিক্ষণক্যাম্পের অভ্যুত্থান ঘটতে পারে। যদি পাশের দেশ ভারত ও মিয়ানমারের বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপের সঙ্গে তাদের সম্পর্কে গড়ে ওঠে, সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও ভারতের উভয়ের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা দেখা দেবে, যা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রের নিরাপত্তার প্রশ্নে পরাশক্তিগুলোর আক্রমণের শিকার হতে পারে। সুতরাং কোনো আন্তর্জাতিক চক্রান্তের শিকার যাতে পার্বত্য চট্টগ্রাম না হয়, সে জন্য এ মুহূর্তে সরকারকে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেওয়া উচিত। না হলে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদও নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
পার্বত্য সমস্যা সমাধানে সরকারের পাশাপাশি আঞ্চলিক নেতাদের এগিয়ে আসতে হবে। জনগণের মধ্যে এ বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টিতে এগিয়ে আসতে হবে। রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তন করতে হবে। দল-মতনির্বিশেষে সবার মতৈক্যই পারে পার্বত্য সমস্যা সমাধানে চুক্তি বাস্তবায়ন করতে।
আব্দুল কাইয়ুম
গণতন্ত্রের উন্নয়নের জন্য রাজনৈতিক মতবিরোধ দূর করে জাতীয় স্বার্থে মতৈক্যের ভিত্তিতে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে এগিয়ে আসা উচিত। পার্বত্য চট্টগ্রাম কমিশনের সদস্য স্বপন আদনানকে বলার জন্য অনুরোধ করছি।
স্বপন আদনান
পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য সরকার প্রয়োজনীয় আইন বা বিধান প্রণয়ন ও প্রয়োগ করেনি এখনো। এতে চুক্তির মাধ্যমে যে প্রতিষ্ঠানগুলো স্থাপিত হয়েছে, সেগুলো সম্পূর্ণভাবে কাজ করতে পারছে না। এখানে রাষ্ট্রীয়ভাবে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব দেখা গেছে বিগত দিনে। দেশে প্রচলিত আইনগুলো যথাযথভাবে প্রয়োগ নিশ্চিত করা হচ্ছে না। যেমন—জেলা পরিষদ আইনের ৬৪ ধারায় বলা হয়েছে, ভূমি হস্তান্তর করা যাবে না কোনোভাবেই জেলা পরিষদের সম্মতি ছাড়া। এ বিধানটি কাগজে-কলমে থাকলেও এটি পাশ কাটিয়ে যাওয়া হচ্ছে নানাভাবে। পুরো বিষয়টি ডিসি অফিস কর্তৃক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হচ্ছে। সর্বশেষে ফাইলটি জেলা পরিষদে পাঠানো হচ্ছে। ফলে জেলা পরিষদের সম্মতি থাক বা না থাক কাজগুলো সম্পন্ন হচ্ছে। অন্যদিকে অনেকটা গায়ের জোরে জমিজমা হস্তান্তর হয়ে যাচ্ছে আইন থাকা সত্ত্বেও।
চুক্তি অনুযায়ী, পার্বত্য অঞ্চলে সরকারের যেসব আইন করার কথা, সেগুলো করতে হলে আঞ্চলিক পরিষদের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। আমরা ভূমি কমিশনের আইন ও সমস্যাগুলো দেখলে বুঝতে পারি, সরকার আঞ্চলিক পরিষদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই আইনগুলো করছে। চুক্তি বাস্তবায়িত হোক বা না হোক প্রতিনিয়ত পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে যাচ্ছে। যেসব কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামে সংঘাত হয়েছিল। যেমন—জাতিগত সংঘাত, বিদ্রোহী দমন, ভূ-প্রক্রিয়া ইত্যাদি কিন্তু চুক্তির পরও অব্যাহত রয়েছে। পার্বত্য অঞ্চলে বাইরে থেকে লোক অনুপ্রবেশ বন্ধ হয়নি, পাহাড়িদের ব্যক্তিগত কিংবা গোষ্ঠীগত ভূমি, জোর-দখল করা কিন্তু চলছে বেআইনিভাবে। ফলে সমস্যাগুলো বেড়েই চলছে।
বর্তমানে বাঙালি ভূমিদস্যুরা পার্বত্য অঞ্চলে শুধু পাহাড়িদের নয়, বাঙালিদের জমিও দখল করছে। ফলে ভূমিবণ্টনে একটি বৈষম্য দেখা দিচ্ছে। এটি অনবরত চলতে থাকলে তার ওপর একটি সামাজিক, রাজনৈতিক প্রভাব পড়াই স্বাভাবিক। যে প্রক্রিয়াগুলোর কারণে সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিল, সে প্রক্রিয়াগুলো অব্যাহত থাকার ফলে এ সমস্যাগুলো আরও সংকটময় করে তুলছে বর্তমান পরিস্থিতিকে। কোনো বাঙালি সরকারপ্রধানই পাহাড়িদের জমিগুলো দখলকারী বাঙালিদের কাছ থেকে তাদের ফিরিয়ে দিতে যাবে না। কারণ, যদি তারা তা করতে চায়, তবে পাহাড়ে বসবাসরত বাঙালিসহ বাঙালি জাতীয়তাবাদের যে সংকীর্ণ একটি গণ্ডি আছে, তাদের সমর্থন কিন্তু সে সরকার হারাবে। সেই সৎসাহস আমাদের রাজনীতিবিদদের আছে কি না, সে বিষয়ে সন্দেহ রয়ে যায়। আমার মতে, এটিই মূল বাধা হিসেবে কাজ করছে চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য।
চুক্তির বাইরে বিশ্বের সমাজ, রাজনীতি যেভাবে বদলে যাচ্ছে, এতে ক্রমেই এ চুক্তিটি অবান্তর ও অপ্রযোজ্য হয়ে যেতে পারে ভবিষ্যতে। চুক্তির চেয়েও গভীর কিছু বিষয় ও অন্তরায় আছে, সেদিকে নজর দেওয়া খুব জরুরি। কিন্তু এ ব্যাপারে জাতীয় স্বার্থ ও বুদ্ধিবৃত্তিক উদ্যোগ নেই। কিছুদিন আগে আর্মড ফোর্সেস ডিভিশন, তাঁদের স্ট্র্যাটেজিক ম্যানেজমেন্ট ফোরাম করার একটি উদ্যোগ নিয়েছে বলে পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে। যদি এর প্রস্তাবগুলো সত্যিই বাস্তবায়ন করা হয়, তাহলে সমস্যা বাড়বে। শান্তিচুক্তিতে বলা হয়েছে, অস্থায়ী সেনাক্যাম্প প্রত্যাহার করা হবে। সেখানে এটি বাস্তবায়িত হলে পার্বত্য অঞ্চলে আবারও সেনা কর্তৃত্ব প্রতিস্থাপিত হবে।
ভূমি কমিশন বর্তমানে পাহাড়িদের নোটিশ দিচ্ছে। একতরফাভাবে তারা ভূমিবিরোধ মামলার নিষ্পত্তি করবে। এতে পাহাড়িদের জমি যারা দখল করেছে, তারাই শেষে আইনি কাগজ নিজেদের পক্ষে পেয়ে যাবে। এতে পার্বত্য চুক্তির বিরোধার্থক কার্যক্রম পরিচালনা করছে বর্তমানে ভূমি কমিশন।
সবশেষে বলতে চাই, সরকার আলোচনার মাধ্যমে চুক্তি সংশোধনের প্রেক্ষাপটও তৈরি করতে পারে। এসব বিষয় নিয়ে গভীর ভাবনা ও অব্যাহত আলোচনার প্রয়োজন। পার্বত্য অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কার্যত স্থিতিশীল রাজনৈতিক ও অবকাঠামোর উন্নয়ন দরকার। পার্বত্য অঞ্চলে সংঘর্ষ চলতে থাকলে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থে কোনো প্রকার লাভ হবে না।
আব্দুল কাইয়ুম
পার্বত্য অঞ্চলে অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অত্যন্ত জরুরি। যেসব বাঙালি অধিবাসী দীর্ঘদিন ধরে সেখানে আছে, তাদেরও সমস্যা রয়েছে। পার্বত্য চুক্তির ১২ বছর পর এখন সেখানে অনেকটা শান্তিপূর্ণ পরিবেশ থাকলেও মাঝেমধ্যে সংঘাত দেখা যায়। পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে পার্বত্য অঞ্চলের আদিবাসী ও বাঙালিদের কী ভূমিকা পালন করা উচিত, সে বিষয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম সম-অধিকার আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক মো. জাহাঙ্গীর কামালকে বলতে অনুরোধ করছি।
মো. জাহাঙ্গীর কামাল
পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রথমে প্রয়োজন স্থানীয় পাহাড়ি ও বাঙালিদের নিয়ে আরও অনেক আলোচনার আয়োজন করা। শুধু আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। সংঘাত-সংঘর্ষ দিয়ে কখনো সম্ভব নয়। বিভিন্ন আলোচনায় আমাদের সংগঠনের পক্ষে থেকে বলেছি, শান্তিচুক্তিটি আমরা মেনে নেব, যদি চুক্তির কিছু সাংঘর্ষিক ধারার পরিবর্তন এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের সব সম্প্রদায়ের অধিকার সংরক্ষণ করে বাস্তবায়ন করা হয়। চুক্তির সুফল আদায়ের জন্য এগিয়ে যেতে হবে সবাইকে।
সরকারের উচ্চপর্যায়ের নেতারা ও কর্মকর্তারা দু-এক দিনের সংক্ষিপ্ত সফরে গিয়ে পার্বত্য অঞ্চলের সমস্যাগুলো গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারেন না। পার্বত্য অঞ্চলে ২৫টি উপজেলা রয়েছে, যা বাংলাদেশের আয়তনের ১০ ভাগের এক ভাগ। সেখানে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী যে অতিকষ্টে জীবন যাপন করছে, তাদের জীবনযাত্রা সম্পর্কে জানতে পারছেন না। কিন্তু তাঁরা সেখানে সফরে গিয়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দিয়ে আসছেন। বাস্তবতার প্রেক্ষাপট কিন্তু অনেক ভিন্ন।
বাঙালিরা যে পাহাড়িদের জমি দখল করছে, এ অভিযোগ সত্য নয়। আসলে রাজনৈতিক সংস্কৃতির কারণে এসব কাদা ছোড়াছুড়ির মাধ্যমে রাষ্ট্রের কাছে এবং রাষ্ট্র পরিচালিত সেনাবাহিনী, পার্বত্য মন্ত্রণালয়, জেলা পরিষদ, আঞ্চলিক পরিষদের মতো সংস্থাগুলো অভ্যন্তরীণ কাদা ছোড়াছুড়ির ফলে এসব সমস্যা প্রকট হচ্ছে। বাস্তবিক পক্ষে সাধারণ পাহাড়ি উপজাতি ও বাঙালির কেউই আসলে প্রকৃত অর্থে লাভবান হচ্ছে না।
সঞ্জিব দ্রং বলছেন, এই মুহূর্তে পাহাড়িদের জন্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজন নেই, এ বিষয়ে আমি দ্বিমত পোষণ করছি। কারণ আমি দেখেছি, অনেক পাহাড়ি উপজাতি আছেন উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করার পর কর্মসংস্থানের অভাবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারছেন না। কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভাবে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে পারছেন না। এসব কারণে তাঁরা অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু হয়ে যাচ্ছেন। কর্মসংস্থানের অভাবে তাঁরা অস্ত্র হাতে তুলে নিচ্ছেন। কারণ, সেখানে কোনো শিল্প-কারখানা কিংবা শিল্পপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় আঞ্চলিক নেতারা আছেন, তাঁদের উদ্দেশে বলতে চাই, আপনারা শুধু পাহাড়িদের নেতা নন। আপনারা পার্বত্য অঞ্চলের সব ছোট জাতিগোষ্ঠী ও পাহাড়ি বাঙালিদেরও নেতা। আপনাদের পার্বত্য অঞ্চলের সবার দায়দায়িত্ব নিতে হবে, তাদের স্বার্থ ও অধিকার আদায়ে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। পার্বত্য তরুণ সমাজ হাতে অস্ত্র তুলে নিচ্ছে শুধু কর্মসংস্থানের অভাবের কারণে। তাই পার্বত্য অঞ্চলে অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে শিল্প-কারখানা প্রতিষ্ঠা করে অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা জরুরি। পার্বত্য অঞ্চলের সমস্যা সমাধানে পাহাড়ি, বাঙালিসহ সক ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী একত্র হয়ে মতৈক্য গড়ে সরকারের কাছে নিজের অধিকার তুলে ধরে তা আদায়ের জন্য এগিয়ে যেতে হবে।
পার্বত্য অঞ্চলের জেলা পরিষদের নির্বাচনের আয়োজন করার মাধ্যমে সব জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। ১৯৯২ সালের পর থেকে জেলা পরিষদের কোনো নির্বাচন হয়নি। বর্তমানে সরকারের মনোনীত ব্যক্তিরা জেলা পরিষদ পরিচালনা করছে, তাদের জবাবদিহি বলে কিছু নেই। জেলা পরিষদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। বিভিন্ন দাতা সংস্থা সেখানে উদ্দেশ্যমূলকভাবে নিজস্ব কার্যক্রম পরিচালনা করছে, সে ব্যাপারে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে সবার। ভূমি কমিশনের বিতর্কিত কার্যক্রমের ব্যাপারে সব পক্ষের আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে।
আব্দুল কাইয়ুম
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষক আমেনা মহসীনকে অনুরোধ করব বলার জন্য।
আমেনা মহসীন
আমি খুব খুশি হতাম, যদি চুক্তিতে উল্লেখ থাকত, পার্বত্য চট্টগ্রাম আদিবাসী-অধ্যুষিত এলাকা। কিন্তু চুক্তিতে কৌশলগতভাবে বলা হয়েছে, পার্বত্য চট্টগ্রাম উপজাতীয় এলাকা। যদি আদিবাসী কথাটি চুক্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকত, তবে পার্বত্য অঞ্চলের মানুষ সরাসরি ভূমি অধিকারসহ অন্যান্য অধিকার পেয়ে যেত। সম্প্রতি সরকার ঘোষণা করেছে, বাংলাদেশে কোনো আদিবাসী নেই। আদিবাসী শব্দটি যেন ব্যবহার না করা হয়। পাহাড়ি আদিবাসীদের একটি দাবি ছিল যে তারা একটি আলাদা জাতি। তখন তারা জুম্ম জাতি হিসেবে পরিচিতি পেতে চেয়েছিল। তখন এ ধরনের একটি বিভাজন সৃষ্টি করা হয়েছিল যে বাংলাদেশে একটি জাতি আছে এবং কিছু উপজাতি আছে। চুক্তিতে আদিবাসী ও উপজাতির বিষয়টি পরিষ্কার করা উচিত ছিল। প্রথমত, চুক্তিটি করার পর বাস্তবায়িত হচ্ছে না। কারণ চুক্তিতে কাঠামোগত কিছু সমস্যা আছে। যেমন—চিটাগাং হিল ট্র্যাক্টস ম্যানুয়ালের একটি সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রয়োজন। আবার যদি এটির সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়, সে ক্ষেত্রে চুক্তি-পরবর্তী যেসব প্রতিষ্ঠান পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়, জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদ, এগুলোর কাঠামোগত গঠন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে যাবে। সিএইচটি ম্যানুয়ালে ডিসিকে সব ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। যদি ম্যানুয়াল ও চুক্তিটির সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়, তবে অবশ্যই সাংঘর্ষিক কিছু বিষয়ে আগে সংশোধনী আনতে হবে। পাহাড়ে বসবাসকারী বাঙালিদের সমস্যা বিষয়ে চুক্তিতে কোনো উল্লেখই নেই। তাই ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য অবশ্যই পাহাড়ি বাঙালিদের বিষয়টি আলোচনার মাধ্যমে চুক্তির অন্তর্ভুক্ত করে সমাধান করতে হবে। পাহাড়িদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি পেতে হলে অবশ্যই আগে চুক্তিটির সাংঘর্ষিক বিষয়গুলো সংশোধন করতে হবে। তা না হলে সাংবিধানিক স্বীকৃতি পেলেও চুক্তিটি বাস্তবায়ন করা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
চুক্তি অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন করা হলেও সেটি সব সময়ই রাখা হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর অধীনে, আগে যেমন ছিল বিশেষ কার্যাদি বিভাগ। অর্থাৎ গঠনের মূল উদ্দেশ্য ছিল মন্ত্রণালয় ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। কিন্তু আমরা সব সময়ই দেখেছি, এটি সরকারের কেন্দ্রীয় ক্ষমতার মধ্যে কুক্ষিগত করে রাখা হয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম বর্তমানে প্রচণ্ড সংকটপূর্ণ অবস্থায় আছে। কারণ পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন আঞ্চলিক সংগঠনগুলো কয়েক ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। জেএসএস, ইউপিডিএফসহ সব সংগঠন বহুভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে, যা চুক্তি বাস্তবায়নে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি দেখতে পাচ্ছি পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনীতিতে। আমাদের জাতীয় বড় দুটি রাজনৈতিক দল একে অপরকে দোষারোপ করে থাকে। তেমনি পার্বত্য অঞ্চলে জেএসএস ও ইউপিডিএফ একে অপরকে সন্ত্রাসী সংগঠন বলছে। পার্বত্য অঞ্চলে চাঁদাবাজি ও জমি দখল অত্যধিক বৃদ্ধি পেয়েছে।
এনজিওগুলো সম্পর্কে পাহাড়িদের বিরূপ মনোভাব রয়ে গেছে। অথচ তারা পাহাড়ি এলাকার উন্নয়নের বিরুদ্ধে নয়। তাদের আশঙ্কা, উন্নয়নের নামে বাইরে থেকে আরও লোক সেখানে আনা হবে। উন্নয়নের নামে পাহাড়িরা বিভিন্ন ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হবে—এই ভয় থেকে তারা উন্নয়নের বিরোধিতা করছে। এ ছাড়া পাহাড়িদের নিরাপত্তার প্রশ্নে সম্প্রতি সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে ‘স্ট্র্যাটেজিক ম্যানেজমেন্ট ফোরাম’ গঠন করার। প্রত্রিকায় এ সংবাদ বেরিয়েছে। এটি যদি বাস্তবায়িত হয়, তবে পার্বত্য অঞ্চল পুনরায় সেনাবাহিনীর কর্তৃত্বে চলে আসবে। একদিকে সেনাবাহিনীর অস্থায়ী ক্যাম্প প্রত্যাহারের কথা বলা হচ্ছে সরকারের পক্ষ থেকে, অন্যদিকে সেনা কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে। আমাদের দেশের একটি অঞ্চলকে পেছনে রেখে জাতীয় কোনো উন্নয়ন সম্ভব নয়। কারণ পার্বত্য অঞ্চলও বাংলাদেশের অংশ। তাদের সামনে এগিয়ে নিয়ে আসার জন্য সরকারের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
পার্বত্য চুক্তির আগের সময় সেখানে যে ব্যাপক গণহত্যা ও নারী ধর্ষণ হয়েছিল, সে বিষয়গুলো চুক্তিতে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। এসব ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসনের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই চুক্তিতে। পাহাড়িদের নিজস্ব সংস্কৃতিতে ব্যাপক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। পাহাড়িদের নিরাপত্তার জন্য একটি ‘মাল্টি এথনিক কমিউনিটি পলিসি’র প্রয়োজনীয়তা দেখা দিচ্ছে। সবার সমন্বিত যৌথ উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে পাহাড়ি ও বাঙালিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে পার্বত্য অঞ্চলে।
আব্দুল কাইয়ুম
আদিবাসীদের নিজস্ব সংস্কৃতি রয়েছে। সেসব রক্ষার জন্য কী করা উচিত, সে বিষয়ে হিল উইমেনস ফেডারেশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইলিরা দেওয়ানকে বলার জন্য অনুরোধ করছি।
ইলিরা দেওয়ান
বর্তমান সরকার নির্বাচনী অঙ্গীকারে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের কথা বলে পাহাড়িদের যে আস্থা অর্জন করেছিল, বর্তমানে সে আস্থায় চিড় ধরেছে সরকারের উদ্যোগহীনতার কারণে। বর্তমান সরকার যে চুক্তি সম্পাদন করেছিল ১৯৯৭ সালে, সে চুক্তি বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার মাধ্যমে আবার পাহাড়িদের আস্থা অর্জন করতে হবে সরকারকে। প্রশাসনের নিরপেক্ষতা অর্থাৎ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা যাঁরা আছেন, তাঁদের নিরপেক্ষ ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের জন্য। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন পুলিশ বিভাগে যেমন কার্যক্রম শুরু করেছে, তেমনি পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রশাসনিক কর্মকর্তারা উদ্যোগ নিতে পারেন নিরপেক্ষতা বজায় রাখার জন্য।
কিছুদিন আগে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী পার্বত্য অঞ্চলে গিয়ে ঘোষণা দিয়ে এসেছেন, আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর সন্ত্রাসী কার্যকলাপ বন্ধে ও চাঁদাবাজি রোধে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করা হবে। আমি মনে করি, পাহাড়ি জনগণ কখনো সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজিকে প্রশ্রয় দেয়নি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, শুধু আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি রোধের প্রশ্ন কেন? বিভিন্ন যে জঙ্গিঘাঁটি ও জঙ্গি তৎপরতার খবর পাওয়া যাচ্ছে, তাদের নির্মূলে অভিযান পরিচালনার কোনো ঘোষণা দেওয়া হয় না কেন? এ ছাড়া জঙ্গিনেতা যাঁরা ধরা পড়েছেন, তাঁরা রিমান্ডে স্বীকার করেছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে জঙ্গিদের অস্ত্র প্রশিক্ষণকেন্দ্র রয়েছে। তাহলে এসব জঙ্গি দমনে পার্বত্য অঞ্চলে সরকারের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
