সিরিয়ার অভ্যুত্থান by তারিক আলী

সিরিয়ার ব্যাপারে সিএনএন ও বিবিসির বিরতিহীন, একতরফা প্রচার এবং ন্যাটো বাহিনীর অনবরত বোমা হামলা অথবা সরাসরি আগ্রাসন চলছে এখন। একদম প্রথমদিকে, আমি পারিবারিক বাথিস্ট শাসনের বিরুদ্ধে জনপ্রিয় অভ্যুত্থানকে খোলাখুলিভাবে এবং জনসমক্ষে সমর্থন করেছিলাম।


আমি আসাদের সামরিক অভ্যুত্থানের সময়েও এর বিরোধিতা করেছিলাম। যেসব আলোকিত পূর্বসূরিকে আসাদ অপসারণ করেছিলেন; আমার সৌভাগ্য হয়েছিল ছয় দিনের যুদ্ধ শেষে তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার। আমার দৃষ্টিতে তারা আরব বিশ্বের সবচেয়ে দক্ষ বুদ্ধিজীবী ছিলেন। সত্যি বলতে কি, আমি কল্পনাও করতে পারিনি, মিসরের মতো সিরিয়ায় যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়বে। কিন্তু যখন এটি ঘটল তখন আমি উল্লসিত বোধ করলাম। আমি আশা করি, অভ্যুত্থানের মাত্রা তীব্র হওয়ার ফলে শাসকশ্রেণী জনগণের সঙ্গে সমঝোতায় বসবে এবং একটি নতুন সংবিধান প্রণয়নে একটি জাতীয় পরিষদ গঠনের জন্য নির্বাচনের যৌথ পরিকল্পনা গৃহীত হবে। এ রকম একটি সমঝোতায় বসার মতো বর্তমান শাসকদের অভিপ্রায়ের সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। এটা হতে পারে না। বর্তমান শাসকদের প্রধান দুটি চরিত্র হলো নির্বুদ্ধিতা এবং নিষ্ঠুরতা, যা তাদের এই সমঝোতায় বসতে দেবে না। তারা প্রাতিষ্ঠানিক এবং বাশার আসাদ মোটামুটি নিশ্চিত যে, কোন ছাড় তাদের জন্য মারাত্মক হবে। অনেক মাস ধরে চলা জনপ্রিয় অভ্যুত্থান ছিল শান্তিপূর্ণ এবং এর শক্তি ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেয়েছে। এটা অনেকটা দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে প্রথম ফিলিস্তিনি ইন্তিফাদার সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ। আমার দৃষ্টিভঙ্গি স্বচ্ছ_ জনগণের সঙ্গে সম্পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করা। একনায়কতন্ত্র নিপাত যাক_ এটাই আমার অবস্থান। এই শাসকশ্রেণীর মধ্যে কোনো প্রগতিশীলতা নেই। কিন্তু একে কে উৎখাত করবে এবং কেমন করে? এটি অগুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন নয়।
মিসরে গণআন্দোলন জয়লাভ করেছে। কেননা সামরিক নেতারা ধরে নিয়েছিলেন, তারা মোবারক জমানায় ফিরতে পারবেন না এবং এই ভয় ছিল যে, সৈনিক ও কনিষ্ঠ কর্মকর্তারা তাদের নির্দেশ নাও মানতে পারেন। যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র স্বৈরশাসকদের ওপর সমর্থন উঠিয়ে নিল,তখন এটি ছিল সময়ের ব্যাপার।
সিরিয়ায় প্রথমদিক থেকেই সামরিক সর্বোচ্চ নেতৃত্ব দৃঢ় ছিল। একটি সংকীর্ণ পথে চলা শুরু করেছিল। তা সত্ত্বেও জনগণের পক্ষে গিয়ে দলত্যাগ ঘটেছে। যখন রাষ্ট্রের দমন-পীড়ন চরম মাত্রায় পেঁৗছাল, তখন দেশের জনগণ দেখল যে, সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই শান্তিপূর্ণ উপায়ে বেশি দিন চালানো সম্ভব নয়। তারা পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থার শরণাপন্ন হলো, যাতে লিবিয়ার মতো এখানেও পরিবর্তন ঘটে।
পশ্চিমারা তাদের মিত্র ব্যবহার শুরু করল। তাদের প্রধান নির্ভরতা তুরস্ককে মুখ্য ভূমিকায় অবতীর্ণ করাল। সৌদি আরব আর কাতারকে সহযোগী ভূমিকায় রাখল। এমনকি এ বিষয়ে ইরানকে দুর্বল করা গেছে। যার ফলে হিজবুল্লাহ, যে কিনা একমাত্র বাহিনী, যারা ইসরায়েলকে দু'বার রাজনৈতিকভাবে পরাজিত করেছিল; তাদেরও দুর্বল করা গেল।
আসাদের বিরোধিতা করা মানেই পশ্চিমা আগ্রাসন ডেকে নিয়ে আসা নয়। লিবিয়ার মতো মডেল অনুসরণ করাই একমাত্র সমাধান নয়। যদিও বিরোধীদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর মনে করেছে যে, আগ্রাসনই একমাত্র সমাধান। তারা বারবার জিজ্ঞাসা করছে, 'আন্তর্জাতিক সম্প্র্রদায় কোথায়?' কিন্তু বাকি অন্যরা একটি পশ্চিমা আগ্রাসনের বিরোধিতা করছে। দেশটির বাইরে থেকে দেখে সহজে বোঝা সম্ভব নয়_ অভ্যন্তরে কী পরিমাণ শক্তি রয়েছে এবং একই লক্ষ্যে অভ্যন্তরে একটি গণঅভ্যুত্থান দরকার।
ন্যাটোর আগ্রাসন একটি আধা-পুতুল সরকারকে স্থলাভিষিক্ত করতে পারে। লিবিয়ার মতো একই কাজ ন্যাটো করবে। যে-ই জিতুক না কেন, জনগণ পরাজিত হবে। সিরিয়াতেও একই ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে। আমি সিরিয়ার লোকাল কো-অর্জনেটিং কমিটির ২০১১ সালের ২৯ আগস্ট দেওয়া বিবৃতির সঙ্গে একমত।
বর্তমান পরিস্থিতি যদি বিদ্যমান থাকে তাহলে কী ঘটবে? একটি অপ্রীতিকর সমঝোতা। আমার মনে যে মডেলটি আসছে, তাহলো আলজেরিয়াতে সামরিক শাসনের অবসানের পরের ঘটনা। ওই ঘটনার নেপথ্যে ছিল ফ্রান্স এবং এর পশ্চিমা মিত্ররা। তারা একটি দ্বিতীয় দফার নির্বাচন হস্তক্ষেপ চালিয়ে বন্ধ করেছিল, যাতে এফআইএস জয়ী হওয়ার পথে ছিল।
মূলকথা হলো, সিরিয়ায় পশ্চিমা আগ্রাসন কখনোই সুফল বয়ে আনবে না। যদি তা চালানো হয়, তাহলে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ সংঘটিত হবে। মস্কো, তেহরান, বেইজিং থেকে চাপ সৃষ্টি করে আসাদকে জনগণের সঙ্গে সমঝোতায় বাধ্য করতে হবে। সিরিয়ার ভবিষ্যৎ যেন নির্ধারিত হয় সে দেশের জনগণের দ্বারা।

তারিক আলী :বামপন্থি বুদ্ধিজীবী কাউন্টারপাঞ্চ থেকে ভাষান্তর
অনিন্দ্য আরিফ

No comments

Powered by Blogger.