বাবা কাহিনী by মুফতি এনায়েতুল্লাহ

ধর্মের দোহাই দিয়ে চিকিৎসার নামে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা ও সর্বস্বান্ত করার সংবাদ ইদানীং প্রায়ই পত্রিকায় আসছে। এ অপকর্মের সঙ্গে জড়িতরা পুলিশের হাতে ধরাও পড়ছে। সর্বশেষ রাজধানীর কদমতলী থেকে ভণ্ড টাইগার বাবাকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব।


এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায়ই কথিত শিশু পীর ও পাগলা বাবাদের উৎপাতও লক্ষ্য করা যায়। এ পীর বাবাদের অলৌকিক ক্ষমতা নিয়ে অনেক মুখরোচক কথাও চালু আছে সমাজে; তাদের কথিত বিভিন্ন অলৌকিক(!) ব্যাপারস্যাপার দেখে সাধারণ মানুষ মুগ্ধ হতে বাধ্য। মুগ্ধ হবেই না কেন? একজন মানুষের সামনে যখন সেই মানুষটির মনের কথাগুলো বলে যাচ্ছেন বাবারা, মুগ্ধ না হয়ে উপায় আছে! কিন্তু কীভাবে তারা এমনটি করছেন; তা কেউ তলিয়ে দেখছে না।
একটি বিষয় হলো, প্রায় সব মানুষই জীবনে অর্থনৈতিক উন্নতি আর খ্যাতির পেছনে ছোটে। সোজা কথায়, প্রত্যেক মানুষই এসবের প্রতি দুর্বল। কিন্তু বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতায় সে উন্নতি প্রায় সবারই অর্জন সম্ভব হয় না। আর বাবারা এ কথাগুলোই বিভিন্নভাবে ইনিয়েবিনিয়ে বলে থাকেন তাদের কাছে যাওয়া দর্শনার্থী ভক্তদের।
অনেকে তো দর্শনার্থীর অতীত জীবন ইতিহাসটাও বলে দেন। এ ছাড়া বলে দেন তার জীবনের সমসাময়িক ঘটে যাওয়া ঘটনার বিবরণও। বলা বাহুল্য, এ জাতীয় লোকগুলো হয় অতি ধুরন্ধর প্রকৃতির। যখন একজন মানুষ তাদের আস্তানায় বা দরবারে যায় কোনো সমস্যা নিয়ে, তখন ওই আস্তানায় তাদের নির্বাচিত বা একই গোত্রীয় প্রচুর লোক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে ভক্তের বেশে। বিশেষ করে মহিলাদের মধ্যে। আর এ কথা সবারই জানা, অনেক মহিলা এসবে বিশ্বাসী হয় একটু বেশি।
ওই সব লোক আগত ব্যক্তিদের মধ্যে ঢুকে তাদের সঙ্গে আপনজনের মতো মিশে বলতে থাকে তাদের নানা সমস্যার কথা। সেই সঙ্গে এই বাবার মাধ্যমে তার কী কী উপকার হয়েছে সেটিও বলে থাকে। আর এগুলো শুনে নতুন আগতরা তার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং বিশ্বাস করে বসে। চলতে থাকে আলাপচারিতা; কথার ফাঁকে ফাঁকে আগতদের সমস্যাগুলো জেনে নিয়ে বিশেষ সংকেতের মাধ্যমে 'বাবা অথবা মা'দের কাছে পাঠানো হয়। এভাবেই নানা উপায়ে আগতদের সমস্যার কথা বলে মুগ্ধ ও ভক্ত করে তোলা হয়। এরপর চলে চিকিৎসা পর্ব! পানি পড়া, তেল পড়া, সুতা পড়া, পাথর ব্যবহারসহ চলে বিচিত্র সব চিকিৎসা পদ্ধতি।
আবার গ্রামাঞ্চলে, ক্ষেত্রবিশেষ শহরাঞ্চলে এ বাবারা এসে তাদের যাবতীয় ইতিহাসসহ বিভিন্ন সমস্যার কথা বলতে থাকেন। তাদের বিভিন্ন ভাব দেখে লোকজন কাবু হতে শুরু করলে বাবা যে কোনো ভক্তের কাছে আল্লাহর নামে এক গ্গ্নাস পানি চেয়ে পান করতে থাকবেন। পানি পান করতে গিয়ে পানির পাত্রের মধ্যে তিনি দেখবেন সবকিছু। সামান্য পানি পান করে তিনি পানি পান করতে অপারগতা প্রকাশ করবেন এই বলে যে, 'না, আমি সমস্যা জর্জরিত কারও ঘরের পানি পান করি না।' এরপর শুরু হবে তার বুজুর্গি ভাব প্রকাশ।
মানুষ স্বভাবতই সমস্যার কথা শুনলে ভয় পায়, এ সম্পর্কে জানতে চায় ও প্রতিকার কামনা করে। সুযোগ বুঝে বাবাও তার বিভিন্ন কাগজপত্র, হাঁড়ি-পাতিল, কড়ি, হাড্ডিগুড্ডি বের করে আগরবাতি ও মোমবাতি জ্বালিয়ে চিকিৎসা শুরু করেন। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অসহায় ও স্বল্পশিক্ষিত লোকজনই তাদের ফাঁদে পা দিয়ে থাকে।
muftianaet@gmail.com