পার্বত্য অঞ্চলের নারীদের প্রতি সংঘাতময় যে আচরণ করা হয়েছিল তা এখনো চলছে, তা বন্ধে পার্বত্য অঞ্চলে নারী প্রতিনিধিত্ব অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে সংবিধানের যে সংশোধনীর প্রক্রিয়া চলছে, সেখানে আদিবাসীদের অধিকারের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে। সাংবিধানিক স্বীকৃতির মাধ্যমে পাহাড়ি নারীদের অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব।
সবশেষে বলতে চাই, প্রথমে পাহাড়িদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, পরবর্তী সময়ে তাদের সামাজিক অধিকার নিশ্চিত করার জন্য উদ্যোগ নিতে হবে। পার্বত্য অঞ্চলের সব রাজনৈতিক দল বর্তমানে চুক্তির বাস্তবায়ন চাইছে। এখন শুধু সরকারের আন্তরিকতা ও সদিচ্ছাই পারে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন করতে।
সুধাসিন্ধু খীসা
পার্বত্য চুক্তি এখনই যদি বাস্তবায়ন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়, তা হলেও অনেক সময় লাগবে। আর চুক্তিটি সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন করতে তো আরও সময়ের প্রয়োজন। অসুখের চিকিৎসা জরুরি, কিন্তু অসুধ অনেক দূরে, ছয় মাস লাগবে তা আনতে! পার্বত্য চুক্তির আজকের দিনে বয়স ১২ বছর সাত মাস ২৮ দিন।
বর্তমান সরকারের মেয়াদ প্রায় দুই বছর হয়ে গেছে, তবু সরকারের পক্ষ থেকে তেমন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না চুক্তি বাস্তবায়নে। চুক্তি মোতাবেক আজও ভূমি কমিশন আইন তৈরি করা হয়নি। যদি চুক্তি মোতাবেক ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি আইন তৈরি না করে ভূমি কমিশন কার্যক্রম শুরু করে, তবে তা চুক্তিবিরোধী হওয়াই স্বাভাবিক। বর্তমানে সরকার ভূমিবিরোধ-সম্পর্কিত যে সংশোধনীর উাদ্যোগ নিয়েছে, তাতে আমি আশাবাদী হতে পারছি না। কারণ, তারা জলে ভাসা জমির বিষয়ে এখনো মতৈক্যে পৌঁছায়নি। এ জমিগুলো হচ্ছে কাপ্তাই বাঁধে যেসব জমি শীতকালে পানি কমে গেলে ভেসে ওঠে, সেগুলো। পাহাড়িরা সেসব নিচু জমিতে চাষ করে থাকে। এ জমিগুলো সরকার অধিগ্রহণ করেছিল। তাহলে সেই জমির ওপর পাহাড়িদের আর অধিকার থাকছে না। তৎকালীন আইনমন্ত্রী বলেছিলেন, সে জমিগুলো ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। এসব জমি নিয়ে পাহাড়ি-বাঙালির সংঘাতের দায়ভার কে নেবে, এমন প্রশ্নে আইনমন্ত্রী তখন রাজি হলেও বিষয়টি এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত স্থানীয় বাসিন্দাদের নিয়ে ভোটার তালিকা করা সম্ভব হচ্ছে না। ভোটার তালিকা না হওয়ায় জেলা পরিষদ নির্বাচন হচ্ছে না। ফলে সরকার মনোনীত পাঁচ সদস্যের জেলা পরিষদ আজীবন চলতে থাকবে।
চুক্তিতে উল্লেখ ছিল, আঞ্চলিক পরিষদের সদস্যদের সুযোগ-সুবিধা প্রবিধান দ্বারা নিশ্চিত করা হবে। সরকারের কাছে প্রথমেই সেই প্রবিধান রচনা করে পাঠানো হলেও কখনই মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। বিগত আমলের কোনো সরকারই চুক্তির প্রতি শ্রদ্ধা ও আন্তরিকতা দেখায়নি, চুক্তির এক যুগ পার হওয়ার পরও। ১৯৭৯-৮০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম ম্যানুয়ালে একটি সংশোধনী এনে বলা হয়েছিল, কেউ ১৫ বছর পার্বত্য অঞ্চলে বসবাস করলে তিনি স্থায়ী বাসিন্দা হবেন। ফলে রাজনৈতিক কারণে যাঁদের পার্বত্য চট্টগ্রামে পুনর্বাসিত করা হয়েছিল, তাঁদের স্থায়ী বাসিন্দা করার জন্য চুক্তি বাস্তবায়নের সময়কে দীর্ঘায়িত করা হয়েছে। ভূমি কমিশন কার্যকর করা হচ্ছে না, ফলে চুক্তি বাস্তবায়ন বিলম্বিত হচ্ছে। অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের জায়গা স্থায়ী বাঙালি বাসিন্দারা দখল করে আছে।
গত ৫ জুলাই পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়েছে, পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন ও অভ্যন্তরীণ সংঘাত প্রতিরোধে ‘স্ট্র্যাটেজিক ম্যানেজমেন্ট ফোরাম’ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে একজন উপদেষ্টা কিংবা দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি স্ট্র্যাটেজিক ম্যানেজমেন্ট ফোরাম গঠন করা হবে, যাঁরা পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সব বিষয় বাস্তবায়নে কাজ করবেন। এ ছাড়া আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রম সেখানে পরিচালনা করতে দেওয়া হবে না। কারণ এসব দলের নিবন্ধন নেই। গণপ্রতিনিধিত্ব আইনে আছে, যদি কোনো রাজনৈতিক দল নিবন্ধিত না হয়, তবে ওই দলের প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করা যাবে না। কিন্তু এর মানে এই নয় যে সে দলগুলো রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে না। অথচ আইনের দোহাই দিয়ে বলা হচ্ছে, খাগড়াছড়িতে কোনো আঞ্চলিক-রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে না। কারণ তাদের নিবন্ধন নেই।
প্রশাসন অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মাধ্যমে কীভাবে পার্বত্য অঞ্চলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়, সরকারের সে বিষয়টি আমার কাছে স্পষ্ট নয়। সরকারের প্রশাসনের ব্যুরোক্রেসি বিভিন্ন কর্মকর্তা তাঁদের আত্মীয়স্বজনের নামে হাজার হাজার একর জমি লিজ নিয়ে দখল করেছেন পার্বত্য চট্টগ্রামে। পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্ট্যান্ডিং কমিটি বেশ কিছু জমির লিজ বাতিল করেছিল। বাতিল করার সিদ্ধান্ত আবার প্রত্যাহার করা হয়েছে। অর্থাৎ যাঁরা জমি দখল করছেন, তাঁরা কতটা শক্তিশালী, তা ওই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে পরিষ্কার।
আমরা পাহাড়ি নেতারা, নেতিবাচক মনোভাব প্রত্যাহার করে ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে বর্তমানে এগিয়ে আসছি চুক্তিটি বাস্তবায়নের প্রয়োজনে। এখন সরকারের উচিত, ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসা চুক্তি বাস্তবায়ন করতে। পাহাড়িদের বিপদের সময় তাদের পাশে থাকা উচিত। সরকারের সদিচ্ছাই পারে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি দ্রুত বাস্তবায়ন করতে। বাঙালি সেনাবাহিনী তো পাহাড়িদের খাজনার টাকা দিয়েও পরিচালিত হয়। সুতরাং সেনাবাহিনী শুধু বাঙালিদের একার নয়, পাহাড়িদেরও। পাহাড়িদের নিরাপত্তা রক্ষায় সেনাবাহিনীকে দায়িত্ব নিতে হবে। সরকারের উচিত, চুক্তি অনুযায়ী জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদ কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া। সরকারের আন্তরিকতাই পারে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন করতে।
বিনায়ক সেন
ভারতের ঝাড়খন্ড রাজ্যের প্রথম অর্থনৈতিক ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট প্রণয়নের কাজে আমি সম্পৃক্ত ছিলাম, বিশ্বব্যাংকে কর্মরত অবস্থায়। আমি তখন দেখেছি, একটি রাজ্যের উন্নয়ন বিভাগ কীভাবে এগিয়ে যায়। যদি কোনো আন্দোলনের একটি বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তাভাবনা করার কেন্দ্র না থাকে, তবে সে আন্দোলন বেশি দূর এগোতে পারে না। বর্তমান বিশ্বায়নের এই যুগে যেকোনো দাবি আদায়ের জন্য অবশ্যই চিন্তাভাবনা ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাকেন্দ্র থাকা দরকার।
ঝাড়খন্ড ভারতের প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের তিন ভাগের এক ভাগ জোগান দিয়ে থাকে। সেখানে জামশেদপুরে টাটানগর রয়েছে। রাঁচির মতো বিশ্বখ্যাত পর্যটনকেন্দ্র রয়েছে। কিন্তু তার পরও এই রাজ্যে দারিদ্র্য দেখা যায়। বিশ্বায়নের এই যুগে আরেকটি ধারণা হচ্ছে, একটি মধ্যবিত্ত সমাজের আকার বাড়ানো, তারপর উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা, দরিদ্র ও পিছিয়ে যাওয়া অঞ্চলকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য। সরকারের মধ্যে যদি এই মনোভাব থাকে, তবে তা পার্বত্য অঞ্চলের জন্য বেশ ভালো হবে। কারণ, অত্যন্ত দরিদ্র ও পিছিয়ে থাকা অঞ্চলের চেয়ে মধ্যবিত্ত সমাজে উত্তীর্ণ হওয়া অনেক ভালো।
আমাদের অসম্ভবকে সম্ভব করার উদ্যোগ নিতে হবে। জাতীয়তাবাদের মধ্যে থেকে অসম্ভবকে সম্ভব করার কল্পনা করা সম্ভব নয়। জাতীয়তাবাদ রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ক্ষতিকর প্রত্যয়ে পরিণত হয়েছে। জাতীয়তাবাদের মধ্যে থেকে মাল্টি এথনিক, একটি ইনক্লুসিভ কমিউনিটি প্রতিষ্ঠা করা কষ্টসাধ্য বিষয়।
পার্বত্য অঞ্চলের নেতাদের সঙ্গে জাতীয় পর্যায়ের নেতাদের যোগাযোগ বাড়াতে হবে। চুক্তি বাস্তবায়নে আঞ্চলিক নেতাদের মতৈক্যের ভিত্তিতে একত্র হয়ে একটি ‘স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্ক’-এর মধ্যে থাকতে হবে সরকারসহ সব পক্ষকে। চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য উভয় পক্ষে আরও আলোচনা বাড়াতে হবে। সবাই একসঙ্গে বসে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সেসব সমস্যা সমাধানের পথ বের করতে হবে, যাতে পার্বত্য চুক্তিটি দ্রুত বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়।
সুলতানা কামাল
পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য কতগুলো বাধা আমাদের সামনে উঠে এসেছে। চুক্তি স্বাক্ষরের এক যুগ পার হয়ে গেছে। এই দীর্ঘ সময় পার হওয়ায় প্রেক্ষাপট অনেকটা বদলে গেছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, চুক্তি যেভাবে স্বাক্ষর করা হয়েছিল, সেভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, নাকি যুগের পরিবর্তনে চুক্তিতে সময়োপযোগী সংশোধনী আনার মধ্য দিয়ে তা বাস্তবায়ন করা হবে। এ অবস্থায় যদি দেখা যায় যে চুক্তি দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য চুক্তিতে কিছু সংশোধনী আনা দরকার, তাও সবাই মিলে ভাবা যেতে পারে। তবে চুক্তির মৌলিক বিষয়ে সংশোধন বা পরিবর্তনের কোনো প্রশ্ন উঠতে পারে না।
পার্বত্য অঞ্চলে বর্তমানে পাহাড়ি-বাঙালি জনসংখ্যার অনুপাত, পাহাড়িদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও সেখানে প্রভাব বিস্তার করতে পারে, এমন নতুন সংগঠনের আবির্ভাব—সর্বোপরি পার্বত্য অঞ্চলে রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন হয়েছে। চুক্তির সময়ে যে প্রক্রিয়ায় বাস্তবায়ন করা যেত, বর্তমানে হয়তো সে প্রক্রিয়ায় চুক্তি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না। তাই সরকারের উচিত, উদ্যোগী ভূমিকা নিয়ে পার্বত্য অঞ্চলে সব জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বকারীদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে চুক্তির সাংঘর্ষিক ধারায় সংশোধনী এনে তা বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেওয়া।
পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা সমাধানে চুক্তির বাস্তবায়ন সরকারের অগ্রাধিকারের তালিকায় নিয়ে আসার জন্য আঞ্চলিক ও উচ্চপর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ আরও বাড়ানো প্রয়োজন। শুধু পার্বত্য অঞ্চলেই নয়, সারা বাংলাদেশেই ভূমি নিয়ে বিরোধ রয়েছে। কারণ অল্প আয়তনের এ দেশে জনসংখ্যা বিপুলসংখ্যক। সুতরাং স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে আলোচনা না করে পার্বত্য অঞ্চলে যে বাঙালি প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল, এতে যে সংঘাত হয়েছিল, তা ছিল স্বাভাবিক। ভূমি কমিশন যদি জরিপ পরিচালনা করে, তবে অনেক পাহাড়ি তাদের ভূমির অধিকার হারাবে। কারণ তাঁদের ভূমির কোনো নির্দিষ্ট কাগজপত্র নেই। জোর করে দখলদারই ভূমির মালিকে পরিণত হবে।
দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়িরা বিভিন্ন বঞ্চনার শিকার হয়ে এসেছে। তাদের এই বঞ্চনা থেকে মুক্তি দিতে আমাদের সবার এগিয়ে আসতে হবে। আদিবাসীদের অধিকারের কথা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। আমাদের উচিত, দেরি না করে এখনই চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য কাজ শুরু করা। পাহাড়ি মানুষের যে অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে, সে অধিকার তাদের ফিরিয়ে দিতে চুক্তি বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত জরুরি।
আব্দুল কাইয়ুম
আলোচনায় দীর্ঘসময় ধরে সবাই বিশদ বক্তব্য দিয়েছেন। এতক্ষণের আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে নতুন কোনো মতামত থাকলে তা খুব সংক্ষেপে বলার অনুরোধ করছি।
মণিস্বপন দেওয়ান
বাংলাদেশের বেশির ভাগ রাজনীতিবিদ ও প্রশাসন যেখানে দুর্বৃত্তায়িত, সেখানে আমাদের গণতন্ত্র সব সময় শঙ্কার মধ্যে থাকে। বিশ্বসংস্থাগুলোর পরামর্শ বাস্তবায়নের জন্য মধ্যবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্ত সমাজের আকার বড় করার কথা বলা হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে বলতে চাই, প্রশাসনে কর্মকর্তারা পার্বত্য অঞ্চলে ৪২ হাজার ৪৫০ একর জমি লিজ নিয়ে দখল করেছিলেন। এ ধরনের দুর্বৃত্তায়িত সমাজে বসবাস করে কীভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা সমাধানে চুক্তি বাস্তবায়ন অতিদ্রুত করা সম্ভব, তা সবার ভাবা উচিত।
আমেনা মহসীন
আমাদের সব ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীকে সঙ্গে নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে হবে চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য। কিন্তু একসময় আমাদের নিজস্ব জাতীয়তাবোধের প্রয়োজন ছিল, সেটি অবশ্যই মনে রাখতে হবে। তা ভুলে গেলে চলবে না।
বিনায়ক সেন
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট লক্ষ করলে দেখা যায়, ভারতে যারা নির্যাতিত জাতিসত্তা ছিল, তাদের মধ্যবিত্ত সমাজ উন্নয়নের মাধ্যমে নিজেরা সামনে এগিয়ে এসেছিল। আমি এটি উদাহরণস্বরূপ বলতে চেয়েছি।
শক্তিপদ ত্রিপুরা
পার্বত্য চট্টগ্রাম ম্যানুয়াল ও চুক্তির সংশোধনী প্রয়োজন হলে তা অবশ্যই করতে হবে। বর্তমান সরকারের ভূমি কমিশনের কার্যক্রমের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে যে সরকার চুক্তি বাস্তবায়নে অবহেলা করছে। সরকারের ও সবার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করা উচিত। চুক্তি বাস্তবায়নে সবার সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের অস্তিত্ব রক্ষায়, তাদের ভাষা-সংস্কৃতি রক্ষার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে পাহাড়িদের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
গৌতম দেওয়ান
আজকের বৈঠকে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে বাধাগুলো কী, সেগুলো উঠে এসেছে। আশা করছি, যাঁরা নীতিনির্ধারক আছেন, তাঁরা এ সমস্যাগুলোর প্রতি দৃষ্টি দিয়ে, তা সমাধানে এগিয়ে আসবেন।
মো. জাহাঙ্গীর কামাল
স্থানীয় পার্বত্য রাজনীতিবিদদের পেছনে যাঁরা থাকেন, সবার সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য। স্থানীয় সব নেতার সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা চিহ্নিত করে তা সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে সব পক্ষ ও সরকারকে।
ইলিরা দেওয়ান
আমাদের সবার মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে হবে। আমি জাতি, আরেকজন উপজাতি—এই মনোভাব অবশ্যই পরিহার করতে হবে। পার্বত্য অঞ্চলের সমস্যা সমাধানে আন্তরিকতা ও মানসিকতা পরিবর্তন অতি জরুরি।
সঞ্জীব দ্রং
‘পাহাড়ি মানুষ যখন বলে, জীবন তার নয়’ কেন পাহাড়িরা এ কথা বলে, তা উচ্চপর্যায় থেকে শুরু করে সবাইকে বুঝতে হবে। পাহাড়িরা যখন নিজেদের অধিকার আদায়ের কথা বলে, তখন তারা মানুষ হিসেবে সেই দাবি রাখে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা ও জাতিসংঘ যেসব অধিকারের কথা বলছে, পাহাড়িরা তা পাওয়ার অধিকার রাখে।
বিনায়ক সেন
সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় যেহেতু পার্বত্য সমস্যাটি নেই, তাই আমার মতামত হচ্ছে, আরও আলাপ-আলোচনা আয়োজনের মাধ্যমে জনমত গড়ে তুলে সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় এ সমস্যা সমাধানের বিষয়টি আনতে হবে। মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে পাহাড়িদের অধিকার আদায়ে দল-মতনির্বিশেষে এগিয়ে আসতে হবে।
সুধাসিন্ধু খীসা
বাংলাদেশে মাথাপিছু চাষাবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ০.০২২ একর। অপরদিকে পার্বত্য অঞ্চলে মাথাপিছু চাষাবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ০.০১৪ একর। পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের আয়তনের ১০ ভাগের এক ভাগ হলেও, অর্থাৎ পার্বত্য অঞ্চলে জমির পরিমাণ বেশি হলেও চাষাবাদযোগ্য জমির পরিমাণ অনেক কম। সুতরাং বলতে চাই, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ভূমিদস্যুদের অত্যাচার বন্ধ করতে হবে। চুক্তি বাস্তবায়নে সরকারসহ সব পক্ষকে এগিয়ে আসতে হবে।
স্বপন আদনান
আইনগতভাবে পার্বত্য অঞ্চলে যাদের অধিকার বেশি, তারা সুবিধা পাবে। সে ক্ষেত্রে পাহাড়িদের প্রথাগত আইনটি রাখলে তারা বেশি সুবিধা পাবে। এতে যদি কিছু বাঙালি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাদের অন্য কোথাও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা অবশ্যই করতে হবে সরকারকে। শুধু রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে সেখানে সেনাবাহিনী মোতায়েন রাখা হচ্ছে। এখানে বলতে পারি, নিরাপত্তার নামে যে নিরাপত্তা সেখানে দেওয়া হচ্ছে, তাতে পাহাড়িরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। সুতরাং বাঙালিদের নিরাপত্তার পাশাপাশি পাহাড়িদের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে সেনাবাহিনীর। পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য যে সংশোধনীর যে প্রশ্ন উঠছে, তা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে।
মতিউর রহমান
আমাদের কথা হচ্ছে, বর্তমানে পার্বত্য অঞ্চলের অবস্থা অনেকটা সংকটাপন্ন। এর মূল কারণ, পার্বত্য অঞ্চলের সংগঠনগুলোর মধ্যে অভ্যন্তরীণ বিভেদ, দ্বিধাবিভক্তি, সন্দেহ, অবিশ্বাস ও অনাস্থা বৃদ্ধি পেয়েছে। আমরা পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের প্রতি অত্যন্ত সহানুভূতিশীল। পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক নেতাদের মূলধারার রাজনীতির সঙ্গে আরও বেশি সম্পৃক্ত হতে হবে। পার্বত্য অঞ্চলে জনমত গড়ে তুলে সরকারের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। স্থানীয় লোকজনকে নিয়ে আলোচনার আয়োজনের মাধ্যমে তাদের অধিকারের কথা সরকারের কাছে তুলে ধরতে হবে।
