বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক সমস্যা এবং প্রসঙ্গ কথা by ড. নিয়াজ আহম্মেদ

দেশকে নিয়ে আমরা সবাই কমবেশি ভাবনায় রত। কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী থেকে শুরু করে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ পর্যন্ত দেশকে নিয়ে ভাবেন। তবে এই ভাবনার মধ্যে রয়েছে পার্থক্য। আবার একই ধরনের ভাবনার ভেতর ভিন্নতাও খুঁজে পাওয়া যায়। মোদ্দাকথা ভাবনার মধ্যে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি।


তবে সবার ভাবনার মধ্যে একটি সাধারণ মিল লক্ষ করা যায়, আর সেটি হলো_দেশের উন্নতি, প্রগতি এবং সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া। আমরা সবাই চাই আমাদের দেশটি জ্ঞান-বিজ্ঞান, অর্থনীতি ও প্রযুক্তিতে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর কাতারে শামিল হোক। একজন কবি দেশের উন্নতির কথা ভাবেন, কবিতা নিয়ে চিন্তা করেন, কবিতার উন্নয়নের কথা ভাবেন এবং এর মাধ্যমে দেশের শ্রীবৃদ্ধির পথ খোঁজার চেষ্টা করেন। তিনি হয়তো ভাবেন, কবিতার উন্নতির মাধ্যমে মানুষের মধ্যে পরিবর্তন আনয়ন সম্ভব, আর এর মাধ্যমে দেশ সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। একজন সংগীতশিল্পী কিংবা সাহিত্যিক তাঁর নিজস্ব বিষয়ের আঙ্গিকে দেশ ভাবনায় মনোনিবেশ করেন। তিনি তাঁর মতো করে যুক্তি উপস্থাপন করেন। তাঁর ভাবনার মধ্যে নেই কোনো খাদ। এভাবে সব পেশার মানুষ নিজ নিজ পেশাগত অবস্থান ও বুদ্ধি-বিবেচনা দিয়ে দেশকে নিয়ে ভাবেন। দেশের সমস্যার কথা তুলে ধরেন এবং কখনো কখনো সমধানের পন্থাও বাতলে দেন।
একজন শিক্ষক হিসেবে আমার ভাবনাটি শিক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়ে হওয়াটা একান্তই স্বাভাবিক। শুধু শিক্ষক নন, যেকোনো বিবেকবান মানুষকেই শিক্ষার অসামঞ্জ্যতা দারুণভাবে নাড়া দেয়। কেননা, শিক্ষা হলো এমন একটি মাধ্যম, যার মাধ্যমে আমরা বৃহৎ সমাজব্যবস্থার মধ্যে পরিবর্তন আনয়ন করতে সক্ষম হই। শিক্ষার গুরুত্ব অন্য খাতগুলোর চেয়ে অনেক বেশি। কিন্তু আমাদের দুঃখ এবং অনেকটা বাস্তবতাও বটে যে স্বাধীনতার প্রায় ৪০ বছর পরও আমরা মোট জিডিপির মাত্র ২ দশমিক ৩৬ ভাগ শিক্ষা খাতে ব্যয় করতে সক্ষম হচ্ছি। অথচ মানসম্মত হলো মোট জিডিপি-র ৮ শতাংশ বরাদ্দ হওয়ার কথা। মানসম্মত, বিজ্ঞানভিত্তিক, যুগোপযোগী শিক্ষার প্রধান এবং প্রধানতম কর্মপন্থা হলো শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো এবং শিক্ষার সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি। আমরা এ ক্ষেত্রে দারুণভাবে পিছিয়ে পড়ছি।
শিক্ষার সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর একমাত্র অর্থ এই নয় যে শিক্ষার দ্বার সহজ করা বা অবারিত করা। গুণগত মানসম্মত শিক্ষা উপহার দিতে হলে ছাত্রছাত্রীদের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে, যাতে তাঁরা এগুলোর সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে নিজেকে দক্ষ করে তৈরি করতে পারেন। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, আমরা ছাত্রছাত্রীদের নূ্যনতম সুযোগ-সুবিধা দিতে সক্ষম নই। তাঁরা অনেকটা মানবেতর জীবনযাপন করেন। সম্প্রতি পত্রিকায় প্রকাশ, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের আবাসিক সমস্যা তীব্র হওয়ায় প্রশাসনিক ভবনের কয়েকটি কক্ষ খালি করে সেখানে ছাত্রীদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়, যেখানে নেই পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থাসহ অন্য সুযোগ-সুবিধা। ছাত্রীরা যেমন মানবেতর জীবনযাপন করছেন, তেমনি চরম নিরাপত্তাহীনতায়ও ভুগছেন। ছাত্রীদের আবাসিক সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করায় শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র ছাত্রী হলের টিভি রুমে ১৫০ জন ছাত্রীর থাকার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। যদিও এখানে নিরাপত্তাহীনতার সমস্যা নেই, কিন্তু তাঁরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় এ রকম তীব্র আবাসিক সংকট বিরাজ করছে। শুধু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ই নয়, কলেজগুলোয় আবাসিক সংকট আরো প্রকট। কিছু কিছু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বাসা ভাড়া করে বিশেষ করে ছাত্রীদের থাকার ব্যবস্থা করছে, কিন্তু কলেজগুলোর পক্ষে সেটিও সম্ভব নয়। স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর রয়েছে স্বাধীনতা, তাই তাদের পক্ষে এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা সহজ। তা ছাড়া দায়িত্ববোধ থেকেও তারা বাসা ভাড়া করে কিংবা প্রশাসনিক ভবনে ছাত্রীদের থাকার ব্যবস্থা করছে। কিন্তু পরিপূর্ণ নিরাপত্তার ব্যবস্থা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো করতে পারবে কি? আজ যদি পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রীর নিরাপত্তাজনিত কারণে একটা কিছু হয়ে যায় তার দায়-দায়িত্ব কে নেবে? বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, সরকার, নাকি ছাত্রীটি নিজেই?
আজ যখন প্রাইমারি ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অসাধু শিক্ষকরা নিজেদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত বই নিয়ে তা বিক্রির মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের পথ খোঁজেন, তখন আমাদের দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে হলের অভাবে ছাত্রীদের প্রশাসনিক ভবনে অরক্ষিত অবস্থায় থাকতে হয়। যখন প্রশিক্ষণের নামে কোটি কোটি টাকা খরচ করে সরকারের কোনো কোনো কর্তাব্যক্তি বিদেশ ভ্রমণ করেন তখনো আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা কমন রুমে বা টিভি রুমে গাদাগাদি করে রাত যাপন করেন। আমরা অপ্রয়োজনীয় জায়গায় পর্যাপ্ত আর্থিক বরাদ্দ দিই, কিন্তু প্রয়োজনীয় জায়গায় পর্যাপ্ত আর্থিক বরাদ্দ দিতে পারি না। ছাত্রছাত্রীদের মেধা বিকাশের জন্য নূ্যনতম প্রয়োজনটুকু দিতে না পারায় মেধাসম্পন্ন মানুষ তৈরিতে আমরা পিছিয়ে পড়ছি। আমাদের উচিত পর্যাপ্ত আবাসিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীদের পরিপূর্ণ মেধা বিকাশের সুযোগ তৈরি করা। একটি হল নির্মাণের জন্য বিরাট পরিকল্পনার প্রয়োজন পড়ে না। খুব বেশি সৃজনশীলতারও প্রয়োজন হয় না। এটি শিক্ষানীতি প্রণয়নের মতো জটিল কাজও নয়। প্রয়োজন অর্থের এবং এর যথাযথ ব্যবহার। আমরা কি পারি না প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক সংকট দূর করার জন্য দ্রত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে? অবশ্যই পারি। এ ক্ষেত্রে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। স্বীকার করছি, সরকারের আর্থিক সংকট রয়েছে, কিন্তু আমাদের দেশে রয়েছেন অসংখ্য বিত্তশালী। তাঁদের পক্ষে একটি হল তৈরি করে দেওয়া অসম্ভব কাজ নয়। নিজেদের নাম-যশের জন্য হয়তো তাঁরা এ কাজটি করবেন। কিন্তু উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকে। ভাবতে হবে ছাত্রছাত্রীদের কথা। এমনকি পিপিপির মাধ্যমেও এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করলে মন্দ হয় না। আমরা চাই আবাসিক সংকটের সমাধান এবং সে জন্য দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ।
লেখক : অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট
neayahmed_2002@yahoo.com