সব কলেজ-ভার্সিটিতে ইতিহাস অবশ্য পাঠ্য করার দাবি- ঢাবির সম্মেলন থেকে ইতিহাস শিক্ষকদের জনমত গঠনে একযোগে কাজ করার ঘোষণা

সকল বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ইতিহাস বিভাগ খোলা এবং সর্বপর্যায়ে ও সকল বিষয়ের জন্য বাংলাদেশের ইতিহাস অবশ্য পাঠ্য করার দাবি জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে জনমত গঠন করতে ইতিহাসের শিক্ষকরা একযোগে কাজ করার ঘোষণা দিয়েছেন।


শুক্রবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরসি মজুমদার আর্টস মিলনায়তনে সারাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজের ইতিহাস শিক্ষকদের এক সম্মেলন থেকে এ ঘোষণা দেয়া হয়। সম্মেলনে বক্তারা জানান, ইতিহাস চর্চার আজ বিপন্ন দশা। স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় পর্যন্ত সর্বস্তরে ইতিহাস আজ উপেক্ষিত। ঢাকা শহরের মাত্র চারটি কলেজে ইতিহাস বিষয়টি রয়েছে। দেশের ৮ জেলার ৩০ সরকারী কলেজের কোনটিতেই ইতিহাস বিভাগ নেই। দেশের সর্বমোট ২৫৩ সরকারী কলেজের মধ্যে ৯৮টিতেই ইতিহাস বিভাগ পড়ানো হয় না। তাছাড়া, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে যে ইতিহাস রয়েছে তাও শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত নয়। পাশাপাশি সারাদেশে ইতিহাস বিষয়ের শিক্ষকের ব্যাপক সঙ্কট রয়েছে।
সম্মেলনের সভাপতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন ইতিহাসের এ দৈন্যের মূল কারণ হিসেবে শিক্ষকদেরই দায়ী করেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের শিক্ষকরা আমাদের দিকে দেখেননি- একথা বলার সময় এসেছে। ইতিহাস বিভাগ থেকে যারা বেরিয়ে গেছে তাদের অনেকের চাকরির ব্যবস্থা করা যায়নি। বিএনপি-জামায়াত যখন ইতিহাস বিকৃত করা শুরু করেছে তখন আমরা শিক্ষকদের কাছে গিয়েছি। তাদের কাছে সত্য ইতিহাস বলার অনুরোধ করেছি। কিন্তু আমাদের শিক্ষকরা নিশ্চুপ ছিলেন। ইতিহাস বিকৃতির পেছনেও শিক্ষকরাই দায়ী। রাজনৈতিক চক্রান্তের শিকার হয়ে তারা ইতিহাসকে বিকৃত করে ফেলেছেন।’
মুনতাসীর মামুন বলেন, ‘ইতিহাসের বিষয়ে আওয়ামী লীগ-বিএনপি এসব বিভাজন ভুলে গিয়ে সঠিক ইতিহাস তুলে ধরতে হবে। ইতিহাসের ওপর আঘাত এলে তা প্রতিহত করা হবে।’
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইতিহাস না পড়ানোর সমস্যা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘ইতিহাস না পড়ালে শিকড়বিহীন মানুষ তৈরি হবে। সারাদেশে জঙ্গীবাদ, মৌলবাদের উত্থান হবে। মানুষ যখন তার পুরনোকে ভুলে যেতে শুরু করবে তখনই বিপর্যয় নেমে আসবে।’ এ প্রসঙ্গে তিনি পাকিস্তানের উদাহরণ টানেন। তিনি বলেন, ‘পাকিস্তানে ইতিহাস পড়ানো বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। কারণ পাকিস্তানী শাসকরা চায় না নতুন প্রজন্ম পাকিস্তানী শাসকদের নষ্টামি সম্পর্কে জানুক। যে কারণে পাকিস্তানে আজ জঙ্গীবাদ আর মৌলবাদের ছড়াছড়ি।’
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক মোহাম্মদ সেলিম বলেন, ‘ইতিহাস শিক্ষার ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ও সরকার বিভিন্ন ধরনের বৈরী আচরণ করেছে। পাকিস্তান রাষ্ট্র সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে সৃষ্ট বলে তখন ইসলামের ইতিহাস বিভাগটি চালু করা হয়। কিন্তু স্বাধীনতার পরও ইতিহাসের চাইতে ইসলামের ইতিহাসকেই বেশি প্রাধান্য দেয়ায় প্রকারান্তরে মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাকেই উস্কে দেয়া হয়েছে। সত্যিকার অর্থে মানবিক গুণাবলী সমৃদ্ধ দেশপ্রেমিক নাগরিক গড়ে তুলতে হলে অসাম্প্রদায়িক ইতিহাস চর্চার বিকল্প নেই।’ এ কারণে জাতীয় শিক্ষানীতিতে উল্লিখিত অসাম্প্রদায়িক ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমৃদ্ধ ইতিহাসের বাস্তবায়নের প্রতি জোর দেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মেসবাহ কামাল বলেন, পাকিস্তান আমলে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামের ইতিহাস খোলা হয়। তারই প্রেক্ষিতে বাংলাদেশেও ইসলামের ইতিহাসটি পড়ানো শুরু হয়। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশ হওয়ার পরও ঐ বিষয়টিই বেশি প্রাধান্য পাওয়ায় শিক্ষার্থীদের পক্ষে প্রকৃত ইতিহাস জানা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
অধ্যাপক মেসবাহ কামালের সঞ্চালনায় সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন সরকারী কলেজ ইতিহাস শিক্ষক পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক সুলতানা নিগার চৌধুরী, সরকারী কলেজ ইতিহাস শিক্ষক পরিষদের সদস্য সচিব ড. মোঃ হাবীবুল্লাহ বাহার, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাহবুবুল হক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান, খুলনার কলেজ শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোল্লা আমীর হোসেনসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ইতিহাস বিভাগের প্রায় অর্ধশতাধিক শিক্ষক। সম্মেলনে শিক্ষকরা তাদের দাবি আদায়ে সুসংবদ্ধভাবে কাজ করতে অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনকে আহ্বায়ক ও অধ্যাপক মেসবাহ কামালকে যুগ্ম আহ্বায়ক করে একটি কমিটি গঠনের প্রস্তাব করেন।

No comments

Powered by Blogger.