সুলতানা কামাল
চুক্তির যে মৌলিক বিষয়গুলো ছিল, অর্থাৎ যাদের অধিকার তা তাদের ফিরিয়ে দিতে হবে, এ বিষয়ে কোনো আপস করা যাবে না। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে যেসব সংশোধনী আনা দরকার, যা চুক্তি ও সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, সে বিষয়ে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সংশোধনী আনতে হবে। চুক্তি বাস্তবায়নে একত্র হয়ে কাজ করার কোনো বিকল্প আমাদের সামনে নেই। মানবিক সত্তা ও মানবিক অধিকারের ব্যাপারে কোনো প্রকার আপস করা যাবে না।
আব্দুল কাইয়ুম
পার্বত্য শান্তিচুক্তি যেহেতু হয়েছে, তা থেকে পিছিয়ে আসার কোনো পথ খোলা নেই। চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যদি কোনো সাংঘর্ষিক বিষয় থেকে থাকে, তা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে সব পক্ষকে এগিয়ে আসতে হবে। আজকের গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নেওয়ার জন্য সবাইকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
সুলতানা কামাল
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও নির্বাহী পরিচালক, আইন ও সালিশ কেন্দ্র
গৌতম দেওয়ান
সভাপতি, পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক কমিটি
স্বপন আদনান
সদস্য, পার্বত্য চট্টগ্রাম কমিশন
মণিস্বপন দেওয়ান
সাবেক উপমন্ত্রী
পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়
অধ্যাপক আমেনা মহসীন
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
শক্তিপদ ত্রিপুরা
সাংগঠনিক সম্পাদক, জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) ও সভাপতি, খাগড়াছড়ি হেডম্যান সমিতি এবং সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান
সুধাসিন্ধু খীসা
কো-চেয়ারম্যান
জনসংহতি সমিতি (এম এন লারমা)
সঞ্জীব দ্রং
সাধারণ সম্পাদক
বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম
মো. জাহাঙ্গীর কামাল
সাধারণ সম্পাদক
পাবর্ত্য চট্টগ্রাম সম-অধিকার আন্দোলন
বিনায়ক সেন
গবেষণা, পরিচালক, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস)
ইলিরা দেওয়ান
সাবেক সাধারণ সম্পাদক, হিল উইমেনস ফেডারেশন, বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রাম কমিশনে কর্মরত
মতিউর রহমান
সম্পাদক, প্রথম আলো
সঞ্চালক
আব্দুল কাইয়ুম
যুগ্ম সম্পাদক, প্রথম আলো
আলোচনা
মতিউর রহমান
পার্বত্য শান্তিচুক্তির বাস্তবায়ন—এটি একটি বড় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দেশের ভবিষ্যৎ গণতন্ত্রের অগ্রগতির জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এর বাস্তবায়ন জরুরি। এরই মধ্যে প্রথম আলো পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন-সম্পর্কিত চার দিনের ধারাবাহিক সংবাদ প্রকাশ করেছে। সরকার বারবার বলছে, তারা এ চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করতে চায়। তারা বিভিন্ন শক্তিশালী কমিটিও গঠন করেছে। কিন্তু পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের এক যুগ পার হয়ে যাওয়ার পরও চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তেমন কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। তাই জনমত গড়ে তোলার জন্য এবং সমাজের সব মহলের মধ্যে এই পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের গুরুত্ব তুলে ধরতে আজকের এই গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন। যেন সরকারকে এ বিষয়ে সজাগ করা যায়—বিশেষ করে পার্বত্য অঞ্চলের জনগণ, যারা এ সমস্যা থেকে পরিত্রাণ চায়, তাদের সহায়তা করা যায়। আমরা সবাইকে নিয়ে এই আলোচনা করতে চেয়েছি।
এই অনুষ্ঠানে পার্বত্যচট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী দীপঙ্কর তালুকদার এবংখাগড়াছড়ির সাংসদ ও শরণার্থী পুনর্বাসনবিষয়ক টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান যতীন্দ্র লাল ত্রিপুরা অংশ নিতে আগ্রহের সঙ্গে সম্মতি দিয়েছিলেন। কিন্তু বিশেষ ব্যস্ততার জন্য তাঁরা আসতে পারেননি।
১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য শান্তিচুক্তি সম্পাদনের পরের বছর রাঙামাটিতে বিশাল জনসমাবেশ হয়েছিল। সেখানে আমরা দেখেছিলাম, চুক্তি স্বাক্ষরের এক বছরের মাথায় সেখানকার জনগণের মধ্যে চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে হতাশার ছায়া। পরে তৎকালীন আওয়ামী লীগের আমলে চুক্তি বাস্তবায়নে কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছিল। কিন্তু বড়ো অগ্রগতি হয়নি। পরবর্তী সময়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর তারা চুক্তিটি বাতিল করে দেয়নি, কিন্তু তাদের সময় চুক্তি বাস্তবায়নে তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। পরবর্তী সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে কিছু কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছিল চুক্তি বাস্তবায়নে।
গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী অঙ্গীকারে পূর্ণাঙ্গরূপে চুক্তি বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছিল। সরকার গঠন করার পর তারা শক্তিশালী কমিটি গঠনও করেছে, চুক্তি বাস্তবায়নের কথা বলছে। যদিও এখন পর্যন্ত চুক্তি বাস্তবায়নে তেমন কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। বর্তমান সরকার টাস্কফোর্স গঠন, ভূমি কমিশন আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে, কিন্তু সেই আদিবাসী উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন সম্পূর্ণ হওয়ার জন্য তেমন কোনো বড় উদ্যোগ আমরা দেখিনি।
ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তির আগেই ভূমি জরিপের বিষয়ে কমিশনের অবস্থান ও বক্তব্য নিয়ে বর্তমানে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। সর্বশেষ সংসদীয় কমিটির বৈঠকে তাঁরা বলেছেন, পাবর্ত্য চুক্তি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। আমার মতে, এটি একটি ভালো উদ্যোগ। এর মাধ্যমে যদি ভবিষ্যতে অন্য কোনো সরকার আসে, তারা পাবর্ত্য চুক্তি বাতিল করতে পারবে না। অন্যদিকে ভূমি কমিশনকে কার্যকর করতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। আর এ বিষয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠকে মতৈক্যে পৌঁছানো গেছে।
এরই মধ্যে আন্তর্জাতিকভাবে পাবর্ত্য চুক্তি বাস্তবায়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইউএনডিপি; তাদের বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে পার্বত্য অঞ্চলে।
পরিশেষে বলব, পার্বত্য শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন ছাড়া আমাদের সামনে অন্য কোনো পথ খোলা নেই। আমাদের সবার আশা, একটি ঐতিহাসিক উদ্যোগ—আলোচনা, সমঝোতার মাধ্যমে চুক্তিটির বাস্তবায়ন এই পার্বত্য অঞ্চলে অতি জরুরি। বর্তমান সরকারের কাছে আমাদের আশা যে চুক্তিটি স্বাক্ষর করেছিল ১৯৯৭ সালে, তারা তা বাস্তবায়নে যথেষ্ট উদ্যোগী হবে। যেহেতু এটি মহাজোটের নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল, তাই তা বাস্তবায়নে এগিয়ে আসা উচিত। সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য চুক্তিটি যত দ্রুত সম্ভব বাস্তবায়ন করতে আমরা জোর দাবি জানাচ্ছি।
আলোচনার শুরুতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা সুলতানা কামালকে অনুরোধ করব চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাধাগুলো কী এবং তা সমাধানে কী উদ্যোগ নেওয়া উচিত, সে বিষয়ে বলার জন্য।
সুলতানা কামাল
আমরা জানি, প্রথম আলোয় প্রকাশিত ধারাবাহিক সংবাদটির বক্তব্য ছিল, পার্বত্য চট্টগ্রাম আবার অশান্ত হয়ে উঠেছে। এ বক্তব্যের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রাম খুব একটা স্বাভাবিক অবস্থায় নেই। আজকের বৈঠকের আলোচকদের আলোচনার মাধ্যমে বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামের সংকটগুলো কী কী এবং এসব সমাধানে কী উদ্যোগ নেওয়া জরুরি, সে বিষয়গুলো উঠে আসবে—পার্বত্য চট্টগ্রাম যে অশান্ত হয়ে উঠছে, তা কীভাবে প্রতিরোধ করা যায়।
পাশাপাশি শান্তির পথে কীভাবে এগিয়ে যাওয়া যাবে, সে বিষয়গুলো বিষদভাবে তুলে ধরা উচিত। আজকের আলোচনার মাধ্যমে পার্বত্য চুক্তির বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হবে। চুক্তি বিশ্লেষণের মাধ্যমে চুক্তি বাস্তবায়নে কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া দরকার কিংবা চুক্তির কিছু বিষয় সংশোধন করা বা বর্তমান প্রেক্ষাপটে চুক্তির কোন অংশগুলোর পরিবর্তন আনতে হবে, সেগুলো চিহ্নিত করতে হবে। শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকার ও সব শ্রেণীর মানুষের ইতিবাচক ভূমিকা পালন করা উচিত।
আব্দুল কাইয়ুম
আজকের আলোচনার জাতীয় ও আন্তর্জাতিক—উভয় দিকেই গুরুত্ব রয়েছে। কারণ যখন কোনো সরকার এ ধরনের কোনো চুক্তি করে, তখন সেটি কোনো রাজনৈতিক দল বা রাজনৈতিক সরকারের একার বিষয় থাকে না। সে চুক্তি বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেশের সব সরকারের ওপর বর্তায়। সেই চুক্তি যদি বাস্তবায়িত না হয়, তখন সেটি দেশে ও আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্নের সৃষ্টি করে। আমরা চাই, পার্বত্য চুক্তিটি বাস্তবায়ন করা হোক।
অনেকে বলেন, চুক্তিটির মধ্যে অসামঞ্জস্য রয়েছে। কিংবা বর্তমান প্রেক্ষাপটে চুক্তিটির ত্রুটি রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে অতি দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। এই পর্যায়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক কমিটির সভাপতি গৌতম দেওয়ানকে অনুরোধ করব বলার জন্য।
গৌতম দেওয়ান
সম্প্রতি পার্বত্য অঞ্চলের সবার কাছে মনে হচ্ছিল, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বাস্তবায়ন সরকারের কর্মপরিকল্পনার অগ্রাধিকার তালিকার মধ্যে নেই। কিন্তু চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়টি দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ইস্যু। বিভিন্ন গণমাধ্যমের পেশাজীবী, শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবী, গবেষক, সুশীল সমাজ—সবার সহযোগিতা যদি আমরা পাই অর্থাৎ যদি একটি জনমত সৃষ্টি করতে পারি, তবে সরকারের কাছে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়টি অগ্রাধিকারের তালিকায় তুলে আনা সম্ভব। সেই লক্ষ্যে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আজকের এই গোলটেবিল বৈঠক সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে কাজ করবে।
পার্বত্য শান্তিচুক্তি বাস্তবায়িত হচ্ছে না। কিন্তু কেন হচ্ছে না, সে বিষয়গুলো আমরা গভীরভাবে চিন্তা করি না কিংবা প্রকৃত কারণ জানার স্বল্পতা রয়েছে। পার্বত্য শান্তিচুক্তির একটি প্রস্তাবনার মধ্যে চারটি খণ্ড রয়েছে। সেখানে মৌলিক যে বিষয়গুলো রয়েছে, সেখানে বলা হয়েছে যে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলকে একটি আদিবাসী-অধ্যুষিত অঞ্চল হিসেবে স্বীকার করা। এটির বৈশিষ্ট্য রক্ষার জন্য চুক্তির মধ্যে কিছু বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল—পার্বত্য চট্টগ্রামে বিশেষ অঞ্চল হিসেবে আঞ্চলিক পরিষদ গঠন করা হবে। তিনটি জেলা রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি নিয়ে বিশেষ শাসিত অঞ্চল গঠন করা হবে। পাশাপাশি সেখানে অভ্যন্তরীণ ও ভারত থেকে প্রত্যাবর্তন করা যেসব শরণার্থী আছে, তাদের পুনর্বাসন করা হবে—সেখানে যারা ভূমিহীন হয়েছে কিংবা ভূমি হারিয়েছে, যাতে তারা তাদের ভূমি ফিরে পায়। তাদের ভূমিবিরোধ-সমস্যা নিষ্পত্তির জন্য ভূমি কমিশন গঠন করা হবে। ভূমি কমিশন এসব সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নেবে।
আঞ্চলিক পরিষদ ওই সব জেলার মধ্যে যেসব বিভাগ রয়েছে, সেগুলোর সমন্বয়, তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ করবে। আঞ্চলিক পরিষদের কার্যপ্রণালি বিধি প্রণয়ন, জেলা পরিষদ আইন সংশোধন ও কার্যপ্রণালি বিধি প্রণয়ন, স্থানীয় ৩৩টি বিভাগের ৬৮টির কাজ জেলা পরিষদের হাতে হস্তান্তরের মতো সাধারণ বিষয়গুলো বছরের পর বছর ফেলে রাখা হয়েছে। সরকার চুক্তির পর এ অঞ্চলকে আদিবাসী-অধ্যুষিত অঞ্চল বললেও বাস্তবে এর কোনো প্রতিফলন ঘটছে না। আমরা আদিবাসী-অধ্যুষিত অঞ্চল বলতে বোঝাই, এখানে যেসব আদিবাসী আছে, তারা যেন তাদের ভাষা-সংস্কৃতি-স্বকীয়তা নিয়ে থাকতে পারে, সে ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ নেওয়া হবে। কিন্তু বাস্তবে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। পাশাপাশি বরং নিরাপত্তাহীনতা, সমতল থেকে বাঙালি প্রতিস্থাপন, ভূমি হারানো, ভূমি জবরদখল—এ বিষয়গুলো বন্ধ হয়নি।
জনসংখ্যার অনুপাতের জরিপে ১৯৪৭ সালে পার্বত্য এলাকায় পাহাড়ি ছিল ৯৭ দশমিক ৫ শতাংশ আর বাঙালি ছিল আড়াই শতাংশ। ১৯৯৭ সালে চুক্তির সময় পাহাড়ি ছিল ৫৫ শতাংশ ও বাঙালি ছিল ৪৫ শতাংশ। কিন্তু বর্তমানে জনসংখ্যার অনুপাত হচ্ছে পাহাড়ি ৫১ শতাংশ আর বাঙালি ৪৯ শতাংশ। পাহাড়ি অঞ্চলে দিন দিন বাঙালি অনুপাতিক হারে বাড়ছে। ফলে আদিবাসীদের নিজস্ব সংস্কৃতি, ভাষা ও স্বকীয়তা হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে।
চুক্তিমতে, ১৯৯৮ সালে আঞ্চলিক পরিষদ গঠন করা হলেও আঞ্চলিক পরিষদের কার্যপ্রণালি বিধি চুক্তির এক যুগ পার হলেও এখনো গঠন করা হয়নি। ২০০০ সালে অঞ্চলিক পরিষদ থেকে সরকারের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল যে কার্যপ্রণালি বিধি কী হবে? কথা ছিল সরকার এ-সম্পর্কিত পরামর্শ প্রদানের মাধ্যমে ফেরত পাঠাবে, কিন্তু এখনো তা করা হয়নি। ফলে আঞ্চলিক পরিষদ যে উদ্দেশ্যে গঠন করা হয়েছিল, তা কোনো ধরনের ভূমিকাই পালন করতে পারছে না।
স্থানীয় সরকার পরিষদ, যেটি ১৯৮৯ সালে তৈরি করা হয়েছিল, সেটির সংশোধনী আনা হয়েছে। কিন্তু জেলা পরিষদ দাবি করছে, আইনে আঞ্চলিক পরিষদের কথা উল্লেখ নেই। তাই আঞ্চলিক পরিষদের সমন্বয়ের দায়বদ্ধতা তাদের নেই। ১৯৯৮ সালে আইনের ১৬(ক) ধারা সংযোজন করে জেলা পরিষদের যে মূল কাঠামো ছিল, তাতে পরিবর্তন এনে অন্তর্বর্তীকালীন পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট আঞ্চলিক পরিষদ গঠন করা হয়েছিল। দেখা গেছে, যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে, তাদের নির্বাচিত ব্যক্তিরাই সেই পরিষদের সদস্য হচ্ছেন। দলের মনোনীত হন বলে তাঁরা পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের অধিকার আদায়ে সচেষ্ট ভূমিকা পালন করতে পারছেন না। ফলে জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদের মধ্যে কোনো সমন্বয় হচ্ছে না। আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান বারবার বৈঠক ডাকার পরও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানরা সেসব বৈঠকে উপস্থিত হননি।
সরকারের পক্ষ থেকে যেহেতু কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা এখনো পাওয়া যায়নি, তাই আঞ্চলিক ও জেলা পরিষদের মধ্যে সমঝোতা হচ্ছে না। জেলা পরিষদগুলোতে পাঁচ বছর অন্তর নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও প্রায় ২০ বছর হয়ে গেছে পরিষদগুলোতে কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। জেলা পরিষদগুলো গঠনের মূল উদ্দেশ্য ছিল, পার্বত্য অঞ্চলে যে ১১টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী আছে, তাদের নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা, তাও সম্ভব হচ্ছে না।
যারা অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু ও ভারত-প্রত্যাগত শরণার্থী আছেন, তাঁদের ভূমি-সমস্যা সমাধানের জন্য সম্প্রতি চতুর্থবারের মতো টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। কিন্তু তাঁদের কার্যপরিচালনার বিধি এখনো তৈরি করা হয়নি। টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান নিয়োগ সবই হয়েছে, কিন্তু কোনো অগ্রগতি হচ্ছে না। পাশাপাশি ভূমি কমিশন গঠন করে ২০০১ সালে ভূমি নিষ্পত্তি কমিশন আইন করা হয়েছে। চুক্তিমতে, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে যেকোনো আইন করতে হলে আঞ্চলিক পরিষদগুলোর সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। কিন্তু কোনো আলোচনা ছাড়াই তাড়াহুড়া করে যে আইনটি করা হয়, তা চুক্তির সঙ্গে ১৯টি বিষয়ে সাংঘর্ষিক।
সম্প্রতি গণমাধ্যমে বিষয়গুলো উঠে আসায় ২২ তারিখে এক বৈঠকে আলোচনায় মূল যে বিষয়গুলো চুক্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক, সেগুলো পরিবর্তন করার কথা বলা হয়েছে। এটি একটি ইতিবাচক দিক। আর যতক্ষণ পর্যন্ত চুক্তির সব বিষয় বাস্তবায়ন করা না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত আশঙ্কা রয়েই যাচ্ছে।
সম্প্রতি কমিশনের ভূমি জরিপ নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। ভূমি কমিশন গঠনের ছয় মাসের মধ্যে কমিশনের বিধিমালা প্রস্তুত করার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত তা করা হয়নি। ভূমি জরিপ আগে হবে, না পরে হবে, সে বিষয়ে ভূমি কমিশনার তাঁর একক মন্তব্য পেশ করছেন, যা পাহাড়ি জনগণের মধ্যে আশঙ্কা ও উৎকণ্ঠার সৃষ্টি করছে।
আব্দুল কাইয়ুম
পার্বত্য অঞ্চলে লক্ষাধিক পরিবার এখনো উদ্বাস্তু। নিজ দেশে পরবাসী হয়ে আছে পাহাড়িরা। তাদের সমস্যা সমাধানে সরকারের উদ্যোগী ভূমিকা প্রয়োজন। আলোচনার এ পর্যায়ে জনসংহতি সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক ও খাগড়াছড়ি হেডম্যান সমিতির সভাপতি শক্তিপদ ত্রিপুরাকে অনুরোধ করছি বলার জন্য।
শক্তিপদ ত্রিপুরা
পাবর্ত্য চট্টগ্রামের যে রাজনৈতিক সমস্যা, তা সমাধানের লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চুক্তি করা হয়েছিল। চুক্তি সম্পাদনের জন্য তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। পাশাপাশি চুক্তির মৌলিক বিষয়গুলো বাস্তবায়ন না হওয়ায় দুঃখ প্রকাশ করছি। বর্তমান সরকার তার নির্বাচনী অঙ্গীকারে চুক্তি সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়নের কথা বলেছিল। সরকার গঠনের পর তারা বারবার বলেছে, চুক্তি সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন করবে। বর্তমান সরকারের মেয়াদ দুই বছরের কাছাকাছি। চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিছু উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। যেমন—টাস্কফোর্স গঠন, ভূমি কমিশন গঠন, কিছু সেনাক্যাম্প প্রত্যাহার করলেও চুক্তির মৌলিক বিষয়গুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের উল্লেখযোগ্য কোনো ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না।
আজকের আলোচনায় দুটি বিষয় উঠে এসেছে। প্রথমত, চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাধাগুলো কী কী এবং দ্বিতীয়ত কীভাবে চুক্তিটি দ্রুত বাস্তবায়ন করা যায়। চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় বাধা হচ্ছে, বর্তমান সময়ে সরকারের কর্মকাণ্ডের যে অগ্রাধিকার তালিকা রয়েছে, এর মধ্যে চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়টি নেই। যেকোনো সমস্যা সমাধানের জন্য সরকারের দৃঢ়প্রতিজ্ঞার প্রয়োজন। এ মুহূর্তে পাবর্ত্য চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ নয়। যেমন—যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়টি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকার উদ্যোগী ভূমিকা পালন করছে, তেমনি পার্বত্য শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের উদ্যোগের অভাব রয়েছে। সরকারের বিশেষ অংশ বা আমলারা চাইছেন না, পাবর্ত্য চুক্তি বাস্তবায়ন হোক অতিদ্রুত। তাঁরা সরকারকে বাধাগ্রস্ত করছেন চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে।
সরকারের চুক্তি বাস্তবায়নে অনীহার পাশাপাশি চুক্তিবিরোধার্থক কিছু কার্যক্রম আমরা দেখতে পাচ্ছি। যেমন—ভূমি কমিশনের বিতর্কিত ভূমিকা পালন। চুক্তিতে স্পষ্ট করে উল্লেখ আছে, ভূমি জরিপ কীভাবে করা হবে। অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু, শরণার্থী ও অন্যান্য যে ভূমিবিরোধ রয়েছে, সেগুলো নিষ্পত্তি করার পরই সরকারের আঞ্চলিক পরিষদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে ভূমি জরিপ করার কথা। কিন্তু ভূমি কমিশনের চেয়ারম্যান দায়িত্ব নেওয়ার পরই ভূমি জরিপের ঘোষণা দিলেন। এ ধরনের কমিশনের কর্মকর্তা ও আমলাদের চুক্তিবিরোধী কার্যক্রম পরিলক্ষিত হচ্ছে।
পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠিত হয়েছিল। এই চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করার কথা মন্ত্রণালয়ের। কিন্তু বারবার আমরা দেখছি, মন্ত্রণালয় চুক্তিবিরোধী কার্যক্রম পরিচালনা করছে। চুক্তিমতে, আদিবাসীদের ও অগ্রজ বাসিন্দাদের সার্টিফিকেট দেওয়ার ক্ষেত্রেও চূড়ান্তভাবে স্থানীয় সরকারপ্রধানদের থাকার কথা। কিন্তু মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, জেলা প্রশাসকের (ডিসি) পাশাপাশি স্থানীয় সরকারপ্রধান এই সার্টিফিকেট দেবেন। সম্প্রতি মন্ত্রণালয় থেকে এও বলা হচ্ছে, আদিবাসী শব্দ ব্যবহার করা যাবে না, উপজাতি শব্দ ব্যবহার করতে হবে। পাবর্ত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এ ধরনের চুক্তিবিরোধী কার্যক্রম আমরা দেখতে পাই।
কীভাবে চুক্তি দ্রুত বাস্তবায়ন করা যায়, সে বিষয়ে কিছু প্রস্তাব দিতে চাই। প্রথমেই সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রয়োজন চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য। সরকারের কার্যক্রমের তালিকায় চুক্তির বিষয়টি নিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে চুক্তি বাস্তবায়নে অগ্রণী বা মূল ভূমিকা পালন করতে হবে।
আমাদের দেশে কোনো সমস্যারই সমাধান প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ ছাড়া হয় না। তাই প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ ও বলিষ্ঠ ভূমিকা কামনা করছি পাবর্ত্য চুক্তি দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য। চুক্তিমতে, ভূমি কমিশনের আইন সংশোধন করতে হবে, পরবর্তীকালে ভূমি জরিপ করতে হবে। আঞ্চলিক পরিষদ ও পার্বত্য আঞ্চলিক কাউন্সিল করতে হবে। আঞ্চলিক পরিষদ ও পার্বত্য আঞ্চলিক কাউন্সিলকে তাদের ক্ষমতা বুঝিয়ে দিতে হবে। পার্বত্য অঞ্চলের ৩৩টি বিভাগের দায়িত্ব তাদের হাতে হস্তান্তর করতে হবে।
আঞ্চলিক পরিষদের বিধিমালা প্রণয়ন করা দরকার। অস্থায়ী সেনাক্যাম্পাসগুলো প্রত্যাহার করতে হবে। এসব কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে সরকারকে পার্বত্য শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আন্তরিক ভূমিকা পালন করতে হবে। আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিতে সরকারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। হিল ট্র্যাক্টস ম্যানুয়ালকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিতে হবে। আদিবাসীদের ভূমি অধিকার, নিজস্ব সংস্কৃতি ও ভাষাগত অধিকারের যে দাবি উঠেছে, তা বাস্তবায়নে সরকারের হস্তক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি।
আব্দুল কাইয়ুম
আদিবাসীদের জীবন ও তাদের সমস্যা সমাধানে সাংবিধানিক স্বীকৃতির বিষয়ে এখন বলবেন বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং।
সঞ্জীব দ্রং
সময় আসলে বয়ে যায়। আমরা অপেক্ষা করছি, কখন পার্বত্য শান্তিচুক্তি সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন করা হবে। আদিবাসী পাহাড়ি মানুষের দুঃখ, কষ্ট, বঞ্চনা চির অবসান করার অঙ্গীকার করেছিলেন বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাঁর নির্বাচনী ইশতেহারে। প্রশ্ন, সময় চলে যাচ্ছে, সরকারের পক্ষ থেকে কিন্তু চুক্তি বাস্তবায়নের তেমন কোনো উদ্যোগ আমরা দেখছি না। সরকার যদি চিন্তা করে, শুধু মুখে বাস্তবায়নের কথা বলে কালক্ষেপণ করবে, সময় পার করবে; বোকা আদিবাসী পাহাড়ি মানুষ শুধু তাদের অধিকারের কথা বলেই যাবে, আর তাদের আশা দিয়ে যাবে। সরকার সময় অতিবাহিত করবে। আবার আদিবাসীদের মধ্যে যেমন পাহাড়ি আদিবাসী ও সমতলের মধ্যে নতুন কিছু সমস্যা ঢুকিয়ে দিয়ে তাদের নিজেদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি করবে। নির্দিষ্ট একটা সময় পার হওয়ার পর চুক্তি বাস্তবায়ন করার আর প্রয়োজন হবে না। এ রকম মনোভাব যদি সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলো চিন্তা করে থাকে, তবে এর চেয়ে বড় ভুল আর হবে না।
চুক্তির ১২ বছর পার হয়ে গেছে। এভাবে আরও অনেক দিন পার হবে চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য। সরকার যদি ভাবে যে আদিবাসীদের ঠকাবে, প্রকৃত অর্থে সরকার নিজেই ঠকবে, নিজের সঙ্গে নিজেই প্রতারণা করবে। সরকারের উচ্চপর্যায়ের সঙ্গে জনসংহতি সমিতিসহ আরও যেসব পাহাড়ি সংগঠন রয়েছে, তাদের নিয়ে আলোচনার আয়োজন করা জরুরি। চুক্তি স্বাক্ষরের আগে যুদ্ধাবস্থায় পাহাড়িদের হেলিকপ্টারে করে শহরে নিয়ে এসে ১৯-২০ বার বৈঠক করেছিল সরকার। তাহলে বর্তমানে চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আলোচনার উদ্যোগ নিতে কেন সরকার বিলম্ব করছে। জনগণ ও নাগরিক সমাজকে সচেতন হতে হবে তাদের অধিকার আদায়ের জন্য।
পার্বত্য অঞ্চলের পাঁচজন সাংসদের মধ্যে যে তিনজন নির্বাচিত সাংসদ আছেন, তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে সরকারকে আলোচনার টেবিলে আনার জন্য। আদিবাসীদের অধিকার তুলে ধরতে হবে সরকারের কাছে। সাংসদদের সুশীল সমাজ ও জনগণকে সঙ্গে নিয়ে মতৈক্য গড়ে তুলতে হবে।
পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন হচ্ছে না, কিন্তু নতুন নতুন প্রকল্প সেখানে দেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি রাঙামাটিতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় করার প্রস্তাব রয়েছে। আমরা পাহাড়িরা নিশ্চয়ই সেটি চাই। কিন্তু এখন নয়। কারণ, পাহাড়ির মানুষ এখনো তৈরি হয়নি এ ধরনের বড় প্রকল্প গ্রহণের জন্য। আমরা জানি উন্নয়ন ভালো, কিন্তু এতে অনেক সময় মানুষের ক্ষতিও হয়। আপনাদের উন্নয়নের নামে আরেক অংশ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। কাপ্তাই বাঁধের ক্ষেত্রে আমরা তা দেখেছি। পাহাড়ি মানুষের ও আঞ্চলিক পরিষদের সঙ্গে আলোচনা না করেই নতুন নতুন প্রকল্প দেওয়া হচ্ছে। তা উদ্বোধন করতে যাচ্ছেন। এতে পাহাড়িরা বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সরকার একদিকে চুক্তি বাস্তবায়ন করছে না, অন্যদিকে সরকারের ক্ষমতা প্রদর্শন করছে। ব্রিটিশ আমল থেকে ঔপনিবেশিক সরকারের মতো যদি বর্তমান সরকারগুলো আচরণ করে, আমি মনে করি, সরকারের সাংঘাতিক ভুল হবে। আমার মতামত হচ্ছে, সরকারের মধ্যে একটি আত্মতুষ্টি ও আত্মঅহংকার চলে এসেছে, ভবিষ্যতে এই সরকারের মনোভাব হয়তো পরিবর্তন হবে না। বর্তমান সরকারের দুই বছর পার হয়ে যাওয়ার পরও এখন পর্যন্ত জনসংহতি সমিতির সভাপতির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর কোনো বৈঠক হয়নি। চুক্তি করার সময় দুই পক্ষের চমৎকার যে সম্পর্ক ছিল, তা অনেকটা ম্লান হয়েছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, যেহেতু তিনি পার্বত্য শান্তিচুক্তি করেছেন, এর বাস্তবায়নও করবেন। আমরা তাঁর কথায় বিশ্বাস রাখতে চাই। আশা করি, তিনি তাঁর কথার প্রতিফলন ঘটাবেন দ্রুত চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে।
আব্দুল কাইয়ুম
সরকারের উচ্চপর্যায়ের সঙ্গে পার্বত্য অঞ্চলের নেতাদের বৈঠক অত্যন্ত জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আলোচনার মাধ্যমে চুক্তি বাস্তবায়নের সমস্যাগুলো কী, তা চিহ্নিত করে সমাধানে দুই পক্ষের সমঝোতার মাধ্যমে দ্রুত উদ্যোগ নিতে হবে পার্বত্য শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের জন্য। চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাস্তবিক সমস্যাগুলো কী কী, সে বিষয়ে বলবেন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপমন্ত্রী মণিস্বপন দেওয়ান।
মণিস্বপন দেওয়ান
আমি বর্তমানে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত নই। তাই আমার মতামত সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত। আমি যখন উপমন্ত্রী ছিলাম, তখন পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে আমি কী করতে পেরেছি, তা আপনারা জানেন। বাংলাদেশে বর্তমানে যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি চলছে, সেখানে যেহেতু পার্বত্য চুক্তিটি আওয়ামী লীগ করেছিল, তাই পরবর্তী সময়ে বিএনপি তার বিরোধিতা করেছিল। আমি তখন পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলাম এবং পার্বত্য শান্তিচুক্তিকে টিকিয়ে রেখেছিলাম।
পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা শুধু পার্বত্য অঞ্চলের পাহাড়িদের সমস্যা নয়, এটি গোটা বাংলাদেশের সমস্যা। এ সমস্যা যদি এখনই দ্রুত সমাধান করা না হয়, তবে যতটা না পাহাড়িরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তার চেয়ে বেশি গ্রতিগ্রস্ত হবে জাতি হিসেবে বাংলাদেশের সব মানুষ। বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে সবকিছুই খুব দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে।
জলবায়ুগত পরিবর্তনের ফলে গোটা বিশ্বের অর্থনীতির একটি আমূল পরিবর্তন হচ্ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি, বন্যা, ঝড় ইত্যাদির কারণে অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক পরিবর্তন হচ্ছে, যার দরুন বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর মধ্যে একটি প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হয়েছে। ফলাফল হিসেবে ইরাকে হামলা, আফগানিস্তানে যুদ্ধ ইত্যাদি বিষয় আমরা দেখেছি। তবে আজকে চীন, আমেরিকা ও ভারতের মধ্যে যে প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হয়েছে, সেখানে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে অত্যন্ত হুমকির মধ্যে রয়েছে। প্রাকৃতিক সম্পদগুলো কিন্তু সমতলে ফুরিয়ে যাচ্ছে। এখন প্রাকৃতিক সম্পদগুলো চলে আসছে গভীর সমুদ্র ও পাহাড়ি অঞ্চলে। সুতরাং এই আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর দেশগুলো বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর গভীর সমুদ্র ও পাহাড়ি অঞ্চল লক্ষ করে এশিয়ান হাইওয়ের মতো বিভিন্ন প্রস্তাব নিয়ে আসছে।
অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের মতো বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলে বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানি প্রবেশ করবে প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের জন্য। সরকারের এসব বিষয়ে সতর্ক হওয়া উচিত। পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা যদি এখনই সমাধান করা না হয়, এ সমস্যাগুলো রেখে দেওয়া হয়, তবে পরাশক্তিগুলোর ‘লুক ইস্ট’ পলিসির অংশ হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা ভবিষ্যতে আরও বৃহৎ আকারে দেখা দেবে। বিশ্বের অন্যান্য দেশ কিন্তু অতি দ্রুত এসব ভূমিজনিত আদিবাসী সমস্যাগুলো সমাধান করছে। বাংলাদেশে পার্বত্য অঞ্চলে অনারোহিত প্রাকৃতিক সম্পদকে আমাদের অর্থনীতির সঙ্গে যোগ করতে চাই, তবে যত দ্রুত সম্ভব পার্বত্য অঞ্চলের সমস্যা সমাধানে সরকারকে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করতে হবে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে। সময় যত দীর্ঘায়িত হবে, তত বেশি ক্ষতিগ্রস্তদের সংখ্যা বাড়তে থাকবে।
বর্তমানে জনসংহতি সমিতি কয়েকটি ভাগে বিভক্ত। যত সময় যাবে, তত দলগুলোর বিভক্তির পরিমাণ বাড়বে এবং আলোচনার টেবিলে সমঝোতার জন্য তাদের আনা কঠিন হয়ে যাবে। পার্বত্য অঞ্চলের সমস্যা জিইয়ে রেখে বাঙালি কিংবা পাহাড়িরা কেউই লাভবান হচ্ছে না। ১৯৭৯-৮০ সালে বাঙালিদের নিয়ে পাহাড়ে স্থায়ী বসবাসের ব্যবস্থা করা হয়েছিল, তার উদ্দেশ্য ছিল পাহাড়িদের দুর্বল করা এবং তাদের আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসা। বিশেষ করে নাইন-ইলেভেনের পর বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে মুসলমান-অধ্যুষিত অঞ্চলের যে দ্বন্দ্ব চলছে, তাতে সন্দেহ থেকে যায় সন্ত্রাসী দল জাগ্রত হওয়ার। যদি ধরা যাক, পার্বত্য অঞ্চলে পাহাড়ি দলগুলো দুর্বল হয়ে গেলে এবং মুসলিম বাঙালির সংখ্যা যদি অত্যধিক বেড়ে যায় এবং পাহাড়ি জীবনযাপনে তারা অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, তাহলে ভবিষ্যতে পাহাড়ি দুর্গম অঞ্চলে জঙ্গিবাদের ঘাঁটি ও প্রশিক্ষণক্যাম্পের অভ্যুত্থান ঘটতে পারে। যদি পাশের দেশ ভারত ও মিয়ানমারের বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপের সঙ্গে তাদের সম্পর্কে গড়ে ওঠে, সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও ভারতের উভয়ের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা দেখা দেবে, যা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রের নিরাপত্তার প্রশ্নে পরাশক্তিগুলোর আক্রমণের শিকার হতে পারে। সুতরাং কোনো আন্তর্জাতিক চক্রান্তের শিকার যাতে পার্বত্য চট্টগ্রাম না হয়, সে জন্য এ মুহূর্তে সরকারকে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেওয়া উচিত। না হলে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদও নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
পার্বত্য সমস্যা সমাধানে সরকারের পাশাপাশি আঞ্চলিক নেতাদের এগিয়ে আসতে হবে। জনগণের মধ্যে এ বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টিতে এগিয়ে আসতে হবে। রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তন করতে হবে। দল-মতনির্বিশেষে সবার মতৈক্যই পারে পার্বত্য সমস্যা সমাধানে চুক্তি বাস্তবায়ন করতে।
আব্দুল কাইয়ুম
গণতন্ত্রের উন্নয়নের জন্য রাজনৈতিক মতবিরোধ দূর করে জাতীয় স্বার্থে মতৈক্যের ভিত্তিতে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে এগিয়ে আসা উচিত। পার্বত্য চট্টগ্রাম কমিশনের সদস্য স্বপন আদনানকে বলার জন্য অনুরোধ করছি।
স্বপন আদনান
পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য সরকার প্রয়োজনীয় আইন বা বিধান প্রণয়ন ও প্রয়োগ করেনি এখনো। এতে চুক্তির মাধ্যমে যে প্রতিষ্ঠানগুলো স্থাপিত হয়েছে, সেগুলো সম্পূর্ণভাবে কাজ করতে পারছে না। এখানে রাষ্ট্রীয়ভাবে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব দেখা গেছে বিগত দিনে। দেশে প্রচলিত আইনগুলো যথাযথভাবে প্রয়োগ নিশ্চিত করা হচ্ছে না। যেমন—জেলা পরিষদ আইনের ৬৪ ধারায় বলা হয়েছে, ভূমি হস্তান্তর করা যাবে না কোনোভাবেই জেলা পরিষদের সম্মতি ছাড়া। এ বিধানটি কাগজে-কলমে থাকলেও এটি পাশ কাটিয়ে যাওয়া হচ্ছে নানাভাবে। পুরো বিষয়টি ডিসি অফিস কর্তৃক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হচ্ছে। সর্বশেষে ফাইলটি জেলা পরিষদে পাঠানো হচ্ছে। ফলে জেলা পরিষদের সম্মতি থাক বা না থাক কাজগুলো সম্পন্ন হচ্ছে। অন্যদিকে অনেকটা গায়ের জোরে জমিজমা হস্তান্তর হয়ে যাচ্ছে আইন থাকা সত্ত্বেও।
চুক্তি অনুযায়ী, পার্বত্য অঞ্চলে সরকারের যেসব আইন করার কথা, সেগুলো করতে হলে আঞ্চলিক পরিষদের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। আমরা ভূমি কমিশনের আইন ও সমস্যাগুলো দেখলে বুঝতে পারি, সরকার আঞ্চলিক পরিষদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই আইনগুলো করছে। চুক্তি বাস্তবায়িত হোক বা না হোক প্রতিনিয়ত পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে যাচ্ছে। যেসব কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামে সংঘাত হয়েছিল। যেমন—জাতিগত সংঘাত, বিদ্রোহী দমন, ভূ-প্রক্রিয়া ইত্যাদি কিন্তু চুক্তির পরও অব্যাহত রয়েছে। পার্বত্য অঞ্চলে বাইরে থেকে লোক অনুপ্রবেশ বন্ধ হয়নি, পাহাড়িদের ব্যক্তিগত কিংবা গোষ্ঠীগত ভূমি, জোর-দখল করা কিন্তু চলছে বেআইনিভাবে। ফলে সমস্যাগুলো বেড়েই চলছে।
বর্তমানে বাঙালি ভূমিদস্যুরা পার্বত্য অঞ্চলে শুধু পাহাড়িদের নয়, বাঙালিদের জমিও দখল করছে। ফলে ভূমিবণ্টনে একটি বৈষম্য দেখা দিচ্ছে। এটি অনবরত চলতে থাকলে তার ওপর একটি সামাজিক, রাজনৈতিক প্রভাব পড়াই স্বাভাবিক। যে প্রক্রিয়াগুলোর কারণে সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিল, সে প্রক্রিয়াগুলো অব্যাহত থাকার ফলে এ সমস্যাগুলো আরও সংকটময় করে তুলছে বর্তমান পরিস্থিতিকে। কোনো বাঙালি সরকারপ্রধানই পাহাড়িদের জমিগুলো দখলকারী বাঙালিদের কাছ থেকে তাদের ফিরিয়ে দিতে যাবে না। কারণ, যদি তারা তা করতে চায়, তবে পাহাড়ে বসবাসরত বাঙালিসহ বাঙালি জাতীয়তাবাদের যে সংকীর্ণ একটি গণ্ডি আছে, তাদের সমর্থন কিন্তু সে সরকার হারাবে। সেই সৎসাহস আমাদের রাজনীতিবিদদের আছে কি না, সে বিষয়ে সন্দেহ রয়ে যায়। আমার মতে, এটিই মূল বাধা হিসেবে কাজ করছে চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য।
চুক্তির বাইরে বিশ্বের সমাজ, রাজনীতি যেভাবে বদলে যাচ্ছে, এতে ক্রমেই এ চুক্তিটি অবান্তর ও অপ্রযোজ্য হয়ে যেতে পারে ভবিষ্যতে। চুক্তির চেয়েও গভীর কিছু বিষয় ও অন্তরায় আছে, সেদিকে নজর দেওয়া খুব জরুরি। কিন্তু এ ব্যাপারে জাতীয় স্বার্থ ও বুদ্ধিবৃত্তিক উদ্যোগ নেই। কিছুদিন আগে আর্মড ফোর্সেস ডিভিশন, তাঁদের স্ট্র্যাটেজিক ম্যানেজমেন্ট ফোরাম করার একটি উদ্যোগ নিয়েছে বলে পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে। যদি এর প্রস্তাবগুলো সত্যিই বাস্তবায়ন করা হয়, তাহলে সমস্যা বাড়বে। শান্তিচুক্তিতে বলা হয়েছে, অস্থায়ী সেনাক্যাম্প প্রত্যাহার করা হবে। সেখানে এটি বাস্তবায়িত হলে পার্বত্য অঞ্চলে আবারও সেনা কর্তৃত্ব প্রতিস্থাপিত হবে।
ভূমি কমিশন বর্তমানে পাহাড়িদের নোটিশ দিচ্ছে। একতরফাভাবে তারা ভূমিবিরোধ মামলার নিষ্পত্তি করবে। এতে পাহাড়িদের জমি যারা দখল করেছে, তারাই শেষে আইনি কাগজ নিজেদের পক্ষে পেয়ে যাবে। এতে পার্বত্য চুক্তির বিরোধার্থক কার্যক্রম পরিচালনা করছে বর্তমানে ভূমি কমিশন।
সবশেষে বলতে চাই, সরকার আলোচনার মাধ্যমে চুক্তি সংশোধনের প্রেক্ষাপটও তৈরি করতে পারে। এসব বিষয় নিয়ে গভীর ভাবনা ও অব্যাহত আলোচনার প্রয়োজন। পার্বত্য অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কার্যত স্থিতিশীল রাজনৈতিক ও অবকাঠামোর উন্নয়ন দরকার। পার্বত্য অঞ্চলে সংঘর্ষ চলতে থাকলে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থে কোনো প্রকার লাভ হবে না।
আব্দুল কাইয়ুম
পার্বত্য অঞ্চলে অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অত্যন্ত জরুরি। যেসব বাঙালি অধিবাসী দীর্ঘদিন ধরে সেখানে আছে, তাদেরও সমস্যা রয়েছে। পার্বত্য চুক্তির ১২ বছর পর এখন সেখানে অনেকটা শান্তিপূর্ণ পরিবেশ থাকলেও মাঝেমধ্যে সংঘাত দেখা যায়। পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে পার্বত্য অঞ্চলের আদিবাসী ও বাঙালিদের কী ভূমিকা পালন করা উচিত, সে বিষয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম সম-অধিকার আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক মো. জাহাঙ্গীর কামালকে বলতে অনুরোধ করছি।
মো. জাহাঙ্গীর কামাল
পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রথমে প্রয়োজন স্থানীয় পাহাড়ি ও বাঙালিদের নিয়ে আরও অনেক আলোচনার আয়োজন করা। শুধু আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। সংঘাত-সংঘর্ষ দিয়ে কখনো সম্ভব নয়। বিভিন্ন আলোচনায় আমাদের সংগঠনের পক্ষে থেকে বলেছি, শান্তিচুক্তিটি আমরা মেনে নেব, যদি চুক্তির কিছু সাংঘর্ষিক ধারার পরিবর্তন এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের সব সম্প্রদায়ের অধিকার সংরক্ষণ করে বাস্তবায়ন করা হয়। চুক্তির সুফল আদায়ের জন্য এগিয়ে যেতে হবে সবাইকে।
সরকারের উচ্চপর্যায়ের নেতারা ও কর্মকর্তারা দু-এক দিনের সংক্ষিপ্ত সফরে গিয়ে পার্বত্য অঞ্চলের সমস্যাগুলো গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারেন না। পার্বত্য অঞ্চলে ২৫টি উপজেলা রয়েছে, যা বাংলাদেশের আয়তনের ১০ ভাগের এক ভাগ। সেখানে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী যে অতিকষ্টে জীবন যাপন করছে, তাদের জীবনযাত্রা সম্পর্কে জানতে পারছেন না। কিন্তু তাঁরা সেখানে সফরে গিয়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দিয়ে আসছেন। বাস্তবতার প্রেক্ষাপট কিন্তু অনেক ভিন্ন।
বাঙালিরা যে পাহাড়িদের জমি দখল করছে, এ অভিযোগ সত্য নয়। আসলে রাজনৈতিক সংস্কৃতির কারণে এসব কাদা ছোড়াছুড়ির মাধ্যমে রাষ্ট্রের কাছে এবং রাষ্ট্র পরিচালিত সেনাবাহিনী, পার্বত্য মন্ত্রণালয়, জেলা পরিষদ, আঞ্চলিক পরিষদের মতো সংস্থাগুলো অভ্যন্তরীণ কাদা ছোড়াছুড়ির ফলে এসব সমস্যা প্রকট হচ্ছে। বাস্তবিক পক্ষে সাধারণ পাহাড়ি উপজাতি ও বাঙালির কেউই আসলে প্রকৃত অর্থে লাভবান হচ্ছে না।
সঞ্জিব দ্রং বলছেন, এই মুহূর্তে পাহাড়িদের জন্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজন নেই, এ বিষয়ে আমি দ্বিমত পোষণ করছি। কারণ আমি দেখেছি, অনেক পাহাড়ি উপজাতি আছেন উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করার পর কর্মসংস্থানের অভাবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারছেন না। কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভাবে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে পারছেন না। এসব কারণে তাঁরা অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু হয়ে যাচ্ছেন। কর্মসংস্থানের অভাবে তাঁরা অস্ত্র হাতে তুলে নিচ্ছেন। কারণ, সেখানে কোনো শিল্প-কারখানা কিংবা শিল্পপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় আঞ্চলিক নেতারা আছেন, তাঁদের উদ্দেশে বলতে চাই, আপনারা শুধু পাহাড়িদের নেতা নন। আপনারা পার্বত্য অঞ্চলের সব ছোট জাতিগোষ্ঠী ও পাহাড়ি বাঙালিদেরও নেতা। আপনাদের পার্বত্য অঞ্চলের সবার দায়দায়িত্ব নিতে হবে, তাদের স্বার্থ ও অধিকার আদায়ে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। পার্বত্য তরুণ সমাজ হাতে অস্ত্র তুলে নিচ্ছে শুধু কর্মসংস্থানের অভাবের কারণে। তাই পার্বত্য অঞ্চলে অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে শিল্প-কারখানা প্রতিষ্ঠা করে অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা জরুরি। পার্বত্য অঞ্চলের সমস্যা সমাধানে পাহাড়ি, বাঙালিসহ সক ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী একত্র হয়ে মতৈক্য গড়ে সরকারের কাছে নিজের অধিকার তুলে ধরে তা আদায়ের জন্য এগিয়ে যেতে হবে।
পার্বত্য অঞ্চলের জেলা পরিষদের নির্বাচনের আয়োজন করার মাধ্যমে সব জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। ১৯৯২ সালের পর থেকে জেলা পরিষদের কোনো নির্বাচন হয়নি। বর্তমানে সরকারের মনোনীত ব্যক্তিরা জেলা পরিষদ পরিচালনা করছে, তাদের জবাবদিহি বলে কিছু নেই। জেলা পরিষদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। বিভিন্ন দাতা সংস্থা সেখানে উদ্দেশ্যমূলকভাবে নিজস্ব কার্যক্রম পরিচালনা করছে, সে ব্যাপারে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে সবার। ভূমি কমিশনের বিতর্কিত কার্যক্রমের ব্যাপারে সব পক্ষের আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে।
আব্দুল কাইয়ুম
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষক আমেনা মহসীনকে অনুরোধ করব বলার জন্য।
আমেনা মহসীন
আমি খুব খুশি হতাম, যদি চুক্তিতে উল্লেখ থাকত, পার্বত্য চট্টগ্রাম আদিবাসী-অধ্যুষিত এলাকা। কিন্তু চুক্তিতে কৌশলগতভাবে বলা হয়েছে, পার্বত্য চট্টগ্রাম উপজাতীয় এলাকা। যদি আদিবাসী কথাটি চুক্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকত, তবে পার্বত্য অঞ্চলের মানুষ সরাসরি ভূমি অধিকারসহ অন্যান্য অধিকার পেয়ে যেত। সম্প্রতি সরকার ঘোষণা করেছে, বাংলাদেশে কোনো আদিবাসী নেই। আদিবাসী শব্দটি যেন ব্যবহার না করা হয়। পাহাড়ি আদিবাসীদের একটি দাবি ছিল যে তারা একটি আলাদা জাতি। তখন তারা জুম্ম জাতি হিসেবে পরিচিতি পেতে চেয়েছিল। তখন এ ধরনের একটি বিভাজন সৃষ্টি করা হয়েছিল যে বাংলাদেশে একটি জাতি আছে এবং কিছু উপজাতি আছে। চুক্তিতে আদিবাসী ও উপজাতির বিষয়টি পরিষ্কার করা উচিত ছিল। প্রথমত, চুক্তিটি করার পর বাস্তবায়িত হচ্ছে না। কারণ চুক্তিতে কাঠামোগত কিছু সমস্যা আছে। যেমন—চিটাগাং হিল ট্র্যাক্টস ম্যানুয়ালের একটি সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রয়োজন। আবার যদি এটির সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়, সে ক্ষেত্রে চুক্তি-পরবর্তী যেসব প্রতিষ্ঠান পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়, জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদ, এগুলোর কাঠামোগত গঠন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে যাবে। সিএইচটি ম্যানুয়ালে ডিসিকে সব ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। যদি ম্যানুয়াল ও চুক্তিটির সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়, তবে অবশ্যই সাংঘর্ষিক কিছু বিষয়ে আগে সংশোধনী আনতে হবে। পাহাড়ে বসবাসকারী বাঙালিদের সমস্যা বিষয়ে চুক্তিতে কোনো উল্লেখই নেই। তাই ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য অবশ্যই পাহাড়ি বাঙালিদের বিষয়টি আলোচনার মাধ্যমে চুক্তির অন্তর্ভুক্ত করে সমাধান করতে হবে। পাহাড়িদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি পেতে হলে অবশ্যই আগে চুক্তিটির সাংঘর্ষিক বিষয়গুলো সংশোধন করতে হবে। তা না হলে সাংবিধানিক স্বীকৃতি পেলেও চুক্তিটি বাস্তবায়ন করা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
চুক্তি অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন করা হলেও সেটি সব সময়ই রাখা হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর অধীনে, আগে যেমন ছিল বিশেষ কার্যাদি বিভাগ। অর্থাৎ গঠনের মূল উদ্দেশ্য ছিল মন্ত্রণালয় ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। কিন্তু আমরা সব সময়ই দেখেছি, এটি সরকারের কেন্দ্রীয় ক্ষমতার মধ্যে কুক্ষিগত করে রাখা হয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম বর্তমানে প্রচণ্ড সংকটপূর্ণ অবস্থায় আছে। কারণ পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন আঞ্চলিক সংগঠনগুলো কয়েক ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। জেএসএস, ইউপিডিএফসহ সব সংগঠন বহুভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে, যা চুক্তি বাস্তবায়নে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি দেখতে পাচ্ছি পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনীতিতে। আমাদের জাতীয় বড় দুটি রাজনৈতিক দল একে অপরকে দোষারোপ করে থাকে। তেমনি পার্বত্য অঞ্চলে জেএসএস ও ইউপিডিএফ একে অপরকে সন্ত্রাসী সংগঠন বলছে। পার্বত্য অঞ্চলে চাঁদাবাজি ও জমি দখল অত্যধিক বৃদ্ধি পেয়েছে।
এনজিওগুলো সম্পর্কে পাহাড়িদের বিরূপ মনোভাব রয়ে গেছে। অথচ তারা পাহাড়ি এলাকার উন্নয়নের বিরুদ্ধে নয়। তাদের আশঙ্কা, উন্নয়নের নামে বাইরে থেকে আরও লোক সেখানে আনা হবে। উন্নয়নের নামে পাহাড়িরা বিভিন্ন ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হবে—এই ভয় থেকে তারা উন্নয়নের বিরোধিতা করছে। এ ছাড়া পাহাড়িদের নিরাপত্তার প্রশ্নে সম্প্রতি সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে ‘স্ট্র্যাটেজিক ম্যানেজমেন্ট ফোরাম’ গঠন করার। প্রত্রিকায় এ সংবাদ বেরিয়েছে। এটি যদি বাস্তবায়িত হয়, তবে পার্বত্য অঞ্চল পুনরায় সেনাবাহিনীর কর্তৃত্বে চলে আসবে। একদিকে সেনাবাহিনীর অস্থায়ী ক্যাম্প প্রত্যাহারের কথা বলা হচ্ছে সরকারের পক্ষ থেকে, অন্যদিকে সেনা কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে। আমাদের দেশের একটি অঞ্চলকে পেছনে রেখে জাতীয় কোনো উন্নয়ন সম্ভব নয়। কারণ পার্বত্য অঞ্চলও বাংলাদেশের অংশ। তাদের সামনে এগিয়ে নিয়ে আসার জন্য সরকারের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
পার্বত্য চুক্তির আগের সময় সেখানে যে ব্যাপক গণহত্যা ও নারী ধর্ষণ হয়েছিল, সে বিষয়গুলো চুক্তিতে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। এসব ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসনের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই চুক্তিতে। পাহাড়িদের নিজস্ব সংস্কৃতিতে ব্যাপক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। পাহাড়িদের নিরাপত্তার জন্য একটি ‘মাল্টি এথনিক কমিউনিটি পলিসি’র প্রয়োজনীয়তা দেখা দিচ্ছে। সবার সমন্বিত যৌথ উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে পাহাড়ি ও বাঙালিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে পার্বত্য অঞ্চলে।
আব্দুল কাইয়ুম
আদিবাসীদের নিজস্ব সংস্কৃতি রয়েছে। সেসব রক্ষার জন্য কী করা উচিত, সে বিষয়ে হিল উইমেনস ফেডারেশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইলিরা দেওয়ানকে বলার জন্য অনুরোধ করছি।
ইলিরা দেওয়ান
বর্তমান সরকার নির্বাচনী অঙ্গীকারে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের কথা বলে পাহাড়িদের যে আস্থা অর্জন করেছিল, বর্তমানে সে আস্থায় চিড় ধরেছে সরকারের উদ্যোগহীনতার কারণে। বর্তমান সরকার যে চুক্তি সম্পাদন করেছিল ১৯৯৭ সালে, সে চুক্তি বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার মাধ্যমে আবার পাহাড়িদের আস্থা অর্জন করতে হবে সরকারকে। প্রশাসনের নিরপেক্ষতা অর্থাৎ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা যাঁরা আছেন, তাঁদের নিরপেক্ষ ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের জন্য। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন পুলিশ বিভাগে যেমন কার্যক্রম শুরু করেছে, তেমনি পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রশাসনিক কর্মকর্তারা উদ্যোগ নিতে পারেন নিরপেক্ষতা বজায় রাখার জন্য।
কিছুদিন আগে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী পার্বত্য অঞ্চলে গিয়ে ঘোষণা দিয়ে এসেছেন, আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর সন্ত্রাসী কার্যকলাপ বন্ধে ও চাঁদাবাজি রোধে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করা হবে। আমি মনে করি, পাহাড়ি জনগণ কখনো সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজিকে প্রশ্রয় দেয়নি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, শুধু আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি রোধের প্রশ্ন কেন? বিভিন্ন যে জঙ্গিঘাঁটি ও জঙ্গি তৎপরতার খবর পাওয়া যাচ্ছে, তাদের নির্মূলে অভিযান পরিচালনার কোনো ঘোষণা দেওয়া হয় না কেন? এ ছাড়া জঙ্গিনেতা যাঁরা ধরা পড়েছেন, তাঁরা রিমান্ডে স্বীকার করেছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে জঙ্গিদের অস্ত্র প্রশিক্ষণকেন্দ্র রয়েছে। তাহলে এসব জঙ্গি দমনে পার্বত্য অঞ্চলে সরকারের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
পার্বত্য অঞ্চলের নারীদের প্রতি সংঘাতময় যে আচরণ করা হয়েছিল তা এখনো চলছে, তা বন্ধে পার্বত্য অঞ্চলে নারী প্রতিনিধিত্ব অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে সংবিধানের যে সংশোধনীর প্রক্রিয়া চলছে, সেখানে আদিবাসীদের অধিকারের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে। সাংবিধানিক স্বীকৃতির মাধ্যমে পাহাড়ি নারীদের অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব।
সবশেষে বলতে চাই, প্রথমে পাহাড়িদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, পরবর্তী সময়ে তাদের সামাজিক অধিকার নিশ্চিত করার জন্য উদ্যোগ নিতে হবে। পার্বত্য অঞ্চলের সব রাজনৈতিক দল বর্তমানে চুক্তির বাস্তবায়ন চাইছে। এখন শুধু সরকারের আন্তরিকতা ও সদিচ্ছাই পারে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন করতে।
সুধাসিন্ধু খীসা
পার্বত্য চুক্তি এখনই যদি বাস্তবায়ন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়, তা হলেও অনেক সময় লাগবে। আর চুক্তিটি সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন করতে তো আরও সময়ের প্রয়োজন। অসুখের চিকিৎসা জরুরি, কিন্তু অসুধ অনেক দূরে, ছয় মাস লাগবে তা আনতে! পার্বত্য চুক্তির আজকের দিনে বয়স ১২ বছর সাত মাস ২৮ দিন।
বর্তমান সরকারের মেয়াদ প্রায় দুই বছর হয়ে গেছে, তবু সরকারের পক্ষ থেকে তেমন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না চুক্তি বাস্তবায়নে। চুক্তি মোতাবেক আজও ভূমি কমিশন আইন তৈরি করা হয়নি। যদি চুক্তি মোতাবেক ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি আইন তৈরি না করে ভূমি কমিশন কার্যক্রম শুরু করে, তবে তা চুক্তিবিরোধী হওয়াই স্বাভাবিক। বর্তমানে সরকার ভূমিবিরোধ-সম্পর্কিত যে সংশোধনীর উাদ্যোগ নিয়েছে, তাতে আমি আশাবাদী হতে পারছি না। কারণ, তারা জলে ভাসা জমির বিষয়ে এখনো মতৈক্যে পৌঁছায়নি। এ জমিগুলো হচ্ছে কাপ্তাই বাঁধে যেসব জমি শীতকালে পানি কমে গেলে ভেসে ওঠে, সেগুলো। পাহাড়িরা সেসব নিচু জমিতে চাষ করে থাকে। এ জমিগুলো সরকার অধিগ্রহণ করেছিল। তাহলে সেই জমির ওপর পাহাড়িদের আর অধিকার থাকছে না। তৎকালীন আইনমন্ত্রী বলেছিলেন, সে জমিগুলো ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। এসব জমি নিয়ে পাহাড়ি-বাঙালির সংঘাতের দায়ভার কে নেবে, এমন প্রশ্নে আইনমন্ত্রী তখন রাজি হলেও বিষয়টি এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত স্থানীয় বাসিন্দাদের নিয়ে ভোটার তালিকা করা সম্ভব হচ্ছে না। ভোটার তালিকা না হওয়ায় জেলা পরিষদ নির্বাচন হচ্ছে না। ফলে সরকার মনোনীত পাঁচ সদস্যের জেলা পরিষদ আজীবন চলতে থাকবে।
চুক্তিতে উল্লেখ ছিল, আঞ্চলিক পরিষদের সদস্যদের সুযোগ-সুবিধা প্রবিধান দ্বারা নিশ্চিত করা হবে। সরকারের কাছে প্রথমেই সেই প্রবিধান রচনা করে পাঠানো হলেও কখনই মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। বিগত আমলের কোনো সরকারই চুক্তির প্রতি শ্রদ্ধা ও আন্তরিকতা দেখায়নি, চুক্তির এক যুগ পার হওয়ার পরও। ১৯৭৯-৮০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম ম্যানুয়ালে একটি সংশোধনী এনে বলা হয়েছিল, কেউ ১৫ বছর পার্বত্য অঞ্চলে বসবাস করলে তিনি স্থায়ী বাসিন্দা হবেন। ফলে রাজনৈতিক কারণে যাঁদের পার্বত্য চট্টগ্রামে পুনর্বাসিত করা হয়েছিল, তাঁদের স্থায়ী বাসিন্দা করার জন্য চুক্তি বাস্তবায়নের সময়কে দীর্ঘায়িত করা হয়েছে। ভূমি কমিশন কার্যকর করা হচ্ছে না, ফলে চুক্তি বাস্তবায়ন বিলম্বিত হচ্ছে। অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের জায়গা স্থায়ী বাঙালি বাসিন্দারা দখল করে আছে।
গত ৫ জুলাই পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়েছে, পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন ও অভ্যন্তরীণ সংঘাত প্রতিরোধে ‘স্ট্র্যাটেজিক ম্যানেজমেন্ট ফোরাম’ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে একজন উপদেষ্টা কিংবা দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি স্ট্র্যাটেজিক ম্যানেজমেন্ট ফোরাম গঠন করা হবে, যাঁরা পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সব বিষয় বাস্তবায়নে কাজ করবেন। এ ছাড়া আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রম সেখানে পরিচালনা করতে দেওয়া হবে না। কারণ এসব দলের নিবন্ধন নেই। গণপ্রতিনিধিত্ব আইনে আছে, যদি কোনো রাজনৈতিক দল নিবন্ধিত না হয়, তবে ওই দলের প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করা যাবে না। কিন্তু এর মানে এই নয় যে সে দলগুলো রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে না। অথচ আইনের দোহাই দিয়ে বলা হচ্ছে, খাগড়াছড়িতে কোনো আঞ্চলিক-রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে না। কারণ তাদের নিবন্ধন নেই।
প্রশাসন অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মাধ্যমে কীভাবে পার্বত্য অঞ্চলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়, সরকারের সে বিষয়টি আমার কাছে স্পষ্ট নয়। সরকারের প্রশাসনের ব্যুরোক্রেসি বিভিন্ন কর্মকর্তা তাঁদের আত্মীয়স্বজনের নামে হাজার হাজার একর জমি লিজ নিয়ে দখল করেছেন পার্বত্য চট্টগ্রামে। পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্ট্যান্ডিং কমিটি বেশ কিছু জমির লিজ বাতিল করেছিল। বাতিল করার সিদ্ধান্ত আবার প্রত্যাহার করা হয়েছে। অর্থাৎ যাঁরা জমি দখল করছেন, তাঁরা কতটা শক্তিশালী, তা ওই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে পরিষ্কার।
আমরা পাহাড়ি নেতারা, নেতিবাচক মনোভাব প্রত্যাহার করে ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে বর্তমানে এগিয়ে আসছি চুক্তিটি বাস্তবায়নের প্রয়োজনে। এখন সরকারের উচিত, ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসা চুক্তি বাস্তবায়ন করতে। পাহাড়িদের বিপদের সময় তাদের পাশে থাকা উচিত। সরকারের সদিচ্ছাই পারে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি দ্রুত বাস্তবায়ন করতে। বাঙালি সেনাবাহিনী তো পাহাড়িদের খাজনার টাকা দিয়েও পরিচালিত হয়। সুতরাং সেনাবাহিনী শুধু বাঙালিদের একার নয়, পাহাড়িদেরও। পাহাড়িদের নিরাপত্তা রক্ষায় সেনাবাহিনীকে দায়িত্ব নিতে হবে। সরকারের উচিত, চুক্তি অনুযায়ী জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদ কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া। সরকারের আন্তরিকতাই পারে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন করতে।
বিনায়ক সেন
ভারতের ঝাড়খন্ড রাজ্যের প্রথম অর্থনৈতিক ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট প্রণয়নের কাজে আমি সম্পৃক্ত ছিলাম, বিশ্বব্যাংকে কর্মরত অবস্থায়। আমি তখন দেখেছি, একটি রাজ্যের উন্নয়ন বিভাগ কীভাবে এগিয়ে যায়। যদি কোনো আন্দোলনের একটি বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তাভাবনা করার কেন্দ্র না থাকে, তবে সে আন্দোলন বেশি দূর এগোতে পারে না। বর্তমান বিশ্বায়নের এই যুগে যেকোনো দাবি আদায়ের জন্য অবশ্যই চিন্তাভাবনা ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাকেন্দ্র থাকা দরকার।
ঝাড়খন্ড ভারতের প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের তিন ভাগের এক ভাগ জোগান দিয়ে থাকে। সেখানে জামশেদপুরে টাটানগর রয়েছে। রাঁচির মতো বিশ্বখ্যাত পর্যটনকেন্দ্র রয়েছে। কিন্তু তার পরও এই রাজ্যে দারিদ্র্য দেখা যায়। বিশ্বায়নের এই যুগে আরেকটি ধারণা হচ্ছে, একটি মধ্যবিত্ত সমাজের আকার বাড়ানো, তারপর উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা, দরিদ্র ও পিছিয়ে যাওয়া অঞ্চলকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য। সরকারের মধ্যে যদি এই মনোভাব থাকে, তবে তা পার্বত্য অঞ্চলের জন্য বেশ ভালো হবে। কারণ, অত্যন্ত দরিদ্র ও পিছিয়ে থাকা অঞ্চলের চেয়ে মধ্যবিত্ত সমাজে উত্তীর্ণ হওয়া অনেক ভালো।
আমাদের অসম্ভবকে সম্ভব করার উদ্যোগ নিতে হবে। জাতীয়তাবাদের মধ্যে থেকে অসম্ভবকে সম্ভব করার কল্পনা করা সম্ভব নয়। জাতীয়তাবাদ রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ক্ষতিকর প্রত্যয়ে পরিণত হয়েছে। জাতীয়তাবাদের মধ্যে থেকে মাল্টি এথনিক, একটি ইনক্লুসিভ কমিউনিটি প্রতিষ্ঠা করা কষ্টসাধ্য বিষয়।
পার্বত্য অঞ্চলের নেতাদের সঙ্গে জাতীয় পর্যায়ের নেতাদের যোগাযোগ বাড়াতে হবে। চুক্তি বাস্তবায়নে আঞ্চলিক নেতাদের মতৈক্যের ভিত্তিতে একত্র হয়ে একটি ‘স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্ক’-এর মধ্যে থাকতে হবে সরকারসহ সব পক্ষকে। চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য উভয় পক্ষে আরও আলোচনা বাড়াতে হবে। সবাই একসঙ্গে বসে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সেসব সমস্যা সমাধানের পথ বের করতে হবে, যাতে পার্বত্য চুক্তিটি দ্রুত বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়।
সুলতানা কামাল
পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য কতগুলো বাধা আমাদের সামনে উঠে এসেছে। চুক্তি স্বাক্ষরের এক যুগ পার হয়ে গেছে। এই দীর্ঘ সময় পার হওয়ায় প্রেক্ষাপট অনেকটা বদলে গেছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, চুক্তি যেভাবে স্বাক্ষর করা হয়েছিল, সেভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, নাকি যুগের পরিবর্তনে চুক্তিতে সময়োপযোগী সংশোধনী আনার মধ্য দিয়ে তা বাস্তবায়ন করা হবে। এ অবস্থায় যদি দেখা যায় যে চুক্তি দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য চুক্তিতে কিছু সংশোধনী আনা দরকার, তাও সবাই মিলে ভাবা যেতে পারে। তবে চুক্তির মৌলিক বিষয়ে সংশোধন বা পরিবর্তনের কোনো প্রশ্ন উঠতে পারে না।
পার্বত্য অঞ্চলে বর্তমানে পাহাড়ি-বাঙালি জনসংখ্যার অনুপাত, পাহাড়িদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও সেখানে প্রভাব বিস্তার করতে পারে, এমন নতুন সংগঠনের আবির্ভাব—সর্বোপরি পার্বত্য অঞ্চলে রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন হয়েছে। চুক্তির সময়ে যে প্রক্রিয়ায় বাস্তবায়ন করা যেত, বর্তমানে হয়তো সে প্রক্রিয়ায় চুক্তি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না। তাই সরকারের উচিত, উদ্যোগী ভূমিকা নিয়ে পার্বত্য অঞ্চলে সব জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বকারীদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে চুক্তির সাংঘর্ষিক ধারায় সংশোধনী এনে তা বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেওয়া।
পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা সমাধানে চুক্তির বাস্তবায়ন সরকারের অগ্রাধিকারের তালিকায় নিয়ে আসার জন্য আঞ্চলিক ও উচ্চপর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ আরও বাড়ানো প্রয়োজন। শুধু পার্বত্য অঞ্চলেই নয়, সারা বাংলাদেশেই ভূমি নিয়ে বিরোধ রয়েছে। কারণ অল্প আয়তনের এ দেশে জনসংখ্যা বিপুলসংখ্যক। সুতরাং স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে আলোচনা না করে পার্বত্য অঞ্চলে যে বাঙালি প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল, এতে যে সংঘাত হয়েছিল, তা ছিল স্বাভাবিক। ভূমি কমিশন যদি জরিপ পরিচালনা করে, তবে অনেক পাহাড়ি তাদের ভূমির অধিকার হারাবে। কারণ তাঁদের ভূমির কোনো নির্দিষ্ট কাগজপত্র নেই। জোর করে দখলদারই ভূমির মালিকে পরিণত হবে।
দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়িরা বিভিন্ন বঞ্চনার শিকার হয়ে এসেছে। তাদের এই বঞ্চনা থেকে মুক্তি দিতে আমাদের সবার এগিয়ে আসতে হবে। আদিবাসীদের অধিকারের কথা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। আমাদের উচিত, দেরি না করে এখনই চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য কাজ শুরু করা। পাহাড়ি মানুষের যে অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে, সে অধিকার তাদের ফিরিয়ে দিতে চুক্তি বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত জরুরি।
আব্দুল কাইয়ুম
আলোচনায় দীর্ঘসময় ধরে সবাই বিশদ বক্তব্য দিয়েছেন। এতক্ষণের আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে নতুন কোনো মতামত থাকলে তা খুব সংক্ষেপে বলার অনুরোধ করছি।
মণিস্বপন দেওয়ান
বাংলাদেশের বেশির ভাগ রাজনীতিবিদ ও প্রশাসন যেখানে দুর্বৃত্তায়িত, সেখানে আমাদের গণতন্ত্র সব সময় শঙ্কার মধ্যে থাকে। বিশ্বসংস্থাগুলোর পরামর্শ বাস্তবায়নের জন্য মধ্যবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্ত সমাজের আকার বড় করার কথা বলা হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে বলতে চাই, প্রশাসনে কর্মকর্তারা পার্বত্য অঞ্চলে ৪২ হাজার ৪৫০ একর জমি লিজ নিয়ে দখল করেছিলেন। এ ধরনের দুর্বৃত্তায়িত সমাজে বসবাস করে কীভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা সমাধানে চুক্তি বাস্তবায়ন অতিদ্রুত করা সম্ভব, তা সবার ভাবা উচিত।
আমেনা মহসীন
আমাদের সব ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীকে সঙ্গে নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে হবে চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য। কিন্তু একসময় আমাদের নিজস্ব জাতীয়তাবোধের প্রয়োজন ছিল, সেটি অবশ্যই মনে রাখতে হবে। তা ভুলে গেলে চলবে না।
বিনায়ক সেন
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট লক্ষ করলে দেখা যায়, ভারতে যারা নির্যাতিত জাতিসত্তা ছিল, তাদের মধ্যবিত্ত সমাজ উন্নয়নের মাধ্যমে নিজেরা সামনে এগিয়ে এসেছিল। আমি এটি উদাহরণস্বরূপ বলতে চেয়েছি।
শক্তিপদ ত্রিপুরা
পার্বত্য চট্টগ্রাম ম্যানুয়াল ও চুক্তির সংশোধনী প্রয়োজন হলে তা অবশ্যই করতে হবে। বর্তমান সরকারের ভূমি কমিশনের কার্যক্রমের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে যে সরকার চুক্তি বাস্তবায়নে অবহেলা করছে। সরকারের ও সবার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করা উচিত। চুক্তি বাস্তবায়নে সবার সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের অস্তিত্ব রক্ষায়, তাদের ভাষা-সংস্কৃতি রক্ষার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে পাহাড়িদের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
গৌতম দেওয়ান
আজকের বৈঠকে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে বাধাগুলো কী, সেগুলো উঠে এসেছে। আশা করছি, যাঁরা নীতিনির্ধারক আছেন, তাঁরা এ সমস্যাগুলোর প্রতি দৃষ্টি দিয়ে, তা সমাধানে এগিয়ে আসবেন।
মো. জাহাঙ্গীর কামাল
স্থানীয় পার্বত্য রাজনীতিবিদদের পেছনে যাঁরা থাকেন, সবার সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য। স্থানীয় সব নেতার সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা চিহ্নিত করে তা সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে সব পক্ষ ও সরকারকে।
ইলিরা দেওয়ান
আমাদের সবার মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে হবে। আমি জাতি, আরেকজন উপজাতি—এই মনোভাব অবশ্যই পরিহার করতে হবে। পার্বত্য অঞ্চলের সমস্যা সমাধানে আন্তরিকতা ও মানসিকতা পরিবর্তন অতি জরুরি।
সঞ্জীব দ্রং
‘পাহাড়ি মানুষ যখন বলে, জীবন তার নয়’ কেন পাহাড়িরা এ কথা বলে, তা উচ্চপর্যায় থেকে শুরু করে সবাইকে বুঝতে হবে। পাহাড়িরা যখন নিজেদের অধিকার আদায়ের কথা বলে, তখন তারা মানুষ হিসেবে সেই দাবি রাখে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা ও জাতিসংঘ যেসব অধিকারের কথা বলছে, পাহাড়িরা তা পাওয়ার অধিকার রাখে।
বিনায়ক সেন
সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় যেহেতু পার্বত্য সমস্যাটি নেই, তাই আমার মতামত হচ্ছে, আরও আলাপ-আলোচনা আয়োজনের মাধ্যমে জনমত গড়ে তুলে সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় এ সমস্যা সমাধানের বিষয়টি আনতে হবে। মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে পাহাড়িদের অধিকার আদায়ে দল-মতনির্বিশেষে এগিয়ে আসতে হবে।
সুধাসিন্ধু খীসা
বাংলাদেশে মাথাপিছু চাষাবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ০.০২২ একর। অপরদিকে পার্বত্য অঞ্চলে মাথাপিছু চাষাবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ০.০১৪ একর। পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের আয়তনের ১০ ভাগের এক ভাগ হলেও, অর্থাৎ পার্বত্য অঞ্চলে জমির পরিমাণ বেশি হলেও চাষাবাদযোগ্য জমির পরিমাণ অনেক কম। সুতরাং বলতে চাই, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ভূমিদস্যুদের অত্যাচার বন্ধ করতে হবে। চুক্তি বাস্তবায়নে সরকারসহ সব পক্ষকে এগিয়ে আসতে হবে।
স্বপন আদনান
আইনগতভাবে পার্বত্য অঞ্চলে যাদের অধিকার বেশি, তারা সুবিধা পাবে। সে ক্ষেত্রে পাহাড়িদের প্রথাগত আইনটি রাখলে তারা বেশি সুবিধা পাবে। এতে যদি কিছু বাঙালি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাদের অন্য কোথাও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা অবশ্যই করতে হবে সরকারকে। শুধু রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে সেখানে সেনাবাহিনী মোতায়েন রাখা হচ্ছে। এখানে বলতে পারি, নিরাপত্তার নামে যে নিরাপত্তা সেখানে দেওয়া হচ্ছে, তাতে পাহাড়িরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। সুতরাং বাঙালিদের নিরাপত্তার পাশাপাশি পাহাড়িদের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে সেনাবাহিনীর। পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য যে সংশোধনীর যে প্রশ্ন উঠছে, তা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে।
মতিউর রহমান
আমাদের কথা হচ্ছে, বর্তমানে পার্বত্য অঞ্চলের অবস্থা অনেকটা সংকটাপন্ন। এর মূল কারণ, পার্বত্য অঞ্চলের সংগঠনগুলোর মধ্যে অভ্যন্তরীণ বিভেদ, দ্বিধাবিভক্তি, সন্দেহ, অবিশ্বাস ও অনাস্থা বৃদ্ধি পেয়েছে। আমরা পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের প্রতি অত্যন্ত সহানুভূতিশীল। পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক নেতাদের মূলধারার রাজনীতির সঙ্গে আরও বেশি সম্পৃক্ত হতে হবে। পার্বত্য অঞ্চলে জনমত গড়ে তুলে সরকারের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। স্থানীয় লোকজনকে নিয়ে আলোচনার আয়োজনের মাধ্যমে তাদের অধিকারের কথা সরকারের কাছে তুলে ধরতে হবে।
সুলতানা কামাল
চুক্তির যে মৌলিক বিষয়গুলো ছিল, অর্থাৎ যাদের অধিকার তা তাদের ফিরিয়ে দিতে হবে, এ বিষয়ে কোনো আপস করা যাবে না। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে যেসব সংশোধনী আনা দরকার, যা চুক্তি ও সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, সে বিষয়ে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সংশোধনী আনতে হবে। চুক্তি বাস্তবায়নে একত্র হয়ে কাজ করার কোনো বিকল্প আমাদের সামনে নেই। মানবিক সত্তা ও মানবিক অধিকারের ব্যাপারে কোনো প্রকার আপস করা যাবে না।
আব্দুল কাইয়ুম
পার্বত্য শান্তিচুক্তি যেহেতু হয়েছে, তা থেকে পিছিয়ে আসার কোনো পথ খোলা নেই। চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যদি কোনো সাংঘর্ষিক বিষয় থেকে থাকে, তা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে সব পক্ষকে এগিয়ে আসতে হবে। আজকের গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নেওয়ার জন্য সবাইকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
About: Unknown
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
eCoxs Special
BNM Archive
- ► 2026 (1332)
- ► 2025 (3280)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
-
▼
2012
(33842)
-
▼
June
(2957)
-
▼
Jun 16
(104)
- গানওয়ালাদের গান শোনা
- প্রথম আলো গোলটেবিল বৈঠক-‘পার্বত্য শান্তিচুক্তি: দ্...
- শ্রদ্ধাঞ্জলি-দীক্ষাগুরু মোহাম্মদ ফরহাদ by সারওয়ার আলী
- কালের পুরাণ-খালেদার কণ্ঠে জামায়াতের সুর! by সোহরাব...
- দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি-লোনাপানির চিংড়ি আর কৃষকে...
- তথ্য অধিকার আইন-তথ্য দেওয়ার দায়িত্ব কে নেবেন by মশ...
- সময়চিত্র-আসুন, সরকারের প্রশংসা করি by আসিফ নজরুল
- অমানবিক কারা ব্যবস্থাপনার সংস্কার দরকার-দুঃসহ কারা...
- বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ান-অরক্ষিত উপকূলীয় জনপদ
- শ্রদ্ধাঞ্জলি-নীরবেই চলে গেলেন ডা. সোফিয়া খাতুন by ...
- সোজা কলমে-নদীর কান্না আমরা শুনতে পাই না by আহমদ রফিক
- অনলাইনে পাঠক মন্তব্য
- ধর্ম-শান্তি বিনির্মাণে আন্তধর্মীয় সম্প্রীতি by মু...
- টেলিভিশন-শিশুদের নিয়ে বড়দের বেহুঁশ বিনোদন থামান by...
- সময়ের প্রতিবিম্ব-গণমাধ্যম নিয়ে দিশেহারা সরকার by এ...
- এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ও মর্মান্তিক মৃত্যু আর দেখতে চাই ...
- সুশাসন ও সহনশীলতা গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত-বিবেকের কণ্...
- চার দিক-অনামিকা, তোমাকে বাঁচাবই by আশীষ কুমার চক্র...
- পাবনার ভাবনা-আত্মতুষ্টি নয়, প্রয়োজন আত্মবিশ্লেষণ b...
- ইউরোপ-অভিবাসীবিরোধী রাজনীতি কীভাবে মূল স্রোতে এল b...
- মুদ্রা-টাকার দাম কত হবে? by মামুন রশীদ
- সুশাসন-প্রশাসনের উন্নতিকল্পে এক গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের...
- রাসায়নিক গুদামগুলো কি সরানো যায় না?-গণবিধ্বংসী মৃত...
- জ্বালানি সংস্থানের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে-বিদ্যুৎ-পর...
- বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত-‘দ্রুত’ ও ‘বিশেষ’ আইনের বিপ...
- শুভ জন্মদিন মেঘ by জাকিয়া আহমেদ
- চারদিক-একটি দরিদ্র ছবি by নেয়ামত উল্যাহ
- নিশ্চিত হোক স্বাস্থ্যসেবা
- অভিমত ভিন্নমত
- এসিড-সন্ত্রাস-নিয়ন্ত্রণ আইন কতটুকু কার্যকর by ফেরদ...
- দায় অন্যের ওপর না চাপিয়ে সমস্যা সমাধানে মনোযোগী হো...
- বাজার স্থিতিশীল রাখতে জোগান বাড়াতে হবে-চালের দাম
- স্বাগত রূপসী বাংলায়
- পবিত্র কোরআনের আলো-নবী (সা.)-এর পক্ষে কোনো কিছু খে...
- ব্রিটেনে কয়েক তরুণের কর্মকাণ্ডে শঙ্কায় নতুন প্রজন্...
- বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক সমস্যা এবং প্রসঙ্গ কথা by ড...
- ধাঁধা দুনিয়া
- সত্যিকারের সবজান্তা-বিবিধ
- যে খবর নাড়া দেয়-কিশোরী সাহসিকা!
- ভিনদেশের চিঠি-স্বপ্নে তাঁর সাথে হয় দেখা
- চারদিক-ছাদের মানুষ ও আমরা by তুহিন ওয়াদুদ
- সাম্প্রতিক ঘটনাবলি ও পুলিশের জবাবদিহি
- শহীদ সাবেরকে যেন ভুলে না যাই by সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
- চরাচর-জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলা প্রস্তুতি দিবস by তাম...
- আত্মশক্তির জোরে ঘুরে দাঁড়াতে হবে by লুৎফর রহমান রনো
- দুনিয়াজুড়ে খাদ্যঘাটতি ও মূল্য বিস্ফোরণ by শামসুল আ...
- কালান্তরের কড়চা : এবারের বঙ্গদর্শন (৩)-ছহি বড় ইউনূ...
- কলকাতার চিঠি-বাঙালির কাঁটা বাঙালি? by অমর সাহা
- সরকারদলীয় নেতা-কর্মীরা কি আইনের ঊর্ধ্বে?-ক্ষমতার দ...
- বন্ধের নীতিমালা মানা না-মানা নিয়ে সংশয়-কোচিং-বাণিজ্য
- শনিবারের সুসংবাদ-মোজাফ্ফরের চোখে আমবিপ্লবের স্বপ্...
- বীর মুক্তিযোদ্ধা-তোমাদের এ ঋণ শোধ হবে না
- রিহ্যাব মেলা-রাজউক কর্মকর্তাদের দেখে বন্ধ হয়ে যায় ...
- সময়মতো সেবা না পাওয়ায় বিদ্যুৎ গ্রাহকদের দুর্ভোগ by...
- সত্য প্রকাশ পাবেই by কামরান শফি
- লাদেনের মৃত্যু পাকিস্তানকে তাড়া করে ফিরবে by সাইমন...
- মর্ত্য থেকে সাগরে by একরামুল হক শামীম
- এই সমাজ-সামাজিক শক্তির জাগরণ চাই by শেখ জিনাত আলী
- কণ্ঠস্বর-লাদেন নেই কিন্তু তারপর? by রাহাত খান
- নদীর সেতু-অপরিণামদর্শী কাজের ফল
- জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়-নামবদলই যথেষ্ট নয়
- আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের এখনই স...
- ওসামা বিন লাদেন-আল কায়দা কঠিন সময় অতিক্রম করছে by ...
- আরেক আলোকে-ওসামা হত্যা, অতঃপর! by ইনাম আহমেদ চৌধুরী
- বিশ্ব মুক্ত সাংবাদিকতা দিবস by রুদ্র মাসুদ
- স্বল্পোন্নত দেশ সম্মেলন-নতুন অংশীদারিত্ব অথবা পুরন...
- সমকালীন প্রসঙ্গ-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ওসামা বিন লাদ...
- সুন্দরবন ও জলবায়ু পরিবর্তন-দুর্নীতিমুক্ত ব্যবস্থাপ...
- লাদেন হত্যাকাণ্ড-স্বস্তির বিশ্ব চাই
- ব্রিফিংয়ে ফখরুল-আন্দোলন দমানোর চেষ্টা করে সরকার ব্...
- ভারতের রাষ্ট্রপতি পদে ইউপিএর প্রার্থী প্রণব
- সওজের টেন্ডার নিয়ে সহিংসতা-সন্ত্রাসীদের হাতে ছিল ৫...
- আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল শান্ত, ৫০ শতাংশ কারখানা খুলেছে
- ফেরত পাঠানো হলো আরো ৪৭ রোহিঙ্গাকে
- রশ্মি প্রযুক্তির চিকিৎসা নিয়ে ছেলেখেলা! by তৌফিক ...
- শ নি বা রে র বিশেষ প্রতিবেদন-কিষান কিষানিদের পাঠশা...
- টিপাইমুখ প্রকল্প-প্রস্তুতির কাজ থেমে নেই by রাহীদ ...
- ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক চার লেন-প্রকল্প এগোয় না, খরচ ...
- ফিরিয়ে আনা হচ্ছে ভারতে সমাহিত মুক্তিযোদ্ধাদের দেহা...
- পোশাক শিল্প নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন...
- ছোট মামলায় বড় ভোগান্তি by আশরাফ-উল-আলম
- নদীর অন্তিম দশা-অবিলম্বে দখলমুক্ত করা হোক
- ব্লগের শব্দ ব্লগের কথা-অশ্লীলতা থেকে দূরে থাকুক
- পবিত্র কোরআনের আলো-মুনাফিকদের জন্য আক্ষেপ এবং রাসু...
- বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে পরিসম্পদ বণ্টন কত দূর...
- শ্রম ও কর্মসংস্থান-মে দিবস ও আজকের বাংলাদেশ by মোঃ...
- মে দিবস-রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ট্রেড ইউনিয়ন চাই by শ...
- শ্রমিক আন্দোলন-সংগঠনের ধারণা নতুনভাবে বিন্যস্ত হচ্...
- পাবনা প্রেস ক্লাবের সুবর্ণজয়ন্তী by এবিএম ফজলুর রহমান
- চলতি প্রসঙ্গ-গৃহকর্মী বনাম গৃহশ্রমিক by নূর কামরুন...
- সমকালীন প্রসঙ্গ-আইএমএফের সোনায় আরও সোনা, নদীতেও অঢ...
- হিমাগারে আলুর পচন-কৃষক দায় নেবে কেন?
- মে দিবস-শ্রমজীবীদের স্বপ্ন ও প্রত্যয়ের দিন
- বিআইডবি্লউটিএর শূন্য পদ স্থায়ী করুন by মোঃ শামীম খান
- বিশুদ্ধ পানির নিশ্চয়তা by আরিফুল ইসলাম
- হৃদয়নন্দন বনে-কোথায় পেলে ভাই এমন রঙিন পাখা by আলী ...
- মুক্তি_ নতুন অভিজ্ঞতা by আনোয়ার হোসেন
- একই বৃত্তে ঘুরছে রাজনীতি by এম আবদুল হাফিজ
- শরণার্থী-মিয়ানমারকে যে প্রশ্নটি করতে হবে by মোহাম্...
- কালের আয়নায়-গ্রামীণ ব্যাংক ব্যবস্থার একজন উদ্ভাবকে...
- ধুনটের নদী-অবৈধ ড্রেজিংয়ের বিপদ
- কোচিংবাণিজ্য-নীতিমালা কার্যকর হোক
- সদরে অন্দরে-কোন ষড়যন্ত্রের শিকার গার্মেন্ট শিল্প b...
- মনের কোণে হীরে-মুক্তো-বাংলাদেশে দুর্নীতির দৈর্ঘ্য,...
-
▼
Jun 16
(104)
-
▼
June
(2957)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...
Recent Comments
Cox's Bazar Us Categories
Cox's Bazar Us Categories
Cox's Bazar Us Categories
প্রথম আলো
আন্তর্জাতিক
মানবজমিন
আলোচনা
কালের কণ্ঠ
উপ-সম্পাদকীয়
যুগান্তর
প্রথম পাতা
মতামত
জাতীয়
সমকাল
নয়া দিগন্ত
রাজনীতি
জনকণ্ঠ
সুশীল কথন
ভারত
অর্থনীতি
শেষের পাতা
বিনোদন
ক্রিকেট খেলা
দেশে দেশে
যুক্তরাষ্ট্র
মধ্যপ্রাচ্য
স্পেশাল প্রতিবেদন
নির্বাচন
প্রথম আলো
খেলা
খোলা কলম
আইন আদালত ও বিচার
ফুটবল খেলা
আমার দেশ
ইসরায়েল
বাংলানিউজ
মুক্তধারা
স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা
Lead
ফিলিস্তিন
রাজধানী
অপরাধ
আন্দোলন
এক্সক্লুসিভ
আইন ও মানবাধিকার
নারী
শিক্ষা
বিএনপি
সারা বিশ্ব
ক্রিকেট
ইরান
সাহিত্য
পাকিস্তান
মুক্তমঞ্চ
আওয়ামী লীগ
বাংলা ট্রিবিউন
দুর্নীতি
শিশু
সারা দেশ
বিশাল বাংলা
চট্টগ্রাম
ব্রেকিং নিউজ
সাউথ এশিয়ান মনিটর
সিলেট
ক্রীড়া
পার্সটুডে
অর্থ
খালেদা জিয়া
অর্থ ও বাণিজ্য
কালবেলা
শিল্প বাণিজ্য
চীন
বিবিসি বাংলা
কাশ্মীর
চতুরঙ্গ
খবরাখবর
প্রধানমন্ত্রী
বিশ্ব
নতুন বার্তা
হত্যা
ধর্ম
স্মরণ
গল্প
যুক্তরাজ্য
শিক্ষাঙ্গন
শেখ হাসিনা
ফুটবল
বার্তা২৪ ডটনেট
রস+আলো
সাক্ষাৎকার
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
মুসলিম
জাতিসংঘ
মুক্তিযুদ্ধ
রাশিয়া
মিডিয়া
হরতাল-অবরোধ
খেলা ধুলা
ছাত্রলীগ
প্রতিবেদন
ইতিহাস
ইউরোপ
সোহরাব হাসান
জামায়াতে ইসলামী
অমানবিক
সৌদি আরব
আলোকিত চট্টগ্রাম
পশ্চিমবঙ্গ
আইন
চাষাবাদ- কৃষি ও কৃষক
ফিচার
ভ্রমণ
মিজানুর রহমান খান
ওয়েছ খছরু
খোলা চোখে
বাংলাদেশ-ভারত
ইসলাম ও সমাজ
সিরিয়া
যৌন নির্যাতন
নারায়ণগঞ্জ
নারী ধর্ষণ
জাতীয় সংসদ
আনন্দ
খেলাধুলা
ব্যাংকিং ও বিনিয়োগ
বিজ্ঞান ও গবেষণা
মাদক
আফ্রিকা
সন্ত্রাস
আনিসুল হক
যৌন আবেদনময়ী
প্রবাস
মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান
ছুটির দিনে
সৈয়দ আবুল মকসুদ
সংখ্যালঘু
নকশা
বিজ্ঞান প্রজন্ম ও কম্পিউটার
গোল্লাছুট
তুরস্ক
আফগানিস্তান
বইপত্র
ড. মুহাম্মদ ইউনূস
অন্য আলো
প্রতারণা
ছবি
টাইমস্ আই বেঙ্গলী
প্রকৃতি
ব্যবসা বাণিজ্য
অপহরণ
দুর্ঘটনা
সাহিত্যালোচনা
গার্মেন্টস শিল্প শ্রমিক
ইউক্রেন
জাতীয় পার্টি
রাজশাহী
স্টেডিয়াম
দীন ইসলাম
তরুণ প্রজন্ম
মানবাধিকার
ফূটবল খেলা
রোহিঙ্গা
মিজানুর রহমান
মশিউল আলম
আলী যাকের
আইন ও বিচার
রুদ্র মিজান
হিন্দু
মানবকণ্ঠ
খুলনা
হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ
আব্দুল কাইয়ুম
তারেক শামসুর রেহমান
আসিফ নজরুল
নেপাল
মালয়েশিয়া
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
সাজেদুল হক
ফারুক ওয়াসিফ
কাফি কামাল
মৌলভীবাজার
হাসান ফেরদৌস
আনন্দ কণ্ঠ
তৃতীয় পাতা
যাপিত জীবন
স্বাস্থ্য
সড়ক দুর্ঘটনা
ক্রিখেট খেলা
ফুটবল খলা
বদরুদ্দীন উমর
মরিয়ম চম্পা
আলী রীয়াজ
রংপুর
জ্যোতির্বিজ্ঞান
টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া
নতুনের জানালা
বৃষ্টি ও বন্যা
মোস্তফা কামাল
এ এম এম শওকত আলী
কক্সবাজার
বন্ধুসভা
শিল্প ও সাহিত্য
সংবিধান ও রাষ্ট্র
বগুড়া
মিয়ানমার
ঢাকা
ঈদ বিশেষ সংখ্যা
বাংলাদেশ
অবৈধ-অনিয়ম-কারচুপি
এ কে এম জাকারিয়া
নির্বাচনী কূটনীতি
বদিউল আলম মজুমদার
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি
গবেষণা
মিসর
এম আবদুল হাফিজ
পরিবেশ
শোক
সংস্কৃতি
খবর
বাংলাদেশে
ব্রাহ্মণবাড়িয়া
অজয় দাশগুপ্ত
প্রজন্ম ডট কম
শুভ্র দেব
আবুল কাশেম
আমদানি ও রপ্তানি
ফ্রান্স
কিশোরগঞ্জ
আবদুল মান্নান
রঙের মেলা
ঐতিহ্য
জাপান
কুমিল্লা
মুক্তমত
রাজনৈতিক আলোচনা
শরিফুল হাসান
শিল্প
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল
মাহমুদুর রহমান
ময়মনসিংহ
লেবানন
সংবাদ২৪.নেট
পার্বত্য চট্টগ্রাম
সীমান্ত সন্ত্রাস
আহমদ রফিক
ইফতেখার মাহমুদ
কাজের খবর
ইরাক
স্বপ্ন নিয়ে
টাঙ্গাইল
HotTopic
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর
যশোর
জীবনযাপন
অমর সাহা
আনোয়ার হোসেন
আলী ইমাম মজুমদার
গাজীপুর
রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন
আবুল মোমেন
থাইল্যান্ড
মুফতি এনায়েতুল্লাহ
শ্রীলঙ্কা
চিকিৎসা
মেহেদী হাসান
সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়
রসালোচনা
কামরুজ্জামান মিলু
পরিবেশ-জীববৈচিত্র্য
বরগুনা
কাজী সোহাগ
স্মৃতিচারণ
আনু মুহাম্মদ
কলকাতা
কুলদীপ নায়ার
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
সারাবেলা
অস্ট্রেলিয়া
তথ্য প্রযুক্তি
মারুফ কিবরিয়া
ব্রাজিল
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম
অন্য দিগন্ত
মহিউদ্দীন জুয়েল
মুনতাসীর মামুন
শিরোনাম
শেখ রোকন
আবু সাঈদ খান
জেল থেকে জেলে
ফেসবুক
মহিউদ্দিন আহমদ
মানসুরা হোসাইন
সংবাদ
কবিতা
বিশ্বজিৎ চৌধুরী
আলী হাবিব
প্রকৃতি ও পরিবেশ
শিল্প ও বাণিজ্য
শেষ পাতা
আবু আহমেদ
এম সাখাওয়াত হোসেন
নুরুজ্জামান লাবু
নূর মোহাম্মদ
সুভাষ সাহা
আতাউস সামাদ
আলোচনা মতামত
অর্থনীতি ও বানিজ্য
এবিএম মূসা
আতাউর রহমান
কামাল আহমেদ
পিয়াস সরকার
আসাম
রংবেরং
রাহীদ এজাজ
শ্রদ্ধাঞ্জলি
আশরাফুল ইসলাম
ফেনী
বরিশাল
মসজিদ
রণজিৎ বিশ্বাস
রোকনুজ্জামান পিয়াস
অরুণ কর্মকার
প্রকৃতি ও বিজ্ঞান
মোস্তফা হোসেইন
ইয়েমেন
একরামুল হক
আশীষ-উর-রহমান
একরামুল হক শামীম
Exclusive
ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ
তুহিন ওয়াদুদ
অপরাজিতা
ইন্দোনেশিয়া
উত্তর কোরিয়া
কালি ও কলম
জলবায়ু ও পরিবেশ
জাগোনিউজ২৪.কম
মইনুল ইসলাম
মানিকগঞ্জ
মুহম্মদ জাফর ইকবাল
মোশতাক আহমেদ
আশরাফুল হক রাজীব
ফরহাদ মাহমুদ
প্রণব বল
শংকর কুমার দে
সেলিম জাহিদ
আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ
কামরুল হাসান
পার্থ প্রতীম ভট্টাচার্য্য
রাজীব আহমেদ
শিল্পী
সাময়িকী ফ্যাশন
দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু
বিদ্যুৎ
মোরসালিন মিজান
রবার্ট ফিস্ক
অভিজিৎ ভট্টাচার্য্য
ঈদ
কাজী সুমন
ঝিলিমিলি
মুস্তাফা জামান আব্বাসী
কুষ্টিয়া
জাতীয় নাগরিক পার্টি
মনজুরুল হক
মহসীন হাবিব
মাহবুব মোর্শেদ
রফিকুল ইসলাম
শিলালিপি
শুভ রহমান
চৌধুরী মুমতাজ আহমদ
ছিটমহল
নিবন্ধ
jugantor
নোবেল পুরস্কার
পাঠকের মতামত
পাবনা
মোশাররফ বাবলু
তানভীর সোহেল
মামুন রশীদ
আনন্দ প্রতিদিন
উৎপল রায়
এনামুল হক
কাজল ঘোষ
নদী দূষণ
নাটোর
নিত্যপণ্য
ফাহিমা আক্তার সুমি
বাংলা নববর্ষ
চারু শিল্প
ভেনেজুয়েলা
শওকত হোসেন
উচ্চশিক্ষা
নজরুল ইসলাম
নিউজিল্যান্ড
পার্থ সারথি দাস
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান
গোলাম মর্তুজা
ফরহাদ মজহার
শারমিন নাহার
principalsanaullah
আদিবাসী
কালের খেয়া
দিল্লি
ফখরুল ইসলাম
বাংলাদেশ প্রতিদিন
বিজ্ঞান
মুখোমুখি প্রতিদিন
মোহীত উল আলম
রাহাত খান
অমিতোষ পাল
গল্পালোচনা
পানি আগ্রাসন
প্রযুক্তি
বিশ্বজিৎ পাল বাবু
মাহবুব তালুকদার
আব্দুল কুদ্দুস
কানাডা
বিদেশ
WikiOpinion
তোফায়েল আহমেদ
তৌহিদা শিরোপা
কাতার
জনস্বাস্থ্য
আলোকিত বাংলাদেশ
কাদের সিদ্দিকী
ড. আবু এন এম ওয়াহিদ
ফারুক মঈনউদ্দীন
মোছাব্বের হোসেন
উৎপল শুভ্র
দিনাজপুর
নোমান মোহাম্মদ
সুদীপ অধিকারী
অরূপ দত্ত
পাভেল পার্থ
ফিরোজ মান্না
মাসুদ পারভেজ
রোজিনা ইসলাম
শরিফুজ্জামান
হামিদ-উজ-জামান মামুন
আকমল হোসেন
আজিজুর রহমান
আলম শাইন
ঝড় ও দুর্যোগ
তারেক মাহমুদ
দীপংকর চন্দ
পাভেল হায়দার চৌধুরী
ফখরে আলম
ফরিদপুর
মাসুদ রানা
শহিদুল ইসলাম
আবুল হাসনাত
আসিফ আহমেদ
ইশতিয়াক পারভেজ
জিয়া চৌধুরী
শিশির মোড়ল
হারুন হাবীব
হুমায়ূন আহমেদ
অমিত বসু
আল আমিন
ওমর ফারুক
ফজলুল বারী
ফারুক চৌধুরী
মাসুদ মিলাদ
শর্মিলা সিনড্রেলা
শাহাদুজ্জামান
হায়দার আকবর খান রনো
জাবেদ রহিম বিজন
জাহাঙ্গীর আলম
ট্রানজিট
নন্দন
যতীন সরকার
যুবলীগ
আরিফুজ্জামান তুহিন
কাজী আনিছ
খাবার
গাজীউল হাসান খান
তারেক রহমান
বাংলার দিগন্ত
মোহাম্মদ কায়কোবাদ
শেখ হাফিজুর রহমান
শৈলী
সাতকানিয়া
সুদান
কাজী হাফিজ
জার্মানি
জোবাইদা নাসরীন
নিয়ামত হোসেন
মাহফুজুর রহমান মানিক
লাতিন আমেরিকা
লুৎফর রহমান রনো
ইমরান আলী
এস এম আজাদ
জাহাঙ্গীর শাহ
মাহমুদুর রহমান মান্না
মুশফিকুর রহমান
সাতক্ষীরা
ইকতেদার আহমেদ
উৎসব
ঝিনাইদহ
মাসুদা ভাট্টি
মোকারম হোসেন
শেখ সাবিহা আলম
সিরাজগঞ্জ
সৈয়দ মাহবুবুর রশিদ
হারুন আল রশীদ
WikiEducation
উজ্জ্বল মেহেদী
কনকচাঁপা
ড. মাহফুজ পারভেজ
পরিতোষ পাল
মিঠুন চৌধুরী
শাহদীন মালিক
হায়দার আলী
আহমেদ জামাল
ইমদাদুল হক মিলন
নওগাঁ
পোশাকশিল্প
বাতায়ন
ব্যবসা
আবু সালেহ আকন
এমাজউদ্দীন আহমদ
টিপু সুলতান
ড. মাহবুব উল্লাহ্
ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী
শোকাবহ ১৫ ও ২১ আগস্ট
WikiInternational
এবনে গোলাম সামাদ
পারভেজ খান
ফজলুল আলম
ফরিদা আখতার
বিভাষ বাড়ৈ
মাহমুদুজ্জামান বাবু
মুনির হাসান
মোশতাক আহমদ
সুনামগঞ্জ
আপেল মাহমুদ
আরব আমিরাত বা দুবাই
জহির উদ্দিন বাবর
নোয়াখালী
রিপন আনসারী
শরীফুল ইসলাম
সুব্রত আচার্য্য
উপন্যাস
কাল স্রোত
ক্রীড়া দিগন্ত
খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ
গাজীউল হক
জাহীদ রেজা নূর
শাহনেওয়াজ বিপ্লব
সাইদুজ্জামান
সাময়িকী
অধ্যাপক শুভাগত চৌধুরী
অনন্যা আশরাফ
অনিকা ফারজানা
আদিত্য আরাফাত
ইফতেখার আহমেদ টিপু
কামাল লোহানী
ড. সা'দত হুসাইন
তামান্না ইসলাম অলি
দক্ষিণ কোরিয়া
ফারজানা লাবনী
ফারুক যোশী
মনজুর আহমেদ
রিয়েল-টাইম নিউজ
লিবিয়া
আসজাদুল কিবরিয়া
জলবায়ু
বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য বাপন
মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী
রশিদ মামুন
লক্ষ্মীপুর
সম্পাদকীয়
সাইফুদ্দীন চৌধুরী
সুমন বর্মণ
BBC
ইমরান রহমান
ইলিরা দেওয়ান
এম শাহজাহান
কাক ছোট গল্প
ছিনতাই
নওশাদ জামিল
নুরুন্নবী চৌধুরী
প্রতীক ওমর
বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম
বিকাশ দত্ত
মনিরুজ্জামান
মহিউদ্দিন আহমেদ
উইঘুর মুসলিম
দৈনিক ইত্তেফাক
পিটার কাস্টার্স
পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রিয় চট্রগ্রাম
বাজেট
বাণিজ্য
মোবাশ্বির আলম মজুমদার
সঞ্জয় সাহা পিয়াল
হবিগঞ্জ
খুন
টাকা আনা পাই
মাহবুবুর রহমান
শুভজ্যোতি ঘোষ
হাছান কুতুবী
Hot Topic
অমর একুশে বিশেষ সংখ্যা ২০১২
অমর একুশে বিশেষ সংখ্যা ২০১২
আবিষ্কার
ড. কামাল
দৈনিক ইনকিলাব
ফিলিপাইন
ভুটান
সাভার
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ
নিয়ন আলোয়
শফিক রহমান
শামীমুল হক
শেয়ারবাজার
আইন আদালত
ইতালি
গ্রিনল্যান্ড
নারী নির্যাতন
পটুয়াখালী
ফরিদ উদ্দিন আহমেদ
মণিপুর
মাগুরা
মেক্সিকো
অনিম আরাফাত
ইসলাম
কিরণ শেখ
জাভেদ ইকবাল
দুদক
রাঙ্গামাটি
Art Mag
আরিফুল ইসলাম
প্রতিবাদ
প্রবাসী বাঙালি
বান্দরবান
মহাকাশচারী
মালদ্বীপ
শফিকুল ইসলাম
শিক্ষানীতি
সংবিধান
ডিডাব্লিউ
শরিফ রুবেল
কূটনীতি
গাইবান্ধা
ঝালকাঠি
নরসিংদী
নাইজেরিয়া
বায়ুদূষণ
শাহনাজ পারভীন
স্বাধীনতা
WikiCity
WikiPolitics
বৌদ্ধ
মতিউর রহমান চৌধুরী
যৌন অপরাধ
WikiInterview
আকবর হোসেন
কিশোর আলো
জলবায়ু পরিবর্তন
দৈনিক সংগ্রাম
Exclusive Articles
WikiEconomy
WikiLaw
ইসলামী ছাত্রশিবির
ঘূর্ণিঝড়-হারিকেন
বাগেরহাট
ভূমিকম্প
রাজনৈতিক
সমিতির খবর
সানজানা চৌধুরী
সায়েদুল ইসলাম
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল
আমাদের সময় ডট কম
কুতুবদিয়া স্পেশাল
খাগড়াছড়ি
চুয়াডাঙ্গা
ধর্মঘট
আইন ও আদালত
কাদির কল্লোল
জোহরান মামদানি
তাইওয়ান
দুর্গোৎসব ও পূজা
দৈনিক আমার সংবাদ
নববর্ষ বিশেষ সংখ্যা 2013.
নূরে আলম সিদ্দিকী
প্রতিক্রিয়া
বিডিআর বিদ্রোহ
ব্যাংক
মুন্সীগঞ্জ
শিশুসাহিত্য
খ্রিষ্টধর্ম
গদ্যকার্টুন
প্রতিদিনের সংবাদ
ভোরের কাগজ
রুমিন ফারহানা
Hit
আর্জেন্টিনা
ইহুদি
পিরোজপুর
বন্যা
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
সরল গরল
Asia
গণমাধ্যম
ডেনমার্ক
পরামর্শ
প্রকৃত্
ভাষা
ভোলা
MERIT
Soikot
WikiWoman
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ
উন্নয়ন
জর্ডান
জ্বালানি
পিলখানা হত্যাকাণ্ড
ফ্যাশন
রঞ্জন বসু
সাংসদ
স্পেন
হরতাল
WikiCrime
উইকিলিকস
ক্রিকেট ও রাজনীতি
গণতন্ত্র
গোপালগঞ্জ
চাঁদপুর
চিত্রকর্ম
ছাত্ররাজনীতি
জঙ্গিবাদ
জন্মদিন
তেল-গ্যাস
দক্ষিণ ধুরুং
দূর পরবাস
নাকিবুল আহসান নিশাদ
নারী অধিকার
নোবেল শান্তি পুরস্কার
পঞ্চগড়
পরীক্ষা
বিজয় দিবস
মেঘালয়
রাঙামাটি
সুশাসনের জন্য নাগরিক
হামলা
আন্দালিব রাশদী
ঈদুল আজহা
এনটিভি
কক্সবাজার নিউজ ডটকম
কুতুবদিয়া নিউজ
চট্টগ্রাম বন্দর
ছাত্র রাজনীতি
ঠাকুরগাঁও
ডিজিটাল বাংলাদেশ
তথ্য অধিকার
দ্বিজেন শর্মা
নির্যাতন
নড়াইল
প্রবাসী শ্রমিক
ভারতের প্রধানমন্ত্রী
মৃত্যু
শারদীয় দুর্গোত্সব
শিশুমৃত্যু
শিশুহত্যা
সালমান রাফি শেখ
সুবীর ভৌমিক
সুশাসন
স্মৃতি
Africa
My Art
অধিকার
আন্তর্জাতিক নারী দিবস
একুশে টেলিভিশন
কলম্বিয়া
কুয়েত
চিঠিপত্র
চুক্তি
তিউনিসিয়া
দুর্যোগ
নির্বাচন ও রাজনীতি
নেত্রকোণা
পরিবহন
পর্যটন কেন্দ্র
প্রশাসন
ফ্রান্সিস বুলাতসিঙ্ঘালা
বেলজিয়াম
বড়ঘোপ
ভি এস নাইপল
ভৈরব
মরক্কো
মাওবাদী
মামলা
যানজট
লেমশীখালী
সংসদ
সন্ত্রাসী
সমাজ
সামাজ
সুন্দরবন
সৈয়দ দিদার বখত
সোমালিয়া
হংকং
Middle East
Principal Sanaullah
Special Day
অগ্নিসংযোগ
অমৃতবাজার পত্রিকা
অরবিন্দ কেজরিওয়াল
আইন ও অধিকার
আগুন ও মৃত্যু
আজকের কাগজ
আল মাহমুদ
আহসান কবির
এম.এ মান্নান
এল সালভাদোর
কমল জোহা খান
কিউবা
খাদ্যসমস্যা
চাঁপাইনবাবগঞ্জ
জঙ্গি
তথ্য অধিকার আইন
দ্য ডেইলি স্টার বাংলা
পানামা
পূর্বপশ্চিম
প্রাণি ও উদ্ভিদ
বঙ্গবন্ধু হত্যা বিচার
বন্য প্রাণী
বেলুচিস্তান
ভিয়েতনাম
ভোরের ঈদ ১৯
ভয়েস অফ আমেরিকা
যায়যায়দিন
লালমনিরহাট
শিক্ষা অধিকার
শিক্ষা ও সমাজব্যবস্থা
শিশুশিক্ষা
শ্রমিক
সন্ত্রাসবাদ
সুইডেন
সুজন সুপান্থ
NEWS
Palestine
fd
অরণ্যে রোদন
অরুণাচল
অর্থনৈতিক
অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক
ইকরাম সেহগাল
উত্তর ধুরুং
উমর মনজুর শাহ
একুশে ফেব্রুয়ারি
ঐতিহাসিক
কিশোরকণ্ঠ
কুড়িগ্রাম
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
কোরবান
ঘূর্ণিঝড়
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন
জর্দান
জাইমা রহমান
জাদুঘর
জামালপুর
জীবন
জেসমিন আখতার
জ্বালানি তেল
টেলিভিশন
তথ্যপ্র্রযুক্তি
তুষার আবদুল্লাহ
দেশপ্রেম
দৈনিক কক্সবাজার
নাগরিক সংবাদ
নারীঅধিকার
নিরাপত্তা
নির্বাচিত
নেদারল্যান্ডস
পাহাড়
পয়লা বৈশাখ
বঙ্গবন্ধু
বন্দর
বিশ্ব অর্থনীতি
বিশ্বকাপ ফুটবল
ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা
মহান বিজয় দিবস
মা
মাদারীপুর
মানবতা
মানববন্ধন
মিজোরাম
মিডিয়া ভাবনা
মে দিবস
শরীয়তপুর
শিক্ষা দিবস
শিক্ষা-প্রশাসন
শুভ বড়দিন
শেরপুর
সজীব ওয়াজেদ জয়
সময়চিত্র
সরেজমিন প্রতিবেদন
সাতকানিয়া পৌরসভা
সিঙ্গাপুর
সুইজ়ারল্যান্ড
সুশান্ত মজুমদার
স্মরণ সভা
স্মর্রণ
হাসান আজিজুল হক
America
Burma
Child
China
Hot Video
Huw Cordey
Latin America
Marwan Barghouti
Tom Geoghegan
Tom Heap
Washington
kolkata24x7
অ্যান্টার্কটিকা
আহমদ ছফা
আহমেদ মুনির
উখিয়া
উত্সব
উদ্যোগ
এসিড-সন্ত্রাস
ওমান
ওয়াসি আহমেদ
কর্মসূচি
কেনিয়া
ঘড়ি
চট্টগ্রাম বন্দর
চাকরি
চারদিক
চীন ও জাপান
জনসংখ্যা
জাকির তালুকদার
জাহাজ
জায়গা
জায়মা জারনাজ রহমান
জীবনী
জেলহত্যা দিবস
জ্বালানী সম্পদ
ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন
ড. সাজিদ হক
ডিজিটাল
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন
তিব্বত
ত্রিপুরা
নগরজীবন
নরওয়ে
নিবন্ধন
নীলফামারী
পবিত্র আশুরা
পবিত্র ঈদুল ফিতর
পরিকল্পনা
পানিসম্পদ
পুলিশ
পেরু
প্যারিস
প্রান্তকথা
প্রিয়.কম
প্রেক্ষিত
বর্নাঢ্য র্যালী
বলিভিয়া
বাংলাভিশন
বাজারসুবিধা
বাস্তবসম্মত
বিচার
বিশ্ব খাদ্য দিবস
বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস
বিশ্ব নদী দিবস
বিশ্ব প্রতিবন্ধী দিবস
বিশ্ব শিক্ষক দিবস
বিশ্ববিদ্যালয়
ব্যবস্থাপনা
ব্যাংক ব্যবস্থা
ব্রিটিশ
ভাষাসৈনিক
মাহমুদ আহমাদ
মুস্তাফিজ মামুন
মোস্তফা সরয়ার ফারুকী
যুদ্ধ ও শান্তি
যুদ্ধাপরাধ
যুদ্ধাপরাধের বিচার
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রাজবাড়ী
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
লবন চাষ
শহীদের স্মৃতি
শান্তি
শিল্প ও পরিবেশ
শিশুশ্রম
সন্ত্রাস ও রাজনীতি
সহজিয়া কড়চা
সিগন্যাল
সেলিনা হোসেন
স্বাধীন
স্বাস্থ্যনীতি
স্মরণ মুক্তিযুদ্ধ
স্মৃতিঘর
হাসপাতাল
Afghanistan
Bangladesh
Brazil
CNN
California
Comments
Croatia
Delhi
Denise Winterman
Dome of the Rock
God Mag
Google
Hugh Schofield
India
Indonesia
Jane O'Brien
Japan
Jeremy Bowen
Jerusalem
Jon Kelly
Kareem Khadder
Kate Dailey
Kim Ghattas
Lead News
Libya
Mahfuz Anam
Michal Zippori
New York
Nigeria
Pakistan
Paris
Paul Colsey
Qamrul Islam
Rosie Goldsmith
Rupert Wingfield-Hayes
Sanjoy Majumder
Source
South Sudan
The Daily Star
The Telegraph
Thomas Fessy
Tours
Vietventures
Wall Street
World's Last Chance
Young
a excellent photo in Kutubdia Island
bdnews24
google search
image
অদিতি ফাল্গুনী
অমানবিকতা
অযোগ্যদে
অসারপনা
আইনকানুন
আজারবাইজান
আদিবাসী দিবস
আনোয়ারা সৈয়দ হক
আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস
আফসার আমেদ
আবদুল লতিফ মাসুম
আবু আজাদ
আশান উজ জামান
আহমদ ফাহমি
ইথিওপিয়া
ইভ টিজিং
ইমরান খান
ইমাম খাইর
ইসলাম ও জীবন
ঈদের খুশি ও আনন্দ
ঈদের বেতন
উজবেকিস্তান
উপনির্বাচ
উপনির্বাচন
উর্দুভাষী
এ পি জে আবদুল কালাম
একুশে ফেব্রুয়ারি:
ঐতিহাস
ওবামা
কক্সবাজার নিউজ
কমিল্লা
কম্বোডিয়া
কলকাতার চিঠি
কাকন রেজা
কাজাখস্তান
কাটরা
কানাই কুণ্ডূ
কালের পুরাণ
কুতুবদিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়
কৈয়ারবিল
ক্রসফায়ার
ক্ষত
ক্ষমাপ্রার্থনা
ক্ষুদ্রঋণ
কয়লানীতি
খায়ের মাহমুদ
খোন্দকার শওকত হোসেন
গাম্বিয়া
গোধূলি
গোড়ার
গৌড়
গ্রামীণ অর্থনীতি
গ্রেপ্তার
ঘূর্ণিঝড় সম্পাদকীয়
ঘোড়া
চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচন
চরমোনাই পীর
চলতি পথে
চাঁদ
চাদ
চিনি
চিরকুট
চিলি
চেয়ারম্যান
ছাত্র-রাজনীতি
ছাড়পত্র
ছুটিদন
জজ হত্যা দিবস
জনদুর্ভোগ
জনস্বাস্থ্যের
জবাবদিহি
জম্মদিন
জলদস্যু
জাতিগত সহিংসতা
জারদারি
জি. মুনীর
জীবনযুদ্ধ
জীবিকা
জুমকন্যার
জ্বালানি রাজনীতি
জ্বালানি সম্পদ
জ্বালানিসম্পদ
জয়পুরহাট
ঝুঁকি
ঝুঁকি হ্রাস দিবস
টিপাইমুখ
টিপাইমুখ বাঁধ
টিপাইমুখে বাঁধ
টিভি চ্যানেল
টোঙ্গা
ঢাকা টাইমস
তানজির আহমেদ রাসেল
তুর্কমেনিস্তান
তেঁতুল
তেলকূপ দুর্ঘটনা
তেলিরকাটা
দক্ষিণ মগডেইল
দারিদ্র্য বিমোচন
দায়গুলো
দায়িত্ব
দুই দু’গুণে পাঁচ
দুর্গ
দূর পরবাসে
দেবনারায়ণ চক্রবর্তী
দৈনিক আজাদী
নগরদর্পণ
নদীকৃত্য দিবস
নববধূ
নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচন
নারীর ক্ষমতায়ন
নাসরীন জাহান
নাসিমা আনিস
নাসির উদ্দিনের স্বাভাবিক মৃত্যু
নিজাম কুতুবী
নিপীড়ন
নিরাপতা
নির্বাসনে
নিষেধাজ্ঞা’
নূরে আলম জিকু
নেতা ইমরান খান
নেতৃত্বে
নোযাখালী
পণ্যবাজার
পদক
পবিত্র হজ
পররাষ্ট্রনীতি
পরিস্থিতি
পর্তুগাল
পাঠকের মন্তব্
পাপুয়া নিউগিনি
পাপড়ি রহমান
পাসপোর্ট
পাহাড়ধস
পিলখানা হত্যা
পোল্যান্ড
পোশাক
প্রশ্নবিদ্ধ
প্রস্তাবিত
প্রাণীজী
প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ
প্রয়াণ
ফাঁসি
ফিনল্যান্ড
ফেরি ও পন্টুন
বঙ্গবন্ধু হত্যা
বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তন
বঞ্চনা
বনসম্পদ
বরিশাল ছাত্রলীগ
বর্ণবৈষম্যবিলোপ দিবস
বাঁকখালী
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি
বাংলাদেশের পতাকা
বার্লিন দেয়াল
বাল্যবিয়ে
বাস্তবা
বাস্তবায়
বিচার বিভাগ
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড
বিজ্ঞানচিন্তা
বিজ্ঞাপন
বিজয়
বিদ্যুত
বিদ্যুৎ-সংকট
বিদ্যুৎকেন্দ্রে
বিপ্রদাশ বড়ুয়া
বিলবোর্ড দুর্ঘটনা
বিলেতের স্ন্যাপশট
বিশ্ব কুষ্ঠ দিবস
বিশ্ব পরিবেশ দিবস
বিসিবি
বুলবন ওসমান
বুড়িগঙ্গা
বৃক্ষরোপণ
বৈশ্বিক উষ্ণায়ন
বৈষম্য
বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর
ব্যারিস্টার নাজির আহমদ
ব্রুনাই
বড়পুকুরিয়া
ভাজিরালংকর্ন
ভালোবাসা
ভাষণ
ভেজাল
ভোজ্যতেল
মংলা থেকে
মঈনুল হাসান
মঙ্গোলিয়া
মঞ্জু সরকার
মনযূরুল হক
মনি হায়দার
মন্ত্রিসভা
মাওবাদী সহিংসতা
মাতৃভাষা ও পরভাষা
মানচিত্র নিউজ
মানব
মানসিক স্বাস্থ্য দিব্স
মানসিকতা
মালি
মাল্টা
মাহবুব রেজা
মাহামুদা খাতুন
মিথিলেশ ভট্টাচার্য
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম
মুরগি জমা
মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন
মূল্যস্ফীতি
মৃত্যু ও কিছু ভাবনা
মোহাম্মদ কামরুজ্জামান
মোহাম্মদ মোশাররফ হুসাইন
ম্যাডোনা
ম্যান্ডেলা দিবস
যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল
যুদ্ধাপরাধ-বিচার
রক্ত
রদ্ধাঞ্জলি
রবাণিজ্যে
রাগবি
রাজনৈতিক সংস্কৃতি
রাজপথ
রাষ্ট্রীয়
রাস্তার
রিয়াল মাদ্রিদ
রুবেল হোসেনের
রেলওয়ের
রোমাঞ্চিত
রোমানিয়া
র্বিজ্ঞান
শক্তিশালী
শঙ্কা
শরীরের
শশী থারুর
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস
শাকিরা
শাহ্নাজ মুন্নী
শায়খ আহমাদুল্লাহ
শিক্ষক খুন
শিক্ষক-রাজনীতি
শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস
শিক্ষাচিত্রে
শিক্ষাবিদের
শিবের গীত
শুঁটকি উৎপাদন
শেরাটনীয়
শোনা
শ্রদ্ধাঞ্জল
শ্রমবাজার
শ্রমশক্তি
ষড়যন্ত্র
সংকট
সংঘাত
সংশোধন
সঙ্গী
সততা
সন্দেশ
সমন্বয়সাধন
সমাজ ও নারী
সমুদ্রস্নান
সময়
সময় নিউজ টিভি
সময়ের প্রতিবিম্ব
সরকার
সাংবাদ
সাইক্লোন শেল্টার
সাইপ্রাস
সাজিদ গ্রেফতার
সাদাসিধে কথা
সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম
সামন্ততন্ত্র
সামরিক শাসন
সামাজি
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম
সাহসী
সিডনি
সিয়াম
সুপ্রভাত
সূর্যে
সেচসুবিধা
সোনার বাংলা
স্কাইপি
স্বকৃত নোমান
স্বচ্ছতা
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
স্বাধীনত
স্বাধীনতাযুদ্ধ
স্বামী
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
স্বীকৃতি
স্মৃত-নিদর্শন
স্মৃতিসৌধ
স্মৃতিসৌধে
স্লোভাকিয়া
হত্যা ও হরতাল
হাইতি
হুগজিল্ট
No comments:
Post a Comment